Home কিস অফ বিট্রেয়াল কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪২

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪২

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪২
লামিয়া রহমান মেঘলা

হিমেল চলে গেলে আজ থেকেই সেরিনের ভার্সিটিতে যাওয়ার কথা। যা কথা তাই কাজ, সকাল সকাল ভার্সিটির জন্য প্রস্তুত হয়ে সেরিন কায়ানের সঙ্গেই বেরিয়ে যায়।
প্রথম দিন ভার্সিটিতে এসে নিজের দু’টো ক্লাস শেষ করে সেরিন এদিক ওদিক একটু ঘুরে দেখল। University of Chittagong বাংলাদেশের আর সব বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় যেন এক অন্যরকম সৌন্দর্যের আধার। এখানে প্রকৃতি নিজের হাতে উদার হয়ে সৌন্দর্য বিলিয়ে দিয়েছে। চারদিকে ঘন সবুজ বন, নিস্তব্ধ জঙ্গল আর দূরে দূরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড় যেন ক্যাম্পাসটাকে এক অপার্থিব আবরণে ঢেকে রেখেছে। পাহাড়ি বাতাসে ভেসে আসা সোঁদা মাটির গন্ধ মনকে অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে। উঁচু গাছের পাতার ফাঁক গলে সূর্যের আলো মাটিতে এসে পড়ে ছায়া আর আলোর মায়াবী নকশা এঁকে। মনে হয়, এখানে জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি প্রকৃতিও নীরবে মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়।
সেরিনের আজ একটি বন্ধু হয়েছে। নাম তার ঐশী। মেয়েটা ভীষণ বেশি কথা বলতে পছন্দ করে। সেরিন তো তেমন একটা কথা বলে না, আর ঐশী যেন কথার ঝর্ণাধারা। তবু দু’জনের মধ্যে অদ্ভুত সুন্দর মিল হয়ে গেছে।

ঐশীর একটি বয়ফ্রেন্ড আছে। মেয়েটার মুখে তার কথাও শুনল সেরিন। দু’জনেরই আজ প্রথম ক্লাস ছিল। তাই তারা দু’জনে চারপাশে নিজেদের মতো করে একটু ঘুরে দেখল। কথায় কথায় ঐশী কায়ানের সম্পর্কেও অনেক কিছু জানল।
ঘড়ির কাঁটায় দুপুর একটা বাজে। আকাশে ধীরে ধীরে কালো মেঘ জমে উঠেছে। দূর আকাশে মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে। বাতাসে বৃষ্টির আগমনী সুর।
সেরিন ঐশীর হাত ধরে বলে,
“এখন চলো, মেঘ করেছে।”
ঐশী বলল,
“হ্যাঁ, ঠিক বলেছো। তোমার বরকে ফোন দিয়েছো?”
সেরিন মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ, উনি এসেছে গেটের সামনে।”
“আচ্ছা।”
দু’জন চলে যায় ভার্সিটির মেইন গেটে। সেখানে কায়ানের গাড়ি দাঁড়িয়ে।
কায়ান গাড়ির পাশে, গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে তার কালো শার্ট আর ফর্মাল কালো প্যান্ট। কালো রঙ যেন তার ব্যক্তিত্বকে আরও গভীর, আরও তীক্ষ্ণ করে তুলেছে। চোখে একজোড়া কালো চশমা, যা তার সুদর্শন মুখশ্রীতে এক রহস্যময় আবেদন এনে দিয়েছে। লম্বা সুঠাম দেহ, প্রশস্ত কাঁধ, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি আর স্থির উপস্থিতি তাকে জনসমুদ্রের মাঝেও আলাদা করে চেনায়। তার মুখে এক অদৃশ্য কঠোরতা থাকলেও সেই কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত আকর্ষণ, যা অনায়াসেই দৃষ্টি আটকে দেয়। তাকে দেখলেই মনে হয়, এই মানুষটি যেন সহজে কারও জন্য থামে না, অথচ যার জন্য থামে তাকে আগলে রাখে সমস্তটা দিয়ে।

সেরিন দূর থেকে তাকিয়ে সমুদ্রপাড়ের সেই দিনের কথা মনে করল। সেদিনও কায়ান ঠিক এমন সাজেই ছিল। কালোর মাঝে মোড়া, নিঃশব্দ অথচ দৃষ্টি কাড়ার মতো উপস্থিতিতে।
সেরিন এগিয়ে যায় কায়ানের দিকে। কায়ান মৃদু হেসে সেরিনকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসে। তারপর খুব স্বাভাবিক যত্নে সেরিনের সিটবেল্ট লাগিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে,
“ভার্সিটির প্রথম দিন কেমন ছিল?”
সেরিন এক্সাইটেড হয়ে আজ সারাদিনে যা যা হয়েছে সব খুলে বলতে শুরু করে। নতুন ক্লাস, নতুন পরিবেশ, ঐশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব, সবকিছু এক নিঃশ্বাসে বলে যায় সে।
কায়ান নীরবে সবটা শুনল। সেরিনের উৎসুক, উচ্ছ্বসিত মুখের দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। মেয়েটা ছোট বাচ্চাদের মতো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে সবকিছু খুলে বলছে তাকে। আর কায়ান সেই আনন্দটুকু নীরবে নিজের ভেতর ধারণ করে শুনে যাচ্ছে।

বাহিরে ঝুম বৃষ্টি। মুষলধারে নেমে আসা বর্ষণ যেন থামার নামই নিচ্ছে না। আকাশ যেন আজ নিজের সমস্ত জমে থাকা ভার একসাথে পৃথিবীর বুকে ঢেলে দিচ্ছে। একটানা বৃষ্টির শব্দে চারদিক কেঁপে উঠছে, মেঘের গর্জন দূর আকাশ থেকে ভেসে এসে প্রকৃতিকে করে তুলছে আরও গভীর, আরও রহস্যময়।
এই অবিরাম বর্ষণের মাঝে একটি মাঠের ধারে কায়ানের গাড়িটি নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। আশেপাশে আপাতত কেউ নেই। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে রাস্তা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চারপাশের পৃথিবী যেন আচমকাই থেমে গেছে। শুধু বৃষ্টি আছে, বাতাস আছে, আর আছে প্রকৃতির উন্মত্ততা।
গাড়ির ভেতরে বসে সেরিন মুগ্ধ চোখে বাহিরের বৃষ্টি দেখছে। এত ঘন বৃষ্টি নেমেছে যে সামনে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। পুরো পৃথিবী যেন সাদা কুয়াশার পর্দায় ঢেকে গেছে। কাঁচের ওপর আছড়ে পড়া বৃষ্টির ফোঁটাগুলো একে অন্যের সঙ্গে মিশে অদ্ভুত সব রেখা আঁকছে। ভেজা মাটির গন্ধ বাতাসে মিশে এক মাদকতা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

হঠাৎ করেই সেরিন অনুভব করল, কায়ানের উষ্ণ নিশ্বাস তার মুখে এসে লাগছে।
মুহূর্তেই তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
সেরিন ফিরে তাকাতেই দু’জনের ওষ্ঠ একে অপরকে ছুঁয়ে গেল। স্পর্শটা এতটাই আকস্মিক, এতটাই অপ্রস্তুত, যে সময় যেন এক পলকের জন্য থমকে দাঁড়াল।
সেরিন স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে পিছিয়ে আসতে চাইল।
কিন্তু কায়ান তাকে সরে যেতে দিল না।
দৃঢ় হাতে তার কোমর জড়িয়ে নিল সে। সেই স্পর্শে ছিল অধিকার, ছিল তীব্রতা, ছিল এক নিঃশব্দ দাবি। এমন এক উপস্থিতি, যাকে অস্বীকার করা কঠিন।
সেরিন আর কিছু বলল না। কোনো বাধাও দিল না।
গাড়ির ভেতরের নীরবতা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠল। বাইরে ঝড়ো বৃষ্টি, ভেতরে জমে থাকা অপ্রকাশিত অনুভূতির ঢেউ। কায়ানের দৃষ্টি ক্রমশ গভীর হয়ে উঠছে, যেন তার চোখের অন্ধকারে লুকিয়ে আছে বহুদিনের দমিয়ে রাখা ঝড়।

ধীরে ধীরে সে সেরিনকে নিজের আয়ত্তে টেনে নিল।
সেরিন চোখ বন্ধ করে রাখল। তার কাঁপা নিশ্বাস, দ্রুত ওঠানামা করা বুক, সবকিছুই বলে দিচ্ছে ভেতরে কতটা আলোড়ন চলছে।
ঠিক তখনই কায়ান হঠাৎ গাড়ির সিটটা নামিয়ে দিল।
আকস্মিক নড়াচড়ায় সেরিন চোখ খুলে তাকাল।
কায়ান তার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে উঠল।
সেই হাসিতে ছিল বিপজ্জনক আকর্ষণ, ছিল অদ্ভুত এক অন্ধকার মায়া। যেন ঝড়ের রাতের মতোই সে, সুন্দর অথচ ভয়ংকর, শান্ত অথচ বিধ্বংসী।
পরক্ষণেই কায়ান সেরিনের উপর ঝুঁকে এলো।
পরম আদরে আকড়ে ধরলো সেরিনের ওষ্ঠদ্বয়।
বাইরে বজ্রপাতের আলো এক মুহূর্তের জন্য গাড়ির ভেতর আলোকিত করে আবার নিভে গেল। আর সেই ক্ষণিক আলোর মতোই তাদের মাঝের দূরত্বটুকুও মিলিয়ে গেল, ডুবে গেল বৃষ্টি, অন্ধকার আর নিঃশব্দ আবেগের গভীরতায়।

এরপর কেটে গেল বেশ কিছু মাস।
কায়ানের অফিসের ব্যস্ততার মাঝেও সেরিনকে নিয়ে তার নতুন বৈবাহিক জীবন বেশ ভালোই কাটছিল। দায়িত্ব আর কাজের অসীম চাপের ভিড়েও সে সর্বোচ্চ চেষ্টা করত সেরিনকে সময় দিতে। দিনের শেষে যত ক্লান্তিই থাকুক না কেন, সেরিনের জন্য তার সময় যেন আলাদা করে বরাদ্দ থাকত। হাজার ব্যস্ততার মাঝেও সে সেরিনকে অবহেলা করেনি কখনও।
অন্যদিকে সেরিনও এখন ভার্সিটির পরিবেশের সঙ্গে বেশ মানিয়ে নিয়েছে। ভার্সিটির বিশাল ক্যাম্পাস, পরিচিত মুখ, পরিচিত পথঘাট সবই এখন তার চেনাজানা হয়ে গেছে।
আহিরের গ্রাজুয়েশনও কিছু মাস আগেই সম্পন্ন হয়েছে।
এখন কায়ান ব্যস্ত থাকলে সেরিন একাই ভার্সিটিতে যাওয়া আসা করে।
সেদিন আবার জারিফ এবং জিনুকেও নিয়ে এসেছিল শিমুল এবং জেবরান। কারণ ওদের মা মেহেরীণ কোথাও চলে গিয়েছে। বিষয়টা প্রথমে মাহমুদের জন্য সহজ ছিল না। তিনি কিছুতেই ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছিলেন না। কিন্তু পরক্ষণেই সবদিক ভেবে চিন্তে জারিফ আর জিনুকে শিমুলের কাছে দত্তক দেওয়া হয়। এখন শিমুলই তাদের আপন মা।

তবে আজকাল কায়ান একটি বিষয় গভীরভাবে লক্ষ করছে।
সেরিন কেমন যেন উদাসীন হয়ে যাচ্ছে।
তার চোখে আগের সেই উজ্জ্বলতা নেই, কথাতেও যেন প্রাণহীন ক্লান্তি। কায়ান কয়েকবার জিজ্ঞেস করেও এর কোনো স্পষ্ট উত্তর পায়নি। সেরিন প্রতিবারই কিছু না কিছু বলে এড়িয়ে গেছে।
আজ কায়ান ঠিক করেছে সেরিনকে একটি সারপ্রাইজ দেবে।
গত দুদিন ধরে সে সেরিনকে আনতে যেতে পারেনি। কাজের চাপে নিজেকেই যেন বন্দি করে রেখেছিল। তাই আজ কোনো পূর্ব খবর না দিয়েই সে সোজা ভার্সিটিতে চলে আসে।
ভার্সিটি ছুটি হয়েছে কিছুক্ষণ আগে।
মেইন গেটের সামনে ঐশীকে একা বের হতে থাকতে দেখে কায়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সেরিনকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
তার মনে অজানা এক অস্বস্তি জন্ম নিল।
সে দ্রুত ঐশীর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
“সেরিন কোথায় ঐশী?”
কায়ানকে দেখে ঐশী থমকে গেল।

তার চোখেমুখে বিস্ময় স্পষ্ট। বোঝাই যাচ্ছে, কায়ানকে এখানে দেখার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না।
সে কাঁপা গলায় বলল,
“ভ ভাইয়া আপনি এখানে?”
কায়ানের কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে উঠল।
“সেরিন কোথায় ঐশী?”
ঐশী স্পষ্টতই নার্ভাস হয়ে পড়েছে।
“স সেরিন তো চলে গিয়েছে। আজ ওর শরীরটা ভালো লাগছিল না।”
কায়ান ভ্রু আরও কুঁচকে তাকাল।
আসার আগে সে আহিরের সঙ্গে কথা বলে এসেছে। সেরিন বাড়িতে যায়নি।
তার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
“মিথ্যা কেন বলছো? সেরিন বাড়িতে যায়নি ঐশী।”
এবার ঐশীর চোখেমুখে ভয় স্পষ্ট হয়ে উঠল।
তার কাঁপতে থাকা শরীর, অস্থির দৃষ্টি সবই বলে দিচ্ছে সে কিছু লুকাচ্ছে।
ঐশীর এই ঘাবড়ে যাওয়া দেখে কায়ানের সন্দেহ আরও গভীর হলো।
পরক্ষণেই সে রাগান্বিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল,
“ঐশী, আই সেইড সেরিন কোথায়, দ্রুত বলো।”
ঐশী প্রায় কেঁদে ফেলার অবস্থায় বলে উঠল,

“ভ ভাইয়া, নীলা ক্যাফেতে গিয়েছে সেরিন। জাকিরের সাথে।”
কায়ানের চোখ সরু হয়ে এলো।
তার কণ্ঠ ভয়ংকর শান্ত।
“জাকির কে?”
ঐশী গিলে নিয়ে উত্তর দিল,
“এমপির ছেলে, জাকির চৌধুরী।”
এক মুহূর্তও দেরি করল না কায়ান।
সে সোজা গাড়িতে উঠে বসে।

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪১

এদিকে ঐশী বারবার সেরিনকে কল করতে লাগল। কিন্তু সেরিন প্রতিবারই কল কেটে দিচ্ছিল।
শেষমেশ অসহায় হয়ে ঐশী হাল ছেড়ে দিল।
মনের ভেতর অজানা ভয় নিয়ে সে ধীরে ধীরে নিজের বাসার পথে রওনা করল।

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here