অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৬
তোনিমা খান
– ইমরোজ এই বাড়িতে কী করছে, আব্বু? আমি তো জানতাম, তোমরা কোনোদিন একজন চরিত্রহীন, লম্পট ব্যক্তিকে নিজেদের বাড়িতে জায়গা দাও না।
এরোজ গর্জে উঠে বলল। পেছনে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা তকদির সিকদার গম্ভীর গলায় বললেন,
– সেটাই করেছিলাম।
সহসা এরোজ আরো দ্বিগুণ আওয়াজে গর্জে উঠল,
– তবে ও কী করছে এই বাড়িতে? এই তোমাদের ন্যায়বিচারের নমুনা?
নির্জনা বেগম টলটলে নেত্রে তাকান রাগে কাঁপতে থাকা ছেলের পানে। নম্র স্বরে বললেন,
– বাবার সাথে ঠিক করে কথা বলো এরোজ।
– আম্মা প্লীজ, এই মুহুর্তে আমায় ম্যানার্স শেখাতে আসবেন না। আমি আপনাদের যথেষ্ট সম্মান, শ্রদ্ধা দিয়েই চলি। কিন্তু আপনারা তার মান রাখেন না।
তুমি থেকে আপনি সম্বোধন শুনতেই নির্জনা বেগমের চোখ ভিজে উঠল। তিনি থমথমে মুখে বললেন,
– ইমরোজ সড়ক দুর্ঘটনায় নিজের একটা পা চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে, এরোজ। আমরা ছাড়া ওকে দেখার মতো কেউ নেই। ওর কর্মফল ওকে ধ্বংস করে দিয়েছে। কিন্তু দিনশেষে আমরা বাবা-মা। তোমরা যে কাউকে ছুঁড়ে ফেলতে পারলেও আমরা মা-বাবারা পারি না। আমাদের কাছে সব সন্তান এক।
এরোজ রক্তচক্ষু নিয়ে বলল,
– আপনার সন্তান জঘন্য অপরাধী হলেও?
– এরোজ, ও যথেষ্ট শাস্তি পেয়েছে ওর কাজের জন্য। আর ও এখন বদলেও গিয়েছে। নিজের কাজের জন্য ও অনুতপ্ত! আর তাছাড়া, তোমাদের আসার আগে ও হোটেলে চলে যেতো। কিন্তু আমরা তো জানতাম না যে তোমরা আচমকা আজকেই আসবে। তোমাদের ফ্লাইট তো ছিল দু’দিন পরে।
এরোজ হাত শক্ত মুঠোবন্দী করে নেয়। অবসাদগ্রস্ত চোখে চেয়ে বলল,
– আপনাদের সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম, আম্মা। কিন্তু আপনারা আমাকেই সারপ্রাইজ করে দিলেন। আপনারা সবসময় আমার সুখ ছিনিয়ে নিতে পারেন না।
– কেউ তোমার সুখ ছিনিয়ে নেবে না, এরোজ।
নির্জনা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন।
এরোজ ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বিরোধ করে বলল,
– নেবে। আমি অনেক কষ্টে নিজেকে নায়েলের অভ্যাস হিসেবে গড়ে তুলেছি। ও এখনো আমায় পুরোপুরি পাপা ডাকে না। ইমরোজকে দেখলে ও আমায় ভুলে যাবে, আমার সাথে কানাডায় যেতে চাইবে না। ও আমার মেয়েকে আমার থেকে ছিনিয়ে নেবে।
এরোজের চোখ টলটল করছে রাগে। চোয়াল ভেঙে আসছে ভয় আর কান্নায়। এত কষ্টের পর সুখের ছোঁয়া পাওয়ায় সে এখন ভীষণ ভীতু হয়ে উঠেছে। এই সুখ সে কোনোভাবেই হারাতে চায় না। কিন্তু নায়েলের সাথে কী করে লড়বে? ও যে একটা নিষ্পাপ শিশু!
সে ভয়ে রীতিমতো দিক দিশেহারা হয়ে পড়ল। উত্তেজিত হয়ে বলল,
– আমি এখুনি আমার স্ত্রী সন্তান নিয়ে চলে যাব এখান থেকে। এখানে এক মুহুর্ত ও থাকব না।
তকদির সিকদার চোখ তুলে তাকান দিক দিশেহারা ছেলের দিকে। আশ্বস্ত করে বললেন,
– কিচ্ছু হবে না, এরোজ। ইমরোজ নায়েল কিংবা মৌন কাউকে ছিনিয়ে নেবে না। ও আজকেই চলে যাবে এখান থেকে। তুমি গিয়ে মৌনকে দেখো।
– এমনটা না হলে কিন্তু আমি বের হয়ে যাব বাড়ি থেকে। আর কোনোদিন পা দেব না এই বাড়িতে, আর না এই দেশে।
এরোজ আঙুল তাক করে কঠিন স্বরে বলল।
ইমরোজের রক্তিম চোখ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়ালো ঘর কাঁপানো সেই তীব্র অধিকারবোধ ভরা কণ্ঠ মিলিয়ে যেতেই। “আমার স্ত্রী সন্তান” কতটা অধিকার বোধসম্পন্ন বাক্য! অথচ তারা কিছুপল আগেও তার পরিবার ছিল। যাদের প্রতি পৃথিবীর সবার উর্ধ্বে শুধুমাত্র তার অধিকার ছিল।
হুইলচেয়ারের হাতল আঁকড়ে ধরা হাত দুটো থরথরিয়ে কাঁপছে। সেই সাথে সমানতালে ইমরোজের গাল ভিজে যাচ্ছে অসহায়ত্ব আর আফসোসে। একটাসময় নিজেকে আর আটকাতে পারল না ইমরোজ। চাপা স্বরে গুমড়ে কেঁদে উঠে বলল,
– ওরা তো আমার স্ত্রী সন্তান ছিল। আজ কেন ওদের উপর আমার আর অধিকার নেই? আমি ওদের ছুঁতে পারছি না, নিজের করে রাখতে পারছি না কেন? হে আল্লাহ, তোমার দেয়া শাস্তি এতটা যন্ত্রণাদায়ক কেন? আমার পরিবার আমায় ফিরিয়ে দাও প্লীজ, আল্লাহ। প্লীজ, আমি তোমার পায়ে পড়ছি।
ইমরোজ হাউমাউ করে কাঁদছে আর বিলাপ করছে। জীবনের এই মুহূর্তে এসে মনে হচ্ছে ছুরিকাঘাত মেনে নেয়া যায়, কিন্তু নিজের মানুষকে অন্যের হতে দেখা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
তপোবন একহাতে ছেলেকে দোল দিতে দিতে দরজায় নক করল।
– ইমরোজ, আসব?
বারান্দার দরজা সম্মুখে হুইলচেয়ারে বসে থাকা ইমরোজ চোখমুখ ঠিক করে নেয়। সেই এক্সিডেন্টে সে সৌভাগ্য না-কি দূর্ভাগ্যের জোরে প্রাণে বেঁচে গেলেও তার বাম পা বাঁচাতে পারেনি। সেটা কেটে ফেলতে হয়েছে। এরপর থেকে এই হুইলচেয়ার-ই তার নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠল।
সে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
– এসো।
তপোবন ভেতরে ঢুকে প্রলম্বিত এক নিঃশ্বাস ফেলল। এক্সিডেন্টের পর থেকে সে বদলে যাওয়া ইমরোজকে দেখেছে। গুমড়ে গুমড়ে মরতে দেখেছে। শাস্তির সময়সীমা আছে। যেখানে সৃষ্টিকর্তা কঠিন থেকে কঠিন গুনাহ মাফ করে দেয় সামান্য ক্ষমা চাওয়ার বিনিময়ে, সেখানে তার মানুষ নিতান্তই তুচ্ছ এক জীব! সে নীরবতা ভেঙে কিছু বলার জন্য উদ্যত হলেই ইমরোজ ভীষণ নম্র স্বরে বলল,
– কারোর জীবনে কোনোরূপ হস্তক্ষেপ করার ইচ্ছা আমার নেই, ভাইজান। আমি জানি, যা হারানোর তা আমি চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি। সেটা কোনোভাবেই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। আমি শুধু দু’টো দিন আমার মেয়েটাকে কাছে পেতে চাই। যদি তোমরা দয়া করো!
বলতে বলতেই পুনরায় ইমরোজের গলা ধরে আসল। কণ্ঠনালীর কাছে দলা পাকানো অসহনীয় ব্যথাগুলোর কারণে আর শব্দ বের হয় না। আজ নিজের সন্তানকে কাছে পাওয়ার জন্য তার অন্যের কাছে ভিক্ষা চাইতে হচ্ছে! জীবন এত করুণ কবে হলো? সে কী করে এতগুলো বছর অন্ধের মতো বেঁচে ছিল সুখগুলোকে অদেখা করে? পুনরায় ইমরোজের গাল ভিজতে লাগল অঝোরে।
ঠিক এই মুহুর্তে এসে তপোবনের মনে হলো জীবন ভীষণ জটিল। সে কোনদিকে যাবে? একদিকে একজন বাবার একটু আকুতি, অন্যদিকে একজনের হুট করে পেয়ে যাওয়া সুখের প্রতি তীব্র মোহ। ভাইয়ের নীরবতায় নাকচের আভাস পেয়ে ইমরোজ নিজের চোখের পানি মুছে ফিরে তাকালো। শঙ্কা দূর করে দিয়ে অনুনয় করে বলল,
– আমি শুধু দু’দিন নায়েলের সাথে থাকব এরপর আমি হোটেলে চলে যাব। তোমরা আনন্দ করতে পারবে নিজেদের মতো। আমি তোমাদের সুখের মাঝে অসুখ হয়ে আসব না।
অপরাধীর সাথে পাষণ্ডতা করতে পারলেও, একজন বাবার আকুতিকে উপেক্ষা করতে পারল না তপোবন।
তবুও কিছু বলল না। ক্ষীণ স্বরে সায় জানিয়ে বলল,
– আচ্ছা।
ঘরের এক কোনায় গুটিয়ে বসে থাকা দেহটিকে সজোরে বুকে জড়িয়ে নেয় এরোজ। হন্তদন্ত হয়ে বলে,
– লেট হিম গো, মৌন। সে আপনার জীবনে কোনোদিন হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। আমি আছি না? তবে আপনি কেন এমন করছেন? আপনার শরীর খারাপ হয়ে পড়বে। আপনি নিজের সাথে একটুও অন্যায় করতে পারেন না। এতে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। আমাদের একসাথে বাঁচতে হবে একদম বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত। শুনেছেন আপনি? কান্না থামান মৌন!
মৌনতা তবুও কান্না থামাতে পারে না। রুগ্ন মুখটি লাল হয়ে উঠেছে ভয় আর যন্ত্রণার তোপে। সে হেঁচকি তুলতে তুলতে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
– তা…তাকে দেখলে আমার ভয় করে, এরোজ। সেই সব দিনগুলো আমার চোখের সামনে ভাসে যেই দিনগুলো আমি গলা কাটা মুরগীর মতো ছটফট করেছি শুধু। কিন্তু ত…তার একটুও সহানুভূতি হয়নি আমার উপর।আম..আমার ম..মনে হয় সে আমার জীবন থেকে সুখ ছিনিয়ে নেবে। সে আ..আমার নায়েলকে নিয়ে যা…বে আমার থেকে।
এই এক ভয় এরোজকেও তাড়া করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সে প্রকাশ করল না। সে আলগোছে ক্রন্দনরত নারীটির দুগাল আঁকড়ে ধরে অজস্র চুমু দিয়ে বলল,
– নায়েলকে কেউ আমাদের থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। সবচেয়ে বড় কথা নায়েল আমাদের ছাড়া থাকতে পারবে না। নিজের সন্তানের উপর আপনার বিশ্বাস আছে না?
মৌনতা ঘন ঘন মাথা নাড়লো। তার বিশ্বাস আছে নিজের সন্তানের উপর। এরোজ ম্লান হাসল, তার ও বিশ্বাস আছে নিজের দেড় বছরের পরিশ্রম, ভালোবাসার উপর। এরপরেও যদি তারা হেরে যায় তবে সেটা তার দূর্ভাগ্য হবে।
ভরা লিভিংরুমের মাঝে মাথা নুঁইয়ে বসে আছে মৌনতা। রুগ্ন হাত দুটি মুঠোবন্দী করে পাশেই শক্ত চোয়ালে বসে আছে এরোজ।
তপোবন নম্র স্বরে অনুনয় করে বলল,
– নায়েল অনেক ছোট, এরোজ। আমাদের বড়দের সমস্যা বোঝার মতো বোধ ওর হয়নি। আমরা মানি বা না মানি, ইমরোজ ওর বায়োলজিক্যাল ফাদার। যত অপরাধই করুক না কেন ওর সন্তানের প্রতি ওর টান থাকবেই। ও অনুতপ্ত নিজের কাজে। ও আর কোনোদিন তোদের কিংবা আমাদের কারোর জীবনে কোনোরূপ হস্তক্ষেপ করবে না। ও শুধু দুটো দিন নায়েলকে কাছে পেতে চায়। আমি এর উপরে আর কি বলব বলতে পারিস? আমার ক্ষমতা নেই একজন বাবার আকুতিকে নাকচ করার। আমি আমার ব্যর্থতা মেনে নিচ্ছি।
পরপরই মৌনতার পানে চেয়ে বলল,
– আমি ভীষণ দুঃখিত মৌনতার কাছে। দেশে এসে যেন ওকে এমন বিপাকে পড়তে না হয় সেই সকল ব্যবস্থা আমি করে রেখেছিলাম। কিন্তু মাঝখান থেকে তোমাদের সারপ্রাইজ সবটা নষ্ট করে দিল।
তকদির সিকদার ও ছোট ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন,
– তুমি তো জন্ম না দিয়েও নায়েলকে হারাতে চাও না। সেখানে ওর জন্মদাতা ওকে একটু কাছে পেতে চেয়েছে এটা তো অন্যায় না। আমরা তো জালিম না যে তার আবদার পায়ে ঠেলে দেব।
এরোজ চোয়াল শক্ত তাকায় বাবার পানে। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
– তোমরা প্রতিবার ইমরোজের বেলায় দয়ার সাগর খুলে বসো। আর প্রতিবার আমার সাথে অন্যায় করার সময় তোমাদের দয়ার বানী ছাড়ো। পরিবর্তে কী হয় জানো? আমার সুখ ছিনিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু এবার আমি এটা কোনোদিন হতে দেব না। আমি এই মুহুর্তে নায়েল আর মৌনতাকে নিয়ে বেরিয়ে যাব এই বাড়ি থেকে। মৌন চলুন। নায়েল কোথায়?
এরোজ চকিতে উঠে দাঁড়ায়। গর্জে উঠে ডাকে,
– নায়েল, নায়েল কোথায় তুমি? পাপার কাছে এসো।
নায়েলের কোনোরূপ সাড়াশব্দ না পেয়ে এরোজ তাকে খুঁজতে চলে গেল। তপোবন মাথা নুইয়ে কপালে আঙুল ঘষছে। কীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনবে বুঝতে পারছে না। সে চোখ তুলে তাকায় রূপকথার বাহুডোরে গুটিয়ে বসে থাকা মৌনতার পানে। এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল ঠিক মেয়েটির সামনে। মৌনতা চোখ তুলে তাকায়। তপোবন ম্লান হেসে তার মাথায় হাত রেখে বলল,
– মৌন, আমি আট বছর যাবৎ দেখে আসছি তুমি কত কঠিন পরিস্থিতি মুখ বুঝে নীরবে সামলে গিয়েছ। আমি জানি পরিস্থিতিটা কতটা অস্বস্তিকর তোমার জন্য। কিন্তু আমি এটাও জানি আমাদের মৌন কত স্ট্রং। তুমি জানো, ইমরোজ আর কোনোদিন তোমার জীবনে কোনোরূপ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। অতীত সব মুছে গিয়েছে মৌন। অতীত আঁকড়ে বর্তমান নষ্ট করো না। দিনশেষে ইমরোজের নায়েল ছাড়া আর কেউ নেই। ও শুধু দুটো দিনের জন্য নায়েলকে কাছে পেতে চায়। এরোজকে একটু বোঝাও, তুমি সাহস পেলেই ও সাহস পাবে।
মৌনতা অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে মাথা নাড়লো। তপোবন ম্লান হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। মিহি স্বরে বলল,
– জীবনের সকল জটিলতা তুমি জিতে যাও। ভাইজান শুধু এতটুকুই প্রার্থনা করব।
ইমরোজ হাউমাউ করে কাঁদছে নিজের ছোট্ট অংশটিকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে। নায়েল ব্যথিত নয়নে চেয়ে ছোট ছোট হাতে বাবার পিঠে হাত চাপড়ে বলল,
– পাপা, ডোন্ট ক্রাই। হোয়াই আর ইউ ক্রাইং? নায়েল বেবি তো এসে গিয়েছি তোমাল কাছে।
ইমরোজ থামে না। থামতে পারে না। সে তার সন্তানটিকে এখন মন ভরে আদর ও করতে পারে না। মনে হয় এই বুঝি সময় ফুরিয়ে গেল। আর তার সন্তানকে সবাই ছিনিয়ে নিয়ে গেল! সে কাঁদতে কাঁদতে নায়েলের চোখেমুখে অজস্র ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে অনুনয় করে বলল,
– নায়েল, পাপা স্যরি। পাপাকে ছেড়ে যেওনা নায়েল। পাপার দম বন্ধ হয়ে আসে তোমায় ছাড়া। তুমি ছাড়া পাপার আর আপন বলতে কেউ নেই নায়েল। প্লীজ ডোন্ট লিভ মি এলোন।
বাবার কোলে বসে থাকা নায়েল ব্যথিত নয়নে চেয়ে বাবার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
– তোমায় ছেলে কোথাও যাবো না, পাপা। ডোন্ট ক্রাই পাপা। নায়েল কষ্ট পাচ্ছে।
ইমরোজের ক্রন্দনরত মুখে হাসি ফুটে উঠল মেয়ের আদুরে কথায়। এই ছোট্ট প্রাণটির মাঝে এত সুখ, সেটা সে আগে কেন বুঝল না? এই আফসোস সে কী করে মেটাবে? সে আরো দ্বিগুণ বেগে কাঁদতে লাগল। নায়েল শক্ত করে জড়িয়ে ধরল বাবাকে। কারোর কান্না দেখলে তার ও কান্না পায়। সে অভ্যাস অনুযায়ী সেও কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
– পাপা কেঁদো না। কাঁদছ কেন? তোমাল পায়ে ব্যথা কলছে? তুমি কেন চেয়ারে বসে আছো? ডাক্তাল দেখাওনি?
ইমরোজ তার চুলের গোছায় চুমু দিয়ে বলল,
– পাপা, তোমায় চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি নায়েল। আমি সারাজীবন কান্না করেও বোধহয় এই আফসোস মেটাতে পারব না।
– কী বলছ পাপা?
ইমরোজ কাঁপতে থাকা ঠোঁট কামড়ে এদিকওদিক তাকালো। অস্থিরচিত্তে শুধু উপায় খুঁজছে, কী করে নায়েলকে তার বুকে আগলে রাখবে। কিন্তু আফসোস কোনো উপায় নেই।
সে ফিসফিসিয়ে বলল,
– পাপার কাছে থেকে যাও না নায়েল।
– থাকব তো। আমলা তো তোমাল কাছেই থাকব। তাই তো চলে এসেছি বিদেছ থেকে।
পরপরই উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
– তুমি কেন নিতে যাওনি মাম্মা আল আমাকে? আমি মিস কলেছি তোমায়।
নায়েল বাচ্চাসুলভ কণ্ঠে বলল। কিন্তু সে যে সত্য থেকে অজানা। ইমরোজ ফ্যাসফেসে কণ্ঠে বলল,
– পাপা অপরাধ করেছি, মা। যেই অপরাধের শাস্তি হিসেবে আল্লাহ তোমাদের আমার থেকে চিরতরে কেড়ে নিয়েছে।
– অপলাধ? মানে ব্যাড কাজ?
– হুম।
সহসা নায়েলের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
– ব্যাড কাজ করলে স্যলি বলতে হয়। তুমি স্যলি বলে দাও আল্লাহকে। তাহলে আল্লাহ ‘ইটস ওকে’ বলে দেবে। আল কষ্ট পেতে হবে না তোমায়।
মেয়ের সহজ উপায়ে ইমরোজের চোখ বেয়ে আবারো ঝরঝরিয়ে অশ্রু গড়াতে লাগল। সে শব্দ করে কেঁদে উঠে বলল,
– আফসোস, জীবন তোমার ভাবনার মতোই সহজ হতো নায়েল। তবে আমি তোমায় সারাজীবন আমার বুকে রাখতে পারতাম। কিন্তু জীবন অনেক কঠিন মা।
– তবে তুমি চাইলে পাপার জীবনটা সহজ করতে পারো মা। পাপার কাছে থেকে যাও। কানাডায় চলে যেও না।
নায়েল প্রগাঢ় হেসে মাথা দুলিয়ে বলল,
– যাব না। আল কেঁদো না। নায়েল দুঃখ পাই তো।
সে বাবাকে আবার জড়িয়ে ধরল। সে যে আদরের পাগল। আর বাবার আদর তার সবচেয়ে প্রিয়!
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এরোজের চোখের সামনে ধোঁয়াশা হয়ে আসল নায়েলের কথা কর্নকুহরে প্রবেশ করতেই। হাত পা থরথরিয়ে কাঁপতে লাগলো। সকল আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা এক নিমিষেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল নায়েলের দৃঢ় কণ্ঠে। সুঠামদেহটি অচিরেই ভীষণ দূর্বলতা অনুভব করল। এতটাই দূর্বলতা অনুভব করল যে এক মুহুর্ত ওখানে দাঁড়ানোর শক্তি পেল না। এরোজ এলোমেলো কদমে সরে যায় সেখান থেকে। পেছনে ফেলে যায় একবুক যন্ত্রণা!
মৌনতা নিজেকে সামলায়। সে কোনো অপরাধ করেনি আর না কেউ তার জীবন পুনরায় যন্ত্রণাময় করার অধিকার রাখে। তবে সে কেন ভয় পাবে? এরোজকে নিচে নামতে দেখে সে উঠে দাঁড়ায়। আনত স্বরে শুধায়,
– নায়েলকে পেয়েছেন?
এরোজ তার কথার কোনোরূপ জবাব দিলো না। সবাইকে প্রশ্নবিদ্ধ করে সে বিধ্বস্ত বদনে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। মৌনতা তার হঠাৎ বদলে যাওয়া আচরণ বুঝে উঠতে না পেরে পিছু ডাকল,
– এরোজ, আমার কথা শুনুন।
এরোজ একবারের জন্যও পিছু ফিরল না। অসহনীয় দুঃখ সহ্য করতে না পেরে সে এক প্রকার পালিয়ে গেল।
জবা ওড়নার কোনা খুঁটতে খুঁটতে গুরুগম্ভীর পরিবেশকে ভঙ্গ করে বলল,
– আবার কী হইলো? ষাঁড় গরু হঠাৎ এমন শান্ত হইয়া গেল ক্যান?
রোজ আড়চোখে কঠিন দৃষ্টি ফেলল তার দিকে। নির্জনা বেগম অতিষ্ট হয়ে বললেন,
– তপোবন, এত ঝামেলা ভালো লাগছে না। ইমরোজকে এই কদিনের জন্য হোটেলে থাকতে বলো।
তপোবন মাথা নত করে বসে আছে। আনত স্বরেই বলল,
– আম্মা, আব্বুকে বলুন প্লীজ।
জড়তায় তপোবনের কণ্ঠ জড়িয়ে আসছে। মৌনতা শুকনো ঢোক গিলে চোখের পানি মুছে নিলো। চোখ তুলে তাকায় ঘরভর্তি সবার পানে। বলল,
– ভাইজান, আব্বুজান! কারোর কোথাও যেতে হবে না। আমি কোনো অপরাধ করিনি তবে আমি কেন মুখ লুকিয়ে বেড়াব? আর না কারোর এখন অধিকার রয়েছে আমার জীবনে হস্তক্ষেপ করার। এটা তার ঘর সে থাকতেই পারে। সে নায়েলের জন্মদাতা। সেই হিসেবে তাকে কাছে চাইতেও পারে। তেমনি এটা আমার স্বামীর ও বাড়ি। আমার ও এখানে মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার আছে। কিন্তু দিনশেষে আমার সন্তান কখনোই এমন একজন মানুষের কাছে চিরতরে থাকবে না, যার পিতৃত্ব ভীষণ দূর্বল।
তপোবন সহ রূপকথা আর রোজের মুখে হাসি ফুটে উঠল। তারা যেন ঠিক এতটুকু সাহসের ই অপেক্ষাতে ছিল। রোজ খলবলিয়ে উঠে বলল,
– একদম ঠিক, মৌনবউ। যে অপরাধ করেছে সে মুখ লুকিয়ে চলবে। তুমি কেন অস্বস্তি বোধ করবে! এইতো আমার মৌনবউ আসল রূপে এসেছে।
তকদির সিকদার ও প্রসন্ন হলেন। সে এগিয়ে এসে মৌনতার মাথায় হাত রেখে স্নেহের কণ্ঠে বললেন,
– চলতি পথে নিজের মাঝে ততক্ষণ কোনো জড়তা বা অস্বস্তি রেখো না, যতক্ষণ না তুমি কোনো অপরাধ করছ। বুঝলে? আব্বুজান সবসময় তোমার সাথে আছি। আল্লাহ আর একবার সুযোগ দিয়েছে জীবনকে উপভোগ করার। ভীষণ আনন্দের সাথে উপভোগ করো, প্রিয়জনকে ভালোবাসো। আর তোমার রগত্যাড়া বরটাকে একটু শান্ত করিও। কথা ছোঁয়ানোর আগে খ্যাক করে ওঠে।
মৌনতা ম্লান হেসে মাথা দোলাল। পরমুহূর্তেই পরিষ্কার হলো এরোজের আচরণের কারণ। নায়েল বাবার কোলে লেগে ছিল পরবর্তী পুরোটা সময়। বাড়ির সবাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেখল সেই দৃশ্য।
মৌনতা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কোলে থাকা তাশফিন আর তাথৈ এর দিকে। ছলছলে দৃষ্টিতে অতৃপ্ততা আর তৃষ্ণা। সে মলিন হেসে বলল,
– আল্লাহ তোমার কোল সুখ দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে, রূপকথা। তুমি যেমন সুখের হকদার, আল্লাহ তোমায় তেমনি সুখ দিয়েছে।
রূপকথা স্পষ্ট দেখল তার চোখে অতৃপ্ততার হাহাকার। সে ম্লান হেসে বলল,
– আমার আপনার আছে না-কি? এই সুখ দুটো তো আমাদের সবার।
জবা খলবলিয়ে উঠে বলল,
– ভাবিজান, আমি কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবিনাই ছোডো ভাইজান আফনের জন্য অমন নেশাখোর হইয়া ঘুরত। আমি কত বলদ! এর জন্যই ভাইজান আফনের দিকে কহনো তাকাইতো না। এইডা যে আমি ক্যান আগে খেয়াল করিনাই?
জবার কণ্ঠে আফসোস। মৌনতা আড়চোখে চেয়ে বলল,
– খেয়াল করলে কী করতি?
জবা কপাল কুঁচকে বলল,
– কালা জাদু কইরা ল্যাংড়া ভাইজানের সংসার থিকা আফনেরে ছাড়াইয়া আনতাম। আর ছোডো ভাইজানের লগে বিয়ে দিয়া দিতাম।
রোজ ল্যাপটপ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তিনজনের দিকে তাকায়। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– আপনার মতো শর্টকাট বুদ্ধি জীবনে এপ্লাই করলে এতদিনে কবরে থাকতে হতো, আপা। এত কথা না বলে আমার লেহেঙ্গা সিলেক্ট করতে সাহায্য করো সবাই। এগুলো কত বিভ্রান্তিকর! সব সুন্দর!
রূপকথা হেসে বলল,
– তোমার বড় ভাইজান বলেছে, যা যা পছন্দ হয় সব নিয়ে নিতে। কোনো কম্প্রোমাইজ না করতে। তুমি নিশ্চিন্তে সিলেক্ট করো।
রোজ আনত স্বরে বলল,
– এগুলো তো তৃশান পাঠিয়েছে পছন্দ করার জন্য।
– সেটাই, ওখান থেকে বাড়তি কিছু পছন্দ হলেও নিয়ে নিতে বলেছে তোমার ভাইজান।
– আচ্ছা ঠিক আছে। এখন এগুলো দেখো। এরপর তোমাদের পোশাক সিলেক্ট করতে হবে।
জবা বলল,
– আমারে দেন আফা আমি একদম চমলক্ক একটা লেহেঙ্গা পছন্দ কইরা দিমু।
রোজ তেরছা চোখে চেয়ে বলল,
– সেই লেহেঙ্গা পরে আমি বিয়ে করতে না পারলেও, চানাচুর বিক্রি করতে অবশ্যই পারব, তাই না আপা?
-আফা, আফনে আমারে অপমান করতে পারেন না।
জবা মুখ ফুলিয়ে বলল। রোজ মুখ বাঁকালো।
তারা পোশাক সিলেক্ট করতে বসল। কিন্তু মৌনতার
অন্তঃস্থল বিচলিত নায়েল আর এরোজকে নিয়ে। তারা কী করে নায়েলের সাথে এই কঠিন সম্পর্ক নিয়ে লড়াই করবে?
তন্মধ্যেই তানশান দরজার নক করল।
– ছোট মা? আসব?
মৌনতা ধাতস্থ কণ্ঠে বলল,
– এসো, আব্বু।
তানশান উঁকি দিয়ে ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
– ছোট মা নায়েলের ঘুম পেয়েছে। ও কী খাবে এখন?
মৌনতা উঠতে উঠতে বলল,
– কোথায় ও? আমার কাছে আসতে বলো, আমি খাইয়ে দেব।
তানশান কাঁচুমাচু করে বলল,
– নায়েল, মেজো পাপার কাছে ঘুমাবে। মেজো পাপা’ই আমাকে পাঠিয়েছে ওর খাবার নিতে।
মৌনতার দেহ স্তিমিত হয়ে এলো। রূপকথা আর রোজ একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। কিন্তু মৌনতা কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে বলল,
– দুধ কলা দিয়ে ভাত খায়।
রূপকথা মেজো ছেলেকে তানশানের কোলে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
– আমি দিচ্ছি ভাবি। আপনি বসুন।
মৌনতা বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টি ফেলে বলল,
– তুমি আমায় আপনি বলা ছাড়তে পারোনি রূপকথা?
রূপকথা বোকাসোকা হেসে বলল,
– দুঃখিত ভাবি, ভুল হয়ে যায় আরকি। তুমি বসো। আর কিছু কী খাবে?
– নাহ, তুমি নায়েলকে একটু খাবারটা দাও।
রূপকথা মাথা নেড়ে চলে যায়। তানশান ভাইকে কাঁধে বসিয়ে নিতেই বিছানায় ফুপির গায়ে ঠেস দিয়ে বসা তাথৈ শব্দ করে উঠল,
– ভা ভা ভা!
তানশান চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো বোনের পানে।
রোজ হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,
– আরে আমার ছোট্ট ফুপিমনি তো দেখছি ভাইকে ডাকছে। যাক এই পুঁচকেটা বড় দুই ভাইয়ের মতো রোবোট হয়নি।
তানশান ভ্রুক্ষেপ না করে ভাইকে কাঁধে বসিয়ে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে বোনের সামনে। মৃদু হেসে বলল,
– জি ভাইজান, বলুন।
ছোট্ট নাদুস নুদুস তাথৈ জবাবের বদলে চার হাত পায়ে ভাইয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ল। তানশান নীরব আবদার বুঝে হেসে ফেলল। তার ভাই বোন দু’জনেই বেশ স্বাস্থ্যবান। বাবা দাদুভাই আর সে ছাড়া কেউ একসাথে দু’জনকে তেমন কোলে নিতে পারে না। সে ভাইকে এক কাঁখে নিয়ে বোনকেও তুলে নিলো আরেক কাঁখে। বলল,
– হয়েছে? খুশি?
তাথৈ জবাব দিল না ঠাস করে ভাইয়ের চুল মুঠোয় পুরে নিলো। সহসা শান্তশিষ্ট তাশফিন চিৎকার করে কেঁদে উঠল। রোজ চেঁচিয়ে উঠল,
– আরে আরে আমার ছোট রোবোটের বাচ্চার চুল ছিঁড়ে ফেলল রে!
তানশান তড়িঘড়ি করে বোনকে ফুপির কোলে দিয়ে ভাইকে বুকে জড়িয়ে নিলো। অজস্র চুমু দিতে দিতে বলল,
– ভাইজান স্যরি তাশু, বোনু ব্যথা দিয়েছে? বোনু তো ছোট্ট তাই বোঝেনি। স্যরি স্যরি কেঁদো না। ভাইজান আদর করে দিচ্ছি।
সে তড়িঘড়ি করে যতপ্রকার মন ভোলানো কাজ আছে সব করল। এক পর্যায়ে গিয়ে তাশফিনের কান্না থামলো। সে ভাইয়ের কাঁধে মাথা রেখে নীরবে ফোঁপাতে লাগল। তানশান হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বোনের দিকে তাকায়,
– এটা কী ঠিক করলে? দেখেছো ভাইয়া কত ব্যথা পেয়েছে? দিস ইজ ভেরি ব্যাড বোনু।
তাথৈ বুঝল না ভাইয়ের কথাগুলো। সে দাঁত কেলিয়ে হেসে নুপুর পরিহিত পা দোলাতে লাগল। তানশান হেসে উঠল তার দাঁত কেলানো দেখে। সে মাথা নুইয়ে ফোলা ফোলা গালে চুমু দিয়ে বলল,
– আমার দুষ্টু ভাইজান! অপরাধ করে হাসা হচ্ছে?
মৌনতা হাসছে তিন ভাইবোনের মেলবন্ধন দেখে। প্রার্থনা করল, তারা যেন এমনি থাকে সারাজীবন। কোন সৎ, আপনের ভেদাভেদ তাদের মধ্যে না ঢুকতে পারে।
রাতভর নায়েল আসল না বাবার কাছ থেকে। বাবার কান্নার দৃশ্য ছোট্ট নায়েলের জন্য বেদনাদায়ক ছিল। নিষ্পাপ প্রাণটি কাউকে কান্না করতে দেখতে নারাজ।
কিন্তু নিষ্পাপ প্রাণটি কী জানে, সে কারোর ঘুমের টনিক? সে কী জানে সে কারোর বুকের প্রশান্তি? যাকে বুকে না পেলে মানুষটা ছটফট করে গলা কাটা মুরগীর মতো?
‘সন্তান ফিরবে তার বুকে’ এই পথ চেয়ে থাকা পুরুষটি রাতভর কাটিয়ে দিল। কিন্তু সন্তান ফিরে আসল না তার বুকে। পিতা না হয়েও পিতৃত্বের অসহনীয় যাতনা নিয়ে এরোজ নির্ঘুম রাত কাটাতে লাগল। অন্তঃস্থল যে একটু একটু করে শক্তি হারাচ্ছে। সে এখন কিসের ভিত্তিতে লড়বে? নিজের অসহায়ত্ব অনুভব হতেই এরোজের চোখ রক্তিম হয়ে উঠল। মৌনতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
– এখানে বসে থেকে কী করবেন? ঘুমাতে চলুন। সকালে চলে আসবে।
এরোজ একচুলও নড়ল না দোতালার সম্মুখে ছোট্ট টেরেসে পেতে রাখা সোফা থেকে। বরং ভাঙা কণ্ঠে আর্তনাদের স্বরে বলে উঠল,
– ও কেন আমার মেয়ে নয়? ও আমার মেয়ে হলে কেউ ওকে আমার থেকে কেড়ে নেয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারত না। আই নিড হার! শি ইজ মাই ব্যাড হ্যাভিট!
মৌনতা ম্লান হেসে উঠল সেই আর্তনাদ ভরা কণ্ঠে। ধিমি কণ্ঠে বলল,
– আপনি কেন ওকে এত ভালোবাসেন?
– ও সেই মানুষ যার মাঝে আমি আপনাকে খুঁজে পাই। ছয় বছর পর আমি তার মাঝেই আপনাকে দেখতে পেতাম, আপনাকে অনুভব করতে পারতাম। যেটা বাস্তবে আমার জন্য নিষিদ্ধ ছিল। সে আমার কাছে খুব মূল্যবান।
মৌনতার দৃষ্টি ছলছল করে উঠল সেই মনোমুগ্ধকর জবাবে। আফসোসের সুরে বলে উঠল,
– এক জীবনে এক এরোজের দেখা পাওয়া এতটা মুশকিল কেন?
এরোজ ম্লান হাসল নারীটির আফসোসে জর্জরিত কণ্ঠে। বলল,
– এক জীবনে এক ইমরোজকে পেয়েছিলেন বলেই এত সহজে এরোজকে মূল্যায়ন করছেন।
– সেই মূল্যায়নে কী লাভ যেই মূল্যায়নে অতীত ছায়ার মতো তাড়া করে বেড়ায়?
– অতীত ভুলে এগিয়ে চলা সৃষ্টিকর্তা দেয়া একটা কঠিন পরীক্ষা। সবাই উত্তীর্ণ হতে পারে না।
– কিন্তু আমি পারব। কারণ আমার সাথে একজন এরোজ আছে।
– হুম।
গালে হাত ঠেকিয়ে অলস কণ্ঠে বলল এরোজ। মস্তিষ্ক আর দৃষ্টি তখনো এঁটে আছে ঠিক দশ ফুট দূরে থাকা বদ্ধ ঘরটির দিকে। মনে হচ্ছে এইতো তার ছোট্ট প্রিন্সেস দরজা খুলে ছুটে বের হবে ‘ছোট পাপা’ ডাকতে ডাকতে।
তবে সৃষ্টিকর্তা বোধহয় এরোজের এক জীবনে পাওয়া সকল দুঃখ ঘুঁচানোর দায়িত্ব নিয়েছেন। তার চাওয়াটি পূরণ হলো। ইমরোজের ঘরের দরজাটি নিঃশব্দে খুলে যেতেই এরোজ সচকিত হয়। দৃষ্টি সরু হয়। স্কাই ব্লু রঙা হাফ প্যান্ট আর সাদা ঢিলেঢালা টিশার্ট পরিহিত নায়েল খোলা চুলে পা টিপে টিপে বের হয়েই এক ছুট লাগালো তার ঘরের দিকে।
ঠিক এরোজের ঘরের সামনে আসতেই নায়েলের গতিরোধ হলো অদূরে টেরেসে জ্বলতে থাকা আলোর মাঝে অতি পরিচিত অবয়ব দেখে। সে চেঁচিয়ে উঠল,
-হেই, ছোট পাপা!
বলেই সে ছুট লাগালো টেরেসের দিকে। হন্তদন্ত হয়ে থামল রকিং চেয়ারে দুলতে থাকা এরোজের কাছে গিয়ে। কোমরে হাত দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বলল,
-আই মিসড ইউ সো মাচ। আমায় কোলে নাও।
রোজকার ন্যায় আদুরে আবদার। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো আজ এরোজের থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাচ্ছে না নায়েল। সে আবার বলল,
-আমায় কোলে নাও। আমাল ঘুমি পেয়েছে।
এরোজ গালে থুতনি ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। সেভাবেই থমথমে মুখে জবাব দিলো,
-পারব না।
-কেন পালবে না?
-ইচ্ছে করছে না।
-কিন্তু আমাল তো ঘুম পেয়েছে।
-ঘুম পেলে ঘুমাও। এখানে কী করছ?
নায়েল খোলা চুলে হাত পেঁচাতে পেঁচাতে বলল,
-পাপাল কাছে ঘুমাতে পালছি না আমি। আমাল ঘুম আসছে না। তুমি কোলে নিয়ে হাঁটো আর স্টোলি বলো। তবে ঘুম আসবে।
-পারব না।
পুনরায় এরোজের ত্যাড়া কণ্ঠে নায়েল এবার রেগে গেল।
-কেন পালবে না? দিস ইজ ভেলি ব্যাড! আমাল ঘুম পেয়েছে, তালাতালি কোলে নাও বলছি।
এরোজ চোখ খুলে তাকায় রাগান্বিত মুখপানে। রেগে বলল,
-বলছি না কোলে নেব না? যেখানে ঘুমাতে গিয়েছিলে সেখানে ঘুমাতে যাও। আমি তো কেউ না তোমার! তবে কেন এসেছ আমার কাছে?
নায়েল কোমরে হাত দিয়ে চোখ গরম করে তাকালো। মাথা ঝাঁকিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলল,
-একছবার আসব।
-কেন আসবে?
-তুমি আমাল ছোট পাপা তাই।
-তাতে কী হয়েছে?
-তুমি আমায় ভালোবাসো।
-না, আমি তোমায় ভালোবাসি না।
-বাসো।
-না, বাসি না।
নায়েল ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বলল,
-আমি বলেছি তুমি আমায় ভালোবাসো।
-আমি তোমায় একটুও ভালোবাসি না।
নায়েল সশদে মেঝেতে পা চাপড়ে বলল,
-বাসো, বাসো বাসো। কোলে নাও বলছি।
এরোজ ও তার মতো তেঁতে উঠে বলল,
-বাসি না, বাসি না, বাসি না। কোলেও নেব না।
নায়েল ফুঁসে উঠে এবার নিজেই এরোজের গা বেয়ে বেয়ে কোলে উঠে গেল। টি টেবিলে ছড়িয়ে রাখা পায়ের উপর পা গুটিয়ে আসন পেতে বসে দু’হাতে শক্ত করে চেপে ধরল এরোজের গাল। দু’জনের চোখ একে অপরকে ভস্ম করে দিচ্ছে।
নায়েল রাগান্বিত স্বরে বলল,
-বলো, ভালোবাসো?
এরোজ কপাল কুঁচকে বলল,
-ভালোবাসি না।
নায়েল রেগেমেগে এবার এরোজের গালে চুমু দিল দুইটা। বলল,
-এবাল বলো, ভালোবাসো।
-একদমই বাসি না।
নায়েল এবার পুরো মুখে অজস্র চুমু দিয়ে বলল,
-এবাল বলো ভালোবাসো।
-নাহ।
সহসা মেয়েটির ধৈর্য ভেঙে গেল। সে চিৎকার করে কেঁদে উঠে বলল,
-কেন এমন কলছ আমাল সাথে? আমায় লাগ দেখাচ্চ কেন? আমি কী কলেছি? আমাল তো ঘুম পেয়েছে।
এরোজ এতক্ষণ যাবৎ চেপে রাখা আনন্দ আর কান্না গুলো আবার গিলে নিলো। নায়েল কাঁদতে কাঁদতে তার গাল চেপে ধরে ঠোঁটে চুমু দিয়ে বলল,
-এই আদল কলে দিয়েছি। আল লাগ দেখাবে না বলে দিলাম! আমায় আদল কলো। কোলে নাও বলছি। আমি তিন্তু কষ্ট পাচ্ছি।
এরোজের সংযম ভাঙে। হাত বাড়িয়ে চট করে ছোট্ট দেহটিকে বুকে মিশিয়ে নিলো। আচমকাই নায়েলকে ভড়কে দিয়ে এরোজ হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠে বলল,
-নায়েল, প্লীজ ছোট পাপাকে ছেড়ে চলে যেওনা। ছোট পাপা তোমায় ছাড়া এক মুহুর্ত ও থাকতে পারব না।
নায়েল পড়ল মহা বিপাকে। তার কান্নার বেগ হারিয়ে যায়। সে বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বল,
-আলে সবাই শুধু কান্না কলে কেন? পাপা কান্না কলে, ছোট পাপা কান্না কলে, সবাই কান্না কলে।
সে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল এরোজের গলা। বলল,
-যাবো না কোথাও। আমি তোমাল সাথেই থাকব। তাই তো পাপাকে ঘুম পালিয়ে আমি চুপি চুপি বেলিয়ে এসেছি। পাপাও কান্না কলে তোমাল মতো। শুধু বলে, নায়েল আমায় ছেলে যেওনা। আমি কোথায় যাব?
শেষের কথাটা নায়েল অবুঝ কণ্ঠে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল। এরোজ কাঁদতে কাঁদতে হেসে ফেলল তার চুপি চুপি বেরিয়ে আসার গল্প শুনে। রক্তের টান প্রকট হলেও তার ভালোবাসার টান একদম ফিকে পড়তে দেয়নি তার ছোট্ট প্রিন্সেস। সে আদরে আদরে ভরিয়ে তুলল নায়েলকে। হেঁটে হেঁটে ঘুম পাড়ালো। দশ মিনিটের মধ্যেই নায়েল ঘুমিয়ে গেল। এরোজের চোখেও নেমে এলো প্রশান্তির ঘুম।
মৌনতা স্মিত হেসে দেখল একে অপরের ঘুমের টনিককে জড়িয়ে ধরে ঘুমানো। এবার তার দায়িত্ব অতীতের সব যন্ত্রণা ভুলে সুখকে আগলে নেয়া।
পার্পেল রঙা মসলিন শাড়িটির মাঝে হিরের ন্যায় জ্বলজ্বল করছে সাদা পাথরগুলো। তবে অত্যাধিক সৌন্দর্যে মোড়া শাড়িটি জড়িয়ে রাখা দেহটি ঠিক ততটাই বিদঘুটে লাগছে।
কানে ছোট্ট সাদা পাথরের একটা ইয়ারিং, হাতে সাদা পাথরের চুরি, গলায় ছোট্ট হিরের পাথর ঝুলতে থাকা একটি চেইন, চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা মিষ্টি রঙা লিপস্টিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার বদলে বিদঘুটে সৌন্দর্য সৃষ্টি করল মৌনতার মাঝে। যার পুরো কৃতিত্ব যায় তার মাথা ভর্তি আঙুলের এক চিমটির ন্যায় ব্রাউন রঙা চুলগুলোর উপর।
নারীর আসল বাহ্যিক সৌন্দর্য যে তার চুলের মাঝে নিহিত। এটা এতদিনে হাজারবার অনুধাবন করেছে মৌনতা। তাই বুঝি, সৃষ্টিকর্তা এই চুলগুলোকে আড়াল করে রাখতে বলে দুনিয়ার মানুষ থেকে!
নিজের বিদঘুটে রূপ দেখে মৌনতা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। হিজাব ছাড়া তাকে দেখতে ঠিক শকুনের মতো লাগছে। সে ফোঁপাতে ফোঁপাতে অস্থির চিত্তে নিজের সাজগোজ মুছতে লাগল। হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে লিপস্টিক ঘষা দিতেই ঘরের দরজা খুলে গেল মৃদু শব্দতুলে।
মৌনতা চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। ব্যস্ত কদমে ঘরে ঢোকা এরোজের পা দুটো থেমে গেল অনাদরে। অলসতা আঁছড়ে পড়ল ব্যস্ত বদনটিতে। সে অলস দেহ দেয়ালের সাথে ঠেকিয়ে মৃদু হাসল। বিমুগ্ধ চিত্তে বলল,
-মাশাআল্লাহ! আমার ঘরে আজ অসময়ে পূর্ণিমার চাঁদ নামল যে?
নোনাজলে লেপ্টে যাওয়া কাজল, ঠোঁটের চারিপাশ ছড়িয়ে থাক এবড়োখেবড়ো লিপস্টিক, রুগ্ন চেহারা, মাথায় বাচ্চাদের মতো কিছু ছোট ছোট চুল এতটাই বিদঘুটে রূপ তৈরি করেছে যে মৌনতা নিজেই নিজের দিকে তাকাতে পারছে না। অথচ সামনের মানুষটা কত মুগ্ধতার সাথে তার প্রশংসায় মত্ত। সে হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল,
-স্বান্তনা দিচ্ছেন?
এরোজ স্মিত হেসে হাত বাড়িয়ে দরজাটা লাগিয়ে দিলো। বুকে হাত গুঁজে বলল,
-মনকে স্বান্তনা দিচ্ছি। যা আপনাকে দেখে উন্মত্ত হয়ে পড়ে। তাকে বোঝাচ্ছি, আপনি আমার। তবে কেন এত উন্মাদনা?
মৌনতা বিশ্বাস করে না তার কথা। কারোর ভালোবাসা এতটা স্বার্থহীন হতে পারে না। সে আরো একবার নিজেকে আরশিতে দেখে। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
– আমায় দেখতে ভয়ঙ্কর বিশ্রী লাগছে তাই না?
এরোজ বলহীন অলস দেহে চেয়ে রইল হীনমন্যতায় আচ্ছন্ন মুখপানে। ক্ষীণ স্বরে বলল,
– সামান্য একটা জড়বস্তু কী করে আপনার সৌন্দর্য্যের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারে, মৌন? কখনো আমার চোখে তাকিয়ে দেখুন না, আমার মৌনকে দেখলে আপনি মুগ্ধ হয়ে যাবেন।
-মিথ্যা কথা!
মৌনতা আরো শব্দ করে কেঁদে উঠল। এরোজ ম্লান হেসে বলল,
-আমার মৌনকে দেখবেন?
মৌনতার কান্নারা ভড়কায়। সে চোখ তুলে তাকায়। এরোজ ধীর কদমে এগিয়ে আসে। পড়নে থাকা ধূসর প্যান্ট আর সাদা শার্ট। শার্টটির টপ বোতামের তিনটা বোতাম খুলতে খুলতে ঠিক মৌনতার সামনে এসে দাঁড়ালো। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিল ঠোঁটের বাম পাশ। যেখানে এবড়োখেবড়ো লিপস্টিক অদ্ভুত মাদকাতার সাথে লেপ্টে আছে।
মৃদু সেই স্পর্শে নারীটির রুগ্ন কায়া ঈষৎ কাঁপল।
অপ্রস্তুত কণ্ঠে বলল,
-নায়েল?
-বড় ভাইজানের কাছে। বাবুদের কাছে ঘুমাবে সে।
মৌনতা অস্থির ভিন্ন সেই নৈকট্যে। এক পা পেছাতে পেছাতে বলল,
-ওহ।
এরোজ মৃদু হেসে চোখে চোখ রাখে। হাত বাড়িয়ে আঁটকে দেয় নারীটির পেছানো। দু’জনের নিঃশ্বাস বাজেভাবে লেপ্টে যাচ্ছে একে অপরের সাথে। নারীটির অপ্রস্তুত চোখে চোখ রেখে ক্ষীণ স্বরে বলল,
-লিপস্টিকটা ঠিক করে দেই? এটা ডাইভার্ট করছে।
মৌনতা হাত বাড়িয়ে একটা টিস্যু ধরিয়ে দিলো তার হাতে। হাতের টিস্যুর পানে চেয়ে এরোজ স্মিত হাসল। ফেলে দিয়ে বলল,
-আমার কাছে আমার ব্যক্তিগত টিস্যু রয়েছে।
-টিস্যু আবার ব্যক্তিগত হয়?
-হয়।
মৌনতা কপাল কুঁচকে প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাকালো। কিন্তু প্রশ্নের জবাবে দু’টো খরখরে ওষ্ঠ ঠিক তার ওষ্ঠকোণে লেপ্টে যেতেই তার দেহ মৃদু ছলকে উঠল। ক্রমেই উষ্ণ ভেজা স্পর্শ তাকে পরিচিয় করালো সেই অনবদ্য ব্যক্তিগত টিস্যুর সাথে।
মৌনতা বদ্ধ চোখে খামচে ধরে পুরুষালী শার্টের আস্তিন। জীবন তাকে এক পর্যায়ে পুরুষালী স্পর্শের সাথে পরিচয় করালেও, সেই স্পর্শে ছিল শুধু কামুকতা। কোনো অনুভূতির অস্তিত্ব ছিল না। যা তার মুখে লজ্জার আবির্ভাব ঘটাত না। কিন্তু এটা কেমন স্পর্শ? যে স্পর্শে পা থেকে মাথা পর্যন্ত এক তীব্র শিহরণ ক্ষিপ্রতার সাথে ছুটে চলে! শুকনো ঢোক গিলার শব্দটা এ নিস্তব্ধতায় বেশ জোরেই শোনাল। দুটি ওষ্ঠদ্বয় আলাদা হলেও একে অপরকে ঈষৎ ছুঁয়ে লজ্জা দিতে ব্যস্ত!
অসহ্য সেই স্পর্শের প্রখরতা সহ্য করতে না পেরে মৌনতা ছটফটিয়ে দূরে সরতে চায় পুরুষালী বাহুডোর থেকে। কিন্তু তাতে ঘোর বিরোধ! একটা হেঁচকা টানে রুগ্ন দেহটি আবারো আষ্টেপৃষ্ঠে আঁটকে গেল শক্তপোক্ত হাতের আড়ালে। ভেজা অশ্রুদ্বয় অনুভূতির পালাবদলে স্তব্ধ, নিস্তেজ। কানে দুটি ওষ্ঠদ্বয় ছুঁয়ে গেল। কর্ণকুহরে আন্দোলিত হলো অদ্ভূত আবদার।
-ডোন্ট গো! আই হ্যাভ আ ডিপ কনভারসেশন উইথ ইউ। লেট মি ডু দিজ, প্লীজ!
কনভারসেশন? যে কনভারসেশনে থাকে না কোনো শব্দের বিনিময়; থাকে শুধু স্পর্শের বিনিময়। অপরাগ মৌনতার কম্পিত দেহ একে একে পরিচিত হতে লাগল এক অন্য অনুভূতির সাথে। আঙুলের ভাঁজে আঙুল, ত্বকের সাথে ত্বকের তীব্র ঘর্ষণ আর ঠোঁটের কোল ঘেঁষে উষ্ণ ঠোঁটের ছোঁয়া। পুরুষালি আঙুলের অবাধ্য টানে গলার মসৃণ ত্বক ছেড়ে খসে পড়ল ছোট্ট হিরের লকেট ঝুলতে থাকা চেইনটা। কলার বোনের উপর থাকা সেন্ট্রাল লাইনের কালচে দাগের উপর দু’টো উত্তপ্ত ওষ্ঠ লেপ্টে গেল। মৌনতার পৃথিবী সংকুচিত হয়ে আসল এক প্রখর অনুভূতির ছোট্ট বলয়ের মাঝে। অনুভব করল, সব স্পর্শে কামুকতা থাকে না। কিছু স্পর্শে থাকে যন্ত্রণাদের প্রতিষেধক।
এরোজ মুখ তুলে তাকায় লাজে রাঙা নারীটির পানে। দাঁড় করায় আরশির সামনে। দু’হাতে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আরশিতে নির্দেশ করে বলল,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৫
-এটা আমার মৌনবউ। একদম মুগ্ধ হবেন না। এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত মৌনবউ।
মৌনতা স্মিত হাসল। সেই হাসিতে প্রাণ হারানো পুরুষটি অলসতার সাথে মেয়েলি গলদেশে মুখ ঘষে। ফিসফিসিয়ে বলল,
– আপনি এক ভয়ঙ্কর ক্ষতিকারক নেশাদ্রব্য, মৌন! আট বছর আগে একবার সেবন করেছিলাম এখনো তার তীব্র নেশার ঘোর থেকে আমি বের হতে পারিনি। আই উইশ, এই নেশার ঘোর কোনোদিন না কাটুক।
