রাগে অনুরাগে পর্ব ৮
সুহাসিনি ফাতেহা
“একি আপু তোমাকে এত লম্বা চওড়া লাগছে কেন? তোমার মুখ এমন খোঁচা খোঁচা লাগছে কেন? তোমার দাড়ি গোঁফ গজাইছে?”
তিতলি তখনও যেন বুঝতে পারছে না। সপ্তাদশী ঝিলিক ভেবে আরও জোরে এক ঝাঁকি দিলো। কিন্তু তাতে সামনে থাকা বলিষ্ঠবান দেহের যুবকের একটুখানি নড়বড় ও হলো না বরং যেন আরো পাথর হলেন। তিতলি অবুঝের মতো মুখ কোরে বলল,
”তুমি এত শক্ত কেন ঝিলিক আপু ?”
—– বলতে বলতে চোখ বাঁধা অবস্থায় হাতের বিচারণ পুরুষালী জিন্স প্যান্ট আন্দাজ করতেই ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলো তিতলি। মুহূর্তে দূরে সরে নিজের চোখ থেকে কাপড় সরালো।
সপ্তাদশী চমকালো থমকালো ভরকালো।
অবাক হতবিহ্বল,বাকরুদ্ধ,স্তব্ধ সব যেন ওকে রীতিমত গ্রাস করেছে। মুখায়বে অবিশ্বাস নিয়ে মেয়েটা হাঁ করে রইল। মাথাটা ঠান্ডা হতেই তিতলির মস্তিষ্ক জ্বলে উঠলো। দুঃখে কষ্টে তিতলির রীতিমত হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। লজ্জায় যেন ছাঁদ ফাঁক হয়ে যায়। মস্তিষ্কের কানায় কানায় প্রশ্ন,
ভাল্লুক ফারাজ খানকে সে এতক্ষণ ধরে রেখেছিলো? ছিঃ তিতলি ছিঃ একি করছিলি তুই! কেউ কি তার স্যার কে জড়িয়ে ধরে? ভালো ভদ্র হলেও মানা যেতো এমন গুরুগম্ভীর, বদমেজাজি আর নাকউঁচু লোককে কিনা তুই এতক্ষণ যাবত জড়িয়ে ধরে ছিলি? তিতলি আর ভাবতে পারছে না। এখন যেন এখান থেকে পালাতে পারলেই বাঁচে। তার সাথে তো ঝিলিক আপু রুপসা আপু ছিলো। এখন কই? এই ভাল্লুক স্যার এখানে কেন? যতই সাহস নিয়ে হাটুক বড় বড় কথা বলুক! সাহসী তিতলিকে এখন কে বাঁচাবে?
ঝিলিক, রুপসা, মিলি, ওরা অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে। তিতলির জন্য এই মুহূর্তে কিছুই করতে পারছে না। দুইটা টু শব্দ করতে গেলেই যেন ঘোর বিপদ। তিতলির সাথে যে তাদেরও ছাড়বে না সেটা বলা যায়। ঝিলিক ফিসফিস করে বলল,
”রুপ আমাদের মনে হয় ফারাজ ভাইয়া কে থামানো উচিত! না হলে যদি তিতলি কে রাগের মাথায় থাপ্পড় দেয় তখন কি হবে? ”
”আমি যেতে পারবো না! তোরা যা বোন!”
”কি বলছিস ভাইয়া কি রেগে গেছেন দেখতে পাচ্ছিস? ”
”যদি আমাদেরও শাস্তি দেই তখন কি করবি? ”
ওরা আল্লাহ আল্লাহ করছে তিতলিকে যেন ছেড়ে দেয়।
ফারাজের রাগ তখন সীমা ছুঁয়ে গেছে। মেজাজ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। শরীরের প্রত্যেকটি শিরা–উপশিরা দপদপ করছে রীতিমত! পারছে না থাপড়ে বেয়াদব মেয়েটার সব দাঁত ফেলে দিতে। কান থেকে ফোন নামিয়ে নিলেন মুহূর্তেই! এক মিনিটের জন্য দু চোখ বন্ধ করে ক্ষিপ্ত মেজাজ শান্ত করার বৃথা চেষ্টা চালাচ্ছেন।
তিতলি ভয়ে ভয়ে ভীষন সাহস যুগিয়ে একটানা বলল,
”শুনুন!”” আপনাকে আমি ইচ্ছে করে ধরিনি! আমরা কানামাছি খেলছিলাম! আপনি হঠাৎ কোথায় থেকে উড়ে এসেছেন ? আমার কোনো দোষ নেই! ” ——
যুবক দাঁতে দাঁত চাপল পরক্ষণে। এক আকাশসম রাগ নিয়ে পরক্ষনেই শক্ত মেজাজে বললেন,
”একটা মেয়ে হয়ে পরপুরুষ কে জড়িয়ে ধরে তার ইজ্জত নিয়ে কানামাছি খেলছেন, আবার বলছেন আপনার কোনো দোষ নেই! বারবার ছাড় দিয়েছি বলে আপনি উড়েছেন! এবার আপনি দেখবেন কিভাবে….. আপনার ডানা ভেঙে যাই !” বলে এদিক ওদিক তাকালেন তিনি।
তর্জনে গর্জনে সপ্তাদশীর কিচ্ছু যায় এলো না। বরং মেয়েটা ত্যাড়া কণ্ঠে বলল,
”আমি কি দেখেছি আপনি এসেছেন! আপনার ইজ্জতে কি আমি লঙ্কা মরিচ লাগিয়ে দিয়েছি? আমার বয়েই গেছে আপনার মতো ভাল্লুক স্যারকে জড়িয়ে ধরার। ”
তিতলির কথায় ফারাজের বাড়ন্ত রাগে যেন ঘিঁ পড়লো। মুহূর্তেই এদিক ওদিক তাকিয়ে ডাকলো,
”ঝিলিক এক্ষুনি এদিকে আয় তো?”
ঝিলিক তো ভয়ে শেষ। মনের ভেতরে কু ডাকছে এই ভেবে যে তাকেও কি তাহলে তিতলির সাথে কোনো শাস্তি দিবে? ঝিলিক ভয়ার্ত গলায় শুধালো,
”জ্বি…ভা–ভাইয়া…”
ফারাজ কিছুক্ষণ ভেবে চিন্তে ঠোঁঠের কোণে বাঁকা হাসির রেখা টানলো অতঃপর বললেন,
”নিচে গিয়ে বড় দেখে একটা কুমড়া নিয়ে আয় তো? ”
”ক—কেন ভাইয়া কুমড়া দিয়ে কি করবেন?”
”ফারাজ চোখ গরম করে ঝিলিকের দিকে তাকাতেই…..’
ঝিলিক ভয়ে ভয়ে বলল,
”ভাইয়া তিতলির কোনো দোষ নেই! আমরাই ওকে কানামাছি খেলার কথা বলেছি। ” ওকে ছেড়ে দেন।”
”তোকে আমি অন্য কারো গান গাইতে বলিনি। আর একটা কথা না বলে যেটা বলছি সেটা নিয়ে আয়। ”
ঝিলিক অসহায় চোখে একবার তিতলির দিকে তাকালো। মেয়েটাকে তারা যুদ্ধের ময়দানে ফেলে দিয়েছে? বড্ড অপরাধবোধ কাজ করছে মেয়েটার মনে। ভালোই বুঝতে পেরেছে আজ রফাদফা কিছু হয়ে যাবে। ঝিলিকের সাথে সাথে রুপসা মিলি,ওরাও নিচে চলে গেলো।
এর মাঝেই তিতলি ভেঙ্গিয়ে বলে উঠল…..
”আপনি ঝিলিক আপুকে কুমড়া আনতে বলেছেন কেন? আপনি কি কুমড়া খেয়ে নিজের রাগ কমান? খেতেও খুব পছন্দ করেন বুঝি? ”
”ফারাজ বিরক্ত চোখে তাকালো বেয়াদব মেয়েটার মুখপানে! কুমড়াটা আনুক শুধু তারপর বুঝাবে পছন্দ করে কিনা! ”
তিতলি আবারও দুঃখ করতে করতে বলল,
”আমার হাত চুলকাচ্ছে ছিঃ আমি এ কাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম! কলেজের সুন্দর সুন্দর সিনিয়র ভাইয়েরা হলেও নিজের মনকে বুঝাতে পারতাম! আমার হাত ধুতে হবে আমি তাহলে যায় হ্যাঁ—–আপনি বরং কুমড়া খান শরীরের জন্য পুষ্টিকর!”—
বলেই যে তিতলি চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াবে —- অমনি শক্তপোক্ত হাত সবেগে কনুই চেপে ধরল ওর। —— যুবকটা রুঢ় গলায় বললেন,
”আর এক পা সামনে এগানোর চেষ্টা করবেন! আই সয়ার,, আপনাকে ছাঁদ থেকে নিচে ফেলে দিবো।”
তিতলি একবার নিজের হাতের দিকে তাকালো! অতঃপর স্রেফ বললো,
”আমাকে ফেলে দিলে তো আমার জামাই তার কিউট সুন্দরী বউটাকে বিয়ে করার আগেই বিধবা হয়ে যাবে। আমাদের এখনো সংসার করা বাকি হানিমুনে যাওয়া বাকি…..”
ফারাজ শীতল রাগ নিয়ে কিছুটা ঝুঁকে একদম তিতলির চোখে নজর রাখল। কন্ঠে শীতল রাগ ঢেলে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
”বয়স তো এখনো ১৮ হয় নি সংসার হানিমুন করার কি বুঝেন হ্যাঁ?”
তিতলির সহজ সরল স্বীকারোক্তি,
”হানিমুন মানে ঘুরে বেড়ানো আর ছবি তুলে আপলোড দেওয়া। আর সংসার করা মানে বাচ্চা কাচ্চা সামলানো……’
ফারাজ ভ্রু কুঁচকালো মুহূর্তেই। ধমকের সুরে চেঁচিয়ে বললেন,
”চুপ বেয়াদব মেয়ে! এক থাপ্পড় দিবো না। একমাস কাউকে মুখ দেখাতে পারবেন না।”
”দূরে সরুন! ভাল্লুক স্যার কোথাকার…… ”
রাগে অনুরাগে পর্ব ৭
আপনার মতো বেয়াদব মেয়ের উপর ফারাজ খানের কোনো ইন্টারেস্ট নেই মিস তিতলি ! আই রিপিট আপনাকে শাস্তি দিবো! আই ডোন্ট নিড অল দিস!
সহসা দরজার কাছ থেকে ভয়ার্ত গলায় ভেসে এলো,
”ভা….ভাইয়া কুমড়া নিয়ে এসেছি!”
