নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬০
জান্নাতুল ফেরদৌ
কেটে গেছে ১২ টা দিন। শাহ্ পরিবার কারাগারে বন্দি। অঙ্কুরের অবস্থার কোনো উন্নতি হয় নি। ও মরে গেলে যদি মুক্তি পায় এরা। বেঁচে ফিরলে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠার আশঙ্কা করছে তারা। বাচ্চাগুলোর চিন্তায় দুদণ্ড স্থির হতে পারছে না কেউ। এমন সময় করকর শব্দে খুলে গেল কারাগারের ভিতরের একটা দরজা। সরু সিড়ি হয়ে ওপরে উঠে আসলো মিরান। হাতে কতগুলি কাগজ। সবাই উঠে দাঁড়ালো বসা থেকে। মিরান কাগজ গুলো বাইজিদ কে দিয়ে বলল
“এটা উত্তরের প্রাসাদের অঙ্কুর কতৃক বানানো সব গুলি গোপন কক্ষের নকশা। প্রত্যেকটায় এমন সব অস্ত্র আছে যার দ্বারা অঙ্কুর এত ক্ষমতাশালী। এগুলো এখন বিনা পাহাড়ায়। চলো সবাই”
সরু সিড়ি টা দিয়ে সবাই নেমে গেল। রইল শুধু মেহেরুন্নেসা আর মিরান। গত পরশু মেহেরুন্নেসার পায়ে বেশ জোরে চোট লেগেছে। অঙ্কুর সৈন্য পাঠিয়েছিল একটা প্রস্তাব রাখতে। সুনেহেরা কে যদি তার সাথে বিবাহ দেিয়া হয় তবে সে শাহ্ পরিবার কে মুক্তি দেবে এবং রাজ্যও ছেড়ে দেবে। অথচ সে নিজেই মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে। ক্রোধে সুনেহেরা আক্রমণ করে বসে প্রহরীর ওপর। লোকটা সুনেহেরা কে দমাতে না পেরে লোহার দন্ড টা ছুড়ে মেরেছে মেহেরুন্নেসার পায়ে। কেটেও গেছে বেশ খানিক টা। মিরান মেহেরুন্নেসার পায়ে ঔষধি তেল মালিশ করে দিল। মেহেরুন্নেসা পাথরের মত ঠা বসে আছে। মিরান তেল ঘষতে ঘষতে বলল
“এই কক্ষ গুলো এতকাল পর খোলা হয়েছে? এগুলো তে তো আসামি রাখা হয় নি কখনো। অবশ্য খুলবে না ই বা কেন? কারাগার খালি আছে নাকি আর? গোটা রাজ্যের সব সৈন্য ভরে দিয়েছে জালেম গুলো।”
মেহেরুন্নেসা ও তাই ভেবেছিল প্রথমে। কারাগার এত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয় না। এটা ঠিক কোন পাশে মহলের তাও আন্দাজ করতে পারছে না। আনা হয়েছিল চোখ বেঁধে।
“এখানে কি হতো বলো তো? কারাগারের ধরণ এমন অদ্ভুত হয় নাকি? এ তো বাইজি গৃহের বর্ণনার সাথে মেলে।”
মিরান হাঁটু ভাজ করে বসলো।
“ঠিকই ধরেছো বেগম। এটা বাইজি গৃহ ই। এই কক্ষে অঙ্কুরের বিদেশি ক্রেতা দের আনা হতো এই সুড়ঙ্গ টা দিয়ে। তাদের মনোরঞ্জন এর জন্য দেওয়া হতো কম বয়সি কিশোরী মেয়ে। তারা সারারাত নাচাতো সেই মেয়েদের। এমনকি…এমনকি একবার সিমরান কেও এই কক্ষে নাচতে হয়েছিলো মারজান এর আদেশে।”
মেহেরুন্নেসার গা ঘৃণায় রিরি করে ওঠে। মিরান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে
“সেদিন এখানে ধরে বেধে নিয়ে আসা হয় আমাকে। কারণ পুরুষ ছিল ৬ জন। সিমরান একা। অন্য কোথাও মেয়ে জোগাড় করতে না পারায় আমাকে কারাগার থেকে নিয়ে আসে। আমাদের কক্ষে রেখে চলে যাওয়ার পর সেখানে দেখলাম এক পরিচিত মুখ। আমার সৎ বাবা। নেশায় বুদ হয়ে আছে সব কটা। একজন সিমরান এর ওড়না কেড়ে নিলো। বলল বস্ত্রহীন হয়ে নাচতে। সে রাতে সব কয়টাকে কেটে বস্তায় ভরে এ ঘরে রেখে গেছিলাম। তার খেসারত দিতে হয়েছিলো সিমরান কে। হাতে পায়ের নখ এ সুচ গেড়ে রেখেছিলো সারা রাত”
মেহেরুন্নেসার গায়ে কাটা দিয়ে দিয়ে উঠছে মিরান এর একেক টা কথায়। কাঁপা কাঁপা চোখ জোড়া পাপড়ি ঝাপটে বলল
“ওটা বুঝি তোমার করা প্রথম হত্যা ছিল?”
মিরান ফ্যাচ ফ্যাচ করে হেসে উঠলো।
“কি যে বলো না বেগম। আমাকে আনা হলো তো কারাগার থেকে। হত্যা করেছি পরেই কারাগারে নিয়েছে। হাহহহ, কারাগারে গিয়ে আবার হত্যা”
“জীবনের প্রথম খু’ন কাকে করেছো তুমি?”
মিরান পা দোলাতে দোলাতে অকপটে উত্তর দিল
“আমার প্রেমিক কে?”
“কেন? আর তখন তো তুমি ছোট ছিলে। প্রেমিক…?”
“বুঝলে না বেগম? মিথ্যা দায়ে আমাকে ফাসানো হয়েছিল। কিছুদিন পর ছেড়েও দেওয়া হয়। র রত্নপ্রভার মৃত্যুর পরই আমাকে ছেড়ে দেয়। ওই হত্যা গুলো নিজে বাচতে করেছিলাম। নিজ বুদ্ধিতে এবং স্বজ্ঞানে আমি প্রথম হ’ত্যা করেছি আমার প্রেমিক কে। কারণ ও আমার সাথে অন্য নারীর তুলনা করতো। দুনিয়ার সব নারীকে ওর ঠিক মনে হতো খালি আমি বাদে। একদিন সহ্যের সীমা পেরিয়ে গেল। তারপর…..”
হাত দিয়ে গলা কাটার মত ইশারা করে ঠোঁট উল্টালো মিরান। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কক্ষের ছাদের দিকে তাকিয়ে বলল
“জানো এই সিমরান মেয়েটা শাহজাদার পিছে এত কেন ঘুরতে? একে মারজান এর চাপ। দুই য়ে ও ভাবতো হয়তো শাহজাদার বেগম হতে পারলে মারজান এর অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু হলো ঠিক উল্টো টা। এই কক্ষে রাতের পর রাত ধ”র্ষিত হয়েছে সিমরান। তার চাইতে বড় কথা হলো এই কক্ষেই মারা হয়েছে শাহজাদি রত্নপ্রভা কে”
মেহেরুন্নেসার চোখ কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসার উপক্রম।
“কি..কি..কিন্তু আমাকে যে বললে সে আত্মহত্যা করেছিল।”
“আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ওষুধের বিদেশি ক্রেতা দের একজনের নজর পড়েছিল রত্নার ওপর। মারজান কে বিষয় টা জানালে সে মুসিবতে পরে যায়। এ যে অসম্ভব। কিন্তু তারা চুক্তি বাতিল করলে অঙ্কুরের বিশাল লোকসান হয়ে যেত। বাধ্য হয়ে সিমরান কে খাওয়ানো হলো নিদ্রাবিষ। ঘুমে ঢোলা মেয়েটাকে নিয়ে দেওয়া হলো সেই জানোয়ার গুলোর কাছে। এই কক্ষটায়। নিজের সম্ভ্রম বাঁচাতে ঝাড়বাতির ওই লোহার সাথে ফাঁসি দেয় সে। গলায় দাগ না থাকলে হয়তো কক্ষে নিয়ে ফেলে রেখে বলতো অরণ্যর দুঃখে মারা গেছে। মাঝরাতে সেই মৃত মেয়েটাকে তার কক্ষে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। চারিদিকে মানুষ দেখে রত্নপ্রভা অরণ্যর মৃত্যু সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে”
মিরান দম নেয়। মেহেরুন্নেসা বলল
“তারপর? বলো না”
“আর কেউ না দেখলেও আমি ছিলাম সেই হত্যার জলজ্যান্ত সাক্ষী। তখন আমার বয়স মাত্র ১৪। আর কেউ টের না পেলেও অরণ্য শাহ্ এর মা আরব কন্যা আমিনা ঠিকই টের পেয়েছিল এই কূটচাল। সেই সময় তিনি পরিকল্পনা করেন শাহজাদার সাথে মিলে। রাতে রত্নপ্রভা কে অগোচরে দাফন করা হয়। আর উন্নত দেশ গুলো থেকে আনা হয় চিকিৎসা বিজ্ঞানী। সকল কে জানানো হয় রত্নপ্রভা পুড়লেও বেঁচে আছে। চিকিৎসক রা কয়েকদিন উত্তর প্রাসাদে থাকে। তারপর চন্দ্রপ্রভা কে দেখিয়ে সবাইকে বলা হয় চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে তারা পোড়া চামড়া কে নতুন রুপ দিয়েছে। তখন থেকে সবাই জানে বদলে গেছে শাহজাদি রত্নপ্রভার অবয়ব। আসলে সে ছিল চন্দ্রা।”
“চন্দ্রা এ কাজে কেন রাজি হলো? আর অঙ্কুর তো চন্দ্রা কে ভালো করেই চিনতো। সে কি মারজান কে বলেনি?”
“অঙ্কুর চেয়েছিল চন্দ্রা কে ব্যাবহার করতে। মহলে তার আরও একজন লোক হলো নিজের বলতে। এজন্যই মারজান কে বলেনি। আর চন্দ্রা কে রত্না প্রমানিত করার কারণ হলো যাতে সে সবার সামনে বলে আগুণ টা কে লাগিয়েছিল। সে রাতে অরণ্যের ফাঁসি হয়। কী ভাগ্য বলুন ওদের। এক দিনে মারা যাওয়া কম কথা? অবশেষে চন্দ্রা জানায় মারজান এর ভাই আরও কয়েকজন মিলে তার কক্ষে আগুণ দিয়েছিল। তাদের ও শূলে চড়ানো হয়েছিল।”
মেহেরুন্নেসার গলা শুকিয়ে এসেছে। একজন নারী ঠিক কতটা ভয়ংকর হতে পারে তা মারজান কে না দেখলে সে বুঝতোই না। নিচ থেকে গড় গড় শব্দ আসতে লাগলো। পর পর উঠে এলো প্রত্যেকে। মুখ ভাড় সবার। তারা যাওয়া মাত্রই তাদের ওপর হামলা করে সৈন্য রা। কিন্তু এ খবর তারা পেল কি করে? মিরান বলল
“তোমরা দ্রুত বেড়িয়ে যাও এখান থেকে। ওরা যে কোনো মূহুর্তে আসতে পারে এখানে। আগে এখান থেকে বেরোও, পরে সব পরিকল্পনা করা যাবে। যাওওও”
তারা অমত করলো না। বেড়িয়ে যেতে লাগলে বাঁধা দিল সুনেহেরা
“ভাইজান, আব্বা? আমরা চলে গেলে সেই রাগে আব্বা কে যদি…?”
“তোমার পিতা নিরাপদ আছে শাহজাদি। দ্রুত যাও”
মিরানের কথার ওপর ভরসা করে নেমে গেল তারা গোপন পথ ধরে। নামতেই অন্ধকার জঙ্গল। পাহাড়ের পাশ ঘেষা জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে তারা বহুপথ পেরিয়ে সকালে পৌছালো প্রশিক্ষণ দুর্গে। বেলা হয়ে গেছে বেশ। দূর থেকে যখন দুর্গের মিনার দেখতে পাচ্ছিলো। মেহেরুন্নেসার বুক তখন পুড়ে যাচ্ছে। কত্তগুলো দিন বাচ্চাদের দেখে না। পা যেন চাকার মত ছুটতে চাইছে। ইচ্ছে করছে এক ছুটে গিয়ে বাচ্চাদের বুকে নিতে। যত এগোচ্ছে চোখের পানি বাধ মানছে না তার। দুর্গে পৌছালো অবশেষে বিধ্বস্ত পাঁচটি মানব।
কিন্তু যা আশা করেছিল তা হলো না। সবার মুখ থমথমে। মেহেরুন্নেসা কান্না জড়ানো কন্ঠে বাচ্চাদের ডাকে। কিন্তু কোথায় সব? দাসীদের মাথা নিচু মুখ থমথমে করে দাড়িয়ে আছে। জান্নাত ময়ের গলা পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে এসে জড়িয়ে ধরলো মা কে। মেহেরুন্নেসা মেয়েকে বুকে নিয়ে যেন তৃষ্ণার্ত বুক জুড়ালো। শাখাও এসে জড়িয়ে ধরলো মেহের কে। মায়ের আগে বড় মা কে জড়িয়ে ধরলো। জান্নাতের কান্না থামছেই না। মেহের জান্নাতের মুখ মুছে কপালে চুমু দিয়ে বলল
“বোন কই? খুব কেঁদেছে না আম্মা কে ছাড়া? হুমম? কোথায় কক্ষের ভিতরে? সারাআআ এই সারাআআ। দেখ আম্মা এসেছে। সারা।”
সুনেহেরা দৌড়ে ঘরে ঢুকলো। কিন্তু সাহারা ঘরে নেই। এক দাসী তখন মাথা নিচু করে ভীত স্বরে বলল
“কাল রাত থেকে ছোট শাহজাদি কে খুজে পাচ্ছি না আমরা”
সবাই সমস্বরে বলে উঠলো
“কিইইই!”
জান্নাত কাঁদতে কাঁদতে বলল
“রাতে ওকে ঘুম পাড়িয়ে তবেই আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। উঠে দেখি ও নেই”
সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। মেহেরুন্নেসা পাগলের মত নিজে কক্ষ থেকে শুরু করে পুরো মহল খুজলো। কোথাও নেই মেয়েটা। সুনেহেরা এক ছুটে চলে গেল বাগানে। সাহারার ফুল ভালো লাগতো। গোলাপ বাগান শিউলি গাছের নিচ দোলনার কাছে পুকুর ঘাটে সবখানে খুঁজলো।
তবুও সাহারার কোনো দেখা নেই।বজান্নাত নিজেও খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিল।বছোট্ট পায়ে দৌড়াচ্ছে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।
যাকে পাচ্ছে তাকেই জিজ্ঞেস করছে,
“আমার বোনরে দেখছো? সাহারা কে দেখছো?”
জান্নাতের চোখ ভিজে উঠছে। শাখাও মহলের বারান্দা ছাদ খুঁজতে লাগলো। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে চেচিয়ে ডাকছে,
“ সাহারা! সাহারা!”
কোনো উত্তর আসছে না।
বাইজিদ প্রহরীদের ডেকে কঠিন গলায় বললো
“দুর্গের এক ইঞ্চি জায়গাও খোজা বাদ দেবে না। সব সব খানে খুঁজো। ইয়া আল্লাহ। আমার বাচ্চাটা কে ভালো ভাবে ফিরিয়ে দিও।”
সৈন্যরা ছড়িয়ে পড়লো, আস্তাবলে, পুরোনো গুদামঘরে দক্ষিণ প্রাচীরে। আবিদ বের হলো দুর্গের বাইরের এলাকায়। চারপাশের পথঘাট, বাগান, নদীর পাড় পর্যন্ত খুঁজে দেখলো। যে রাখাল ছেলেরা গরু চরাচ্ছিল তাদেরও জিজ্ঞেস করলো। কেউ কিছু বলতে পারলো না। দুপুর গড়িয়ে যেতে লাগলো। রোদ মাথার ওপর উঠে গেছে। সবাই হাঁপিয়ে উঠেছে। তবুও খোঁজা বন্ধ হয়নি। একেকজন একেক দিকে ছুটছে।
মেহেরুন্নেসার মুখ শুকিয়ে গেছে। গত রাত থেকে এক ফোঁটা পানিও খায়নি। বারবার একই কথা বলছে
“আমার মেয়ে কোথায় গেল? কেউ দেখলো না? কি কচুর নিরাপত্তা এই দুর্গে?”
সুনেহেরার অবস্থাও ভালো না। দৌড়ে দৌড়ে খুঁজছে। এত জোরে হাঁটায় কয়েকবার যে হোঁচট খেয়েছে হিসাব নেই। দুপুরের দিকে পুরো দুর্গে ভয়ংকর অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়লো। কেউ ভাবতে পারছে না যে সাহারা কোথাও লুকিয়ে আছে। তাহলে এতক্ষণে তো বের হয়ে আসার কথা। কারো না কারো চোখে পড়ার কথা। কিন্তু সাহারা কোথাও নেই। সবার বুকের ভেতর ভয় জমতে শুরু করলো। কোনো অঘটন ঘটলো না তো?
পুরো মহল সাহারাকে খুঁজে অস্থির, এদিকে সেই তিন বছরের দস্যি মেয়েটা বাদরামো করে বেড়াচ্ছে জঙ্গলে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই চুপিচুপি বেরিয়ে এসেছে। কারও অনুমতি না নিয়েই। ঠিক যেমনটা সুনেহেরা প্রায়ই করতো।
জঙ্গলের ভিতর ঢুকতেই তার চোখ দুটো চকচক করে উঠলো। চারদিকে কত রঙের ফুল। কত অচেনা পাখি। কত সুন্দর সুন্দর প্রজাপতি।
একটা নীল প্রজাপতি তার সামনে উড়ে যেতেই সাহারা খিলখিল করে হেসে উঠলো।
তারপর ছোট ছোট পায়ে দৌড় দিল পিছু পিছু।
প্রজাপতিটা ফুলে বসছে আবার উড়ে যাচ্ছে।
সাহারাও ছুটছে তার পেছনে পেছনে। সোনালি চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। গায়ের ছোট্ট জামাটাও ধুলোয় মাখামাখি হয়ে গেছে। তবু তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কিছু দূরে গিয়ে সে দেখতে পেল একটা হরিণ ছানা। মা হরিণটা সম্ভবত কাছেই ছিল। ছানাটাও সাহারার দিকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে রইলো। সাহারা ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে বসে পড়লো। তারপর ছোট্ট হাত বাড়িয়ে বললো,
“আয় আয় তু তু তু”
হরিণ ছানাটা কয়েক মুহূর্ত মুচড়ামুচড়ি করে এগিয়ে এলো। সাহারা তো মহা খুশি, আনন্দে হাততালি দিলো। অনেকক্ষণ সে হরিণ ছানার সাথে খেললো। যেন দুটোই এক জাতের বাচ্চা। একে অপর কে ধরছে লাফিয়ে লাফিয়ে। ছুয়াছুয়ি খেলছে দুটো তে।
একটা ছোট গাছের ডাল দেখলো সাহারা। ডালটা মাটির খুব কাছেই। সাহারা দুই হাতে ধরে ঝুলে পড়লো। পা দুটো বাতাসে দোল খাচ্ছে। সে নিজেই হেসে কুটিকুটি। একবার ঝুলছে একবার নামছে। আবার উঠছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দের জায়গা এই জঙ্গলটাই। দুপুরের দিকে ক্লান্ত হয়ে একটা ঘাসভরা জায়গায় চিত হয়ে শুয়ে পড়লো। আবার সেখানে বসেই ফুল ছিঁড়লো পাতা ছিঁড়লো। মাটিতে নানা রকম আঁকিবুঁকি কাটলো। তখনই ঝোপের আড়াল থেকে একটা শেয়াল বের হলো। বড় কোনো শেয়াল না। তরুণ একটা শেয়াল। গায়ে লালচে বাদামি রং। বিচ্ছু সাহারা একটুও ভয় পেল না।
নাচতে নাচতে এগিয়ে গেল শেয়ালের কাছে। শেয়াল ই ওর ভয়ে পালালো। পিচ্চি ফর্সা পা দুটো ছুটছে আর হাত তুলে ডাকছে
“দাড়া দাড়া।”
শেয়ালটা অনেক টা দূর গিয়ে তাটপর দাড়ালো। বিচ্ছুটা কাছে গিয়ে শেয়ালের মাথায় হাত বুলায়। শেয়াল টা মাথা কাত করলো। সাহারা খিলখিল করে হেসে উঠলো।
“আমাল তাতে দাবি?”
শেয়ালটা অবশ্য কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু কিছু দূর পর্যন্ত তার পেছন পেছন হাঁটতে লাগলো। বিকেলের দিকে সাহারা হঠাৎ দূরে পরিচিত একটা পথ দেখতে পেল। পথটা সে চিনতে পারলো। এইনপথ ধরেই এসেছিল। ছোট্ট মেয়েটা শেয়ালটাকে সঙ্গে নিয়েই হাঁটা ধরলো। জঙ্গলের সরু পথ। রাস্তায় শুকনো পাতা।
অনেকটা পথ হেঁটে অবশেষে সামনে দেখা দিল সেই পুরোনো প্রশিক্ষণ দুর্গ।
দূর থেকে সাহারাকে আসতে দেখে সব হুড়মুড় করে এলো। আরও অবাক হলো যখন দেখলো তার পেছনে একটা শেয়ালও আসছে। নারূ সৈনিক রা চোখ বড় বড় করে বললো,
“ইয়া আল্লাহ! এ তো ছোট শাহজাদি! বেগম, শাহজাদা, শাহজাদি ফিরেছে।”
মেহের কাঁদতে কাঁদতে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলো। গালে কপালে অসংখ্য চুমু দিয়ে বলল
“তুমি কার সাথে আসলে মা?”
“একাই”
সারাদিন টইটই করে ফর্সা মুখ খানা লাল হৈ গেছে। শেয়ালের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললো,
“এইতা আমাল বন্দু”
সকলে একে অপরের মুখের দিকে তাকালো।
মেহেরুন্নেসার মুখের হাসি মিইয়ে গেল। শেয়াল টা লোকজনের মধ্যেও সাহারার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। চন্দ্রা মুখে হাত দিয়ে বলল
“মেহের ওকে সরাও ওটার কাছ থেকে। বন্য প্রাণী। সাহারা কে কোথাও আচড় টাচড় দিল নাকি দেখো।”
সৈন্য রা শেয়াল কে তাড়া করতে গেলে সাহারা চেচিয়ে কেদে ওঠে। শেয়াল এর পিঠে হাত দিয়ে বলে
“যা যা শালু যা। আবার আছিচ”
কে জানে কি বুঝলো শেয়াল চলে গেল ফের জঙ্গলের দিকে। জান্নাত এসে বোন কে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না। সাহারা জান্নাতের কান্না দেখে খুব ভয় পেয়ে গছে। বাইজিদ সাহারা কে কোলে তুলে নিয়ে সবাই কে সাথে করে ভিতরে গেল।
বিকেলের দিকে দু্র্গের ফটকে দেখা গেল মিরানের ঘোড়া। ঘোড়াটা ঘামে ভিজে গেছে।
মিরানের চেহারাও অস্বাভাবিক গম্ভীর। দু্র্গে ঢুকেই সোজা দরবার কক্ষের দিকে হাঁটতে লাগলো।
সকলে সেখানে বসে ছিল। মিরামের অস্থির মুখ দেখে একটু ভড়কে গেল। মিরান সব জড়তা ঝেড়ে বলে ফেলল
“জমিদার বাবু কে মাহাদি নিজ হাতে তাকে হত্যা করেছে।”
ধর থেকে তখন সবার আত্মা টা যায় যায়। ধপ করে পাশের আসনে বসে পড়লো মেহেরুন্নেসা।
তার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। বাইজিদের বুকে জ্বলন শুরু হলো। কিশোর বয়সে মা কে হারিয়েছে। বাবা তাকে যথেষ্ট ভরসা এবং আদরেী সাথে বড় করেছে। মাহাদি এটা কি করে করতে পাটলো? সুনেহেরা কাঁপা গলায় বলল
“মাহাদি? মাহাদি এটা করলো? অসম্ভব। অসম্ভব মিরা। আমি এটা বিশ্বাস করি না। তোর কোথাও ভুল হচ্ছে”
মিরান ঘাড় নেড়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে বলল,
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৫৯
“ নিজ চোখে না দেখলে আমিও বিশ্বাস করতাম না শাহজাদি। আমি নিজ চোখে দেখেছি তার গলা….”
কান্নার দরুন মিরানের কন্ঠ রোধ হয়ে আসে। সত্যিই মাহাদি নিজের মালিকে কে হত্যা করেছে। যার দাস হয়ে ছিল তার শির উচ্ছেদ করেছে। সুনেহেরার ভালোবাসার মানুষ তার পিতা কে হত্যা করেছে। তরবারি কোষ থেকে তলোয়ার ছুটিয়ে বেড়িয়ে পড়লো সুনেহেরা। আগুন ঝড়ছে তার গা থেকে।
