রাগে অনুরাগে পর্ব ৪
সুহাসিনি ফাতেহা
তিতলি শপিং ব্যাগ টা নিয়ে নিজের রুমে চলে এলো। একমুহূর্ত দেরি না করে শাড়ি টা বের করে উল্টে’পাল্টে দেখলো। এত পছন্দ হয়ছে যে তিতলি বলে বুঝাতে পারবে না। আজকে সে হলুদে খুব সুন্দর করে সাজবে। এমনিতেই বিয়ে বাড়িতে গেলে পাঁচ দশটা বাঁদর পেছনে আটার মতো লেগেই থাকে? তাতে তিতলির কি? বরং সে এটা ভীষন উপভোগ করে।”
তিতলি শাড়িটার কয়েকটা পিক তুলে মেসেন্জারে ডুকলো। ওর ফ্রেন্ডসার্কেলের একটা আড্ডাগ্রুপ রয়েছে। যেটাতে কমজোর ১০ জন সদস্যা আছে। দুইজন ছেলে বাকি আটজন মেয়ে। তিতলি শাড়ির পিক গুলো গ্রুপে সেন্ড করে দিয়ে লিখলো,
”হেই বন্ধুরা— শাড়ি টা কেমন? আমাকে খুব মানাবে তাই না?”
এক মিনিটের মধ্যেই নিধি, সিয়াম, প্রিমাকে সিন করতে দেখা গেলো। বাঁদর গুলো সারাক্ষণ লাইনে ঝুঁলে থাকে। তৎক্ষণাৎ টুংটাং আওয়াজে মেসেজ আসলো,
”শাড়িটা দাড়ুন! সমস্যা একটাই তোকে মানাবে না।” —- তা কোথায় যাচ্ছিস শুনি?” বর দেখতে নাকি বর ভাগাতে?
তিতলি দেখলো সেটা। সিয়ামের মেসেজ! ফ্রেন্ডমহলের মধ্যে সিয়ামের সাথে তিতলির সাপে নেউলে সম্পর্ক। তিতলিকে একশত জন সুন্দর লাগছে বললে ও সে একজন এটা বলবেই যে,
—-”তেতুল গাছের পেত্নীর মতো লাগছে।” ভাবা যায়?
তিতলি ভ্রু বাঁকায়! লিখলো,
”তোর বিয়েত যাচ্ছি —-ছাগলের ৩ নাম্বার বা*চ্চা।”
”তুই উটের বা*চ্চা! উটের যেমন পিঠ বাঁকা থাকে তোর ও ঘাঁড় বাঁকা।”
তিতলি পাল্টা মেসেজ দিলো না। চাইলে সে এখন সিয়ামের চৌদ্দ*গোষ্ঠী সহ উদ্ধার করে ফেলবে নিজের কথার দাপটে। কিন্তু এখন তার মন ভালো। আর মন ভালো হলে সে একদম ভদ্র হয়ে যায়। যেন সে সদ্য পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে। তাই দুইটা ভেঙ্গানো ইমোজি সেন্ড করে দিলো।
মোবাইল রেখে দিবে দিবে ভেবে হঠাৎ ডিয়েক্টিভ করে রাখা ফেক আইডির কথা মনে পড়লো। তিতলি মেয়েটা আসলে শুধরাবে না।
——একদিন ওর বাঁকা ঘাঁড় কেউ মটকাবেই!
আইডি ঠিক করে লগইন করেই ফারাজ খানের দেওয়া সেদিনকার মেসেজ টা দেখলো তিতলি। এই একটা মেসেজই দিয়েছে ১০০ টা মেসেজ
অাদান-প্রধান করার পর। তবে সে পাল্টা কোনো মেসেজ দিলো না। তাকে অপ*মান করার ফলস্বরুপ ফারাজ খানের প্রফোইলে ডুকে সব পোস্টে হা হা দিয়ে আসলো। তিতলির কি? তিতলি কে তো আর চিনতে পারে নি। খুশি মনে মোবাইল রেখে দিলো।
তিতলি হলুদ রঙা ছোট ছোট কারুকাজে আবৃত শাড়িটা গায়ে জড়িয়েছে। কোমর ছড়ানো রেশমের মতো সিল্কি চুলগুলো খুলে রেখে পেছনে একটা টানা হলুদ গাঁজরা দিলো। নরম মোলায়েম দু হাতে দুইটা ফুলের গাঁজরা বেঁধেছে। মুখে হাল্কা পাতলা মেকআপ করে অধর জোড়ায় রক্তে রাঙা লাল টকটকে লিপিস্টিক দিয়ে চোখে মোটা করে কাজল টানল। ব্যাস এইটুকুই যথেষ্ট ছিলো। তিতলি সত্যি খুব সুন্দর করে সেজেছে। গায়ের রং ফর্সা হওয়াতে শাড়িটাও বেশ ফুটছে যেন। তাকালেই চোখ শান্ত হয়ে আসছে এমন একটা সাঁজ নিয়েই তিতলি আয়না দেখল। আয়নায় দাড়িয়ে বেশ কয়েকটা ঢং রস করে পিক ও তুলে নিলো।
ইতিমধ্যেই দরজার বাহির থেকে——-
চড়া কণ্ঠ ভেসে এলো,
”তিতলি! বের হয়ে আসবি নাকি আমি তোকে রেখে চলে যাবো।”
তিতলি ও গলা ছেড়ে জানাল,
”আসছি ভাইয়া!”
তিতলির ভাইকে বিশ্বাস নেই। তোকে রেখে চলে যাবো মানে? একটু হেরফের হলে বলা নেই সত্যি তিতলি কে রেখে চলে গেলো। এটা কি তিতলি হতে দিবে? এতবড় সুযোগ পেয়ে সে হাতছাড়া করবে। হতে পারে এটা? এমনিতে বিয়ে টিয়ে খেতে পারে না। কারো বিয়ে হয় না। তাই তিতলি বাধ্য মেয়ের মতো তুষারের পেছন পেছন নেমে গেলো।
নিচে নেমে আসতেই তিতলির দাদি ফরিদা বানু বললেন,
“মাশাল্লাহ! আমার নাতনি টারে কি সুন্দর লাগছে, কোনো পোলার নজর না লাগুক।”
দাদির কথায় তিতলি ঠোঁঠ প্রসারিত করে হাসলো।
আলেয়া শেখ তুষারের উদ্দেশ্য সাবধানতার বানী ছেড়ে দিলেন,
”তিতলি কে কিছুতেই একা ছাড়বি না তুষার।”
তুষার মোলায়েম কণ্ঠে বললেন,
”কোনো চিন্তা নেই আম্মু। আমি আছিতো।”
অতঃপর ওরা মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যেতে যেতে তিতলি শুনতে ফেলো ফরিদা বানুর আপত্তিকর কথা,
”নাতনি ডা বড় হচ্ছে। বিয়া সাদি দন লাইগবো না।”
—-তিতলির দাদি ফরিদা বানু গ্রামে থাকেন বেশির ভাগ। বয়স কম হয় নি।৭৫ বছর বয়স। তবে দেখতে মনে হবে ৬০ বছর। এখনো অনেক শক্ত! তিতলির পাঁচ জন চাচা আছে। তিতলির বাবা সবার ছোট। সবার নিজস্ব বাসা- বাড়ি করা। ফরিদা বানু সব ছেলের বাড়িতে একমাস করে থাকেন। বাকি মাস গুলো তিতলিদের বাড়িতেই থাকে।
বিয়ে বাড়ি গিয়ে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগল না। গাড়ি দিয়ে পঁচিশ মিনিটের পথ। একটানেই চলে এসেছে মনে হলো। দুতালা বিশিষ্ট ভবন টা বিশাল আয়োজনে মুখরিত। ফেইরী লাইট থেকে শুরু করে ভারি ডেকোরেশনে সাজানো হয়েছে সামনের গেইট পর্যন্ত। বলা যায় তিতলি এই বাড়িতে আজ প্রথমবার আসলো।
বাড়ির ভেতরে ডুকতেই তুষারের বন্ধু অয়ন এগিয়ে এসে কৌশল বিনিময় করলো। ফের তিতলির দিকে তাকালো। মেয়েটাকে আজ একটু বেশিই সুন্দর লাগছে। অয়ন তিতলি কে নিজের বোনের মতোই ভাবে। ছোট থেকে তুষারের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকায় সে বাড়িতে আসা যাওয়া ছিলো। তবে আজকাল তিতলিকে নিয়ে অন্যচিন্তা আসে মনে। অয়ন নিজেই তুষারকে রাজি করিয়েছে যাতে তিতলি কে সাথে নিয়ে আসে। অয়ন তাকাতেই তিতলি সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে বলল,
‘”আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।”
”ওয়ালাইকুম আসসালাম।”স্রেফ বললো,
”কেমন আছো তিতলি?”
”আলহামদুলিল্লাহ ভালো ভাইয়া।”
এরপর আরো টুকটাক কথা চললো।
ঘড়ির কাঁটায় রাত প্রায় আটটা। চারদিক থেকে শুধু হৈচৈ,কোলাহল একেকজন একেক জায়গায় দাড়িয়ে ফটো তুলছে।
তিতলি অয়নের কাজিন রুপসা,ঝিলিক আরো কিছু মেয়ের সাথে ছাদে বসে আড্ডা দিচ্ছে । ছাদে ও মানুষের আনাগোনা অনেক। নিচে তো আরো বেশি। বিয়ে বাড়ির সব ছেলেদের চোখ যেন ঘুরেফিরে তিতলির দিকেই পরছে। এমনকি এর মধ্যেই একজন প্রায় জোর করেই তিতলির হাতে একটা চিরকুট স্রেফ দুইটা সাদা গোলাপ দিয়ে গেলো। তিতলি মাইন্ড করলো না। বরং হেসে নেয়ে গোলাপ ফুল গুলোর লোভ সামলাতে না পেরে চিরকুট টা হাতে নিলো। ছেলেটা চলে যেতেই মুখ ভেঙচি কেটে তিতলি চিরকুট টা ডাস্টবিনে ফেলে দিলো।
বিয়ে বাড়ির দোকানি সহ বিভিন্ন নাস্তা খেয়ে রীতিমত তিতলির পেট চাপছে। কাউকে বলতে গেলে কত লজ্জাজনক বিষয় ভাবা যায়। সব বেডরুম আনাচে-কানাচ মেহমান। তিতলি উপায় না পেয়ে সবার উদ্দেশ্য বলল,
রুপসা আপু আমি একটু আসছি— বলে ভাইয়ের খোঁজে ছাঁদ থেকে নেমে গেলো।
নিচে নাচ-গানের আয়োজন করা হয়েছে। বাড়ির উঠোনে এবং ছাঁদে দুই জায়গাই স্টেজ তৈরি করা হয়েছে।
প্যান্ডেলের পাশে আলভী, নিহাদ, ফরহাদ, FK আরো কেউ কেউ বসে আছে। আলভী, ফরহাদ বিবাহিত। ওরা সবাই অয়নের কাজিন। কথার মাঝে আলভী হঠাৎ হতাশ গলায় বলল,
”কি একটা বউ বিয়ে করছি আমি! ধরলেই চিল্লানি দেয়!”
ফরহাদ ও ওর সাথে তাল মিলালো।
দুঃখের সহিত বলল,
”মনের কথা কইছস রে ব্রো। আমি ও চেষ্টা করছিলাম ফুলের টপ দিয়ে বারি দিছে।
আলভী, নিহাদ ওরা হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
ঠাট্টার সুরে বলল,
“কোথায়?”
”দেখানো যাবে না ..!”
মুহূর্তেই হাসির রোল পড়ে গেলো সেখান টায়। তবে একজন বিরক্ত ভঙ্গিতে ফোন আসায় কথা বলতে বলতে উঠে চলে গেলো।
পেটের চাপের উত্তেজনায় তিতলি বর্তমান অবস্থাটা ভুলে গেলো। দ্বিকশূন্য হয়ে ভাইকে খুঁজছে। এমনকি তুষারের মোবাইল টাও তার কাছে। আইফোন হওয়ায় ছাঁদে আসার সময় নিয়ে ছবি তুলার জন্য এনেছে। তুষার’কে খুঁজতে খুঁজতে বেয়াখালি তে আচমকা কারো শক্তপোক্ত পিঠের সঙ্গে ধাক্কা লাগলো তিতলির। অমনি খেই হারিয়ে পরে যেতে নিলে তিতলি যুবকের পেছনের শার্টের কলার খাঁমছে ধরলো। টান খেয়ে যুবক পেছনের দিকে মানে তিতলির উপর পরে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিলো। পেছনে ফিরেই চাপা গর্জনে বলে উঠলেন,
”হোয়াট দ্য হেল?”
ধমকে সপ্তাদশীর সর্বাঙ্গ কম্পিত হলো। তার চেয়ে বেশি অবাক হলো সামনে থাকা ব্যক্তি টা আর কেউ নয় স্বয়ং ফরাজ খান দাড়িয়ে আছে। তিতলি অাশ্চর্য বনে গেল। এই লোক এখানে কি করছে? যার থেকে বাঁচতে নিজের মিথ্যা ডাইরিয়া বানালো। ঔষুধ দিলে খাওয়ার নাম করে জানালা দিয়ে ফেলে দিতো। আর সেই কিনা…”
ফারাজের রাগ তখন সীমা ছুঁয়ে গেছে। মেজাজ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সামনে থাকা রমনী টা কে সেটা ভালোভাবে না দেখেই যুবক চাপা রাগে শক্ত মুখাবয়বে কঠিন গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
”এই মেয়ে! আপনি কি চোখে দেখতে পান না? আপনার কি মাথায় কোনো অসুবিধা আছে নাকি?”
তিতলি কাপট রাগ দেখালো। সে কি এই লোকের কথা হজম করে নিবে? মোটে ও না,না,না।
ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠে বলল,
”বিশাল দৈত্যের মতো হাঁটার জায়গায় দাড়িয়ে থাকবেন। আর কেউ ধাক্কা দিলেই দোষ!”
ফারাজ খান এবার সরাসরি তাকালেন তিতলির মুখপানে। সপ্তদশীর পেল্লব মুখখানার ওপর বিক্ষিপ্ত আকারে আছড়ে পড়ছে ছোট বড় বেয়াদব কেশগুচ্ছ। যুবকের চোখে মুখে বিরক্ত ভাব। ফারাজ খান এই বেয়াদব মেয়েটার উপর ভীষন বিরক্ত। চেঁচিয়ে বলল,
”আপনার সাহস কি করে হলো আমাকে ধাক্কা দেওয়ার? তার উপর মুখের উপর দিয়ে কথা বলছেন? আপনি কি কখনো শুধরাবেন না নাকি স্রেফ আমাকেই কিছু করতে হবে?”
বিরবির করল,
ক্যারেক্টারলেস গার্লস!
তিতলি ঝগরা করার মতো অবস্থাতে নেই। মুখখানা এমন যেন কেঁদেই দিবে এমন ভাব। একদিকে ভাইকে খুঁজে পাচ্ছে না!অন্যদিকে আরেক বিপদ এখন তাকে কে বাঁচাবে? এখন যদি এই ফারাজ খানের সাথে পাক্কা লাগতে যায় উল্টো ঘোর বিপদ।সময় বুঝে সেও ছাড়বে না এই ফারাজ খানকে। তাই মুখখানা অসহায় করে নত মস্তিষ্কে জানাল,
”সরি স্যার! ভুল হয়ে গেছে আমার! এবারের মতো মাফ করে দিন।”
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩
উত্তর না পেয়ে তিতলি অসহায় নেত্রে ফের তাকালো ফারাজ খানের দিকে। কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তিতলির মুখপানে চেয়ে আছে। ভ্রু জোড়া কুঁচকে নেত্রযুগল সরু করে রেখেছেন কৌতুকে। অতঃপর মোবাইল পকেটে রাখতে রাখতে তিতলির দিকে সামান্য ঝুকে গিয়ে ফিসফিস করে বলে থামল,
”তোহ ফাইনাললি নিজের দোষ নিজেই স্বিকার করলেন মিস তিতলি! এত ভালো হয়ে গেলেন? আপনার মতলব তো সুবিধার লাগছে না!”
