দাহশয্যা পর্ব ৯৫ (৩)
Raiha Zubair Ripti
মেহরিনের শারীরিক অবস্থা আগের থেকে ভালো হলেও মানসিক অবস্থার কোনো উন্নত হয় নি। মেয়েটা আগেও কম কথা বলতো,আর এখন একেবারেই প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না বললেই চলে। রুম থেকেও বের হতো না। তবে আজ হুট করে মেহরিন বোরকা নিকাব পড়ে বের হয়েছে একজনের খোঁজে। সানজিদা বেগম উঠানে বসে চাউল ঝাড়ছিলো কুলোয় করে। মেয়েকে বের হতে দেখে বলল,
“ কোথায় যাচ্ছিস? ”
মেহরিন সাইড ব্যাগটায় ফোন ঢুকাতে ঢুকাতে বলল,
“ সামনেই আম্মু। বাবুর নাকি ডায়াপার শেষ হয়ে গেছে। আমি নিয়ে আসবো ফেরার পথে। আব্বুকে আনতে মানা করিও। ”
“ যাচ্ছিস কোথায় সেটা তো বল। ”
“ পাশের গ্রামে। এসে পরবো,চিন্তা করো না তুমি। ”
সানজিদা বেগম পথ আঁটকে দাঁড়ালেন। এই মেয়েকে তিনি একা ছাড়বেন? বাবার সাথে থেকেই যেভাবে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। মোতালেব ভুঁইয়া যদি শোনেন মেহরিনকে তিনি একা বের হতে দিয়েছে,তাহলে কি মোতালেব ভুঁইয়া ঠিক থাকবেন?
“ দাঁড়া তুই। আমিও আসতেছি। ”
মেহরিন দীর্ঘ এক শ্বাস ফেললো।
“ না আসলেও চলতো। ”
“ বেশি বুঝবে না খবরদার। দাঁড়াও আসছি আমি। ”
সানজিদা বেগম রুমে গিয়ে বোরকা পরে আসলেন। মেয়ের সাথে পাশের গ্রামে গেলেন। মেহরিন সবাইকে সেই পাগলের কথা জিজ্ঞেস করলো। গতবছর যে নতুন এক মহিলা পাগল এসেছিল। যে বারবার মেহরিন কে সতর্ক করছিলো। বলছিলো তাকে সংসার করতে দিবে না,কোল জুড়ে কখনো সন্তান আসতে দিবে না। ঐ মহিলার সব কথাই তো ফলে যাচ্ছে। মেহরিন পুরো গ্রাম তন্নতন্ন করে খুঁজলো। অবশেষে একজনের মাধ্যমে জানতে পারলো সেই পাগল মহিলা কে নাকি সেদিনই তার ছেলে এসে নিয়ে গেছে। মেহরিন অবাক হলো। ছেলে এসে নিয়ে গেছে! কোথায় নিয়ে গেছে, জিগ্যেস করলে তারা বলে, জানে না। এক বছরের বেশি হতে লাগলো। মনে থাকে নাকি?
মেহরিন আশাহত হলো। সানজিদা বেগম মেয়েকে জিজ্ঞেস করলো কেনো এই পাগল কে খুঁজছে সে এভাবে হন্যে হয়ে। মেহরিন পরে সবটা বললো সেদিনের সেই বিকালের ঘটনা টা। সব শুনে সানজিদা বেগম কিছুক্ষণ থম মেরে ছিলেন। তারপর মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে নিলে মেহরিন বলল-
“ বাবুর ডায়াপার নেওয়া হয় নি। ওটা নিয়ে ফিরি? সারা রাত আপুকে জ্বালিয়েছে। ”
তারা ঘোষপাড়ার রোড দিয়ে বক চত্বরে আসলো। আর একটু হেঁটে গেলেই সুলতানপুর। মেহরিনের শ্বশুর বাড়ি। মেহরিন দীর্ঘ এক শ্বাস ফেললো। আফিয়া সুলতান যদি জানতে পারতো মেহরিন এসেছে এখানে। তাহলে হয়তো দৌড়ে চলে আসতো। মেহরিন ফার্মেসী থেকে বাবুর ডায়াপার নিয়ে কি মনে করে যেন সোজা হেঁটে মহাদেবপুর কেন্দ্রীয় কবরস্থানের দিকে হাঁটা ধরলো। পেছন পেছন সানজিদা বেগম ও আসলো। মেয়ের পায়ের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“ কোথায় যাচ্ছিস? এদিকে তো কবরস্থান। ”
মেহরিন নিকাবের আড়ালে কিঞ্চিৎ হাসলো।
“ আমাদের একমাত্র শেষ দীর্ঘস্থায়ী ঠিকানা,যা আমরা সবসময় ভুলে যাই। সেজন্যই তো পাপ কাজ করার সময় একটুও ভাবি না,তাই না মা? চলো একটু দেখে আসি। নিজের মউত কে স্মরণ করে আসি। একদিন তো আমাদের ও আসতে হবে এখানে। ”
ইমন এসেছিল বক চত্বরে একটা কাজে। সানজিদা বেগম আর মেহরিন কে কবরস্থানের দিকে যেতে দেখে পেছন পেছন এসে বলল,
“ কোথায় যাচ্ছেন চাচি? ”
সানজিদা বেগম বললেন,
“ এই তো বাবা কবরস্থানে। ”
ইমন হাঁটতে হাঁটতে আসলো তাদের সাথে।
কবরস্থানে ভেতরে মেয়েদের ঢোকা নিষিদ্ধ। সেজন্য মেহরিন বাহির থেকেই, গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো। এই কবরস্থানেই সোলেমান তার আর মেহরিনের জন্য কবরের অগ্রীম জায়গা কিনে রেখেছে। বলেছিল কোনো এক গাছের ছায়ার নিচে কিনেছে জমি। বেড়া দিয়ে বাঁধা। কোনো নামধাম নেই। মেহরিন দুচোখ সেই জায়গাটা খুঁজলো। একসময় খুঁজেও পেলো। তবে সেটাই সঠিক স্থান কি না বুঝে উঠতে পারলো না। কবরস্থানের দেখাশোনা করেন খাদেম,তিনি ওদের অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিলো। এগিয়ে আসলেন এবার। বললেন..
“ কারা তোমরা? তোমাদের কোনো আত্মীয়র কবর আছে এখানে? ”
মেহরিন দু দিকে মাথা নাড়িয়ে না জানালো। ঐ গাছের নিচে থাকা সমান জমি চোখের ইশারায় দেখিয়ে বলল-
“ ঐখানে তো কবর দেওয়া হয় নি কাউকে? বেড়া যে তারপরও। ”
“ ঐ জায়গা এক ভদ্রলোক তার আর তার স্ত্রীর জন্য অগ্রীম কিনে রেখেছেন। মৃত্যুর পর তাদের দুজনের কবর এখানেই করা হবে। মৃত্যু নিয়ে কত চিন্তা লোকটার! আজকাল কেউ এভাবে ভাবেই না। লোকটা আমার দেখা সবচেয়ে ব্যতিক্রম ছিলো। ”
ইমন কৌতূহল হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ কে সেই লোক? ”
“ আমাদের চেয়ারম্যান আমিরুল সুলতানের ছেলে,নওয়াজ সোলেমান সুলতান। চিনো? সে তো ঢাকার নামকরা এমপি। ”
ইমনের চোখ মুখের আভা পরিবর্তন হয়ে আসলো এই নাম শুনে। মেহরিন চোখ বুঝলো। মনে মনে বলল,
“ আমি আপনাকে এতটাই ঘৃণা করি যে এখন আর চাই না আমার কবর আপনার কবরের পাশে হোক। ”
তারপর ব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করার সময় ইমনের ফোনটা বেজে উঠলো। ইমন রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে ইমনের মা বলে উঠলো- ঊর্মি মা হয়েছে। ছেলে সন্তান হয়েছে তার একটু আগে। ইব্রাহিম ফোন করে জানালো। ইমন আলহামদুলিল্লাহ বলে জিজ্ঞেস করলো- মা ছেলে কেমন আছে? ইতি বেগম বলল- মা ছেলে দুজনই সুস্থ আছে।
মেহরিন টাকা বের করে খাদেমের হাতে দিলো। সানজিদা বেগম জিজ্ঞেস করলো-
“ কিছু হয়েছে ইমন? ”
ইমন ফোন কে’টে দিয়ে বলল-
“ ঊর্মির ছেলে হয়েছে চাচি। ”
কথাটা বলেই একবার মেহরিনের দিকে তাকালো। নিকাবের নিচে থাকা মেহরিনের মুখের ছাপ দেখা গেলো না।
“ মা ছেলে কেমন আছে? সুস্থ আছে তো? ”
“ জ্বি চাচি। সুস্থ আছে দুজনে। ”
খাদেম টাকা গুলোর দিকে তাকিয়ে বলল-
“ কিসের টাকা দিলে মা? ”
মেহরিন কবর গুলোর দিকে তাকিয়ে বলল-
“ বিশেষ কোনো কারন নেই চাচা। আজ আসি?”
মেহরিন হাঁটা ধরলো। সানজিদা বেগম আর ইমনও পেছন পেছন আসলো। সানজিদা বেগম জিজ্ঞেস করলো-
“ ভাগ্নে কে দেখতে যাবে না ইমন? ”
“ দেখতে যাওয়া তো উচিৎ। দেখি। ”
বাড়ি চলে আসলো তারা। ইমন নিজের বাড়ি গেলো। মেহরিন বোরকা নিকাব টা খুলেই ওয়াশরুমে চলে গেলো। কল চেপে পানি ছেড়ে দিয়ে মুখ চেপে কান্না করে দিলো। এতক্ষণ সে কান্না চেপে রেখেছিল। এবার আর পারলো না। নিজের সন্তানের কথা মনে পরলো ঊর্মির খবর টা শুনে। মনে মনে আলহামদুলিল্লাহ বললেও কলিজা বুকটা খা খা করে উঠছিলো।
সোলেমান আজ সাংবাদিকদের সামনে বসে আছে। অনেক অনেক প্রশ্ন জমে আছে দেশও দেশবাসীদের কাছে। সেগুলেই একে একে সাংবাদিক রা প্রশ্ন করছে..
“ আপনি তো জেলে ছিলেন। বোনের ধর্ষনকারী দের খুন করার জন্য। তাহলে আপনি ডেনমার্ক কিভাবে গেলেন? সেখান থেকে আপনার মৃত্যুর খবর আসলো। আপনি বেঁচে রইলেন কি করে? ”
সোলেমান পায়ের উপর পা তুলে আছে। সাংবাদিকদের করা প্রশ্নগুলো শুনে বলল,,
“ আমি জেলে ছিলাম,এটা নতুন খবর না। আপনারা কি সেই সময়ের পরের খবরগুলো পাননি? এ কেমন সাংবাদিক আপনারা? দ্বিতীয়ত আমি জামিন পেয়েছি আইনজীবীর মাধ্যমে। তৃতীয়ত আমি কাজের উদ্দেশ্যেই ডেনমার্ক গিয়েছিলাম।”।
ছাড়াও যে পেলাম সেই নিউজটা পান নি? আপনারা না সাংবাদিক? এই নিউজটা কেনো পেলেন না? আর দ্বিতীয়ত উকিলের মাধ্যমেই আমার জামিন হয়েছে। তৃতীয়ত আমি কাজের জন্যই ডেনমার্কে গিয়েছিল। চতুর্থ প্রশ্ন হলো..আমার মৃত্যুর খবর আপনাদের কে দিয়েছে?”
একজন সাংবাদিক উত্তর দিল,
“আপনার চাচা বাশার সুলতান।”
নামটা বলতেই পাশের সারিতে বসা বাশার সুলতানের শরীর শক্ত হয়ে গেলো। সোলেমান ধীরে তার দিকে তাকালো, তারপর বললো,
“ তাহলে গিয়ে তাকেই জিজ্ঞেস করুন এই প্রশ্নের উত্তর। আমার জানামতে আমি মরিনি। আমার লাশও কেউ দেখেনি। তাহলে আপনারা কেন বিশ্বাস করলেন? যার থেকে এই খবর শুনে বিশ্বাস করছিলেন তাকে গিয়ে চেপে ধরুন। এই সমস্ত দায় তার। ”
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠলো। সোলেমান একবার স্ক্রিনে তাকিয়ে ফোন রিসিভ করলো।
ওপাশ থেকে ইব্রাহিম উচ্ছ্বসিত আনন্দের সাথে বলে উঠলো,
“ সোলেমান… আমি বাবা হয়েছি রে। আমার ছেলে হয়েছে।”
এক মুহূর্তে পুরো পরিবেশ বদলে গেলো।সোলেমানের শরীরের ভেতর দিয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেলো। চোখ বন্ধ হয়ে এলো। মনে পড়লো সেই হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট অস্তিত্ব, যে আর কখনো পৃথিবীতে আসবে নি। হয়তো সে ছেলে ছিলো অথবা মেয়ে।
সোলেমান খুব আস্তে বললো,
“আসছি।”
ফোন কেটে দিলো। এরপর আর এক মুহূর্তও দেরি করলো না। চেয়ারে হাত রেখে উঠে দাঁড়ালো সোলেমান। সাংবাদিকরা কিছু বলার আগেই সে বেরিয়ে যেতে লাগলো। পেছন থেকে একজন ডাক দিল,
“স্যার, ইন্টারভিউ এখনো শেষ হয়নি!”
সোলেমান থামলো না। শুধু বললো,
“আজ আর না।”
হাসপাতালের করিডোরে আলো ঝলমল করছে। ভেতরে এক অদ্ভুত ব্যস্ততা, কিন্তু আনন্দও আছে।
ইব্রাহিম দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সোলেমান আসতেই সে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো। সোলেমান কিছু বললো না। আশেপাশে তাকালো। বাচ্চা খুঁজলো হয়তো। ইব্রাহিম বুঝলো। সেজন্য কেবিনের ভেতরে নিয়ে গেলো। সিজারে হয়েছে বেবি। ঊর্মি এখনো সেন্সলেস হয়ে আছে। ইতি বেগম আসছে ঢাকায়। যতই হোক মেয়ে তো। মেয়ের বাচ্চা হয়েছে একা কি আর এই অবস্থায় সামলাতে পারবে?
ইব্রাহিমের ছেলেটাকে ছোট্ট সাদা কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় শুইয়ে রাখা হয়েছে। কাছে গিয়ে কোলে নিলো। এতক্ষণ বাবার কোলেই ছিলো। ঘুমিয়েছিল বলে শুইয়ে দিয়েছিল।
সোলেমান কাছে এনে বলল,,
“ কোলে নে। ”
সোলেমান ইতস্তত হলো। নিবে কি নিবে না। ইব্রাহিম নিজেই হাতে তুলে দিলো। শিশুটাকে কোলে নিতেই সোলেমানের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠলো। চোখ বন্ধ হয়ে এলো। নিজের সন্তান কে একবার কোলে নেওয়ার সুযোগ তো দূরে থাক দেখার সুযোগ টাও হলো না। এই ছোট্ট প্রাণের ওজনের ভেতরেই যেন সে নিজের ভাঙা পৃথিবীটা আবার অনুভব করলো। দু’চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে এলো। ইব্রাহিম বললো,,
“ আজানটা দে ওর কানের কাছে। তুই দিবি বলে আমি দেই নি। ”
সোলেমান বিস্মিত চোখে তাকালো।
“ আমি দিব আজান! তুই জানিস না আমি কেমন?”
“ জানি। ”
“ তারপরও? ”
“ হু তারপরও। আর আমি জানি আমার বন্ধু সোলেমান কেমন। আমার সন্তানের দ্বিতীয় পিতা সে। ”
সোলেমান তার মুখটা নবজাতকের কানের কাছে নিয়ে আজান দিয়ে খুব আস্তে বললো,
“ তুই বড় হ … অন্তত অনেক গুলো বছর বেঁচে থাক রে বাবা। আল্লাহ তোকে বাঁচিয়ে রাখুক হাজার বছর। মা বাবার মনের মতো হোস। ”
“ একটা নাম রেখে দে সোলেমান। ”
সোলেমান তাকালো বাচ্চাটার মুখে দিকে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো।
“ যদি পছন্দ না হয় তখন? ”
“ হবে। ”
“ রুস্তম..রুস্তম পাশা? ”
“ সুন্দর নাম। আজ থেকে ওর নাম রুস্তম পাশা। ”
দুদিন পর ঊর্মি কে বাসায় আনা হয় হসপিটাল থেকে। ইতি বেগম ইব্রাহিমের বাড়িতেই থাকছেন। ইমন হসপিটালের বাচ্চাটাকে দেখেই,বাচ্চার জন্য আনা জিনিসপত্র দিয়েই নওগাঁ চলে গেছে। ঊর্মি খুব একটা কথা বলে না ইব্রাহিমের সাথে। সোলেমান তার সন্তানের কানে আজান দিয়েছে নাম রেখেছে শুনে রাগ করেছে। রুস্তম নামে ডাকেই না। ইব্রাহিম এই নামেই ডাকে। ঊর্মি বাচ্চা নিয়ে তার মায়ের সাথে ঘুমায়। সোলেমান সেই যে হসপিটালে দেখেছে বাবুকে। তারপর আর দেখে নি।
আজ সন্ধ্যার আকাশটা ধীরে ধীরে গাঢ় নীল হয়ে আসছিল। বাশার সুলতান বাগানের কোণে তার পুরোনো কাঠের চেয়ারে বসে ছিলেন। সামনে ছোট্ট টেবিলে এক কাপ চা। তা থেকে হালকা বাষ্প উঠছে, চারপাশে সন্ধ্যার নরম বাতাসে পাতাগুলো নড়ছে। এই সময়টাই তার সবচেয়ে নীরব সময়। ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে নাম,এজওয়ানের। তিনি একটুখানি দীর্ঘশ্বাস ফেলে কলটা রিসিভ করলেন। ওপাশ থেকে ছেলের কণ্ঠ হালকা টিটকারি মেশানো হাসি নিয়ে ভেসে এলো।
“ হোয়াটসঅ্যাপ হ্যান্ডসাম বাশার সুলতান? ”
ছেলের মুখে টিটকারি মার্কা কথা শুনে রাগ হলো।
“ ভালো তোর? ”
“ ফাস্টক্লাস। ভাইজান কে ফোন দিলে ভাইজান ফোন তুলে না কেনো? কোনো সমস্যা হয়েছে? ভাইজান কি কোনো কারন নিয়ে আমার উপর রেগে আছে? ”
“ না তেমন কিছু না। তোর উপর কেনো রাগ করবে। ব্যস্ত থাকে আজকাল ভীষণ। শোন তোকে একটা গুড নিউজ দেই। ”
“ বলো। ”
“ ইব্রাহিমের ছেলে হয়েছে। ”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা। তারপর বিস্ফোরণের মতো এলো এজওয়ানের কণ্ঠ,
“ কিহ! কবে? ”
“ তিন দিন হলো। ”
“ আর তুমি আজ বলতেছো! আমি বাংলাদেশে আসছি চ্যাম্পের সাথে দেখা করতে ভেরী সুন। ভাইজানও তো ক’দিন পর বাবা হবে। আহা সবাই বাবা হচ্ছে। আর আমি হচ্ছি না। এই দুঃখ কই রাখি বলো। ”
বাশার সুলতান আমতাআমতা করে বলল-
“ সোলেমান বাবা হচ্ছে না। ”
এজওয়ানের কপাল কুঁচকে আসলো এই কথা শুনে।
“ বাবা হচ্ছে না মানে? ”
বাশার সুলতান বেশিরভাগ কথা গোপন করে শুধু বললো,
“ শেখর কে চিনিস না? শেখর মেরে ফেলছে। ”
বাজ পরলো যেন এজওয়ানের মাথায়। মেরে ফেলছে মানে!
“ সবটা খুলে বলো। ভাইজান আমাকে জানালো না কেনো? ”
বাশার সুলতান যতটুকু বলা যায় ছেলেকে ততটুকুই বললো। সব শুনে এজওয়ান বিধ্বস্ত হয়ে গেলো। তার ভাইজানের রক্ত আর নেই! এতগুলো দিন পর সে আজ জানলো! তার ভাইয়ের উপর দিয়ে এত ঝড় গেলো আর সে কি না কিছুই জানতে পারলো না! এজওয়ান কোনো রকমে শুধু বললো-
“ আ.. আমি আসছি। ”
বাশার সুলতান বাঁধা দিয়ে বলল,,
“ আসার দরকার নেই। অস্ট্রেলিয়ায় থাক মাহির সাথে। এখানে এসে সোলেমানের জীবনটাকে আর জটিল করিস না। মাহি আর তোর সংসারেও দূরত্ব বাঁধাস না। ”
“ ভার মে যাক সংসার। তুমি কেনো আগে বলো নাই আমাকে এসব? ”
“ কারণ আমি চাইনি তোর সংসারটা নড়বড়ে হোক। মাহি তোকে এখনো পুরোপুরি মেনে নেয় না। তুই যদি এই অবস্থায় এখানে আসিস, তাহলে সোলেমানের কষ্ট কমবে না,আর তোর জীবনও এলোমেলো হবে। তুই দূরে থাকলে কমপক্ষে দু’টা জীবন শান্ত থাকবে। সোলেমান নিজেকে সামলে নিয়েছে। তাকে আবার কষ্টের মধ্যে টেনে আনার মানে নেই। তুই এসে কাটা গায়ে আবার নুনের ছিটা দিস না তো। তুই তোর মতো থাক। আজীবন তো দূরেই থেকেছিা। সব কিছু আমি সোলেমানই সামলিয়েছি। এবারও পারবো। ”
বাশার সুলতান মুখের উপর কেটে দিলো ফোন টা। এজওয়ান বসে পরলো বেলকনির চেয়ারে। এত কিছু হয়ে গেলো এই কদিনে! অথচ ভাইজান জানতেও দিলো না তাকে!
মাহি এসে দাঁড়ালো পাশে। একটা খাম দিয়ে বলল-
“ একটা খাম এসেছে। খুলে দেখুন তো। ”
এজওয়ান খাম টা খুলে দেখলো RAAF থেকে পাঠানো হয়েছে। ভেতরের চিঠিটা পড়তে পড়তে তার মুখ শক্ত হয়ে গেল। এটা সাধারণ কল নয়—একটা ইমিডিয়েট অপারেশনাল রিকুইজিশন অর্ডার। সাউথ সেক্টরে একটা অননুমোদিত এয়ার থ্রেট ধরা পড়েছে। কিছু অজানা ড্রোন-টাইপ ফ্লাইট রাডারে ঢুকে পড়েছে, যেগুলোর সোর্স ট্রেস করা যাচ্ছে না। সিভিল এয়ারস্পেস ঝুঁকিতে। আর সেই অপারেশনে একমাত্র রিজার্ভ কমান্ডার যিনি এই ধরনের প্যাটার্ন আগে হ্যান্ডেল করতে পারবে, তিনি হচ্ছে এজওয়ান সুলতান।
আর এখন তাকে ইমিডিয়েটলি সেখানে যেতে হবে। একদিকে ASIO অন্যদিকে RAAF। মাথা খারাপ করে দিবে এরা।
এজওয়ান রেডি হয়ে মাহিকে বলল,
“ রেডি হও তরিকুলের বেটি। তোমাকে আজ কিছু দেখাবো। ”
মাহি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো-
“ কি দেখাবেন? ”
“ রেডি হয়ে সাথে চলো তারপর দেখাই। ”
মাহি জিন্স প্যান্ট আর হোয়াইট রঙের গেঞ্জি আর তার উপর দিয়ে নেভি ব্লু আর সাদা রঙের চেকচেক একটা টিশার্ট পড়ে নিলো।
এজওয়ান আর বেশি কথা না বাড়িয়ে মাহিকে নিয়ে বের হয়ে গেল। গাড়ির জানালায় সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে গলে পড়ছে, কিন্তু এজওয়ানের মাথার ভেতরে তখন ঝড়।
RAAF-এর খামটা টেবিলে রাখার মতো নয়,এটা ইমিডিয়েট কল-আপ অর্ডার। এমন অর্ডার সাধারণ কোনো অফিসারের জন্য আসে না।
মাহি পাশে বসে চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
“কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
এজওয়ান চোখ না সরিয়েই বলল,
“ গেলেই দেখতে পারবে। চুপ থাকো এখন। ”
গাড়ি থামতেই বিশাল গেট খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইউনিফর্মধারী সৈন্যরা একসাথে স্যালুট করল।
“Welcome, Sir.”
মাহির ভ্রু কুঁচকে গেল।
“এরা আপনাকে ‘Sir’ বলছে কেন?”
এজওয়ান কোনো উত্তর দিল না। শুধু ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। হঠাৎই এক সিনিয়র অফিসার সামনে এসে দাঁড়াল।
“Commander Ezwan, reporting time is already passed. The Air Force Chief is waiting.”
মাহি থমকে গেল।
“কী বলল ও?”
এবার এজওয়ান তার দিকে তাকাল।
“ ইংরেজি বুঝো না? ”
মাহি অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল।
“আপনি… ”
এজওয়ান মাহির কথা শেষ করার আগেই মাহি কে বাহিরে বসিয়ে রেখে এজওয়ান প্রস্থান করলো। ভেতরের ব্রিফিং রুম দরজা খুলতেই দেখলো বড় স্ক্রিনে লাইভ এয়ারস্পেস ম্যাপ। রেড জোন ফ্ল্যাশ করছে।
একজন জেনারেল বললেন,
“উইং কমান্ডার এজওয়ান, উই নিড ইউ ইন দ্য স্কাই। দ্য আননোন ইউনিট ইজ নাও ক্লোজিং ইন অন সিভিল এয়ার রুটস। উই ক্যান্ট হ্যান্ডেল ইট ফ্রম গ্রাউন্ড।”
এজওয়ান একদম ঠান্ডা গলায় বলল,
“গিভ মি দ্য ফাইল।”
জেনারেল মাথা নেড়ে ফাইলটা এগিয়ে দিলেন। ব্রিফিং শেষ হতেই এজওয়ান আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। দ্রুত ইউনিফর্ম রুমে ঢুকলেন। পরনে জড়ালো গাঢ় নীল ইউনিফর্ম, কাঁধে পদমর্যাদার চিহ্ন, বুকের ওপর ঝকঝকে ব্যাজ।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মাহি এজওয়ান কে এই লুকে দেখো একদম চুপ হয়ে গেছে। সে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
“আপনি… আসলেই…”
সে বাকিটা শেষ করতে পারল না। এজওয়ান তার দিকে একবার তাকাল। চোখ টিপে বলল,
“ তুমি অনেক করেছো। আমি অনেক দেখেছি। এবার আমি দেখাবো আর তুমি শুধু দেখবে। Welcome to my dark side মিসেস এজওয়ান সুলতান । Now you get to meet my one-look Wing Commander, Ajwan Sultan .”
মাহির চোখ তখনও বিস্ময়ে বড়।
“আপনি আমাকে এই বিষয়ে আগে কিছুই বলেননি…”
“ বললে কি প্রেমে পড়ে যেতে? ”
মাহি চুপ হয়ে গেলো। এজওয়ান যাওয়ার সময় শুধু বলে গেলো,,
“ জুনিয়র, অ্যাম ইউর সিনিয়র, বয়সে,হাইটে,সম্পর্কে, পেশায়,সব কিছুতেই। সো অলওয়েজ রেসপেক্ট মি। ওকে? ”
এই কথা শেষ করেই সে আর অপেক্ষা করল না। সামনে এগিয়ে গেল রানওয়ের দিকে। বিশাল হ্যাঙ্গারের দরজা খুলে গেল। ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে একটি যুদ্ধবিমান। সিঁড়ি বেয়ে ককপিটে উঠে গেল। হেলমেট মাথায় পরল। ককপিটের কাঁচ ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। ফাইটার জেটটা আকাশ ছুঁয়ে উঠে গেল, আর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মাহি শুধু তাকিয়ে রইলো হা করে।
আকাশের ওপরে উঠতেই এজওয়ানের কণ্ঠ ভেসে এলো রেডিওতে,
“কমস চেক। আই’ম ইন দ্য স্কাই নাউ।”
অন্য পাশ থেকে দ্রুত জবাব—
“রজার দ্যাট, কমান্ডার। থ্রেট ইজ মুভিং নর্থ-ইস্ট করিডর। অল ইউনিটস রেডি।”
রাডারে তিনটা অজানা সিগনাল, একদম সিভিল এয়ার রুটের ভেতরে ঢুকে গেছে। না কোনো দেশের ফ্লাইট আইডি, না কোনো ট্রান্সপন্ডার কোড।
সে ধীরে বলল,
“আইডেন্টিফাই।”
অন্য পাইলট বলল,
“কপি। নো আইডেন্টিটি। ইট’স মুভিং ইন ডিসগাইস প্যাটার্ন।”
এজওয়ানের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“ডিকয়…”
হঠাৎ তার ফাইটার জেটটা দ্রুত বাঁক নিল।
স্ক্রিনে লক অন এলার্ট জ্বলে উঠল।
“টার্গেট ইন রেঞ্জ।”
এজওয়ান ঠান্ডা গলায় বলল,
“আই’ম টেকিং ফ্রন্ট লিড। অল ইউনিটস, স্টে ব্যাক টু সিভিল করিডর প্রোটেকশন।”
একটা সিগনাল হঠাৎ দিক বদল করলো। সোজা কমার্শিয়াল এয়ারস্পেসের দিকে। এজওয়ান এক মুহূর্ত দেরি করল না।
“লক অন।”
তার আঙুল ট্রিগারের কাছে গিয়ে থামল… কিন্তু ফায়ার করল না। সে বুঝে গেল এটা আসল শত্রু না। এটা শুধু ডিকয় স্কোয়াড। আসল ইউনিট অন্যদিকে ঢুকে গেছে। রেডিওতে হঠাৎ নতুন ভয়েস-
“কমান্ডার, সেকেন্ডারি থ্রেট ডিটেক্টেড। ডিপার স্কাই জোন, অল্টিটিউড ৩৫,০০০ ফিট।”
এজওয়ানের চোখ শক্ত হয়ে গেল।
“সো দ্যাট’স দ্য প্লে…”
সে জেট ঘুরিয়ে পুরো স্পিডে উপরে উঠল। আকাশ এখন পাতলা, ঠান্ডা, আর ভয়ংকর শান্ত।হঠাৎ রাডারে আসল সিগনাল ধরা পড়ল,একটা হাই-স্পিড ড্রোন স্কোয়াড্রন, যেটা স্যাটেলাইট জ্যাম করে ঢুকে আসছে।
এজওয়ান নিঃশ্বাস ছাড়ল।
“ফাইনালি…”
কিন্তু ঠিক তখনই পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো।
কন্ট্রোল ভয়েস এল,,
“স্যার, আমাদের সিগনাল ব্লক হচ্ছে। ফরমেশন ভেঙে যাচ্ছে। আমরা ভিজুয়াল লক হারাচ্ছি!”
এয়ারস্পেসে বিশৃঙ্খলা শুরু হলো। নিচে ব্রিফিং রুমের বাহিরেই মাহি দাঁড়িয়ে ছিল। সবটাই দেখছিলো। স্ক্রিনে সব লাল হয়ে যাচ্ছে। সে এবার সরাসরি ব্রিফিং কনসোলে গিয়ে দাঁড়ালো। হাতে রেডিও তুলে নিল। কন্ট্রোলাররা এক মুহূর্ত থমকে গেল,
“এই মেয়ে কে? এখানে কী করছে?”
কেউ কিছু বোঝার আগেই মাহি রেডিও অন করল। আকাশে তখন এজওয়ানের কণ্ঠ ভেসে আসছে,
“টার্গেট মিসিং… ভিজুয়াল লস হচ্ছে…”
মাহি হঠাৎ বলে উঠলো,
“এজওয়ান শুনছেন?”
তরিকুলের বেটির কন্ঠস্বর শুনে চমকালো কিঞ্চিৎ এজওয়ান।
“হ্যাঁ বলো।”
মাহি দ্রুত বলল,,
“আপনার ডান পাশে ২০ ডিগ্রি নিচে নামেন। ওখানে ডিকয় ক্লাস্টার আছে। আপনি এখন মেইন টার্গেট মিস করছেন।”
এক মুহূর্ত নীরবতা থেকে তারপর এজওয়ান বলল,
“তুমি কীভাবে বুঝলে?”
“স্ক্রিনে প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে। ওরা আপনাকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। আপনি উপরে না গিয়ে ডান দিকে কাট দিন।”
এজওয়ান চোখ সরু করল।
“অল ইউনিটস… পজিশন চেঞ্জ।”
মুহূর্তেই আকাশের ফরমেশন বদলে গেল। ডিকয় ভেঙে পড়ল। আসল ড্রোন ইউনিট সামনে ধরা পড়ল।এজওয়ান ধীরে জেট স্টেবল করল। জেটটা ধীরে ল্যান্ড করল। হ্যাঙ্গার খুলে গেল। অফিসাররা দৌড়ে এলো।
একজন সামনে এসে বলল,
“ওয়েল ডান, কমান্ডার। দ্য স্কাই ইজ ক্লিয়ার নাউ।”
এজওয়ান হেলমেট খুলে ফেলল। মাহির দিকে তাকিয়ে বলল,
“ অল ক্রেডিট গোস টু মাই ওয়াইফ, মাই জুনিয়র। থ্যাংকস মিসেস সুলতান। শি সেভড দ্যা মিশন। মিট মাই ওয়াইফ, শি ইজ আ ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স অপারেটিভ ফ্রম বাংলাদেশ। ”
মাহি চমকালো শেষের কথা শুনে। এই পরিচয়ের কথা তো এজওয়ানের জানার কথা না। মাহি তো কাউকে বলে নি। তাহলে সে কিভাবে জানলো? সাফওয়ান বলেছে? সে তো একমাত্র সাফওয়ান কেই বলেছিল। কিন্তু সেটাও বা কি করে সম্ভব। তাদের মধ্যে তো সাপ নেউলের সম্পর্ক। এজওয়ান তার পোশাক বদলে এসে মাহির হাত ধরে বলল,
“ চলো বাড়ি যাওয়া যাক। ”
“ আপনি আমার পরিচয় জানলেন কিভাবে? ”
এজওয়ান হাসলো।
“ ভুলে যেও না, জুনিয়র। আমি তোমার সিনিয়র। তাই এসব জানা আমার বা হাতের মিডেল আঙুলের কাজ । ”
মাহি লাস্ট কথাটা শুনে রাগী চোখে তাকিয়ে বলল,,
“বাসায় যান, তারপর সিনিয়র-জুনিয়র দেখাচ্ছি। আর কোন আঙুলের কাজ সেটাও দেখাচ্ছি। ”
মেহরিনের এইচএসসি পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ হয়েছে। যেহেতু সে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের শিক্ষার্থী, সেজন্য তার পরীক্ষার কেন্দ্র ঢাকায়। তাকে ঢাকায় গিয়ে থেকে এক্সাম দিতে হবে। আবার এক্সাম শেষে কোচিংও করতে হবে মেডিক্যালের প্রিপারেশনের জন্য। সুলতান নিবাসে তো সে জীবনেও যাবে না। সেজন্য মোতালেব ভুঁইয়া তেহরানদের বাড়িতে মেহরিনের থাকার ব্যবস্থা করলো। মেহরিন ওখানে থেকেই এইচএসসি আর মেডিক্যালের এক্সাম দিবে। মোতালেব ভুঁইয়া প্রতি সপ্তাহে যাবেন মেয়েকে দেখতে। সোলেমান যেন উত্যক্ত করতে না পারে সে নিয়েও ব্যবস্থা নিবে।
মেহরিনের ঢাকা যাওয়ার নাম শুনেই মন মস্তিষ্ক সব বিষের মতো হয়ে গেলো। রাত তখন আটটা বাজে। ইমন এসেছে। ইতি বেগম নেই সেজন্য মোতালেব ভুঁইয়া তার খাওয়া দাওয়া এ বাড়িতেই করতে বলছে। খাবার সময় কথায় কথায় উঠলো মোতালেব ভুঁইয়া কেইস করবে সোলেমানের নামে। ইমন সে কথা শুনে বলল-
“ কেইস করে কোনো লাভ নেই আঙ্কেল। দেশের মাথায় বসে রাজত্ব করা মানুষ তারা। কোনো আদালতই তাদের সাজা দিতে পারবে না। আর তাছাড়া প্রমাণ কই আমাদের কাছে? প্রমান দিয়েই সাজা পাওয়ানো যায় না এই দেশে । সেখানে তো আমাদের প্রমানই নেই। কিচ্ছু করতে পারবেন না। শুধু শুধু আপনার টাকা নষ্ট হবে। হেনস্তা হবেন। ”
মেহরিন কিছু বললো না। চুপচাপ শুনলো। এক পর্যায়ে মেহরিনের বিষয় উঠলো। মেহরিন যেহেতু বলেছে সোলেমানের সংসার আর করবে না,মোতালেব ভুঁইয়াও আর মেয়েকে পাঠাবেন না। তাই মোতালেব ভুঁইয়ার মনে হলো মেয়ের ছাড়াছাড়ি করিয়ে আনাই উত্তম। এমন এক অমানুষের সাথে থাকার কোনো মানেই হয় না। ডিভোর্সের কথা উঠাতেই ইমন মেহরিন দুজনেই চমকে উঠলো। মেহরিন তো কখনো ডিভোর্সের কথা চিন্তা তো দূরে থাক মাথাতেও আনে নি। সেখানে মোতালেব ভুঁইয়া নির্দ্বিধায় ডিভোর্সের কথা বলে ফেলছে। সমাজ কি চোখে দেখে একজন ডিভোর্সি মেয়েকে মোতালেব ভুঁইয়া কি সেটা ভুলে গেছেন!
মেহরিনের থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে মোতালেব ভুঁইয়া বলল,
“ মেহরিন,তুমি মা সমাজের চিন্তা কইরো না। তুমি তো সিদ্ধান্ত নিয়াই নিছো সংসার করবা না। বাপ আছি আজীবন তোমার সাথে। সমাজের ধার আমি ধারবো না। তোমার সুখ সবার আগে। আর আমি বাপ হয়ে বলতেছি তুমি ডিভোর্স দিয়ে দাও। আজীবন তোমারে আমি আমার কাছে রাখতে পারবো। কোনো সমস্যা হবে না। আমার মাইয়ারে কষ্ট দেওয়া মানুষজন আমি দেখতে পারি না। ”
ইমন খেয়ে চলে যাওয়ার সময় মেহরিন কে শুধু বলে গেলো,
“ মেহরিন যা করবে, ভেবে চিন্তে সময় নিয়ে তারপর করবে। চাচার কথায় হটকারিতায় কোনো কিছু করো না। ”
ইমন চলে গেলো। মেহরিন সারা রাত ভাবলো। সেরিন, বাতাসি, সবাই বুঝালো। বাতাসি নিজেও ডিভোর্স দিবে ইয়াসিন কে। কোনো খুনিদের সাথে আর যাই হোক ঘর করা যায় না। এক সপ্তাহ ধরে ভেবেচিন্তে মেহরিন সিদ্ধান্ত নিলো। যেখানে তার বাবা তার পাশে আছে সেখানে তার আর কোনো মানুষের পরিচয় নাম কিছুই দরকার নেই। আর তা ছাড়া যে মানুষকে আইনও সাজা দিতে পারবে না। তার কাছে এটাই সাজা স্বরূপ হিসেবে পাঠানো তোহফা মেহরিনের তরফ থেকে। থাকুক সে তার পাপের বোঝা নিয়ে। আর ভাগিদার না করুক এই মেহরিন কে। তাদের মধ্যেকার সব সম্পর্কের ইতি ঘটুক। দুজনার পথ ভিন্ন হোক। পরিচিত থেকে আবার অপরিচিত হোক। মেহরিনের এখনো অনেকটা পথ চলা বাকি। তাকে তার বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে হবে।
এই পৃথিবীতে এই তো এক মানুষ তার বাবা। যে কি না নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবেসে গেছে। তার বাবা কোনোদিন তার মাথার চুলটা পর্যন্ত এলোমেলো হতে দেয় নি। সেখানে নওয়াজ সোলেমান সুলতান তুমি তার আস্ত একখানা জীবন এলোমেলো করে দিয়েছো।
নওয়াজ সোলেমান সুলতান কে মেহরিন তাবাসসুম ডিভোর্স দিবে। যেই সম্পর্কে থাকার জন্য একসময় মেহরিন উতলা ছিলো। এখন সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মেহরিন উতলা। মোতালেব ভুঁইয়া মেয়ের অনুমতি পেয়ে ডিভোর্স পেপার বানিয়ে আনলো। বুকে পাথর চেপে মেহরিন তাতে সাইন করে দিলো। মোতালেব ভুঁইয়া সেই পেপার টা উকিলের মাধ্যমে সুলতান নিবাসে পাঠালো।
দাহশয্যা পর্ব ৯৫ (২)
ভুঁইয়া বাড়ি থেকে দীর্ঘ একমাস পর সুলতান নিবাসে উকিলের মাধ্যমে একটি খাম এসেছে। সোলেমান খবরটা পেয়েই কাঁপা কাঁপা হাতে খামটা খুলতেই দেখতে পেলো, এটা একটা তালাকনামা । আর মেহরিন এতে সাইনও করে দিয়েছে ।
