ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ৮
অনামিকা আহমেদ
শাস্তির কথা কানে পৌঁছাতেই রূপ এর শিরদাঁড়া বেয়ে এক শীতল শিহরন বয়ে যায়। চোখ দুটো বিস্ফারিত, ঠোঁট দুটো আলগা হয়ে কাঁপতে শুরু করে। ইশতিহার রূপের এমন নাজেহাল দশা দেখে বাকা হেসে রূপের কপালে লেপ্টানো এলোচুল গুলো অতি যত্নে তার কানের পেছনে গুঁজে দেয়। ইশতিহার এর শীতল আঙুল গুলো রূপের উষ্ণ কান স্পর্শ করতেই রূপের সারা শরীর কাঁপুনি দিয়ে উঠে। ঠোঁট গলে বের হয়ে আসে কিছু অস্ফুট শব্দ।
ইশতিহার শার্টের ওপরের বোতামটা খুলে মুহুর্তের মাঝেই রূপের একেবারে কাছে চলে আসে। ইশতিহার এর চোখের চাহনী, ভাবভঙ্গি দেখে ভালই বোঝা যাচ্ছে তার মাথায় কিছু দুষ্টু চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। এবার রূপ ও কিছুটা ভরকে যায়। জ্বলজ্বলে চোখে এদিক ওদিক তাকিয়ে চারপাশে কাউকে দেখতে না পেলেও যেকোনো সময় কেও এখানে এসে পড়তে পারে এটা ভেবে সে ইশতিহার এর বুকে হাত রেখে তাকে দূরে সরিয়ে দিতে চায়।
” কি করছেন? ছাড়ুন আমায়, কেও দেখে নিবে যে।”
ইশতিহার প্রবল বেগে রূপের কোমর জড়িয়ে তাকে নিজের কাছে এনে বলে,
” দেখুক, আমি সব হাঁড়ির খবর ফাঁস করে দিয়েছি। তাই এখন কেও এখানে এসে আমাদের কাছাকাছি দেখলে চিল্লিয়ে বাড়ি মাথায় তোলার বদলে নিজেই চোখ ঢেকে চলে যাবে। আমরা লিগ্যাললি মেরেড কাপল, এতজীবন আইনত ছিলাম, আজ সামাজিক ভাবেও হলাম।”
এই বলে ইশতিহার রূপ কে কোলে তুলে নেয়। রূপ ইশতিহার এর সাথে না পেরে তার প্রশস্ত বুকে মুখ লুকায়। ইশতিহার রূপের কাণ্ডকারখানা দেখে বেশ মজা পায়, চুপচাপ সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে নিজের রুমে চলে যায় সে।
রূপ কে বিছানায় ফেলে ইশতিহার এক ঝটকায় দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর পেছন ফিরে মা*দকতাভরা দৃষ্টিতে রূপের দিকে তাকিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে থাকে। রূপ ও তাল মিলিয়ে পিছানো শুরু করে, কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারে না। বিছানার শেষ প্রান্তে তার পিঠ ঠেকে গেলে ইশতিহার দ্রুত তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে।
” সবকিছুতে আপনি শুধু আমার দোষ কেনো দেখেন ইশতিহার ভাইয়া? রুপম ভাইয়া আমার হাত টেনে ধরেছে, আমি তো নিজে থেকে ওনার কোলে বসিনি। তাও আপনার আমাকেই শাস্তি দিতে হবে।”
কথাগুলো ঠোঁট ফুলিয়ে একশ্বাসে বলে রূপ। চোখ দুটো তার অভিমানের জ্বলে ভরে গেছে। ইশতিহার একটু নিচে নেমে তার গলায় নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে বলে,
” শাস্তি নাম্বার ২, নিজের একমাত্র স্বামী কে ভাইয়া বলে সম্বোধন করা গর্হিত আর দ*ণ্ডনীয় অ*পরাধ। এতে আমার বাচ্চা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগবে। শেষে দেখা যাবে আমাকে বাবা ডাকার বদলে মামা ডেকে বসে আসে।”
” ইশতিহার আজ না -”
রূপ আর কিছু বলতে পারল না। তার আগেই ইশতিহার তার দুটো ঠোঁটের ওপর নিজের আঙুল চেপে ধরে। নিজের মুখটা রূপের কানের কাছে এনে আলতো করে লতিতে চুমু খেয়ে বলে,
” মাই ন*টি বেবিগার্ল, সবসময় ১৮+ চিন্তাভাবনা মাথায় ঘোরে তাই না? অবশ্য ঘোরারই কথা এত হ্যান্ডসাম একটা হাসবেন্ড থাকলে সব মেয়েদেরই মাথা নষ্ট হয়ে যাবে। তোর দোষ না, বয়সের দোষ।”
এই বলে ইশতিহার রূপের ওপর থাকে উঠে পরে। রূপ বোকার মতো ইশতিহার এর দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকে। ইশতিহার নাইটস্ট্যান্ড এর ওপর রাখা কাচের গ্লাস টা হতে নেয়। রূপের নজর যায় গ্লাসে থাকা সাদা তরল টার দিকে, তার জন্য এক প্রকার বি*ষ। রূপ সাথে সাথেই বিছানায় উপুর হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে দেয়। ইশতিহার এর তেজি গলার আদেশ কানে ছুটে এলেও সে মুখ তুলে না।
” রূপ, উঠ, তাড়াতাড়ি দুধ খেয়ে নে। নাটক করবি না, যত সময় নিবি দুধের পরিমাণ তত বাড়বে।”
” না আমি দুধ খাবো না, ওটা কোনো খাওয়ার জিনিস হলো। অশ্লী*ল খাবার একটা। আমি তো ভদ্র মেয়ে অশ্লী*ল খাবার খাই না।”
” দুধ অশ্লী*ল না, অশ্লী*ল তোর চিন্তাধারা। দেখ আমাকে জ্বালাস না, পড়ে আমি জ্বালানো শুরু করলে তুই নিতে পারবি না রূপ।”
রূপ এবার ইশতিহার এর কাছ পরাজিত হয়। সে যে পণ করেছে রূপ কে দুধ খাইয়ে ছাড়বে রূপ সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। গ্লাস টা হতে নিতেই দুধের গন্ধে রূপের গা গুলিয়ে উঠে। সে কান্নারত চোখে ইশতিহার এর দিকে তাকালে সে কঠোর কন্ঠে বলে,
” কোনো বাহানা চলবে না। প্রতিদিন তোকে এক গ্লাস দুধ খেতে বলেছিলাম। তুই খাস না, তাই আজ তোকে ধরে বেঁধে খাইয়েই ছাড়ব।”
” কিন্তু গন্ধ যে।”
” নাক বন্ধ করে খা।”
রূপ বিরক্তি সহকারে দুই আঙুল দিয়ে নাকের আগা চেপে ধরে এক গ্লাসের পুরো দুধ টা গলায় ঢেলে দেয়। খাওয়া শেষে সে কাশতে শুরু করে। ইশতিহার তাড়াতাড়ি করে তাকে পানি খাওয়ায়।
” দেখেছেন খেয়েছি, এখন তো আপনার শাস্তি শেষ?”
ইশতিহার মাথা নাড়ায় বলে,
” না, এখনও শেষ হয়নি। একটা গ্লাস যেমন শেষ করেছিস এমন আরেকটা গ্লাস ও চটপট গিলে ফেল দেখি। আমার আবার একটু বাসর বাসর পাচ্ছে।”
বিছানার ওপর ধরাশায়ী হয়ে পড়ে আছে আদনানের ক্লান্ত শরীর। সেই কখন থেকে এপাশ ওপাশ করেই চলেছে কিন্তু তবুও ঘুমের খবর নেই। অন্যদিন হলে এতক্ষণে সে এক ঘুম দিয়ে উঠে পড়ত কিন্তু আজ যেনো তার মন তাকে ঘুমাতেই দিচ্ছে না। আদনান উঠে বসে, হতাশ চোখে অন্ধকার রুমের দিকে একবার চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
রুমটা অবশ্য একেবারে অন্ধকার নয়। জানালার ধারের মানিপ্লেন্ট গাছের গায়ে জড়ানো মরিচ বাতি গুলো আবছা আলো ছড়াচ্ছে। তাতে ভালো করে কিছু দেখা না গেলেও রুমের মধ্যে হাঁটাচলা করা সম্ভব হয়। রুমের গুমোট পরিবেশে বসে থাকতে দমবন্ধ লাগায় আদনান সিদ্ধান্ত নেয় ছাদে একটু পায়চারি করার। যেই ভাবা সেই কাজ। নিজের রুম থেকে বের হয়ে এবার আদনান পা বাড়ায় ছাদের দিকে। কানে হেডফোন গোঁজা, শান্ত বিটের মিউজিক তার মস্তিষ্ক কে ঠান্ডা করছে। তবে ছাদের দরজা খুলতেই চোখের সামনে দেখলো আদনান সেটা দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। একটা অবয়ব ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে সাদা কামিজের সাথে সাদা ওড়না বাতাসে হালকা উড়ছে। বলতে গেলে এ যেনো আস্ত এক হর*র মুভির দৃশ্য। আদনান এর কপাল বেয়ে ঠান্ডা ঘামের রেখা দেখা যায়। পা দুটো এতটাই জমে যায় যে সে দৌড়ে পালাতেও পারে না। বিস্ফারিত চোখে সে কেবল ওই অবয়বের দিকেই চেয়ে থাকে।
ছাদে কারো উপস্থিতি বুঝতে পেরে ভাবনা পেছন ফিরে চায়। চোখের সামনে এক অপরিচিত লোককে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে তো একপ্রকার চিৎকার করে উঠে। এদিকে ভাবনার চিৎকার শুনে আদনান ও চিৎকার দিয়ে উঠে। এতদিন সে জানত মানুষ ভূ*ত দেখলে চিৎকার দেয়, এবার সে দেখলো ভূ*ত ও মানুষ কে দেখে ভয়ে চিৎকার দেয়।
দুজন নরনারীর মিশ্রিত চিৎকার ইশতিহার এর কানে এসে পৌঁছায়। রূপের সাথে ঘনিষ্ট মুহূর্ত শেষে সে সবে তার ক্লান্ত ঘর্মাক্ত শরীরটা নিয়ে শুয়ে রূপ তে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল। রোমান্টিকতার এই চরম মুহূর্তে আদনানের ফাটা বাঁশের মত গলার চিৎকার শুনে আদনান বলে উঠে,
ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ৭
” গেছে গেছে, এক সপ্তাহের জন্য আমার বাসর করার সাধ মিটে গেছে। আবার কি দেখে ভেটকালো ওই ভীতুর ডিম টা? এ নিজেও শান্তি পাবে না আর আমাকেও শান্তি দিবে না। বিয়ের পর ভাবি কে এই শা*লা নির্ঘাত হার্ট অ্যা*টাক করিয়ে মারবে।”
