নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২৯
রূপন্তী সরকার
ঋষভ ইয়াশফার হাত ধরে টানতে টানতে সোজা নিজেদের রুমে নিয়ে এলো। ওকে ভেতরে ঢুকিয়েই ও ঠাস করে দরজার লকটা আটকে দিল। তারপর ইয়াশফাকে বিছানায় একরকম বসিয়ে দিয়ে নিজের ল্যাপটপটা বের করলো।এদিকে ইয়াশফার বুকের ভেতর তখন ধড়ফড় ধড়ফড় করছে!
ও কিছুতেই বুঝতে পারছে না এখন কী করবে। এই রাক্ষসটা যদি এখন সব শুনে ফেলে, তবে নির্ঘাত মেরে ওর কানের নিচে লাল করে দেবে! ইয়াশফা মনে মনে চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করতে লাগলো, “ইয়া খোদা! কেন যে গাড়িতে বসে ওইসব গালিগালাজ করতে গেলাম! এই খাটাশের হাত থেকে এবার তুমিই আমাকে রক্ষা করো আল্লাহ!”
ঋষভ ল্যাপটপটা অন করে আড়চোখে ইয়াশফার দিকে তাকালো। তারপর একটা শয়তানি হাসি দিয়ে বললো, “হুম, এবার তাহলে গাড়ির অডিও রেকর্ডটা অন করা যাক।”
ঋষভ যেই না মাউসে ক্লিক করতে যাবে, অমনি ইয়াশফা ভয়ে আর আতঙ্কে একসাথে কাঁদতে কাঁদতে খ্যাঁকখ্যাঁক করে হেসে উঠলো! কান্না আর হাসির মিশেলে ওর মুখের বিচিত্র অবস্থা দেখে ঋষভের নিজেরই দম ফেটে হাসি পাচ্ছিল।
ও খুব কষ্টে নিজের হাসি চেপে রেখে গম্ভীর হওয়ার ভান করে বললো, “কী ব্যাপার? পাগলের মতো এভাবে হাসছো কেন?”
ইয়াশফা ঋষভের দিকে তাকিয়ে জোর করে মুখভর্তি একগাল বোকাবোকা হাসি ঝুলিয়ে বললো,
“আসলে… ইয়ে মানে… আপনি তো মাশাল্লাহ অনেক হ্যান্ডসাম! তাই আপনারে একটু জাওরা বললাম, এতে কারো নজর লাগবে না আপনার উপর, জাওরা না বললে যদি নজর লেগে যায়! নজর কাটানোর জন্যই ওইসব বলছিলাম,”
ঋষভ চোখ দুটো গোল গোল করে অবাক হয়ে তাকালো। ভুরু কুঁচকে বললো, “হোয়াট? জাওরা? হোয়াট ইজ জাওরা?”
ঋষভের প্রশ্ন শুনে ইয়াশফা মনে মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাত তুললো,”আল্লাহ বাঁচাইছে, এই বলদটা দেখি জাওরা মানেই জানে না!”
ও এবার মুখের নিষ্পাপ ভাব এনে ঋষভের দিকে তাকিয়ে বেশ প্রত্যয়ের সাথে বুঝিয়ে বললো, “আরে জাওরা মানে হলো খুব সুন্দর, ভীষণ হ্যান্ডসাম! আর ওই যে আরেকটা কথা বলছিলাম না? চোদনা.. ওটার মানে হলো অনেক বেশি সুন্দর, মানে একদম রাজপুত্তুরের মতো সুন্দর! ওই সুন্দরীদের নজর থেইকা আপনারে বাঁচাইতে আমি কিসমিসগো কাছে আপনার এই রূপের তারিফ করতেছিলাম আর কী!”
ঋষভ ল্যাপটপের সামনে বসে হা করে ইয়াশফার দিকে চেয়ে রইলো। ও বুঝতে পারছে না মেয়েটা কি আসলেই ওর প্রশংসা করেছে? মেয়েটা যেই চিজ প্রসংশা করার তো কথা না
ঋষভ এক গাল বাঁকা হেসে ইয়াশফাকে বললো,, “তাই? আচ্ছা বেবিগার্ল, দাঁড়াও! আমি গুগলে সার্চ করে একটু শিওর হয়ে নেই।”
কথাটা বলেই ঋষভ ঝটপট ফোনে টাইপ করতে লাগলো। সার্চ রেজাল্ট স্ক্রিনে আসতেই ওর চোখ জোড়া কপালে উঠে গেল! রাগে পুরো মুখ লাল করে ও যেই না ইয়াশফার দিকে তাকালো, অমনি ইয়াশফা দিল ভোঁ-দৌড়! ঋষভও ইয়াশফার পেছন পেছন দৌড়াচ্ছে আর বলছে
“এ্যাই মেয়ে দাঁড়াও ধরতে পারলে কিন্তু খবর খারাপ আছে”
ইয়াশফা প্রাণভয়ে ঘর জুড়ে ছুটছে আর চিৎকার করে বলছে, “আল্লাহ বাঁচাও! আর কোনোদিন বলবো না, মাগো…!”
কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। ঋষভ এক ঝটকায় পেছন থেকে ইয়াশফার লম্বা চুলের গোছা চেপে ধরলো। তারপর ওকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে গালটা শক্ত করে চেপে ধরে দাঁত কিড়মিড় করে বললো, “জাওরা আর চোদনা মানে যেন কী বললা? খুব সুন্দর? রাজপুত্র তাইনা?”
ইয়াশফা বেগতিক দেখে আর কোনো উপায় না পেয়ে, এদিক-ওদিক তাকিয়ে এক্কেবারে চোখ বন্ধ করে ঋষভের ঠিক মেইন পয়েন্ট বরাবর সজোরে একটা লাথি বসিয়ে দিল! লাথি খেয়ে ঋষভের হাত আলগা হতেই ও ঝেড়ে দিল এক দৌড়। এবার আর ওকে পায় কে! ওদিকে ঋষভ দুই হাত দিয়ে নিজের মেইন জায়গা চেপে ধরে ব্যথায় নীল হয়ে থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। মেয়েটা তো এক লাথিতে ওর ভবিষ্যৎটাই অন্ধকার করে দিল!
এদিকে ইয়াশফা ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোর দিয়ে অন্ধের মতো দৌড়াতে গিয়ে নিজের পায়ে নিজেই হোঁচট খেলো। তারপর ধড়াস করে আছাড় খেয়ে পড়লো মেঝেতে। কোমরটা বোধহয় ওর ওখানেই শেষ! ঠিক তখনই কোথা থেকে একজন এসে আলতো করে ওকে ধরে ফেললো। মেয়েটি টকটকে লাল শাড়ি পরা, চোখে ঘন কাজল আর দেখতে ভারী মিষ্টি। ইয়াশফা হা করে মেঝেতে বসেই ওই রূপবতী মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। ও কিছুতেই মাথায় মেলাতে পারলো না এই মেয়েটা কে!
মেয়েটি অত্যন্ত মায়াবী চোখে ইয়াশফাকে সাবধানে টেনে তুললো। তারপর ওর গালে হাত দিয়ে মিষ্টি সুরে বললো, “এভাবে দৌড়াচ্ছো কেন বাবু? দেখলে তো, পড়ে গিয়ে কত ব্যথা পেলে!”
ইয়াশফা বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটা আসলে কে? এই বাড়িতে এর আগে তো কখনোই দেখেনি ওকে! ও এক গাল বোকা হাসি হেসে কোমরের ব্যথা চেপে বললো, “হেহে ওই আরকী! একটা পাগল ষাঁড় তাড়া করেছিল তো, তাই জীবন বাঁচাতে দৌড়াচ্ছি। তা আপনি কে? চিনলাম না তো!”
মেয়েটি মুখে আঁচল চাপা দিয়ে মুচকি হেসে বললো, “আমি জ্যোতি, শুভ্রর বউ। ষাঁড় মানে কোন ষাঁড়? এই বাড়িতে আবার ষাঁড় আসলো কোথা থেকে?”
এবার ইয়াশফার হাঁ করা মুখ দিয়ে আর কোনো কথা বেরোলো না। শুভ্রর বউ মানে?! শুভ্র ভাইয়া বিয়ে করে বউ ঘরে তুলে নিয়েছে, আর ও কিছুই জানে না?!
ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে শুভ্র, অদ্রীত আর রুহি একসাথে বের হয়ে এলো। শুভ্র করিডোরে ইয়াশফাকে দেখেই হন্তদন্ত হয়ে ওর হাত ধরে ফেললো। তারপর ফিসফিস করে বললো, “এই ইয়াশফা, চলো চলো রুমে চলো। তোমাকে একদম শুরু থেকে সব খুলে বলছি!”
কিন্তু শুভ্রর কথা শেষ হওয়ার আগেই, ঘরের ভেতর থেকে একটা চিনা মাটির ফুলদানি রকেটের গতিতে উড়ে এসে সজোরে লাগলো শুভ্রর হাতে! ব্যথায় ও ‘আহ’ করে হাত ছেড়ে দিতেই সবাই অবাক চোখে সামনে তাকালো। দেখা গেল, দরজার চৌকাঠ ধরে কোনোমতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঋষভ! ওর এক হাত এখনো কোমরে, আর চোখ মুখ রাগে রি রি করছে। ও শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বিকট চিৎকার করে উঠলো, “ছাড় আমার পেঁচি-মুখির হাত, জাওরা কোথাকার!”
ঋষভের মুখে এমন খাঁটি গ্রামীণ গালি শুনে সবার চোখ চড়কগাছ! পুরো করিডোরে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। অদ্রীত তো নিজের কানকে বিশ্বাসই করতে পারছিল না। ও এক ছুটে গিয়ে ঋষভের পা থেকে মাথা পর্যন্ত কয়েকবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো এটা আসলেই ওর বন্ধু নাকি জিন ভূতে ধরলো! এই জাওরা, পেঁচি-মুখি এসব শব্দ তো ঋষভের ডিকশনারিতেই থাকার কথা না! মুহূর্তের মধ্যে শুভ্র, অদ্রীত, রুহি আর নতুন বউ জ্যোতি সবার সন্দেহী নজর গিয়ে পড়লো ইয়াশফার ওপর।
ইয়াশফা তখন একদিকে কাঁদো কাঁদো, অন্যদিকে ভয়ে হাসবো না কাঁদবো বুঝতে না পেরে একটা অদ্ভুত মুখভঙ্গি করে দাঁড়িয়ে আছে।
পরিস্থিতি বুঝতে পেরে অদ্রীত জোড়ে জোড়ে হাততালি দিয়ে হেসেই খুন! ও ঋষভকে খোঁচা মেরে বললো, “বাহ! বাহ! সঙ্গদোষে লোহা ভাসে আজ একদম হাতেনাতে প্রমাণ হয়ে গেল বদ্দদা! ভাবীর কোচিং ক্লাসে ভর্তি হয়ে ল্যাঙ্গুয়েজ স্কিল তো মাশাল্লাহ হেব্বি ইমপ্রুভ করেছো!”
এদিকে নিজের মুখ দিয়ে এমন কথা বের হয়ে গেছে দেখে ঋষভ নিজেই নিজের ওপর চরম বিরক্ত হলো। ওদিকে ইয়াশফা উল্টো কোমর দুলিয়ে রেগে মেগে মেকি কান্না জুড়ে দিল, “এই যে লোক! আপনি আমাকে সবার সামনে পেঁচি-মুখি বললেন কেন? আমি দেখতে পেঁচির মতো? এতবড় অপমান!”
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২৮
ঋষভ দাঁত কিড়মিড় করে চুপ করে রইলো। ও মনে মনে ভাবলো, “পেঁচি-মুখি তো কম বলেছি! একটু আগে গুগলে সার্চ দিয়ে ‘জাওরা’ আর ‘চোদনা’র আসল মানে দেখার পর থেকে আমার মাথা এমনিতেই হ্যাং হয়ে আছে! এখন যদি সবাইকে বলি ও আমাকে কী বলে ডেকেছে, তবে আমার ইজ্জতের ফালুদা হয়ে যাবে!”
ইয়াশফা মনে মনে বললো “এখন আমি যদি শুরু করি তাহলে ছাপার কাপর ছাপায় থাকবে না হেহে মানে ওই আরকি”
