Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে পর্ব ২

রাগে অনুরাগে পর্ব ২

রাগে অনুরাগে পর্ব ২
সুহাসিনি ফাতেহা

”যতক্ষণ না ক্লাস শেষ হবে এভাবে দাড়িয়ে থাকবেন। ” বলেই ফারাজ খান একদম ভদ্রলোকের মতো চলে যাচ্ছে যেন সে কিছুই করেনি এমন ভঙ্গিতে।
তিতলি খুবই বিরক্ত হলো। টিচার হয়ে নিজেকে কি ভাবে আল্লাহ জানে। শুধুমাত্র টিচার বলে আজ তিতলি চুপ থাকছে না হলে এতক্ষনে বোধহয় কিছু হয়েই যেত। ফারাজ খান কলেজে জয়েন করেছে সবেমাত্র দুইমাস। প্রথম দিন থেকেই লোকটার এত্ত ভারী এটিটিউড, উফফ ঢং এসব মোটেও চঞ্চল তিতলির সহ্য হয় না। গম্ভীর মুখটা সবসময় প্যাঁচার মতো করে রাখে। সে কি লোকটাকে পছন্দ বা ভালোটালো বেসে মেসেজ দিচ্ছে নাকি? উঁহুম মোটে না সে তো শুধু এটাই বুঝাতে চাচ্ছে যে, শিক্ষকদের মন হতে হবে মোমের মতো নরম। স্টুডেন্টদের সাথে হেসে হেসে দুইটা কথা বলবে। তা না এই লোক শুধু ধমকের উপর রাখে।

যেমন—- এই মেয়ে! শাট আপ! আউট! কথা শুনেন না! পড়ছেন না কেন? আপনার কি মাথায় সমস্যা! আরো কত কি?
তিতলি ফোঁসফোঁস শ্বাস তুলে নিজের মোটা ফ্রেমের চশমাটা মুঁছে নিয়ে সে ঝকঝকে চকচকে চোখে ফারাজের দিকে চাইলো। লোকটা তার দিকে তাকাচ্ছেই না।
রাগে তিতলি নিচের অধর কামড়ে ধরল । বিরবির করে আওড়ালো,
শালা বুইড়া, উজবুক, গম্ভীর ব্যাটা শুধু পারে স্টুডেন্টদের কিভাবে শায়েস্তা করতে পারবে সে চিন্তা নিয়ে হাঁটে! মনে কোনো দয়া-মায়া নাই! এত গুলো স্টুডেন্টের মাঝে সে একা দাড়িয়ে আছে দাড়িয়ে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছে মাটি ফাঁক হয়ে যাক।

চল্লিশ মিনিট শেষ হয়ে গেলো। ফারাজ তিতলির দিকে একবারের জন্য ফিরে ও তাকাচ্ছে না। বোর্ডে লাইন বাই লাইন সবকিছু মনেযোগ দিয়ে বুঝাচ্ছে স্টুডেন্টদের। অথচ তিতলির চোখের দৃষ্টি ফ্যালফ্যাল করে থাকা দৃষ্টির মতো।
ফারাজ লেখা শেষ করেই ধীরে ধীরে ঘাড় বেঁকিয়ে ঘুরে তিতলির দিকে তাকালো। সহসা গাঁঢ় খয়েরী অধরের প্রান্ত প্রাসারিত করে বাঁকা হাসলো কিনা কে জানে।
তৎক্ষণাৎ গম্ভীর কন্ঠে বলে,
মিস তিতলি? আপনার কি দাড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে? আমি আবার দয়াবান টিচার ! মুখে বললে ও আপনাকে তো এক ঘন্টা দাড়িয়ে রাখতে পারি না। বসুন!
তিতলি বড্ড ঘ্যাড়ত্যাড়া! ফারাজ যে তাকে ঠেস লাগিয়ে কথা বলেছে ওটা আর বুঝার বাকি নেই।
জানাল,
”না স্যার! আমার দাড়িয়ে থাকতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। আপনি বরং নিজের কাজ করুন আপনার দয়া দেখাতে হবে না।”

ফারাজ তিতলি’কে আড়াল করেই ঠোঁঠ কামড়ে হাসল। পরমুহূর্তেই তিতলির মুখ বরাবর চেয়ে ভ্রু শিথীল করে বলল,
”শিক্ষকের মাথার উপর কথা বলার পরিণতি কেমন হতে পারে, সেই ধারণা কি আদৌও আছে আপনার ?” একটু থেমে ফের ধমকের সুরে বলে,
জাস্ট সিড ডাউন আই সেড!”
ধমকে তিতলি কেঁপে উঠলো। অথচ তাকালোও না ফারাজ খানের দিকে। এতক্ষণ দাড় করিয়ে রাখতে দয়া হয় নি। অথচ এখন ছুটির টাইমে যত্তসব ঢং দেখাতে আসছে। সে কি শুনবে এই লোকের কথা এটুকু সময় দাড়িয়ে থাকবে তাও এই লোকের কথা শুনবেই না। ‘
নিজের জেদ সবকিছুর উপরে রেখে তিতলি আর বসলো না। ফারাজ ও আর জোর করে নি। ওনার ধারণা অযথা কোনো দ্যাড়”ব্যাটারি দের ধমক, দিয়ে না বসিয়ে নিজের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আর ফারাজ খানের কাছে সময়ের মূল্য অনেক বেশি।

ঘন্টা শেষ হতেই সবাই এক এক করে ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে গেলো। ক্যান্টিনে, করিডোরে, মাঠে,গেইটে সবাই আড্ডা দিচ্ছে। তিতলি পড়ালেখায় মোটামোটি ভালোই। সাইন্স গ্রুপ নিয়ে পড়ালেখা করছে। কখনো স্কুল কলেজ ফাঁকি দেয় নি। অথচ আজকে কি হয়েছে কে জানে। মনে মনে ভাবছে আজ আর পরের দু ঘন্টা করবে না।
ভাবনার মাঝে শুনল পাশ থেকে নিধির গলা,
“ ফারাজ স্যার তো তোর মোবাইল নিয়ে গেছে, তাই না তিতলি ?” এখন কি করবি? যদি বুঝে যায় মেসেজের মেয়েটা আর কেউ নয় বরং,তুই! ইয়া আল্লাহ আমার তো ভাবলেই গাঁকাটা দিচ্ছে।
তিতলি মুহুর্তেই ফিরল নিধির দিকে। এই ফারাজ খান! ফারাজ খান নামটা শুনলেই তিতলির মাথায় সহসা ভুত চেপে বসে। আজকে যে তাকে পুরো ক্লাস দাড় করিয়ে রেখেছে সে কি আদৌ ভুলবে কথাটা। কক্ষুনো না! খাতায়- কলমে লেখে রাখবে তারপর ও তো না। বসতে বলেছে তো যখন ঘন্টা বসে যাবে তখন এই দুই-কিংবা তিন মিনিট। তিতলি ভ্রু নাচিয়ে বলল,

”তাতে আমার কি? আমি তো আর প্রেম করার জন্য মেসেজ দিই নি।”
নিধি অবাকের সাথে চরম অবাকে বলল,
”তুই জানিস কি কি মেসেজ লিখছিলি। স্যারকে বলছিস আপনি কি হিজলা! মনে কি,কোনো ফিলিংস নেই? একটা সুন্দুরী মেয়ে আপনাকে এত সুন্দর সুন্দর অফার দিচ্ছে এটা আপনার সাত কপালের ভাগ্য! ও মাই গড! এখন বলছিস তাতে তোর কি? দেখ তুই আমার জানের দোস্ত তুকে যদি স্যার থাপ্পড় মেরে কলেজ থেকে বের করে দেয় তখন আমার কি হবে?”
“ এবার তিতলির মুখে কিছুটা ভয়ের চাপ দেখা গেলো। এই স্যার কে তো সে ভয় পায় না এমন না। মুখে বললে কি হলো? অন্য স্টুডেন্টদের মতো এত ভয় না ফেলে ও সে তো তার বাবা ভাই কে ভীষন রকমের ভয় পায়। পড়ালেখার প্রতি কোনোরকম টালবাহানা ফাঁকিবাজি তিতলির বাবা তৌসিফ শেখ , কিছুতেই বরবাস্ত করেন না। আর পড়ালেখার বিষয়ে তিতলি ও খুবই মনেযোগী ছাত্রী। অন্যসব কিছু উড়ে যাক।
তার মেসেজের জন্য যদি ফারাজ খান তাকে কলেজ থেকে বের করে দেয় তাহলে তো বাবাকে মুখ দেখাতে পারবে না।
অথচ তিতলি তাও জেদের গলায় বলল,

“ বের করে দিলে দিক! যেই কলেজে এই ফারাজ খান নামক টিচার সেই কলেজে পড়ার ইচ্ছে নেই। মনে হয় দেশে আর কলেজ নেই। ”
এবার স্মৃতি নোট থেকে মুখ তুললো। ওর পড়ার কোনো শেষ নেই। যথেষ্ট বুঝদার মেয়ে। কলেজে আসলেই যেখানে সেখানে বই কিংবা নোটবই নিয়ে,ডুবে থাকে। ও বলল,
”তুই কি ঠিক করেছিস তিতলি? স্যার কে নিয়ে যা তা বল…..”
স্মৃতির কথার ভেতরে তখনই ফের কানে এলো,
”মিস তিতলি? আপনি এদিকে আসুন। ”

তিতলি ফিরে মুখ ঘুরে তাকালো পেছনটায়। লোকটার মুখখানা সে কি গম্ভীর। গালের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির উপস্থিতিতে, লম্বাটে চোয়ালখানা কেমন তীক্ষ্ণ হয়েছে ব্লেডের ন্যায়। চোখাচোখি হতেই তৎক্ষণাৎ ফারাজ খান বলিষ্ঠ দেহ ছেড়ে লম্বা,লম্বা কদমে হাঁটছে সমানে।
তিতলি রা বাহিরে দাড়িয়ে আছে। ও একপলক নিধি স্মৃতি, সিয়াম সবার দিকে তাকালো। ফের ফরাজা খানের যাওয়া দেখলো। উঠে দাড়ালো উদ্দেশ্য এখন নিজের মোবাইল ফেরত নেওয়া তাই একবাক্যেয় পেছন পেছন গেলো।
পেছন পেছন যেতেই খালি জায়গাতে ফারাজ খান থেমে গেলো। সামনে ফিরেই প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন,

”আপনাকে এখন আমার সামনে দশ বার কান ধরে উঠবস করতে হবে মিস তিতলি! অবশ্যই কাজটা আপনাকে সবার সামনেই করানো উচিত ছিলো। বাট আমি তো আর পার্সোনাল বিষয়ে অন্য কাউকে ডুকাই না। বুঝেন তো?”
তিতলি ভারী চমকালো, ভরকালো। মুহূর্তেই কিছু না বুঝার মতো করে একটানা বলল,
” ন…না না না… নেভার! আমি কিছুতেই কান ধরে উঠবস করবো না। আর আমার অপরাধ টা কি জানতে পারি? আমি কি জানতাম আপনি ক্লাসে।এসেছেন? ”

রাগে অনুরাগে পর্ব ১

” ওহ রিয়েলি? যখন চোখ মোবাইলের ভেতরে ডুবে থাকে তখন জানবেন ও বা কি করে? বাই দ্যা ওয়্যে আপনি যে বড় ভুল করে ফেলছেন! বিগ মেস্টেক! এর শাস্তি তো পেতেই হবে। ”
ভয়ে তিতলির গোল মুখখানা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো।
”শা..শাস্তি মানে? আমার জানামতে আমি শাস্তি পাওয়ার মতো কোনো কাজ করিই নিই!”
অবশ্যই আপনি শাস্তি পাওয়ারই যোগ্য মিস তিতলি! তাহলে আর দেরি কিসের? শাস্তি টা দিয়েই দিই?

রাগে অনুরাগে পর্ব ৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here