Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৪

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৪

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৪
তোনিমা খান

এরোজের জীবনের শুরু থেকে এই পর্যন্ত সবকিছু কখনোই সুস্থ স্বাভাবিক ছিল না। একটা অসুস্থ, অনিশ্চিত, অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করতে করতে ত্যক্ত প্রাণটি ওই একটা নামে এসেই সুখ খুঁজে পায়। আর সেটা হলো ‘মৌনতা’।
কিন্তু জীবন বরাবরই এরোজের সাথে বিভৎস খেলায় মত্ত হয়েছে। সুখ ছুঁতে গিয়েও ছুঁতে না পারার আফসোসে জর্জরিত করেছে।
সময়ের পরিক্রমায় মৌনতাও অনুভব করে ওই মানুষটা তার জন্য কাঙালের মতো অপেক্ষারত। কিন্তু হাসপাতালের ওই দরজাটি যেন তার জন্য দূর্ভেদ্য এক দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্রথম সাত দিন। বেডে শুয়ে থাকা মৌনতা নিভু নিভু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দরজার ওপারে থাকা মানুষটার দিকে। দরজার ওপারে জীবন আর এপারে মৃত্যু‌। এই দরজাটা পার হতে পারলে জীবন ফিরে পাবে কিন্তু ব্যর্থ হলে মৃত্যু।

মৌনতার ওষ্ঠদ্বয় আলতো বেঁকে যায়। ফেটে চৌচির ওষ্ঠদ্বয়ে নোনা স্বাদের রক্তের আনাগোনা। তবে বিভৎস যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা দেহটির মাঝেও আজ অদ্ভুত সৌন্দর্য জ্বলজ্বল করছে। নয়া বধূরূপ! হাতে কানে গলায় ছোট ছোট কিছু অলংকার জানান দিচ্ছে সে কারোর খুব যত্ন, ভালোবাসায় মুড়িয়ে রাখা এক ব্যক্তিগত মানুষ। যার ভালোবাসার সৌন্দর্যের কাছে হেরে যাচ্ছে দেহের অভ্যন্তরে ছুটে চলা অবশিষ্ট মরণব্যাধির কোষগুলো। এরোজের মৌনবউয়ের বধূরূপের কাছে হেরে যাচ্ছে ক্যান্সারের দেয়া বিদঘুটে বিভৎস রূপ।
চোখে চোখ রেখেই মৌনতা আলতো হাত নেড়ে এরোজকে কাছে ডাকল। বিয়ের পর মুহুর্ত থেকে তাদের সংসার জীবন চলছেই এই হাসপাতালের করিডরে আর ওই কামরাটিতে। চোখে চোখে পড়তেই নীরব আহ্বানে এরোজ ধীর কদমে দরজা ঠেলে ঢুকলো। বেডের কাছে এগিয়ে যেতেই মৌনতা শাহাদাত আঙুল নেড়ে আরো কাছে ডাকল। গোলাপী আভা ছড়িয়ে যাওয়া ফর্সা মুখটিতে চেপে রাখা কান্নার আভাস। এরোজ ঈষৎ ঝুকে গেল বিছানার শায়িত নারীটির মুখের উপর। কিন্তু তাতেও কার্যসিদ্ধি হলো না। শাহাদাত আঙুলটি আবারো নড়ে উঠতেই এরোজ এবার অপ্রস্তুত হলো। বিবাহের আজ বিশ দিন কিন্তু তাদের নৈকট্য বলতে একে অপরের হাত ধরে হাসপাতালের এই কক্ষটিতে রাত কাটিয়ে দেয়া।

নিজের অপ্রস্তুত সত্তা নিয়েই এরোজ আরেকটু এগিয়ে গেল। যেই এগিয়ে যাওয়া নৈকট্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল, বন্দি অনুভূতিরা বহুবছর বাদ খাঁচা থেকে মুক্তি পাওয়ার আনন্দে মুক্ত পাখিদের ন্যায় ডানা ঝাপটাতে লাগল। নাকে নাক ঠেকে গেল। টলটলে স্বচ্ছ দুটি অশ্রুভেজা নয়নে আঁটকে গেল দুটি ধূসর অশ্রুভেজা নয়ন। পুরুষালী গালে একটি কম্পিত উষ্ণ হাত ঠেকতেই এরোজ কৌতুহলী হলো। কিন্তু তার সকল কৌতুহল থমকালো যখন শুষ্ক ফাটা চৌচির ওষ্ঠদ্বয় তার ললাট ছুঁয়ে দিল। একটা শুষ্ক চুমু—এরোজ ধপ করে চোখ বন্ধ করে নিলো। কর্ণকুহরে শিরশির করে আন্দোলিত হয় একটি রিনরিনে ফিসফিসানি কণ্ঠ।
– যদি সৃষ্টিকর্তা এই দরজার ওপারে যাওয়ার অনুমতি না দেয় তবে আমার প্রতি কোনো আক্ষেপ রাখবেন না। নিজেকে ভালোবাসবেন, নিজের যত্ন নিবেন।

বিদঘুটে শব্দগুলো মিলিয়ে যায় নিস্তব্ধতার আড়ালে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা মৌনতার গালে দুই ফোঁটা অশ্রু পড়তেই মৌনতার ও চোখের কার্নিশ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়ালো। একটাসময় নারীটির সেই নীরব অশ্রু বিসর্জন নীরবতা ভেঙে ফুঁপিয়ে উঠল যখন এরোজ বদ্ধ নেত্রে পুনরায় তার ললাট এগিয়ে দিল।
মৌনতা কাঁদতে কাঁদতে হেসে ফেলল পুরুষটি বাচ্চাদের ন্যায় আদর লুফে নেয়ার চেষ্টা দেখে। সে ফিরিয়ে দিল না। চোখে অশ্রু ঠোঁটে হাসি নিয়ে সে দু’হাতে পুরুষালী গাল দুটো আঁকড়ে ধরে ললাটে পুনরায় ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। এরোজ এবার ডান গাল এগিয়ে দিল। মৌনতা কাঁদতে কাঁদতে সেখানেও ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। একে একে বাম গাল, সরু নাকের ডগা, দুই চোখের পাতা একে একে সব নীরব আবদার অনুসরণ করে ছুঁয়ে গেল ভীষণ আদরের সাথে। অথচ দু’জনের চোখ দিয়েই অবাধে নোনাজল গড়াচ্ছে।
একবার দু’বার? এমন শুষ্ক স্পর্শ অজস্রবার পুনরাবৃত্তি হলো। এরোজ উন্মত্ত হয়ে পড়ল জগতের সবচেয়ে শক্তিশালী স্পর্শটুকু জীবনে প্রথমবারের মতো অনুভব করে। আর মৌনতা ঠিক ততবারই ভীষণ আদরের সাথে তার আবদার পূরণ করেছে।

কিন্তু অজস্র স্পর্শ পেয়েও মন ভরতে না পেরে একটাসময় এরোজ নিজের অসহায়ত্বে শব্দ করে কেঁদে উঠল। ক্যানুলা লাগানো উষ্ণ হাত দুটি মুখে ঠেকিয়ে সে হাউমাউ করে কাঁদল। কাঁদতে কাঁদতে অভিযোগ করে বলল,
– এত কঠিন কথা কী করে বললেন? আপনার কী আমার উপর একটুও দয়া হয় না মৌন? জগতের সবচেয়ে সুন্দর আর ক্ষমতাধর স্পর্শের সাথে পরিচয় করে দাবি ছাড়িয়ে নিচ্ছেন? আপনি কেন এত পাষাণ মৌন? আপনার একটুও উচিৎ হয়নি এত সুখময় স্পর্শের সাথে পরিচিয় করানোর। এই স্পর্শে এত সুখ কেন? আজ মনে হচ্ছে আমি কখনো জানতামই না সুখ কাকে বলে! আমি সুখকে জানতে চাই মৌন, প্লীজ। আপনাকে এই দরজার ওপারে যেতে হবে, যেতেই হবে। অন্তত আমায় রোজ এমন করে একটু সুখের সাথে পরিচিত করার জন্য হলেও ওই দরজার ওপারে যেতে হবে।
দুটি ললাট একে অপরের সাথে দুঃখ আলাপনে মত্ত। দু’জনের মাঝেই আপ্রাণ চেষ্টা ওই দরজাটার ওপারে যাওয়ার এবং দ্বিতীয়বার জীবনকে জিতে নেয়ার।

ক্যালেন্ডারের পাতায় নতুন বছর যুক্ত হয়েছে। জীবনে যুক্ত হয়েছে নতুন অনুভূতি, নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন প্রাণের স্পন্দন।
সময়ের বিবর্তনে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। যার কারণে প্রকৃতিতেও অদ্ভুত পরিবর্তনের দেখা মিলেছে। এতটাই অদ্ভুত যে বদনে হিমের সূচ ফোঁটা ফেব্রুয়ারী মাসের শীতেও সুনামির দেখা মিলছে। ভারী অদ্ভুত! ভারী বিরক্তিকর!
আকাশের ক্ষিপ্র বজ্রঝড়ের প্রকোপে থাইগ্লাসগুলো ও কেঁপে উঠছে দফায় দফায়। গাছ মরমর করার ভয়ঙ্কর শব্দে আলোড়িত হলো নিস্তব্ধ কামরা জুড়ে। রূপকথা নামক ছোট্ট মা’টি বদ্ধ নেত্রে বিরক্তি মিশ্রিত নিঃশ্বাস ফেলল। ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে আসছে একটি আদুরে উদ্বিগ্ন কণ্ঠ।
– হ্যালো? রূপকথা? শুনতে পাচ্ছো আমার জান?
– শুনছি।
রূপকথা ব্যথাতুর নিঃশ্বাস ফেলে বলল। ঝড়ে আঁটকে থাকা গাড়িতে বসা তপোবন বাইরের বিরূপ আবহাওয়ার দানবীয় প্রকোপ দেখতে দেখতে দুশ্চিন্তা নিয়ে বলল,

– রাতটুকু কোনোভাবে কাটিয়ে দিতে পারবে না? গাড়ি আগাতেই পারছে না। মাঝ সড়কে গাছ ভেঙে পড়েছে। আমায় অন্য রাস্তা ঘুরে আসতে হবে তাতেও অনেক সময় লাগবে। আম্মা, আব্বু কোন জ্ঞানে তোমাদের একা রেখে বাগেরহাটে গেল?
পুরো কোম্পানির দায়িত্ব তপোবনের কাঁধে থাকায় তাকে কনস্ট্রাকশন সাইটের দিকটাও সামলাতে হয়।দুইদিনের জন্য যশোর গিয়েছিল। কিন্তু আজ যখন শুনল সন্ধ্যায় শুনল নির্জনা বেগম আর তকদির সিকদার বাগেরহাটে গিয়েছে তখন কাজ সেরে দ্রুত বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। রূপকথার গর্ভাবস্থার শেষ সপ্তাহ চলছে। কোনোভাবেই একা রাখা যাবে না।কিন্তু যখন রওনা দিল তখন ঝড় শুরু হয়ে গিয়েছে।
রূপকথার পেট ব্যথা করছে বিকাল থেকে। সে পেটে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
– পেটে ব্যথা করছে তানশানের পাপা।
এতটুকু যথেষ্ট ছিল তপোবনের সকল দুশ্চিন্তায় নতুন মাত্র যোগ করার জন্য। সে ঘেমে উঠল। ক্ষোভে ভরা কণ্ঠে বলল,

– তুমি কী করে আব্বু আম্মুকে যেতে দিলে বলোতো?
– আম্মা, আব্বুজানের করার কিছু ছিল না। মেজো চাচির একসাথে দুই পা ভেঙেছে। না গেলে খারাপ দেখাত।
– এই সময় লোকদেখানো ফর্মালিটির কী খুব প্রয়োজন ছিল? তিনি তো এখন সুস্থ আছেন। কিন্তু এখানে তোমরা তিনজন। এইটুকু কেউ ভাবল না—যে একজনের জন্য তিনজনকে এভাবে বিপদের মুখে ফেলে যাই কী করে?
তপোবনকে আজ ভীষণ স্বার্থপর শোনালো। রূপকথা জানে মানুষটা সবার বিপদে সবার আগে উপস্থিত হয় কিন্তু আজ? আজ গল্পটা ভিন্ন।
তপোবন ড্রাইভারকে ইশারা করল দ্রুত অন্য পথে গাড়ি চালাতে।
– তুমি কী কোনোভাবে আম্মা, শুকতারা আর‌ নিহামকে ডাকতে পারবে না?
– বাইরে অনেক ঝড় হচ্ছে। তারা এখন ছোট ছোট দু’জনকে নিয়ে বের হলে একটা বিপদ হয়ে যাবে।
– তবে আমি অ্যাম্বুলেন্স কল করি। তারা এসে তোমায় হসপিটালে নিয়ে যাক। অন্তত ওখানে থাকলে কোনো সমস্যা হলে ডাক্তার দেখে নেবে। আমি এই দুশ্চিন্তা নিতে পারছি না।
রূপকথার বিরক্তি এবার রাগে পরিণত হলো,
– রাখুন আপনার দুশ্চিন্তা। বড়জোড় দুই ঘন্টার তো ব্যপার। কিছু হবে না। অতটাও ব্যথা না। আপনি নিশ্চিন্তে আসুন।
তপোবনের মন মানলো না। তার বুকটা কেমন বিচলিত হয়ে পড়েছে। এটা প্রায়শই হয় যখন থেকে রূপকথা গর্ভধারণ করেছে। সে তবুও নিজেকে দমিয়ে নিলো। ঘুরে যেতে তাদের একটু বেশি সময় লাগবে। মাত্র দুই আড়াই ঘন্টা তো!
সে বলল,

– তবে জবাকে আর মাজেদা চাচিকে নিজের সাথে রাখো আর সাবধানে থাকো। তানশান কোথায়?
– এখানেই ছিল এতক্ষণ। মাত্র তার ঘরে গেল। আগামীকাল স্কুলের অল্পকিছু হোম ওয়ার্ক বাকি আছে তাই করতে গিয়েছে।
– আচ্ছা।
ফোন কাটতেই রূপকথা নড়েচড়ে বসল। ওয়াশরুমে যেতে হবে। কিন্তু তার একা উঠতে বসতে কষ্ট হয়। সে দরজার পানে চেয়ে উঁচু স্বরে ডাকল,
– জবা আপা? জবা আপা? একটু রুমে আসবেন? ওয়াশরুমে যাব।
রূপকথা অনেকক্ষণ ডাকলো কিন্তু জবা এলো না। হয়তো ভাত খাচ্ছে। সে নিজেই ওঠার চেষ্টা করল। কিন্তু উঠতে যাবে ওমনি পেটে একটা ব্যথাতুর ধাক্কা অনুভব হলো। রূপকথা চোখমুখ কুঁচকে পেট আঁকড়ে আর্তনাদ করে উঠল। ধাতস্থ হয়ে তাকালো নিজের স্ফিত উদরপানে। হাত বুলিয়ে বলল,
– এই দুষ্টু ছানারা? তোমাদের ঘুম নেই? এখনো মাকে লাথি মারছ? ঘুমাও বলছি নয়তো মা বকা দেব।
নিজমনে বকবক করতে করতে রূপকথা ধীরপায়ে ওয়াশরুম গেল। তবে যতটা প্রাণবন্ত বদনে ওয়াশরুমে ঢুকলো বের হওয়ার সময়টা ছিল ততটাই ভয়ঙ্কর। স্যাঁতস্যাঁতে মার্বেল টাইলসের পথ ধরে অতি সাবধানে হাঁটতে থাকা রূপকথার সকল সাবধানতা কেড়ে নিলো আচমকা হিংস্র পশুর ন্যায় ঘুটঘুটে তমসায় ছেয়ে যাওয়া বদ্ধ ওয়াশরুমটি।
ঝড়ের গর্জন আর জানালার কাঁচে বৃষ্টির উন্মত্ত আঘাতের শব্দে থমথমে পরিবেশ ঠিকরে বদ্ধ ওয়াশরুমের দরজা দিয়ে গগনবিদারী এক চিৎকার বেরিয়ে আসল।

– তানশান!
রূপকথার কণ্ঠনালী আঁটকে গেল যখন তার ভারী শরীরটা ভারসাম্য হারিয়ে সজোরে আছড়ে পড়ল ঠান্ডা, শক্ত মার্বেলের মেঝেতে। অন্ধকার চিরে এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণার আর্তনাদ বের হয়ে এলো রূপকথার গলা দিয়ে। পড়ে যাওয়ার ধাক্কাটা সরাসরি গিয়ে লাগল তার তলপেটে। তীব্র, ধারালো এক যন্ত্রণা মুহূর্তের মধ্যে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। মনে হলো যেন কোনো ধারালো তলোয়ার তার শরীরটাকে দুই ভাগে চিরে ফেলল। রূপকথা দুই হাতে পেটটা চেপে ধরে গুঙিয়ে উঠল। ব্যথার প্রকোপ এতটাই তীব্র যে সে আর একটাও শব্দ করতে পারল না, শুধু অস্ফুট গোঙানির শব্দ বের হলো মুখ থেকে।
কিন্তু রূপকথা ব্যথার থেকেও বেশি ভয় অনুভব করল। সে ব্যথা ভুলে আঁকড়ে ধরল নিজের উদর। যন্ত্রণা ছাপিয়ে এক চরম ভীতি আঁকড়ে ধরল তার মাতৃত্বকে। কাঁপতে কাঁপতে রূপকথা এদিক ওদিক তাকালো। কিছু দেখতে পারছে না। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে মেঝেতে হাত রেখে ভর দিল। কিন্তু তার‌ মস্তিষ্ক অচল হয়ে যায় যখন হাতের তালুতে কোনো স্যাঁতস্যাঁতে মেঝে স্পর্শ করল না বরং উষ্ণ, আঠালো কোনো তরল পদার্থ অনুভব হলো। সে ব্যথা ভুলে গগনবিদারী চিৎকার করে উঠল,

– তানশাননন!
– তানশান! জবা আপা! কেউ আছো…” রূপকথা ফুঁপিয়ে কাঁদছে কিন্তু একটুও নড়তে পারছে না। তার নিম্নদার ছিড়ে যাওয়ার মনে ব্যথায় সে কাতরাতে লাগল। কিন্তু তার দূর্বল কণ্ঠস্বর ঝড়ের গর্জনের কাছে অতি তুচ্ছ শোনাল।
কারেন্ট যাওয়ার পরেও যখন আইপিএস চালু হলো না তখন তানশান ফোনের লাইট জ্বালিয়ে ত্রস্ত পায়ে মায়ের ঘরে এলো। নক না করেই ঘরে ঢুকে বলল,
– মিমি, আই পি এস জ্বলছে না কেন?
কিন্তু কোথাও মিমি নেই। তানশান চকিতে এদিক ওদিক তাকালো। মিমি তো খুব একটা নড়তে চড়তে পারে না। সে উঁচু কণ্ঠে ডাকতে গেলেই কর্ণকুহর সচকিত হলো। ওয়াশরুম থেকে গুমড়ে কাঁদার শব্দ শুনতেই সে তড়িৎ সেদিকে পা বাড়ালো।
যেতে যেতেই পুনরায় কর্ণকুহরে আন্দোলিত হলো রূপকথার অস্ফুট স্বরের আর্তনাদ।
-তানশান বাঁচাও।
তানশান বজ্রাহত চোখে তাকালো বদ্ধ দরজার দিকে। সে ছুটে গিয়ে দরজা ধাক্কালো।
– মিমি? মিমি কী হয়েছে? আপনি এমন কথা বলছেন কেন? আপনি কী ঠিক আছেন? ভেতরে তো অন্ধকার।
রূপকথার জবাব আসল না শুধু কাতরানোর শব্দ শোনাগেল। সহসা তানশানের মুখটি ভয়ে শূন্য হয়ে গেল। সে হন্তদন্ত হয়ে দরজা ধাক্কা দিয়ে বলল,

– মিমি, অন্ধকারে পড়ে গিয়েছেন? দরজা কী খুলতে পারছেন না? মিমি একটু চেষ্টা করুন দরজা খোলার।
– আমি নড়তে পারছি না, তানশান।
রূপকথা ফুঁপিয়ে উঠে বলল।
তানশান আর এক মুহুর্ত ও বিলম্ব করল না ছুটে গিয়ে একটা হাতুড়ি নিয়ে আসল। তার মাঝে দানবীয় শক্তি ভর করলো। নিজের সব শক্তি আর হাতুড়ি দিয়ে ঠিক দশ মিনিটের মাথায় তানশান দরজা খুলতে সফল হলো। খুলতেই তার দেহ সর্বশান্ত হয়ে গেল সাদা মেঝেতে লাল তরল পদার্থের আধিপত্য দেখে।
হাত থেকে হাতুড়িটা ধপ করে পড়ে যায় তানশানের। সে ছুটে গিয়ে আঁকড়ে ধরল চেতনা হারাতে বসা রূপকথাকে। এত রক্ত দেখে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে ছেলেটি। উদ্ভ্রান্তের মতো রূপকথার চোখমুখ ছুঁয়ে বলে,
– মিমি, কোথায় ব্যথা পেয়েছেন? পেটে ব্যথা করছে? হে আল্লাহ কত রক্ত!
রূপকথা ছটফট করছে। তানশান তাকে আগলে নিয়ে গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে ডাকলো জবাকে,
– জবা ফুপি, মিমি পড়ে গিয়েছে। তাড়াতাড়ি এদিকে আসুন।
রূপকথার শরীরের শক্তি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। চারপাশের অন্ধকারটা যেন আরও ঘন হয়ে আসছে, চোখের পাতা জোড়া ভারী হয়ে নামছে। রক্তের উষ্ণ ধারাটা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে মেঝেতে, আর তার সাথে সাথেই রূপকথা তলিয়ে যেতে লাগল এক অতল, অন্ধকার চেতনার গভীরে…।
তানশান গলা কাটা মুরগীর মতো ছটফট করতে করতে থমকে গেল রূপকথাকে নিস্তেজ হতে দেখে। আতঙ্কে চোখের কোনে জল জমতে জমতে সে চকিতে দেহটিকে আগলে নিলো বুকে। ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল,

– মিমি, এই মিমি আপনি এমন করছেন কেন? কিছু হবে না মিমি। আমরা এখুনি হসপিটালে যাবো। কিছু হবে না, ভাই-বোনের কিছু হবে না।
বলতে বলতেই তানশান বাহুতে মুখ ঠেকিয়ে শব্দ করে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে পুনরায় জবাকে ডাকলো,
– জবা ফুপিইই!
তানশান অস্থির চিত্তে একবার রক্ত আর নিস্তেজ রূপকথার পানে তাকাচ্ছে। জীবনে কখনোই এত অসহায়ত্ব অনুভব হয়নি তার। তার মনে হচ্ছে সে নিজের চোখের সামনে নিজের অক্ষমতার কারণে তার প্রিয় মানুষকে চিরতরে হারাচ্ছে। তার মিমি তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তার ভাই বোনকে সে তার চোখের সামনে হারিয়ে ফেলছে এই এক ভবানার ভয়ে কুঁকড়ে উঠল তানশান। সে বাচ্চাদের মতো ফুঁপাতে ফুঁপাতে আচমকা ডেকে উঠল,

– মাম্মা!
– মাম্মা, মাম্মা প্লীজ ডোন্ট লিভ মি। আমরা এখুনি হাসপাতালে যাবো। কিচ্ছু হবে না।
সেই অর্ধ চেতনার মাঝে সেদিন রূপকথা সত্যিকার অর্থেই মায়ের স্বীকৃতি পেল। শরীরের সাথে নিস্তেজ হতে চাওয়া চোখদুটো আধো নয়ন মেলে তাকায়। তার দৃষ্টিতে এক সন্তাকে জিতে যাওয়ার আনন্দ আর দুই সন্তানকে হারিয়ে ফেলার ভয়।
আজ ছেলের চোখে আজ মাকে হারানোর যন্ত্রণা স্পষ্ট! এইতো রূপকথা চিরতরে আজ জিতে গিয়েছে সৎ মা নামক শব্দটির সাথে লড়াইয়ে। সে থরথরিয়ে কাঁপতে থাকা রক্তাক্ত হাতটি রাখে তানশানের বাহুতে। কণ্ঠনালী আঁটকে আসছে তবুও ছেলেকে ভরসা জোগাতে কুণ্ঠাবোধ করল না।
-মা…মাম্মার কিছু হবে না তানশান। তুমি পাশে আছো না। মাম্মাকে একটু হসপিটালে নেয়ার ব্যবস্থা করবে তানশান। ভাই বোনের হয়তো কষ্ট হচ্ছে।
রূপকথা ঠোঁট কামড়ে কান্না আঁটকায়।
তানশান ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,

– হ্যাঁ হ্যাঁ মাম্মা, আমরা এখুনি হসপিটালে যাব। ভাই বোনের কিচ্ছু হবে না।
জবা গিয়েছিল ছাদে চিলেকোঠার কাঠের জানালা ঝড়ের প্রকোপে ভেঙে গিয়েছে তা দেখতে। কিন্তু এতটুকু সময়ের মাঝে যে এমন দূর্ঘটনা ঘটবে তা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। ঘুমন্ত মাজেদা চাচি জবার চিৎকারে হন্তদন্ত হয়ে এসে দেখল জবা আর তানশান নিস্তেজ রূপকথাকে বের করছে ওয়াশরুম থেকে।
রূপকথাকে বের করেই তানশান ছুটে ঘর থেকে বের হয়। যেতে যেতে বলে,
– মাম্মাকে একটু কাপড়ে জড়িয়ে নিন ফুপি আমি গাড়ি বের করছি।
বাবা তাকে অবসর সময়ে সব বিষয়ে দক্ষ করে তুলেছে। সে ড্রাইভ করতে পারলেও প্রাকটিস ব্যতীত কখনোই হাইওয়েতে ড্রাইভ করেনি। তবে আজ সে নিরুপায়। রূপকথার অনেক ব্লিডিং হচ্ছে। এভাবে আর এক মুহূর্তও রাখা যাবে না।

মাজেদা চাচি, জবা আর তানশান তিনজনে বহুকষ্টে রূপকথাকে গাড়িতে তুলতে সফল হয়। তানশান কাঁদতে কাঁদতে গাড়িতে বসে স্টিয়ারিংয়ে হাত দিল। এক পলক পেছনে তাকিয়ে বুকভরা নিঃশ্বাস ফেলে সে বিসমিল্লাহ বলে গাড়ি স্টার্ট দিল। ঝড়ের রাতে মানুষ না থাকলেও প্রকৃতি কম বাঁধ সাধেনি। তবে আজ মাকে হারানোর ভয়ে তানশান জাগতিক সকল ভয়কে জয় করে নিলো। সে পনেরো মিনিটের মাথায় সফলভাবে হাইওয়েতে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাল।
ক্রিটিক্যাল অবস্থা দেখে ডক্টর জানালো ইমিডিয়েট সি সেকশন করাতে হবে। ওই মুহুর্তে রূপকথার একমাত্র অভিভাবক তানশান। তাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হলো এবং সব ফর্মালিটিজ পূরণ করতে হলো।
ডক্টর রূপকথাকে ইমিডিয়েটলি ওটিতে নিলো। ব্লু ট্রাউজার আর রক্তাক্ত সাদা শার্ট নিয়ে তানশান ধপ করে বেঞ্চে বসে পড়ল। পাশ থেকে ভেসে আসা জবা আর মাজেদা চাচির কান্নার আওয়াজ তাকে স্পর্শ করল না। সে থরথরিয়ে কাঁপতে থাকা হাতে বাবাকে ফোন লাগায়। তপোবন ফোন রিসিভ করেই ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৩ (২)

– তানশান কী অবস্থা তোমার? তোমার আর তোমার মিমির ফোনে এতবার ফোন দিলাম, একজন ও রিসিভ করোনি।
তানশান ঠোঁট চেপে কান্না আটকায়। অস্ফুট স্বরে বলল,
– পাপা, মাম্মা ওয়াশরুমে পড়ে গিয়েছিল। অনেক ব্লিডিং হয়েছে। আমি তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। ডক্টর বলেছেন, ভাই বোন ঠিক নেই পাপা। ওটিতে নিয়ে গিয়েছেন মাম্মাকে। ইমিডিয়েটলি সি সেকশন করাতে হবে।
বলতেই তানশান কান্নায় ভেঙে পড়ল। তপোবনের চোখের সামনে ধোঁয়াশা হয়ে আসল মুহুর্তেই।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৪ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here