Home রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১৬

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১৬

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১৬
রিক্তা ইসলাম মায়া

‘ বেয়াদবের বাচ্চা, তোরে বলছিলাম না ঘরের বাইরে যাবি না? কেন গেলি? আমার কথা কানে যায় না? পাগল আমি? না করার পরও কেন বারবার অবাধ্য হস? জানের ভয় নাই? মরার যখন পাখা গজাইছে, তখন আমিই মেরে দিই তোরে? দিই মেরে এখন?
মায়া ভীষণ ভয় পেয়েছে। সে হেঁচকি তুলে কাঁদছে।শরীর কাঁপছে ভয়ের তাড়নায়। রিদ মায়ার গাল চেপে ধরা রিদের হাতটা মায়া দুহাতে টেনে ছাড়াতে চেয়ে বলে—
‘ আমি বুঝতে পারিনি কেউ আমার ওপর আক্রমণ করবে। আমি তো টিয়ার খোঁজে বাইরে গিয়েছিলাম।
রিদ মায়ার গাল ছেড়ে গর্জে উঠে লাথি মারল সোফার টেবিলে। বিকট শব্দে ঝনঝনিয়ে কাচ ভেঙে পড়ল ফ্লোরে। রিদ গর্জে উঠে বলল—

‘ আমাকে তোর পাগল মনে হয়, বেয়াদবের বাচ্চা? কথা বললে শুনিস না, নিষেধ মানিস না, ইগনোর করিস, তেজ দেখাস! তোর তেজের ধার ধারি আমি? যে তেজ দেখাস? দাঁড়া!
রিদ আশেপাশে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পেয়েও গেল—দরজার কোণায় একটা ক্রিকেট ব্যাট। এই ব্যাটটি রাদিফের। সে মাঝেমধ্যে বাড়িতে ছেলেদের নিয়ে ক্রিকেট খেলে। ব্যাটটি রাদিলের ঘরেই ছিল। সুফিয়া খান লোক দিয়ে ঘর পরিষ্কার করানোর সময় একজন কাজের লোক রাদিফের ব্যাটটি বাইরে স্টোর রুমে রাখতে যাচ্ছিল। তা দেখে মায়া রাদিফের ব্যাটটি নিজের ঘরে এনে রাখে—অনুষ্ঠানের পর রাদিফকে আবার দিয়ে দেবে বলে। রিদ রাগান্বিত ভঙ্গিতে এখন মায়ার রাখা রাদিফের ব্যাটটি হাতে তুলে নেয়। রিদ খুব বেশি রেগে গেলে তার মাথা ঠিক থাকে না, মেজাজ হারিয়ে সামনে যাকে পায় রাগের বশে তাকেই আঘাত করে ফেলে। মায়া রিদকে ব্যাট হাতে নিতে দেখে আতঙ্কিত ভঙ্গিতে তৎক্ষণাৎ দৌড়ে গিয়ে পেছন থেকে জাপটে ধরল। রিদ গর্জে উঠে মায়াকে ছাড়তে বলে—

‘ ছাড়!
“না, ছাড়ব না। আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমি আর জীবনেও আপনাকে ইগনোর করব না। সরি! সরি!
এতক্ষণ আক্রমণ কারীর ভয়ে কাঁদলেও এবার মায়া রিদের ভয়ে কাঁপছে। রিদ রাগের মাথায় ওকে আবার আঘাত করে না বসে! মায়া ভয়ে কাঁপলেও রিদকে ছাড়ছে না; রিদকে ছেড়ে দিলে যদি সে মায়াকে আঘাত করে বসে—এই ভয়ে। রিদ রাগে রি রি করে ব্যাট হাতে মায়ার দুহাত ছাড়াতে চায়, কিন্তু পারে না। মায়া শক্ত করে রিদের পেট জড়িয়ে রিদের কাছে আকুতি-মিনতি করছে। রিদ মায়াকে নিয়ে সামনে ঘুরতে চাইলে মায়া রিদের পিঠ ছেড়ে তৎক্ষণাৎ তার বুক জাপটে ধরে। রিদ দাঁতে দাঁত পিষে শক্ত মুঠোয় ব্যাট চেপে রাগে ফুঁসছে। দূর থেকে একটা মানুষকে যতটা ভয়ঙ্কর দেখায়, কাছ থেকে সে ততটাই নিরাপদ। মায়া রিদের হাত থেকে বাঁচতে রিদের কাছেই আশ্রয় নিয়েছে এবং এতে কাজও হয়েছে। রিদ নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। আজ যদি রিদ ওই সময় ওই পথ দিয়ে না যেত, তাহলে আজ মায়ার শেষ দিন হতে পারত। আজ একটুর জন্য বেঁচেছে মায়া। রিদের বিগত কয়েক দিন ধরেই মনটা বিচলিত হচ্ছিল মায়াকে নিয়ে। তার মনে হচ্ছিল, কেউ তার দুর্বলতায় আঘাত করতে মায়াকে হাতিয়ার বানাতে পারে। সন্দেহবশত রিদ কয়েক দিন ধরে মায়াকে নজরে রাখছিল, পাশাপাশি রিদের অজান্তে এমন কে হতে পারে যে তার দুর্বলতায় আঘাত করতে পারে—সেই খোঁজও করছিল। মূলত এজন্যই রিদ মায়াকে বাড়ির বাইরে কোথাও যেতে নিষেধ করেছিল। কিন্তু রিদের নিজেরও ধারণা ছিল না যে আক্রমণকারী শত্রুরা তার বাড়ি অবধি ঢুকে তার বউকে নিয়ে যেতে চাইবে। আক্রমণকারী যেহেতু খান বাড়িতে ঢোকার সাহস পেয়েছে, তার মানে খান বাড়ির কেউই হবে যে লোকগুলোকে খান বাড়িতে ঢোকার সুযোগ করে দিয়েছে। শত্রু যেহেতু খান বাড়ির মধ্যেই আছে, তাহলে রিদকে আরও একটু বোকা সাজতে হবে। তাদের সুযোগ দিতে হবে যেন তারা ভাবে যে তারা জিতে যাচ্ছে। জিতে যাওয়ার খুশিতে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপই হবে রিদের জন্য উত্তম সুযোগ।
মায়া রিদকে জড়িয়ে কান্নাভেজা গলায় ফের বলতে লাগল—

‘ আমি আসলে বুঝতে পারিনি আপনাদের বাড়িতে, আপনার উপস্থিতির মধ্যেও কেউ আমাকে কিডন্যাপ করতে চাইবে। যদি বুঝতে পারতাম, তাহলে বের হতাম না। আপনারা সবাই বাড়িতে ছিলেন, সেজন্যই টিয়াকে খুঁজতে বের হয়েছিলাম। সত্যি আমি বুঝতে পারিনি কেউ আমাকে মারতে চাইবে। সরি আপনার কথা না শুনার জন্য।
রিদ রাগে ফুঁসছে। সবকিছু কেমন তিক্ত আর বিষাক্ত লাগছে। রিদ হাতের ব্যাটটা দেয়ালে ছুড়ে মারে। শব্দ হতেই মায়া ভয়ে চমকে ওঠে, তবে রিদকে ছাড়ে না। রিদ রাগে রি রি করে মায়াকে বুক থেকে টেনে সরাতে সরাতে বলে—
‘ তুই মর গিয়ে। তুই মরলেই আমি বাঁচি। আমার সব অশান্তির কারণ তুই। তোর জন্য আমাকে ভয়ে থাকতে হয়। তুমি নাই, ভয়ও নাই। কাহিনি শেষ। সর।

রিদ মায়াকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। মায়া রিদের ধাক্কায় তাল সামলাতে না পেরে দেয়ালে গিয়ে বারি খায়। এতে মায়ার এক হাতের বাহু আর কনুইতে বেশ ব্যথা লাগে। মায়া আর রুম থেকে বেরুল না, রুমে বসেই কাঁদতে লাগল। রিদের বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই মায়ার সাথে দেখা করতে একে একে খান বাড়ির সবাই আসে। মায়াকে সান্ত্বনা দেয়, ভয় পেয়ে কান্না করতে নিষেধ করে। রিদ আছে, সে সব সামলে নেবে; মায়ার ক্ষতি কেউ করতে পারবে না বলে সান্ত্বনা দেয়।

রাত প্রায় তিনটা বাজে। খান বাড়ির সকলেই ঘুমে, শুধু বাইরের ছেলেরা যারা রান্নাবান্নার কাজে আছে তারা জেগে। রিদ কমিশনারের সঙ্গে কথা বলে মাত্রই বাড়িতে ফিরেছে। সঙ্গে আয়ন ছিল। আসিফকে সঙ্গে নেয়নি, যাতে খান বাড়িতে থাকা গুপ্তচর টের না পায় রিদ কোথায় গেছে। কমিশনার খান বাড়িতে আসতে চেয়েছিলেন মায়ার দুর্ঘটনার খবরটা শুনে, কিন্তু রিদ উনাকে নিষেধ করে নিজে গিয়ে দেখা করে আসে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর রিদ বাড়িতে ফেরে। এর মাঝে জুঁই আয়নকে বেশ কয়েকবার ফোন করে বলে ওর জন্য আইসক্রিম নিয়ে যেতে। এই অসময়ে জুঁইয়ের আইসক্রিম খাওয়া নিয়ে প্রথমে আয়ন নিষেধ করলেও পরে রাজি হয়ে যায়। আজ প্রায় বেশ কয়েক দিন যাবৎ জুঁইয়ের খাওয়া-দাওয়া নিয়ে বেশ অনিহা তৈরি হয়েছে, বারবার মুড সুইং হচ্ছে। আবার মাঝেমধ্যে এমন সব খাবারের নাম বলে, যা আয়নের পক্ষে খুঁজে বের করা মুশকিল হয়ে যায়। আয়ন জুঁইয়ের জন্য কয়েক ফ্লেভারের আইসক্রিম নেয়। বাম হাতে পলিথিন ব্যাগে জুঁইয়ের আইসক্রিম নিয়ে আয়ন রুমে ঢুকে জুঁইকে কোথাও দেখতে পেল না। তখনই মনে পড়ল, জুঁই বিগত কয়েক দিন যাবৎ নোহার রুমে ঘুমাচ্ছে। আয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

বউয়ের সঙ্গে সংসার করার পর বউকে ছাড়া একা থাকা মুশকিল, অথচ এসব মেয়েদের কে বোঝাবে? এদের বুঝিয়ে বললেও উল্টো বোঝে। আয়ন নোহার রুমের দরজায় নক করে পরপর কয়েকবার জুঁইকে ডেকেও কোনো সাড়াশব্দ পেল না। আয়ন ভেজানো দরজাটা ঠেলে রুমে ঢোকে। জুঁই ও নোহা দুজন বিছানার দুপাশে ঘুমিয়ে আছে। আয়ন জুঁইয়ের পাশে বসে মৃদুস্বরে জুঁইকে ডাকে, কিন্তু জুঁই ওঠে না। নোহার নড়াচড়া দেখা গেল। আয়ন এর চেয়ে বেশি ডাকলে জুঁইয়ের জায়গায় নোহার ঘুম ভেঙে যাবে, তাই আয়ন উঠে দাঁড়িয়ে জুঁইকে কোলে নিয়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল। জুঁইকে নিজের বিছানায় শুইয়ে দরজা লাগাল। রুমের আলো জ্বালিয়ে পলিথিন থেকে আইসক্রিমের বক্স খুলে তাতে চামচ লাগিয়ে ফের জুঁইকে ডাকতে লাগল। এবার বেশ উঁচু স্বরেই জুঁইকে ডাকছে। জুঁই ঘুম-ঘুম চোখে আয়নকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফের চোখ বন্ধ করে নেয়। আয়ন বেশ বিরক্তিতে জুঁইয়ের মাথার পাশে বসে ফের ডাকে—

‘ জুঁই, উঠুন। আপনি না বলেছিলেন আইসক্রিম খাবেন? দেখেন, আপনার জন্য আইসক্রিম নিয়ে এসেছি। উঠুন, এটা খাবেন।
‘ হুম?
জুঁই হুম হুম বলে আবারও ঘুমিয়ে পরছে। আয়ন বেশ বিরক্তিতে জুঁইকে টেনে বসিয়ে দিতে দিতে বলে—
‘ আপনার মতো ঘুমে গাধা আমি আর একটাও দেখিনি জুঁই। আইসক্রিম নিয়ে সেই আধা ঘণ্টা ধরে শুধু আপনাকে ডেকেই যাচ্ছি। আপনার আইসক্রিম গলে পানি হয়ে যাচ্ছে, অথচ আপনার ঘুম ভাঙছে না। নিন এটা খান।
ঘুমন্ত জুঁইকে টেনে বসিয়ে তার কোলে আইসক্রিম ধরিয়ে দিয়ে আয়ন ওয়াশরুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে। জুঁই চোখ ডলে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইল। ঘুমের রেশ কিছুটা কমে আসতেই কোলে আইসক্রিম খেতে শুরু করে। জুঁইয়ের কী হয়েছে কে জানে, মাঝেমধ্যে এমন সব খাবার খেতে মন চায়, যেন পানি তৃষ্ণা পাওয়ার মতো ওই সব খাবারের তৃষ্ণা পায়। না খেলে যেন এক মূহুর্তের জন্য জুঁইয়ের রুহ বেরিয়ে যাবে! আইসক্রিম পেয়ে জুঁই গাল ভরে ভরে খেতে লাগল। আয়ন ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসতে আসতে জুঁই পুরো আইসক্রিমের বক্স খালি করে ফেলে। আয়ন ওয়াশরুম থেকে বেরোতেই জুঁই ফের আইসক্রিম চেয়ে বলে—

‘ আর আইসক্রিম নেই? একটা বক্সই এনেছিলেন আইসক্রিমের?
আয়ন কপাল কুঁচকায়। এক কেজির একটা আইসক্রিম বক্স খেয়ে বলছে আরও আছে কিনা? আয়ন আইসক্রিম বক্স এনেছে পাঁচটা, বাকিগুলো নিচে ফ্রিজে রেখে এসেছে। জুঁইয়ের জন্য শুধু চকলেট ফ্লেভারের আইসক্রিম বক্সটা নিয়ে এসেছিল, সেটাও শেষ! আয়ন কপাল কুঁচকে বলল—
‘ এটার সবটা শেষ?
‘ হ্যাঁ।
‘ এত তাড়াতাড়ি?
‘ হ্যাঁ। আমার আরও আইসক্রিম খেতে মন চাচ্ছে। আপনি আর আইসক্রিম আনেননি?
এত আইসক্রিম খেয়েও জুঁই আরও আইসক্রিম চাচ্ছে দেখে আয়ন মিথ্যা বলে জুঁইকে—
‘ না, আর আনা হয়নি। মনে করেছিলাম আপনি এটাই খেতে পারবেন না, সেজন্য একটা বক্সই এনেছিলাম। কাল আবার আপনাকে আরও আইসক্রিম এনে খাওয়াব। এখন ঘুমান কেমন।
জুঁই নাছোড়বান্দা হয়ে আবদারের সুরে বলে—

‘ প্লিজ, আর একটা আইসক্রিম এনে দিন না। নয়তো কাউকে বলেন না আমাকে আরও একটা আইসক্রিমের বক্স এনে দিতে। বাড়িতে অনেক লোকজন আছে, যে কাউকে বললে তারা আমাকে একটা আইসক্রিম এনে দেবে। ছোট বক্স হলেও চলবে।
বেশি আইসক্রিম খেলে জুইয়ের গলা ভেঙে যাবে। ঠান্ডা জ্বর দুটোই হতে পারে জুইয়ের। আয়ন ফের মিথ্যা বলে…
‘এতো রাতে শপ খোলা নেই জুঁই। সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে।
‘ তাহলে আপনি এই আইসক্রিমটা কোথা থেকে এনেছেন?
‘এটা আমি আপনার জন্য অনেক আগেই কিনে রেখেছিলাম। আপনি যখন আমাকে ফোন দিয়েছিলেন, তখনই লোক দিয়ে আমি কিনে রেখেছিলাম। এখন ঘুমান, জুঁই। এত রাতে আর আইসক্রিম খেতে হবে না, ঠান্ডা লেগে যাবে আপনার।
জুঁই আয়নের কথা শুনে আইসক্রিমের বক্স আয়নের হাতে দিয়ে দেয়। আয়ন খালি বক্সটা সোফার টেবিলের উপর রাখে। জুঁই বিছানায় শুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে আয়নও ঘরের আলো নিভিয়ে ডিম লাইট জ্বেলে জুঁইয়ের পাশে শুতে গেলে জুঁই বলে—

‘ ডাক্তার সাহেব, আপনার শরীরে আজকে কী দিয়েছেন? এত মিষ্টি গন্ধ লাগছে কেন? আমার খুব ভালো লাগছে। আপনি আমার কাছে আসুন।
আয়ন বালিশে মাথা রেখে জুঁইয়ের দিকে সন্দেহী দৃষ্টিতে তাকায়। এই পারফিউম আয়ন সবসময় ব্যবহার করে, তাহলে জুঁই আজ নতুন গন্ধ পাচ্ছে? এই তো পরশু রাতেও জুঁই আয়নকে বলল যে আয়নের পারফিউমের গন্ধ জুঁই সইতে পারছে না, আয়ন যেন জুঁইয়ের থেকে দূরে থাকে। আর আজকে বলছে এই একই পারফিউমের গন্ধ জুঁইয়ের কাছে মিষ্টি লাগছে, আয়নকে কাছে আসতে বলছে! আয়ন তীক্ষ্ণ গলায় জুঁইকে প্রশ্ন করে বলল—
‘ আপনার কী হয়েছে বলুন তো, জুঁই? এমন অদ্ভুত আচরণ কেন করছেন? একবার বলেন আমার গায়ের গন্ধ আপনার পছন্দ না, আবার এখন বলছেন আমার গায়ের গন্ধ মিষ্টি লাগছে। ব্যাপার কী বলুন তো?
“ব্যাপার-স্যাপার বলতে পারব না। আমার যা মনে হচ্ছে, তাই বলছি। আপনি কাছে আসুন তো।
আয়ন আসার আগে জুঁই নিজেই আয়নকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে যায়। আয়ন হাত মেলে দিতেই জুঁই আয়নের বুকে মাথা রাখে। আয়নের টি-শার্ট টেনে বারবার গন্ধ শুঁকছে। থেকে থেকে আয়নের গলায়, গালে শব্দ করে চুমুও খাচ্ছে। আয়ন ভারী গলায় জুঁইকে বলে—

‘ আপনার যে কী হয়েছে জুঁই, নিজেই বুঝতে পারছি না। এই একবার আদর করছেন, তো এই দূরে ঠেলে দেন!
রিদ রুমে ঢুকে ঘরের আলো জ্বালল। মায়াকে রুমের কোথাও না দেখে রিদের মেজাজ আরও খিটখিটে হয়ে যায়। রিদের অবাধ্য হওয়া এই নারীর অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাক, এই অবাধ্য নারী জাহান্নামে যাক! এই নারীর পেছনে রিদ আর দৌড়াবে না। রিদ রাগে-জিদে দরজাটা জোরে ধাক্কা দিয়ে বন্ধ করল। দরজার ভারী শব্দে দেয়ালসহ কেঁপে উঠল, তবে সে দরজা লক করেনি। রাত তখন প্রায় ৩:১৭। মায়া কার ঘরে শুয়েছে রিদ জানে না, আর না জানতে চায়। জাহান্নামে যাক এই নারী! রিদ ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। রিদের সুগারের সমস্যা আছে, বেশিক্ষণ না খেয়ে থাকতে পারে না। শরীর কাঁপে। রিদ সেই দুপুরে খেয়েছিল, তারপর থেকে একটা দানাও তার পেটে পড়েনি। সুফিয়া খান বেশ কয়েকবার বলেছিলেন রিদকে খেয়ে নিতে, কিন্তু রিদ খাবে না বলে জেদ করে রুমে চলে এসেছে। রিদ রুমের লাইট নিভিয়ে রুমটা অন্ধকার করে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল চোখের ওপর হাত রেখে।

তার মিনিট দশেক পরেই মায়া হাতের ট্রে-তে করে রিদের জন্য খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকল। রিদ তখন ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর মায়া আর ঘুমায়নি। রিদের ঘরেই ছিল। রিদকে বাড়িতে ফিরতে দেখে তাড়াহুড়ো করে রান্নাঘরে গিয়েছিল রিদের জন্য খাবার গরম করতে। রিদের ভাঙচুর করা সোফার টেবিল সুফিয়া খান মালাকে দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নিয়েছেন। ড্রয়িংরুম থেকে একটা এক্সট্রা সোফার টেবিল আপাতত রিদের রুমে রেখে গেছেন। মায়া খাবার ট্রে ওই সোফার টেবিলের ওপর রেখে ঘরের আলো জ্বালাল। রিদ বিছানায় টানটান করে শুয়ে, এক পা অন্য পায়ের ওপর তুলে কপালে হাত ঠেকিয়ে আছে। মায়া রিদের ওপর ঝুঁকে তার কপালে থাকা হাতটা সরিয়ে দিতেই দেখল রিদ তাকিয়ে আছে। রিদকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মায়া একটু থতমত খেয়ে যায়। তারপর রিদকে ডেকে বলে—
‘ আপনার জন্য খাবার এনেছি। খাবার খাবেন আসুন।
রিদ কথার উত্তর না দিয়ে মায়ার হাতটা ঝাড়া দিয়ে ফেলে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। মায়া ফের দুহাতে রিদের বাহু টেনে রিদকে চিৎ করে বলে—

‘ ডাকছি আমি, শুনছেন না? খাবেন আসুন।
‘ খাব না, সর।
‘ কেন খাবেন না?
‘ ইচ্ছা নাই, তাই।
‘ কেন ইচ্ছা নাই আপনার, বলেন?
“বা’ল! সর তো। মেজাজ খারাপ করিস না, যা।
রিদ মায়ার হাতটা বাহু ঝাঁকিয়ে ফেলে ফের পাশ ফিরে শুতে চাইলে মায়াও ফের রিদকে টেনে নিজের দিকে ফিরিয়ে বলে…
“না খেলে আপনার সুগার ফল করবে।
“করুক, তোর কী?
‘ আমারই তো সব! আমার এত সুন্দর একটা চাঁদমুখো জামাই না খেয়ে অসুস্থ হয়ে যাবে, এটা আমার প্রাণে সইবে বলুন?
‘ বা’ল! যা তো, বিরক্ত করিস না।
“ঠিক আছে, তাহলে চলে যাচ্ছি।

মায়া সত্যি সত্যি রিদকে ছেড়ে উঠে গেল। তবে ঘর থেকে বেরুল না, বরং ট্রে-তে আনা খাবারগুলো ঢাকনা দিয়ে ভালো করে ঢেকে রাখল। ঘরের দরজা লাগিয়ে রুমের আলো নিভিয়ে দিল। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। মায়া আন্দাজমতো বারান্দার দরজা অবধি গিয়ে দরজাটা হাল্কা খুলে দেয়, এতে বাইরের কড়া লাইটিংয়ে ঘর আবছা আলোয় আলোকিত হলো। মায়া সেই আলোয় বিছানা অবধি গেল। মায়া শাড়ি পরলে রিদ খুব পছন্দ করে। সেজন্য মায়া নিজের গায়ের শাড়িটা বদলায়নি। সে হামাগুড়ি দিয়ে রিদের মুখোমুখি বিছানায় শুয়ে পড়ল। পায়ের কাছে কম্বল টেনে রিদের সঙ্গে মিশে শুলো। রিদ বিরক্তিতে মায়াকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিতে দিতে বলে—
‘ সরো! গরম লাগে।
‘ তাহলে এসি বাড়িয়ে দিন।

রিদ মায়াকে ‘তুমি’ করে বলছে, এর মানে মায়া ঠিক পথেই হাঁটছে। রিদের রাগ কমে এসেছে, মায়া আর একটু তেল-মালিশ করলেই রিদের রাগ ভেঙে যাবে, তখন মায়া রিদকে খাওয়াবে। রিদ মায়াকে পিঠ করে ওপাশ ফিরে শুলো। মায়া রিদের ওপর দিয়ে সেপাশেও গেল। দুজনের গায়ে একই কম্বল টেনে রিদকে জড়িয়ে ধরলে রিদ বিরক্ত গলায় বলে—
‘ উফ রিত! বিরক্ত করছ কেন?
‘ অন্ধকারে আমার ভয় লাগে তো।
রিদ চুপ রইল, মায়াকে নিজের থেকে আর সরাতে চাইল না। মায়া আরও চেপে চেপে রিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে শুলো। রিদের হাত মায়া নিজের পিঠে রাখে। রিদ মায়াকে জড়িয়ে ধরছে না দেখে মায়া রিদের কোমরের কাছের টি-শার্ট টেনে উপরে উঠাল। রিদের খালি পিঠে মায়া হাত বুলাতে বুলাতে বলল—
‘ আপনার গায়ে কি জ্বর? শরীর গরম কেন?
টি-শার্টটি খুলে ফেলুন, আর জ্বর থাকবে না।
‘ গায়ে জ্বর নেই আমার। আর মানুষের গায়ে জ্বর থাকলে কাপড় পরে, খোলে না, স্টুপিড!
‘ ওহ, তাহলে মনে হয় আপনার ঠান্ডা লেগেছে। টি-শার্টটি খুলে ফেললে, গরম লাগবে।
মায়ার উল্টাপাল্টা যুক্তিতে রিদ মায়ার হাত চেপে ধরে। মায়া রিদের টি-শার্ট টানছে খোলার জন্য। রিদ তীক্ষ্ণ গলায় বলল—

“মতলব কী তোমার? কী চাই?
মায়া গুনগুনিয়ে বলে…
‘ আমার মতলব কী, এটা যদি আপনি বুঝতেন তাহলে এত কষ্ট করা লাগত আমার? আপনি নিজেই বুঝতেন কী চাই আমার।
রিদ প্রথম দেখাতেই মায়ার মতলব বুঝেছিল, যখন মায়া রিদের সঙ্গে শুয়েছে। রিদ তারপরও মায়াকে উপেক্ষা করে বলে—
“সরো, মুড নাই।
“তাহলে উঠে যাই?
মায়া উঠতে চায়, অথচ রিদ ‘মুড নাই’ বলেও মায়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে, উঠতে দিচ্ছে না। মায়া বুঝতে পারে রিদ ওকে ছাড়বে না। মায়া রিদের পিঠে থাকা হাতটা মাথায় নিয়ে যায়। রিদের চুলে হাত বুলিয়ে রিদের মাথাটা টেনে নিজের মুখোমুখি করে অন্ধকারে ফিসফিসিয়ে বলে—
‘ আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি। আমাদের একটা মেয়ে হয়েছে, দেখতে ঠিক আপনার মতো সুন্দর হয়েছে। কী সুন্দর হাসে মেয়েটা!
রিদ খুব মনোযোগ দিয়ে মায়ার কথা শুনছে। স্বপ্নের ব্যাপারটা মায়া সত্যি বলেছে নাকি মিথ্যা—রিদ জানে না, তবে এই মুহূর্তে মায়ার মুখে স্বপ্নের কথাগুলো শুনতে রিদের ভালো লাগছে। রিদ মায়ার কথার তালে জানতে চায়—
‘ মেয়েটা তোমার মতো সুন্দর হাসে?
রিদের মেয়ে পছন্দ। সেজন্যই মায়া মেয়ে বাচ্চার কথাটা বলেছে। যাতে রিদ মায়ার কথা শুনে। হলোও তাই। মায়া বলে…

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১৫

‘ বলব, যদি আপনি এখন খেতে আসেন তাহলে।
মায়া চট করে কথা ঘুরিয়ে নিল। রিদও ছেড়ে দেওয়ার মানুষ নয়, সেও মায়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে বলে—
‘ খাবার আগে ফরজ গোসল করে নিই, তারপর খাব।
‘ আপনি না রাতে একবার গোসল করেছেন তাহলে এখন আবার কিসের গোসল?
রিদ মায়ার গলায় মুখ গুজে ঘনিষ্ঠ হয়ে বলে…
‘ মুড এসেছে তাই বউকে নিয়ে করব।

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here