প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১৩
বন্যা সিকদার
দেখতে দেখতে দীর্ঘ একটা সপ্তাহ চোখের পলকে কেটে গেল। এই এক সপ্তাহে কত কিছুই না বদলে গিয়েছে শুধু বদলাল নি উজান-মৌ’য়ের মাঝের সম্পর্ক আর ইফাত-মেহেরে’র মধ্যকার সেই যন্ত্রণাদায়ক দূরত্ব। মেহের গত এক সপ্তাহ ধরে টুকটাক যাও বা কথা বলত ইফাতে’র সাথে কিন্তু গত দুদিন ধরে সে একদমই কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি ইফাত রোজ তার কলেজের সামনে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বলে‚ মেহেরে’র পরীক্ষা থাকা সত্ত্বেও সে গত দুদিন ধরে কলেজে যাওয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছে। মেহেরে’র এই চরম অবহেলা আর দূরত্ব নিতে পারছিল না ইফাত। তাই আজ সে সব বাধা ভেঙে সোজা মেহেরে’র ফুপুর বাসার নিচে এসে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় এক ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও মেহেরে’র এক পলক দেখার সৌভাগ্য তার হচ্ছিল না।
ঠিক তখনই দোতলার বারান্দায় এক হাতে গরম কফির মগ আর অন্য হাতে একটা বই নিয়ে এসে দাঁড়াল মেহের। সে ছোটবেলা থেকেই ভীষণ বইপ্রেমী। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে কফির মগে চুমুক দিতে দিতে বারান্দায় বসে বই পড়া আর ঝিরঝির বৃষ্টি দেখা তার জীবনের অন্যতম প্রিয় একটা ভালোলাগা। এখন যেহেতু একদম শেষ বিকেল‚ এই সময় প্রতিদিন মেহেরে’র ফুপা-ফুপি সবাই ড্রয়িং রুমে বসে চা-গল্প করেন। কিন্তু আজ সারাদিন ধরে হওয়া ঝিরঝিরে মিষ্টি বৃষ্টির কারণে আবহাওয়া বড্ড ঠান্ডা তাই বাড়ির সবাই এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মেহের বারান্দার গ্রিলে হাত দিয়ে নিচের দিকে তাকাতেই আচমকা তার নিজের বাড়ির সামনে‚ ভর বৃষ্টির মাঝে ইফাত’কে ওভাবে বাইকের ওপর নিথর হয়ে বসে থাকতে দেখে চমকে উঠল। ঠিক তখনই আকাশের মেঘ ডাকল এবং বৃষ্টির বেগ কিছুটা বাড়তে শুরু করল। মেহের দোতলার বারান্দা থেকেই চারপাশ দেখে নিয়ে অত্যন্ত নিচু ব্যাকুল স্বরে ডাকল।
”এই যে শুনছেন? এই ভর বৃষ্টির মধ্যে ওখানে ওভাবে কেন দাঁড়িয়ে আছেন?
কিন্তু ইফাত মেহেরে’র কথার কোনো উত্তর দিল না। সে নিজের বাইকের হ্যান্ডেলে গালে হাত দিয়ে ঠিক আগের মতোই এক দৃষ্টিতে দোতলার বারান্দার দিকে তাকিয়ে রইল। মেহের ওপর থেকে আরও বারকয়েক তাকে ডাকল‚ তবুও ইফাত যেন কানেই তুলল না। মেহের আর কোনো উপায় না পেয়ে নিজের কফির মগ আর বইটা টেবিল রেখে‚ পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলো। সদর দরজার কাছে এসে সে আবারও ইফাত’কে ডাক দিল।
”এই যে আপনার কী হয়েছে বলুন তো? এভাবে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে ভিজছেন কেন? ভেতরে আসুন।
এবার ইফাত নিজের বাইক থেকে নেমে এক নীরব ও পাথুরে দৃষ্টি নিয়ে হেঁটে এসে মেহেরে’র একদম সামনে এসে দাঁড়াল। তবে সে মেহেরে’র ফুপুর বাসার সীমানার ভেতরে পা রাখল না। বাইরের বৃষ্টির মাঝেই দাঁড়িয়ে রইল। মেহের তার দিকে একরাশ রাগী দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে অথচ ইফাতে’র মধ্যে সেই রাগের বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। মেহের নিজের জোড়া ভ্রু কুঁচকে ক্ষিপ্ত গলায় জিজ্ঞেস করল। ”কী হলো কথা বলছেন না কেন? এই বৃষ্টির মধ্যে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার মানে কী?
ইফাত নিজের ভেজা মুখটা মুছে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও শান্ত গলায় উত্তর দিল। “তোমার জন্য।
কিন্তু ইফাতে’র এই ছোট ও সহজ উত্তর শুনে মেহেরে’র মন বিন্দুমাত্র খুশি হতে পারল না। সে ভেবেছিল নিজে থেকে দূরত্ব বজায় রাখলে‚ ফোন না ধরলে হয়তো ইফাত একসময় তার থেকে দূরে সরে যাবে। কিন্তু এই জেদি লোকটা আজ সরাসরি তাদের বাসার নিচে এসে হাজির হয়েছে। সে খানিকটা রাগান্বিত হয়ে বলল‚ ”আমার জন্য মানে? আমি কি আপনাকে একবারের জন্যও বলেছি যে আপনি আমাদের বাসার নিচে এসে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবেন‚ হ্যাঁ?
ইফাত বৃষ্টির মাঝে মেহেরে’র চোখের দিকে তাকিয়ে তপ্ত হেসে বলল‚ “তুমি তো এটাও বলোনি যে এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবো না।
মেহের ইফাতে’র মতো জেদি এই ছেলের কথা শুনে এক দীর্ঘ ও তপ্ত নিশ্বাস ফেলল। আকাশের মেঘ যেন আজ তাদের মনের কথার সাথে তাল মিলিয়ে ডাকছে। বৃষ্টির গতি ধীরে ধীরে আরও বাড়তে লাগল কিন্তু তবুও ইফাত এক চুলও নড়ল না। এতে মেহের এবার বেজায় চটে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল। ”আরে আপনি পুরো ভিজে যাচ্ছেন তো। ভেতরে আসুন? এভাবে আর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে নির্ঘাত জ্বর চলে আসবে আপনার।
ইফাত এবার মেহেরে’র মুখের দিকে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে‚ “আমার কবে হবে?
ইফাতে’র এই কথার আগাগোড়া কিছুই মাথায় ঢুকল না মেহেরে’র। সে কপাল কুঁচকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল। “কী বললেন?
বৃষ্টির ভারী পানি ইফাতে’র ভেজা চুল ছুঁয়ে‚ কপাল বেয়ে তার ধারালো নাকের ডগা দিয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। সে এক দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল। সে মেহেরে’র এই অবুঝ চাউনি দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারল তার পাঠানো শত শত মেসেজের একটাও এই মেয়েটি আজ পর্যন্ত খুলে দেখেনি। দেখলে অন্তত এই মুহূর্তে এই প্রশ্নটা করত না। ইফাত নিজের মনেই হাসল‚ দুনিয়ায় তার চেয়ে কম ধৈর্যশীল ছেলে বোধহয় দুটো নেই। অথচ এই মেহের নামের মেয়েটার বেলায় তার ভেতর এত ধৈর্য‚ এত অপেক্ষা কোত্থেকে আসে সে নিজেও জানে না! ভালোবাসা বোধহয় আসলেই মানুষকে এভাবে বদলে দেয়।
ইফাত এবার নিজের ভেজা চোখ দুটো সোজা তুলে মেহেরে’র চোখের মণিকোঠায় স্থির করল। পরম আকুলতা ও ভালোবাসায় মাখানো কণ্ঠে এক নিশ্বাসে বলে উঠল‚
“ভীষণ ভালোবাসি তোমায় ফুলকন্যা।
ইফাতে’র মুখ থেকে এই একটা শব্দ শোনা মাত্রই মেহেরে’র পায়ের তলার মাটি যেন এক নিমেষে সরে গেল। সে পুরো স্তব্ধ ও নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে নিজের স্বপ্নেও কখনো ইফাতে’র কাছ থেকে এত বড় একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হবে তা আশা করেনি। সে ভেবেছিল‚ কোনো এক দূর ভবিষ্যতে হয়তো এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত ও ভয়ানক দিনটি যে এত তাড়াতাড়ি আসবে তা মেহেরে’র কল্পনারও বাইরে ছিল। সে নিজের শুকনো ঢোক গিলে মনের ভেতরের তীব্র কাঁপনটা লুকিয়ে মুখখানা যতটা সম্ভব শক্ত ও কঠিন করে বলল‚ “কীহহহ বললেন আপনি?
ইফাত এবার মেহেরে’র এক হাত নিজের ভেজা হাতের মুঠোয় নিয়ে পরম আকুতিতে নিয়ে আওরায়‚ “তোমায় আমি প্রেমিকা নয় বউ করে ঘরে তুলতে চাই ফুলকন্যা। বিয়ে করবে আমায়?
ইফাতে’র এই সরাসরি বিয়ের প্রস্তাবে মেহেরে’র বুকের ভেতরটা যেন এক মস্ত বড় ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল। তার শরীরে আর দাঁড়িয়ে থাকার মতো কোনো শক্তি অবশিষ্ট রইল না। এই কাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের উত্তর সে কী দেবে‚ তা কিছুতেই ভেবে পেল না সে। তার নিজের অতীতের সেই অন্ধকার অতীত‚ সমাজের সেই চাবুক আর নিজের কলঙ্কের কথা এক নিমেষে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। সে নিজের চোখের জলটুকু কোনোমতে চেপে রেখে আমতা আমতা করে কাঁপা গলায় বলল‚
“আ আ আ আপনি যেটা চাচ্ছেন সেটা কোনোদিন পসিবল নয়। তাই চলে যান এখান থেকে। আর কোনোদিন আসবেন না আমার সামনে।
এই বলেই ইফাতে’র মুখের সামনে মেহের দরজা আঁটকে দিলো। ইফাত কিছু সময় সেভাবেই তাকিয়ে রইলো। সে কিভাবে বাঁচবে মেয়েটাকে ছাড়া? মেয়েটা কি কোনোদিন বুঝবে না তার গভীর ভালোবাসা?
”প্রফেসর সাহেব‚ আই লাভ ইউ সো মাচ।
পড়ার টেবিলের খাতার ওপর দুই হাত রেখে‚ নিজের চিবুকটা ঠেকিয়ে হুট করেই অত্যন্ত মিষ্টি সুরে উজানে’র দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে উঠল মৌ। উজান তখন হাতে কলম নিয়ে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ফিজিক্সের একটা ম্যাথ মৌ’কে বোঝাচ্ছিল। মৌ’য়ের মুখ থেকে এমন অসময়ে রোমান্টিক বাণী শুনে উজান নিজের হাতের কলমটা টেবিলের ওপর খটাস করে রাখল। তারপর চোখ দুটো বড় বড় করে কড়া গলায় ধমকে উঠল।
“থাপ্পড় দিয়ে তোমার সব কটা দাঁত ভেঙে দেববেয়দব মেয়ে। দিন দিন ফাজিল হয়ে যাচ্ছো। পড়ার সময় এই সব আজাইরা ফালতু কথা তোমার ওই পুচকে মাথায় আসে কী করে‚: হ্যাঁ? চুপচাপ যে ম্যাথটা করাচ্ছি, ওটাতে মনোযোগ দাও।
উজানে’র এমন রাগান্বিত ধমক খেয়ে মৌ নিজের মুখটা বেলুনের মতো চট করে চুপসে নিল। পড়াশোনা জিনিসটা তার ছোটবেলা থেকেই বরাবরই চরম অপছন্দের। সে তো মনে মনে ভেবেছিল‚ যখন বিয়েটা হয়েই গেছে তখন অন্তত এই খাতা-কলমের অত্যাচার থেকে চিরকালের মতো মুক্তি পাবে! কিন্তু এখন তো দেখছে পুরো উল্টো পুরাণ‚ খোদ বরের কাছেই প্রতিদিন রাতে তাকে টিউশনি পড়তে হচ্ছে। উজান প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে মৌ’কে একটা মাত্র ম্যাথ বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে কিন্তু এই অবুঝ মেয়েটার মাথায় ফিজিক্সের সূত্র যেন কিছুতেই ঢুকতে চাইছে না। এই নিয়ে উজান যতবার বকাঝকা করছে‚ মৌ ততবারই উল্টো কোনো না কোনো কথা বলে উজান’কে আরও রাগিয়ে তুলছে। মৌ এবার নিজের একটা ফর্সা গাল উজানে’র দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সব কটা দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল‚
”এই যে থাপ্পড় দিতে চাইলেন না? নেন‚ দেন থাপ্পড়। তবে আমার একটা শর্ত আছে‚ থাপ্পড় দেওয়ার পর কিন্তু আমাকে জড়িয়ে ধরে ‘ভালোবাসি’ বলতে হবে।
উজান নিজের কপালে হাত দিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে গলার স্বর কিছুটা নরম করে বলল‚ “প্লিজ পিচ্চি আর ফাজলামো না করে একটুখানি পড়াশোনা নিয়ে সিরিয়াস হও তো? তোমার সামনে পরীক্ষা। এমন অবস্থা হলে ভালো রেজাল্ট তো দূর‚ তুমি পরীক্ষায় টেনেটুনে পাস করতে পারবে কিনা তা নিয়েই আমার ঘোর সন্দেহ আছে।
মৌ নিজের ঠোঁট উল্টে বলল‚ “আমার কোনো দরকার নেই পরীক্ষায় পাস করার। দুদিন পর আপনার বাচ্চার মা হয়ে‚ আপনার ঘরসংসার আর বাচ্চা-কাচ্চা সামলে তাদের ঠিকমতো মানুষ করতে পারলেই আমার জীবন ধন্য। ফিজিক্সের সূত্র দিয়ে আমার কী হবে‚ শুনি?
মৌ’য়ের মুখে এতটুকু বয়সে সরাসরি ‘বাচ্চা-কাচ্চা মানুষ করার’ কথা শুনে উজান এবার চরম বিষম খেল। সে নিজের চোখ রাঙিয়ে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে যায়। “দাঁড়াও ফাজিল মেয়ে তোমাকে আজ আমি মজা দেখাচ্ছি।
কিন্তু উজান কিছু করার জন্য এগিয়ে আসার আগেই মৌ খিলখিল করে হেসে টেবিল ছেড়ে এক লাফে উঠে দাঁড়াল। সে নিজের ওড়নাটা সামলে নিয়ে হুট করে রুমের দরজার দিকে এক দৌড় দিল। উজান তড়িঘড়ি করে বিছানার পাশ থেকে চিৎকার করে উঠল। “এই পিচ্চি দৌড়িও না পড়ে গিয়ে ব্যথা পাবে। সত্যি সত্যি বলছি দাঁড়াও।
মৌ উজানে’র সেই উপকারী বারণ নিজের কানেই তুলল না। সে যেই না হাসতে হাসতে দরজার কাছাকাছি পৌঁছাল‚ ওমনি ঠাসস করে শক্ত মেঝের ওপর আছাড় খেয়ে পড়ে গেল। উজান আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে গেল। মৌ মেঝেতে পড়ে গিয়ে বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে উজানে’র মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবল‚ ইশশশ কেন যে এই খিটখিটে মানুষটার কথা শুনতে গেলো না! এখন তো সত্যিই খুব ব্যথা পেলো। উজান কোনো কথা না বলে অত্যন্ত সাবধানে নিজের দু-হাত দিয়ে মৌ’কে পাজা কোলে তুলে নিল। তারপর ধীরপায়ে এনে বিছানার ওপর বসিয়ে দিল। সে নিজের দাঁতে দাঁত চেপে রাগটা নিয়ন্ত্রণ করে নিলো।
“আমার কথা শুনো না কেন বলতো? এতো ত্যাড়ামি কে করে শুনি?
“নারী এমন একটা শব্দ যা শুরুই হইছে না দিয়ে! তারপরও কিভাবে আশা করেন যে আপনাদের কথা আমরা অক্ষরে অক্ষরে শুনবো!
কথাটা বলেই মৌ নিজের সব কষ্ট ভুলে আবারও ফিক করে হেসে দিল। উজান তার দিকে এক তীব্র ও রাগী চ্যামড়া দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই সে চট করে নিজের মুখে হাত দিয়ে চুপ হয়ে গেল। মৌ এবার খানিকটা উজানে’র দিকে ঝুঁকে এসে চোখ টিপে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
“রাগ করলেন?
“আস্ত একটা নির্লজ্জ মেয়ে তুমি। এত বড় আছাড় খেয়ে ব্যথা পেলে অথচ এখনো বসে বসে দাঁত কেলাচ্ছো। সারাদিন ফোন দেখে যত সব আজগুবি আর ত্যাড়াবেঁকা কথা শেখা হয় তাই না? আজ থেকে তোমার ফোন হাতে নেওয়া সম্পূর্ণ ব্যানড।
উজান কড়া সুরে বলল। মৌ এবার উজানে’র শার্টের কলারটা আলতো করে টেনে ধরে আদুরে গলায় বলল‚ “লাভ ইউ শাশুড়ির হ্যান্ডসাম ছেলে।
উজান এবার নিজের দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে বিছানার কোণে বসে পড়ল। এই মেয়েটাকে কোনো ব্যাকরণ বা ফিজিক্সের সূত্র দিয়ে সামলানো তার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সে মৌ’য়ের এই মিষ্টি যন্ত্রণাদায়ক অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ঘর থেকে উঠে দাঁড়াল। আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। সে দ্রুত পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। রাত তখন অনেক গভীর। পুরো চৌধুরী বাড়ি এখন নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। উজান রুম থেকে বেরিয়ে নিজের ভেতরের অস্থিরতা কমাতে ধীরপায়ে বাড়ির পেছনে থাকা সেই পুরোনো পুকুরপাড়ের দিকে এগিয়ে এলো। এই জায়গাটা একসময়‚ বিশেষ করে তার স্কুল-কলেজ লাইফে ভীষণ প্রিয় ছিল। একা একা বসে চাঁদ দেখা আর ডায়েরি লেখার এক মস্ত বড় আশ্রয় ছিল এই পুকুরপাড়। তবে ১৪ বছর আগের সেই কালরাতের পর থেকে এখানে আর তেমন একটা আসা হয় না তার। উজান যখন পুকুরপাড়ের ঘাটে গিয়ে দাঁড়িয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল‚ ঠিক তখনই তার মনে হলো পেছনে ছায়ার মতো কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। সে সাথে সাথে সজোরে পেছন ফিরে তাকাল।
দেখল মৌ ঠিক চোরের মতো পা টিপে টিপে তার পিছু পিছু এতদূর চলে এসেছে। তাকে ওভাবে দেখে উজান নিজের জায়গায় স্থবির হয়ে গেল। সে নিজের দু-হাত বুকের ওপর আড়াআড়িভাবে বেঁধে‚ জোড়া ভ্রু কুঁচকে অত্যন্ত গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল। “প্রব্লেম কী তোমার? মাঝরাতে এভাবে চোরের মতো আমার পিছু পিছু আসার মানে কী? একটু আগে মাত্র আছাড় খেয়ে ব্যথা পেয়েও তোমার কি একটুও শিক্ষা হয়নি?
মৌ ধীরপায়ে হেঁটে এসে উজানে’র একদম সামনে দাঁড়াল। সে নিজের পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে একটু উঁচু হয়ে উজানে’র মুখের কাছাকাছি নিজের মুখটা নিয়ে গেল। তারপর এক গাল হাসি ফুটিয়ে আওড়াল‚ ”ওহহ্‚ আমার দুলহা জান যেখানে ওনার এই পুঁচকে বউটাও ঠিক ওনার পিছু পিছু সেখানে আসবে।
“ফাজলামো করো না পিচ্চি‚ অনেক রাত হয়েছে। এখনই রুমে যাও।
”যাব না‚ কী করবেন আপনি শুনি?
“দেখো পিচ্চি আমার মাথাটা অলরেডি গরম হয়ে আছে দয়া করে আমার রাগটা আর বাড়িও না। যাও এখান থেকে‚ তোমার এই সারাদিনের যন্ত্রণা আর পাগলামি আমি আর নিতে পারছি না।
উজান কথাটি কিছুটা চড়া সুরে বলতেই মৌ’য়ের মুখের সেই চপল হাসিটা এক নিমেষে মিলিয়ে গেল। সে অত্যন্ত করুণ ও অসহায় চোখে উজানে’র চোখের দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করল।
“আমি কি আপনাকে শুধু সারাদিন যন্ত্রণাই দেই? আপনাকে একটুও ভালোবাসি না?
মৌ’য়ের ওই বুকভাঙা অসহায় স্বরের আকুল প্রশ্নটা উজানে’র কানে কোনো এক তীব্র বজ্রপাতের মতো গিয়ে বাজতে লাগল। সে খুব ভালো করে টের পাচ্ছে‚ তার এই রুক্ষ আর কঠিন কথায় মেয়েটা বড্ড বেশি কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু উজানে’র নিজেরও তো আজ কিছু করার নেই। যে মেয়েটাকে সে নিজের মনের ভেতর থেকে ভালোবাসতে পারছে না‚ যাকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে এখনো মেনে নিতে পারছে না। তাকে মিছে মায়ার জালে জড়িয়ে নিজের দিকে টেনে এনে ভবিষ্যতে আরও গভীর কোনো আঘাত দিতে চায় না সে। আর ঠিক সেই কারণেই সে মৌ’য়ের সাথে সবসময় এমন রুড আর রুক্ষ বিহেভিয়ার করে। কিন্তু এই অবুঝ মেয়েটা তো সেই গভীর সমীকরণ বোঝে না।
উজান নিজের মনের সমস্ত আবেগ পাথর চাপা দিয়ে‚ মৌ’য়ের ছলোছলো চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শীতল ও দৃঢ় গলায় বলে উঠল।
“কিন্তু আমার তোমার এই সস্তা ভালোবাসার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই। উজান চৌধুরীর লাইফে আজ শুধু তুমি কেন‚ কোনো নারীর কোনো জায়গার প্রয়োজন নেই। এই উজান চৌধুরী নিজের অতীতে একাই বাঁচতে শিখেছে আর চিরকাল একাই বাঁচতে পারে। তার লাইফে কোনো মানুষের সান্নিধ্যের প্রয়োজন নেই‚ আর না আছে কারো ভালোবাসার দরকার। আমি এই ‘ভালোবাসা’ শব্দটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি। এই একটা মাত্র মিথ্যে শব্দ একসময় আমার পুরো লাইফটা তছনছ করে ধ্বংস করে দিয়েছিল। আমি আমার জীবনে আর দ্বিতীয়বার একই ধ্বংসলীলা দেখতে চাই না। সো প্লিজ‚ আমাকে আমার মতো একটু একা থাকতে দাও। আমি তোমায় রিকোয়েস্ট করছি।
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১২
উজানে’র মুখ থেকে ‘ঘৃণা’ আর ‘একলা থাকার’ ওই নিষ্ঠুর দাবি শোনা মাত্রই মৌ’য়ের চোখের বাঁধ ভেঙে গেল। তার দু-চোখ বেয়ে অজস্র অশ্রুধারা গাল বেয়ে টপটপ করে নিচে গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে এক পা এগিয়ে এসে উজানে’র শার্টের বুকটা খামচে ধরে অত্যন্ত ব্যাকুল ও কাঁদতে কাঁদতে ডুকরে উঠল। “কিন্তু আমার যে আপনাকে চাই-ই চাই প্রফেসর সাহেব। শুধুই আপনাকে চাই আমার এই জীবনে। আমি সারাজীবন আপনার ওই শক্ত বুকটার আলিঙ্গনে আবদ্ধ থেকে…..
