Home অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ শেষ পর্ব

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ শেষ পর্ব

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ শেষ পর্ব
নুসাইবা ইভানা

জীবন কখনো কারো অনুপস্থিতিতে থেমে থাকে না৷ জীবন বয়ে চলা নদীর মতো চলতে থাকে। ‘নদী এপার ভাঙে, ওপার গড়ে’—এটাই নদীর খেলা। সে কখনো আটকায় না, তাকে আটকানো সম্ভবও না। জীবনও ঠিক বয়ে চলা নদীর মতো।
দেখতে দেখতে কেটে গেছে চার-চারটি বছর৷
চৌধুরী বাড়ির উঠোন আজ আবারও সরগরম। পুরো বাড়ি জাঁকজমকভাবে সাজানো। আহিয়াদ অর্ণব নিহান আর সুনেহরা তাসনিম জায়না দৌড়ে পুরো বাড়ি মাথায় তুলেছে। তাদের পেছনে ছুটছে আরেকজন—মাহি। মাহি বড় বোন হিসেবে বেশ দায়িত্বশীল। ওদের সাথে পেরে না উঠে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে সে বলল, “তোমরা যদি এখন না থামো, তোমাদের বার্থডে সেলিব্রেশন এখানেই স্থগিত করে দেওয়া হবে।”
নিহান খুবই দুষ্টু। সে সোফায় বসে গাল ফুলিয়ে বলল, “পাপা, পাপা!”
সুনেহরা ভালো মেয়ের মতো মাহির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল, “আর দুষ্টুমি করব না।”
হুট করেই নিহান আবার দৌড়াতে লাগল আর বলতে লাগল, “ধরতে পারবি না, ধরতে পারবি না!” জায়না খিলখিল করে হেসে উঠল।

মাহি ফিসফিস করে বলল, “জায়না, তুমি তো ভালো বাচ্চা, তাই না? শোনো, নিহান একা একা দৌড়ে ঠিকই বসে পড়বে। তুমি ওর সাথে যেয়ো না, কেমন?”
জায়না মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
নিহান রেগে সঙ্গে সঙ্গে বলল, “বড় বোন হলে কী হবে? তুমি তো বুড়ি!”
সবাই হেসে উঠল।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছে সায়না, তার কোলে আদ্রিয়ান। সায়না হেসে বলল, “নিহান হলো দাদু।”
এবার মাহি আর জায়নাও হেসে উঠল। নিহান দু’হাত ভাঁজ করে রেগেমেগে রুমে চলে গেল। সে এখন ভীষণ রেগে আছে৷
রেডি হয়ে বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে অতিথিদের আগমন দেখছে জিয়ান।
পেছন থেকে এসে নয়না বলল, “মিস্টার প্লেন ড্রাইভার, একা একা কী করছ?”
জিয়ান হেসে বলল, “ভাবছি।”

“কী ভাবছ এত মনোযোগ দিয়ে?”
“আমাদের গল্পটা।”
নয়না জিয়ানের পাশে এসে দাঁড়াল।
জিয়ান আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “মনে আছে? একসময় সব হারিয়ে ফেলেছিলাম। তোমাকে, পরিবারকে, এমনকি নিজেকেও।”
“তারপর?”
“তারপর বুঝলাম, ভালোবাসা ধরে রাখতে ভালোবাসার মানুষটাকে সঠিক হতে হয়। একে অপরের প্রতি ভরসা ও বিশ্বাস রাখতে হয়।”
নয়না মৃদু হেসে মাথাটা জিয়ানের কাঁধে রাখল। জিয়ান নয়নার গালে দু’হাত রেখে নিজের ঠোঁটটা নয়নার ঠোঁটের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে—ঠিক তখনই নিহান চিৎকার করে ডাকতে লাগল, “মাম্মাম! পাপা!”
জিয়ান আর নয়না নিজেদের সামলে নিয়ে একসাথে সামনে তাকিয়ে বলে উঠল, “আমাদের প্রিন্সের কী হলো?”

“মাহিপু আমাকে মেরেছে!”
জিয়ান নিহানকে কোলে তুলে নিয়ে বলল, “বড় আপি একটু আদর করেছে, বাবা।”
নিহান জোরে কান্না জুড়ে দিল। নয়না সামনের দিকে তাকিয়ে হেসেই যাচ্ছে বাপ-বেটার কাণ্ড দেখে। দু’জন এখন কুস্তি খেলছে। এক মুহূর্তের জন্য জিয়ান ও নয়নার দৃষ্টির মিলন ঘটল। সেই দৃষ্টিতে ছিল না কোনো আক্ষেপ, না কোনো কিছু হারানোর ভয়; ছিল শুধু শান্তি—দীর্ঘ পথ পেরিয়ে পাওয়া এক পরিপূর্ণ শান্তির অনুভব।
কিছুক্ষণ পর নয়না এসে নিহানকে কোলে নিয়ে বলল, “তুমি আমার প্রিন্স না? তো প্রিন্সরা কি এইটুকু কথায় রেগে যায়? তোমাকে না রাতে প্রিন্সের গল্প শোনালাম! বাবার অবস্থা কী করেছ! এসো, তোমাকে মাম্মাম একদম প্রিন্সের মতো সাজিয়ে দিই।” জিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, “মিস্টার ড্রাইভার, দ্রুত আবার রেডি হোন, গেস্টরা সব চলে এসেছে। ”

অনেক দূরে, অন্য এক দেশে, অন্য এক প্রান্তে মেহনুর বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে জারিফ। ছেলেটা এখন অনেক বড় হয়ে গেছে।
“মাম্মাম?”
“হুম?”
“তুমি কি কখনো বাংলাদেশে ফিরে যাবে না? জানো, আজ জায়না আর নিহানের বার্থডে পার্টি। দাদুভাই বলেছে।”
মেহনুর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল, “না সোনা।”
“কেন আমরা বাংলাদেশ যাব না, মাম্মাম? ওটা তো আমার দাদুর বাড়ি। ওখানে সবাই আছে—আম্মু, বাবা, নিহান, জায়না। আমরা কেন নেই?”
মেহনুর আকাশের দিকে তাকাল। কিছু প্রশ্নের উত্তর শব্দে দেওয়া যায় না; কিছু উত্তর শুধু হৃদয় জানে। মেহনুর মৃদু হেসে বলল, “কারণ সব মানুষের নিজের একটা জায়গা থাকে। আমাদের জায়গাটা এখন এখানে।”
জারিফ আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। বরাবরের মতোই জারিফের মুখটা চুপসে গেল। মেহনুর ছেলেকে বুকে টেনে নিল।
একসময় সে ভেবেছিল ভালোবাসা মানেই কাউকে নিজের করে পাওয়া। আজ সে জানে, ভালোবাসা মানে কখনো কখনো দূরে সরে যাওয়াও; কাউকে তার প্রাপ্য সুখ দিয়ে দেওয়া। জোর করে আর যা-ই হোক, ভালোবাসা পাওয়া যায় না। কাউকে তার সম্পূর্ণ পৃথিবী ফিরিয়ে দেওয়াটাই ভালোবাসা।
তার জীবনের গল্পে হয়তো সুখের সংজ্ঞা অন্য রকম। কিন্তু এখানে সে শান্তিতে আছে, এটাই যথেষ্ট মেহনুরের জন্য। বাংলাদেশে তার জন্য কোনো অপেক্ষা নেই, কোনো দাবি নেই, কোনো প্রত্যাশা নেই, কোনো ভালোবাসার মানুষও নেই। শুধু কিছু স্মৃতি আছে; স্মৃতিগুলোকে হৃদয়ে স্বযত্নে আগলে রেখে সে এগিয়ে গেছে বহুদূর।

অন্তর রেডি হয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার কোলের ছোট্ট মেয়ে তৃষ্ণা আঙুল চুষছে।
নীলাঞ্জনা নাবিলকে নিয়ে অন্তরের পাশে এসে দাঁড়াল। অন্তর মুগ্ধ দৃষ্টিতে নিজের পরিবারকে দেখছে। জীবন তার কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। তুষীকে ভুলতে সে কোনোদিন পারবে না—হয়তো মৃত্যুর আগ পর্যন্তও না। কিন্তু আজ আর সেই স্মৃতি তাকে দুর্বল করতে পারে না, বরং মনে করিয়ে দেয়, একজন মানুষকে ভালোবেসেও অন্য একজনের সঙ্গে সুন্দর জীবন কাটানো সম্ভব। কারণ ভালোবাসা কখনো ভাগ হয় না, ভালোবাসা শুধু রূপ বদলায়।
অন্তর হাত বাড়িয়ে নীলাঞ্জনার হাত ধরল। নীলাঞ্জনা মুচকি হেসে অন্তরের হাতে হাত রাখল। আজ আর তাদের মধ্যে কোনো অপূর্ণতা নেই।

ঈশান আমেরিকায় চলে গেছে প্রায় সাড়ে তিন বছর হলো। এতগুলো বছরের মধ্যে একবারও বাংলাদেশে আসেনি ঈশান। সেখানকার একটি মেডিকেল কলেজের হার্ট সার্জন সে।
সূচনা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। সেই কল্পনার জগৎ ছেড়ে সে এখন বাস্তবতা বুঝতে শিখেছে। সে জানে, জাংকুক তার জন্য আকাশের চাঁদের মতো—যাকে দেখা যায়, তবে কখনো নিজের করে পাওয়া যায় না।
মাঝেমধ্যে সূচনা ভিডিও কলে ঈশানকে বিরক্ত করে। সূচনার সবচেয়ে প্রিয় কাজ ঈশানকে বিরক্ত করা। আজ সুন্দর করে রেডি হয়ে কল করল ঈশানকে।
“হেই পিচ্চি! এত সেজেগুজে আমাকে দেখাচ্ছিস কেন? আমাকে না দেখিয়ে আন্টিকে দেখা, ধরে বিয়ে দিয়ে দেবে।”
“ঈশান ভাই, কোরিয়ান ভাবি কই?”
ঈশান সূচনার দিকে তাকিয়ে বলল, “সূচনা-মূচনা, তোরে ব্লক করে দেব আর একবার উল্টোপাল্টা কথা বললে!”
সূচনা হো হো করে হেসে বলল, “ঈশান ভাই, চিরকুমার থাকার ইচ্ছে আছে নাকি?”
ঈশান সূচনার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই আর আমাকে কল করবি না পেত্নী!” বলেই কলটা কেটে দিল।
কিছু সম্পর্কের নাম থাকে না, তবুও সেগুলো ভীষণ সুন্দর হয়।

অনিকেত, সায়না, নীলাঞ্জনা, অন্তর, সূচনা—সবাই মিলে জমিয়ে আনন্দ করে রাত বারোটার দিকে বাসায় চলে গেল। মুরুব্বিরা আগেই চলে গেছেন, ওরাই থেকে লেট নাইট পর্যন্ত মজা করল। সবাই চলে যেতেই নয়না নিজের ড্রেস চেঞ্জ করে রুমে আসল। জায়না আর নিহান আজ তার দাদির ঘরে ঘুমিয়েছে।
নয়না বেডের উপর বসে চোখ বন্ধ করে একটু শান্তির নিশ্বাস নিচ্ছে। হঠাৎ খেয়াল করল, জিয়ান তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। জিয়ান বেডের পাশে এসে নয়নাকে চোখ বন্ধ করে থাকতে দেখে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবল।
একটা সময় ছিল, যখন এই মেয়েটাকে হারানোর ভয় তাকে প্রতিদিন তাড়িয়ে বেড়াত। অথচ আজ সেই মেয়েটাই তার পৃথিবী।
জিয়ান এগিয়ে গিয়ে নয়নার পাশে বসল। মৃদু স্বরে ডাকল, “বাটার মাশরুম!”
নয়না ফিরে তাকিয়ে হাসল, “কী হয়েছে মিস্টার প্লেন ড্রাইভার? এভাবে কী দেখছ?”
“তোমাকে দেখছি।”
“প্রতিদিনই তো দেখো।”
“তবুও মন ভরে না। যত দেখি, তত বেশি দেখতে ইচ্ছে করে।”

নয়না হেসে মাথা নুইয়ে ফেলল। জিয়ান ফিসফিস করে বলল, “আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সিদ্ধান্ত ছিল তোমাকে বিয়ে করা। আর সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত ছিল তোমাকে ভালোবাসা।”
নয়নার চোখ ভিজে উঠল। ভুল সময়ে, ভুল করে সঠিক মানুষটা তার জীবনে চলে এসেছিল। নয়না আলতো করে জিয়ানের হাতটা চেপে ধরল, “জানো, আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সূচনা সেদিন হয়েছিল, যেদিন আমি পরিপূর্ণরূপে তোমার অর্ধাঙ্গিনী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।”
রাত গভীর। সবাই ঘুমিয়ে গেছে। জিয়ান নয়নাকে নিজের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে ধরল।
নয়না মৃদু স্বরে বলল, “এখন কী ভাবছ?”
জিয়ান নয়নার মাথাটা নিজের বক্ষে আলতো করে চেপে ধরে বলল, “ভাবছি, জীবনটা কত সুন্দর, তাই না?”
“হঠাৎ এটা ভাবার কারণ?”
“কারণ একসময় মনে হতো আমি সুখী হওয়ার যোগ্য নই।”
নয়না নিজের মাথা উঁচু করে জিয়ানের ঠোঁটে আলতো চুমু খেল। “তারপর?”
জিয়ান মৃদু হেসে বলল, “এখন মনে হয়, আল্লাহ আমার প্রার্থনার চেয়েও বেশি দিয়েছেন। আমি হয়তো এত কিছু পাওয়ার যোগ্য ছিলাম না।”
নয়না চোখ বন্ধ করল। তার জীবনে দুঃখ এসেছে, ঝড় এসেছে, অসংখ্য পরীক্ষা এসেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে তার মানুষটাকে আঁকড়ে ধরে সংসার করতে পেরেছে, তারা পূর্ণতা পেয়েছে।
জিয়ান নয়নার কপালে চুমু দিয়ে বলল, “শোনো, বাটার মাশরুম।”

“হুম?”
“পরের জন্মেও আমার অর্ধাঙ্গিনী হবে?”
নয়না হাসল। চোখের কোণে চিকচিক করছে সুখের জল। “আমি তো এই জন্মেই তোমার মধ্যে মিশে গেছি। পরের জন্মে আলাদা হব কীভাবে? আর হ্যাঁ, পরের জন্ম বলে কোনো জন্ম নেই।”
ধীরে ধীরে রাতের গভীরতার সাথে জিয়ানের ভালোবাসার স্পর্শ গভীর হতে লাগল। ভালোবেসে মিশে যেতে লাগল একে অপরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ৫৬

দূরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। নতুন সূর্যের আলোয় ধীরে ধীরে আলোকিত হচ্ছে পৃথিবী। ঠিক যেভাবে সব ঝড়ের পরে জিয়ান ও নয়নার জীবনেও ছড়িয়ে পড়েছে ভালোবাসার রশ্মি।
কিন্তু ভালোবাসার গল্পগুলো কখনো শেষ হয় না। সেগুলো বেঁচে থাকে—কখনো স্মৃতিতে, কখনো অপেক্ষায়, আর কখনো একজনের হৃদয়ে অন্যজনের অর্ধাঙ্গিনী হয়ে।

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here