Home Mad for you 2 Mad for you 2 part 16

Mad for you 2 part 16

Mad for you 2 part 16
তানিয়া খাতুন

কলেজের বিশাল লোহার গেটটার সামনে আজ সকাল থেকেই উপচে পড়া ভিড়।
চারদিকে ছাত্র ছাত্রীদের ব্যস্ত আনাগোনা, কারও হাতে নোটস, কারও হাতে মোটা মোটা বই।
পরীক্ষা আসন্ন বলে পুরো ক্যাম্পাসজুড়েই যেন চাপা অস্থিরতা ছড়িয়ে রয়েছে।
আজ ক্যাম্পাসের এমন অবস্থা যে পা ফেলার মতো জায়গাও যেন অবশিষ্ট নেই।
ঠিক সেই সময় কলেজ গেটের সামনে এসে থামে একটি কালো রঙের বুলেট ।
বাইকটির গর্জনময় শব্দ মুহূর্তের মধ্যেই আশপাশের সমস্ত কোলাহলকে যেন স্তব্ধ করে দেয়।
এক অদ্ভুত পরিবর্তন নেমে আসে চারপাশে।

গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্র ছাত্রীরা একে একে ধীরে মাথা নিচু করতে শুরু করে।
যারা একটু দূরে ছিল, তারাও একইভাবে সম্মান আর ভয়ের মিশ্র অনুভূতিতে মাথা নত করে ফেলে।
এমনকি ক্যাম্পাসের ভেতরে থাকা শিক্ষার্থীরাও বাইক টির উপস্থিতি টের পেয়ে নিঃশব্দে মুখ নিচু করে নেয়।
যারা নতুন, কিংবা পুরো বিষয়টা সম্পর্কে কিছুই জানে না, তারা বিস্মিত চোখে চারপাশে তাকায়।
কিন্তু আশপাশের সবাইকে এমন আচরণ করতে দেখে তারাও তাড়াতাড়ি মাথা নিচু করে ফেলে।
মুহূর্তের মধ্যেই কোলাহলপূর্ণ ক্যাম্পাসটা থমথমে নীরবতায় ঢেকে যায়।
বুলেটের উপর বসে থাকা ক্ৰিশ অবশ্য সম্পূর্ণ নির্বিকার।
মনে হচ্ছিল এই দৃশ্য তার আগেই থেকেই জানা।
সে ধীর ভঙ্গিতে বাইকটা স্ট্যান্ড করে।
তারপর একরাশ গম্ভীরতা মুখে নিয়ে নিচে নামে।
পিছন থেকে রুহিও আস্তে করে নেমে দাঁড়ায়।
চারপাশের দৃশ্যটা দেখে বিস্ময়ে ভরে ওঠে তার চোখ।
এতগুলো মানুষ একসঙ্গে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে— ব্যাপারটা তার কাছে অসম্ভব অদ্ভুত লাগে।
রুহি কিছুক্ষণ চারদিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে ক্ৰিশের দিকে মুখ ফেরায়।
তার চোখে স্পষ্ট কৌতূহল।
নিচু স্বরে প্রশ্ন করে—

— “সবাই এভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে কেন?”
ক্ৰিশ প্রশ্নটা শুনে একটুও বিচলিত হয় না।
তার মুখভঙ্গি আগের মতোই কঠিন ও নির্লিপ্ত রয়ে যায়।
মনে হয় যেন এসব বিষয় তার কাছে একেবারেই স্বাভাবিক।
সে কোনো উত্তর না দিয়ে ধীরে ধীরে রুহির কাছে এগিয়ে আসে।
তারপর শক্ত করে রুহির হাত চেপে ধরে গভীর স্বরে বলে —
— “তোমার ক্লাসের দেরি হয়ে যাচ্ছে। চলো।”
ব্যস, এটুকুই।
কোনো ব্যাখ্যা নয়, কোনো অতিরিক্ত শব্দ নয়।
রুহি ভেতরে ভেতরে বিরক্ত হয়ে ওঠে।
মনে মনে ক্ৰিশ কে দু-একটা গালিও দেয়।
— “এই লোকটার প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলেই যেন ইগোতে লাগে! যত্তসব…”
ঠোঁট ফুলিয়ে বিরক্ত মুখে ক্ৰিশের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করে রুহি।
রুহিকে তার ক্লাসরুমের সামনে এনে দাঁড় করায় ক্ৰিশ।
পুরো পথজুড়েই তার মুখে ছিল আগের মতোই কঠিন, নির্লিপ্ত ভাব।
ক্লাসরুমের দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল সিমরান।
রুহিকে দেখামাত্রই সে ছুটে আসে।

— “রুহি!”
ডাক দিয়েই শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে।
রুহিও কিছুটা স্বস্তি পায়।
সকালের অদ্ভুত ঘটনাগুলোর পর বন্ধু কে দেখে যেন বুকের ভেতরের চাপা অস্বস্তিটা সামান্য হলেও কমে আসে তার।
সিমরান তখনও রুহিকে জড়িয়ে ধরে টুকটাক কথা বলছে, আর ক্ৰিশ নির্বিকার দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত।
তারপর গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে—
— “ক্লাস শেষ হলে যেন তোমাকে এখানেই পাই।”
কথাটার মধ্যে আদেশের সুর এতটাই স্পষ্ট ছিল যে রুহি অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাথা নাড়ে।
ব্যস, আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না ক্ৰিশ।
উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করে সে।
তার হাঁটার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ অপেক্ষা করছে তার জন্য।
কিছুদূর এগিয়েই কলেজের পুরোনো কমন রুমটার সামনে এসে থামে ক্ৰিশ।
দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে।
ভেতরে ঢুকতেই তার চোখ স্থির হয়ে যায় সামনের বেঞ্চের উপর বসে থাকা একটা ছেলের উপর।
তার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে আরও দুজন বন্ধু।
ছেলেটা কিছু একটা বলছিল, মুখে ছিল আত্মতুষ্টির হাসি।
পরমুহূর্তেই ঝড়ের মতো এগিয়ে যায় ক্ৰিশ।
কেউ কিছু বোঝার আগেই সে ছেলেটার কলার শক্ত করে চেপে ধরে বেঞ্চ থেকে টেনে নামিয়ে ফেলে।
ধপ করে মেঝেতে পড়তেই সজোরে এক ঘুষি গিয়ে লাগে ছেলেটার মুখে।
আঘাতের তীব্রতায় ছেলেটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়।
ঠিক তখনই আমান আর রুদ্র কমনরুমে ঢুকে পড়ে।
তারা মূলত ক্ৰিশকেই খুঁজতেই এসেছিল।
দৃশ্যটা দেখে দুজনেই তড়িঘড়ি করে এগিয়ে আসে।

— “কী করছিস তুই!” — চিৎকার করে ওঠে আমান।
ক্ৰিশ তখন রাগে ফুঁসছে।
তার চোখদুটো রক্তিম হয়ে উঠেছে।
দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে—
— “ছাড় আমাকে! ও আমার বাটারফ্লাইয়ের দিকে তাকিয়েছে… আমি ওকে খুন করে ফেলব!”
মেঝেতে পড়ে থাকা ছেলেটা কষ্টে মুখ তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।
তার ঠোঁটের কোণে রক্ত জমে গেছে।
কিন্তু তবুও বিকৃত হেসে বলে ওঠে—

“কয়দিন ছিলাম না… এর মধ্যেই মাল জুটিয়ে নিয়েছিস?”
“মাল” শব্দটা কানে যেতেই যেন ক্ৰিশের মাথার ভেতরকার সমস্ত নিয়ন্ত্রণ ভেঙে যায়।
মুহূর্তের মধ্যে সে আবার ছুটে যায় ছেলেটার দিকে।
তারপর কোনো সুযোগ না দিয়েই সজোরে ছেলেটার মাথা দেয়ালে আছড়ে মারে।
পরমুহূর্তেই ফেটে যায় কপালের একপাশ।
গলগল করে রক্ত বের হতে শুরু করে।
ছেলেটার দুই বন্ধু এতক্ষণ পুরো ঘটনাটা নির্বাক হয়ে দেখছিল।
কারণ এমন দৃশ্য তাদের কাছে নতুন নয়।
ক্ৰিশের রাগ সম্পর্কে পুরো কলেজই জানে।
তবুও এবার পরিস্থিতি খারাপ হতে দেখে তারা দ্রুত এগিয়ে এসে ছেলেটাকে টেনে তোলে।
ক্ৰিশ তখনও ক্ষিপ্ত।
আমান আর রুদ্র মিলে কোনোমতে তাকে পিছন থেকে ধরে রেখেছে।
ক্ৰিশ প্রচণ্ড রাগে চিৎকার করে ওঠে—
— “দ্বিতীয়বার আমার বাটারফ্লাইকে ওই নামে ডাকলে তোর জিভ ছিঁড়ে কুকুরকে খাওয়াবো মাদার**!”
তার কণ্ঠে এমন হিংস্রতা ছিল যে মুহূর্তের জন্য পুরো কমনরুম নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
আমান আর রুদ্র দ্রুত ক্ৰিশকে টেনে বাইরে নিয়ে যেতে থাকে।
ক্ৰিশ তখনও রাগে হাঁপাচ্ছিল।
চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, চোখদুটো জ্বলছে আগুনের মতো।
মনে হচ্ছিল আর এক মুহূর্ত সুযোগ পেলে সত্যিই ছেলেটাকে শেষ করে ফেলবে সে।

কলেজ বিল্ডিংয়ের ছাদের এক কোণে বসে একের পর এক সিগারেট শেষ করছে ক্ৰিশ।
দুপুরের হালকা বাতাসে তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে।
মুখভর্তি কঠিন গম্ভীরতা, চোখদুটো অস্বাভাবিক রকম শান্ত— কিন্তু সেই শান্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা আগুনটা খুব সহজেই বোঝা যায় না।
তার পাশেই বসে আছে আমান আর রুদ্র।
দুজনেই চুপচাপ ক্ৰিশের দিকে তাকিয়ে আছে।
কারণ তারা জানে, ক্ৰিশ যখন এভাবে একটার পর একটা সিগারেট শেষ করে, তখন তার মাথার ভেতর কিছু না কিছু চলছেই।
ক্ৰিশ বাতাসে ধোঁয়া ছেড়ে গম্ভীর স্বরে বলে —

— “ওরা সব কাজে লেগেছে?”
আমান মাথা নেড়ে উত্তর দেয়—
— “হ্যাঁ। তোর কথা মতো পুরো কলেজে সিসিটিভি লাগানো হচ্ছে।
ওখানেই সবাই কাজ করছে। আর দশজন মহিলা কর্মচারীও রেখেছি, যারা সারাদিন স্কিনের সামনে বসে নজর রাখবে।”
ক্ৰিশ ভ্রু কুঁচকে আবার বলে ওঠে—
— “রুদ্র, তুই ওই নীলের উপর নজর রাখবি। ও যেন রুহির আশেপাশে না আসতে পারে।”
রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
তারপর নিচু স্বরে বলে—
— “এত হাইপার হচ্ছিস কেন? জানিস তো ছেলেটার মাথায় একটু সমস্যা আছে…”
ক্ৰিশের চোখ মুখ মুহূর্তেই আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে—

— “তাই তো ওকে কিছু করছি না।
নইলে এতদিনে অন্য কেউ হলে নিজের হাতে খুন করতাম আমি…”
— “আপনি তাহলে খুনও করেন?”
হঠাৎ ভেসে আসা নারী কণ্ঠস্বর শুনে চমকে ওঠে আমান আর রুদ্র।
দুজনেই দ্রুত পিছনে তাকায়।
ছাদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রুহি।
তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময় আর ক্ষোভ।
পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আমান আর রুদ্র একে অপরের দিকে তাকায়।
তারপর কোনো কথা না বলেই ধীরে ধীরে সেখান থেকে সরে যায়।
কিন্তু ক্ৰিশ—সে যেন কিছুই শোনেনি।
নির্বিকারভাবে বসে সিগারেটে টান দিতে থাকে।
রুহি দ্রুত এগিয়ে আসে।
তারপর রাগে ক্ৰিশের হাত থেকে সিগারেটটা টেনে নিয়ে নিচে ফেলে দেয়।
চোখভর্তি ক্ষোভ নিয়ে বলে ওঠে—

— “কী হলো? আমার কথার জবাব দিন! কটা খুন করেছেন আপনি?”
তার কণ্ঠ কাঁপছিল।
রাগ, ভয় আর হতাশা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল সেখানে।
— “আর এই যে সবাই আমাদের দেখলে মাথা নিচু করে থাকে, এটাও আপনার কাজ, তাই না?”
কিছুক্ষণ থেমে আবার বলে—
— “একটু আগেই একটা ছেলেকে প্রায় মেরে আধমরা করে ফেলেছেন আপনি… আব্বু তাহলে ঠিকই বলেছিল।
আপনি একটা গুণ্ডা…”
“গুণ্ডা” শব্দটা বাতাসে ভেসে উঠতেই ক্ৰিশের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে।
তার চোখের গভীরে জমে ওঠে তীব্র অন্ধকার।
কিন্তু রুহি তখন আর থামার অবস্থায় নেই।
দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ আর রাগ যেন একসঙ্গে বেরিয়ে আসে তার মুখ দিয়ে।

— “আসলে ভুলটা আমারই ছিল। আমি ভেবেছিলাম বিয়ে হয়েছে, তাই সব মেনে নিয়ে সংসার করব… কিন্তু না।
আপনার সঙ্গে সংসার করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে রুহি ঘুরে দাঁড়ায়।
সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পাচ্ছে না।
কারণ ক্ৰিশের চোখের রাগটা সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
কিন্তু রুহি এক পা বাড়ানোর আগেই ক্ৰিশ আচমকা উঠে দাঁড়ায়।
পরমুহূর্তেই এক ঝটকায় পিছন থেকে রুহিকে টেনে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নেয় সে।
রুহির নিঃশ্বাস আটকে আসে।
ক্ৰিশ নিজের মুখ গুঁজে দেয় তার চুলের ভাঁজে।
গভীরভাবে নিঃশ্বাস নেয়।
তারপর কর্কশ, ভারী কণ্ঠে বলে ওঠে—

— “কি বললে? আরেকবার বলো… আমি শুনতে পাইনি।”
ক্ৰিশের গলায় চাপা হিংস্রতা এতটাই স্পষ্ট ছিল যে রুহির গলা শুকিয়ে আসে।
একবার সাহস করে বলে ফেলেছে সে।
কিন্তু দ্বিতীয়বার বলার সাহস আর খুঁজে পায় না।
ক্ৰিশ এবার ধমকে ওঠে—
— “কী হলো? বলো। স্পিক আপ, বাটারফ্লাই।”
রুহি ভয়ে কেঁপে ওঠে।
তার ঠোঁট নড়লেও শব্দ বের হয় না।
— “দ্বিতীয়বার আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলবে না, বাটারফ্লাই। উঁচু গলায় কথা বলা আমার একদম পছন্দ না… বুঝেছ?
রুহি কোনো উত্তর দিল না। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল সে।
অথচ তার ভেতরে তখন চলছিল অদ্ভুত এক ঝড়—অজস্র ভাবনা এসে জট বেঁধেছিল মনের গভীরে।
চোখদুটো অন্যমনস্ক, মুখে নিস্তব্ধতার ছায়া।

ক্ৰিশ কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
তারপর হঠাৎই এক টানে রুহিকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল।
আকস্মিকতায় কেঁপে উঠল রুহি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ক্ৰিশ ঝুঁকে পড়ল তার মুখের খুব কাছে।
মুহূর্তের মধ্যেই তার দাঁতের চাপ বসে গেল রুহির কোমল গোলাপি অধরে।
তীব্র ব্যথায় রুহির শরীর কেঁপে উঠল। বিস্ময় আর যন্ত্রণায় বড় বড় হয়ে গেল তার চোখ।
মনে হচ্ছিল, তাঁর প্ৰান পাখি টা এক্ষুনি বিদায় নেবে।
ঠোঁটের কোণে হালকা রক্ত ফুটে উঠতেই ক্ৰিশ থমকে গেল এক মুহূর্ত। কিন্তু সেই থামা ছিল ক্ষণিকের।
নোনতা রক্তের স্বাদ পেতেই তার দৃষ্টি আরও গাঢ় হয়ে উঠল। অদ্ভুত এক উন্মাদনা ভর করল চোখেমুখে।
সে ধীরে ধীরে রুহির ঠোঁটের কোণে জমে থাকা রক্তটুকু নিজের ঠোঁটে টেনে নিল, এর মধ্যেও যেনো কোনো অজানা তৃপ্তি খুঁজে পাচ্ছে।
রুহি তখন অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
ব্যথায় শরীর অবশ হয়ে এলেও কণ্ঠ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না।
ক্ৰিশ দু’হাতের আজলায় রুহির মুখখানা আলতো অথচ দৃঢ়ভাবে চেপে ধরল।
তার গভীর দৃষ্টির ভেতর তখন মিশে ছিল অধিকার আর অদ্ভুত এক দহন—যে দহনের তাপে মুহূর্তটাই ভারী হয়ে উঠেছিল।
— “মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তোমাকে এই ক্ৰিশ খানের সঙ্গেই থাকতে হবে। যদি না পারো…”
তার কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে আসে।
— “তাহলে নিজের হাতেই তোমাকে শেষ করে দেব… বিশ্বাস কর একটুও কষ্ট’ হবে না আমার ।”

হাসপাতালের ছোট্ট কেবিনজুড়ে তখন গভীর নীরবতা।
কেবিনের একপাশে নিঃশব্দে বসে আছে নীল।
কিছুক্ষণ আগেই ডাক্তার তার মাথায় ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে।
কপালের ডানপাশে সাদা ব্যান্ডেজের নিচ থেকে হালকা রক্তের দাগ এখনও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
আঘাতের কারণে শরীরটা দুর্বল লাগলেও তার মুখে কোনো কষ্টের ছাপ নেই।
বরং অদ্ভুত এক নির্লিপ্ততা ঘিরে আছে তাকে।
তার দুই বন্ধু ওষুধ আনতে বাইরে গেছে।
তাই পুরো কেবিনে এখন একাই বসে আছে নীল।
মনে হচ্ছে চিন্তার গভীর কোনো অন্ধকারে ডুবে আছে সে।
ঠিক তখনই আচমকা কেবিনের দরজাটা খুলে যায়।
পরমুহূর্তেই হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে আয়েশা।
মেয়েটার শ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে।
মনে হচ্ছে তাড়াহুড়ো করে দৌড়ে এসেছে সে।
চোখদুটো পানি তে টলমল করছে।
ভয়ের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে তার মুখে।
নীলকে দেখামাত্রই আর নিজেকে সামলাতে পারে না আয়েশা।
দ্রুত ছুটে গিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে।
তারপর বুকের ভেতর জমে থাকা আতঙ্ক আর কষ্ট একসঙ্গে বেরিয়ে আসে কান্না হয়ে।
ফুঁপিয়ে উঠতে উঠতে সে বলে—

“তোমাকে কতবার বলেছি, নীল… ক্ৰিশের সঙ্গে কোনো ধরনের ঝামেলায় জড়িয়ো না। তুমি আমার কোনো কথাই শোনো না…”
কথাগুলোর সঙ্গে সঙ্গে তার চোখের পানি ভিজিয়ে দিচ্ছিল নীলের শার্ট।
নীল দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
তারপর খুব শান্তভাবে আয়েশাকে নিজের বুক থেকে সামান্য সরিয়ে দেয়।
মমতাভরা ভঙ্গিতে হাত রাখে তার মাথায়।

— “আমিও তো তোমাকে বলি, আয়েশা… আমার মতো বখাটে ছেলের পিছনে ঘুরো না।
শেষে শুধু কষ্টই পাবে। কিন্তু তুমিও তো আমার কথা শোনো না…”
কথাগুলো শুনে আয়েশার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে।
এই মানুষটা সবসময় তাকে এভাবেই দূরে ঠেলে দেয়।
অথচ কতবার সে নিজের সমস্ত অনুভূতি নিয়ে নীলের সামনে দাঁড়িয়েছে।
কতবার তার কাছ থেকে একটু ভালোবাসা চেয়েছে।
একটুখানি স্বীকৃতি চেয়েছে।
কিন্তু প্রতিবারই নীল তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে ঠান্ডা, নির্লিপ্ত কথায়।
নীল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
তার চোখদুটো ধীরে ধীরে গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে যায়।

— “আমার কাছে ভালোবাসা আশা কোরো না, আয়েশা…”
— “আমার জীবন খুব কঠিন। আমার আম্মুর সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছে, তার প্রতিশোধ আমি নেবই।
আমার জীবনে এখন শুধু রক্ত আছে… খুনোখুনি আছে… সেখানে ভালোবাসার কোনো জায়গা নেই।”
তার কণ্ঠে এমন এক কঠিন বাস্তবতা ছিল, যা শুনে মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে যায় আয়েশা।
— “তুমি যেতে পারো…”
ছোট্ট এই কথাটুকুই যেন ছুরির মতো গিয়ে বিঁধে আয়েশার বুকে।
তার চোখ আবারও ভিজে ওঠে।
দ্রুত চোখের পানি মুছে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় সে।
তারপর অভিমানভরা কণ্ঠে বলে ওঠে—

— “আপনি খুব খারাপ… একদম পাথর! দেখবেন, একদিন আমি থাকব না সেদিন আমাকে খুজবেন…”
কথাগুলো বলেই আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না আয়েশা।
চোখের পানি আড়াল করতে দ্রুত বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে।
দরজাটা ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।
পুরো কেবিন আবারও নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে।
নীল দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথাটা পেছনে ঠেকায়।
চোখের কোণে জমে ওঠা পানিটুকু গড়িয়ে পড়ার আগেই হাত তুলে মুছে ফেলে সে।
মেয়েটা ভীষণ আবেগপ্রবণ।
বয়সটাও কম।

Mad for you 2 part 15

তাই মাঝেমধ্যেই এমন অভিমান করে চলে যায়।
আবার কিছুক্ষণ পর ঠিকই নীলকে খুঁজতে খুঁজতে ফিরে আসে।
কিন্তু নীল এই মায়ার জালে জড়াতে চায় না।
সে জানে, তার জীবন স্বাভাবিক নয়।
তার পথের শেষ প্রান্তে সুখ বলে কিছু নেই।
তার বুকের ভেতরে বহু বছর ধরে শুধু একটাই আগুন জ্বলছে—প্রতিশোধ!
শুধু প্রতিশোধ।

Mad for you 2 part 17

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here