আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৮ (২)
অরাত্রিকা রহমান
-“বনু..মাহির ভাই..আপনারা উঠেছেন?”
মিরার ডাকে সোরায়া চমকে নিজের চোখ খুলে ফেলল। মাহিরকে নিজের অতি সন্নিকটে দেখে সে মাহিরের বুকে হাত রেখে মৃদু ধাক্কায় ছেলেটাকে নিজের উপর থেকে সরিয়ে দিল। মাহির বিরক্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিছানায় গা ছেঁড়ে দিল হতাশায়। সকাল সকাল রোমান্টিক মুডের এমন ভাবে বারোটা বেজে গেল বলে হয়তো এই হতাশা। সোরায়া তাড়াহুড়ো করে কোনো মতো নিজের উন্মুক্ত গায়ে চাদরটা গুছিয়ে নিতে নিতে চিন্তিত গলায় বলল-
“আপু..ডাকছে। এখন কি হবে? কি করবো?”
মাহির সোরায়ার পাশে মুখে একটা বিরক্তিকর ভাব নিয়ে শুয়ে ছিল। সোরায়ার উৎকণ্ঠা দেখে সে বাঁকা চোখে সোরায়া কে উদ্দেশ্য করে বলল-
“এমন ভাব করছো কেন, মনে হচ্ছে যেন কট খেতে যাচ্ছি আমরা। বিয়ে হয়ে গেছে আমাদের বোকা মেয়ে। আমাদের জন্য এখন এসব ভেরি মাচ লিগাল।”
সোরায়া মুখ ঘুরিয়ে মাহিরের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল-
“কি অদ্ভুত! এক রাতে লাজ লজ্জা কি সব খেয়ে ফেলেছেন? আপু আপনাকে আমাকে এই অবস্থায় দেখলে আমি আর কখনো আপুর চোখে চোখ রাখতে পারবো? আমাকে এভাবে কেউ দেখলে কি লজ্জায় পড়বো আমি আপনি বুঝতে পারছেন?”
মাহির বিরক্তি ও অস্বস্তিতে সোরায়ার রক্তিম বর্ণ ধারণ করা নাকটা হালকা করে টেনে দিয়ে বলল-
“কেন লজ্জায় পড়বে? লজ্জার কি করেছি আমি তোমার সাথে? আপু কিছুই ভাববে না। উল্টো যদি তুমি স্বাভাবিক থাকো তাহলে আমার পুরুষত্ব নিয়ে ঠিকই সন্দেহ করবে।”
-“সোরা…ওই বনু..? মাহির ভাই..!”
মিরায়ার কণ্ঠ পুনরায় ভেসে এলো। মাহির বাধ্য হয়ে বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সোরায়া চেঁচিয়ে উঠলো-
“কোথায় যাচ্ছেন?”
-“দরজা খুলতে।”
-“দরজা খুলতে মানে? আমি খালি গায়ে তো।”
-“উফ্, সেটা আমি দেখতে পাচ্ছি তো জান। বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছো কেন?”
সোরায়া থতমত খেয়ে একদম চুপ করে গেল। মাহির দরজার লকে হাত রাখতেই মিরা আবারো ডাকলো-
“বনু..! উঠেছিস তোরা?”
সোরায়া এবার জোড় গলায় বিছানা থেকেই চিৎকার করে উঠলো-
“উঠেছি আপু…জাস্ট এমনি গড়াগড়ি করছিলাম বিছানায়। তুমি যাও। আসছি আমরা..”
মিরা বাইরে থেকে সোরায়ার আওয়াজ পেল। মাহির আর দরজা খুললো না সোরায়ার কথা শুনে। মিরা আর কথা বাড়ালো না। এমনিতেও সে কেবল রোকেয়া বেগমের কথাতে সোরায়া আর মাহিরকে ডাকতে এসেছে নয়তো বোনের বাসর ঘরের দরজা নক করার ইচ্ছে তার ছিল না। মিরা সোরায়ার প্রতিউত্তর শুনে সঙ্গে সঙ্গে নিচে নেমে গেল। মাহির মুচকি হেঁসে আবারো বিছানার দিকে এগিয়ে এলো। সোরায়ার এবার গায়ের চাদর সমেত বিছানার থেকে নামলো। এখন বিছানায় থাকাটা তার ভয়ের কারণ। তবে বেচারি হঠাৎ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ব্যর্থ। সোরায়া দুপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে নিজের শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে না পেরে পড়ে যাচ্ছিল বলে মাহির দ্রুততার সাথে এগিয়ে এসে তাকে ধরে ফেলল।
-“আহহ্..!”
সোরায়া আড়তোনাদ করে চোখ খিচিয়ে বন্ধ করে নিল। মাহির উদ্বিগ্নতা দেখিয়ে সোরায়ার গালে হাত রাখলো-
“সামলে জান… কষ্ট হচ্ছে? মাথা ঘুরছে? কি সমস্যা হচ্ছে আমায় বলো।”
সোরায়া মাহিরের বুকে মাথা ঠেকিয়ে তার শার্টের কিছু অংশ খামচে ধরলো। কোমরের নিচটা কেমন অবশ অবশ লাগছে সোরায়ার। পায়ের জোড় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ কম মনে হচ্ছে। সোরায়া দাঁতে দাঁত চেপে আওড়ালো- “ভীষণ ব্যাথা..! পা ফেলতে পারছি না।”
মাহিরের এমন কথা শুনে ঠিক খুশি হলো না দুঃখ সে নিজেও বুঝলো না। তবে আপাতত খুশি প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই তাই দু্ঃখ টুকুই সম্বল। মাহির সোরায়া কে কোলে তুলে নিল। তাকে আবারো বিছানায় শুইয়ে দিল।
-“ঘরে কোনো পেইন কিলার আছে? না থাকলে বলো আমি নিয়ে আসছি গিয়ে।”
সোরায়া বিছানার সাইড টেবিলের দিকে দেখিয়ে দিয়ে বলল-
“যেতে হবে না ড্রয়ারে আছে।”
মাহির ড্রয়ার থেকে ঔষধ বের করে সোরায়াকে যত্ন সহকারে খাইয়ে দিয়ে মেয়েটার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল-
“সরি জান, একটু টাইম নাও দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে।”
সোরায়া ছলছল চোখে মাহিরের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পরই মিনমিনিয়ে বলল-
“তাহলে বলুন, কখনো ওমন করবেন না..!”
মাহির সোরায়ার কপালে স্নেহের পরশ এঁকে দিয়ে শান্ত গলায় বলল-
“আমি আবারো সরি জান। কিন্তু মিথ্যা যে বলতে পারবে না।” সোরায়া লজ্জায় মাথা নিচু করে নিল। সে জানে এই মাত্র যা সে বললো তা ভিত্তিহীন তবুও বলে ফেলল। মাহির এক গাল বাঁকা হেঁসে সোরায়া কে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল-
“থাক থাক হয়েছে, আর লজ্জা পেতে হবে না। তোমার লজ্জা আমার নির্লজ্জতামীর প্রধান কারণ, আমার লজ্জাবতী..সো প্লিজ..আমার প্রতি মায়া দেখিয়ে লাজ সরিয়ে রাখ। আই লাভ ইউ..!”
সোরায়া আরো দৃঢ়তার সাথে মাহিরের সাথে মিশে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল-
“আই লাভ ইউ মোর..!”
-“রুদ্র…এই..উঠুন না..সকাল হয়েছে কখন..! উঠুন।”
রিমির ব্যস্ত ডাকে রুদ্র বিরক্তি নিয়ে তাকে আরো ঘনিষ্ঠ ভাবে আঁকড়ে ধরলো। রিমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুনরায় রুদ্রর গালে হাত রেখে ডাকলো তাকে-
“আহা, ছাড়ুন। বাড়ি ভর্তি মেহমান আমার উঠতে হবে।”
রুদ্র ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল-
“উফ্, ঘুমাতে দাও না একটু..!”
রিমি এবার বিরক্ত হয়ে রুদ্রর হাতে আঘাত করে বলল-
“দিবো না ঘুমাতে। আপনি আমাকে ঘুমাতে দিয়েছেন? উঠুন উঠুন। নিজে না উঠলে আমাকে ছাড়ুন।”
রুদ্র রিমিকে ছেঁড়ে দিল, তবে নিজে উঠলো না। ওভাবেই উপর হয়ে শুয়ে রইল। রিমি নিজের মুক্তি পেয়েই সন্তুষ্ট, সে আর রুদ্র কে ডাকলো না। রিমি তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলো।
ড্রয়িং রুমে শফিক রহমান, রায়ান চৌধুরী ও মাহিদ খান একসাথে সোফায় বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আড্ডা মজেছেন। রোকেয়া বেগম, রামিলা চৌধুরী ও সীমা খান খাবার টেবিল সাজাচ্ছেন হাতে হাতে। সকলের মাঝে যে এমন গভীর সখ্যতা গড়ে উঠেছে তার খবর হয়তো তাদের কাছেও নেই। তিনজনের মাহির সোরায়ার বিয়ে নিয়ে কথা যেন শেষই হচ্ছে না। মিরা রান্নাঘরে আর রায়ান ঢাকা ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে নিজের মতো। রামিলা চৌধুরী সিঁড়ির দিকে একনজর দেখে বললেন-
“মিরা রায়ান নামলো, রিমি আর রুদ্র এখনো নামছে না। এখনও কি ঘুমাচ্ছে নাকি?”
সীমা খান মাঝ থেকে বললেন-
“থাক না ভাবি। বাচ্চা গুলো অনেক কাজ করেছে এই কয়দিন। একটু বিশ্রাম নিক। আপনার বড় বউমা নিচে নেমে সেই যে রান্না ঘরে ঢুকে আমাদের বের করলো এখন নিজে বের হচ্ছে না। এমন শরীরে ওর কি এসব কথা সাজে? ও তো একটু ঘুমাতে পারতো।”
রামিলা চৌধুরী মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই মিরা রান্নাঘর থেকে এক ট্রে ভর্তি ফল কেটে সাজিয়ে নিয়ে খাবার টেবিলের দিকে আসতে আসতে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল-
“এসেগেছি। ফল গুলো কাটতে সময় লাগলো আর কি।”
রামিলা চৌধুরী মিরার হাত থেকে ফলের ট্রে টা নিয়ে টেবিলের উপর রাখলেন। আর মিরাকে টেনে চেয়ারে বসিয়ে বললেন-
“তোকে না বলেছি এমন অসচেতন না থাকতে। এখন তোর ফল কাটার সময় না খাওয়ার?”
মিরা কিছু বলার মতো খুঁজে পেল না। রিমি দ্রুত সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে সবার উদ্দেশ্যে বলল-
“গুড মর্নিং এভরিওয়ান। সরি, দেরি হয়ে গেল একটু।”
রামিলা চৌধুরী রিমিকে একা সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখা মাত্রই প্রশ্ন করলেন-
“রিমি..তুই একা কেন? রুদ্র কোথায়?”
রিমি একটু অস্বস্তিতে নরম কণ্ঠে জবাব দিল-
“উনি ঘুমাচ্ছেন মা। আমি ডেকেছিলাম, বললেন আরো একটু ঘুমাবেন তাই আর কি..!”
-“সবাই তৈরি হয়ে নাও। ঢাকা ফেরার সব বন্দোবস্ত হয়ে গেছে। ঘণ্টাখানেক পরেই বের হতে হবে।”
সদর দরজা পেরিয়ে রায়ান ড্রয়িং রুমে পা রেখেই গম্ভীর গলায় এ কথা বলতেই সকলের নজর গিয়ে রায়ানের উপর স্থির হলো। মিরা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে রোকেয়া বেগমের কাঁধে ধাক্কা দিয়ে ইঙ্গিত করতেই রোকেয়া বেগম আমতা আমতা করে বললেন-
“আজই কেন যেতে হবে রিভান? বিয়ে তো মাত্র শেষ হলো। আর কিছু দিন থাক।”
-“সরি, খালামণি। আমার তো আমেরিকা যাওয়ার কথা ছিল আরো তিন মাস আগে যেটা আর হয়ে উঠেনি। কারণ তো জানোই- আমার লক্ষ্মী, শান্তশিষ্ট বউয়ের কর্ম..! কম্পানি এখনো ওই লস বহন করছে। রায়ান ইন্ডাস্ট্রি’স আমার বহুদিনের কষ্টের ফল। এখন হাল না ধরলে সবটা শেষ হয়ে যাবে। আমার চট্টগ্রাম থাকলে চলবে না।”
রোকেয়া বেগম রায়ানের উত্তরে আর কিছু বলতে পারলেন না। মিরা তো সকালেই একবার ধমক খেয়েছে এই বিষয়ে কথা বলায় এখন আর সাহস নেই। তবে শফিক রহমান সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গাম্ভীর্যতা দেখিয়ে বললেন-
“কাজ যেহেতু আছে সেটা নিয়ে তো তর্ক করার কোনো মানে হয় না। যাও তবে। কিন্তু মিরা যাবে না।”
রায়ানের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো –
“মিরা যাবে না মানে?”
-“যাবে না মানে যাবে না।”
-“কেন যাবে না?”
-“কারণ, ঢাকায় মিরার কোনো কাজ নেই। কাজ তোমার তুমি যেতেই পারো।”
রায়ান শফিক রহমানের যুক্তি শুনে তুচ্ছার্থে হেঁসে বাঁকা চোখে একবার মিরার দিকে তাকালো। আনন্দে যেন মেয়েটার চোখ চকচক করছে। রায়ানের চোখে চোখ পড়তেই সেটা তৎক্ষণাৎ হারিয়ে গেল। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-
“খালুজান, আমি আপনার সাথে তর্ক করতে চাইছি না এই বিষয়ে। মিরার কাজ নেই কিন্তু পড়া তো আছে। ফাস্ট ইয়ার শেষ হয়েছে কেবল। ক্যাম্পাসে তো যেতে হবে ওর। তাছাড়া, আমি যাচ্ছি মানে আমায় বউ আমার সাথে যাচ্ছে।”
শফিক রহমান ধীর পায়ে রায়ানের সামনে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ে বললেন-
“ও আমার মেয়ে, আমি বলছি মিরা এখানে থাকবে আরো কিছু দিন মানে এখানেই থাকবে।”
উপস্থিত সবাই জামাই শ্বশুরের লড়াই দেখছে শুরু মাত্র হয় তো পপকর্ন টাই নেই। রায়ান নিজের ভদ্রতা হারায় নি। সে শান্ত গলায় নিজের দিকে থেকে আরো কিছু বলতে যাবে তখনি শফিক রহমান নিজের হাত উঁচু করে রায়ান কে থামিয়ে দিয়ে বললেন-
“কেবল এক চাওয়াতে আমার মেয়েকে তোমার হাত তুলে দিয়েছিলাম। আজ যখন আমার এক মেয়ে আমার ঘর খালি করে চলে যাচ্ছে আমি আমার আরেক মেয়েকে নিজের কাছে রাখতে চাই।”
শফিক রহমানের এমন আবেগী শব্দের ভীরে রায়ান নিজেকে হারিয়ে ফেলল। এমন আবদার কি ফেরানো যায়? রায়ানের এক মূহুর্তের জন্য মনে হলো কিছু দিন পর তো সেও বাবা হবে তখন এমন পরিস্থিতিতে তার করণীয় কি হবে? প্রশ্ন টা মাথায় আসতেই তার অভ্যন্তরটা কেঁপে উঠলো। রায়ান কিছুই বলল না আর। সে এক নজর মিরার দিকে দেখলো আবার একই দেহের সামান্য নিচে উদরের অংশে নজর পড়তেই চোখ সরিয়ে নিল। বুকটা অদ্ভুত রকমের ধকধক করছে। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিছু বলার সাহস হলো না ছেলেটার। চুপচাপ ড্রয়িং রুম থেকে সোজা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। কেউই ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না শেষ সিদ্ধান্ত কি হলো- মিরা যাচ্ছে? না যাচ্ছে না? রায়ান সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে লাগলো। একই সময় মাহির উপর থেকে নামছে। রায়ান কে এমন নিশ্চুপ উপরে উঠে যেতে দেখে অবাক হয়ে প্রশ্ন করল-
“কিরে, কই যাচ্ছিস?”
রায়ান মাহির কে দেখেও না দেখার মতো এড়িয়ে সোজা উপরে চলে গেল। মাহির হতবাক – সে কি করেছে যে রায়ান তার সাথে কথা বললো না..! মাহির নিচে নেমে কৌতুহলে জিজ্ঞেস করলো-
“রায়ানের কি হয়েছে? এমন সিরিয়াস কেন হয়ে আছো তোমরা?”
মিরা মাঝে থেকে দ্রুততার সাথে সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে বলল-
“আমি একটু আসছি।”
এই কথা বলে সেও সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল। মাহির কিছুই বুঝলো না কি হয়েছে ড্রয়িং রুমে। সীমা খান মাহিরের উপস্থিতি দেখেই চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন-
“তুই একা কেন মাহির? সোরা মা কোথায়?”
মায়ের প্রশ্নে মাহিরের রায়ান দিক থেকে ধ্যান ছুটলো। উত্তর কি দেবে জানা নেই যদিও তার তবে সে জানতো এই প্রশ্নের সম্মুখীন তাকে হতে হবে। মাহির নিজের চেহারায় কোনো অস্বাভাবিকতা দেখালো না। নয়তো সোরায়া ও সবার সামনে আসতে লজ্জা পাবে। মাহির স্বাভাবিক ভাবে জবাব দিল-
“সোরা ঘুমাচ্ছে। এই কয়দিন তেমন ঘুম হয় নি হয়তো। ক্লান্ত তো..তাই গভীর ঘুমে আছে। জাগাতে ইচ্ছে করেনি। পরে ডেকে নিবোক্ষন। এখন ঘুমাক।”
সীমা খান মাহিরের কথায় যৌক্তিকতা দেখে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন-
“হ্যাঁ, ভালো করেছিস। একটু ঘুমাক। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা লং জার্নি করতে হবে আবার। একটু রেস্ট নিয়ে নিক।”
মিরা রায়ানের পিছু পিছু তার ঘরে প্রবেশ করলো। রায়ান নিজের লাগেজ গুছাচ্ছে। মিরার লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিয়ে রায়ানের দিকে এক পা দু পা করে এগিয়ে এসে ঠিক রায়ানের পিছনে দাঁড়াল। রায়ান মিরার উপস্থিতি টের পাচ্ছে কিন্তু তার মিরার সাথে কোনো প্রকার তর্কে যাওয়ার ইচ্ছা নেই। রায়ান শান্ত গলায় বলল-
“আলমারিতে আমার কিছু জিনিস আছে। বের করে দাও।”
মিরা রায়ানের কথা অনুযায়ী কাজটা করলো। রায়ান নিজের জিনিস গুলো গুছিয়ে নিয়ে লাগাজের থেইন লাগিয়ে দিল। মিরা রায়ানের পিছনেই দাঁড়িয়ে থেকে মিনমিনে গলায় জিজ্ঞেস করলো-
”আমার জিনিস গুলো গুছানো হয় নি।”
রায়ান লাগেজ বেড থেকে নামিয়ে স্টেন্ড করে স্বাভাবিক ভাবে বলল-
“প্রয়োজন নেই। তুমি যাচ্ছো না। কাজ আমার তাই আমি যাচ্ছি।”
রায়ানের কথায় মিরা অবুঝের মতো লাফিয়ে উঠলো উচ্ছ্বসিত হয়ে। রায়ান মিরার আনন্দ দেখে বাঁকা চাহুনিতে মিরার দিকে তাকালো-
“আমাকে ছাড়া থাকবে বলে এতো আনন্দ? দ্যাট’স সামথিং নিউ। ইম্প্রেসিভ।”
মিরা স্থির হলো রায়ানের কথা গুলো যে ব্যঙ্গ করে বলা তা সে বুঝতে পারছে ভালোই। মিরা ঠিক নিজেও বুঝতে পারছে তার কি আদতেও আনন্দ করা শোভা পায়? হয়তো পায়! আবার হয় তো না..! মিরা রায়ানের দিকে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে রায়ানের বুকে মাথা রেখে বলল-
“খুব বেশিদিন না। মাত্র ৫-৬ দিন এর ব্যাপার। চাচা চাচি একটু স্যাটেল হয়ে গেলে চলে আসবো। এই কয়টা দিন ম্যানেজ করুন।”
রায়ানের কানে মিরার বলা ‘মাত্র এই কয়টা দিন” শুনে মনে মনে বিড়বিড় করলো মিরার উদ্দেশ্যে-
“তোমাকে ছাড়া ৫-৬ টা দিন আমার জন্য ‘মাত্র এই কয়টা দিন’ কিভাবে মনে হতে পারে তোমার হৃদপাখি? কিভাবে?”
রায়ান সংযত করলো নিজেকে। মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল-
“আমাদের প্রিন্সেসের যত্ন নিও। ও তো আর বলতে পারবে না- মাম্মা আমার খিদে পেয়েছে। সময় মতো খেয়ে নিও ওর জন্য কেমন? আর যখন এখানে আর থাকতে ইচ্ছে করবে না চলে এসো। ওকে?”
মিরার হৃদয় ভারী হয়ে এলো। রায়ানের বুকে চিবুক ঠেকিয়ে ছলছল চোখে রায়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“আপনি আমাকে নিতে আসবেন তো?”
-“না..!”
মিরা রায়ানের থেকে দূরে সরে গিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল-
“না মানে?”
-“না মানে না। নিজ ইচ্ছায় থেকে যাচ্ছো। আবার নিজ ইচ্ছায় চলে আসবে। আমার কিছু বলার নেই।”
মিরা রায়ানের কথা বুঝতে পারলো রায়ান এই সিদ্ধান্তে খুশি নয় একপ্রকার বাধ্য হয়ে রেখে যাচ্ছে তাকে। মিরাও জেদ ধরে বলল-
“আপনি নিতে না এলে আমি যাবো না।”
রায়ান মিরার দুগালে হাত রেখে তার কপালে ছোট্ট চুমু এঁকে দিয়ে বলল-
“তুমি যখন নিজ থেকে ফিরবে তখন দেখা হবে হৃদপাখি। নিজের খেয়াল রেখো। হতে পারে আমি কাজের ব্যস্ততায় খবর নিতে পারলাম না তাই বলে কোনো রকমের অযত্ন অবহেলা যেন না দেখি আমার বউয়ের প্রতি।”
মিরার রাগ হচ্ছে খুব রায়ানের উপর। কিন্তু তা প্রকাশ করার সুযোগ নেই তার। কারণই বা কি দেবে সেই রাগের!
নাস্তা শেষে মাহির সোরায়ার জন্য একটা প্লেটে অল্প কিছু খাবার নিয়ে ঘরে এলো। সোরায়া ভারী একটা লাল ফারসি ড্রেস পড়ে আয়নার সামনে বসে আছে। মাহির খাবারের প্লেট টা নিয়ে সোরায়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে এক সাইডে বসলো। সোরায়া মাহির কে দেখে প্রশ্ন করলো-
“সবাই আমার খোঁজ করেছে তাই না? কি বলেছেন আপনি? আমি কেন নামি নি? কেউ ভুল কিছু ভাবে নি তো?”
মাহির সোরায়ার উদ্বিগ্নতা দেখে নিজের হাসি আর ধরে রাখতে পারলো না। মাহির কে হাসতে দেখে সোরায়া বোকা বোকা ভাব নিয়ে বলল-
“আপনি কি আমার উপর হাসছেন?”
মাহির হাসি থামিয়ে বলল-
“তোমার উপর না, পরিস্থিতির উপর হাসছি। একে তো ঠিক মতো হাঁটতে পারছো না, তার উপর এখনই শরীরের এই অবস্থায় নিজের শশুর বাড়ি যেতে হবে। এখন আমি এক বেহায়া যার এতে কিছুই যায় আসে না আর তুমি এক হায়াবতী যে কিনা ঠিক মতো হাঁটতে পারছে না বলে লোকসম্মুখে যেতে নারাজ। এই পরিস্থিতিতে আমার ইমোশন গুলো এমন ভাবে কনফিউজড হয়েছে যে আমি বুঝতেও পারছি না কি করা উচিত তাই হাসছি।”
সোরায়া মাহিরের কথাগুলো শুনে মাথা নিচু করে নিল-
“সরি, কিন্তু আমার তো সত্যিই হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। আপনাকে ইচ্ছে করে এমন পরিস্থিতিতে ফেলছি না বিশ্বাস করুন।”
মাহির হাফ ছেঁড়ে সোরায়ার চিবুকে হাত রেখে তার মুখে নিজের দিকে উঁচু করলো-
“হেই…লুক অ্যাট মি। কি বলছো এসব? আমার দিকে তাকাও সোরা..!”
সোরায়া ফ্যালফ্যাল করে মাহিরের দিকে তাকালো। মাহির সোরায়ার দুগালে হাত রেখে ঘোর লাগানো গলায় বলল-
“তোমার এই সাময়িক অপারগতার কারণ আমি নিজে। এটা আমার জন্য ঠিক কতটা তৃপ্তির তা যদি তোমাকে বোঝাতে পারতাম হয়তো তুমি এমনটা বলতে পারতে না।”
সোরায়ার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো মাহিরের কথায়। লজ্জায় গাল দুটো রক্তিম হয়ে উঠলো। মাহির সোরায়ার লাজে রাঙা মুখশ্রী দেখে নিজের সংযম ত্যাগ করলো। নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনলো প্রিয়তমার ঠোঁট জোড়ায়। সোরায়া দুচোখের পাতা বন্ধ করলো সেই সময় টুকুর জন্য। মাহির সোরায়ার কপালে কপাল ঠেকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-
“তোমার এই বিচলিত ভাব, এই লজ্জা, এই ছোট্ট অপারগতা আমাকের সন্তুষ্টি ও তৃপ্তির কারণ। এইটা নিয়ে ভবিষ্যতে কখনো দুঃখ প্রকাশ করবে না। বুঝেছো?”
সোরায়ার ঠোঁট অনবরত কাঁপছে। মেয়েটা নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরলো। মাহির সোরায়ার দিকে তাকিয়ে মজার ছলে বলে উঠলো-
“By the way, Congratulations, Mrs. Khan..”
সোরায়া অবাক হয়ে তাকালো। কারণ বোঝার স্বার্থে পাল্টা প্রশ্ন করলো-
“কন্গ্রেচুলেশনস, কিসের জন্য?”
মাহির সোরায়ার কানের দিকে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল-
“Congratulations on being the Girl who took my virginity..”
সোরায়া সম্পূর্ণ হতভম্ব। লজ্জায় তার ইচ্ছা করলো মাহিরের বুকে মিশে যেতে। সে দুহাতে মুখ ঢেকে মাহিরের বুকে লুকিয়ে কথার ধারাবাহিকতায় বলে ফেলল-“You took mine as well..”
মাহির সোরায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে ছোট চুমু দিয়ে বলল-
“তাহলে, তুমিও আমাকে কন্গ্রেচুলেট করো। এতো বড় একটা অ্যাচিভমেন্ট আমার..!”
সোরায়া না পারতে এবার বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো-
“আপনি চুপ করবেন একটু ? উফফ্…!”
হঠাৎ দরজার কড়া নড়লো- “আসতে পারি?”
দরজার ওপার থেকে মিরার কণ্ঠ স্বরে মাহির সোরায়া একে অপরের আলিঙ্গন থেকে সরে গেল।
-“জি আপু..সরি ভাবি..!”
মাহিরের অনুমোদন পেয়ে মিরা দরজা ঠেলে ঘরের ভেতরে ঢুকতেই দেখলো মাহির আর সোরায়া কাছাকাছি বসে আছে। মিরা ইতস্তত বোধ করে জিজ্ঞেস করলো-
“আমি কি ভুল সময়ে এলাম?”
মাহির আর সোরায়া একসাথে নাসূচক মাথা নাড়লো-
“না না আপু / একদম না ভাবি। আসুন না..”
মিরা সোরায়ার কাছে গিয়ে বসলে মাহির দুই বোনকে কিছু টা একলা সময় দিতে মিরার উপর নিজের দায়িত্ব টুকু সঁপে দিল-
“ভাবি এখন যেহেতু আপনি এসেছেন, আপনিই খাইয়ে দিন ওকে। রায়ান বলল আপনি আমাদের সাথে ঢাকা ফিরছেন না। সোরায়া ঢাকা ফিরে আপনাকে মিস করবে এটা সিয়র। একটু আদর করে দিন।”
মিরা মাহিরের কথায় মুচকি হাসলো। মাহির ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে মিরা একবার পা থেকে মাথা অব্দি সোরায়া কে দেখলো। বড় বোন হিসেবে এখন তার কি বলা উচিত হবে মিরার মাথায় ঠিক খেলছে না। সোরায়া ও এই প্রথমবার এতোটা থমথমে হয়ে আছে। মিরা শুকনো ঢোঁক গিলে সোরায়া কে জিজ্ঞেস করলো-
“তুই ঠিক আছিস তো বনু?”
সোরায়া মিরার প্রশ্নের মানে বুঝলো কিনা বলা দায় তবে অস্বস্তিতে হাতের নখ খুঁটতে খুঁটতে বলল-
“হুম, ঠিক আছি আপু। হঠাৎ এভাবে জিজ্ঞেস করছো যে?”
মিরা জিভের সাহায্যে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে বলল-
“হঠাৎ বলতে আসলে, সবই তো হঠাৎই। কি না কি বলছি খোদা। আমি বলতে চাইছি যে, তোর শরীর ঠিক আছে তো? না মানে , নিচে এলি না তাই আর কি..!”
সোরায়া মিরার কথার ধরন দেখে বুঝতে পারছিল তার যে অবস্থা মিরার তাকে এমন প্রশ্ন করতেও দ্বিধা অনুভব হচ্ছে। সোরায়া ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি রেখে বলল-
“সব ঠিক আছে আপু। টেনশন কোরো না। তেমন কোনো কারণে না আসলে, ক্লান্ত লাগছিল তাই ঘুমিয়েছিলাম।”
মিরা নিজের গলা পরিষ্কার করতে একটু গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের নার্ভাসনেস কম করলো। আমতা আমতা করে কোনো মতো চিন্তার আসল কারণটা নিয়ে প্রশ্ন টা করেই ফেলল-
“বনু…তোর কি হাঁটতে প্রবলেম হচ্ছে?”
এমনি সময় সোরায়া মিরার মুখে এই প্রশ্ন শুনে হয়তো লজ্জা পেত তবে তার থেকে মিরাকেই বেশি অস্বস্তিতে দেখে সোরায়ার হাসি পাচ্ছে খুব। সোরায়া কেবল হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো। আর আওড়ালো- “একটু..!”
মিরা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলো। তারপর একটু বড় বড় ভাব নিয়ে বলল-
“ব্যাপার না, ঠিক হয়ে যাবে। তুই প্যানিক করিস না। ঠিক আছে?”
সোরায়া আবারো সম্মতি দিয়ে মাথা নাড়লো। মিরার চোখ নিচের দিকে। সোরায়া মিরাকে এভাবে দেখে মাথা একটা দুষ্টু বুদ্ধি পাকিয়ে হঠাৎ বলল-
“আপু..একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
মিরা হঠাৎ চমকে উঠে সাড়া দিল –
“হ্যাঁ হ্যাঁ, কি হয়েছে? কিছু জানার থাকলে জিজ্ঞেস কর আমি চেষ্টা করবো ভালো করে বোঝানোর।”
-“রায়ান ভাইয়া কি তোমাকে এই জন্যই দুইদিন কোলে নিয়ে ঘুরেছিল ভাইয়ার বার্থডের পর?”
সোরায়ার কথার ভিত্তি বুঝে মিরার কাশি উঠে গেল। এই প্রশ্নের উত্তর ছোট বোন কে কিভাবে দেবে। সোরায়া দ্রুত একটা গ্লাসে পানি ঢেলে মিরার দিকে এগিয়ে দিল-
“আরে আস্তে, পানি খাও, পানি খাও।”
মিরা কয়েক ঢোঁক পানি গিলে শান্ত হয়ে সোরায়ার দিকে তাকালো। সোরায়া ও মিরার দিকে তাকালো। দুইবোনের নজর মিলতেই দুজনেই হঠাৎ হেসে উঠলো একজন আরেক জনের অবস্থা দেখে। মিরা সোরায়ার কান আলতো হাতে ধরে শাসনের স্বরে বলল-
“বড্ড পেকে গেছিস তাই না? শয়তানের হাড্ডি।”
সোরায়া খিলখিলিয়ে হাসলো। তারপর মিরা সোরায়ার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে করতে তাকে অল্প করে খাইয়ে দিল। বেলা বাড়লে সকলে বিদায়ের জন্য প্রস্তুতি নিল। বাড়িতে কিছু সময়ের জন্য আবারো ব্যস্ততা। তবে বাড়ির দেয়ালের প্রতিটা ইটও যেন আজ বিষন্নতায় নিমজ্জিত। বরপক্ষের সকলে রওনা দিয়েছেন। সাথে চৌধুরী বাড়ির সবাই ও বিদায় নিয়েছেন। এখন বর কনে এক সঙ্গে রওনা দেবে। মিরার সহযোগিতায় সোরায়া নিচে নামলো। রোকেয়া বেগম ও শফিক রহমানের চোখ-মুখে স্পষ্ট কষ্টের ছাপ। তারা যতই নিজেকে সামলে রাখতে চাইছেন , বুকের ভেতরের শূন্যতা যেন বারবার চোখের কোণে জল হয়ে জমে উঠছে। ঘরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে আছে মেয়ের শৈশবের স্মৃতি—হাসি, অভিমান, ছোট ছোট দৌড়ঝাঁপ, সবকিছু যেন একসাথে ভিড় করে এসেছে এই বিদায়ের মুহূর্তে। মিরার হাত ধরে সোরায়া ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নামছে, আর প্রতিটি ধাপ যেন তাকে তার পরিচিত পৃথিবী থেকে একটু একটু করে দূরে নিয়ে যাচ্ছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা, শুধু চাপা কান্নার শব্দ আর ভারী নিঃশ্বাসের আওয়াজ। সোরায়া ড্রয়িং রুমে আসতেই রোকেয়া বেগম তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁপা গলায় বললেন,
“আমার ছোট্ট বুড়ি, ছোটবেলা থেকে তোকে বুকের মাঝে আগলে রেখেছি। আজ তোকে অন্য এক ঘরে পাঠাচ্ছি। চাচি কে ভুলে যাস না কিন্তু, এই মায়ের ঘর সবসময় তোর জন্য অপেক্ষা করবে। কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবি, কোনো ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা চেয়ে নিবি, বড়দের কথা কথা শুনবি। আমার লক্ষ্মী মেয়েটা যেন সবার সুপ্রিয় হয়।”
সোরায়ার চোখ ভিজে উঠলো। সে রোকেয়া বেগমের বুকে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমি সব সময় লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থাকবো চাচি। তুমি একদম চিন্তা কোরো না। তুমি নিজের আর চাচার শরীরের যত্ন নিও, সব সময় সুস্থ থাকবে দুজন। আব্বু আম্মু কে তো মনেও করতে পারি না তোমরাই তো আমার সব বলো। নিজেদের অযত্ন করবে না কিন্তু। খুব অভিমান করবো কিন্তু।”
রোকেয়া বেগম সোরায়ার কপালে চুমু দিয়ে তার চোখ মুছলেন। এবার শফিক রহমান ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন। তার চোখে জল, কিন্তু কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। তিনি এগিয়ে এসে সোরায়ার হাতটা আলতো করে ধরে এক দুই পদক্ষেপের ব্যবধানে মাহিরের দিকে নিয়ে গেলেন। নিজের অন্য হাতে মাহিরের হাতে নিয়ে সোরায়ার হাত মাহিরের হাতেৎতুলে দিলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভারী গলায় বললেন,
“আজ থেকে আমার সবচেয়ে আদরের আমানতটা তোমার হাতে তুলে দিলাম, বাবা। ছোটবেলা থেকে ওর চোখে জল পড়ার আগেই আমি তা মুছে দিয়েছি। আজ থেকে সেই দায়িত্ব তোমার। ওর মুখের হাসিটা যেন কখনো ম্লান না হয়… কারণ ওর হাসির সাথেই আমার বেঁচে থাকার অনেকটা জড়িয়ে আছে।”
একটু থেমে তিনি আরো বললেন,
“মেয়েরা যখন বাবার ঘর ছেড়ে যায়, তখন শুধু একটা মানুষ না—বাবার বুকের একটা অংশও সঙ্গে নিয়ে যায়। তাই ওকে শুধু স্ত্রী হিসেবে নয়, আমার বুকের টুকরো ভেবে আগলে রেখো।”
মাহির দু’হাতে সোরায়ার হাত শক্ত করে ধরে সম্মানভরে মাথা নত করল। গলা ভারী হয়ে এলো তারও।
“আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, চাচা। ওর চোখে জল আসার একটা ছোট্ট কারণ কখনো ওর জীবনে আসবে না। তার আগেই আমি নিজের সবটুকু দিয়ে ওকে আগলে নেব।”
শফিক রহমান মৃদু হেসে সোরায়ার মাথায় হাত রাখলেন।
“সুখে থাকিস মা… তোর সুখটাই এখন আমাদের শান্তি।”
সবাই যেন নিঃশব্দে কাঁদছে। বিদায়ের সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, সময়টা যদি আরেকটু থেমে থাকতো!
সোরায়া শফিক রহমানের হাতের উষ্ণতা নিজের মুঠোয় অনুভব করছে। বুকের ভেতরটা যেন ফাঁকা হয়ে আসছে। এতদিনের পরিচিত উঠান, দেয়াল, বারান্দা—সবকিছু আজ হঠাৎ করেই অচেন হয়ে যাচ্ছে। চোখের জল আটকে রাখতে চাইলেও বারবার গাল বেয়ে নেমে আসছিল মেয়েটার। মিরা ধীর পায়ে সোরায়ার দিকে এগিয়ে গেল। এতক্ষণ নিজেকে শক্ত করে রাখা মিরা আর পারলো না। কাঁদো কাঁদো মুখে নিজের হাত দুটো মেলাতেই সোরায়া মিরাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলো।
-“শুশশ, কাঁদতে হয় না। পাগলি, একেবারে হারিয়ে যাচ্ছিস নাকি? এটা নতুন একটা অধ্যায় তোর জীবনে। দোয়া করি অনেক সুখী হো? খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবো আমি ঢাকায়। তখন আবার দেখা হবে। ডাক দিলেই চলে আসবো।”
সোরায়া চোখের জল মুছতে মুছতে হালকা হাসলো।
সোরায়া গভীর শ্বাস নিয়ে চারপাশে শেষবারের মতো তাকালো। মাহির গাড়ির দরজা খুললো সোরায়ার জন্য সোরায়ার হাত ধরে তাকে গাড়িতে বাড়ালো সাবধানে। এরপর নিজেও গাড়িতে উঠলো। গাড়ির জানালার কাঁচ নামানো সোরায়া। মিরা ঝুঁকি সোরায়াকে বলল-
“আমি কিছু খাবার প্যাক করে দিয়েছি। রাস্তায় খুদা পেলে খেয়ে নিস কেমন? সাবধানে যাস। আর পৌঁছে কল করবি কিন্তু।”
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৮
সোরায়া মুচকি হেঁসে মাথা নাড়লো। ইঞ্জিন স্টার্ট হলো। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে বাড়ির উঠনটা ফাঁকা করে মাহিরের গাড়িটা বেরিয়ে গেল। শফিক রহমান বাড়ির কর্তা হিসেবে নিজেকে শক্ত ভাবে ধরে রাখলেন। রোকেয়া বেগম কে স্বান্তনা দিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন ওনাকে নিয়ে। পরপর মিয়াও বাড়ির ভেতরে যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই হঠাৎ দেখলো রাস্তার এক পাশ থেকে একটা ছায়া হঠাৎ বিলিন হয়ে গেল। মিরা আশ্চর্য হলো-
“কে..? কে ওখানে..?”
কারো সাড়া এলো না। মনের ভুল ভেবে মিরা বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
