Home ইশকে এ নিকাহ ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১০

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১০

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১০
লাইরা আয়নাত

শহরের অন্যতম ল্যাভিশ আর অভিজাত এক রেস্টুরেন্ট। চারপাশে রয়্যাল ফ্যামিলি আর তাদের ফ্যামিলি ফ্রেন্ডসদের আড্ডা, হাসিখুশি হৈহুল্লোড় আর ডিনারের এক জমকালো পরিবেশ। আর ঠিক এই অ্যারিস্টোক্রেটিক ক্রাউডের মাঝখানে, আয়াজের ঠিক পাশেই একদম নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে ইনায়াত। এখানে আসার কোনো ইচ্ছাই তার ছিল না। কিন্তু আয়াজ খুব সুকৌশলে তার মাকে দিয়ে ইনায়াতকে নিয়ে এসেছে। স্বয়ং আয়াজের মায়ের নির্দেশ, তাই বাধ্য হয়েই ইনায়াতকে এই ডিনারে এটেন্ড করতে হয়েছে।

উপস্থিত এলিট মানুষজন ইনায়াতকে দেখে বেশ কৌতূহলী। অনেকেই জানতে চাইছে, কে এই মেয়ে? তবে আয়াজ কিছু বলার আগেই তার মা খুব ক্যাজুয়াল আর ডিপ্লোমেটিক টোনে বলে দিচ্ছেন, ইনায়াত উনার এক ফ্রেন্ডের মেয়ে। আসলে একজন কনকিউবাইনের মেয়ে যে ক্রাউনের লিগ্যাল ওয়াইফ, এই সত্যিটা এই রয়্যাল সোসাইটির কেউ মেনে নিতে পারবে না। তাই পরিচয়টা গোপন রাখাটাই তাদের কাছে সেফ মনে হচ্ছে। ইনায়াতের কাছে বিষয়টা মোটেও অবাস্তব বা হার্টব্রেকিং লাগছে না। কারণ এমন বঞ্চনা, অবহেলা আর নিজের অস্তিত্বকে লুকিয়ে রাখার প্র্যাকটিস তার বহুদিনের, সে এতে অভ্যস্ত। তবে রয়্যাল গেস্টদের ফিসফিসানি ঠিকই তার কানে আসছে”ওহ! এই জন্যই মেয়েটার মাঝে এমন একটা কমনার ভাইব! আউটফিট আর প্রেজেন্টেশনও তো একদমই রয়্যাল নয়।

কথাটা খুব একটা ভুলও নয়। ইনায়াতের পরনে কোনো গ্ল্যামারাস গাউন নেই বরং একটা ডার্ক ব্রাউন ওভারসাইজড শার্ট আর অফ-হোয়াইট ওয়াইড-লেগ প্যান্ট পরেই সে চলে এসেছে। লাউড মেকআপ বা সাজগোজ তার সাথে একদমই যায় না। নিজের এই ক্যাজুয়াল আর কমফোর্টেবল লুক নিয়েই সে এই রয়্যাল গ্যাদারিংয়ে বসে আছে।
এই একই ডিনার পার্টিতে উপস্থিত আছে ইনায়াতের সৎ ভাই ফায়েদ এবং ফায়েদের খালাতো ভাই জেভিয়ার। পুরোটা সময় জেভিয়ারের দৃষ্টি ইনায়াতের ওপরই আটকে আছে। জেভিয়ার এখানকার ভেতরের অনেক কিছুই জানে। সে খুব ভালো করেই বোঝে যে আয়াজ এখনো ইনায়াতকে মন থেকে অ্যাকসেপ্ট করেনি। জেভিয়ার ইনায়াতকে প্রচণ্ড পছন্দ করে, কিন্তু ফ্যামিলি স্ট্যাটাস আর রয়্যাল প্রোটোকলের কারণে কখনো তার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ফিলিংস এক্সপ্রেস করার সাহস পায়নি। জেভিয়ার নিজেও একজন ক্রাউন, তবে ‘সেকেন্ড ক্রাউন’। আর ইনায়াত স্ট্যাটাসের দিক থেকে তার চেয়ে অনেক লোয়ার ক্লাসের হওয়ায়, ফ্যামিলি কখনোই এই সম্পর্ক মেনে নিত না। স্ট্যাটাসের এই কোল্ড ক্যালকুলেশন করতে করতেই জেভিয়ার আজ ইনায়াতকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে।

ডিনার টেবিলে বসে জেভিয়ার অপলক দৃষ্টিতে ইনায়াতের শান্ত, চুপচাপ মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সে জানে, ইনায়াত মোটেও এত সাইলেন্ট নেচারের কেউ নয়। ভেতর ভেতর সে ভীষণ চঞ্চল আর প্রাণবন্ত একটা মেয়ে, কিন্তু সেই রূপটা শুধু তার ক্লোজ সার্কেলের আপন মানুষদের জন্যই। ওদিকে আয়াজ হয়তো টেবিলে বসে অন্যদের সাথে টুকটাক বিজনেস টপিক নিয়ে কথা বলছে, কিন্তু জেভিয়ারের এই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার বিষয়টা তার শার্প চোখ এড়াতে পারে না। শুরুতে সে বিষয়টা ইগনোর করার চেষ্টা করলেও, কিছুক্ষণ পর তার বেশ ইরিটেশন হতে শুরু করে। ইনায়াত এর দিকে অন্য কারো এমন চাহনি আয়াজের ইগোতে লাগে, ব্যাপারটা সে মোটেও টলারেট করতে পারে না। তাই কথা বলার ফাঁকেই সে দুই হাতের কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে, থুতনিতে হাত রেখে এমনভাবে নিজের পজিশন চেঞ্জ করে নেয়। যাতে ইনায়াত পুরোপুরি আড়াল হয়ে যায় আর জেভিয়ার কোনোভাবেই তাকে দেখতে না পারে।

এই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে ইনায়াত কোনোমতে ডিনারটা শেষ করে। তারপর খুব শান্তভাবে টেবিল ছেড়ে উঠে আসে। রেস্টুরেন্টের মেইন গেটে প্রচুর সিকিউরিটি আর গার্ড, তাই সে সবার চোখ এড়িয়ে সেকেন্ড গেট দিয়ে বেরিয়ে বাইরের খোলা আকাশের নিচে এসে দাঁড়ায়। রাতের ঠান্ডা বাতাসে এখন সে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারছে। এতক্ষণ এই রয়্যাল গ্যাদারিংয়ের মাঝে নিজেকে খাঁচায় বন্দী কোনো সাফোকেটেড প্রাণীর মতো মনে হচ্ছিল তার। চারপাশে তাকিয়ে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ইনায়াত।
তাকে একা বেরিয়ে যেতে দেখে জেভিয়ারও আর বসে থাকতে পারে না। ওয়াশরুমের এক্সকিউজ দিয়ে সে-ও ইনায়াতের পিছু পিছু বাইরে চলে আসে। ইনায়াতকে বাইরের শান্ত পরিবেশে স্বস্তির সাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জেভিয়ার পেছন থেকে খুব সফট টোনে ডেকে ওঠে, “হেই ইনায়াত! কেমন আছো?”
পরিচিত গলার স্বর শুনে ইনায়াত থেমে যায় এবং পেছনে তাকায়। জেভিয়ারকে নিজের ঠিক সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে ইনায়াতের এক্সপ্রেশনে কোনো হেলদোল দেখা যায় না। সে খুব স্বাভাবিকভাবে ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি ফুটিয়ে বলে, “এই তো, আলহামদুলিল্লাহ!”
জেভিয়ারের ঠোঁটের কোণে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। নিজের পছন্দের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলতে পারাটাই এই মুহূর্তে তার জীবনের সবচেয়ে বড় পিস। চারপাশের নয়েজ, পার্টির ঝলমলে আলো কিংবা ভেতরের ডিনার টেবিলের ফেক হাসি-ঠাট্টা, কোনো কিছুই এখন আর তাকে স্পর্শ করে না। সেকেন্ড গেটের ঠাণ্ডা বাতাসে ইনায়াতের চুলগুলো হালকা উড়ছে এবং সেই দৃশ্যটাই জেভিয়ারের কাছে এই মুহূর্তের সবচেয়ে বিউটিফুল সিনারি মনে হচ্ছে।

সে ইনায়াতের দিকে তাকিয়ে বেশ কিউরিওসিটি নিয়ে জিজ্ঞেস করে, “ম্যারেড লাইফ কেমন যাচ্ছে তোমার? এত জলদি বিয়েটা হয়ে গেল, তাও আবার এমন এক্সিডেন্টালি……..
প্রশ্নটা শুনে ইনায়াত একটু থমকে যায়। তারপর এবারও খুব ক্যাজুয়াল একটা হাসি দেয়। তার চোখেমুখে কোনো রিগ্রেট বা রাগ নেই। তার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে জেভিয়ারের এই প্রশ্নটার উত্তর সে নিজেও জানে না, আবার জানতেও চায় না। সে শান্ত গলায় বরং পাল্টা প্রশ্নই ছুঁড়ে দেয়, “আপনিও তো একজন ক্রাউন। আপনার সাথে যদি আমার মতো কোনো কমনারের বিয়ে হতো, তাহলে আপনাদের লাইফটা কেমন কাটত?”
প্রশ্নটা শুনে জেভিয়ার একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ইনায়াতের চোখের দিকে ভীষণ সফট আর কেয়ারিং এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। এই মুহূর্তে সে শুধু একজন ক্রাউন প্রিন্স নয়, বরং একজন সাধারণ পুরুষ যে তার পছন্দের নারীটার সামনে নিজের ফিলিংস সাজাচ্ছে। তারপর ধীরে ধীরে সে উত্তর দেয়, “হয়তো ফ্যামিলির দিক থেকে সিচুয়েশন খুব একটা ভালো যেত না। কিন্তু আমার দিক থেকে আমি তাকে সবসময় প্রটেক্ট করে রাখতাম। কারণ আমার কাছে এই সো-কল্ড ক্লাস বা স্ট্যাটাস কোনো ম্যাটার করে না।”

কথাগুলো ইনায়াতের কানে এসে এক মৃদু ঢেউ তুলে যায়। সে কিছুক্ষণ সাইলেন্ট থাকে। চোখ নামিয়ে নিজের হাতের আঙুলগুলোর দিকে তাকিয়ে খুব শান্তভাবে বলে, “কিন্তু আপনার মতো তো আর সবাই ভাবে না। সবাই এখানে নিজেদের ক্লাস আর স্ট্যাটাস মেইনটেইন করতেই ব্যস্ত।” একটু থেমে নিজেকে সামলে নিয়ে ইনায়াত আবার বলে, “এনিওয়ে, বাদ দিন এসব। আমরা মনে হয় একটু বেশিই ডিপ কনভারসেশনে চলে যাচ্ছি।”
জেভিয়ার ইনায়াতের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে এমন কিছু একটা এক্সপ্রেশন কাজ করছে যা ইনায়াত পড়তে পারলেও ইগনোর করার ভান করে। জেভিয়ার নিজের মনের কোনো একটা আনটোল্ড ফিলিংস ইনায়াতকে বলতে চায়। সে ঠোঁট নাড়ে, একটা শব্দ বের হতেই যায় এবং ঠিক তখনই সেখানে আয়াজের এন্ট্রি হয়।
আসলে জেভিয়ার যখন ওয়াশরুমের এক্সকিউজ দিয়ে টেবিল ছেড়ে ওঠে আসে, আয়াজও ঠিক তার পিছু পিছু সেকেন্ড গেটের দিকে চলে আসে। একদম চুপিসারে এসেছে। এতক্ষণ আড়ালে দাঁড়িয়ে, পিলারের পেছনে হাইড করে সে তাদের মধ্যকার সব কনভারসেশন শোনেছে।

তাদের এই ক্লোজ কনভারসেশন শুনে আয়াজের বুকের ভেতরটা কেমন মুচড়ে ওঠে। এক অদ্ভুত জেলাসি আর ইরিটেশন তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলতেছে। তার মনে হতে থাকে কেউ তার নিজের জিনিসে হাত দিচ্ছে, অথচ সে স্বীকার করতেও পারে না যে জিনিসটা আদৌ তার। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, হাতের মুঠোও শক্ত হয়ে যায়। সে আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে সরাসরি তাদের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে।
হঠাৎ আয়াজকে সেখানে দেখে জেভিয়ার বেশ সারপ্রাইজড হয়ে পড়ে তার মুখের সেই সফট এক্সপ্রেশনটা মুহূর্তেই বদলে যায়। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, “আয়াজ! তুমি এখানে? এই সেকেন্ড গেটে?”
আয়াজ জেভিয়ারের কথার কোনো ডিরেক্ট আনসার দেয় না। সে ইনায়াতের দিকে একটা তাচ্ছিল্যভরা দৃষ্টিতে তাকায়। সেই দৃষ্টি একইসাথে পজেশন আর কমপ্লেইন দুটোই প্রকাশ করে জেভিয়ারের দিকে ফিরে খুব ক্যাজুয়াল আর ফেক একটা স্মাইল দিয়ে বলে, “আমার ওয়াইফ এখানে চলে এসেছে, তাই আমিও দেখতে এলাম আসলে কী হয়েছে। এমনিতেও ডিনার টেবিলে মম ওকে সবার সামনে রিয়েল আইডেন্টিটি দেয়নি, তাই আমার একটু গিল্টি ফিল হচ্ছিল।”

“ওয়াইফ” শব্দটা সে এমন এক জোর দিয়ে উচ্চারণ করে, তবে সেটা শুধু ইনায়াতকে শেক করার জন্য নয়, বরং জেভিয়ারের মাঝখানে একটা ইনভিজিবল দেয়াল তুলে দেওয়ার জন্যই বলা। আয়াজের এই ওভার-প্রোটেক্টিভ আর পজেসিভ বিহেভিয়ার দেখে জেভিয়ার কিছু একটা বলতে যাবে, তার ঠোঁট নড়ে ওঠে প্রটেস্ট করার জন্য। কিন্তু ঠিক তখনই তার ফোনে একটা কল চলে আসে। ফোনের স্ক্রিনে নামটা দেখে সে একটু কপাল কুঁচকায়। তারপর আর কথা না বাড়িয়ে ওদের দুজনকে গুডবাই জানিয়ে কলটা রিসিভ করতে করতে ওখান থেকে চলে যায়।
তবে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে সে ইনায়াতের দিকে এক পলক তাকায়। তার সেই আহত দৃষ্টিতে অনেক কিছু হাইড করা থাকে একটু আক্ষেপ, একটু চিন্তা আর অনেকটা আনস্পোকেন ওয়ার্ডস।
জেভিয়ার চোখের আড়াল হতেই ইনায়াত পুরো ঘুরে দাঁড়িয়ে আয়াজের দিকে তাকায়। এতক্ষণ যে শান্ত ইনায়াত জেভিয়ারের সাথে কথা বলছিল, তার চোখে এখন তীব্র ইরিটেশন এক নিমিষেই তার শান্ত মুখোশটা খসে পড়ে। আয়াজ কে সে স্ট্রেটফরোয়ার্ড ভাষায় বলে, “আপনার কি সব জায়গায় এমন নাটক করতে হয়? জেভিয়ার এখানকার সব সত্যিটাই বোঝে। সো, আপনার এই ড্রামা করার কোনো প্রয়োজন ছিল না।আর শুনুন, নেক্সট টাইম আমাকে সবার সামনে ‘ওয়াইফ’ বলে ডাকবেন না। আমি কারো ওয়াইফ নই।”
কথাগুলো শুধু শব্দ থাকে না। একেকটা ছোট ছোট শার্প ছুরির মতো সেগুলো সরাসরি আয়াজের ইগোতে গিয়ে বিঁধে যায়।

ইনায়াতের এই মুখের ওপর জবাব আর রিজেকশন আয়াজ টলারেট করতে পারে না। তার চোখ দুটো লাল হয়ে আসে এবং কপালের রগ ফুলে ওঠে। সে ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে, গলার টোন উঁচিয়ে প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে, “তোমার তো লাক ভালো যে আমি সবার সামনে তোমায় নিজের ওয়াইফ বলে একনলেজ করেছি, আর তুমি সেটা নিয়েই ডিনাই করছ?”
এ বলে ও একপা এগিয়ে আসে ইনায়াতের দিকে। দাঁতে দাঁত চেপে, প্রতিটা শব্দে পয়জন ঢেলে বলে, “শুকরিয়া আদায় করো, ফ্লোরেন্স! জীবনে অন্তত শুকরিয়া আদায় করতে শেখো।”
ইনায়াত আয়াজের কথায় বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে সামনের দিকে হেঁটে চলে। তার চোখে-মুখে এক ধরনের শীতল উদাসীনতা, মনে হচ্ছে চারপাশের পৃথিবী বা তার পাশে হাঁটা মানুষটার কোনো অস্তিত্বই তার কাছে নেই। আয়াজ অবশ্য এত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নয় সে দ্রুত পা চালিয়ে ইনায়াতের সাথে নিজের পেস ম্যাচ করে নেয়। গলাটা যথাসম্ভব সফট রেখে সে জিজ্ঞেস করে,
“তুমি কি হার্ট হয়েছ?”
ইনায়াত নিজের হাঁটার রিদম একটুও না ভেঙে, সামনের দিকে তাকিয়েই পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
“কী নিয়ে?”
আয়াজ একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, “মম যে ট্রুথটা রিভিল করল না আসলে বুঝতেই তো পারছ, তুমি আর আমি সেম ক্লাসের না, তাই আরকি।”

ইনায়াতের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। সেই হাসিতে কোনো অভিমান নেই, আছে এক নিরাসক্তি যে নিরাসক্ত দেখে আয়াজের বুকের ভেতরটায় শূন্যতা তৈরি হয়ে যায়। ইনায়াত শান্ত স্বরে বলে,
“উনি তো সত্যিই বলেছেন, আমার সাথে কি আপনার ম্যাচ করে? আমি ওসব বিষয়ে কখনোই হার্ট হই না, মিস্টার ক্রাউন। আই গেস, আপনি এই কয়দিনে আমার সম্পর্কে এতটুকু আইডিয়া তো পেয়েছেনই।”
আয়াজ জানে, ইনায়াতের কাছে এসব রয়্যাল ট্যাগ, ব্ল্যাডলাইন বা ক্লাস-ডিফারেন্সের কোনো ভ্যালু নেই। তারপরও মনের ভেতরের কোনো এক চোরা আশা থেকে সে আবার জিজ্ঞেস করে বসে,
“সত্যিই আমার একসেপ্ট না করায় তোমার কিছু যায় আসে না? আমার ওয়াইফ হয়েও না হওয়ার এই ট্যাগটাতেও না?”
ইনায়াত এবার নিজের দু’হাত বুকে ফোল্ড করে নিতে নিতে বলে, “যার-তার কথায় আমার কিছু যায় আসে না। আর আমি আপনার ওয়াইফ নই, তাই এক্সপেক্ট করব নেক্সট টাইম আমাকে এটা আর বলবেন না।”

কথাটা আয়াজের ইগোতে একটা শার্প গ্লাসের মতো বিঁধে যায় গিয়ে। সে কিছুটা শকড হয়েই বলে ওঠে, “আমি তোমার কাছে জাস্ট ‘যে কেউ’?”
ইনায়াত নির্লিপ্তভাবে মাথা নাড়ায়, “অবশ্যই।”
“সত্যিই কেউ না?”
“না।”
আয়াজ একটা তপ্ত শ্বাস ছেড়ে ইনায়াতের চোখের দিকে ডিপলি তাকায়। তার ঠোঁট থেকে বেরিয়ে আসে এমন একটা সেন্টেন্স, যা ঠিক অভিযোগ না কি আক্ষেপ বোঝা মুশকিল। “তুমি সত্যি খুব উইয়ার্ড, ফ্লোরেন্স।”

এতক্ষণে ইনায়াত এবার চোখ তুলে আয়াজের দিকে সরাসরি তাকিয়ে কড়া ওয়ার্নিংদিয়ে বলে, “আমাকে যদি ডাকতেই হয়, তবে ইনায়াত ডাকুন, নয়তো ডাকবেন না।”
আয়াজ তো ঠিক এই আই-কন্ট্যাক্টটারই ওয়েট করছিল। সে বেশ স্টাবর্ন এবং অ্যারোগেন্ট গলায় জবাব দেয়, “সবাই যা ডাকবে, আমি তা ডাকব না। আমি ফ্লোরেন্সই ডাকব, কারণ এই ডাকটা এক্সক্লুসিভলি আমার জন্য।”
ইনায়াত তাচ্ছিল্য করে বলে, “এত ড্রামা করবেন না, আমার এসব একদমই পছন্দ না। নিজের লিমিটে থাকুন, নিজের ক্লাস অনুযায়ী বিহেভ করুন। আর আপনি আমার সাথে এভাবে পা মিলিয়ে হাঁটছেন কেন? আপনার ক্লাস তো ডাউন হয়ে যাবে।”
আয়াজ ওর কথার আর কোনো উত্তর দেয় না। সে শুধু তাকিয়ে থাকে তার সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু আছে, যা শব্দের চেয়েও অনেক বেশি লাউড।

হাঁটতে হাঁটতে তারা একটা ভিনটেজ আইসক্রিম স্টলের সামনে এসে পৌঁছায়। ইনায়াত এগিয়ে গিয়ে দুটো মিস্টার হুইপি ভ্যান আইসক্রিম নেয়। স্টলটা বেশ পুরোনো ধাঁচের, কোনো অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম নেই খুচরো সেন্ট দিয়েই পে করতে হয়। ভাগ্য ভালো, ইনায়াতের কাছে ক্যাশ ছিল। আয়াজ মনে মনে ভাবে, দুটো আইসক্রিম যেহেতু নিয়েছে, একটা নিশ্চয়ই তাকে অফার করবে। কিন্তু ওকে ভুল প্রমানিত করে ইনায়াত নিজের দুই হাতে দুটো আইসক্রিম ধরে, দুটিতেই পরপর বাইট বসাতে শুরু করে। এতে তো আয়াজ পুরো অফগার্ড হয়ে শেষমেশ বলেই ফেলে, “আমার জন্য নেবে না?”
ইনায়াত ভ্রু কুঁচকে সারপ্রাইজড হয়ে জিজ্ঞেস করে, “আপনি খাবেন?”

“হ্যাঁ।”
ইনায়াত একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিড়বিড় করে ওঠে, “এর জন্য এখন আমার মানি ওয়েস্ট করতে হবে!” তবুও মুখে কিছু না বলে, নিজের হাতের দুটো আইসক্রিমই সে আয়াজের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, “দুই হাতে দুটো নিয়ে খেতে পারেন, নয়তো একটা আমি খাব, আপনি আরেকটা হোল্ড করুন।”
আয়াজ চমকে যায়। নিজের পুরো রয়্যাল লাইফে সে কখনো কোনো খাবারের জন্য এত ক্রেজিনেস দেখায়নি। কিন্তু এই মুহূর্তে, ইনায়াতের হাতের ওই সাধারণ ভ্যান আইসক্রিম দুটো তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিসিয়াস জিনিস বলে মনে হচ্ছে ও চটজলদি বলে, “না না, আমি দুটোই খাব।”
ইনায়াত শুধু মাথা নাড়ায় “ওকেহ।”

ইনায়াত নিজের জন্য নতুন করে আরেকটা আইসক্রিম নিয়ে খেতে খেতে সামনে এগোয়। আয়াজও দু’হাতে দুটো আইসক্রিম নিয়ে তার সাথে পা মেলায়। ইনায়াত আবার মুখ খোলে, “আপনি আমার সাথে সাথে আসছেন কেন? আমি ক্যাব নিয়ে নিজের প্লেসে চলে যাব।”
আয়াজ আইসক্রিমে ছোট্ট একটা কামড় বসিয়ে খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে জবাব দেয়, “এমনিই আসছি। আর আমি তোমার সাথে কোথায় আসছি? আমি তো আমার নিজের মতো হাঁটছি। তোমাকে কি বলেছি যে আমি তোমার সাথে আসছি?”
ইনায়াত আর কথা বাড়ায় না। সে সাইলেন্ট হয়ে যায়। তার নীরবতা দেখে আয়াজ আরও এক ধাপ এগিয়ে এসে বলে, “তোমার হাতের আইসক্রিমটাও আমায় দিয়ে দাও, আমারগুলো খেয়ে মন ভরেনি।”
ইনায়াত এবার রাগে আঁতকে ওঠে, “আপনাকে কেন দেব? দুটো কিনে দিয়েছি, কোনো শেম নেই? দুটো খেয়ে এখন বলছেন আরেকটা খেতে!”

আয়াজ অবশ্য পারমিশনের ওয়েট করে না। সে ইনায়াতের হাত থেকে প্রায় ঝাপটি মেরে নিয়ে নেয় আইসক্রিমটা। “আরে দাও না! একটা আইসক্রিমই তো, এমন করছ কেন?”
ইনায়াত প্রথমে দিতে না চাইলেও, বাধ্য হয়ে ছেড়ে দেয়। তারপর জলদি নিজের হাতে থাকা অন্যটা ফিনিশ করতে শুরু করে বলা তো যায় না, মিস্টার ক্রাউন হয়তো এটাও কেড়ে নেবে!
এদিকে আয়াজের মনের ভেতরে হাজারটা ডলফিন আনন্দে স্প্ল্যাশ করছে। এত সিলি, এত অর্ডিনারি একটা স্ট্রিট মোমেন্ট তাকে এতটা হ্যাপিনেস দিতে পারে, সেটা সে নিজেই বিলিভ করতে পারছে না। ইনায়াতের সাথে কাটানো এই ছোট্ট মোমেন্টগুলো তাকে স্পিচলেস করে দিচ্ছে।

আয়াজ তার আইসক্রিমটা শেষ করে নেয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই তাদের পাশ ঘেঁষে এসে থামে কয়েকটা স্লিক, লাক্সারিয়াস গাড়ি। আয়াজের নিজের গাড়িটার দরজা খুলে যায়, ভেতরে বসে আছে এভা। সে বলে ওঠে, “তুমি চলে এসো। আসলে আমার ড্রাইভার নেই, তাই তোমার সাথেই যাওয়া।”
আয়াজ একবার ইনায়াতের দিকে তাকায়। আশেপাশে অন্যান্য রয়্যালরাও প্রেজেন্ট। ইনায়াতকে সবার সামনে অলরেডি একজন কমনর হিসেবে ইন্ট্রোডিউস করা হয়েছে। তাই সবার সামনে তাকে নিয়ে এক গাড়িতে ওঠা পসিবল নয়। রয়্যাল প্রোটোকল, আইডেন্টিটি আর ব্লাডলাইন সবকিছু এক ইনভিজিবল দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে যায় তাদের মাঝে।

আয়াজ কিছু বলার আগেই ইনায়াত খুব পোলাইটলি একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলে, “আপনি আপনার পথে যান, আমি আমার পথে।” এ কথা বলেই সে অন্যদিকে টার্ন নেয়।
আয়াজ কিছুক্ষণ স্ট্যাচুর মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখ আটকে থাকে ইনায়াতের চলে যাওয়ার ফিগারটার দিকে। যে মেয়েটি এইমাত্র তাকে “জাস্ট যে কেউ” বলে গেল, অথচ তার ওই একটাই মুচকি হাসি আয়াজের গোটা পৃথিবীকে স্টপ-মোশনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
অবশেষে সে গাড়িতে গিয়ে ওঠে। কিন্তু তার মাইন্ড পড়ে থাকে ওই পুরোনো আইসক্রিমের স্টলে, ইনায়াতের ওই মুচকি হাসিটার ভেতরে। আয়াজ বারবার রিকল করতে থাকে একটু আগের প্রতিটা ডিটেইল “আমি দুটোই খাব” বলার সময়ের সেই চাইল্ডিশ এক্সাইটমেন্ট, ইনায়াতের কপালের সেই বিরক্তির ভাঁজ, আর “ওকেহ” বলার সময়ের সেই কেয়ারলেস সুরটা।
তার মন চাইছে যদি টাইম ট্রাভেল করে শতবার সেই মুহূর্তগুলোতে ফিরে যাওয়া যেত!

একটু পর,,,,,
রাতের ফাঁকা রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে আলোয় দাঁড়িয়ে আছে ইনায়াত। চারপাশের কনকনে ঠান্ডা বাতাসে তার সিল্কি চুলগুলো এলোমেলোভাবে উড়ছে। নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে সে হঠাৎই চিৎকার করে ওঠে, “শট! আমার তিনটা আইসক্রিম কেন যে ওই স্টুপিডটাকে খাওয়াতে গেলাম!”
বিরক্তিতে একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে সামনের দিকে পা বাড়ায়। রাত প্রায় বারোটা বাজে। চারপাশটা একদম সুনসান, নামহীন ইরি সাইলেন্স বিরাজ করছে পুরো রাস্তায়। ঠিক সেই মুহূর্তেই জেভিয়ারের নিজের চকচকে ব্ল্যাক বেন্টলি স্টেট লিমোজিন একদম স্মুথলি ইনায়াতের গা ঘেঁষে এসে দাঁড়ায়। এলিগেন্ট অরা নিয়ে জেভিয়ার নিজে বেরিয়ে এসে ভদ্রতার সাথে ইনায়াতের জন্য দরজাটা খুলে দিয়ে, একদৃষ্টে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “তুমি আমার সাথে চলো।”

ইনায়াত ফুস করে একটা তপ্ত শ্বাস ছাড়ে। জেভিয়ারের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে সে জবাব দেয়, “থ্যাংকস, বাট সরি। আমি ক্রাউনদের আশেপাশে একদমই ইনভলভ হতে চাই না।”
জেভিয়ারের চোখে মুহূর্তের জন্য একটা হালকা হতাশার ছায়া নেমে আসে। তার গলার স্বর কিছুটা নরম হয়, “কিন্তু আমি তো তোমার টিচার। অন্তত একজন টিচারের সাথে তো যাবে?”
জেভিয়ার ইনায়াতের স্কুল লাইফের টিচার। সে ইনায়াত আর নাভিদকে সবসময় খুব ভালোভাবে গাইড করে এসেছে। ইনায়াত জেভিয়ারকে যথেষ্ট শ্রদ্ধার চোখেই দেখে। তাই কোনো রকম অভদ্রতা না করে ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা পোলাইট স্মাইল ফুটিয়ে সে বলে, “আমি আপনাকে অনেক রেসপেক্ট করি স্যার। কিন্তু বিলিভ মি, এই মুহূর্তে আমার পক্ষে যাওয়া পসিবল না। আসছি।”

কথাটা বলেই আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ায় না ইনায়াত। হাত দেখিয়ে একটা ট্যাক্সি থামায় এবং সেদিকে এগিয়ে যায়। জেভিয়ার গাড়ির দরজায় হাত রেখে একদৃষ্টে তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। অন্য কোনো মেয়ে হলে হয়তো আয়াজকে জেলাস ফিল করানোর জন্য হলেও আজ এই সুযোগটা লুফে নিত। কিন্তু ইনায়াত তো একদমই আলাদা; এসব চিপ ড্রামার সে তোয়াক্কাই করে না। জেভিয়ারের বুক চিরে একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। সে আপনমনেই বিড়বিড় করে ওঠে, “তুমি সেই আগের মতোই রয়ে গেলে ইনায়াত। যে তোমার প্রেমে আমি পড়েছিলাম, এতগুলো বছরে সেই তুমি একটুও চেঞ্জ হলে না!”

[ অনেক কষ্ট করে লিখেছি। ইয়ার চেঞ্জ এক্সাম চলছে, তার মাঝেও লিখতে বসেছি। #অভিমানী_কৃষ্ণচূড়া
হয়তো আজ দিতে পারব না, তবে ইনশাআল্লাহ আগামীকাল অবশ্যই দেব। কি বলব বুঝতে পারি না পড়াশোনা করব, নাকি লেখা লিখব। দুটোর মাঝখানে আটকে আছি। এত কষ্ট করে লিখেছি যদি একটু রেসপন্সের যোগ্য মনে হয়, করবেন। না হলে হয়তো এটা অফ করে দেব। কারণ কষ্টের কোনো মূল্য না থাকলে লিখে লাভ কী ]
বাড়িতে ফিরে ফ্রেশ হয়ে ইনায়াত ব্যালকনির সোফায় বসে আছে। রাত বারোটা চল্লিশ বাজে, চারদিকে নীরবতায় ঘেরা। কিন্তু ইনায়াতের চোখে বিন্দুমাত্র ঘুম নেই। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে রাতের নিস্তব্ধ, তারাহীন আকাশের দিকে। রুমের ভেতর আয়াজ ল্যাপটপ নিয়ে নিজের কাজ করছে। কাজ শেষ করে ল্যাপটপটা শাটডাউন করে সে উঠে দাঁড়ায়। ধীরপায়ে ব্যালকনিতে এগিয়ে আসে এবং ইনায়াতের একদম গা ঘেঁষে সোফায় বসে পড়ে।
তাকে এভাবে এত কাছে বসতে দেখে ইনায়াত বিরক্তি নিয়ে একপলক তাকায়, তারপর কিছুটা পার্সোনাল স্পেস বজায় রাখার জন্য সোফায় আরেকটু সরে বসে। ইনায়াতের এই অস্বস্তিটুকু আয়াজের তীক্ষ্ণ চোখ এড়ায় না। সে ইনায়াতের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে হঠাৎই নীরবতা ভাঙে, “তুমি কি জেভিয়ারের সাথে এসেছ?”
ইনায়াত আয়াজের দিকে না তাকিয়েই একদম স্ট্রেট-কাট উত্তর দেয়, “না।”

শুধু ‘না’ বলার কারণ হলো, সে আয়াজের সাথে কোনোভাবেই এই কনভারসেশন লেংদি করতে ইন্টারেস্টেড নয়। সে চাইলেই জিজ্ঞেস করতে পারে, এই প্রশ্নের বেসিস কী! কিন্তু এসব অবান্তর কথায় সে নিজের এনার্জি বা শব্দ, কোনোটিই ওয়েস্ট করতে চায় না। ইনায়াতের এই শর্ট আর নির্লিপ্ত উত্তর শুনে আয়াজ নিজে থেকেই এক্সপ্লেইন করে, “আসলে সবাই আমার সিরিয়ালে এসেছে, শুধু ও সবার লাস্টে আসে। তাই ভাবলাম তুমি হয়তো ওর সাথেই ফিরেছ, কারণ তোমরা তো পূর্বপরিচিত।”
ইনায়াত আকাশের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই আগের মতো ইনডিফারেন্ট টোনে বলে, “ওহ।”
ইনায়াতের এই উদাসীনতা আয়াজের ভেতরে সূক্ষ্ম রাগের জন্ম নেয় সে ভ্রু কুঁচকে বলে, “জাস্ট ওহ? আর কিছু বলবে না? তোমরা যে পূর্বপরিচিত, সেটা আমি কীভাবে জানলাম, তা জানতেও চাইবে না?”
ইনায়াত এবার একটা তপ্ত শ্বাস ছেড়ে। আকাশের দিক থেকে চোখ নামিয়ে দুই পা সোফায় তুলে সে একটু নড়েচড়ে বসে। আয়াজের দিকে একপলক তাকিয়ে তাচ্ছিল্য নিয়ে বলে, “আপনাদের জানা বা না জানা নিয়ে আমার কী যায় আসে যে আমি ইন্টারেস্ট দেখাব?”
ইনায়াতের কথায় আয়াজের ইগোতে এবার বেশ জোরেই হিট করে। সে গলার স্বর কিছুটা কঠিন করে বলে, “তুমি নিজেকে একটু বেশিই কোল্ড শো করছ। এতটা কোল্ড না হওয়াই বেটার। আমি তোমার সাথে এই রিলেশনশিপটা একটা ফ্রেন্ডলি পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাইছি। আমি একজন ক্রাউন হয়েও নিজের ইগো সাইডে রেখে এটা চাইছি, তুমি কি বুঝতে পারছ বিষয়টা?”
ইনায়াত এবার আয়াজের দিকে তাকিয়ে একটা মকিং স্মাইল দিয়ে বলে, “আপনি ক্রাউন হয়ে যা ইচ্ছে চাইতে পারেন, সেটা আমি বুঝতে যাব কেন? আর আপনি আমার মতো একজন কনকিউবাইনের মেয়ের সাথেই বা কেন এত ফ্রেন্ডলি হতে চাইবেন?”

আয়াজ এবার স্পষ্টতই রেগে যায়, রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, “এ জন্যই তোমাদের মতো মানুষদের ভ্যালু দিতে নেই! আমি চাইছি তোমার সাথে একটা স্ট্যান্ডার্ড ওয়েতে কথা বলার স্ট্যাটাস মেইনটেইন করতে, আর তুমি…….
ইনায়াত এবার আয়াজের কথার মাঝখানেই তাকে থামিয়ে দেয়। সরাসরি আয়াজের চোখে চোখ রেখে শার্প টোনে বলে, “আপনি ফ্রেন্ড বানাতে চান না, বেড পার্টনার বানাতে চান তা আমি খুব ভালো করেই জানি। আপনার আমার থেকে একটা বেবি লাগবে, সে জন্যই এত ড্রামা, তাই তো? বেবি হলে আপনি কিং হয়ে যাবেন, সাথে সামনের বছর ইলেকশনেও শক্ত পজিশনে দাঁড়াতে পারবেন। আমি অতটাও স্টুপিড নই, মিস্টার ক্রাউন।”

আয়াজ মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। ও এত নিখুঁতভাবে তার মাইন্ড রিড করে ফেলেছে! হ্যাঁ, কথাটা সত্যি যে সে বেবি নিতে চায়। কিন্তু ইনায়াত যেভাবে ভাবছে, ঠিক সেভাবে নয়। সে তো আপাতত শুধু ইনায়াতের সাথে ফ্রেন্ডলি হতে চায়, ইনায়াতকে এখনো নিজের ওয়াইফ হিসেবেই অ্যাকসেপ্ট করতে পারছে না সে বেবি নেওয়া তো অনেক দূরের কথা! কিন্তু আয়াজ এসবের কিছুই ইনায়াতকে এক্সপ্লেইন করে না। সে হুট করেই উঠে এসে ইনায়াতের দিকে আরো ঝুঁকে আসে, গলার স্বর ভারী করে বলে, “হ্যাঁ, আমি বেবি চাই। একটা বেবি আমার জন্য অনেক প্রয়োজন।”
কথাটা শুনে ইনায়াতের গা গুলিয়ে আসে। ঘৃণার দৃষ্টিতে আয়াজের দিকে তাকিয়ে সে বলে, “তাহলে নিন না বেবি! আপনার জন্য কি মেয়ের অভাব আছে নাকি এই শহরে? এটা আমাকে বলছেন কেন?”

আয়াজ এবার উগ্র হয়ে ওঠে। সে ইনায়াতের দিকে আরো ঝুঁকে আসে, নিজের দুই হাত ইনায়াতের দুই কাঁধের পাশে সোফার হেডবোর্ডে আটকে দিয়ে তাকে একপ্রকার ট্র্যাপ করে রূঢ় তবে এক ধরনের নেশাজড়ানো স্বরে বলে, “আমার ঠিক তোমার পেট থেকেই বেবিটা চাই। অন্য কারো থেকে নয়। শুধু তোমার আর আমার বেবি হতে হবে।”
ইনায়াত বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে আয়াজের চোখে স্থির দৃষ্টি রেখে দাঁত চেপে বলে, “তাহলে চাইতে থাকুন। কারণ কিছু চাওয়া শুধুই চাওয়া হয়ে থেকে যায়।”
আয়াজের ইগো এবার ফেটে পড়ে, “আরে এত ইগো দেখাও কাকে তুমি? চেনো আমায়? জানো আমি কে? আমার লেভেল কী? আমি আয়াজ যে তোমাকে ছোঁব, তোমার কাছ থেকে বেবি নেওয়ার উইশ করছি সেটাও তো তোমার ভাগ্য!”

ইনায়াত আর এক মুহূর্তও টলারেট করে না। সজোরে আয়াজের বুকে ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিয়ে বলে “আমার আপনার বেবি নেওয়ার বিন্দুমাত্র রুচি নেই, মিস্টার ক্রাউন। জাস্ট গেট আউট, আমার সামনে থেকে সরুন।”
ইনায়াতের এই সাডেন পুশে আয়াজ কিছুটা থমকে যায়। সে নিজেকে সামলে নেয়। তার এখন রাগ করা উচিত নয়, পরিস্থিতি আরো বিগড়ে যাবে। সে ধপ করে ইনায়াতের একদম গা ঘেঁষে সোফায় বসে পড়ে। তারপর সব ইগো, সব রাগ ভুলে হুট করেই ইনায়াতের কোলে নিজের মাথাটা গুঁজে দেয়। আর শান্ত স্বরে সে বলে, “তুমি কিছু বলো না। আমাকে জাস্ট কিছুক্ষণ এভাবেই থাকতে দাও।”
ইনায়াত এই আনএক্সপেক্টেড বিহেভিয়ারে প্রথমে চমকে উঠলেও পরমুহূর্তেই তার রাগ সপ্তমে চড়ে গিয়ে। সে দাঁত কটমট করে আয়াজের সিল্কি চুলগুলো মুঠো করে ধরে বিরক্তি নিয়ে তার মাথাটা নিজের কোল থেকে সরিয়ে দিয়ে ঝটকা মেরে উঠে দাঁড়িয়ে আর এক সেকেন্ডও সেখানে না দাঁড়িয়ে হনহন করে রুমে চলে যায় সে বিরক্তি আর ঘৃণায় তার ফিজিক্যালি সিক লাগছে।

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৯

আয়াজ ব্যালকনির সোফায় ঠিক সেভাবেই শুয়ে থাকে। রাতের ঠান্ডা হাওয়া তার চুলে বিলি কেটে যাচ্ছে। সে নিজেই বুঝতে পারছে না তার ভেতরে আসলে কী চলছে! একজন ক্রাউন হয়ে সে কেন এই সামান্য মেয়েটার কাছে বারবার নিজের ইগো সারেন্ডার করছে? কিছু একটা নিশ্চয়ই হচ্ছে, তীব্রভাবেই হচ্ছে। ইনায়াতের এই রাগ, এই অবজ্ঞা, এই খিটমিটে মুহূর্তগুলোই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অনুভূতির অংশ হয়ে উঠছে। সোফায় শুয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে আপনমনেই একটা প্রশান্তির স্মার্ক ফুটে ওঠে আয়াজের ঠোঁটে।

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here