রুপুর বিয়ে পর্ব ৩৬
Bobita Ray
প্রাপ্তবয়স্ক একজন যুবক কাঁদতে কাঁদতে পুরো হাসপাতাল জুড়ে পাগলের মতো ছোটাছুটি করছে। দৃশ্যটা ডাক্তার নার্স থেকে শুরু করে প্রতিটা রোগীর সাথে আসা মানুষের নজর কাড়ল। সবাই খুব উৎকণ্ঠা কৌতূহল নিয়ে বিনয়কে দেখছে। কেউ কেউ ডেকে জিজ্ঞেসও করছে৷ কী হয়েছে আপনার? বিনয় কাউকেই কিছু বলছে না। চোখের জল মুছতে মুছতে ক্রমাগত কাকে যেন ফোন করছে। হাসপাতালের বাইরে ঔষধের দোকান। বিধান বাবু ঔষধ আনতে গিয়েছিল। বিনয় বাবাকে দেখে ছুটে এলো। চোখের জল মুছে বলল,
“মা এখন কেমন আছে বাবা?”
বিধানবাবুর চোখ-মুখ শুকনো। দেখে মনে হচ্ছে প্রচুর ভয় পেয়েছে। অল্পের জন্য অনেক বড় বিপদ কেটে গেছে দেখে, এখন একটু স্বস্তিবোধ করছে। বিনয়ের মাথায় হাত রেখে ভরসা দিয়ে বলল,
“তোর মা এখন ভালো আছে। চল আমার সাথে। তোকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে আছে।”
বিনয় দু’হাতে মুখ ঢেকে বিড়বিড় করে বলল,
“আমি মায়ের সামনে কোন মুখে যাব বাবা। আমি ভাবতেই পারছি না। আমার জন্য মা..
“ অযথা নিজেকে দোষারোপ করিস না বিনয়। অসুখ-বিসুখ তো আর বলেকয়ে হয় না।”
“আমার চিন্তায়ই তো মা মিনি স্ট্রোক করেছে। আজ আমার কারণে মায়ের যদি বড় ধরনের কোনকিছু হয়ে যেত। আমি কখনো নিজেকে ক্ষমা করতে পারতাম না বাবা।”
বিধান বাবু বুকচিরে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বিনয় কেবিনের সামনে গিয়ে দেখল, মায়ের মুখে অক্সিজেন মাক্স। হাতে স্যালাইন চলছে। মাকে এই অবস্থায় দেখে, বিনয়ের বুকের পাঁজর ভেঙে এলো। বিনয়কে দেখে, বীথি রানীর চোখে জল এসে গেল। ঠোঁটের কোণে হাসি লেগে রইল। ইশারায় বিনয়কে কাছে ডাকল। বিনয় গুটিগুটি পায়ে মায়ের কাছে এসে দাঁড়াল। বীথি রানী বিনয়ের দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দিল। বিনয় মায়ের হাত মুঠো করে ধরল। চোখদুটো ছলছল করছে। মনটা খুব নাজুক হয়ে আছে।
বিনয়ের ছোট মাসি বিনয়ের কাঁধে হাত রাখল। নিচু কণ্ঠে বলল,
“তুই কেমন ছেলে বিনয়। তুই তো জানিস। তোকে না দেখলে আমার দিদিটা একদণ্ড শান্তি পায় না। সারাক্ষণ চিন্তায় অস্থির হয়ে থাকে। সেই তুই তোর মাকে কিছু না বলে অতদূরে চলে গেলি। একবারও আমার দিদির কথা ভাবলি না। তোর জন্য যদি আমার দিদির কিছু হয়ে যেত।”
বিনয়ের মুখটা শুকিয়ে গেল। ভয় পাওয়া কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলল,
“কিচ্ছু হবে না মায়ের। কিচ্ছু হবে না।”
বাইরে ঝুমবৃষ্টি। রুপু রাতদুপুরে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছাদে একা একা দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে। তখন বিনয় যেভাবে হুড়মুড় করে চলে গেল। রুপুর উচিত ছিল বিনয়কে ফোন করে জিজ্ঞেস করা। ঠিকমতো বাড়িতে পৌঁছেছে কি-না। রুপু ভুলেও ফোন করে জিজ্ঞেস করেনি। বরং বিনয়ের আজকের ব্যবহারে কঠিন সিদ্ধান্ত রুপু খুব সহজেই নিতে পারবে বলে মনে হচ্ছে৷ বিনয় যেভাবে আজ চলে গেল। রুপুর জায়গায় অন্যকোন মেয়ে হলে, কী করত? অতি দুঃখে কেঁদেকেটে অস্থির হয়ে যেত। রাতে ভাত খেত না। সারারাত ছটফট করতো। ঠিকমতো ঘুমাতে পারত না। আর সবচেয়ে বেশি যে কাজটা করতো। তা হলো, বিনয়কে পাগলের মতো অজস্রবার ফোন করতো। বিনয় ঠিকমতো বাড়িতে না পৌঁছানো পর্যন্ত একদণ্ড শান্তি পেত না। অথচ রুপু করেছে সম্পূর্ণ বিপরীত কাণ্ড। বিনয় চলে যাওয়ার পর রুপু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভাত খেতে বসেছে। এবং তৃপ্তি করে ভরপেট ভাত খেয়েছে। তারপর নীল শাড়ি পরে হালকা সাজগোছ করে এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছাদে চলে এসেছে। একা একা বৃষ্টিবিলাস করতে বেশ লাগছে। আষাঢ়ে বৃষ্টি। ফোঁটাগুলো বড় বড়। বেশ গায়ে লাগছে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে রুপুর কাঁপুনি ধরে গেল। একটু ভয় ভয়ও করছে বৈকি।
ভেজা শাড়ি পাল্টে বিছানায় যেতেই রুপুর গা কাঁপিয়ে জ্বর এসে গেল। এত জ্বর শেষ কবে হয়েছিল। রুপুর মনে পড়ছে না। জ্বরের ঔষধ ঘরেই আছে। কিন্তু কোথায় আছে। এইমুহূর্তে রুপুর মনে পড়ছে না। শরীর ছেড়ে দিয়েছে। বিছানা থেকে উঠে ঔষধ খুঁজে খাওয়ার মতো বিন্দুমাত্র শক্তি শরীরে নেই। রুপু পায়ের কাছ থেকে কাঁথা কুড়িয়ে নিয়ে গা ঢাকল। শীত কমছে না। শরীর থরথর করে কাঁপছে৷ দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। জ্বরের ঘোরে আপনমনে মায়ের সাথে বিড়বিড় করে কথা বলতে বলতে রুপু অচেতন হয়ে পড়ল।
চোখে কড়া আলো এসে লাগছে। এখন রাত না দিন। রুপু ঠাহর করতে পারছে না। তবে আগের মতো জ্বর নেই। মাথা ঠাণ্ডা। বেশ আরাম লাগছে। রুপু আবারও পিটপিট করে তাকাল। ঠাম্মি রুপুর মাথার কাছে চিন্তিতমুখে বসে আছে। মিনতিদি রুপুর মাথায় একমনে জল ঢালছে। ঠাম্মি বলল,
“এত জ্বর কীভাবে বাঁধালে রুপু?”
“এখন রাত না সকাল ঠাম্মি?”
“সকাল দশটার উপরে বাজে।”
রুপুর চোখদুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। তড়িঘড়ি করে উঠতে গিয়ে মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। ঠাম্মি বলল,
“কী করছ কী? শুয়ে থাকো।”
“আমাকে এখুনি অফিসে যেতে হবে ঠাম্মি। ইশ, এতক্ষণে বোধহয় ক্লাস শুরু হয়ে গেছে।”
“এখন যাওয়ার দরকার নেই। শরীর আরেকটু সুস্থ হোক। তারপরে নাহয় ছুটি নিয়ে এসো। আমি অবশ্য তোমাদের বড় স্যারকে তোমার শরীর খারাপ বলেছি।”
এই মানুষটা এত ভালো কেন? পরিবার পরিজন ছেড়ে আসার পরে এইমাত্র এই মানুষটা রুপুকে আগলে রেখেছে। এখন পর্যন্ত রুপুর অতীত নিয়ে রুপুকে কটুকথা শোনায়নি। কৃতজ্ঞতায় রুপুর মাথা নুয়ে গেল। তবে নিজের আবেগ মোটেও প্রকাশ করল না রুপু। ঠাম্মির একহাত নিজের কপালে রেখে হাসিমুখে বলল,
“দেখুন ঠাম্মি। আমার গা একদম ঠাণ্ডা৷ এখন জ্বর নেই। অযথা ঘরে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না।”
ঠাম্মি হতাশ হয়ে বলল,
“তুমি যখন একবার মনস্থির করেছ তুমি যাবে। তাহলে তুমি যাবেই। কোনভাবেই তোমাকে আটকে রাখা যাবে না। বেশ যাও। তবে যাওয়ার আগে কিছু মুখে দিয়ে জ্বরের ঔষধ খেয়ে তারপর যাও।”
রুপু ইশারায় মিনতিদিকে ভেজা মাথা মুছিয়ে দিতে বলল।
রুপুর মুখ তেতো বিষ। কোনমতে আধখানা রুটি ছিঁড়ে মুখে দিয়ে জল দিয়ে গিলে খেল। জলটুকুও পানসে লাগছে।
তারপর রেডি হয়ে তড়িঘড়ি করে অফিসে চলে গেল। রুপুকে দেখে হাবিব এগিয়ে এলো। বলল,
“ম্যাডাম বড় স্যার আপনাকে ডাকে। অফিস রুমে বসে আছে। দেখা করে তারপর ক্লাসে যান।”
রুপু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“স্যার আসব?”
“আসুন।”
রুপু ঘরে প্রবেশ করতেই ঈশান ইশারায় রুপুকে সামনের চেয়ারে বসতে বলল। রুপু বসল। ঈশান বলল,
“এখন কী সুস্থবোধ করছেন?”
“জি।”
“অবশ্য অসুস্থ হলেও আমি নিজে থেকে আপনাকে কখনো ছুটি নিতে বলব না। কারণ এখানে এক্সট্রা কোন স্যার নেই। একজন ছুটি নিলে তার পরিবর্তে আমাকেই ক্লাস নিতে হবে। ক্লাস নিলে আমি নিজের কাজকর্ম করব কখন! এতক্ষণ প্রফেশনালি কথাবার্তা বললাম। দয়া করে আপনি কিছু মনে করবেন না। এখন সম্পূর্ণ অন্য টপিকে কিছু কথা বলি। রুপু শুনুন, মফস্বল হলেও এখানে গ্রাম্য একটা ভাইব আছে। এখানে কিছু ঘটার থেকে কিছু রটে তাড়াতাড়ি। ব্যক্তি আপনি অবশ্যই স্বাধীন। তবে আমার অনুরোধ থাকবে।”
ঈশানের পুরো কথাটা শেষ হওয়ার আগেই রুপু বলল,
“আমি বুঝতে পেরেছি স্যার। আপনি কী বলতে চাচ্ছেন। তবে যাকে নিয়ে রটনা রটার কথা বলছেন। তাকে নিয়ে রটনা রটার আপাতত কোনরকম সম্ভাবনা নেই। নিশ্চিন্ত থাকুন। কারণ সেই ব্যক্তি এখনো আমার হাজবেন্ড। তবে অফিস ছুটির পরে অফিসের একটা কক্ষ কিছু সময়ের জন্য ব্যবহার করার জন্য আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।”
ঈশান প্রচণ্ড অবাক হয়েছে। রুপু বিবাহিত? ঈশানের সত্যিই জানা ছিল না। তবে ঈশান চমৎকার ভাবে নিজেকে সামলে নিল। কোনভাবেই রুপুকে বুঝতে দিল না। ও যে অবাক হয়েছে। তবে রুপুর ব্যাপারে একটু হলেও ঈশানের কৌতূহল বেড়ে গেল। ঈশান বলল,
“ঠিকাছে আপনি এখন ক্লাসে যান।”
তিনদিন পর বীথি রানীকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। এই তিনদিন বিনয় ভুলেও মায়ের চোখের আড়াল হয়নি। বিনয় বাথরুমে গেলেও বীথি রানী অস্থির হয়ে যায়। আতঙ্কিত বোধ করে। ব্যাকুল হয়ে বিনয়কে ডাকে। ডাক্তার বলে দিয়েছে। বীথি রানীকে কোনভাবেই দুশ্চিন্তায় রাখা যাবে না। এক ভুল বিনয় আর দ্বিতীয়বার করেনি। তবে রুপুর উপর বিনয়ের এক আকাশ পরিমাণ অভিমান জমে আছে। সেদিন বিনয় অতরাতে চলে আসার পর রুপুর কী উচিত ছিল না। বিনয়কে এক মিনিটের জন্য হলেও ফোন করে জিজ্ঞেস করা। তুমি এখন কোথায়? এত তাড়াহুড়ো করে চলে গেল কেন? বাড়ির সবাই ভালো আছে তো? ভালোভাবে পৌঁছেছ? না.. জেদি নিষ্ঠুর নির্দয় মেয়েটা ভুলেও বিনয়কে ফোন করেনি। এত জেদ কেন ওর? থাকুক ও ওর ইগো নিয়ে। এখন থেকে বিনয়ও নিজের মতো থাকবে। নিজের মতো থাকব বললেই কী আর থাকা যায়? জেদি মেয়েটা বিনয়ের মস্তিষ্ক জুড়ে আছে। কোনভাবেই রুপুকে মাথা থেকে সরানো যাচ্ছে না। যে বিনয়ের ভালোবাসা বুঝে না। তাকে কেন ভালোবেসে কষ্ট পাবে বিনয়? রাগে, জেদে, দুঃখে যতই মুখে বলুক, রুপুকে ভালোবাসব না। অথচ মন-প্রাণ উজার করে আজও রুপুকেই ভালোবাসে বিনয়। পাগলের মতো ভালোবাসে। যতদিন যাচ্ছে। ভালোবাসা ততই যেন গাঢ় হচ্ছে।
“বিনয় বিনয় রে কোথায় গেলি বাবা?”
রুপুর কথা ভাবতে ভাবতে বিনয় অন্যএক ভুবনে চলে গিয়েছিল। মায়ের ডাকে হুঁশ ফিরল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আসছি মা।”
মায়ের মাথার কাছে গিয়ে বিনয় বসল। বীথি রানী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বিনয়ের পিঠে স্নেহের হাত রাখল। বলল
“তোর বউ কী বলল? এই সংসারে ফিরে আসবে না?”
“রুপুর কথা এখন থাকুক মা।”
“থাকবে কেন? শুনি তোর বউয়ের কথা।”
“ও চাকরি করছে। চাকরি ফেলে এখানে আসা সম্ভব না। তবে ছুটিছাটা পেলে অবশ্যই আসবে মা।”
“এভাবে কী সংসার হয়, তুই বল বাবা? আমি একজন অসুস্থ মানুষ। তোর বউও বাড়িতে নেই। আমার এত কষ্টে তিলে তিলে গড়া সংসারের হাল ধরবে কে? তাছাড়া তুই এক জায়গায় তোর বউ আরেক জায়গায়। এই ব্যাপারটা আমার মোটেও ভালো লাগছে না। একা একা অতদূর তোর বউ কী করছে, কার সাথে মিশছে, কার সঙ্গে থাকছে। কিছুই তো আমরা জানি না।”
“মা রুপু ওখানে ভালোই আছে।”
“সে-তো তোর সামনে। পেছনের খবর তো তুই বা আমি জানি না।”
“মা প্লিজ আমার এখন এই ব্যাপারে কথা বলতে মোটেও ইচ্ছে করছে না।”
“ইচ্ছে না করলেও তোকে তো শুনতে হবে বাবা। আমার অসুখের কথাশুনে কতদূর দুরান্ত থেকে আত্মীয় স্বজন আমাকে দেখতে চলে এলো। অথচ তোর বউ এলো না। সেকি পারতো না। আমাকে দেখতে আসতে। ফোনেও এই পর্যন্ত আমার সাথে ভালোমন্দ একটা কথা বলল না। সবাই শুধু জিজ্ঞেস করে, বিনয়ের বউ কোথায়? বিনয়ের বউ কোথায়? সবাইকে কী আর মিথ্যে বলা যায়। যে শুনছে তোর বউয়ের কিচ্ছা। সেই ছিঃ ছিঃ করছে। কতজনের মুখ বন্ধ করব আমি। আমি এত কথা বুঝি না বাবা। তোর বউকে একমাসের ভেতরে এই বাড়িতে চলে আসতে বল। আর নাহলে তোর ছোটমাসি বিকল্প ব্যবস্থা করবে।”
“মা রুপু এখন কিছুতেই আসবে না।”
“না আসলে আর কী করার। আমি তোকে আবার বিয়ে দেব।”
বিনয় চমকে উঠল। বিস্ফোরিত চোখে মায়ের দিকে তাকাল। অস্ফুট স্বরে বলল,
“অসম্ভব।”
“অসম্ভবের কিছু নেই। তোর দিকে তাকালে আমারই খারাপ লাগে। আমার নিজের ভুলেও জন্য তোর জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেছে। আমি বেঁচে থাকতে তোর জীবনটা গুছিয়ে দিয়ে না গেলে। আমি যে মরেও শান্তি পাব না বাবা।”
কথাগুলো বলতে বলতে বীথি রানী ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। বিনয় ঘাবড়ে গেল। কণ্ঠে অসহায়ত্ব ফুটিয়ে বলল,
“প্লিজ মা কেঁদো না তুমি।”
“তাহলে আমার মাথা ছুঁয়ে কথা দে.. একমাসের মধ্যে তোর বউ ফিরে না আসলে তুই আমার কথা রাখবি।”
“মা প্লিজ.. আমাকে একটু সময় দাও। আমি রুপুর সাথে কথা বলে দেখি। ও কী চায়।”
“লিখে রাখ.. তোর বউ তোর সাথে সংসার করবে না। ও মেয়ের পাখনা গজিয়ে গেছে।”
মায়ের কথাশুনে মনটাই ভেঙে গেল। চোখদুটো ক্রমশই ঝাপসা হয়ে আসছে। রুপুর উপর প্রচণ্ড রাগ লাগছে। চোখের জল লুকানোর জন্য মায়ের কাছ থেকে উঠে চলে গেল বিনয়।
টানা তিনদিন অসুস্থ ছিল রুপু। জ্বর এই আসে এই যায়। তবে পুরোপুরি শরীর ছেড়ে যায় না। আজ একটু সুস্থবোধ করছে। তবে শরীরের দুর্বলতা পুরোপুরি কাটেনি। মুখের তিতকুটে ভাবটা এখন আর নেই। এই তিনদিন ঠাম্মির ওখানেই খাওয়া-দাওয়া করেছে রুপু। ঠাম্মি কোনভাবেই অসুস্থ শরীরে রুপুকে রান্না করতে দেয়নি। আজ ছুটির দিন। ফ্রিজ ফাঁকা। ঘরটাও এলোমেলো হয়ে আছে৷ একগাদা ময়লা কাপড়চোপড় জমে আছে। ঘর গোছাতে হবে। ময়লা কাপড়চোপড় ধুতে হবে। বাজার করতে হবে। রান্না করতে হবে। কত কাজ। অথচ খুব আলসেমি লাগছে৷ কোন কাজ করতে ইচ্ছে করছে না।
ফোন বাজছে। বিনয়ের ফোন। রুপুর ধরতে ইচ্ছে করছে না। ফোনটা বেজে বেজে কেটে গেল। আবার বাজল। আবার কেটে গেল। আবার বাজল। রুপু অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফোনটা রিসিভ করল। হ্যালো বলতেই বিনয় রাগী কণ্ঠে বলল,
“কী করছিলে কী তুমি? আমার ফোন ধরতে এতো দেরি হলো কেন? নাকি ছুটির দিনেও তোমার ক্লাস থাকে। স্পেশাল ক্লাস।”
বিনয়ের কথার ধরনে রুপু হেসে ফেলল। বেশ কড়া কণ্ঠেই জবাব দিল।
“তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছ। আমি যাদের ক্লাস করাই। তারা সবাই মেয়ে। মেয়েদের সাথে আর যাইহোক স্পেশাল ক্লাস করা যায় না।”
বিনয় নিভে গেল। তবে রাগ কমল না। মায়ের রাগ রুপুর সাথে দেখিয়েও তো কোন লাভ নেই। হতচ্ছাড়া রাগটা কোনভাবেই কন্ট্রোল করা যাচ্ছে না। বিনয় কন্ঠে অসহায়ত্ব ফুটিয়ে বলল,
“তুমি প্লিজ বাড়ি ফিরে এসো রুপু।”
“দুঃখিত। সম্ভব না।”
“কেন সম্ভব না?”
“কারণটা তোমাকে এখন আর বলতে ইচ্ছে করছে না।”
বিনয় রুপুকে ভয় দেখানোর জন্য বলল,
“তুমি না আসলে আমি কিন্তু মায়ের পছন্দ করা মেয়েকে সত্যি সত্যিই বিয়ে করে ফেলব।”
রুপু ভয় তো পেলোই না। উল্টো হেসে ফেলল। আমুদে কণ্ঠে বলল,
রুপুর বিয়ে পর্ব ৩৫
“কবে বিয়ে করছ? নেমন্তন্ন করতে ভুলো না কিন্তু। আমাকে ডিভোর্স দিয়ে কী বিয়ে করবে? না বিয়ে করে ডিভোর্স দেবে। আমি অবশ্য তোমার ভালোর জন্য পরামর্শ দিতে পারি। ঝামেলা বিয়ের আগেই চুকিয়ে ফেলা ভালো৷”
বিনয়ের সর্বশরীর রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে জ্বলে গেল। মরা মরা কণ্ঠে বলল,
“তুমি..তুমি খুব নির্দয়, পাষাণ, হৃদয়হীনা একটা মেয়ে রুপু।”
