মহামায়া পর্ব ৪৪
তুশকন্যা
বান্ধবীদের সাথে রাতের আহার পর্ব শেষ করে আনায়া সবেমাত্র নিজের বেডরুমে প্রবেশ করেছে। সারাদিনে একের পর এক গণ্ডগোল পাকিয়ে এলেও, কেনীথের ব্যক্তিগত ফোন নম্বরটি কোনো উপায়ে জোগাড় করেই যেন সে এক বিশ্বজয় করে ফেলেছে। আনায়ার চোখেমুখে এখন উপচে পড়া খুশির চপলতা; আজ রাতে যে তার সহজে ঘুম আসবে না, তা সে বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে।
যথারীতি বিছানায় নিজের ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে, তুলতুলে এংরি বার্ডস-এর রেড’গুলোর ওপর সম্পূর্ণ ভর ছেড়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল আনায়া । অতঃপর নিজের আধাভাঙ্গা ফোনটি হাতে নিয়ে, কেনীথের নম্বরটি খানিকটা তিক্ত মনে ‘বজ্জাত রেড’ নামে সেভ করে নিল। একইসাথে মনে মনে বিড়বিড় করল,
“ভাবের স্বামী আমার, দাম দেয়না কিছু না। যত্তসব রঙঢঙ!”
বলেই সে আবার ভাবতে লাগল, ফোন নাম্বারটা তো জোগাড় করেছে।এবার বান্দাকে একটা মেসেজ দেওয়া যায় কিনা। মনের ভেতর তীব্র দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর ভীতি কাজ করলেও, শেষমেশ রমণীর চঞ্চলতাই জয়ী হলো। সে গভীর এক দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করে একটি মেসেজ টাইপ করে পাঠিয়েই দিল,
”হাই ভিভিয়ান, কেমন আছো?”
ওদিকে কেনীথ তখন সদ্য স্নান সেরে নিজের ঘরে এসেছিল। নম্বরটি ব্লক করার সিদ্ধান্ত নিয়েও তার সুতীক্ষ্ণ মস্তিষ্কে এক নতুন ভাবনার উদয় হলো। সে নিশ্চিত হতে চাইল ওপাশের মানুষটির ধৃষ্টতা কতখানি। তাই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও গম্ভীর আকারে সে নিজে জার্মান ভাষায় টাইপ করল,
”কে আপনি?”
ওপাশ থেকে ঝড়ের বেগে উত্তর আসার সংকেত মিলল। কেনীথ বিছানায় হেলান দিয়ে নিজের ল্যাপটপটি কোলে তুলে নিল। স্ক্রিনে অফিসিয়াল কাজ চলতে থাকলেও তার মনোযোগের একাংশ এখন ফোনের পর্দায়। ক্ষণকালের মধ্যেই অপর প্রান্ত থেকে স্থূল ও অশোভন জার্মান শব্দের সংমিশ্রণে বার্তা ভেসে এল,
”জান? সবসময় এতো রাগ করে থাকো কেন, হ্যাঁ? একটুও কি হাসিখুশি থাকা যায় না? মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা যাচ্ছে না? বাই দ্য ওয়ে, তোমার কি গার্লফ্রেন্ড আছে? আমি অবশ্য গার্লফ্রেন্ড থাকা ঢ্যামনাদের সাথে কথা-টথা বলি না।”
মেসেজটি পড়ে কেনীথের ওষ্ঠকোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি গাঢ় হলো। মেয়েটি যে নিজের পরিচয় লুকিয়ে তাকে বিভ্রান্ত করার এক ব্যর্থ খেলায় মেতেছে, তা তার বুঝতে আর বাকি নেই। সে এবার খেলাটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। অত্যন্ত ভদ্র ও সংযত ভাষায় সে প্রত্যুত্তর পাঠাল,
”আপনি কি বলবেন, আপনি কে?”
আনায়া বিছানায় শুয়ে উপুড় হয়ে পা দোলাচ্ছিল। কেনীথের প্রতিটি উত্তরের ব্যবধান এবং তার গম্ভীর শব্দচয়ন আনায়ার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি করছে। এক অজানা উত্তেজনা আর ভয়ের রোমাঞ্চ তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে ক্রমশ। সে দ্রুত আঙুল চালিয়ে লিখল,
”না বললে কি খুব সমস্যা?”
কেনীথ ল্যাপটপের কিবোর্ডে আঙুল চালাতে চালাতেই এক হাত দিয়ে ফোনে টাইপ করল,
”জ্বী না, কোনো সমস্যা নেই। আমি শুধু আপনার নাম্বারটা ব্লক করব, এইটুকু।”
ব্লক করার কথাটি পড়া মাত্রই আনায়ার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। লোকটা যা বজ্জাত, সত্যিই যদি নম্বরটি ব্লক করে দেয়, তবে তার এত কষ্টের অর্জন এক নিমেষেই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। সে অত্যন্ত তটস্থ হয়ে দ্রুত উত্তর পাঠাল,
”এই না না, শুধু শুধু রাগ করো তুমি। নাম্বার ব্লক করার কি দরকার?”
কেনীথ ফোনের ওপারে বসে আনায়ার এই ছটফটানি যেন স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিল। তার গম্ভীর মুখাবয়বে এক সূক্ষ্ম বিদ্রূপাত্মক রেখা ফুটে উঠল। সে লিখল,
”তাহলে বলুন, আপনার নাম কি?”
আনায়া সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ক্ষণকাল ভাবল। ছদ্মনামটি এমন হতে হবে যা শুনলে কেনীথ কোনোভাবেই তাকে মেলাতে না পারে। ঠোঁট কামড়ে ধরে সে টাইপ করল,
”জুলি, তবে তুমি চাইলে আমায় আদর করে আইসললিও ডাকতে পারো।”
আইসললি! ভ্রু উঁচিয়ে নামটা পড়ে, কেনীথ নিজের ভেতরের বিদ্রূপাত্মক হাস্যরসটুকু চেপে রাখল। ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে সে গুরুত্বের সাথে উত্তর দেওয়ার ভংগিমায় লিখল,
”জুলি? কিন্তু আমি তো আপনাকে চিনি না। আপনি আমার নাম্বার কোথায় পেয়েছেন?”
আনায়া মনে মনে কুটিপাটি করে হাসল। আবারও এক নতুন বিশ্বজয়ের তৃপ্তি নিয়ে সে দাঁত কিড়মিড়িয়ে আওড়াল,
“বাবাজী, এবার কোথায় যাবা তুমি? চিনলে না তো আমায়! চিনবা কেমনে, তোমার চেয়ে দুইকাঠি উপরে থাকি আমি।”
বকবক করে দু’চারটে এহেন সব বাণী আওড়ে, পরক্ষণেই আবার নিজেকে সাবাশী দিতে আত্মতৃপ্তি নিয়ে বিড়বিড় করল,
“হায়য়য়য়, কত্ত ট্যালেন্টেড আমি!”
চপল রমণী বেশ প্রগলভতা নিয়ে এবার মেসেজের উত্তর দিতে মরিয়া হলো,
”ওসব নিয়ে তোমার না ভাবলেও চলবে। তুমি আমায় আগে এটা বলো তো, তোমার কোনো গার্লফ্রেন্ড আছে কিনা?”
কেনীথ এবার মোক্ষম চালটি চালার সুযোগ পেল। মেয়েটার পাগলামি আর অনধিকার চর্চায় একটি সূক্ষ্ম আঘাত হানার জন্য সে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে ঢঙে লিখল,
”হ্যাঁ আছে।”
মেসেজটি স্ক্রিনে দেখামাত্রই আনায়ার মুখের সমস্ত হাসি নিমেষেই মিলিয়ে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা আর ভারী ঠেকতে লাগল। তার বড় আব্বুর ফুতের জীবনে সে ব্যতীত আবারও অন্য কোনো নারী? এটা কীভাবে সম্ভব! সে নিজের অস্থিরতা লুকিয়ে কম্পিত আঙুলে টাইপ করল—
”রিয়েলি? হোয়াটস্ হার নেইম?”
কেনীথ তার ল্যাপটপের কাজ সামলানোর পাশাপাশি আনায়ার এই মানসিক বিপর্যয়টুকু বেশ উপভোগ করছিল। সে নিজেকে পুরোপুরি মিঙ্গেল প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে অত্যন্ত নিস্পৃহভাবে উত্তর দিল,
”দ্যাটস মাই পারসোনাল ম্যাটার, সো আই ওয়ান্ট টেল ইউ অ্যানিথিং!”
আনায়ার খামখেয়ালী মাথায় এবার তীব্র জেদ চেপে গেল। সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে রাজি নয় যে—তার জন্য এতো পাগলামির পর, বছর খানেকের মাঝেই এই বান্দা অন্যকারো সাথে আবার নতুন করে রিলেশনে জড়িয়েছে। অস্থিরচিত্তের রমণী নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার ছলে এবং সত্য উদঘাটনের চেষ্টায় লিখল,
”মিথ্যে বলছো তুমি, আমি জানি তোমার কোনো গফ-টফ নেই। থাকলে নিশ্চয় নাম বলতে এতো দ্বিধা করতে হতো না।”
কেনীথ এবার আর দেরি করল না। এই কাল্পনিক চরিত্রটিকে আরও বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য সে অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে টাইপ করল,
”এটা অত্যন্ত সিক্রেট, তবুও আপনি যখন জানতে চাচ্ছেন তবে বলতেই পারি…ওর নাম স্টিফেন!”
মেসেজটা পাঠানো মাত্রই, কেনীথ চোখমুখ খিঁচে ধরল। স্টিফেন? এটা তো বোধহয় ছেলে মানুষের নাম হিসেবেই ভালো মানায়। সে কোন হুঁশে এই নামই লিখতে গেল। তবুও আশা রাখল, আনায়া বিষয়টাকে খুব একটা গুরুত্ব দেবে না। কিন্তু আনায়ার খুঁতখুঁতে মন বিষয়টাকে এড়িয়ে যেতে চেয়েও পারল না। কিছুটা সন্দেহ নিয়ে লিখল,
“স্টিফেন? নামটা কেমন ছেলে মানুষের মতো লাগছে না? তুমি কি আমার সাথে মজা করছো?”
কেনীথ ল্যাপটপ হতে সম্পূর্ণ মনোযোগ সরিয়ে টাইপ করার প্রতি অনুগত হলো। বেশ দৃঢ়তার সাথেই লিখে গেল,
___”আপনি জার্মান নন?”
___”হ্যা, কিন্তু কেনো?”
___”একজন জার্মান হলে তো এই প্রশ্ন করার কথা ছিল না। স্টিফেন নামে জার্মানি কিংবা ইউরোপে অহরহ মেয়ে আছে।”
মেসেজটা পড়ে আনায়া কিঞ্চিৎ কেশে উঠল। ধরা পড়ে যাচ্ছে কিনা ঠিক বুঝতে পারছে না। কিন্তু তবুও সে মনে মনে বিড়বিড় করতে লাগল কেবল একটি নাম—স্টিফেন! কিছুক্ষণের মাঝেই নামটা ঘিরে আনায়ার মনের ভেতর এক তীব্র ঈর্ষার আগুন জ্বলে উঠল। সে সফট-টয়টাকে শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরে ভ্রু কুঁচকে ভাবতে লাগল—কেনীথ কি সত্যিই তাকে চিনে ফেলেছে? তাই কি তাকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য এই স্টিফেন নামের মনগড়া চরিত্রটি বানিয়েছে? নাকি সত্যিই তার জীবনে স্টিফের নামের কেউ আছে? আর যদি চিনে ফেলে থাকে, তবে সে এত সহজে উত্তর দিচ্ছে কেন? চিন্তার জালে আনায়ার মাথা গুলিয়ে যেতে লাগল। কি এক মুসিবত! তবুও সে ছদ্মবেশ বজায় রেখে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ল—
”সত্যি বলছেন তো আপনি?”
কেনীথ ফোনের ওপারে এক চিলতে তাচ্ছিল্যভরা হেসে উত্তর দিল,
”মিথ্যে কেনো বলব?”
আনায়া দমে না গিয়ে আবার লিখল,
”কত দিনের রিলেশন আপনাদের?”
কেনীথ এবার চট করেই হিসাব কষে উত্তর দিল,
”প্রায় আটমাস।”
আট মাস! তার মানে একবছর আগে সেই অপ্রত্যাশিত ঘটনার পরপরই এই অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছে। রমণীর চোখদুটো রাগে-ক্ষোভে, কষ্টে ছলছল করে উঠল। দাঁতে দাঁত পিষে খোদার কাছে অভিযোগ ছুঁড়ে বলল,
“ওরেহ্ আল্লাহ্, এ তুমি আমার কি সর্বনাশ করে দিলে?
আনায়ার এবার আর সহ্য হলো না। তার ভেতরের আসল জেদি মেয়েটি যেন ছদ্মনামের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। সে ক্ষিপ্ত হয়ে লিখল,
”মিথ্যে বলতে লজ্জা করে না?”
কেনীথ বিছানায় আরাম করে বসে ল্যাপটপটি একপাশে সরিয়ে রাখল। সে বুঝতে পারছিল ওপাশের মেয়েটি এখন ঈর্ষায় জ্বলছে। সে অত্যন্ত নিরীহ ও অচেনা সাজার ভংগিমায় উত্তর দিল,
”আপনার কেনো মনে হচ্ছে আমি আপনাকে মিথ্যে বলছি? আমি কি আপনাকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনি? আমার তো মনে হচ্ছে না।”
কেনীথের এই সম্পূর্ণ অচেনা ও দূরত্ব বজায় রাখা উত্তরটি দেখে আনায়ার সংশয় কিছুটা দূর হলো। সে ভাবল, যাক—লোকটা তাহলে তাকে চিনতে পারেনি। জুলি ভেবেই কথা বলছে। সে নিজের ভেতরের অস্থিরতাটুকু সামাল দিয়ে কথোপকথনটি অন্যদিকে মোড় নেওয়ার জন্য স্বাভাবিক সুরে জিজ্ঞেস করল,
”না তুমি আমায় কিভাবে চিনবে, আমাদের তো কখনো সামন-সামনি দেখাই হয়নি। যাই হোক, এখন তুমি কি করছো?”
কেনীথ অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় চট করে টাইপ করল,
”একটা ইডিয়টের সাথে কথা বলছি!”
আনায়া স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার ভ্রুকুটি চরম আকার ধারণ করল। সে ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত হয়ে টাইপ করল,
”মানে???”
রাত্রির প্রহর তখন আরও গভীর ও নিস্তব্ধ। মিউনিখের তুষারশীতল আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে আনায়ার শয়নকক্ষে তখন এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলছে। ফোনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করতে থাকা ‘একটা ইডিয়টের সাথে কথা বলছি!’ বাক্যটি যেন তীরের মতো এসে তার হৃদপিণ্ডে আঘাত হেনেছে। এক মুহূর্তের জন্য আনায়া ভেবে বসল, তার চারপাশের বাতাসও বুঝি ক্রমশই জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে।
রমণীর পুরো শরীর সংশয়ের এক তীব্র ঝড়ে কাঁপতে লাগল। হাত থেকে ফোনটি আলগা হয়ে নরম বিছানার ওপর খসে পড়ল। আনায়ার কপালে সূক্ষ্ম বিন্দুর মতো ঘাম জমে উঠছে। তার সুতীক্ষ্ণ মস্তিষ্কে তখন আত্মঘাতী সব চিন্তা খেলা করছে—কেনীথ কি তবে তার এই ছদ্মবেশ ধরে ফেলেছে? কিন্তু কিভাবে?
আর যদি তা-ই হয়, তবে এই অপমানের পর কাল সকালে সে কোন মুখে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে? ভয়, লজ্জা আর এক অজানা আশঙ্কায় আনায়ার কান্না পেয়ে গেল। সে রেডটাকে শক্ত করে জড়িয়ে একপ্রকার নিজের সাথে পিষে ধরল। নিজের এই চরম বোকামির জন্য নিজেকেই মনে মনে সহস্রবার ধিক্কার দিতে লাগল।
ঠিক যখন আনায়া নিজের এই চূড়ান্ত পরাজয় ও অপদস্থ হওয়া মেনে নিয়ে ফোনটি সুইচঅফ করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল, তখনই বিছানায় পড়ে থাকা ফোনটি আবারও টুং করে কেঁপে উঠল। আনায়া অত্যন্ত তটস্থ হয়ে, কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনটি তুলে চোখের সামনে ধরল। কেনীথের পরবর্তী মেসেজটি ভেসে উঠেছে। সেখানে অত্যন্ত স্বাভাবিক ঢঙে,নিস্পৃহ টোনে লেখা—
”আজ অফিসে কিছু নতুন ক্লায়েন্ট এসেছিল। ডিল করার মতো ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞানও তাদের নেই। সম্পূর্ণ অযোগ্য কিছু মানুষের পেছনে কয়েকটা ঘণ্টা নষ্ট করতে হয়েছে; আমার বিরক্তিটা মূলত তাদের ওপর।”
মেসেজটি পড়া মাত্রই আনায়ার বুকের ভেতর আটকে থাকা দমটা যেন এক দীর্ঘশ্বাসের সাথে বেরিয়ে এল। সারা শরীরে বয়ে যাওয়া সেই হিমশীতল ভয়ের স্রোতটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গিয়ে সেখানে এক অদ্ভুত ও আরামদায়ক স্বস্তি ভর করল। সে একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বিছানায় সোজা হয়ে নড়েচড়ে বসল। তার মানে কেনীথ তাকে একটুও চিনতে পারেনি! সে শুধু শুধু এতো ঘাবড়ে যাচ্ছিল? যাক, সৃষ্টিকর্তা তাকে এই যাত্রায় কেলেঙ্কারির হাত থেকে রক্ষা করেছেন!
আনায়া নিজের চিরচেনা চপলতা আর আত্মবিশ্বাসে ফিরে এসে আবার দ্রুত আঙুল চালাল,
”ওহ! আমি তো ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ইডিয়ট বলছ।”
কেনীথের অত্যন্ত গম্ভীর মুখাবয়বের এককোণে তখন এক রহস্যময় ও তাচ্ছিল্যের হাসি লেপ্টে আছে। মেয়েটার এই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার ব্যাকুলতা সে ফোনের ওপার থেকেও স্পষ্ট টের পাচ্ছিল। সে আবারও প্রত্যুত্তর পাঠালো,
___” স্ট্রেঞ্জ! আমি আপনাকে কেনো ইডিয়ট বলবো? আপনি ইডিয়ট?”
আনায়া থতমত খেয়ে গেল। লোকটার কথাবার্তা এমন ত্যাড়া কেনো বুঝতে পারছে না। একটু স্বাভাবিক ভাবেও তো মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা যায়। অথচ শুরু থেকেই মনে হচ্ছে লোকটা ভীষণ বিরক্তি নিয়ে তাকে কেবল খোঁচাই দিয়ে যাচ্ছে। তবুও একটা বিষয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দিল এই ভেবে যে—কেনীথ তো জানছে সে আনায়া নয় বরং জুলি। সেক্ষেত্রে একটা অপরচিত মেয়ের সাথে অতিরিক্ত রঙে ঢঙে কথা বলবে না—এটাই তো ভদ্র বাড়ির স্বামীর পরিচয়!
আনায়া নতুন কিছু টাইপ করতে করতে বিড়বিড় করল,
“নাহ, জামাইটা আমার ভালোই আছে।”
আবারও সে মেসেজ পাঠাতে উতলা হলো,
___”তোমার মুখে রসকষ বলতে কিছু নেই? এতো ত্যাড়া ত্যাড়া কথা বলো কেন? তোমার সো-কল্ড গার্লফ্রেন্ড জানতে পারলে রাগ করবে এইজন্য?”
আনায়া কিছুটা তিক্ততা নিয়েই মেসেজটা পাঠালো। ভেবেছিল কেনীথও হয়তো এবার একটু ত্যাছড়া কথা বলে ছাড়বে। অথচ এমন কিছুই হলো না; সে কোনো প্রত্যুত্তরই পাঠালো না। মিনিট পাঁচেক কেটে যাবার পর আনায়া হকচকিয়ে উঠল, কেনীথ ঘুমিয়ে গেল কিনা এই দুশ্চিন্তায় ডুবল। ততক্ষণে আচমকা কেনীথের নতুন একটা মেসেজ এলো,
___”আপনি কি আদৌও জানেন, আমি কে?”
আনায়া মেসেজটা দেখে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের সাথে হাসল। মুখ ভেঙচিয়ে লিখল,
“জানবো না কেন? তুমি ইউরোপের সবচেয়ে বড়, বড়’র চেয়েও বড়, আইফেল টাওয়ারের চেয়েও বড় সেলিব্রিটি। তোমার পেছনে তো দলে দলে মেয়েরা ঘুরে বেড়ায়, কি আমি ঠিক বলেছি না?”
___”………”
___”তোমার সমস্যা কি, হ্যাঁ? বারবার মেসেজ দিয়ে হুট করে কোথায় গায়েব হয়ে যাও?”
___”……..”
আবারও প্রত্যুত্তর শূন্য। আনায়া চোখ-মুখ খিঁচে ফেলল। মেজাজটা কোনোভাবেই কন্ট্রোল করা যাচ্ছে না। সে ব্যাপার না, তার নিজের মেজাজ যখন বিগড়েছে তখন কেনীথের মেজাজও বিগড়ানো উচিত। আনায়া প্রসঙ্গ বদলে লিখল,
___”এনিওয়ে, এসব কথা না হয় বাদ দিলাম। তা এখন বলো, তোমার সেই ক্লায়েন্টরা কী এমন করল যে তোমার এত মেজাজ খারাপ হলো?”
___”তারা কী করেছে, তা একজন আউটসাইডারকে বলা আমার প্রফেশনাল পলিসির বাইরে। বাই দ্য ওয়ে, মাঝরাতে একজন আননোন পারসনের পার্সোনাল লাইফ নিয়ে এত কিউরিওসিটি দেখানোর রিজনটা জানতে পারি, মিস জুলি?”
আনায়া নিজের ওষ্ঠাধর কামড়ে মৃদু হাসল। কেনীথের এই অতিমাত্রায় গম্ভীর, রাশভারী আর দাম্ভিক আচরণ তাকে যেন এক অদ্ভুত মোহের জালে জড়িয়ে ফেলছে। সে অত্যন্ত চতুরতার সাথে টাইপ করল,
___”কারণ তোমার লাইফটা অনেক বোরিং। ওতে একটু মশলাপাতি ছিটিয়ে দিলে ভালো হয়।”
___”আমি বলেছি আপনাকে মশলাপাতি ছিটিয়ে দিতে?”
___”না, সে তো দাওনি কিন্তু দিলেও বা ক্ষতি কি? এনিওয়ে, তুমি আমায় বারবার আপনি বলা বন্ধ করো তো। আমি বুড়ি নাকি যে সেই কখন থেকে আপনি ডেকে যাচ্ছো? আর আমি তো বলেছিই, তুমি চাইলে আমাকে আদর করে আইসললিও ডাকতে পারো। নামটা কি খুব বেশি খারাপ?”
কেনীথ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিদ্রুপের সাথে আওড়াল,
‘জুলি দ্য আইসললি! ধূর্ত শেয়াল বলব নাকি অপদার্থ মুরগী—বোঝা মুশকিল!”
পরমুহূর্তেই কেনীথ ত্যাক্ত শ্বাস ফেলে, আবারও লিখল,
”আইএম নট শিওর ইফ মাই লাইফ ইজ বোরিং, বাট ইটস ডেফিনেটলি হাইলি ডিসিপ্লিনড। প্লাস, আই হ্যাভ নো ইন্টারেস্ট ইন কলিং অ্যান আনফ্যামিলিয়ার গার্ল বাই সাচ আ চিপ নেম। আই গেস গার্লস লাইক ইউ—ফাইন্ড রিফ্রেশমেন্ট বাই অ্যানোয়িং গাইজ অ্যাট মিডনাইট, অ্যাম আই রাইট?”
কেনীথের এই ধারালো কটাক্ষে আনায়ার আত্মসম্মানে কিছুটা আঘাত লাগল বটে, তবে তার এই অবজ্ঞা করার ধরনটাই তাকে আরও বেশি টালমাটাল করে তুলছিল। সে একরোখা জেদ ধরে লিখল,
”ওহ্ কাম অন বেইবি, কথা বলতেও এত এটিটিউড দেখাও কেন, হা? স্টিফেন না কি যেন বললে…সে মেয়ে তোমার এতো ইগো-অ্যাটিটিউট সহ্য করে কীভাবে? ওর প্রবলেম হয় না?”
স্টিফেনের প্রসঙ্গ আসতেই কেনীথ কাজের ফাঁকেও, মনে মনে বেশ আমোদ পেল। সে নিজের বুনে যাওয়া কাল্পনিক জালটি ওপাশের ছদ্মবেশী মেয়েটির চারপাশে আরও শক্ত করে জড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াসে লিখল,
”স্টিফেন আমার ব্যক্তিত্বকে সম্মান করতে জানে। সে অহেতুক, উদ্দেশ্যহীন ভাবে রাত-বিরেতে কথাবার্তা বলে আমার সময় নষ্ট করে না। তার রুচিবোধ অত্যন্ত উন্নত এবং মার্জিত।”
আনায়ার এবার সত্যিই স্টিফেন নামের মেয়েটির ওপর তীব্র ঈর্ষায় জ্বলতে লাগল। মনে মনে সে স্টিফেনকে ইচ্ছেমতো গালমন্দ করল।
—”এ কোন হতচ্ছাড়ি, একবার হাতের নিচে পাই খালি—মে’রে তক্তা বানিয়ে ছাড়ব।”
সত্য মিথ্যা পরের বিষয়, কেনীথের মুখে অন্য কোনো নারীর এমন অকুণ্ঠ প্রশংসা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। তার বুকের ভেতর এক অজানা অসহায়ত্ব, অধিকারবোধ মাথা চড়া দিয়ে উঠল। সে ক্ষুব্ধ হয়ে লিখল,
”রুচিবোধ উন্নত হলেই বুঝি একটা মানুষ পারফেক্ট হয়? ভালোবেসে দুটো মিষ্টি কথা বলতে না পারলে সেই সম্পর্কের কোনো মূল্য নেই। আমি নিশ্চিত, তোমাকে দিয়ে তো বোধহয় ওসব কিছুই হয়না। তুমি তো আস্ত একটা নিরামিষ!”
___”আপনাকে কে বলল আমি নিরামিষ না আমিষ? প্রতিবার স্টিফেনের সাথে দেখা করতে গিয়ে আমাদের মাঝে যা কিছু হয়, সেসব কি আপনি এসে দেখে গিয়েছেন? আর আমি আমিষ হই বা নিরামিষ, স্টিফেন আমার জন্য কতটুকু পাগল তা নিয়ে আপনার নূন্যতম ধারণা আছে?”
___”এক সেকেন্ড, এক সেকেন্ড, তোমাদের মাঝে কি হয়?”
___”যাই হোক না কেনো, তা আপনাকে কেনো বলতে হবে? মাঝরাতে আপনাকে অহেতুক সময় দিচ্ছি, এটাই কি যথেষ্ট নয়?”
___”এতো ভাব না দেখিয়ে সরাসরি বললেই তো হয়। তোমার গার্লফ্রেন্ডকে তুমি চুমু খেলেও বা আমার কি?”
___”এক্স্যাক্টলি মাই পয়েন্ট! আমি আমার গার্লফ্রেন্ডকে চুমু খাবো নাকি তাকে নিয়ে রুমডেটে যাবো—দ্যাট’স এনটায়ারলি মাই পার্সোনাল ম্যাটার, ইজন্ট ইট?”
___”হোয়াট দ্য হেল! রুম ডেট মানে?”
___”হাউ স্ট্রেঞ্জ, হোয়াই আর ইউ সো সারপ্রাইজড? আ রুম ডেট ইজ আ কমপ্লিটলি নরমাল থিং ইন আ রিলেশনশিপ। হোয়াই, ডোন্ট ইউ নো দ্যাট?”
সারাদিনের ব্যস্ততা আর ক্লান্তির পর, মাঝরাতে কাজের ফাঁকে এমন একটা অদ্ভুত কাজকর্মে নিজেকে লিপ্ত হতে দেখে, কেনীথের না চাইতেও বিষয়টায় খানিক বিরক্তিবোধ ও একইসাথে হাস্যকরও ঠেকছে। এক পাগলীর চক্করে পড়ে না জানি আরো কি কি করতে হবে। তবুও সে নিজের ধৈর্য মেপে, অফিশিয়াল কাজগুলো শেষ করার পাশাপাশি আনায়ার মেসেজগুলোরও লাগাতার উত্তর দিতে থাকল।
ওদিকে আনায়া যে বিস্ময়ে হতভম্বে কূলকিনারা হারিয়েছে, সে-ও আর বুঝতে বাকি নেই। প্রায় বেশ কিছুক্ষণ আর কোনো নতুন মেসেজ এলো না। কেনীথও ফোনটা সাইডে রেখে কাজের ব্যস্ততায় ডুবল। প্রায় মিনিট দশেক পর হুট করে রমণীর একখান নতুন মেসেজের শব্দে কেনীথের ধ্যান হটল। ফোনটা হাতে নিতেই দেখল,
“হাউ ক্যান ইউ বি সো শেমলেস? তুমি কি ভেবেছো, আমায় এসব ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে দূরে সরাবে? যেনো তোমায় আমি বিরক্ত না করি। এটা তো সরাসরি বললেই হতো, এভাবে নিজেকে স্বস্তা প্রমাণের কি প্রয়োজন ছিল?”
মেসেজটা পাঠিয়েই আনায়া নিজের দুহাতে মুখ ঢাকল। তার মনে হলো সে বড্ড বেশি ব্যক্তিগত সীমারেখা লঙ্ঘন করে ফেলেছে। আবার মনে হচ্ছে, ফোনের ভেতর ঢুকে পড়ে লোকটার মাথা ফাটিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু কেনীথ যদি এবার রেগে গিয়ে নম্বরটি ব্লক করে দেয়? ভেবেই সে আবার বিড়বিড় করল,
“দিলে দিক, তাতে আমার কি? আজ নিজের নাম্বার দিয়ে জুলি সেজেছি, কাল নতুন নাম্বার জোগাড় করলে ফুলকলি সাজব।”
অন্যদিকে কেনীথ মেসেজটি দেখে কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। মেয়েটির ভেতরের ঈর্ষা, ক্ষোভ আর অধিকারবোধের প্রচ্ছন্ন প্রকাশ তাকে ক্ষণিকের জন্য অবাক করলেও, সে নিজের ভেতরের রাশভারী গম্ভীর ভাবমূর্তি একচুলও নড়তে দিল না। অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়, বরফশীতল কণ্ঠে উত্তর দিল,
”ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিট,মিস জুলি! নয়তো এক্ষুনি ব্লক করে দেবো।”
যা ভেবেছিল তাই! ঠিকই ব্লকের প্রসঙ্গ তুলল। ওদিকে সময়ও ক্রমশই বেড়ে চলেছে।
ঘড়ির কাঁটা তখন রাত একটা ছুঁইছুঁই। মিউনিখের নিস্তব্ধ রাত আরও গভীর, আরও নির্জন হচ্ছে। কিন্তু এই দুই বিপরীত মেরুর মানুষের মধ্যকার ছদ্মবেশী চ্যাট যেন থামার কোনো লক্ষণই দেখাচ্ছিল না। আনায়া কেনীথের কঠোর আচরণে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ ও হৃদস্পন্দন অনুভব করছিল, আর ওদিকে কেনীথও নিজের সমস্ত গাম্ভীর্য বজায় রেখে, অত্যন্ত মনোযোগের সাথে এই চঞ্চল মেয়েটির ছটফটানি আর অবাধ্যতা উপভোগ করছিল। এভাবেই গভীর রাত অব্দি দুই প্রচ্ছন্ন হৃদয়ের অদ্ভুত এক লুকোচুরি খেলার মধ্য দিয়ে ঘটনাপ্রবাহ সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
____”ওহ রিয়েলি? লিমিট ক্রসের তুমি কী দেখলে মিস্টার ভিভিয়ান? বাই দ্য ওয়ে, তুমি যে মাঝরাতে একটা আননোন মেয়ের সাথে এভাবে চ্যাট করছ, তোমার গার্লফ্রেন্ড জানলে রাগ করবে না? প্রবলেম হবে না তোমার?
____”নোপ, নট অ্যাট অল। এদেশের মেয়েরা এসব ছোটখাটো বিষয়ে এতটা মাথা ঘামায় না। আপনিও তো এদেশেরই, সো আপনার তো এটা অলরেডি জানার কথা। আর আমি যদি চার-পাঁচটা মেয়ে নিয়েও একসাথে ঘুরি, তাও স্টিফেন আমায় কিছু বলবে না।!
ফোনের স্ক্রিন দেখে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল আনায়ার। মনে মনে ভাবল—হোয়াট দ্য হেল! এসব কী বলছে এই লোক? চার-পাঁচটা মেয়ে? সে নিজের কৌতূহল আর চেপে রাখতে পারল না।
___”ওয়েট, ওয়েট! এই মুহূর্তে তোমার গার্লফ্রেন্ড একচুয়ালি কতগুলো?
কেনীথের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শয়তানি হাসি ফুটে উঠল,
___”আপাতত তো শুধু স্টিফেনের সাথেই সিরিয়াস রিলেশনে আছি। যদি কখনো আমাদের ব্রেকআপ হয়ে যায়, তখন অন্য কেউ আসবে। তাছাড়া এমনিতে চার-পাঁচটা জাস্ট ফ্রেন্ড আছে আরকি!”
আনায়ার এবার সত্যিই মাথা ঘুরে পড়ার উপক্রম। ঈর্ষা আর বিস্ময়ে কাঁপাকাঁপা আঙুলে সে দ্রুত টাইপ করল,
___”জাস্ট ফ্রেন্ড? ওরা কি ছেলে না মেয়ে?
___”অবশ্যই মেয়ে! আই অ্যাম নট গে (Gay)
মেসেজটা দেখামাত্রই আনায়ার চোয়াল হা হয়ে গেল। চোখ-মুখ কুঁচকে সে মনে মনে আওড়াতে লাগল—
“গাই? আশ্চর্য! আমি কখন ওনাকে গাই-গরু বলতে গেলাম? ওহ শিট, শিট! ওটা গে (Gay)! মানে ছেলে ছেলে…আস্তাগফিরুল্লাহ! তওবা, তওবা! বড় আম্মু, তোমার ছেলে তো শেষ! পুরো ধ্বংস হয়ে গেছে এই বান্দা!”
আনায়া নিজেকে দ্রুততর সামলে নিয়ে টাইপ করল,
___”ওহ, আই সি! তা মিস্টার ভিভিয়ান, ওই চার-পাঁচটা জাস্ট ফ্রেন্ডের সাথেও কি মাঝরাতে এমন চ্যাট চলে? নাকি শুধু জুলিই এই স্পেশাল প্রিভিলেজটা পাচ্ছে?
___”ডিপেন্ডস…! কখনো কখনো ওদের সাথে ইম্পর্টেন্ট টপিকে কথা হয়। তবে আপনার মতো এত উইয়ার্ড কোশ্চেন বোধহয় কেউ করে না। সো এক দিক থেকে নিজেকে স্পেশাল চ্যাপ্টার ভাবতেই পারেন।”
আনায়া চোখ-মুখ বিরক্তিতে কুঁচকে ফেলল। মাথা ভনভন করছে তার। লোকটা এতোটা বিগড়ে গেছে? চার-পাঁচটা মেয়ে জাস্ট ফ্রেন্ড নিয়েও ঘুরে বেড়াচ্ছে? বাহ্ কি চমৎকার ব্যাপার স্যাপার।
মনে মনে একগাদা তিক্ত বাণী আওড়িয়ে আনায়া লিখল,
___”ওহ, তাই নাকি? ভালোই তো আলুর মতো সব তরকারির সাথে মিশে যান। আপনার যে এতো ভালো গুণ আছে, আমি তো আজ আপনার সাথে কথা না বললে কখনো জানতেও পারতাম না।”
কেনীথ তার এহেন রিপ্লাই দেখে আর না হেসে পারল না। বেচারী টোপ দিতে এসে নিজেই টোপে ফেঁসে গিয়েছে। তুমি থেকে সোজা আপনি’তে কনভার্ট হতেও বেশিক্ষণ লাগল না। যাক, একদিক থেকে বিষয়টা ভালোই হচ্ছে। আনায়া তার উপর যতটা পারুক রাগ করুক, যতটা পারুক ঘৃণা করুন—দিন শেষে বোধহয় এটা এই অবাধ্য মেয়েটার জন্যই মঙ্গলজনক।
এদিকে আনায়া ফুঁসতে ফুঁসতে আবারও লিখল,
___”তা ওই চার-পাঁচটা গার্ল-ফ্রেন্ড নাকি জাস্ট ফ্রেন্ড… গুলো কি আপনার এই টাফ এন্ড রাফ বিহেভিয়ার দেখেই ক্রাশ খেয়েছে? নাকি আপনি তাদের সামনে অন্য কোনো রূপ দেখান,যেটা আমার কাছে দেখাতে আপনার কষ্ট হচ্ছে, হাহ?”
___”……….”
___”কি হলো, আবারও চুপ করে গেলেন কেনো?চাইলে সত্যিটা বলতেই পারেন, আপনার ডজন ডজন গার্লফ্রেন্ড থাকলেও আমার কোনো সমস্যা নেই। অবশ্য থাকবেই বা কেনো? আমার নিজেরই তো তিনটে বফ আছে। এটাই তো স্বাভাবিক তাই না?”
ক্রোধের তোপে চোখের সামনে থাকা তিনটে রেড-কে নিজের তিনটে বয়ফ্রেন্ড বানিয়ে, চারটে বানোয়াট কথাবার্তা বলতেও আনায়া নূন্যতম দ্বিধা করল না৷ অন্যপ্রান্তে কেনীথ এটা দেখে তাচ্ছিল্যের সাথে কিঞ্চিৎ না হেসেও পারল না। বিদ্রুপের সাথে বিড়বিড় করল,
“গ্রেইট! একটাই তার জুটছে না, আবার নাকি তিনটে বফ?
___” আবারও গায়েব হলেন? আশ্চর্য, কত অদ্ভুত মানুষ আপনি। মেসেজ সিন করেও রিপ্লাই দিচ্ছেন না! আপনার বিহেভিয়ার এতো রুড কেনো, বলেন তো?”
আনায়া বিরক্তি নিয়ে ফোনটা এবার আছড়ে ফেলবে। মনের মধ্যে একরাশ ক্রোধ নিয়ে আওড়িয়ে যাচ্ছে,
“অমানুষ একটা! অসভ্যটা একদিন আমায় মেরেই ফেলবে।”
এরিমধ্যে হঠাৎ আনায়ার প্রত্যাশায় আরেকটু বিরক্তি ঢেলে দিতে এতক্ষণ বাদে রিপ্লাই এলো,
___”বিহেভিয়ার রুড মনে হলে হতেই পারে,বাট ইটস জাস্ট মাই পারসোনালিটি। আর ক্রাশ খাওয়াটা যার-তার পার্সোনাল চয়েস, এখানে আমার কোনো হাত নেই।”
___”আরেহ্ বাহ, ব্যাপারটা দারুণ তো!আপনি তো দেখছি উন্নতমানের আলু৷ যখন যে ক্রাশ খাবে, আসবে-যাবে, তার সাথেই মিশে যাবেন? কঠিন পারসোনালিটি আপনার। তা করবেন নাকি আমার সাথে একটু ইটিশ-পিটিশ? প্রমিজ করছি, আপনার ঐ ডজন খানেক গফ-জফের থেকেও বেটার ফিল করাব; একদম কঢ়াহ্!”
মেসেজখানা দেখেই কেনীথের চোখদুটো অত্যাধিকমাত্রায় সরু হয়ে গেলো। এবার যেন হিসেবটা একটু হলেও মিলেছে। তার জানা মনে আনায়া’র কখনোই ততটাও শান্তশিষ্ট, ভদ্রনিষ্ঠ হওয়ার কথা ছিল না যতটা সে গতবছর প্রথমবার পূর্ণাঙ্গ প্রাপ্তবয়স্ক রূপে মেয়েটাকে দেখেছিল। মেয়েটার অত্যধিক পরিমাণে ভদ্রতা দেখে সে নিজেও নিজেকে দুবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল এই ভেবে যে—আসলেই এটা তার আনায়া কিনা।
কিন্তু এখন আর বুঝতে বাকি নেই, আনায়া আজও তাই রয়েছে যেমনটা তাকে সে একদম ছোট্ট বেলায় দেখেছিল। কিন্তু আপাতত ভিন্ন ইঙ্গিতে ছোঁড়া মেসেজটা দেখে তার কন্ঠস্বর হতে কেবল একটাই বাক্য নির্গত হলো,
“অতিরিক্ত পেকে গেছে।”
কেনীথ একবাক্যে রিপ্লাই দিল,
“আই অ্যাম নট ইন্টারেস্টেড!”
আনায়া তৎক্ষনাৎ দাঁত কিড়মিড়িয়ে লিখল,
___”ওহ গড! আপনার এই মেল ইগো তো একদম আকাশ ছোঁয়া! কখন মহাকাশ ছুঁয়ে ফেলে, তারই অপেক্ষায় আছি।
আচ্ছা, একটা চ্যালেঞ্জ নেবেন? কাল যদি সামনাসামনি কোনো মেয়ে এসে আপনাকে প্রপোজ করে, আপনি কি তাকেও এই ত্যাড়া ভাবে ‘আই অ্যাম নট ইন্টারেস্টেড’ বলে তাড়িয়ে দেবেন?”
___”অবশ্যই, যদি সে আপনার মতো উইয়ার্ড টাইপ হয়, তবে এক সেকেন্ডও ওয়েস্ট করব না।”
আনায়া বিছানা থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠল। আদতে রাগটা তার কিসের জন্য তা বোধহয় সে নিজেও জানেনা। নিজেকে জুলি বলে দাবী করলেও, অপমানগুলো যেন তার নিজের গায়ে কিংবা আনায়া সত্তাতেই লাগছে। আনায়া রাগে ফুসতে ফুসতে লিখল,
“হেই! তুমি আমাকে উইয়ার্ড বললে? তুমি তো আমাকে দেখোইনি! আমি দেখতে কতটা কিউট আর এলিগেন্ট, তোমার তো কোনো আইডিয়াই নেই! দেখলে ওই স্টিফেন-টিফেন সব ভুলে যাবে, হুহ!
___”আই ডাউট দ্যাট।”
___”মানে? মানে? তোমার কি মনে হয় আমি সুন্দর না?”
___” যে মেয়ে মাঝরাতে বেগানা পুরুষকে মেসেজ দিয়ে বিরক্ত করে, তার কিউটনেস নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তাই ঢাক-ঢোল পিটিয়ে নিজের প্রশংসা করা বন্ধ করুন।”
___”অসভ্য লোক! আপনি একটা আস্ত বজ্জাত! জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ, কোনোদিন যদি সামনাসামনি দেখা হয়, এই কথার জন্য আপনাকে রিগ্রেট করাব আমি!
___”আই অ্যাম ওয়েটিং ফর দ্যাট ডে, মিস জুলি দ্যা আইসললি। আপাতত অনেক রাত হয়েছে, সো স্টপ ইয়োর ইমাজিনেশন অ্যান্ড গো টু স্লিপ।
___”ওকে ফাইন, যাচ্ছি আমি। আপনার ওই চার-পাঁচটা জাস্ট ফ্রেন্ড আর স্টিফেনকে নিয়ে সুখে থাকুন! গুড নাইট, মিস্টার অ্যারোগ্যান্ট, বজ্জাত, খাট্টাস, জার্মান হিটলার!”
একগাদা গালি উগড়ে দিয়েই আনায়া ফোনটা হাতের মুঠোয় চেপে ধরল। এই তুষারঝরা রাতেও তার শরীর থেকে যেন ফুটন্ত আগ্নেয়গিরির উত্তাপ বের হচ্ছে। সেই রাগটা মাথায় চড়ল কেনীথের শেষ মেসেজটা দেখে,
___”গুড নাইট।”
দুটো শব্দ লিখেই সে অফলাইনে চলে গিয়েছে। আনায়া হাত-পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে দাঁত কিড়মিড়িয়ে ফুঁসতে লাগল,
“জানোয়ার একটা! বলে কিনা গার্লফ্রেন্ড আছে, জাস্টফ্রেন্ড আছে চারপাঁচটা। তাহলে আমি কি, হ্যাঁ? আমি কেনো এতো খেটে মরছি? উনি ভেবেছেন টা কি? এসব করে পাড় পেয়ে যাবে? শুরুতে একজনের জন্য দিওয়ানা ছিল, ব্রেকআপ হয়েছে কাহিনি শেষ। তখন বয়স কম ছিল বলে, নিজেকে বুঝ দিয়ে মেনে নিয়েছে; মাফ করে দিয়েছি ওনাকে। তাই বলে এখনো এসব সহ্য করব? একবার যদি জানতে পারি, ওনার এইসব গফ-জফের কাহিনি সব সত্যি! কসম এই জানোয়ারকে মেরে আমি দাফন করে ছাড়ব।”
বলতে বলতেই আনায়া জেদের তোপে কেঁদে ফেলল। মুখটা ধপাস করে বালিশের উপরে থুবড়ে দিয়ে, চিৎপটাং হয়ে শুয়ে পড়ল। চারপাশে হাত-পা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কেঁদে কেঁদে অভিযোগ করতে লাগল,
“খোদা! আমার সাথেই কেন এসব করো? এই জীবনে আমি তোমার কাছে কি এমন চেয়েছি? চেয়েছি কখনো কিছু? শেষকালে একটা বান্দারে চাইলাম অথচ তার সিস্টেমেই তুমি কতশত গড়বড় করে রেখেছো। এভাবে হলে কিভাবে চলবে বলো?
আমার এতো বড় সর্বনাশ কেনো করলে তুমি? একবারও আমার বংশের কথা ভাবলে না? উনি ছাড়া আমার বংশের বাত্তি জ্বালানোর মতো আর কেউ আছে? নেই তো! তাহলে আমার স্বামীটাকে তুমি কেনো এভাবে নষ্ট করে দিলে? মানুষটা পুরোদমে নষ্ট হয়ে গেছে,খোদাআআ! এখন আমি কি করব বলো? কি করবো আমিইইইইইই?”
পরদিন সকাল বেলা। মিউনিখের সমগ্র আকাশমণ্ডল আজ এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ঢেকে আছে। তবুও গতকালের মতো আজ আর ভার্সিটিতে ফাঁকি দেয়নি আনায়া। সে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে,তখনই তার মনের ভেতর এক চাপা উত্তেজনা; আজ তাদের ব্যাচে প্রফেসর ভিকের লেকচার দেওয়ার কথা। গত রাতে ছদ্মবেশ ধারণ করে চটুল সব কথোপকথনের পর আজ সামনাসামনি কেনীথের গম্ভীর মুখাবয়বটি দেখার জন্য আনায়ার মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু ভার্সিটিতে প্রবেশ করতেই তার সেই সমস্ত উদ্দীপনা এক নিমেষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। আজ কেনীথ আসেনি; তার পরিবর্তে অন্য এক বয়োবৃদ্ধ প্রফেসর এসে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং নিদারুণ এক জটিল চ্যাপ্টারের ওপর ক্লাস নিতে শুরু করলেন। সেই ক্লাসের প্রতিটি মুহূর্ত আনায়ার কাছে শতাব্দীর মতো দীর্ঘ এবং অতিমাত্রায় বিরক্ত ঠেকছিল।
লেকচারের একটি শব্দও তার মাথায় ঢুকল না। অগত্যা মন খারাপ করে, তীব্র হতাশা আর ক্লান্তি নিয়ে সে দুপুরের দিকে বাসায় ফিরে এল।
বাসায় ফেরার পর থেকেই কেনীথের ওপর রাগে তার মেজাজ ভনভন করছিল। মনে মনে ভাবল, আজ আর কোনোমতেই ওই গ্যালারির হেডকোয়ার্টারে যাবে না। কিন্তু বিকেলের দিকে নিজের জেদ আর কৌতূহলের কাছে আবারও পরাস্ত হলো সে। মার্জিত একটি পোশাকে তৈরি হয়ে যখন সে বাড়ি থেকে বের হতে যাবে, তখন আইজেল তাকে কিছুটা আড়চোখে পরখ করল। আনায়া অবশ্য বের হওয়ার সময় আইজেলকে উদ্দেশ্য করে বলল, আজ ফিরতে তার কিছুটা দেরি হতে পারে। আইজেল তার এই আচমকা ব্যস্ততায় কিছুটা সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকাল বটে, তবে কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করল না।অতঃপর সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে আনায়া সোজা হেডকোয়ার্টারের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
হেডকোয়ার্টারে পা রাখতেই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা তাকে গ্রাস করল। সে ধীরপায়ে কেনীথের সুপরিসর কেবিনের সম্মুখে এসে দাঁড়াল। কাঁচের দরজার অপরপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ভেতরে তাকাতেই দেখল, কেনীথ নিজের ডেস্কে অত্যন্ত মনোযোগের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। পরনে কালো ফরমাল স্যুট, আর তার ওপর চাপানো ওভারকোট। নতুনত্ব বলতে সুবিন্যস্ত ছাঁটা চুলগুলোতে মার্জিত ও আভিজাত্যের রূপ স্পষ্ট। ঘুরেফিরে চুলগুলোতে নজর পড়তেই যেন, মনের কোণে একরাশ হতাশার সৃষ্টি হয়।
আনায়া আরেকটু খেয়াল করে দেখল, কেনীথ অত্যন্ত গম্ভীর মুখে ফাইলের পাতা ওল্টাচ্ছে আর ক্ষণে ক্ষণে নিজের ডান হাতের আঙুলের ডগায় একটি সিগনেচার-পেন বাজিগরের ন্যায় ঘুরাচ্ছে। আনায়া কোনো প্রকার অনুমতি না নিয়েই শব্দহীন পায়ে কেবিনের ভেতরে প্রবেশ করল। কিন্তু তার এই আকস্মিক উপস্থিতিতেও কেনীথের মাঝে বিন্দুমাত্র কোনো ভাবান্তর লক্ষ্য করা গেল না; সে নিজের কাজেই মগ্ন রইল।
এদিকে আনায়া কোনো কথা না বাড়িয়ে মস্তবড় কেবিনের ভেতরে অত্যন্ত অলস ভঙ্গিতে ঘুরঘুর করতে লাগল। কী করবে, কোথা থেকে শুরু করবে—কিছুই তার মাথায় ঢুকছিল না। আর লোকটার ওই রাশভারী চেহারাটার দিকে তাকালেই গত রাতের সেই বিরক্তিকর, মেজাজ বিগড়ানো চ্যাটিং চ্যাপ্টারের কথা মনে পড়ে তার মেজাজ আরও বিগড়ে যাচ্ছিল।
প্রায় বেশ কিছুক্ষণ সময় এভাবেই এক অস্বস্তিকর নীরবতার মধ্য দিয়ে কেটে গেল। অবশেষে আনায়া এই গুমোট নীরবতাকে ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিল। সে কেনীথের ডেস্ক থেকে কিছুটা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে বিনীত গলায় স্পষ্ট স্বরে বলল,
”আমি কী করব?”
তার কণ্ঠস্বর কানে যেতেই কেনীথ মাত্র এক পলকের জন্য নিজের প্রখর দৃষ্টি জোড়া তুলে আনায়াকে অবলোকন করল, এবং পরক্ষণেই তা নামিয়ে নিল। অত্যন্ত গম্ভীর ঢঙে ফাইলের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে সে নিজের চিরচেনা শীতল গম্ভীর কণ্ঠে জার্মান ভাষায় আওড়াল—
“বিটে স্প্রিশ ডয়েচ!”
(জার্মান ভাষায় কথা বলুন)
আনায়া কেনীথের কথার অন্তর্নিহিত অর্থ এবং তার এই অহেতুক এ্যাটিটিউটের প্রদর্শন দেখে ভেতরে ভেতরে দাঁত কিড়মিড় করে উঠল। মনে মনে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে বিড়বিড় করল—
‘আসছে আমার জার্মান হিটলার!’
ক্ষিপ্ত এই রমণী যেন নিজের অগ্নিদৃষ্টি দিয়েই এই নির্লিপ্ত পুরুষটিকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। তবে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আনায়া নিজেকে যথাসাধ্য সংযত করল। ভ্রু যুগল কুঁচকে, নিজের ভাঙা-চোরা জার্মান ভাষায় কিছুটা ক্ষোভের সাথে শুধাল,
”কিছুই তো বুঝতে পারছি না। একটা দুটো কাজ দিলেও তো পারেন!”
কেনীথ জবাব দিতে বিন্দুমাত্র বিলম্ব করল না। ফাইলের ওপর থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ঢঙে গম্ভীর স্বরে প্রত্যুত্তর করল,
”কিছুই করতে হবে না।”
তার এই কাটকাট জবাবে আনায়া আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। সে নিজের জেদে মুখটা ফুলিয়ে কেবিনের এদিক-সেদিক উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরঘুর করতে লাগল। হঠাৎ করেই কেবিনের এককোণে থাকা কফি মেকারটির দিকে তার নজর পড়ল। সে নিজেকে একটু কাজের মাঝে ব্যস্ত রাখার তাগিদে কর্মব্যস্ত কেনীথের উদ্দেশ্যে বলল,
”কফি খাবেন? বানিয়ে দেব?”
”নাহ!”
অত্যন্ত অবহেলায় এমন একটি রূঢ় জবাব পেয়ে আনায়া নিজের চোখ দুটো সরু করল। মনে মনে আবারও তীব্র ক্ষোভে মুখ ভেঙচিয়ে আওড়াল—
‘নায়্যয়য়য়য়য়! ভাবের স্বামী আমার! সময় আসুক না—কফি কেন, সুযোগ পেলে আমি আপনাকে ডিরেক্ট বিষ খাওয়াবো!’
আনায়া নিজের দুহাত শক্ত করে মুঠো করে, নিজের ভেতরের চাপা রাগ-উত্তেজনা শান্ত করার চেষ্টা করল। সে আবারও এক পা এগিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
”তাহলে আমি খাই?”
কেনীথ এবার আর কোনো প্রত্যুত্তর করার প্রয়োজন বোধ করল না। এমনকি সে আনায়ার দিকে ফিরেও তাকাল না। তার এই মৌনতাকে সম্মতি ধরে নিয়ে আনায়া আর কথা না বাড়িয়ে নিজের মতো করে কফি তৈরিতে মন দিল। কফি বানানোর ফাঁকে ফাঁকে সে আড়চোখে কেনীথের প্রতিটি নড়চড় পরখ করছিল এবং মনে মনে তার উদ্দেশ্যে দুই-চারটে ত্যাছড়া গালিও ঝেড়ে দিচ্ছিল।
সবকিছু শেষে গরম কফির মগটা হাতে নিয়ে সে অত্যন্ত ধীরস্থিরে, আনমনে জানালার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। এরই মধ্যে সে খেয়াল করল, কেনীথ ফাইলগুলো একপাশে সরিয়ে রেখে হুট করেই ব্যাক-চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিয়েছে; কিছুটা বাঁকা হয়ে, অত্যন্ত খেয়ালি মনে নিজের ফোনের স্ক্রিনে মত্ত হয়েছে। তার আঙুলের গতি দেখে স্পষ্ট মনে হচ্ছিল সে কারও সাথে চ্যাট করছে। সত্যিই কি চ্যাট করছে নাকি অন্য কিছু টাইপ করছে?
সে যাই হোক, আনায়া নিজের তথাকথিত সন্দেহকেই অকাট্য সত্য মনে করে, ভাবুক মনে মনে বিড়বিড় করতে লাগল—
‘নিশ্চিত ওই ঢ্যামনীগুলোর সাথে কথা বলছে! ছিহ্, পুরোদমে নষ্ট হয়ে গেছে লোকটা। না জানি আমার কপালে কী আছে! কপাল ভালো থাকলে এতক্ষণে বড়-আব্বুর কাছে গিয়ে এর বিচার দিতাম—কিন্তু আমার তো আবার সেই কপালও নেই।’
আনায়া নিজের মনেই এসব বকবক করতে ব্যস্ত রইল। সে ঠিক কোথায় যাচ্ছে, তার পা দুটো কোন দিকে এগোচ্ছে, সেসবে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। তার আসল উদ্দেশ্য ছিল কেনীথের পাশ কাটিয়ে জানালার দিকে চলে যাওয়া। কিন্তু তার আগেই ঠিক সেটাই ঘটল, যা প্রতিনিয়ত তার এই হতভাগ্য জীবনে হয়ে আসে।
নিজের এক পায়ের সাথে আরেক পা কীভাবে যেন লেগে গেল, আর সে ভারসাম্য হারিয়ে ধপাস করে গরম কফির মগটা নিয়েই সরাসরি কেনীথের ওপর আছড়ে পড়ল। আনায়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা ছিল কোনোমতে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার, কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। কেবিনজুড়ে রমণীর এক আকুল চিৎকার প্রতিধ্বনিত হলো,
”এই নাআআ…আআআ!”
কেনীথ নিজেও হুট করে কিছু বুঝে ওঠার সময় পেল না। কিন্তু পরমুহূর্তেই সে নিজের শরীরের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশে তপ্ত তরলের তীব্র ছোঁয়া অনুভব করল। নিচের দিকে তাকাতেই দেখল, আনায়া তার দুই হাঁটুর মাঝখানের অংশে আছড়ে পড়েছে। তার সিল্কি চুলগুলো সব এলোমেলো হয়ে মুখের ওপর ছড়িয়ে আছে; আর হাতে ধরা কাপটা তীব্র আশঙ্কায় থরথর করে কাঁপছে।
আজও যে এক গণ্ডগোল বাধিয়ে ফেলেছে, তা টের পেতেই আনায়া কাঁপা কাঁপা ও ভীত কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
”স…স..সরি, সরি আমি বুঝতে পারিনি।”
কেনীথ কিছু বলার আগেই আনায়া তটস্থ হয়ে আবারও বলে উঠল,
”কিছু হয়নি, কিছু হয়নি, আমি এখনই মুছে দিচ্ছি।”
একথা বলেই সে কোনো আগপাছ না ভেবে নিজের গলায় জড়ানো স্কার্ফটা সজোরে টেনে নিল। অতঃপর কেনীথের দুই ঊরুর মাঝবরাবর কালো প্যান্টের ভিজে থাকা যথাযথ অংশটার দিকে হাত বাড়াল। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের কাজের গভীরতা ও স্থানকাল অনুধাবন করতেই তার পুরো হুঁশ ফিরে এল। মুহূর্তেই বেখেয়ালী রমণীর চোখ-মুখ শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেল।শুষ্ক ঢোক গিলে সে মাথাটা উঁচিয়ে কেনীথের মুখপানে তাকাতেই তার পুরো দুনিয়াটা যেন ভনভন করে ঘুরে উঠল। সে বুঝতে পারছিল না এই মুহূর্তে তার আসলে কী করা উচিত।
কেনীথের ক্ষিপ্ত ও বরফশীতল চেহারাটার দিকে তাকিয়ে আনায়ার সমগ্র শরীর কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠেছে। লোকটার চোখ দুটো এমন রক্তিম হয়ে আছে, যেন পারলে সে তাকে এখনই জ্যান্ত চিবিয়ে খাবে। এই ভাবনায় সে মনে মনে নিজেকেই শুধালো,
“আচ্ছা, সে কি খুব বড় ভুল করে ফেলেছে নাকি? মনে হয় তা-ই!”
আনায়ার আর বিন্দুমাত্র সাহস হলো না সেখানে স্থির বসে থাকার। সে আড়চোখে আশপাশটা কোনোমতে আঁচ করে নিয়ে, আর কোনো কিছুর পরিণতি না ভেবে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। পুরোপুরি সোজা হয়ে না উঠেই সে হাত-পা গুটিয়ে তীব্র গতিতে দৌড়ে পালানোর পরিকল্পনা সাজিয়ে ছুটতে গেল।
কিন্তু তার আগেই পেছন থেকে কেনীথের বলিষ্ঠ হাতখানা খপ করে তার একটি পা টেনে ধরল। পালাতে চাওয়া আনায়া ভারসাম্য হারিয়ে আবারও দুড়ুম করে ফ্লোরে আছড়ে পড়ল। কিন্তু কেনীথ তার পায়ের ওপর থেকে নিজের শক্ত গ্রিপ বিন্দুমাত্র আলগা করল না। বরং অত্যন্ত ত্যক্ত ও গম্ভীর স্বরে বাক্য ছুড়ল,
”পালাচ্ছিস কোথায়?”
আনায়া মুখটা ফিরিয়ে নিজের পা-টা কেনীথের লোহার মতো শক্ত কব্জায় বন্দি দেখে চরম ভয়ে শুষ্ক ঢোক গিলল। কিন্তু তার চেয়েও বেশি অবাক হলো পাষণ্ড পুরুষের অভিব্যক্তিতে। আজ হঠাৎ খাঁটি বাংলায় ‘তুই’ সম্মোধন? এতোমাস পর বোধহয় লোকটা তার সাথে স্বাভাবিক সম্পর্কের ঢঙে দুটো কথা বলল। অথচ তাও এমন এক মূহুর্তে? এই ভাবনায় খুশি হবে না কেনীথের ভাবগতিক দেখে ভয়ে কুঁকড়ে যাবে—তা সে কোনোমতেই বুঝতে পারছেনা।
আনায়া ফ্লোরের উপর নিজের দুহাতে ভর দিয়ে কিছুটা পেছানোর চেষ্টা করতেই, কেনীথ আচমকা তার পা ধরে আরেকটু সজোরে নিজের দিকে টান দিল। সে তার বা’ভ্রু উঁচিয়ে কিঞ্চিৎ তাচ্ছিল্যের ইঙ্গিত করতেই, আনায়া ভিজে থাকা অংশটার দিকে একঝলক দেখে নিয়ে, কাঁদো কাঁদো গলায় মিনতির সুরে আওড়াল,
মহামায়া পর্ব ৪৩
”বিশ্বাসের করুন, আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি। আমি কেন ইচ্ছে করে করব বলুন? যা আপনার তা তো আমারও, তাই না? আর নিজের জিনিসের ক্ষতি কি কেউ কখনো ইচ্ছে করে করে, বলুন?”
