লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৩
লিজা মনি
কাচের দেয়ালের ওপাশে এক জড়চিত্রের মতো শায়িত আছে এক অনন্য রূপসী রমণী। বুকের ওঠানামা খুবই ধীর আর ক্ষীণ হয়ে আছে। জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে কোনো অদৃশ্য সুতোয় দুলছে । হাসপাতালের সমস্ত নিয়মকানুন, কর্তব্যরত ডাক্তার ও নার্সদের কর্কশ বারণকে এক প্রচণ্ড উগ্রতায় পদদলিত করে সেই বিভীষিকাময় কেবিনের ভেতরে ঝঁড়ের গতিতে প্রবেশ করল নিক।
এই সেই ঘর, যেখানে সম্পূর্ণ অসাড় ও বেঘোরে শুয়ে আছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র গ্যাংস্টার বসের একমাত্র বেঁচে থাকার অবলম্বন, তার হৃদপিণ্ড।এনির ফর্সা হাতে বিঁধে আছে ক্যানুলা, মুখমণ্ডল ঢাকা পড়েছে কৃত্রিম অক্সিজেন মাস্কের প্লাস্টিকে। তুষারশুভ্র পেটের ও হাতের ওপর চুইয়ে পড়া রক্তের দাগ আড়াল করে সগর্বে দৃশ্যমান হয়ে আছে সাদা ব্যান্ডেজের আস্তরণ।
নিকের ধূসর চোখের মণি দুটো এই দৃশ্যে জ্বলে উঠে। তার সহ্য হলো না এই নির্মম জড়তা। মনের ভেতরে এক প্রাচীন আক্রোশ ফুঁসে উঠল। শরীরের শার্টটার মধ্যে এখনও শত্রুদের রক্ত লেগে আছে। কালো শার্টের উপর লাল রক্তের আস্তরন বুঝা না গেলেও গন্ধ বের হয়ে আসছে। হাত – শরীরে অসংখ্য ক্ষতের দাগ। নিক ঠোঁট কামড়ালো নিজের। অতীত কি কম নিষ্ঠুর ছিল? তবে এই বর্তমান কেন তার চেয়েও দ্বিগুণ হাহাকার আর নির্মমতা নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল?
এক তীব্র উন্মাদনায় ব্যস্ত হয়ে উঠল নিক। এনির শিয়রে বসে এক বুক শূন্যতা নিয়ে শুকনো ঢোক গিলল সে। চিকিৎসকেরা অভয় দিয়ে বলেছে সে এখন বিপদমুক্ত, অথচ মেয়েটার বুক চিরে এখনো নিশ্বাস বের হচ্ছে এক বুক কষ্ট নিয়ে। নিকের ধারালো চিবুক শক্ত হয়ে উঠল। তার আর সহ্য হচ্ছে না এই কৃত্রিম ক্যানুলা আর বন্দি করে রাখা অক্সিজেন মাস্কের অস্তিত্ব। মনে হচ্ছে এগুলোই যেন এনিকে তার থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে। বুকের ভেতরটা এক অজানা, তীব্র যন্ত্রণায় পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে তার।
কোনো হিতাহিত জ্ঞান না রেখে এক আদিম ও নিষ্ঠুর অবাধ্যতায় টান মেরে ছিঁড়ে ফেলে দেয় এনির হাতের ক্যানুলাটা। খোলার সেই নৃশংস মুহূর্তেই মাংস ফুঁড়ে রক্ত ছিটকে পড়ল কিছুটা দূরে সাদা চাদরের বুকে। তীব্র ব্যথার আকস্মিকতায় এনির নিস্তেজ, ভগ্ন শরীরটা একবার সজোরে ঝাঁকি দিয়ে উঠে । অবশ, অর্ধনিমীলিত চোখ মেলে সে তাকায় নিকের অবিন্যস্ত মুখাবয়বের দিকে।
কিন্তু নিক তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। সে তৎক্ষণাৎ নিজের ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরল এনির সেই রক্তাক্ত ক্ষতস্থান। এক অদ্ভুত, উন্মত্ত ব্যাকুলতায় সে যেন ওই রমণীর শরীর থেকে ঝরে পড়া সমস্ত রক্ত নিজের ভেতরে শুষে নিতে চাচ্ছে । এক ফোঁটা রক্তও সে এই নশ্বর পৃথিবীর মাটিতে বিফলে যেতে দেবে না। কোনো জড় বস্তুকে তা স্পর্শ করতে দেবে না।
নিকের এই হিংস্রতার তাপে এনির ফুসফুসের গতি আচমকা বেড়ে যায়। ক্ষীণ নিশ্বাস দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে লাগে। অবশ ঠোঁট দুটো সামান্য কাঁপিয়ে উঠে। চরম ভগ্ন ও দুর্বল গলায় ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
” আমার মেয়ে কোথায়? কেমন আছে সে? প্লিজ নিয়ে আসুন, আমার দুধের বাচ্চাটা কতক্ষন ধরে খায় না।
সেই রক্তপিপাসু হিংস্র পুরুষের সমস্ত আদিম উন্মাদনা যেন নিমেষে এক অলক্ষ্য মন্ত্রবলে স্তব্ধ হয়ে যায়। যে মানুষটার চোখের ইশারায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাম্রাজ্য থরথর করে কাঁপে, আজ সামান্য এক নারীর অবশ চোখের মণি দুটোর দিকে তাকাতে গিয়ে সে ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে। অপার্থিব এক আতঙ্কে পুরো অবশ হয়ে যাচ্ছে তার ভেতরটা। এক নির্মম, হৃদয়হীন মানব আজ পরাস্ত এক নিঃস্ব বালকের মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তাকাতে পারছে না এই মায়াবী কাতর চোখের দিকে।
মস্তিষ্কের প্রতিটি শিরায়-উপশিরায় সবকিছু কেমন ওলটপালট হয়ে গুলিয়ে উঠছে নিকের। মনে হচ্ছে এক নিমেষে পুরো পৃথিবীটাকে পুড়িয়ে ছারখার করে ধ্বংসের স্তূপ বানিয়ে দিতে । বুকের গহিনে এতক্ষণ ধরে যে প্রতিশোধ আর যন্ত্রণার অনল ধাউ ধাউ করে জ্বলছিল, তা আরও তীব্র হয়ে উঠে। যে শত্রুরা এনির এই অবস্থা করেছে, তাদের বুক চিরে জীবন্ত কলিজাটা বের করে চিবিয়ে খেলেও বুঝি এই মুহূর্তে তার ভেতরের পৈশাচিক তৃপ্তি আসবে না।
এক চরম উন্মত্ততায়, পাগলের মতো বুক ফুলিয়ে একটা দীর্ঘ ও তপ্ত শ্বাস টেনে নিক শেষবারের মতো এক পলক তাকাল এনির দিকে। কিন্তু না, সেই অপরাজেয় গ্যাংস্টার বসের আর দ্বিতীয়বার চোখ তুলে তাকানোর মতো সাহস অবশিষ্ট রইল না। এনির ওই নিষ্পাপ, যন্ত্রণাকাতর চাউনি সমস্ত অহংকার, সমস্ত নিষ্ঠুরতাকে এক লহমায় ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।
নিজের রক্তাক্ত ঠোঁট দুটোকে কোনোমতে আলগা করে। এক অদ্ভুত আর্দ্র আর ভাঙা গলায় খুব ছোট্ট করে অধৈর্য গলায় আওড়ায়,
” আমার প্রেম, আমার জীবন, কলিজা আমার ব্যাথা করছে এখনও? কষ্ট অনুভব করছো? অসহ্য যন্ত্রনা হচ্ছে? কোথায় ব্যাথা করছে কলিজা, দেখাও!
এনির চোখ ছাপিয়ে কান্না বেরিয়ে আসে। নিককে ভালোভাবে পরখ করার সাহস পেলো না সে। এতটা বিধ্বস্ত রুপ কখনো দেখে নি সে। এমন ভয়ানক মনস্টারের চোখে – মুখে এমন যন্ত্রনার ছাপ কেনো? কেনো তার পুরো শরীর এমন রক্তাক্ত হয়ে আছে। এই যন্ত্রনা কিসের এত? এনি কেঁদে উঠে,
” কিসের এত যন্ত্রনা আপনার চোখে- মুখে? আমি ঠিক আছি। আমার মেয়ে কোথায় নিক? প্লিজ ওকে আনুন আমার কাছে। আর সহ্য করতে পারছি না এই দুরত্ব।কোথায় সে? কেনো নিয়ে আসেন নি?
নিক থামে কিছুক্ষণের জন্য। এমন ভাবে উত্তর দেয় যেন কিছু ঘটে নি।
” আছে। অপেক্ষা করছে তোমার জন্য।
বাচ্চা সুস্থ আছে শুনে মায়ের মন শান্ত হয়ে উঠে। এনি আর অন্যসব চিন্তা করলো না। বায়না ধরলো নিকের সাথে এই মুহূর্তে বাড়িতে চলে যাবে।কতক্ষন হলো বাচ্চাগুলোকে বুকে আগলে নিচ্ছে না সে। ভেতরটা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। এনি হাত চেপে ধরে উঠে বসে। বিছানা থেকে নামতে গেলে নিক শক্ত করে ধরে তার বাহু।
” যাচ্ছো কোথায়?
এনি ছলছল চোখে তাকায় নিকের দিকে। ছটফটিয়ে উঠে তার দেহখানা,
” যাব আমি আপনার সাথে। নিভ্রিতাকে কতক্ষন ধরে দেখি না। জানেন মরে যাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিলো আমার শরীর থেকে জীবন্ত অবস্থায় কেউ কলিজা ছিঁ*ড়ে নিয়ে আসছে। আমার কলিজাটা ঠিক আছে শুনে কতটা শান্তি পাচ্ছি বলে বুঝাতে পারব না। মনে হচ্ছে কোনো আগুনের ভেতর থেকে উঠে এসে শীতলতা অনুভব করছি। এরিক আর নিরাশাও কতক্ষন ধরে দুধ খায় না। কান্না করছে নিশ্চই অনেক? নিয়ে চলুন তাড়াতাড়ি। মা হয়েছি আমি। বাচ্চাদের বুক থেকে সরিয়ে হসপিটালে শুয়ে থাকা শুভা পায় না। চলুন নিক!
নিক খামছে ধরলো এনির বাহু। ঘন ঘন শ্বাস টেনে উত্তর করলো,
” একটু পর।
নিকের এমন অস্বাভাবিক অবস্থা দেখে এনি হালকা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে,
” আপনাকে অস্বাভাবিক লাগছে অনেক। এমন অবস্থা আগে কখনো দেখিনি। কিসের জন্য এমন দেখাচ্ছে আপনাকে?
” দ্যাটস নান অব ইয়োর বিজনেস। অপেক্ষা করো কিছুক্ষন, আসছি আমি।
” এমন কঠিনভাবে কথা বলছেন কেনো? আমার অশান্তি লাগছে এখানে।
” লাগুক একটু অশান্তি।
এনি ভোঁতা মুখে তাকায় নিকের দিকে। তপ্ত শ্বাস ফেলে জিজ্ঞাসা করে,
” নাজলী আপা কেমন আছে?
” অপারেশন চলছে।
এনির বুকটা কেঁপে উঠে। তখনকার এক- একটা দৃশ্য মনে হতেই ভয়ে কু*কড়ে যায়। কাঁপা গলায় বলে,
” ঠ.. ঠিক হয়ে যাবে তো? আমাদের বাঁচাতে গিয়ে বিপদের সম্মুখীন হলো। আমার বোনটা ঠিক হয়ে যাক। আর কিছু চাচ্ছি না এই মুহূর্তে। প্লিজ, আল্লাহ, মেক হিম ওয়েল।
পর – পর নিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
” নিভ্রিতার শরীরে চো*ট লাগে নি তো? ও কেঁদে নিশ্চই দুনিয়া ভাসিয়ে দিয়েছে। জানা নেই জালিমরা কি করেছে আমার মেয়েটার সাথে।
নিক শক্ত করে ধরলো নিজের ঠোঁট। এক মুহূর্তে টিকা যাচ্ছে না এখানে। সমুদ্রের উত্তালের মত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তার অনুভুতিহীন হৃদয়। এনির কপালে কপাল ঠেকালো হিংস্র মানব। নিককে এমন বেপোরোয়াভাবে শ্বাস ফেলতে দেখে এনি মুচকি হাসে। নিকের ঘাড়ে হাত রেখে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলে,
” আমি ওদের শরীরে আঘাত লাগতে দেয় নি নিক। আপনার আমানত আমি ধ্বংস হতে দেয় নি। কোনো পুরুষ আমাকে বাজেভাবে স্পর্শ করতে পারে নি। কোনো ঘাতক আপনার অস্তিত্বের উপর আচর দিতে পারে নি। আপনার সন্তান, আপনার স্ত্রী সুস্থ আছেন। আপনার আমানত কিছু হয় নি। ভয় পাচ্ছেন কেনো এইভাবে?
নিক শেষ বারের মত ঠোঁট ছুয়ালো এনির গালে। মোটেও সেটা ভালোবাসার স্পর্শ ছিলো না। কেমন যেন একটা শেষ স্পর্শের অনুভুতি হলো। যেভাবে ঝড়ের বেগে এসেছিলো ঠিক সেভাবে বের হয়ে যায়। যাওয়ার আগে ছোট্ট করে উত্তর দেয়,
” আমার অশুভ জীবনের সাথে তোমাকে জড়ানো উচিত হয় নি। একদম উচিত হয় নি। তুমি একদিন ঠিকই বলতে পৃথিবীর সবাই বাবা হওয়ার ক্ষমতা রাখলেও আমার মত পাপী কখনো বাবা হওয়ার ক্ষমতা রাখে না। কোনো নরকে পুষ্প ফুটতে পারে না। যদি একবার ভুল করে ফুটেও যায় তবে সেটা ঝলসে যায় একটা সময়। আই কুডেন্ট প্রটেক্ট ইউ।
আই কুডেন্ট কিপ মাই ওন চাইল্ড সেইফ। দেয়ার ইজ নো আদার ফাদার ইন দিস ওয়ার্ল্ড অ্যাজ ফেইলড অ্যাজ মি। আই’ম সরি দ্যাট আই কুডেন্ট প্রটেক্ট ইউ। এই ভুবনে আমার মত খারাপ আর জন্ম না নিক। নয়ত তার পাশের সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে।
এনি খামছে ধরলো বিছানার চাঁদর। নিকের মুখে প্রথমবারের মত আর পাঁচজন সাধারন মানুষের মত বাক্য শুনে ধ্বাক্কা খেলো রমণী। বুঝতে পারে নি কথার অর্থ। এই দুই লাইনের কথার মধ্যে এত বেদনা ছিলো কেনো? গলাটা এমন যন্ত্রনাদায়ক কেনো শুনালো! কেনো?
হসপিটালের করিডোরের বিষণ্ণ আলোয় তখন এক চরম অনিশ্চয়তার প্রহর চলছে। ইমার্জেন্সি রুমের ভেতরে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে নাজলী। অপারেশন থিয়েটারের দরজার ওপর জ্বলতে থাকা লাল আলোটা এক নির্মম মহাকালের প্রতীক। সমস্ত চিকিৎসকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। ভেতরে আতঙ্কে মুচরে যাচ্ছে তারা। আরিশের কঠিন হুশিয়ারি এখনও সবার কানে বাজছে,
” আমার স্ত্রীর যদি কিছু হবে তবে এই হসপিটাল ধ্বংস করব আমি। প্রতিটা ডাক্তারকে এর কঠিন মাশুল গননা করতে হবে।
ডাক্তারদের কণ্ঠস্বর আশঙ্কাজনক। তারা না পেরে ভয়ে – ভয়ে জানিয়েছেন পরিস্থিতি সংকটের চরম সীমায় উপনীত। তীব্র রক্তক্ষরণে নাজলীর অবস্থা সূচনীয় । আঘাতের তীব্রতা এতটাই মারাত্মক ছিল যে, তা পিঠের মেরুদণ্ডকে কেন্দ্র করে এফোঁড়-ওফোঁড় করে উদর পর্যন্ত এসে ঠেকেছে। বাহ্যিক কোনো উদ্দীপনাতেই সে আর সাড়া দিচ্ছে না। ক্ষীয়মাণ ফুসফুস দুটো অলক্ষ্যে অত্যন্ত ধীরলয়ে শেষ কিছু শ্বাসের আবর্তন ধরে রেখেছে মাত্র।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের সূক্ষ্ম গণনায় তার ফিরে আসার সম্ভাবনা এখন মাত্র আট শতাংশের ক্ষীণ সুতোয় ঝুলছে।
এই ধ্বংসস্তূপের বাইরে করিডোরের ঠান্ডা মেঝেতে আছড়ে পড়ছিল আরিশের আদিম, উন্মত্ত হাহাকার। যে মানুষটা এতক্ষণ এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের মতো হাসপাতালের দেয়ালগুলোতে মাথা কুটে মরছিল, যার ভেতরের হিতাহিত জ্ঞানশূন্য আচরণে আশপাশের সবাই শিউরে উঠছিল, সে ইতিমধ্যেই দু-দুবার হারিয়েছে।
আরিশ এখন একদম শান্ত হয়ে বসে আছে। তবে সে শান্ত হওয়া কোনো স্বস্তি নয়। কেমন যেন জীবন্ত পাথরের মত বসে আছে। করিডোরের একটা জীর্ণ চেয়ারে সে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। চোখের মণি দুটো স্থির, পলকহীন ও এক শূন্য অতিপ্রাকৃতিক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে অপারেশন থিয়েটারের ওই বন্ধ দরজার দিকে। সারা শরীরে লেপ্টে আছে এক বিধ্বস্ততার ছাপ। জামাকাপড় সহ শরীর একদম ক্ষত-বিক্ষত। মাথার চুলগুলো অবিন্যস্ত ও শুষ্ক হয়ে আছে। কপালে জমে থাকা ঘাম আর রক্তের রেখা শুকিয়ে বিবর্ণ রুপ ধারন করেছে। মুখাবয়বের প্রতিটি রেখায়, চোখের কোণে এবং ঠোঁটের জড়তায় পৃথিবীর সমস্ত আদি-অন্তহীন যন্ত্রণা মূর্ত হয়ে উঠেছে। আরিশ বসে আছে ঠিকই, কিন্তু ভেতরের আত্মাটা বহু আগেই ওই বন্ধ দরজার ওপাশে নাজলীর অবশ শরীরের পাশে গিয়ে আছড়ে পড়েছে। আরিশকে এমন শান্ত হয়ে বসে থাকতে দেখে অধিরাজ তপ্ত শ্বাস ফেলে। দশ মিনিট হবে সে এখানে এসেছে। একদিকে নিক অন্যদিকে আরিশ সবাই কেমন যেন হিংস্র সত্তা থেকে বেরিয়ে এক অসহায় প্রেমিকের রুপ নিয়েছে।
সন্তান হারিয়ে নিকের হিংস্রতা আরও কয়েক ধাপ পেরিয়েছে। কায়াতের মৃত্যুর পর আরও বিশ জন শত্রুকে মেরে এসেছে। এমন মৃত্যু যে কারোর রুহ অব্দি কাঁপিয়ে তুলার জন্য যথেষ্ট ছিলো। অধিরাজের চোখে এখনও ভাসছে সেই ধ্বংসাত্বক ভিবৎস্য মুহূর্ত, যেখানে আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্ট নিজের শত্রুর কলিজা চিবিয়ে খেয়েছে। অধিরাজ খামছে ধরলো নিজের চুল। কোনো কিছু ভাবতে পারলো না আর। যতবার নিকের সেই নরখাদক রুপ নিয়ে ভাবতে যাচ্ছে ততবার সে দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। অধিরাজ চোখ- মুখ মুছে আরিশের কাধে হাত রাখে। সামান্য শ্বাস ফেলে বলে,
” স্যার, এভরিথিং উইল বি ওকে। হ্যাভ ফেইথ ইন ইয়োরসেলফ। নাজলী ম্যাম হচ্ছে সত্যিকারের কুইন।দেখেন নি কিভাবে আপনার সাথে ফাইট করত। একটুও ভয় পেত না কিছুতে। এইবার ও ফাইট করে ঠিক আপনার বুকে চলে আসবে। কুইনরা কখনো হারে না স্যার। না এনি ম্যাম হারবে আর না নাজলী ম্যাম।
আরিশ করিডরের দিকে তাকিয়ে ভাঙ্গা গলায় আওড়ালো। তবে সেই কন্ঠস্বর যথেষ্ট শক্ত ছিলো,
” ওকে আসতে হবে অধিরাজ। যদি না আসে তবে খুব খারাপ হয়ে যাবে। ঝগড়া এখনও সমাপ্ত হয় নি আমাদের। পায়ে পা রেখে ঝগড়া করার জন্য হলেও এই মেয়েটাকে আমার চাই। আসতে হবে তাকে, যে কোনো মূল্যে।
অধিরাজ অবাক দৃষ্টিতে তাকালো আরিশের দিকে। বিশ বছরের স্পর্ক এদের সাথে তার। এক মুহূর্তের জন্য যাদের কোনোদিন অস্থির হতে দেখে নি তাদের ছটফট করা অস্থিরতা দেখছে সে।
অপারেশন থিয়েটারের লাইট নিভে যায়। আরিশ চট করে তাকায় সেদিকে। দুইজন ডাক্তার বের হয়ে আসলে ঝড়ের বেগে ছুটে যায় সেদিকে। ডাক্তারকে কিছু বলার বা শুনার পরোয়া করলো না। ডাক্তার তারা হতভম্ভ হয়ে যায় সবাই। একজন আটকাতে চাইলো কিন্তু সাহস হলো না। একজন ডাক্তার অধিরাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
” মি অধিরাজ, প্লিজ টেল হিম টু স্টে কাম, আদারওয়াইজ দ্য পেশেন্ট মে বি হার্মড।
অধিরাজ শরীর ঝাঁকিয়ে হাসলো সামান্য। নোংরা রক্তাক্ত শার্ট পরিহিতা শক্তপোক্ত বিশাল দেহী শরীরটা সামান্য ঝাঁকি দিয়ে উঠে। ডাক্তার তারা ভ্রুঁ কুচকালো। অধিরাজ ঠোঁট চেপে ধরে থেমে থেমে বলে,
” একজন ওয়াইফের কাছে তার হাজবেন্ডের স্পর্শ পৃথিবীর সব থেকে দামী মেডিসিন ডক্টর। আর সেখানে যদি হয় আত্নার বন্ধন তখন পেশেন্টের ক্ষতি নয় বেস্টটা হবে। চিন্তামুক্ত থাকুন, এই মুহূর্তে কেবিনের ভেতরে কোনো ক্রিমিনাল লিডার প্রবেশ করে নি। প্রবেশ করেছে একজন বিধ্বস্ত, ভাঙ্গুর স্বামী। সো দেয়ার্স নো নিড টু ওরি অ্যাবাউট দেম। জাস্ট প্রে দ্যাট দে ডোন্ট গেট সেপারেটেড অ্যান্ড দ্যাট হি রিকাভার্স।
অধিরাজ হেসে চলে যায়। ওইদিকটা সব কিছু সামলাতে হবে। নিক কি পরিকল্পনা করছে ধারনা নেই। অধিরাজ চিন্তিত হয়ে গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে ঠোঁট কামড়ায়। নিভ্রিতাকে যদি কায়াত না মেরে থাকে তবে কে মেরেছে? কে সেই গোপন শত্রু? আপন কেউ নাকি বাহিরের শত্রুদের মধ্যে একজন। চিন্তায় মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে তার। রাগে উন্মাদের মত গাড়ির স্টিয়ারিং এর উপর ঘুষি দিয়ে বসে। চামড়া ফেটে রক্ত গলগলিয়ে পড়ছে। কিন্তু সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। রক্তাক্ত হাত নিয়েই স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে সেই টেরিসের দিকে এগিয়ে যায়।
আরিশ ঝড়ের গতিতে কেবিনের ভেতরে ডুকলেও ভেতরে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ে নাজলীর পাশে। এক ঘন্টা পেরিয়ে গিয়েছে সেই একইভাবে মাথরের মত বসে আছে। নাজলীর ফ্যাকাসে মুখটা থেকে নজর সরছে না। ফর্সা চেহারা একদম লাল হয়ে আছে। লাল চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ল্যাপ্টে আছে শুভ্র বেডের উপরে। পেটে সাদা ব্যান্ডেজ ভেসে উঠেছে। হাতে ক্যানুলা লাগানো। মুখে অক্সিজেন মাক্স লাগিয়ে রাখা হয়েছে। শ্বাস চলছে খুব ধীর গতিতে। আরিশ কাঁপা হাতে নাজলীর নরম তুলতুলে হাত দুইটা আলতো ভাবে ধরে। এতক্ষন পরে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে পড়ে ক্রিমিনাল লিডারের। হাতটা মুখের কাছে নিয়ে চুমু খায়। আচমকা বাচ্চাদের মত ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে,
” আই কুডেন্ট প্রটেক্ট ইউ। দ্য এনিমিজ হার্ট ইউ সো ব্যাডলি, অ্যান্ড ইয়েট আই কুডেন্ট ডু এনিথিং টু দেম।
প্লিজ ফরগিভ মি, মাই। আমার ঝগড়ুটে কুইন, কথা বলো জান। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বুকে হাত রেখে দেখো উত্তপ্ত ধোঁয়া বের হচ্ছে এই স্থান থেকে। আর কত পুড়াবি এই পুড়ে যাওয়া শরীরটাকে। জানিস, জীবনে কখনো সুখের মুখ দেখিনি। তকে নিয়ে বাঁচতে চেয়েছি আজীবন। তুই ও বেইমানি শুরু করে দিয়েছিস? এইভাবে মাঝ পথে ছেড়ে যাওয়ার পায়তারা করছিস? খবরদার এমন চিন্তা ভাবনা করলে গলা টিপে মেরে ফেলব। আমি অসহায়, আমি নিস্বঃ! আমার এই অসহায় জীবনে কি একটু থাকলে খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে? একটু থেকে যাও। ঝগড়া করব, ভালোবাসব, মারব – বকব আবার সবটা দিয়ে আদরও করব। গড প্রমিস জান, ক্রিমিনাল লিডার আরিশ ইলহাম এই লাল কেশওয়ালী নারীর প্রতি বাজেভাবে আসক্ত। তাকে ছাড়া সে অসহায়! একবার তাকা। আমার বিধ্বস্ত রুপ দেখতে তো খুব ভালোবাসো। একবার তাকিয়েই দেখ না তকে ছাড়া কোন বিধ্বস্ত রুপে পৌঁছেছি।
নাজলীর শরীর সামান্য ঝাঁকি দিয়ে উঠে। পর – পর তিনবার ঝাঁকি দিয়ে উঠে শরীর। চোখ বন্ধ তবুও চোখ থেকে গাল বেয়ে অঁঝোড়ে পানি পড়ছে। হাত – পা নড়ছে না একটুও। নিশ্বাসের মাত্রা প্রয়োজনের তুলনায় বেগতিক ভাবে চলছে। আরিশ ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে। কেউ যেন তার হৃৎপিন্ডটা খামছে ধরে রেখেছে। নাজলীর কপালে হাত রেখে অধৈর্য হয়ে উঠে,
” কি হয়েছে? কষ্ট অনুভব করছো ভেতরে? যন্ত্রনা হচ্ছে? ডাক্তার ডাকব? শালী কথা বলছিস না কেনো?.
পর মুহূর্তে আরিশ উন্মাদের মত আচরন করে উঠে। খামছে ধরে নিজের অগুছালো চুল। পাগলের মত এদিকে – সেদিক তাকায়। নাজলীর নিশ্বাস ধীরে ধীরে কমে আসছে। আরিশ দিশেহারা হয়ে নাজলীর ক্ষত স্থানে হাত রেখে বলে,
” এই বউ, কোথায় যন্ত্রনা হচ্ছে বল না? তর নিশ্বাস কেনো কমে আসছে? নিশ্বাস বন্ধ রেখে প্র্যাংক করছিস আমার সাথে? প্লিজ এই মুহূর্তে আর জ্বালাবে না। এমনিতেই জ্বলে – পুড়ে মরে যাচ্ছি। আর কখনো জঙ্গলী ডাকব না। সত্যি বলছি আর কখনো বকব না। প্রয়োজন পড়লে সারাজীবন পায়ের কাছে পড়ে থাকব। তবুও কোনো প্র্যাংক করো না আমার সাথে। কি চাই? বাবু চেয়েছিলে না সেদিন? একটা নয় হাজারটা দিব। শুধু একবার তাকাও! প্লিজ তাকাও।
নাজলীর নিথর অবয়বে কোনো সাড়া নেই। এক অনন্ত, হিমশীতল নীরবতা যেন গ্রাস করেছে পুরো শরীরকে। আরিশের বুকের ভেতর আচমকা বাতাস আটকে আসে। ফুসফুসটা কেমন এক লহমায় সংকুচিত হয়ে যায়। চোখের সামনে শায়িত ওই প্রিয় মুখের দিকে সরাসরি তাকানোর মতো বিন্দুমাত্র সাহস সে আর সঞ্চয় করতে পারছে না। এক বুক অবরুদ্ধ দম চেপে, অসীম ভয়ে চোখ রাখে নাজলীর নিস্তেজ হাতের নাড়ির ওপর।
হতাশা আর তীব্র আক্রোশে আরিশের চোখের মণি দুটো মুহূর্তেই টকটকে রক্তবর্ণ ধারণ করে উঠে । উন্মাদের মত রক্তচক্ষু নিয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকায় এই অসাড় শরীরের দিকে। মাথার ভেতরের সমস্ত রগ একযোগে হয়ে ছিঁড়ে আসতে চাচ্ছে।
আরিশ হাসলো সামান্য। চারদিকের সেই গুমোট স্তব্ধতা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে, পুরো অপারেশন থিয়েটার কাঁপিয়ে উন্মাদের মতো হেসে উঠে। এক অদ্ভুত, বিদঘুটে আর হাড়-হিম করা ভয়ানক হাসি! সেই হাসির কোনো মায়া ছিল না। কোনো আনন্দের লেশমাত্র ও নেই। পিশাচের মত পৈশাচিক হাসিতে ফেটে পড়ে। সেই কর্কশ, বিদঘুটে হাসির অন্তরালে ঠিক কতটা তীব্র দহন আর বুক-ফাটা যন্ত্রণা মিশে ছিল তা এই নশ্বর পৃথিবীর কোনো মানদণ্ড দিয়ে তা পরিমাপ করা সম্ভব নয়। যদি কোনোভাবে সেই যন্ত্রণার গভীরতা অনুমান করা যেত, তবে বোধহয় আশপাশের সমস্ত জড় ও জীবন্ত বস্তু মুহূর্তের মধ্যে এক প্রলয়ংকরী মহাধ্বংসস্তূপে পরিণত হতো।
নবজাতক দুটিকে সামলাতে গিয়ে তানভী এক মহাসমুদ্রে এসে পড়েছে। ক্ষুধার্ত তৃষ্ণায় মায়ের বুকের দুধ না পেয়ে শিশু দুটি একটানা বুক ফাটানো চিৎকার করে কেঁদেই যাচ্ছে। । তাদের এমন আকুল কান্না তানভীর বুকে এসে বিধছে। নিরুপায় হয়ে সে বাচ্চাদের নিয়ে বারান্দার খোলা বাতাসে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কোনো কিছুতেই অবুঝ কান্না থামার লক্ষণ নেই।
কিছুক্ষণের জন্য তানভীর ক্লান্ত দৃষ্টি গিয়ে থমকে দাঁড়ায় ছোট্ট নিরাশার ওপর। নিষ্পাপ শিশুটার দিকে তাকালেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। ঠিক যেন সেই গ্যাংস্টার বসের অবিকল আরেকটা প্রতিচ্ছবি! এই চরম শোক আর কষ্টের মুহূর্তে দাঁড়িয়েও তানভীর অবিন্যস্ত মাথায় একটা অদ্ভুত চিন্তা বারবার ঘুরপাক খেতে থাকে। নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, মেয়ে দুটোই কেন এমন ভয়ানক ভাগ্যের মুখোমুখি হলো? নিরাশার চুলগুলো যদিওবা এনির মতো নরম আর সুন্দর হয়েছে, কিন্তু তার চোখ-মুখের প্রতিটি গড়ন যেন নিকের সেই ধারালো, নিষ্ঠুর অবয়বের হুবহু অনুকরণ। শুধু সামান্য কিছুটা পার্থক্য। অন্যদিকে এরিকের দিকে তাকালে বুকটা আরও শান্ত হয়ে আসে। তার ওই নীল মায়াবী চোখ আর মুখের আদল যেন অবিকল তার মায়ের পুরুষালী সংস্করণ। যে নিষ্পাপ মেয়েটা নিকের রক্তের, নিকের চেহারার হুবহু অনুলিপি ছিল, তাকেই কি না ওই নরপশুরা শেষপর্যন্ত বেঁচে থাকতে দিল না!
রিদ্ধিমা আর নিজের চোখের নোনা জল ধরে রাখতে পারল না। গাল বেয়ে পড়া জলটুকু আলতো করে মুছে নিয়ে সে পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে নেয় সেই নিষ্পাপ, আদরের পুতুল দুটিকে। এই ঘোর বিপদে আর কোনো উপায় না পেয়ে কাঁপতে থাকা হাতে সে অধিরাজের নম্বরে ফোন লাগায়।
ফোনের ওপাশে কয়েকবার রিং হওয়ার শব্দ শোনা যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওপাশ থেকে গম্ভীর ও ভারী গলায় ফোনটা রিসিভ করে অধিরাজ।
” ওরা কাঁদছে অনেক রাজ। ফিডিং করিয়েছি কিন্তু ওরা মায়ের সান্নিধ্য চাচ্ছে। ওরা ব্রেস্ট ফিডিং করে অভ্যস্ত। তৃপ্তি পাচ্ছে না,তৃষ্ণা মিটছে ন। ওদের কান্না বুকে বিঁধছে অনেক।
অধিরাজের তাড়াহুড়া কন্ঠস্বর,
” কাম ডাউন তানভী, বস এই মাত্র ম্যামকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে হসপিটাল থেকে বের হলো। যদি কোনো উদ্দেশ্যে থেকে থাকেও তবে এই মুহূর্তে মিনারে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তুমি ম্যামকে নিভ্রিতার ব্যাপারে কিছু বলো না। উনি এখনও জানে না।
” আমার খুব ভয় করছে রাজ। একজন মায়ের বুক থেকে একটা সন্তান চলে গেলো ভাবতেই দম বন্ধ হয়ে আসছে। একটা মেয়ের জন্য সন্তান কি জিনিস তা অনুভব করা যায় না। মেয়ের নিথর দেহ এনি কিভাবে সহ্য করবে? যেখানে স্বয়ং গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান সহ্য করতে পারলো না। জীবন্ত কলিজা ছিঁড়ে এনে কাচা চি*বিয়ে খেয়েছে।
কথাটা বলতে গিয়েই তানভী নাক – মুখ কুচকে ফেলে। তখনকার কাহিনী মনে হতেই আবার ও শরীর গুলিয়ে আসে। এমন হিংস্রতা, এমন বর্বরতা কোনো কালে অনুভব ও করে নি সে। বমি আসতে গেলে চোখ- মুখ খিঁচে নেয় তানভী। অধিরাজ বুঝতে পারলো তানভীর অবস্থা। হালকা হেসে বলে,
” শুধু তো কলিজা চিবিয়েছে, আমি তো ভেবেছি কাচা মাংস এই চিবিয়ে খাবে।
” একই কাহিনী হলো। কলিজা আর কাচা মাংসের তফাৎ কোথায়? নরখাদকের মনুষ্যরুপ!
অধিরাজের মুখ- কিছুটা গম্ভীর হয়ে আসে। সে নিজেও হাঁপিয়ে উঠেছে। সারাদিনে পেটে কিছু পড়ে নি। মনে ও ছিলো না কিছু। শুধু সে নয় কেউ কিছু মুখে তুলে নি। কেমন যেন হত্যাযজ্ঞ লেগে গেলো প্রতিটা ব্যক্তির জীবনে। সবার জীবন উলোট- পালোট হয়ে গিয়েছে। অধিরাজ ফোনের মধ্যে শুনতে পেলো কারোর শব্দ। গমগমিয়ে বলে,
” ক.. কে এসেছে তানভী?
তানভী হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে আছে পিছন দিকে ফিরে। নিক – এনি এসেছে। এনির শরীরে এখনও সাদা ব্যান্ডেজ। নিকের শক্ত- পোক্ত বিশাল দেহী কোলে এনির ছোট- খাটো দেহটা মিশে আছে। পায়ে ব্যান্ডেজ করা।দুই পায়ে কাচ গেঁথে মারাত্নক অবস্থা হয়ে গিয়েছে। এইদিকে অধিরাজ হ্যালো, হ্যালো বলেই যাচ্ছে। তানভী ঘোর থেকে বের হয়ে বলে,
” আমি রাখছি রাজ। তোমার বস এসেছে, সাথে এনিও। ইশ্বরের কাছে দোহায় প্রলয় ঠেকানোর ক্ষমতা দেওয়া হোক এই মুহূর্তে।
তানভী কেটে দেয় ফোন। অধিরাজ আর কিছু বলার সুযোগ পেলো না। ঠোঁট ভিজিয়ে, চোখের পানি মুছে বারান্দা থেকে রুমে প্রবেশ করে। তানভীর কোলে নিজের ছানাগুলোকে দেখে সামান্য হাসে।।অথচ চোখ দিয়ে টপ- টপ করে পানি পড়ছে। তানভী সামান্য হেসে এগিয়ে দেয়। হাত- পা কাঁপছে তার। এই মুহূর্তেই জিজ্ঞাসা করবে আমার নিভ্রিতা কোথায়? তখন কি বলা হবে? যদি জানতে পারে তার নিভ্রিতা আজীবনের জন্য চোখ বন্ধ করে ফেলেছে তখন কি ঘটবে? ধ্বংস? বিচ্ছেদ! কোনটা?
এনি বাচ্চাদের কোলে নিয়ে কতক্ষণ চুমু খায়। মায়ের শরীরের গন্ধ পেয়ে ফ্যাল-ফ্যাল চোখে তাকিয়ে আছে দুইটা প্রান। এনি এলোমেলোভাবে চুমু খায় নিজের প্রানগুলোর চোখে-মুখে। বুকে নিয়ে কেঁদেই উঠে কিছুটা,
” আমার প্রান, আমার বাবা- মা। মাম্মামকে মিস করেছো অনেক তাই না। আমিও প্রচুর মিস করেছি। ইশশ কেঁদে -কুটে একদম লাল হয়ে গিয়েছে। এরিক তুমি না গুড বয়। তবে কেনো কাঁদলে শুনি? বোনকে আগলে রাখতে পারলে না? হুম!
এরিক পিটপিট করে তাকিয়ে আছে মায়ের দিকে। মা – কি তাকে বকা দিচ্ছে বিষয়টা বুঝতে পারছে না এমন ভাব। কি জানি হলো ছেলেটার। হুট করেই ঠোঁট ভেঙ্গে কেঁদে উঠে। এনির ভেতর মুচড় দিয়ে উঠে খানিকটা। তানভী যন্ত্রনার মধ্যেও হেসে দেয় নিরবে। এনি এরিককে বুকে মিশিয়ে নিয়ে শান্তনা দেয়,
” বাবা আমার। বকে নি তোমাকে। আমার বাবাকে কি আমি বকতে পারি? কথার কথা বলেছি এইসব। পাপার স্বভাব এর খোলস ছেড়ে হুট করে এমন ছিঁচকাঁদুনি হয়ে গেলে কিভাবে? হুম!
তানভী এনিকে পানি এগিয়ে দিয়ে বলে,
” পানিটা খেয়ে নাও। তোমাকে অনেক বিধ্বস্ত লাগছে। তোমাকে পেয়ে কতটা শান্ত হয়ে গিয়েছে। এতক্ষণ কেঁদে অস্থির দুজন। ওকে খাওয়াও দ্রুত।
” অনেক কষ্ট করেছো আজ তুমি। তুমি ছিলে বলে ভরসা ছিলো। বাচ্চাদের ঠিক আগলে নিবে।
” ইটস ওকে। আমার সন্তানের মত ওরা। দায়িত্ব এইটা আমার। আগে খাওয়াও, নয়ত টর্নেডো শুরু করে দিবে।
এনি খাওয়াতে গিয়েও থেমে যায় নিককে এমন ধারালো দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে। এই দৃষ্টিতে কেনো সে আজও লজ্জা পায় বুঝে উঠে না। কেমন অস্বস্তি নিয়ে তাকায় নিকের দিকে। নিক ঠোঁট কামড়ালো। কেমন অদ্ভুত গলায় বলে,
” তুমি যাদের কোলে নিয়ে বসে আছো তারা আমার রক্ত, আর তারা এমনি- এমনি চলে আসে নি। যা করতে চেয়েছিলে দ্রুত করো। ফার্স্ট!
এনি থতমত খেয়ে যায়। তানভীর সামনে এমন লজ্জায় পড়তে হলো তাকে। ঠোঁট কাটা লোক! মুখে কিছু আটকায় না। এনি এরিককে কোলে নিয়েই বলে,
” নিভ্রিতা কোথায়? ঘুমিয়ে আছে নাকি? নিয়ে আসো তাকে।
তানভী থমকায়। শুকনো ঢোক গিলে তাকায় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভয়ানক পুরুষটার দিকে। নিকের এই শান্ত রুপ দেখে মুহূর্তেই মাথা ধরে যায়। সেই ভিবৎস্য পিশাচ রুপ ভেসে উঠে। বুকের ভেতরে কেমন চেপে ধরেছে। তানভী মাথা যন্ত্রনায় হাঁশফাঁশ করে উঠলো। আতঙ্ক নিয়ে আবার ও তাকালো নিকের দিকে। যার দৃষ্টি সামনে বসে থাকা তিনজনের দিকে। তানভীকে কথা বলতে না দেখে এনি ভ্রুঁ কুচকায়। এমন অস্বাভাবিক আচরনে জিজ্ঞাসা করে,
” তুমি ভয় পাচ্ছো কিসে তানভী? উনার সামনে তো তুমি আরও অনেক বার এসেছো। তখন তো ভয় পাও নি। তবে এমন কাঁপছো কেনো?
তানভী কোনো উত্তর করলো না। এক প্রকার পালিয়ে গেলো এনির চোখের সামনে থেকে। উত্তর দেওয়ার মত শক্তি তার নেই।তানভীকে এমন বেরিয়ে যেতে দেখে এনি হতভাগ হয়ে যায়। এনি নিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
” আশ্চর্য , এরিকের পাপা নিভ্রিতা কোথায়? ওকে আনছেন না কেনো?
নিক কাবার্ডের কাছে এগিয়ে গেলো। বাচ্চারা এনির বুকে নাক – মুখ ঘষছে। এনি অপেক্ষা করলো না। আর কত অভুক্ত থাকবে তার কলিজা গুলোকে । মাথায় চুমু খেয়ে নিকের দিকে তাকায়। লোকটা কাবার্ডের কাছে কিছু একটা করছে। এনি ব্রেস্ট ফিডিং করিয়ে এরিককে শুইয়ে দেয়। নিরাশাকে নিয়ে নিকের দিকে তাকিয়ে সামান্য রাগে চেঁচিয়ে উঠে,
” এইভাবে চুপ করে আছেন কেনো নিক? ছটফট শুনতে পাচ্ছেন না আমার? আমার মেয়ে কোথায়? আমার নিভ্রিতা কোথায়?
নিক এরপর ও উত্তর করলো না। এনির কান্না পাচ্ছে রাগে। নিককে ইচ্ছে করছে কামড়ে ফ*লাফ*লা করে দিতে। এমন উত্তপ্ত মুহূর্তে চুপ থাকা কি আদও কাম্য! এনি ঠোঁট চেপে নিশ্বাস টানে। চোয়াল শক্ত করে বলে,
” দুই মিনিটের মধ্যে যদি আপনি উত্তর না দিয়েছেন তবে এই ক্ষত-বিক্ষত শরীর নিয়ে আমার মেয়েকে খুঁজে আনব। লাগবে না আপনার কোনো উত্তর। দয়া – মায়া তো কোনো কালেই ছিলো না। আমার ভেতরের ছটফট কিভাবে বুঝবেন?
নিক এক মুহূর্তে তাকালো এনির দিকে। এনি ঠোঁট কামড়ে ধরে কেঁদে যাচ্ছে। তবুও পাষন্ড পুরুষের মন গললো না।
রিদ্ধিমা ছাদের দিকে তাকিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এনির কান্না কল্পনা করতেই রিদ্ধিমার বুক ছিঁ*ড়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা তাদের জন্য কখনো ছিলো না। সব কিছুর জন্য ও দায়ী। হ্যা, নিজের বিধ্বস্ত ভাইয়ের জীবনকে নরক বানিয়ে তুলেছে সে আরও। একটা গুছানো, হাসি-খুশি জীবনকে ধ্বংস করে দিয়েছে সে। শত্রুরা সব মরেছে তবে তাকে কেনো বাঁচিয়ে রাখা হলো? করুনা ছিলো এইটা? হ্যা, করুনা এইতো। নয়ত যে নিক জেভরান সামান্য কথাতে শরীর থেকে গলাটা আলাদা করে ফেলে সে আজ কেনো এত শান্ত তার প্রতি? সে তো প্রথম পদক্ষেপ গ্রহন করেছিলো। নয়ত এই ভুবনে কার ক্ষমতা ছিলো মিনারে ডুকে এক হিংস্র পুরুষের বুক থেকে টেনে নিবে তার এই অস্তিত্বকে।রিদ্ধিমার ইচ্ছে করছিলো চিৎকার কাঁদতে। জীবন কোথায় নিয়ে গেলো তাকে। নিজের এই ভাতিজির খুনে সে? এই বাস্তবতা নিয়ে কিভাবে বাঁচবে সে? না পেলো জীবনের প্রথম প্রণয়ের পুরুষকে আর না আজ কোনোদিন ভাইয়ের সামনে দাড়াতে পারবে। আপনজন কাছে আসলে জীবন স্বর্গ হয়ে উঠে, অথচ আমি ওদের জীবনকে নরক বানিয়ে দিলাম। রিদ্ধিমার সহ্য হলো না এই বাস্তবতা। যন্ত্রনা থেকে বুক ছিঁড়ে বের হয়ে আসে। নিকের উপস্থিতিত অনুভব করে চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস টানে। ঠিক অনুভব করতে পারছে ডাক্তারের সাথে কথা বলছে। হয়ত তার বিষয় নিয়েই। নিক চলে যেতে নিলে রিদ্ধিমা ভাঙ্গা গলায় ডেকে উঠে,
” ভ.. ভাইয়া!
নিক থামলো কিছুক্ষণের জন্য। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়। রিদ্ধিমার চোখ থেকে বিরতহীনভাবে পানি পড়ছে। নিজেকে শক্ত করে বলে,
” আমাকে কেনো বাঁচিয়ে রাখলেন গ্যাংস্টার বস? আ.. আমিও তো সমান অপরাধী? মৃত্যু আমার ও প্রাপ্য ছিলো। জঘন্য মৃত্যু! কঠিন মৃত্যু!
নিক রক্তাক্ত হাত – মুখ নিয়েই তাকায় রিদ্ধিমার দিকে। রিদ্ধিমার সাহস হলো না সেই চোখে তাকানোর। শুধু শুনা গেলো নিকের তপ্ত কন্ঠস্বর,
” বোন হত্যা করার আদেশ দিচ্ছো?
” অপরাধীকে শাস্তি দিতে বলেছি।
” কোন অপরাধে?
” আপনার মেয়েকে হত্যার অপরাধে। নাকি রক্ত বলে ছেড়ে দিচ্ছেন?
” অপরাধী হলে প্রথমে তোমার বুকে ছুঁরি চালাতাম। ষড়যন্ত্রের গুঁটি হলে তাকে অপরাধী বলে না। ইউ নো হোয়াট, যখন ছোট ছিলে ঠিক ওদের মত এই আগলেছি তোমাকে। ভালোবাসা বদলে যায় নি। আর না বদলেছে তোমার প্রতি আমার দায়িত্ববোধ। একটা সময় তুমি ও আমার খুব আদুরে ছিলে। আমার মেয়েকে তুমি মারো নি। যদি তুমি কোনো ষড়যন্ত্রের সঙ্গী হতে তবে প্রথম তোমার কলিজাটা এই ছিঁড়ে নিয়ে আসতাম।
রিদ্ধিমা কেঁদে উঠে। আর সহ্য হচ্ছে না এই যন্ত্রনা। এই কান্না একটা সময় হাঁউ – মাঁউ করে রুপ নেয়। মুখে হাত দিয়ে কেমন পাগলের মত কেঁদে যাচ্ছে । কাঁদতে – কাঁদতে ভাঙ্গা গলায় শুধায়,
” আ… আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না। যতবার চোখ বন্ধ করছি নিষ্পাপ একখানা মুখ ভেসে আসছে। তোমার কপিখানা ভেসে আসছে ভাইয়া। নিজেকে অসহ্য লাগছে। সব কিছু আমার জন্য হয়েছে। যন্ত্রনা হচ্ছে, মরে যাচ্ছি আমি। আমাকে ক্ষমা করো না, কখনো ক্ষমা করো না। পাপী আমি, অপরাধী আমি। আ.. আমি… আ… আমি….
রিদ্ধিমার নিশ্বাস বাড়তে থাকে। নিক ডাক্তারকে কিছু একটা ইশারা দিয়ে বের হয়ে যায় রুম থেকে। পুনরায় এনির কাছে যায়। এনি বাচ্চাদের শুইয়ে দিয়ে বিছানা থেকে নামার চেষ্টা করছে। কাচা ক্ষত নিয়ে মেঝেতে পা রাখার ফলে ব্যান্ডেজের উপর দিয়েই রক্ত ঝড়ছে। নিককে আসতে দেখে এনি রাগে চোয়াল শক্ত করে ফেলে। নিককে এই মুহূর্তে তার কাছে বিরক্তি লাগছে। নিকের পিছন থেকে তানভীকে আসতে দেখে এনি মরিয়ে হয়ে উঠে। ছটফট করে বলে,
” তানভী বলো না, আমার মেয়েটা কোথায়? আরে কেউ তো কিছু বলো। আমি যন্ত্রনায় মরে গেলে কি শান্তি পাবে তোমরা?
এনি কথাটা শেষ করতে পারলো না।।তার আগেই ঝড়ের বেগে তাকে আবার ও কোলে তুলে নেয় নিক। এনি যন্ত্রনায় নাক-মুখ খিঁচে ফেলে। নিক গম্ভীর গলায় আওয়ায়জ করে,
” ওদেরকে দুই ঘন্টা সামলাও তানভী। খুব দ্রুত ফেরত আসব।
এনি চট করে চোখ খুলে। নিকের শার্ট শক্ত করে চেপে ধরে আবার ও চেঁচায়,
” যাব না আপনার সাথে। আমি আমার মেয়ের কাছে যাব। আপনার মত এমন নিষ্ঠুর পুরুষের সাথে থাকব না আমি।
নিক ছোট্ট করে উত্তর দেয়,
” থাকতে হবে না আর। তোমার ইচ্ছেতেই হবে সব কিছু। তোমার মেয়ে ঘুমিয়ে আছে। জেগে যাবে বলে মিনারে আনিনি। চলো দেখা করে আসি।
এনি থমকায়। এই বাক্য কিছুতেই নিকের হতে পারে নি। আর যায় হোক এইটা গ্যাংস্টার বসের কন্ঠনিসৃত বাক্য হতে পারে না। ‘ থাকতে হবে না ” এই বাক্য মরে গেলেও উনি বলবে না। গলা চেপে ধরে, জবান বন্ধ করে ফেলে এইটা শুনলে। তবে এত সহজে কিভাবে বলো দিলো?কি হচ্ছে আমার সাথে?
একটি মিশকালো গাড়ি এসে সশব্দে থামল সুপরিচিত সেই টেরিসের সামনে। এই সেই অভিশপ্ত স্থান, যেখানে এক প্রলয়ংকরী ধ্বংসলীলা রচিত হয়েছিল। যেখানে নিকের তীব্র আক্রোশের আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে নিখোঁজ ও বিনাশ হয়েছিল তার অসংখ্য শত্রু।
গাড়ির দরজা খুলে নিক অত্যন্ত সন্তর্পণে এনিকে নিজের পাঁজা কোলে তুলে নেয়। তার সেই চওড়া বুকের আশ্রয়ে এনিকে জড়িয়ে রেখেই সে দৃঢ় পদক্ষেপে টেরিসের ভেতরে প্রবেশ করে। চারদিকের স্তব্ধতা আর চেনা পরিবেশের এই রূপ দেখে এনির ভেতরের কৌতূহল ও উৎকণ্ঠা তীব্র হতে থাকে। সে চারপাশের ধূসর অবয়বগুলোর ওপর ক্লান্ত আর অনুসন্ধিৎসু চোখ বুলিয়ে আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না।
অসহায়ত্ব আর তীব্র অধৈর্যতায় নিকের শার্টের কলারটা খামচে ধরে অভিমানী ও দুর্বল গলায় সে শুধায়,
”কিছু বলুন, কোথায় নিয়ে এসেছেন? আর সহ্য হচ্ছে না কিন্তু।”
নিক সেই ধ্বসত্বক রুমে প্রবেশ করে যেখান হান্টারের নিস্তেজ লাশ একটা বক্সের ভেতর রাখা হয়েছে। চারপাশে অসংখ্য গার্ড পাহাড়া দিচ্ছে সব কিছু। চারপাশে অসংখ্য লোকের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন দেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মনে হচ্ছে এইটা মানুষের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন দেহের বাগান। তার থেকেও ভয়ানক দৃশ্য কায়াতের। পেটের নাড়ি-ভুড়ি খুলে পড়ে আছে পাশেই। চোখ- জিহ্বা তুলে ফেলা হয়েছে বহু আগে। কেমন গা ছমছমে হাড় হীম করা ভয়ানক পরিস্থিতি। এমন একটা অবস্থা মনে হচ্ছে কোনো প্রেতাত্মার দেশে চলে এসেছে। এনির মাথা ঝিমঝিম করে উঠে। শক্ত করে নিকের শার্ট খামছে ধরে এই চওড়া বুকে মুখ গুঁজে দেয়। তার একমাত্র শান্তির জায়গা, তার আশ্রয়স্থল! নিক এনিকে ছাড়িয়ে একটা কাচের উপর বসিয়ে দেয়। এনি শুধু মেয়ে – মেয়ে করে যাচ্ছে। নিক ধপ করে বসে পড়ে নোংরা মেঝেতে। এতক্ষনে টিকিয়ে রাখা শক্ত-পোক্ত দেহটা ছেড়ে দেয়। এনি ভড়কে যায় নিকের এমন ব্যবহারে। অধিরাজের হাতে ধরা বক্সের দিকে তাকিয়ে কলিজা মুচড় দিয়ে উঠে। বক্স থেকে ঠান্ডা ধোঁয়া বের হচ্ছে। এনি ঠোঁট কামড়ালো নিজের।
নিকের দিকে এক পলক তাকিয়ে ঠোঁট ভেজায়,
” ব… বক্সে কি আছে? এইটা আমার সামনে এনেছেন কেনো? এইটা তো এইসব বক্স যেখানে লাশ রাখা হয়। শরীর যাতে দীর্ঘক্ষন ঠিক থাকে। এ.. এইসব অসহ্য মার্কা জিনিস আমার কাছে এনেছেন কেনো?
অধিরাজ মাথা নিচু করে এনির সম্মুখে দাঁড়ায় একদম। নিভ্রিতার নিস্তেজ, ফ্যাকাশে দেহখানা দেখে মুখে হাত দিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে। সমস্ত গার্ড মাথা নিচু করে শিউরে উঠে এই চিৎকারে। এমন করুন আর যন্ত্রনা কেনো এই কান্নাতে? এনি ক্ষত-বিক্ষত পা নিয়ে নেমে যায় কাচের উপর থেকে। পা দিয়ে রক্ত ঝড়ছে।। সেদিকে কোনো ভ্রুঁ ক্ষেপ নেই। চোখ-মুখ কেমন লাল হয়ে এসেছে তার। দ্রুত কাচের বক্স থেকে নিজের ছোট্ট প্রানটাকে তুলে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। শরীরের ওরনা দিয়ে চেপে ধরে। চোখে-মুখ পাগলের মত চুমু খায়। হায় আফসোস, মেয়ে তার চোখ খুলছে না। এনি ভিবৎস্য, উন্মাদের মত মেয়েকে আগলে নিতে থাকে। যেন এই মুহূর্তে পেটের ভেতরে ডুকিয়ে ফেলবে।অধিরাজের দিকে তাকিয়ে রাগ দেখায়,
” আপনার সাহস হলো কিভাবে আমার মেয়েকে এমন কাচে রাখার।
পর -পর নিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
” নিক আপনি বলুন না, ওকে কখনো শক্ত স্থানে রাখিনি। আপনার এসিস্ট্যান্ট ভালো নয়। অপরাধ করেছে সে। আমার মেয়েকে এখানে রেখেছে। ইশশ! এর জন্য অনেক বাজেভাবে শাস্তি দিবেন।
অধিরাজের শরীর শিরশির করে উঠে। মায়ের এই কেমন কেমন পাগল উন্মাদনা। এনি নিভ্রিতার গালে চুমু খেয়ে বুকের সাথে আবার ও মিশিয়ে নেয়।
” মামুনি আমার, এইতো মাম্মাম চলে এসেছে। খিদে পায় নি তোমার? চোখ খুলো সোনা।
নিভ্রিতার রেসপন্স না পেয়ে পাগলের মত ছুটে যায় নিকের দিকে।ঘন -ঘন শ্বাস টেনে কেঁদে উঠে,
” আপনি বলেছিলেন তো আমার মেয়ে ঘুমিয়ে আছে। আমি তো ঘুম থেকে ডাকছি কখন থেকে। কিন্তু উঠছে না কেনো বলোন তো? অভিমান করেছে আমার সাথে? রাগ করেছে? আমি ভুল বলতাম না, ঠিক বাপের মত হয়েছে।।কেমন সামান্য কিছুতেই রেগে গেলো আমার প্রতি। ওকে বলুন এই মুহূর্তে ওর রাগ, অভিমান দেখার সময় নেই। দ্রুত চোখ খুলতে। নয়ত প্রচুর বকব। এক জীবনে বাপ জ্বালিয়েছে এখন মেয়ে জ্বালাচ্ছে।
নিক ঠোঁট কামড়ে ধরলো নিজের। সামান্য ঝুঁকে মেয়ের কপালে সময় নিয়ে গাঢ় চুমু খেলো। এনি শক্ত করে চেপে ধরে নিকের কলার। রাগে উন্মাদের মত চিৎকার দিয়ে উঠে,
” আমার মেয়ে চোখ খুলছে না আর আপনি চুপ আছেন? ওর কিছু হলে এক – একজনকে মারব আমি। ওকে বলুন আমার দিকে তাকাতে। নয়ত ধ্বংস করে দিব আপনাকে।
নিক এনির চোখে চোখ রাখলো। পর – পর ইশারা করলো সমস্ত গার্ড যাতে বের হয়ে যায়। অধিরাজ সহ সবাই বেরিয়ে পড় রুম থেকে। মুহূর্তেই খালি হয়ে পরে পুরো রুম। নিক এনির চোখে -চোখ রেখে উত্তর দেয়,
” ধ্বংস চাও আমার? আরেকটা বক্স দেখতে পাচ্ছো? সেখানে আমার সব থেকে বিশ্বস্ত আর ভালোবাসার জিনিসটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। আর তোমার বুকে আমার তিন পৃথিবী থেকে একজন । আর কোন ধ্বংস দেখতে চাও আমার? একদিন বলেছিলে যদি বাচ্চাদের কিছু হয় তবে তুমি আমাকে নিজ হাতে ধ্বংস করবে। পারিনি শত্রু হতে নিজের রক্তকে রক্ষা করতে। তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক পরাজিত আর হতভাগা পিতা।
এনি নিভ্রিতাকে বুকে নিয়ে দুই – পাশে মাথা নাড়ায়,
” আ… আমার মেয়ের কিছু হয় নি। আপনি বলেছিলেন জীবদ্দশায় ওদের কিছু হতে দিবেন না। জীবন দিয়ে আগলে রাখবেন। সবটা ভরসা রেখে, এক জাহান্নামে ওদের জন্ম দিয়েছি। মৃত্যুর ঝুঁকি আছে জেনেও ওদেরকে দুনিয়া দেখিয়েছি। পুরোটা ভরসা নিয়ে ওদের কে সেই রক্তাক্ত মিনারে আগলে নিয়েছি। চারপাশে শত্রু, তিনটা বছর মিনার থেকে বের হয় নি। নিজেকে এতটা সাইকো বানিয়েছি যে ভাবতে গেলেও ভয় হয়। অনেক সইয়েছি, আর সইতে পারব না।।শক্তি নেই আমার।
নিক উন্মাদের মত হাসলো। কেমন সেই ভয়ানক -বিদঘুটে অট্টহাসি। চারপাশে লাশ এর মধ্যে নিকের এমন ভয়ানক রুপ। এনি ধপ করে বসে পড়ে নোংরা রক্তাক্ত মেঝের উপর।
নিক একটা ধারালো ছুঁরি এনির সম্মুখে রাখে। হাসি থামিয়ে নিজের হাতের উপর ছুঁরি বসিয়ে দেয়।।টগবগিয়ে রক্ত ছিটকে পড়ে দুরে।। এনির কাছে অসহায় সৈনিকের মত পরাজয় স্বীকার করে উন্মাদের মত বলে ,
” আমি পারিনি তোমাদের প্রটেক্ট করতে।।হেরে গিয়েছি আমি। হেরে গিয়েছে একজন আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্ট। ঠিক বলতে আমার মত মনস্টার বাপ হওয়ার ক্ষমতা রাখে না। ভুল করেছি এই জাহান্নামে তোমাদের এনে। জীবনের প্রথম বার গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান নিজের ভুল স্বীকার করছে। ধ্বংস যদি আমার লেখা থাকত তবে খোদা কেনো এইভাবে ধ্বংস লিখলো! অতীতে মা- বাপ সব হারিয়েছি। এখন মেয়ে হারালাম।সবার তো অতীত খারাপ থাকে।।কিন্তু আমার অতীত -বর্তমান দুইটাই খারাপ। শালার জিন্দেগীহহ!
আমার সব শত্রু ফিনিশড। যদি থেকে থাকে তবে তাদের সাথে তোমার কোনো কানেকশন নেই। আজ এই পাপাচারে লিপ্ত, ধ্বংসাত্বক জীবন থেকে তুমি মুক্ত। চাইলে তুমি নিজের মত করে বাঁচতে পারো। তোমাকে আমি ফোর্স করেছি। জোর করে, নির্যাতন করে বন্ধিনী বানিয়েছি। তিন বছর ধরে এই মিনারে আটকে রেখে তিলে তিলে কষ্ট দিয়েছি। তুমি ঘৃনা করো আমাকে, চরম ঘৃনা। তুমিও একটা সুন্দর জীবন ডিজার্ব করো। কাউকে ভালোবাসার ক্ষমতা করো। চাঁদের কলঙ্ক থাকে তবুও তোমার কোনো কলঙ্ক ছিলো না। আমার এই অন্ধকার জীবনের সাথে জড়িয়ে তোমাকে কলঙ্কিত করেছি।
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭২ (২)
চাইলে তুমি এই কলঙ্ক মুছে ফেলতে পারো। আটকাবো না আর। কোনো গার্ড নেই। আমার হান্টার ও নেই যে গেইডের সামনে গেলে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তুমি মুক্ত! না দেখে বাঁচতে পারব কিন্তু তোমাকে হারিয়ে ফেলার ক্ষমতা এই বুকে এখন ও সৃষ্টি হয় নি। ধ্বংস করতে চাও আমাকে। করে ফেলো ধ্বংস। গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান তোমাকে অধিকার দিয়েছে আনাস্তাসিয়া এনি, ছুঁরিটা দিয়ে তার দেহ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দাও।।খোদার কসম কেউ আটকাবে না, আমি নিজেও না।
