অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৩ (২)
তোনিমা খান
– শুনেছি কানাডা যাচ্ছো?
রাত একটার সময় ঘুমের ঘোরে কারোর এহেন প্রশ্নে রোজের মস্তিষ্ক সচল হলো। সে বদ্ধ নেত্র খুলে ফোনের স্ক্রিনে তাকাল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে তৃশানের নামটি। সে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে আবার বালিশে মুখ ডুবিয়ে দিল। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,
– বাহ, আপনি তো আমার বেশ খবর রাখেন!
-আমি তোমার কোন খবর আমি রাখি না সেটা বলতে পারো?
তৃশানের কণ্ঠে অবসাদ। এই অবসাদ চেনাজানা অনুভূতিকে বারংবার জানতে চাওয়ার।
– আর এগুলো কেন?
– মন-মস্তিষ্ক, ভাবনা সবটা জুড়ে যেই মানুষটা আছে তার খবরাখবর রাখতেও সুখ সুখ অনুভব হয়।
রোজ বদ্ধ নেত্রে হেসে উঠল। বলল,
– তো এত মাস পর আপনার মনে পড়েছে আপনার মন মস্তিষ্কে জুড়ে থাকা মানুষটির কথা? ভারী অদ্ভুত!
রোজের কণ্ঠে তাচ্ছিল্যের আভাস। তৃশান ম্লান হেসে বলল,
– নিজেকে যাচাই করছিলাম।
– কী পেলেন?
– ভালোবাসা আর ভুলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক দিকভ্রান্ত পথিককে খুঁজে পেলাম।
– দিকভ্রান্ত পথিকটি কী এখনো সঠিক পথ খুঁজে পায়নি?
-পেয়েছে।
-সেই সঠিক পথটি তবে কী?
-রোজ সিকদার।
রোজ সজোরে চোখ মেলে তাকাল। আঁধারে দৃষ্টি রেখে জিজ্ঞেস করল,
– ভালোবাসা না-কি ভুল?
– ভালোবাসা।
– এমনটা কেন মনে হলো?
– বিগত কয়েক মাস যাবৎ আমি হন্যে হয়ে ভালোবাসার আসল সংজ্ঞা খুঁজেছি। কিন্তু প্রতিবার জবাবে আমি শুধু একটা নাম পেয়েছি। আর সেটা হলো ‘রোজ সিকদার’।
-আর পূর্বে যেটা ছিল?
-ভুল। যেটা আমায় প্রতিনিয়ত লজ্জিত করে। অস্থিরতায় আমার ঘুম কেড়ে নেয়। শান্তি কেড়ে নেয়, নিজের চোখে চোখ রাখার ক্ষমতা কেড়ে নেয় সেটা কখনোই ভালোবাসা হতে পারে না রোজ।
তৃশানের কণ্ঠে স্পষ্ট যন্ত্রণার আভাস। সেই ভুলের যন্ত্রণা যা আজো তাকে লজ্জিত করে। রোজের ওষ্ঠকোনা আলতো বেঁকে যায়।
পুনশ্চ কর্নকুহরে আন্দোলিত হয় তৃশানের অমোঘ কিছু প্রেমময় বানী।
-তুমি ভালোবাসা চেয়েছিলে রোজ। আমার কাছে ভালোবাসার সংজ্ঞা মানেই রোজ সিকদার। ফিউচার ওয়াইফ মানে ‘রোজ সিকদার’। আমার বাচ্চাদের মা মানে ‘রোজ সিকদার’। বৃদ্ধ বয়সে হাতে হাত ধরে হাঁটার সঙ্গী মানে ‘রোজ সিকদার’।
এটা ব্যতীত আমি আর কোনো ভালোবাসা বুঝি না, রোজ। কিন্তু তোমার কাছে ভালোবাসা মানে কী আমি জানি না।
তৃশান এক নাগাড়ে বলে থামল। অপেক্ষা করল অপরপ্রান্তে থাকা নারীটির জবাবের। কিন্তু নির্দয় নারীটি তার ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছে। সে পুনরায় ডাকল,
-রোজ?
-হু।
-তুমি জবাব দাওনি।
রোজ আঁধার পানে একদৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
-কানাডা থেকে আসার পর বাবা মাকে সম্বন্ধ নিয়ে বাড়িতে পাঠাবেন।
ঠিক এতটুকু জবাব আসতেই ফোনটা কেটে গেল। আশ্চর্য, অবিশ্বাস্য, হতবিহ্বল তৃশান বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কিয়ৎকাল কেটে গেল নতুন এই অনুভূতি অনুভব করতেই। যখন ঘোর কাটল তখন দ্রুত আবার ফোন দিল রোজকে। লাগাতার ফোন বাজতেই রোজ রেগেমেগে রিসিভার কানে ঠেকালো,
-কী সমস্যা? জবাব দিয়েছি না? রাত একটা বাজে, ঘুমাচ্ছি আমি।
তৃশান হন্তদন্ত হয়ে বলল,
-কানাডা যেতে তো এখনো দু’দিন।
-তো?
-আমি বরং মামনি আর পাপাকে আগামীকাল পাঠাই।
-আমি আপনাকে সামনে পেলে মাথায় একটা বারি মারতাম এভাবে আমার কাঁচা ঘুম নষ্ট করার জন্য। ঘুমানোর সময় বিরক্ত করা আমার একদম অপছন্দ!
বলেই রোজ ফোনটা কেটে দিল। এই ক’মাসে বুকের ভেতরে জমা কষ্টগুলো এক নিমিষেই হারিয়ে গিয়েছে। বুক জুড়ে অজস্র রঙিন প্রজাপতির আনাগোনা। প্রিয়জনকে নিজের করে পেয়ে যাওয়ার অবর্ণনীয় সুখকে আগলে নিয়ে কখন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল খেয়ালই হলো না। অথচ বিগত মাসগুলো কত ছটফট করেছে শুধু এই একটা ফোনের জন্য। অবশেষে লোকটা ভালোবাসার আসল সংজ্ঞা খুঁজে পেল।
রোজের ঘুম লম্বা হলো। যেন সে বিগত মাসগুলোর ঘুম একবারে পুষিয়ে নিয়েছে। ঘুম থেকে উঠতেই অন্তঃস্থলে পুনরায় রঙিন প্রজাপতিরা ডানা মেলতে লাগল। সে ফ্রেশ হয়ে মৃদু গুনগুনিয়ে নাচতে নাচতে রুম থেকে বের হলো।
তাদের সিঁড়িটি একদম লিভিং রুমের মাঝ বরাবর। রোজ মনের আনন্দে নাচতে নাচতে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে নিদারুণ উল্লাসের সাথে হাঁক ছেড়ে বলল,
– বড় ভাবিজান? তানশান? তোমরা কী কোল্ড কফি খাবে? আমি বানাব এখন।
কিন্তু হঠাৎ করেই রোজের কণ্ঠ আঁটকে গেল নিচের সিঁড়িতে নামতেই। রোজ হতভম্ব হয়ে তাকালো সিঁড়ির ঠিক বাম পাশে থাকা এল সাইজের সোফায় বসা তিনটি অনাকাঙ্ক্ষিত মুখপানে। তৃশান হাঁ করে তাকিয়ে রইল রোজের আপাদমস্তক। হতভম্ব রোজ তৎক্ষণাৎ নিজের পানে তাকায়। পড়নের ফতুয়া আর পায়জামাটি লক্ষ হতেই সে আচমকা উরাধুরা ছুট লাগায় উল্টোদিকে।
নির্জনা বেগমের ইচ্ছে হলো রোজের কান ফাটিয়ে দিতে। কতবার বলেছে এই পোশাক পরে নিচে না নামতে। বসার থেকে অনতিদূরে খাবার ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা তানশান আর রূপকথার গম্ভীর মুখশ্রী ভেদ করে না চাইতেও ফিক করে হাসি বেরিয়ে আসে।
তামজিদ জোবায়েদ আর মৈতি শব্দ করে হেসে উঠলেন রোজের দৌড় দেখে। তপোবন জড়তা নিয়ে বলল,
– লজ্জা পেয়েছে হয়ত।
তকদির সিকদার ও সৌজন্য হাসলেন। তামজিদ জোবায়েদ হাসতে হাসতে বললেন,
– রোজ এখনো আগের মতোই চঞ্চল আর প্রাণবন্ত রয়েছে, ভাইজান। আমার ঘরে এমন একটা মেয়ের খুব প্রয়োজন। এই বুড়ো বুড়ি আর ছেলে তো সবসময় বাইরেই থাকে। বাড়িটা একদম শূন্য লাগে। আপনি যদি রাজি হতেন তবে আমার ঘরেও একটা পরীর মতো মেয়ে থাকত ভাইজান।
তৃশান সম্প্রতি একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জব পেয়েছে। আপনারা ওর একাডেমিক পারফরম্যান্স সম্পর্কে জানেন। প্রতিটা বোর্ড এক্সামে বোর্ড স্ট্যান্ড করেছে।
নির্জনা বেগম আর তকদির সিকদার তপোবনের দিকে তাকালো। তপোবন তাকিয়ে আছে ফোনে থাকা মেসেজটির দিকে।
তৃশান নামক আইডি থেকে ছোট্ট একটি মেসেজ।
– যেটা হয়েছে সেটা একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল ছিল ভাইজান। আমি তার জন্য আপনার কাছে লজ্জিত। কিন্তু রোজের প্রতি ভালোবাসা আমার কোনো ভুল কিংবা রাগের অংশ নয়। আমরা দু’জন অতীত জেনে দুজনকে যথেষ্ট পর্যবেক্ষণ করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আশাকরি আপনি কোনো হঠকারিতা মূলক সিদ্ধান্ত নেবেন না— যা আমার আর রোজের একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে নষ্ট করে দেবে।
তপোবন মুখ তুলে এক পলক দেখল তৃশানকে। অতঃপর বয়স্কদের উদ্দেশ্যে বলল,
– আমি একটু রোজের সাথে কথা বলে আসছি।
নির্জনা বেগমের তৃশান আর রূপকথার অতীতের কারণে আপত্তি থাকলেও তৃশান এসেই আগে সেই ভুলের জন্য মাফ চেয়েছে। এটাও বলেছে এই সম্পর্কে রোজের পূর্ণ সম্মতি রয়েছে। ঠিক এই জায়গাটায় তকদির সিকদার কথার জোর হারিয়ে ফেললেন। তিনি কখনোই মেয়ের উপর জোরজবরদস্তি করে কিছু চাপিয়ে দেননি। যা চেয়েছে তাই দিয়েছেন। জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সে এই ভুল করবেন না। রোজ যেটা চাইবে সেটাই হবে।
তপোবন বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে বোনের বারান্দায়। রোজ আলুথালু বেশে কাঁচুমাচু করে যাচ্ছে ভাইয়ের শানিত দৃষ্টি দেখে। তপোবন গলা খাঁকারি দিল। মিহি স্বরে জিজ্ঞেস করল,
– তৃশানের সাথে তোমার কেমন সম্পর্ক?
– কোনো সম্পর্ক নেই ভাইজান।
রোজ তড়িঘড়ি করে বলল। তপোবন গম্ভীর মুখে চাইল। রোজ বোকাসোকা কণ্ঠে বলল,
– তুমি যেমনটা ভাবছ তেমনকিছুই নেই ভাইজান। আমার তার সাথে জাস্ট কয়েক মাস পরে দুই একবার কথা হয়।
– সেটাই, কেন কথা হয়।
রোজ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
– সে আমায় ভালোবাসে।
– আর এটা তুমি কী করে বুঝলে তার ভালোবাসা সত্যি? যেখানে কিছুদিন আগেই একটা বিশ্রী ঘটনা ঘটেছে।
-ওই বিশ্রী ঘটনার জন্যই সে বদলে গিয়েছে, ভাইজান। সে লজ্জিত নিজের কাজে। সে জানত না ভাবির বিষয়ে তাই ভুল হয়ে গিয়েছে। যখন জেনেছে নিজেকে পুরোপুরি শুধরে নিয়েছে। সে ওই ভুল থেকে বের হতেই আমায় অনেক আগেই প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি। বলেছিলাম যেদিন সে আমার প্রতি ভালোবাসা অনুভব করবে সেদিন ই যেন বাড়িতে প্রস্তাব পাঠায়।
তপোবন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আড়ালে তবে অনেককিছুই এগিয়ে গিয়েছে। আর কিছু অবশিষ্ট নেই। তাই সে জিজ্ঞেস করল,
-তুমি মন থেকে রাজি এই প্রস্তাবে? কোনো প্রকার প্রেশার ক্রিয়েট করা হচ্ছে না তো?
রোজ নত শিরে থেকেই না বোধক মাথা নাড়ল। তপোবন আর কথা বাড়াল না। বোনের মাথায় হাত রেখে বলল,
-আশাকরি বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নিয়েছ। কিন্তু জীবনে কখনোই যদি মনে হয় তোমার সিদ্ধান্ত ভুল সাথে সাথে ভাইজানকে বলবে। ভাইজান সবসময় তোমার সাথে আছি।
রোজ স্মিত হাসল ভাইয়ের কথায়। সে জানে, তৃশান তার সিদ্ধান্ত কখনোই ভুল প্রমাণিত হতে দেবে না।
এরপর একটা দীর্ঘ আলাপচারিতায় তকদির সিকদার আর তামজিদ জোবায়েদ সিদ্ধান্ত নিলেন, এখন আপাতত আংটি পরিয়ে রেখে যাবে। কানাডা থেকে আসার পরে আকদ হবে। আর তকদির সিকদারের ছোট ছেলে যখন দেশে আসবে তখন আনুষ্ঠানিকভাবে রোজকে উঠিয়ে নেয়া হবে।
একটা নরমাল কূর্তিতেই রোজকে আংটি পরানো হলো। এই পুরো সময়টাতে রূপকথা আর তানশান আপ্যায়ন করেছে তাদের। রূপকথাকে বাধ্যতামূলক সকলের সাথে দেখা করতে হলো। তৃশান একবারের জন্যও মাথা তোলেনি। কিন্তু এরপরেও সেই সময়টাতে তানশান একটুও মায়ের হাত ছাড়েনি। মূলত তৃশান বাড়িতে আসার পর থেকেই সে মায়ের পিছু ছাড়েনি।
রূপকথা রান্নাঘরে ঢুকে মাথায় কাপড় ফেলে দিতেই দেখল তানশান ও বেড়ালের ন্যায় তার পিছে পিছে ঢুকছে। রূপকথা এবার খিলখিলিয়ে হেসে উঠে বলল,
-এই ছেলে, তুমি আমার পিছু পিছু ঘুরছ কেন?
তানশান ছোটমুখ করে চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,
-আই ডোন্ট লাইক তৃশান চাচু।
রূপকথা স্ফিত মৃদু হাতে পেট আঁকড়ে ধরে এগিয়ে এসে ছেলেটির মাথা এলোমেলো করে দিয়ে বলল,
-সে এখন তোমার ফুপা। তাকে সম্মান করবে। সে যখন আমাদের কোনো ক্ষতি করছে না, আমরাও তার কোনো ক্ষতি করব না। তোমার ফুপির ভালো থাকা জুড়ে আছে তার সাথে ঠিক আছে? মিমির কথা শুনবে?
তানশান মাথা নেড়ে বলল,
-শুনব।
তাদের কথার মাঝেই রোজ হন্তদন্ত হয়ে রান্নাঘরে ঢুকল। রেগেমেগে তানশানকে বলল,
-এই ছেলে, এমনি সময় তো পত্রিকা ওয়ালা আসলেও ফুপি ফুপি বলে পাড়া মাতিয়ে তোলো। আর আজ তোমার গলা থেকে কোনো আওয়াজ বের হয়নি তাই না? যখন দেখলে আমি হাঁক ছেড়ে তোমাদের ডাকছি তোমরা বলবে না ঘরে অতিথি এসেছে?
তানশান কপাল কুঁচকে বলল,
-তুমিও তো কখনো এমন নাচতে নাচতে নিচে নামো না। তবে আমি কীভাবে জানব যে আজ তুমি নাচতে নাচতে নিচে নামবে? আমি কী জ্যোতিষী যে আমি আগে থেকেই জানব আজ আমার ফুপির মনে লাড্ডু ফুটেছে?
-তানশানের বাচ্চা মুখ সামলে কথা বলো। আমার মনে কোনো লাড্ডু ফোটেনি।
রোজ তেতে উঠে তানশানের চুল টেনে ধরল। রূপকথা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল তাদের ঝগড়া দেখে। রোজ ঝগড়া থামিয়ে তাকায় রূপকথার পানে। মিহি স্বরে বলে,
-তুমি কী আমার উপর রেগে আছো ভাবি?
-নাহ কেন?
-আমি তৃশানকে বিয়ে করছি দেখে?
-আমায় লজ্জা দিও না, আপু। তার সাথে আমার কোনো লেনা দেনা কখনোই ছিল না আপু। ওটা আম্মার একটা ভুল বোঝাবুঝি ছিল। আর কিছুই না। আমি তোমার জন্য ভীষণ খুশি।
রূপকথা হাসিমুখে বলল। রোজ ম্লান হেসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
কারাগারের লোহার শিকের এইপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ইমরোজ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ঘৃণাভরা মুখপানে। তার চোখে বিস্ময়, আফসোস আর না বলা সহস্র অভিযোগ।
মেঝেতে কুঁকড়ে বসে যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা এই মেয়েটিই তার জীবনসঙ্গিনী ছিল! যার মোহে সে পুরো দুনিয়াকে তুচ্ছ করেছিল, আজ সেই মেয়েটির কারণে সে নিঃস্ব।
মানুষ যাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়, সেই মানুষটিই কেন তাকে সবচেয়ে বড় অবহেলা উপহার দেয়? এই অমীমাংসিত প্রশ্নটি মনে নিয়ে সে প্রতিবারের মতো আজও জিজ্ঞেস করল,
– আমার সাথে এমনটা কেন করলে, সৃজা?
শারীরিক নির্যাতনে বিধ্বস্ত সৃজা এবার ধৈর্য হারিয়ে চিৎকার করে উঠল,
– তুই একটা মা**! তুই কী ভেবেছিলি আমি মৌনতার মতো দুঃখ কষ্ট সহ্য করে তোর ঘরে বসে দিনরাত খাটব আর তোর সেবা করব? আমি সৃজা যে কখনো রান্না করিনি, তোর ঘরে আমি তাও করেছি। এটাই তোর সৌভাগ্য! আবার জিজ্ঞেস করছিস কেন এমনটা করেছি? তুই তো এটারই যোগ্য! তোর না আছে বুদ্ধি, না আছে ব্যক্তিত্ব, আর না আছে রুচিবোধ। তোর সাথে আটটা মাস কাটিয়েছি, এর জন্যই তোর শুকরিয়া করা উচিত।
ইমরোজ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আজ সেই চিরচেনা প্রেমময় ‘তুমি’ সম্বোধনটুকুও ‘তুই’ তে রূপান্তরিত হয়েছে। সে অস্ফুট স্বরে বলল,
– এত ঘৃণা? আমাদের দেড় বছরের প্রেম, আট মাসের সংসার। সবই কি তোমার কাছে মূল্যহীন ছিল সৃজা? একবারও কি ভালোবাসোনি? এত বড় ক্ষতি কী করে করলে?
– এসব ভালোবাসা টালোবাসা আমার দ্বারা হয় না। আর তোর মতো মা* কে তো কোনোদিন না। আমার লেনা দেনা শুধু টাকার সাথে। ভালোবাসতে হয় সুপুরুষকে। তুই একটা কাপুরুষ। যে ঘরে বউ বাচ্চা রেখে আমার সাথে শুতে পারে সে কোনোদিন ভালোবাসার যোগ্য না।
সবটা টাকার জন্য ছিল? ইমরোজ বিধুর নয়নে চেয়ে বলল,
– অথচ আমি তোমার ভালোবাসার টানেই আমার স্ত্রী সন্তান ছেড়ে দিয়েছিলাম সৃজা। তোমার সাথে একটা সুখী সংসার জীবন শুরু করতে চেয়েছিলাম।
সহসা সৃজা দূর্বল বদনে হেসে উঠল। যেন সে কোনো মজার জোকস শুনেছে। সে হাসতে হাসতে বলল,
– সত্যি? তোর প্রতিটা রগ আমি চিনি। তুই কী বুঝিস আমি তোর মতো গাধা? আমি দেড় বছরে কতবার অনুরোধ করেছিলাম মৌনতাকে ডিভোর্স দেয়ার জন্য, কিন্তু তুই কখনো দিসনি। তুই তো ঘরে বাইরে মজা নিচ্ছিলি। ঘরে আদর্শ বউ আর বাইরে প্রেমিকা। বাহ কেয়া জিন্দেগি! আর যখন দেখলি ঘরের বউ মরণব্যধীতে আক্রান্ত, তাকে দিয়ে আর কাজ হবে না; তখুনি তুই তাকে ছেড়ে আমায় বিয়ে করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলি। কী ঠিক বলছি না?
ইমরোজ শুকনো ঢোক গিলল সৃজার কথায় শতভাগ সত্যতার আভাসে। হ্যাঁ, সে কোনোদিন মৌনতাকে ছাড়তে চায়নি। সে মৌনতার পতিভক্তি, সেবা, ভালোবাসার প্রতি আকৃষ্ট ছিল। মৌনতা যত অসুস্থ থাকুক না কেন কখনোই তার আহ্বানে নাকচ করত না। কখনো তাকে অখুশি করত না। তবে এটাও সত্য সে সৃজাকেও ভালোবাসত। কিন্তু দুই নৌকায় পা দিয়ে যে বেশিদিন চলা যায় না।
লোভ! এই একটি নিকৃষ্ট শব্দ সৃজা ও ইমরোজ উভয়কেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইমরোজ আর একটা শব্দ বলার মতো ক্ষমতা জোগাতে পারল না। সে বেরিয়ে গেল থানা থেকে।আজ আড়াই মাস। অথচ সে এখনো ঢাকার বিভিন্ন থানায় ছোটাছুটি করছে নিজের টাকা উদ্ধার করার জন্য। কিন্তু কোনো উপায় হচ্ছে না। জমানো কিছু টাকা অবশিষ্ট ছিল তাও শেষের পথে। থাকার মতো জায়গা বলতে নিজের করা এক তলা একটি অফিস। সারাজীবন আভিজাত্যের মাঝে বড় হওয়ায় পুরুষটি কারোর কাছে গিয়ে চাকরির জন্য দাঁড়াতে পারে না লজ্জায়। পুরো খুলনায় ছড়িয়ে পড়েছে তার কাহিনী। সবাই থুতু দিচ্ছে আর মজা নিচ্ছে।
ব্যর্থতার ভারী বোঝা কাঁধে নিয়ে ইমরোজ ফুটপাতে হাঁটতে লাগল। চোখের পাতায় ভাসছে দুই নারীর তফাৎ। এক নারী যে কি-না ছয় বছরের সংসার জীবনে তার থেকে ভালোবাসা আর সম্মান ব্যতীত কিচ্ছু চায়নি। আর এক নারী যে কি-না দুই বছর তার সাথে ভালোবাসার অভিনয় করার বিনিময়ে তার গোটা জীবনের অর্জিত সম্পত্তি, পরিবার, সম্মান, ব্যক্তিত্ব, মাথার উপর ছায়া সব কেড়ে নিয়েছে।
হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ আকাশের বুক চিরে বৃষ্টি নামল। পথিকরা আশ্রয়ের খোঁজে ছুটলেও ইমরোজের মাঝে কোনো তাড়না নেই। আজ যেন এই প্রবল বৃষ্টিও তার ভেতরের দহনকে প্রশমিত করতে পারছে না। তার চেহারা বসে গেছে, চোখের নিচে গাঢ় কালি। আজ সে নিঃস্ব। তার পরিবার নেই, বন্ধু নেই, তার খোঁজ নেওয়ার মতো এই বিশাল পৃথিবীতে কেউ নেই। তার কেউ নেই, তার কেউ নেই…
আর্তনাদ চেপে রাখতে না পেরে সে হঠাৎ ফুটপাতে হাঁটু গেড়ে মাথা নুইয়ে বসে পড়ল। আর্তনাদের সুরে বলে উঠল
– কেন নেই?
বলেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল পুরুষটি। বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে গেল তার করুণ বিলাপ।
– আমার কেউ নেই! কেন নেই? জগতের সবার সব আছে, শুধু আমি একা কেন? আমার তো ভরা সংসার ছিল, মৌনতা ছিল, নায়েল ছিল। তারা তো আমাকে ভালোবাসত! আমরা তো খুব সুখে ছিলাম। তাদের জন্য তো আমি সবকিছু ছিলাম। আমার জন্য তারা পাগল ছিল তবে তারা আজ কোথায়? তারা কেন আমার একটু খোঁজ নেয়না? আমি কী খুব বড় অপরাধ করে ফেলেছি? আমায় ক্ষমা করা যায় না? আম্মা আব্বু, ভাইজান, রোজের কী একটুও মনে পড়ে না আমার কথা?
সুখ, জৌলুশে পরিপূর্ণ ধরণীতে রিক্ত ইমরোজ আজ বুক ফাটা আর্তনাদ করছে রাস্তায় বসে। কিন্তু শোনার মতো কেউ নেই। ইমরোজ হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে অনুনয় করে বলল,
– হে আল্লাহ প্লীজ আমায় রাস্তা দেখাও। আমার যে খুব কষ্ট হচ্ছে। নায়েল! প্লীজ পাপার কাছে চলে এসো। পাপা কখনো তোমাকে আর তোমার মাম্মাকে কষ্ট দেব না নায়েল। আল্লাহ প্লীজ আমায় আমার আগের জীবন ফিরিয়ে দাও। আমি সৃজার মোহে পড়ে পাপ করেছি। আমি ক্ষমা চাইছি তোমার কাছে। কেউ মন থেকে ক্ষমা চাইলে তো তুমি কখনো ফিরিয়ে দাও না। আমায় ফিরিয়ে দিও না। আমায় আমার পরিবার ফিরিয়ে দাও আমি তাদের সারাজীবন আগলে রাখব।
বৃষ্টির করতালিতে মুখরিত ধরণীও বোধহয় আজ ধিক্কার জানালো ইমরোজের আর্তনাদে। অজস্রবার সুযোগ দেয়ার পরেও অজস্র পাপ করার পরে বান্দা যখন আল্লাহর সহানুভূতিকে পুঁজি করে ক্ষমা চায় তখন কি-ই বা বলার থাকে! নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহ তায়ালা ক্ষমার ক্ষেত্রে দয়ালু। তিনি কাকে কখন ক্ষমা করবেন সেটা কেউ কল্পনাও করতে পারে না।
বহুক্ষণ কান্নার পর তার ভেতরের বিষাদ কিছুটা হালকা হলো। প্রচণ্ড জ্বর আর ভেজা শরীর নিয়ে সে টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল।
– আমাকে আব্বুর কাছে যেতে হবে। মৌনতা যেমনি থাকুক না কেন আমি তাকে আবার গ্রহণ করতে চাই। তারা আমার পরিবার ছিল, আমার জন্য তারা পাগল ছিল। তারা কখনোই আমায় ফিরিয়ে দেবে না। আমি দরকার হলে মৌনতার পায়ে পড়ে ক্ষমা চাইব। তবুও আমি আমার পরিবারকে ফিরে চাই।
টালমাটাল পায়ে ইমরোজ উন্মাদের মতো ছুটতে লাগল তার ছুটে যাওয়া সুখ আবার আঁকড়ে ধরতে। কিন্তু সে কী জানে তারা অচিরেই কারোর সুখ হয়ে গিয়েছে? ভাগ্যের কী নির্মম পরিণতি! একদিন স্বামী নামক ভ্রমের পেছনে মৌনতা তার জীবন, যৌবন খুইয়ে ছুটেছে আর আজ স্বামী নামক মানুষটা তার পেছনে ছুটছে! মানুষ কেন সঠিক সময়ে সঠিক বোধটি উপলব্ধি করতে পারে না?
পরদিন সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ তকদির সিকদার, তপোবন আর তানশান নামাজ শেষে হাঁটাহাঁটি করে বাড়ি ফিরল। গেট দিয়ে ঢোকার পথে কিছুটা দূরে মেইন রোডে শোরগোল দেখে তপোবন আর তকদির সিকদার এগিয়ে গেল সেদিকে। যেতে যেতে তানশানকে বলল,
– বাসায় যাও, আব্বু। আমরা আসছি।
তানশান নীরবে চলে গেল বাড়ির ভেতরে। তকদির সিকদার আর তপোবন মেইন রোডে যেতেই আশ্চর্য হয়ে গেল রোডের পাশে অচেতন ইমরোজকে পড়ে থাকতে দেখে। লোকজন ঘিরে রেখেছে তাকে। তাকদির সিকদার আর তপোবন পেছনকার ভুলের দোহাই দিয়ে তাকে ওভাবে ফেলে রাখতে পারল না। তারা তৎক্ষণাৎ অচেতন দেহটি আঁকড়ে ধরল। প্রচন্ড উত্তাপে গা পুড়ছে। তকদির সিকদার উদ্বিগ্ন কণ্ঠে চারিপাশের লোকদের জিজ্ঞেস করলেন,
– ওর কী হয়েছে? ও এখানে এভাবে কী করছে?
একজন রিকশা চালক বললেন,
– একটু আগে একটা বাসের কন্ডাক্টর ওনাকে এখানে নামিয়ে দিয়ে গেল। অজ্ঞান হওয়ার আগে নাকি এই জায়গার নাম বলেছিল। আপনাদের কিছু হয় নাকি? আমরা আরো খুঁজতে যেতে চাইছিলাম পরিবারের লোকজন।
তকদির সিকদার আর তপোবন জবাব দিল না। তপোবন ঠোঁট কামড়ে ছেলেটির জীর্ণশীর্ণ বদন দেখে বাবাকে সতর্ক কণ্ঠে বলল,
– আব্বু, এভাবে রাখা ঠিক হবে না। শরীরের অবস্থা অনেক খারাপ। বাড়িতে নিয়ে চলো। হাত পা কালো হয়ে পড়ছে।
তকদির সিকদার শাসন করতে জানলেও পাষণ্ডতা করতে পারলেন না। দিনশেষে ছেলেটির জন্মদাতা তিনি। তারা বাড়িতে নিয়ে এলো ইমরোজকে।
নির্জনা বেগম আতঁকে উঠলেন আজ এত গুলো মাস পর ছেলের এমন শোচনীয় দশায়।
– ওর কী হয়েছে তপোবন? ওর চোখমুখের এমন দশা কেন?
তপোবন ইমরোজকে গেস্ট রুমে রাখল। বলল,
– জানিনা আম্মা। জ্বরে অচেতন হয়ে রাস্তার মোড়ে পড়ে ছিল। তাই আব্বু আর আমি নিয়ে এলাম। এভাবে বেশিক্ষণ ফেলে রাখলে মরে যাবে।
– তপোবন!
নির্জনা বেগম আর্তনাদ করে উঠলেন। তপোবনের মুখাবয়ব কঠিন। সে ডাক্তারকে ফোন দিল। নির্জনা বেগম দ্রুত ইমরোজের গা হাত পা ছুঁয়ে দেখে জলপট্টি দিতে লাগলেন। তকদির সিকদার থমথমে মুখে রুমে ঢুকলেন। তাচ্ছিল্য হেসে বললেন,
– দেখেছ নির্জনা, কর্মের ফল কাকে বলে? বাবা মা সন্তানের জন্য যা করেন ভালোর জন্য করেন। কিন্তু এই ছোট্ট বাক্যটুকু বোঝার ক্ষমতা সবার থাকে না। নির্বোধ ছেলে! আমি কখনোই আমার সন্তানদের উপর ওই ব্যাভিচারিনীর ছায়া পড়তে দেইনি। কিন্তু ও ঠিকই ওর মায়ের গুণ নিজের মধ্যে লালন করত। আজ তার করুণ পরিণতি দেখো। বাগেরহাটের এমপির ছেলে আজ রাস্তায় পড়ে ছিল।
তাকদির সিকদারের কণ্ঠে এহেন তুচ্ছতাচ্ছিল্যে নির্জনা বেগম প্রতিবাদ করলেন তৎক্ষণাৎ,
-এই অবস্থায় আপনার ঘৃণা প্রকাশ করা কি খুব প্রয়োজন? ও ভুল করেছে, শাস্তিও পাচ্ছে। এখন ও মরে যাক—এটাই কি আপনি চান? তাহলে আপনিও তো ওর মতো খারাপই হয়ে গেলেন।
তকদির সিকদার চোয়াল শক্ত করে বললেন,
– তুমি জানো আমি চরিত্রহীন ব্যক্তি সহ্য করতে পারি না, নির্জনা। তাই ওকেও সহ্য করতে পারছি না। এদের কোনো শাস্তিই আমার শাস্তি মনে হয় না। তাড়াতাড়ি ওকে সুস্থ করো এরপর বিদায় করো।
নির্জনা বেগম অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকালেন। তিনি এই ছেলেগুলোর প্রতি একটু বেশিই নরম। ওদের একটুও দুঃখ দেখতে পারে না। অনুনয় করে বললেন,
– সন্তানরা ভুল করবে রোজের আব্বু। কিন্তু তাই বলে বাবা মাও ভুল করবে? অনেক হয়েছে। ও যথেষ্ট শাস্তি পাচ্ছে আপনি অন্তত ওকে এই অবস্থায় ঘৃণা করা বন্ধ করুন। এটা ওর ও বাবার বাড়ি। ও থাকুক এখানে। আপনি আমি ছাড়া ওর দেখাশোনা করার জন্য তো কেউ নেই এই পৃথিবীতে।
সহসা হতবিহ্বল তকদির সিকদার গর্জে উঠলেন,
– তুমি কী বেশিই দয়ালু হচ্ছো না নির্জনা বেগম? ও আমার সাজানো গোছানো পরিবারটা ধ্বংস করে দিয়েছে। মৌনতাকে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছে, আমার নায়েলের জীবন নষ্ট করে দিয়েছে। এরপর ও তুমি বলছ আমি ঘৃণা করা বন্ধ করব? মোটেও না। আমি এত দয়ালু নই যে একটা চরিত্রহীন ব্যক্তিকে জাস্টিফাই করব। ওকে কোনোরকম সুস্থ করে বিদায় করবে। আমার কথার একটুও নড়চড় হয় না যেন!
বলেই সে গটগট করে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে। নির্জনা বেগম অশ্রুসিক্ত নয়নে ছেলেটিকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখলেন। সেই আগের সুঠামদেহী সুশ্রী গড়নের ইমরোজ আর নেই। তিনি নীরবে কাঁদলেন। ঠিক এমন পরিণতির আভাস করেই তিনি শুরু থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন যেন ইমরোজকে খারাপ পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে। কিন্তু কর্ম আমাদের কখনোই পিছু ছাড়ে না।
তপোবন ডাক্তার নিয়ে আসল। ডাক্তার দেখে বললেন, শরীরের অবস্থা সংকটাপন্ন। হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।
তপোবন আর নির্জনা বেগম দেরি করল না। তারা হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
বের হওয়ার আগে তপোবন নিজের ঘরে উঁকি দিল। মেয়েটি নেই। রান্নাঘরে গেল, সেখানেও নেই। অবশেষে ছেলের ঘরে এসে পেল রূপকথাকে। মা বিছানায় শুয়ে শুয়ে ড্রাই ফ্রুটস খাচ্ছে আর ছেলে মায়ের পড়া নিচ্ছে।
তপোবন ম্লান হাসল। যত দিন যাচ্ছে রূপকথার চলাফেরা ততই দুঃসহনীয় হয়ে উঠছে। গর্ভাবস্থার প্রায় সাড়ে আট মাসের বেশি সময় চলছে। সাধারণ অন্তঃসত্ত্বা নারীদের থেকে দ্বিগুণ ভারী পেট নিয়ে চলাফেরা করা তার জন্য দুস্কর হয়ে উঠছে। সারারাত ছটফট করে। তার উপর আগামী মাসে তার টেস্ট এক্সাম। মেয়েটি আরো এক বছর গ্যাপ দিতে নারাজ। পরীক্ষার পরেই ডেলিভারির ডেট। এর মধ্যে তাদের আবার কানাডায় যেতে হবে।
এরোজের একটাই আবদার ছিল পরিবারের কাছে। সে তার সুখকে সকলকে সাক্ষী রেখে নিজের করতে চায়। তার বিয়েতে তার পরিবার সবাই থাকবে। সে কোনো লুকোচুরি কিংবা একা একা বিয়ে করবে না। বরং পুরো দুনিয়াকে দেখিয়ে ধুমধাম করে বিয়ে করবে।
আজীবন শুধু দুঃখই পেয়ে যাওয়া ছেলেটির এই আবদার পূরণ করতে তপোবন আর তকদির সিকদার বাধ্য। আর তার কারণেই বিগত কয়েকমাস যাবৎ তারা কানাডায় যাওয়ার সকল প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
তপোবন ছেলেকে ডাকল,
– আব্বু!
মিমির পড়া ধরতে থাকা তানশান বাবার পানে তাকালো। ধাতস্থ কণ্ঠে বলল,
– জি পাপা।
– আজ স্কুলে যেতে হবে না। বাসায় থাকো আর মিমির খেয়াল রেখো। পাপা আর দাদুমনি একটু হাসপাতালে যাচ্ছি।
– ওকে পাপা।
তানশান আবার বইয়ে মনোযোগ দিল। রূপকথা স্বভাবসুলভ ছেলের মুখে একটা ড্রাই ফ্রুট ঢুকিয়ে দিয়ে দরজার পানে তাকালো। চোখে চোখ পড়তেই তপোবন বলল,
– আমি বাহির থেকে দুপুরের খাবার নিয়ে আসব। রান্নাঘরে ঢুকবে না।
রূপকথা ফোলা ফোলা মলিন মুখে বলল,
– হাসপাতালে কেন যাচ্ছেন? বাসায় কে এসেছে?
তপোবন চাপা স্বরে বলল,
– ইমরোজ। ও অনেক অসুস্থ। ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।
– কী হয়েছে?
– প্রচন্ড জ্বরে অচেতন হয়ে গিয়েছে।
– ওহ্।
– শরীর বেশি খারাপ লাগছে?
– নাহ।
রূপকথা আবার ছেলের দিকে মনোযোগ দিল। তপোবন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে যায়। গর্ভাবস্থার শুরুর দিকের সন্তান রাখা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হওয়ায় এখন অসুস্থ থাকলেও ইদানিং মেয়েটি বলে না। বরং দাঁতে দাঁত চেপে সব ব্যথা সহ্য করে নেয়। মাস দুই ধরে তো বাচ্চারা লাথিও দিচ্ছে। তাতে মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে হাসে আর বলে,
– তার বাচ্চারা সুস্থ আছে।
তপোবন আশ্চর্য হয় মেয়েটির ধৈর্য আর সহনশীলতা দেখে। ব্যথিত হয় কী করে একটা ছোট্ট মেয়ে সংসার, সন্তান নামক জটিল জীবনে আঁটকে গেল এই ভেবে। রূপকথার বয়সী মেয়েরা যেখানে জীবনের রঙিন সময়টা উপভোগ করে, সেখানে রূপকথাকে দেখা যায় তার ভারী দেহ সামলে ঘর সংসার সামলাতে ব্যস্ত থাকে। তার মুখে থাকে না কোনো অভিযোগ, কষ্টের ছাপ।
তপোবনের মনে হয় সে যত যাই করুক না কেন সে রূপকথার প্রাপ্য তাকে দিতে পারছে না। অথচ রূপকথা এতটুকুতেই তার প্রতি প্রাণ হারায়।
ইমরোজের জ্ঞান ফিরতে সময় লাগল। দুপুর নাগাদ তার জ্ঞান ফিরল। চোখ খুলতেই মা আর ভাইকে দেখতেই ইমরোজ অস্বাভাবিক নীরব হয়ে গেল। নির্জনা বেগম তার মাথায় হাত রাখলেন। নম্র কণ্ঠে বললেন,
– শরীর ভালো লাগছে এখন আব্বা?
‘আব্বা’ ঠিক কতদিন পর কেউ এমন আদর করে একটু ডাকল ইমরোজকে তার ইয়ত্তা নেই। মাকে একাধারে দেখতে থাকা ইমরোজ আচমকাই নীরবতা ভেঙে হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল। নির্জনা বেগম ভড়কালেন এত বড় ছেলের কান্নায়।
– কাঁদছ কেন? শরীর খারাপ লাগছে? ডাক্তার বলেছেন আর দু’দিন একটু জ্বর থাকবে এরপর ঠিক হয়ে যাবে।
ইমরোজ জবাব দিল না। কাঁদতে কাঁদতে মায়ের হাতটি টেনে গালে ঠেকালো। বহুদিন বাদ মায়ের সুগন্ধ পেয়ে বদ্ধ নেত্রে অনুভব করতে লাগল।
ইমরোজ কাঁদতে কাঁদতে বলল,
– আম্মা, কতদিন পর মাথায় তোমার হাত পেলাম। জানো, আমি মরে পড়ে থাকলেও আমার মাথায় এখন আর কেউ হাত রাখে না। আমি অনেক খারাপ মানুষ তাই না আম্মা?
নির্জনা বেগমের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল ছেলের এই জীর্ণ দশা দেখে; এমন বিধ্বস্ত ইমরোজকে তিনি আগে কখনো দেখেননি। তিনি থমথমে মুখে বললেন,
– এসব কথা এখন রাখো। তুমি অসুস্থ!
ইমরোজের কান্নার বেগ আরও বেড়ে গেল। সে মিনতি করে বলল,
– আমায় ক্ষমা করা যায় না, আম্মা? আমি কেন এত বোকা বলোতো? আমি কেন মানুষ চিনতে পারি না? সৃজা আমার সব সম্পত্তি নেয়ার জন্য আমার সাথে আড়াই বছর শুধু অভিনয় করেছে, আম্মা। আমি আমার পরিবার হারিয়েছি ওর কারণে। আমার নায়েলের সুখ ছিনিয়ে নিয়েছি।
তপোবন নির্বিকার চিত্তে ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিল। সেখানে গর্ভাবস্থার শেষ সময়ে যমজ সন্তানের মায়েদের নিরাপত্তা নিয়ে এক চিকিৎসকের পরামর্শ সে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছে। ছোট ভাইয়ের অনুশোচনা তাকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করল না। ঠিক সেই লগ্নে তকদির সিকদার কক্ষে প্রবেশ করলেন। ঢুকেই তিনি বড় ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন,
-তপোবন, বাড়িতে দুপুরের খাবার পাঠিয়েছ?
তপোবন ফোন থেকে মাথা তুলে বলল,
-“হ্যাঁ, পাঠিয়েছি। আমি কি এখন বেরোব? এখানে এত ভিড়ের প্রয়োজন নেই।
তপোবন উঠে দাঁড়াতেই ইমরোজ অশ্রুসিক্ত চোখে বড় ভাইয়ের দিকে তাকাল। আর্তকণ্ঠে ডাকল,
-ভাইজান!
এককালে এই ডাকটিতে রুক্ষতা মিশে থাকত, আজ সেখানে কেবলই আর্তি আর মায়া। ভাইকে নিরুদ্বেগ দেখে ইমরোজ পুনরায় বলল,
-ভাইজান, আমায় দয়া করে ক্ষমা করে দাও। তুমি ঠিকই বলতে, আমি ভালো-মন্দ চেনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলাম। যার কারণে আমি চিনতে পারিনি কোনটা আমার আসল ঘর আর কোনটা মরীচিকা।
তপোবন ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে ফিরে তাকাল।
– আমার ক্ষমা করা না-করায় কিছু যায় আসে না ইমরোজ। তোরা এখন অনেক বড় হয়ে গেছিস। ভাইজানকে তোদের তখনও প্রয়োজন ছিল না, এখনও নেই।
তকদির সিকদার হাত দুটি পেছনে বেঁধে গম্ভীর গলায় বললেন,
– এখানে দাঁড়িয়ে অপ্রাসঙ্গিক কথা বলার দরকার নেই তপোবন। তুমি বাড়ি যাও। বৌমা আর দাদুভাইয়ের তোমাকে এখন প্রয়োজন।
-আসছি তাহলে।
ইমরোজ বিছানা ছেড়ে উঠে বসার চেষ্টা করল। বিচলিত কণ্ঠে বলল,
-আব্বু, ভাইজান! দয়া করে দাঁড়াও, আমার কিছু কথা আছে।
-কিন্তু তোমার সাথে আমাদের কোনো কথা নেই।
আমরা তোমার মতো পাষাণ নই যে একজন অসুস্থ মানুষকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেব। তাই দয়াবশত তোমাকে হাসপাতালে এনেছি। আমাদের থেকে এর বেশি কোনো করুণা আশা কোরো না।
তকদির সিকদার শীতল কণ্ঠে বললেন।
ইমরোজ চোখ মুছে ধরা গলায় বলল,
-না, কোনো করুণা চাইছি না। শুধু একটি বিষয়ে সাহায্য করো, মৌনতা কেমন আছে?
ইমরোজের প্রশ্নে নির্জনা বেগম আর তকদির সিকদার চমকে উঠলেও তপোবন একটুও বরদাস্ত করল না। সে কঠোর স্বরে বলল,
-তা দিয়ে তোর কী কাজ? তুই ওকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে চলে গিয়েছিলি। তাই মৌনতার ব্যাপারে জানার কোনো অধিকার বা প্রয়োজন তোর আর নেই।
ইমরোজ টলটলে নেত্রে চেয়ে বলল,
– আছে ভাইজান। আমি জানি মৌনতা এখনো আমায় পাগলের মতো ভালোবাসে। আমি তাকে আর নায়েলকে ফিরে পেতে চাই। আমায় আমার পরিবার ফিরিয়ে দাও প্লীজ। আমি আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই।
– খবরদার ইমরোজ! এই নোংরা মুখে আর কোনোদিন মৌনতা আর নায়েলের নাম নিবি না। তুই কী ভেবেছিস ওরা এখনো তোর মতো বিশ্বাসঘাতক নোংরা মানুষের আশায় বসে আছে? ওরা সেইদিন ই জীবনে কয়েকধাপ এগিয়ে গিয়েছে যেদিন তুই ওদের পায়ে ঠেলে দিয়েছিলি।
তপোবনের কঠোর গলায় ইমরোজ উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
– এটা হতে পারে না, ভাইজান। আমি জানি ওরা কতটা ভালোবাসত আমায়। তোমরা কেন এমন করছ? আমার ভুলের কারণে ভেঙে যাওয়া আমার পরিবারটা আমায় ফিরিয়ে দাও প্লীজ। আমি দরকার পড়লে মৌনতার পায়ে পড়ে ক্ষমা চাইব। আমি আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। আমি পরিশ্রম করব আর মৌনতার চিকিৎসা করাব। নায়েলের কথা চিন্তা করো। একটা বাচ্চার জন্য বাবা মা আর একটা স্বাভাবিক জীবন থাকা খুব প্রয়োজন।
তকদির সিকদার হেসে উঠলেন,
– এটা তোমার এখন মনে পড়েছে যে একটা বাচ্চার জন্য তার বাবা মা আর একটা স্বাভাবিক জীবন থাকা খুব প্রয়োজন? তোমার মতো নিমকহারাম আমি দুটো দেখিনি। তোমার বউ বাচ্চা যখন তোমার কাছে ভালোবাসা ভিক্ষা চাইত তখন তুমি তাদের পায়ে ঠেলে দিয়েছ, আর এখন সব হারিয়ে এসেছ তাদের ভালোবাসা দিতে? তাদের কোনো প্রয়োজন নেই তোমার মতো জালিমের ভালোবাসার। নায়েলের বাবা মা আর স্বাভাবিক জীবন সব আছে। সে খুব সুখে আছে। তারা স্বপ্নের মতো একটা সুখী জীবনযাপন করছে। সেই জীবনে যেন আমি তোমার ছায়াও না দেখি।
অবিশ্বাস্য চাহনিতে ইমরোজ পরখ করে বাবাকে। অস্ফুট স্বরে বলে,
– নায়েলের বাবা মা আছে মানে? মৌনতা বিয়ে করে নিয়েছে?
তকদির সিকদারের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। তিনি এই কমাসে দেখেছেন তার বদলে যাওয়া ছোট ছেলের উন্মাদনা। এটাও দেখেছেন মৌনতা আর নায়েল কত সহজে এরোজের কারণে জীবনের সকল দুঃখ ভুলে সুখী হতে শিখেছে। তিনি কোনোভাবেই তাদের সুখে আঁচ লাগতে দেবেন না ইমরোজের। সে থমথমে মুখে বলল,
– হ্যাঁ।
নির্জনা বেগম চমকে তাকালো স্বামীর পানে। তকদির সিকদার চোখের ইশারায় তাকে সাবধান করে দিলেন কোনো উচ্চবাচ্য না করতে।
ইমরোজ স্তব্ধ হয়ে রইল। বিড়বিড় করে বলল,
-মৌনতা বিয়ে করেছে? কবে? কাকে? ও তো অসুস্থ ছিল!
তকদির সিকদার অত্যন্ত গর্বের সাথে বললেন,
-তাকেই করেছে— যে মৌনতার দুঃসময়ে তার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মৃত্যুর মুখে ফেলে আসা মেয়েটির মাথায় ভরসার হাত রেখেছিল। যে তোমার ফেলে দেওয়া সন্তানটিকে পিতৃস্নেহে বুকে বুকে আগলে নিয়ে বাবার আদর দিয়েছিল।
ইমরোজের বুঝতে একটু ও সময় লাগল না সেই মানুষটি কে হতে পারে! ইমরোজ অবিশ্বাস্য চাহনিতে চেয়ে অস্ফুট স্বরে আওড়ালো,
– এরোজ?
তকদির সিকদার কোনো জবাব দিলেন না সেই প্রশ্নের। গমগমে স্বরে বললেন,
-আমার মনে হয় না তোমার এই প্রশ্নের জবাব চাওয়ার কোনো অধিকার রয়েছে। তাই তোমায় আমি সাবধান করছি! তুমি বারবার কারোর জীবন নষ্ট করতে পারবে না। মৌনতা আর নায়েলের বিষয়ে একটা প্রশ্ন করার মতো অধিকার ও আর তোমার নেই। তাই ওদের জীবনে কোনোদিন কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করলে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না, ইমরোজ।
বলেই তকদির সিকদার পা বাড়াতে গেল কিন্তু ইমরোজ আচমকাই শান্তশিষ্ট রূপ ভেদ করে হারানোর যন্ত্রণায় ফেটে পড়ল। সে ছটফট করে উঠল,
-আব্বু, আমার কথা শোনো। মৌনতা এত তাড়াতাড়ি কী করে মুভ অন করতে পারে? ও আমায় খুব ভালোবাসত। আর করলেও সেটা কী এরোজ? তবে কী আমার সন্দেহটাই সঠিক? নয়তো এত সহজে কী করে ও মুভ অন করে নিলো?
প্রত্যুত্তরে তকদির সিকদার গর্জে উঠলেন,
-তোমায় আমি বারবার বলেছি মুখ সামলে কথা বলো। এখনো তোমার শিক্ষা হয়নি, হ্যাঁ? তুমি কোন সাহসে ওই মেয়েটার উপর কলঙ্ক লাগাও? ওই মেয়েটা প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে আর তার দুঃখের প্রতিটা পথে তার পাশে ছিল এরোজ। ওই ছেলেটা যে কি-না সাত বছর যাবৎ একটা মেয়েকে এক তরফা ভালোবেসে আসছে। চোখের সামনে নিজের প্রিয় মানুষকে নিজের বড় ভাইয়ের স্ত্রী হিসেবে দেখেও কখনো একটুও বেয়াদবি করেনি। কখনো কাউকে বুঝতে দেয়নি ভেতরের কষ্ট। অথচ তুমি এক নির্বোধ যে কি-না হিরা পেয়েও তাকে পায়ে পিষে গুড়িয়ে দিয়েছ। আর এরোজ সেই হিরাকে একটু একটু করে জুড়ে নিচ্ছে।
তকদির সিকদারের শেষের কথাগুলো যেন তপ্ত সীসার মতো ইমরোজের কানে গিয়ে বিঁধল। এরোজ সাত বছর ধরে মৌনতাকে ভালোবাসে? তারমানে ও মৌনতার জন্য অমন মাতাল উগ্র হয়ে গিয়েছিল? এতটুকু ইমরোজের পায়ের নিচের মাটি সরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
কিন্তু তার ভেতরের হারানোর তীব্র জ্বালা তাকে শান্ত হতে দিল না। সে অসংলগ্ন পায়ে সামনে এগিয়ে এসে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে বলল,
-আব্বু, এটা কী করে হতে পারে? এরোজ আমার ছোট ভাই হয়ে আমার স্ত্রী আর সন্তানকে নিয়ে সংসার করবে আর এটা তোমরা প্রশ্রয় দিচ্ছো? হাউ কুড ইউ ডু দিজ আব্বু?
তকদির সিকদার আর মেজাজ ধরে রাখতে পারলেন না। সে ক্ষিপ্ত কদমে এগিয়ে এসে ইমরোজের কলার চেপে ধরে বললেন,
-আমার স্ত্রী সন্তান বলে সম্বোধন করবে না ওদের। ওরা তোমার কেউ হয়না। ওদের সাথে তোমার সব সম্পর্ক লেনা দেনা চুকে গিয়েছে।
সহসা ইমরোজ ক্রোধ আর দু্ঃখে ফেটে পড়ল। সে ক্ষিপ্ত হস্তে বাবার হাত থেকে নিজের কলার ছাড়িয়ে নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
-না কোনো লেনা দেনা চুকে যায়নি। নায়েল আমার সন্তান। আমি ওর জন্মদাতা। তোমরা কখনোই ওর সাথে আমার সম্পর্ক শেষ করাতে পারবে না। আমি কখনোই আমার সন্তানকে এরোজের হাতে দেব না আব্বু। মৌনতা কোনোভাবেই এরোজকে বিয়ে করতে পারে না। আমি ওর সাথে কথা বলব।
তকদির সিকদার দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
-ওদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে অলরেডি। কিছুদিন পর অনুষ্ঠান। দূরে থাকবে ওর থেকে নয়তো তোমায় আমি উঠে দাঁড়ানোর লায়েক রাখব না।
ইমরোজের হুঁশ ফিরল। ক্রোধ ভুলে বাবার হাতটি আঁকড়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। অনুনয় করে বলল,
-আব্বু, আব্বু আমার কথা শোনো। আমি জানি মৌনতার বিয়ে হয়নি। হলে আমি জানতাম। তুমি আমার প্রতি একটু করুণা করো, আমি তো তোমার ছেলে। শত ভুল করলেও তোমার ছেলে। তুমি কী করে এক ছেলের স্ত্রী সন্তানকে আর এক ছেলের সাথে বিয়ে দিতে পারো? ওরা আমার পরিবার ছিল আব্বু। আমি নিজের দোষে হারিয়েছি যার জন্য আমি অনুতপ্ত। আমি সকল প্রায়শ্চিত্ত করতে রাজি। কিন্তু তবুও ওদের আমায় ফিরিয়ে দাও। আমি জানি তুমি চাইলে সব পারো। প্লীজ আব্বু, আমি আর কোনোদিন ওদের কষ্ট দেব না।
অজস্র অনুনয় বিনয়ের পরেও তকদির সিকদার আর তপোবন একদম নিরুদ্বেগ কঠিন অবয়বে দাঁড়িয়ে আছে। আর ইমরোজ অসহায়ত্ব, ক্ষোভে ছটফট করেই যাচ্ছে।
মৃত্যুর জন্য ধুক ধুক করতে থাকা প্রাণটিও এখন বাঁচতে চায়। ঠিক এতটুকু আকাঙ্ক্ষা যেন ক্যান্সার নামক বিধ্বংসী মরণব্যাধির উপর ভারী পড়ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে দেখা গিয়েছে, মানসিক সুখ কিংবা বাঁচার ইচ্ছা দেহে এন্ডোরফিন হরমোন নিঃসরণ করে, যা দ্রুত রিকভারিতে সাহায্য করে।
পাঁচটা কেমোর পর মৌনতার শরীর থেকে ক্যান্সার কোষের সাথে সাথে সুস্থ কোষগুলোও ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ফলে তার শারীরিক অবস্থা ক্রিটিক্যাল সাইটোপেনিয়া বা রক্তকণিকা উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
দেহের ইমিউন সিস্টেম শূন্যের কোঠায় ছিল। তন্মধ্যেই প্লাটিলেট কাউন্ট পাঁচ হাজারের নিচে নেমে যায় যার কারণে মৌনতার রক্ত বমি হয়।
দীর্ঘ বারো দিন আইসিইউতে ভেন্টিলেশনে নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্লাটিলেট ও ব্রড স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক দেয়ার পর মৌনতার দেহ অবশেষে পজিটিভ রেসপন্স করতে শুরু করে।
এক পশলা তুষারঝড় যেমন বনভূমিকে রিক্ত করে দিয়ে যায়, কেমোথেরাপির সেই ঝড়ও মৌনতাকে তেমনি এক শূন্য মরুভূমিতে পরিণত করেছিল। বারো দিন পর যখন ভেন্টিলেশন টিউবটা তার গলা থেকে বের করা হলো, তখন তার মুক্ত নিঃশ্বাসে ছিল বাঁচার অমোঘ তৃষ্ণা।
ডাক্তাররা অবলোকন করলেন, ক’দিন আগেই যার ইমিউন সিস্টেম শূন্যের কোঠায় নেমেছিল, সেই শরীরে এখন বেঁচে থাকার অদ্ভুত জেদ। শরীরের সকল সিস্টেম সচল হচ্ছে, ব্লাড কাউন্ট বাড়তে শুরু করছে, ইমিউন সিস্টেম বাড়তে শুরু করছে। ভেন্টিলেটর ছাড়াই সে এখন নিঃশ্বাস নিতে পারে।
তর্ক বিতর্কে ক্লান্ত হয়ে ডক্টর একটাসময় বললেন ,
– তুমি যদি ওকে বাঁচাতে চাও তবে হাসপাতাল থেকে বের করার চিন্তাও করো না। আর যদি চাও এত মাসের সব পরিশ্রম, কষ্ট এক মুহুর্তে নষ্ট করতে তবে নিয়ে যাও। আমার কোনো আপত্তি নেই।
এরোজ বিধ্বস্ত নয়নে চেয়ে বলল,
– আমি তাকে বহুবার হারাতে হারাতে গিয়ে ফিরে পেয়েছি ডক্টর। আরো একবার হারানোর শক্তি নেই। এভাবে বলবেন না প্লীজ। আমি তার নিরাপত্তার সব ব্যবস্থা করব।
ডক্টর অতিষ্ট হয়ে বললেন,
– মৌনতার শরীর রিকভারি করছে এরোজ। নাইনটি নাইন পার্সেন্ট ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা শেষ। কিছুদিন পরেই বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করা হবে। তারপর বিয়ে করার অজস্র সময় পাবে।
ডক্টর ও জানেন এই সময়টুকু কতটা রিস্কি আর এরোজ ও জানে। বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের পর ডক্টরদের হাতে করার মতো আর কিছু থাকবে না। আর কিছু করার থাকবে না—এতটুকু ভাবনায় আসতেই এরোজের চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল। বলহীন দেহে ডক্টরের পানে চেয়ে ভাঙা কণ্ঠে বলল,
– বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের পর মৌনকে ছয় মাসের জন্য টাফ আইসোলেশনে রাখা হবে, ডক্টর। আপনি ভালো করেই জানেন আমার হাতে সময় খুব কম। প্লীজ, তাকে আমার স্ত্রী রূপে দেখার খুব ইচ্ছা ডক্টর। আমি প্রতিনিয়ত তাকে হারানোর ভয়ে গুমড়ে মরছি। আর সম্ভব নয়। এবার যা হবে সেটা আমার স্ত্রী রূপে হবে।
ডক্টর হাল ছেড়ে দিলেন। ত্যক্ত সুরে বললেন,
– ওকে! কিন্তু সেটা দুদিন পর। মৌনতাকে আরো দু’দিন সময় দিতে হবে থেরাপির জন্য।
এরোজের মুখে হাসি ফুটে উঠল। শুয়ে থাকতে থাকতে মৌনতার দেহ অনেকটাই নিঃসাড় হয়ে পড়েছে। তাই তাকে থেরাপি নিতে হবে।
এরোজ মৃদু হেসে ভীষণ উত্তেজিত বদনে ডক্টরকে জড়িয়ে ধরল। কৃতজ্ঞতার সুরে বলল,
– থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ ডক্টর। আমি তাকে পুরো দুনিয়া থেকে আড়াল করে রাখব। কোনো ভীড়ের মাঝে যেতে দেব না।
ডক্টর হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরলেন। বিগত সাড়ে দশ মাসে তিনি এই ছেলেটির ভালোবাসা দেখে মুগ্ধ,ত্যক্ত, বিরক্ত! তিনি এরোজের পিঠে হাত চাপড়ে বললেন,
– তুমি জিতে যাও। মৌনতা তোমার হয়ে যাক। সৃষ্টিকর্তা কখনোই তোমার ভালোবাসাকে হারতে দেবে না।
এরোজ ছলছল নেত্রে মাথা নাড়ল। তারা কখনোই হারবে না।
হাতে ঠান্ডা তরল কিছুর আভাস পেতেই মৌনতার আঙুলগুলো নড়ে উঠল। এরোজ সাবধানে আঁকড়ে ধরল নড়ে উঠা হাতটি। মৌনতা ধীরস্থির চোখ মেলে তাকালো। মৃতপ্রায় চাহনি, রুক্ষ শুষ্ক ত্বকের মলিনতা যেন জানান দিচ্ছে দেহের অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণার আভাস। ঠোঁট ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়তেই এরোজ ঠোঁট কামড়ে কান্না আঁটকায়। হাত বাড়িয়ে ওয়েট টিস্যু দিয়ে ঠোঁটের রক্ত গুলো মুছে ফেলল।
মৌনতা ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেলে অতি ধিমি কণ্ঠে আওড়ালো,
-কী করছেন?
এরোজ ছলছল চোখে চমৎকার হাসল। হাতের মেহেদীর কোনটি দেখিয়ে বলল,
-মেহেদি পড়িয়ে দিচ্ছি।
-কেন?
এরোজ চোখে চোখ রাখল। স্মিত হেসে বলল,
-পরশু আমাদের বিয়ে তাই।
মৌনতা মৃদু অবাক হলো। দূর্বল কণ্ঠে বলল,
-সত্যি?
-হুম। আজ বাড়িতে মেহেন্দির অনুষ্ঠান হচ্ছে। কাল হলুদ হবে আর পরশু বিয়ে। দেখবেন সবাইকে? সবাই হাত ভরে মেহেদী দিয়েছে।
মৌনতা মলিন মুখে তাকিয়ে রইল। তার বিয়ে অথচ সে তো বিছানা থেকেই নামতে পারছে না। এরোজ যেন ওই চাহনির মানে ঠিক বুঝে গিয়েছে। সে বলল,
-বিকালে থেরাপি দেয়া হবে। কালকের মধ্যে অনেকটা সুস্থ হয়ে যাবেন। পরশু শুধু ছয় ঘন্টার জন্য ছুটি নিয়ে বাড়িতে যাবেন বিয়ের জন্য।
মৌনতা ম্লান হেসে বলল,
-সবাই মেহেদী দিচ্ছে?
এরোজ মাথা নেড়ে বলল,
-হুম। লুক অ্যাট দ্য ডোর।
এরোজের কথামতো দরজার দিকে তাকাতেই মৌনতা চমকে উঠল কাঁচের কিউবিক আকৃতির গ্লাস ভেদ করে দুটি অশ্রুসিক্ত চোখ ভেসে উঠতেই। মৌনতা অস্ফুট স্বরে ডেকে উঠল,
-রোজ!
দরজার ওপারে থাকা রোজ নিজেকে প্রাণপণে আটকাতে গিয়েও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল নিজের প্রিয় মৌন বউয়ের মৃতপ্রায় চাহনি দেখে। এরোজ ছলছল নেত্রে বোনকে শাসায়। রোজ ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকায়। অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে মুখে প্রগাঢ় হাসি নিয়ে সে দু’হাত তুলে দেখালো। তার হাত ভর্তি মেহেদী দেখে মৌনতার দুই চোখের কার্নিশ ভিজতে লাগল একটু একটু করে।
তন্মধ্যেই এরোজ নিজের ফোনটা মৌনতার মুখের উপর তুলে ধরল। স্ক্রিনে থাকা রোজ নিজের হাত দেখিয়ে চেঁচিয়ে বলল,
-দেখো মৌনবউ, আমরা সবাই তোমার বিয়ের মেহেদী দিয়েছি।
একে একে নিভা, নাবিলা, রূপকথা, তানশান, নিশাত, নির্জনা বেগম, মাসুমা বেগম তাদের মেহেদী পড়া হাত দেখাতেই মৌনতা হতবাক হয়ে চেয়ে রইল ফোনের স্ক্রিনের দিকে। তার স্থবিরতা ভেঙে হুঁ হুঁ করে কান্না বেরিয়ে আসল যখন তপোবন, তাকদির সিকদার আর নেওয়াজ সাহেব নিজেদের হাতের তালুতে দেয়া মেহেদী দেখালো।
মৌনতা অস্থিরচিত্তে একবার দরজার পানে তাকালো আর একবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল দূরদেশে তার ফেলে আসা প্রিয়জনদের দেখে।
মৌনতা কাঁদতে কাঁদতে এরোজের পানে চেয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
-আব্বু, ভাইজান, রোজ, তানশান সবাই এসেছে এখানে? এগুলো কী সত্যি?
এরোজ বাচ্চাদের মতো বাহুতে নিজের চোখ মুছে ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
-হুম, সবাই এসেছে আমাদের বিয়ের জন্য।
তার কথা শুনে মৌনতা পুনরায় তাকায় দরজার দিকে। একে সবাই সেই ছোট্ট কাঁচের গ্লাসের ফাঁক দিয়ে তার সাথে দেখা করল। মৌনতার উত্তপ্তটি হৃদয় আর দেহের ভেতরে থাকা যন্ত্রণাগুলো অচিরেই হারিয়ে গেল প্রিয়জনদের মুখ দেখে।
সে এরোজের পানে চেয়ে অনুনয় করে বলল,
-আমি বাড়িতে যাব।
এরোজ ম্লান হেসে বলল,
-এইবার একেবারে মিসেস এরোজ সিকদার হয়ে বাড়িতে ফিরবেন। আর একদিন মাত্র।
মৌনতা অশ্রুভেজা নয়নে চেয়ে বলল,
-একদিন অনেক লম্বা হয়।
-মিসেস এরোজ হওয়ার এত তাড়া?
মৌনতা ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
-অনেক। সুখ যে আমার জন্য মরীচিকা। বারংবার আঁকড়ে ধরতে চাই তবুও ফসকে যায়।
এরোজ তার হাতটি আঁকড়ে ধরল। দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
-এবার আর আমাদের সুখ কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। কথা দিচ্ছি।
মৌনতা মেনে নিল তার ওয়াদা। সে জানে এই মানুষটা কখনোই তার ওয়াদার বরখেলাপ করে না।
এরোজ আবার মেহেদী দিতে শুরু করল ফোন দেখে দেখে। আর মৌনতা মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল তার ধূসর জীবনকে একটু একটু রাঙিয়ে তোলা অপার্থিব সৌন্দর্যে মোড়া মানুষটিকে।
যেই মুগ্ধতায় এক নিমিষেই কেটে গেল একটি দিন। একদিন খুব একটা দীর্ঘ ছিল না। হাসপাতাল থেকে মৌনতাকে একদম বিয়ের ভেনুতে নেয়া হলো।
একটা বিচের পাশে খোলা মাঠ। সেই মাঠের ঠিক মাঝ বরাবর উইস্টেরিয়া এবং অর্কিডের ঝালর দিয়ে সুসজ্জিত নিকাহ মঞ্চটি দেখেই মৌনতা দাঁড়িয়ে গেল। ঠিক যেন ধরণীর বুকে সফেদ ফুলে ফুলে সজ্জিত শুভ্র এক স্বর্গীয় স্থান। যেখানে ভালোবাসা তার ভালোবাসাকে নিজের করে পায়।
সকাল নয়টা নাগাদ ভেনুর পাশে থাকা দালানটিতে ঢুকতেই মৌনতার অশ্রু বাঁধভাঙা হলো সাদা পোশাকে আবৃত তার পুরো পরিবারটিকে দেখে। সকলে কেঁদে উঠল হাঁড়ের উপর চামড়ার প্রলেপে একটি মৃতপ্রায় দেহটিকে দেখে। রোজ আর তানশান খুব করে চাইছিল ছুটে গিয়ে তাদের প্রিয় মানুষটিকে জড়িতে ধরতে। কিন্তু ডক্টরের কঠোর নিষেধাজ্ঞা মৌনতার শরীর এখন খুবই নাজুক। কোনো প্রকার ব্যাকটেরিয়া ওর দেহে প্রবেশ করলে ওর জন্য বিপদজনক হয়ে যাবে।
মৌনতা দূর থেকেই সবাইকে দেখতে পেল। এরপর তাকে ব্রাইডরুমে নিয়ে যাওয়া হলো। পরিবারের সকলে ছিল আরেকটি ঘরে। এরোজ ব্যস্ত কদমে সেই ঘরে ঢুকতেই নির্জনা বেগম বললেন,
-মৌনতা পরবে কী? দেখাওনি তো কিছু। আমি ওর সব গয়না নিয়ে এসেছি।
এরোজ কাঙ্খিত জিনিস খুঁজতে খুঁজতে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-কোনো গয়নার প্রয়োজন নেই। আমি আমার স্ত্রীর জন্য সব কিনে রেখেছি।
নিশাত উঠে বলল,
-কিন্তু ওটা মৌনতার প্রাপ্য এরোজ। ওগুলো তোর স্ত্রীর জন্যই বানিয়ে রাখা।
এরোজ সরব কঠিন চোখে তাকাল খালামনি আর মায়ের দিকে। কঠোর গলায় বলল,
-ওই দেশ, ওই বাড়ি জড়িত সব অভিশপ্ত। ওই বাড়ির কোনোকিছু আর মৌনতাকে ছুঁতে পারবে না খালামনি।
তপোবন সহ সকলে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলল তার অবুঝের মতো কথায়। যেখানে সে নিজেই ওই বাড়ির ছেলে সেখানে ওই বাড়ির জিনিস কী করে অভিশপ্ত হয়? কিন্তু কে বোঝাবে ওই ষাঁড় গরুকে?
এরোজ সাদা গোলাপ গুলো খুঁজে পেতেই রুম থেকে বেরিয়ে গেল। সাদা লেহেঙ্গা পরিহিত রোজ তার লেহেঙ্গা আঁকড়ে ধরে ভাইয়ের পিছু পিছু যেতে যেতে বলল,
-ভাইজান, আমি একটু মৌন বউ এর কাছে যাই? আমি সকাল থেকে নিজেকে পুরো স্যানিটাইজ করেছি। শুধু স্যানিটাইজার খাওয়া বাকি। আর দেহের কোথাও স্যানিটাইজার লাগানো বাকি নেই। প্লীজ ভাই?
এরোজ থমথমে মুখে বলল,
-আয়।
রোজ চেঁচিয়ে উঠল আনন্দে। ছুটে গেল তার প্রিয় মৌনবউয়ের কাছে।
মৌনতা নায়েলকে বুকে জড়িয়ে ধরে চুপটি করে বসেছিল। তন্মধ্যেই তার বুকে কেউ আঁছড়ে পড়তেই মৌনতা হকচকিয়ে গিয়ে নায়েলকে সহ রোজকেও আঁকড়ে ধরলো। অস্ফুট স্বরে ডেকে উঠল,
-রোজ!
রোজ পুনরায় হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠে আদুরে গলায় ডাকল,
-মৌনবউ, আই মিস ইউ। আমি বলেছিলাম না তুমি সারাজীবন আমার মৌন বউ হয়ে থাকবে? দেখেছ?
মৌনতা ম্লান হেসে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-ছোট্ট রোজ, নিজেই তো আর ক’দিন পর কারোর বউ হয়ে যাবে।
-এসব কথা এখন বলোনা তো মৌনবউ। আমায় অনুভব করতে দাও তোমাকে। আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না আমি তোমায় ছুঁতে পারছি। ভাইজান কেন এত কঠোর মৌন বউ? কাউকে তোমার কাছে ঘেঁষতে দেয় না।
মৌনতা ম্লান হাসল তার কথায়।
এরোজ ভেনুর গেটের সামনে দাঁড়াতেই গাড়ি থেকে একটি স্থুল দেহের লম্বা মেয়ে বেরিয়ে এলো তার স্যুটকেস নিয়ে। এরোজ চমৎকার হেসে বলল,
-ফাতিমা, আসসালামুয়ালাইকুম। ক্যায়সি হো?
-আচ্ছি হু, এরোজ ভাইজান। আপকি দুলহান কাহা হ্যায়?
-আন্দার হ্যায়। চালো, দিখাতিহু। তুম বহত খুবসুরত লাগ রাহিহো।
এরোজ হাসিমুখে বলল। ফাতিমা হাসিমুখে বলল,
-শুকরিয়া ভাইজান।
তবে তার হাসি নিভে গেল এরোজের পরের কথায়।
-লেকেন তুমসে জেয়াদা মেরি বিবি জেয়াদা খুবসুরত হ্যায়।
বলেই এরোজ হেসে উঠল। ফাতিমাও হেসে বলল,
-মুবারাক হো, ভাইজান। আপ তো জিত গ্যায়ে।
এরোজ মাথা নেড়ে বলল,
-হা, বো তো হ্যায়।
কিন্তু ফাতিমা ব্রাইডরুমে ঢুকতেই থমকে গেল চেয়ারে বসে থাকা মনুষটিকে দেখে। কারণ এরোজের ভাষ্যমতে তার স্ত্রী অনেক সুন্দর অথচ সে একটা বিশ্রী সৌন্দর্যের কঙ্কালের মতো নারীকে ছাড়া কক্ষে কিছুই দেখতে পারছে না।
এরোজ ফাতিমার স্যুটকেস নিয়ে রুমে ঢুকতেই তার আশ্চর্য চেহারা দেখে মৃদু হাসল। বলল,
-হ্যায় না খুবসুরত? বো ক্যান্সার পেশেন্ট হ্যায়।
ফাতিমা বাকহারা হতে গিয়েও মুগ্ধচিত্তে হেসে উঠল সৌন্দর্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত দেখে। ঘন ঘন মাথা নেড়ে এরোজের কথায় সায় জানিয়ে বলল,
-হা ভইজান। বো বহত খুবসুরত হ্যায়। একদাম পারী জ্যায়সি।
-আই নো।
এরোজ হেসে বলল। ফাতিমা পাকিস্তানের মেয়ে। কানাডায় পড়াশুনা করে। এবং তার বন্ধুদের সহযোগিতায় তারা সম্মিলিতভাবে একটা বুটিকের দোকান আর একটা পার্লার চালায়। সেই বুটিকে পাকিস্তানিদের হাতে তৈরি অনেক সুন্দর কারুকার্য খচিত বিয়ের পোশাক পাওয়া যায়। আর ফাতিমার কাজ ও অনেক সুন্দর। সে আগে থেকেই চেনে। তাই নিজের বিশেষ দিনে তাকেই এনেছে। এবং তার থেকেই মৌনতার আর নায়েলের জন্য পোশাক ও বানিয়েছে।
অসুস্থ থাকার কারণে মৌনতা ভারী পোশাক ক্যারি করতে পারবে না। খুব সাধারণের মাঝেও অসাধারণ একটি লাল আর গোল্ডেন জারি ওয়ার্কের একটি লেহেঙ্গা আনিয়েছে। যেটা উপর থেকে একটা আনারকলির মতো দেখতে লাগে কিন্তু আদোতে তার নিচে থাকে একটা স্কার্ট।
এরোজ কক্ষ থেকে বের হওয়ার আগে ফাতিমাকে বলল,
-ফাতিমা, গিভ ইয়োর বেস্ট ওকে?
ফাতিমা ভীষণ উৎসাহী কণ্ঠে বলল,
-ওকে ভাইজান।
এরোজ বেরিয়ে গেল নিজেকে আর তার চিরসঙ্গীকে তৈরি করতে। যে কি-না বাবা মায়ের বিয়ের সকল কার্যক্রমে তার সাথে সাথে থেকে তত্ত্বাবধান করেছে।
তপোবন নায়েলকে কোলে নিয়ে গ্রুম রুমে ঢুকতেই এরোজ তার লাল লেহেঙ্গাটা বের করল।
-দাও ভাইজান। তাকে রেডি করিয়ে দেই।
নায়েল হুড়মুড়িয়ে বড় বাবার কোল থেকে নেমে বলল,
-এটা আমাল ড্রেস? ও মাই গড! ইটস বিউটিফুল!
এরোজ হাঁটু গেড়ে বসে তার হাত দুটো আঁকড়ে ধরে বলল,
-হুম, আমরা এটা পরে আমাদের মৌনবউকে আনতে যাব।
নায়েল চোখ বড় বড় করে বলল,
-সত্যি? মৌন বউকে আনলেই আমলা ফ্যামিলি হয়ে যাব?
এরোজ মাথা নাড়ল। বিগত কয়েকদিন যাবৎ মেয়েটির থেকে একটি পরিপূর্ণ পরিবার হওয়ার অনুমতি নিয়েছে।
সে ছোট ছোট গোলাপী গালে চুমু দিয়ে বলল,
-হুম, এরপর মাম্মা আর ছোট পাপার বিয়ে হবে। তারপর আমরা ফ্যামিলি হয়ে যাব। আর তোমার পাপা। এরপর আর কেউ কখনো বলবে না, তোমার মাম্মা পাপা নেই।
অবুঝ নায়েল কী বুঝল কে জানে! সে আচমকা আনন্দে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
-ইয়েএএ আর কখনো টিচার আমায় বলবে না যে আমাল মাম্মা পাপা নেই। আমাল সব আছে।
-হ্যাঁ তোমার সব আছে।
তপোবন নীরবে দেখল চাচা ভাতিজি থেকে একটু একটু করে বাবা মেয়ে হয়ে ওঠা এরোজ আর নায়েলকে।
এরপর? এরপর দীর্ঘ সাত বছরের যন্ত্রণাকে এক নিমিষেই তুচ্ছ করে দিল সাদা পর্দার আড়ালে বধূবেশে বসে থাকা মৌনতার এক ঝলক।
অফ হোয়াইট সেরওয়ানির একপাশে ফেলে রাখা গোল্ডেন কারুকার্য খচিত শাল জড়িয়ে রাখা হাতটি আঁকড়ে ধরে লাল টুকটুকে ল্যাহেঙ্গা পরিহিত নায়েল আনন্দে আত্মহারা হয়ে লাফাতে লাফাতে লাল গালিচা পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে তাদের মৌন বউয়ের কাছে।
নায়েল আর এরোজ ঠিক সাদা ফুলের পর্দার অপরপাশে এসে বসল। নিকাহমঞ্চে শুধু ইমাম, তপোবন, তকদির সিকদার আর নেওয়াজ সাহেব উপস্থিত ছিলেন। ইমাম বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন।
কবুল বলার সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি আসতেই মৌনতা চোখ বন্ধ করে নিলো। বদ্ধ চোখের পাতায় ভেসে উঠল অতীতের সকল তীক্ত স্মৃতি। মৌনতা ধপ করে চোখ মেলে তাকালো। এক মুহুর্ত ও কালবিলম্ব না করে বলল,
-কবুল, কবুল, কবুল।
কিয়ৎকাল বাদেই অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে আসল উদগ্রীব পুরুষালী কণ্ঠ।
-কবুল, কবুল, কবুল।
উপস্থিত সকলে হেসে উঠল এরোজকে হন্তদন্ত হয়ে কবুল বলতে দেখে। মুরুব্বিরা সবাই নেমে গেলেন স্টেজ থেকে। রোজ আর নিভা এগিয়ে এসে বলল,
-ভাইজান পর্দা তোলো তাড়াতাড়ি।
নায়েল এক ঝাপে ফুপির কোলে চড়ে উঠে বলল,
-এই পাপা, পদ্দা তোলো। তালাতালি। মাম্মা বউ ছেজেছে আমলা দেখব।
এরোজ পর্দা তুলল। নুইয়ে গিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর বধূটিকে দেখার জন্য লাল ঘোমটাটি তুলতেই চোখ ছলছল করে উঠল। দু’টো অশ্রুসজল নয়নে চোখ পড়তেই সে বিমুগ্ধ চিত্তে বলল,
-এবার আমায় মুগ্ধ করা ছেড়ে দিন, মৌন। এক জীবনে আর কত মুগ্ধ করবেন? বুকের ভেতর যত মুগ্ধতা জমে আছে তাতে অনায়াসে কয়েক জন্ম কাটিয়ে দেয়া যাবে। এবার দুঃখগুলো আমার নামে করে দিয়ে আপনিটা বরং আমার হয়ে যান। শুভ বিবাহ মৌন…না না মৌনবউ। আমার মৌনবউ।
মৌনতার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়াল সেই অনবদ্য সৌন্দর্যের প্রশংসায়। এরোজ আজ কোনো বাধাবিপত্তির তোয়াক্কা করল না। বরং সকলের উৎসুক দৃষ্টি উপেক্ষা করে বলল,
-মৌন, আপনাকে একটু জড়িয়ে ধরতে পারি?
মৌনতা জবাব দিল না বরং নীরবে নিজ উদ্যোগে লেপ্টে গেল প্রশস্ত বক্ষে। সহসা টুপটাপ করে এরোজের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়াতে লাগল। একটা সময় ছেলেটি বিশ্বজয় করে নেয়ার মতো আনন্দে শব্দ করে কেঁদে উঠে বলল,
-আপনি আমার মৌন! আপনি চিরদিনের জন্য আমার।
উপস্থিত সকলের মাঝে হৈচৈ পড়ে গেল। নির্জনা বেগম হতভম্ব হয়ে তকদির সিকদারকে বললেন,
-রোজের আব্বু, আমি আমার ছেলেটাকে এত খুশি কোনোদিন দেখিনি। আমার ছেলেটা খুশিতে কাঁদছে।
তকদির সিকদার হাসলেন। আজ কারোর কাছে একটুও দৃষ্টিকটু লাগছে না এই দৃশ্যটি। বরং সকলে মুক্তমনে মুগ্ধচিত্তে দেখল।
ইমরোজ নিস্তেজ নিঃস্ব বদনে মেঝেতে করা বিছানায় শুয়েছিল। হঠাৎ করেই ফোনে অজস্র নোটিফিকেশন টোন বেজে উঠল। সে কৌতুহলী হয়ে স্ক্রিন অন করতেই চমকে গেল ফেসবুক জুড়ে তার পরিবারের লোকদের অজস্র পোস্টের নোটিফিকেশন দেখে। তার থেকেও আশ্চর্যের বিষয় হলো এরোজের আইডি থেকে পোস্ট করার নোটিফিকেশন দেখে। এরোজ তাকে ব্লক থেকে ছেড়েছে?
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৩
সে চকিতে নোটিফিকেশন অন করল। মুহুর্তেই দেহ হীম হয়ে আসল লাল টুকটুকে বধূসাজে মৌনতাকে এরোজের বাহুডোরে আবদ্ধ দেখে। একহাতে নায়েল আর একহাতে মৌনতাকে আগলে দাঁড়িয়ে আছে এরোজ।
ক্যাপশনে লেখা “আমার মৌনবউ আর আমার মেয়ে।”
ইমরোজের চোখের সামনে সব ধোঁয়াশা হয়ে আসল। ‘সবটা শেষ’ এতটুকু তার চেতনা ছিনিয়ে নিলো মুহুর্তেই।
