উন্মাদনা পর্ব ২০
কায়নাত খান কবিতা
“ স্টুপিড”
রেহমানের বরাবরই কম বয়সী আচড়ে পাকনা মেয়ে অপছন্দ। বয়সের তুলনায় বেশি ভাব নিলে তো কথাই নেই। পাড়ার কাকিমাদের দায়িত্বও যেন এই আধাপাকা মেয়েগুলোই কাঁধে তুলে নেয়। তাই পাকনা স্বভাবের মেয়েদের থেকে রেহমান সবসময় দূরেই থাকে।
আনন্দীকে ইস্টুপিট বলে গাড়ি স্টার্ট দিয়েই থানার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে সে। বরাবরই সময়ের ব্যাপারে ভীষণ পাঙ্কচুয়াল রেহমান, অথচ আজ সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। তার ওপর এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অবরোধ।সব মিলিয়ে দিনটা একেবারে হেকটিক কেটেছে।
থানায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় সন্ধ্যা। ভিতরে ঢুকতেই রেহমানের চোখ আটকে যায় এক দৃশ্যে।
চেয়ারে পা তুলে আরাম করে বসে কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছে রমজান ওরফে রোমিও। কয়েক মাস আগে দেবের একটা গান বের হয়েছিল, যেখানে “কিশোরী কিশোরী” বলে নায়ক প্রায় কেঁদেই মরে। আর রোমিও সেই গানকে “খিচুড়ি খিচুড়ি” বানিয়ে সারাদিন ব্যঙ্গ করে। কারণ তার মতে,দেবের সঙ্গে শুধুই শুভশ্রীকেই মানায়, বাকি সবাই তেল কম জল।
ডিউটির সময় এমন আরাম করে বসে থাকা রেহমানের মোটেও পছন্দ হলো না। একটুও শব্দ না করে সে গিয়ে রোমিওর চেয়ারটা টেনে দেয়।
রোমিও সোজা মাটিতে পড়ে যায় ।সে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই উপরে তাকিয়ে পিলে চমকে ওঠে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং যমদূত!তাছাড়া সে নিজে ও এসেছে কিছু ক্ষণ আগেই।এইচএসসি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সামাল দিতে দিতে বেচারার নাকানিচুবানি অবস্থা হয়ে গেছে। এর মাঝে সে সান্সক্রিম দিতে ও ভুলে গেছিলো। কোথায় সে নিজেকে দেবের মতো ট্রান্সফার করতে চেয়েছিলো, সেখানে ডিউটি তাকে কালা মানিকের রূপে নিয়ে আসে। যার সমস্ত ক্ষোভ আজ সে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর মিটিয়েছে। সবে মাত্র এসে মুখে ক্রিম লাগিয়ে মনের সুখে বেচারা গান শুনছিলো।সেখানে ও রেহমান এসে বাঁধা দিলো।
রোমিও লাফিয়ে উঠে এমন এক বিশাল সালাম ঠোকে যেন রাষ্ট্রপতি এসে হাজির হয়েছে।
“আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওবারাকাতুহু স্যাররর!”
রেহমান ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলে,
“ডিউটির সময় গান শোনা নিষিদ্ধ, জানেন তো মি. রোমিও?”
রোমিও কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে গম্ভীর মুখে বলে,
“স্যার, আপনি শুধু আমার গান শোনা দেখলেন… পিছনের মোটিভটা দেখলেন না।”
রেহমান ভ্রু কুঁচকে তাকায়। প্রশ্ন করবে না, কিন্তু উত্তর শুনতে চায়।গলা খাঁকারি দিয়ে রোমিও শুরু করে,
“স্যার! আমি গানের মাধ্যমে আপনাকে স্মরণ করছিলাম।”
“হুম?”
“জ্বী স্যার! দেব যখন বলে, ‘চ্যালেঞ্জ নিবি না শা”লা!’ তখন আমার শুধু আপনার কথাই মনে পড়ে। কারণ আপনিও তো ক্রিমিনালদের একই ডায়লগ দেন ‘চ্যালেঞ্জ নিবি না শা”লা!’ ”
রেহমান চোখ বন্ধ করে একবার মাথা নাড়ল।তারপর কড়া গলায় বললো,
“ইস্টুপিট!”
বলে গটগট করে নিজের রুমে চলে যায় সে।আর বেচারা রোমিও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। ট্রেনিং থেকে জয়েন করার পর থেকে
রেহমানের কাছে বকা খেয়েই তার পেট ভরছে। তবুও সে রেহমানের পিছু ছাড়ে না।কারণ একটাই, নামের মিল।রেহমান আর রোমিও।একদম দেব-জিতের মতো ভাই ভাই!তাই রেহমান যেখানে, রোমিওও সেখানে।
রেহমান যেখানে নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, ঠিক অপর প্রান্তে আনন্দী বাড়িতে ঢোকার সাহসই পায় না।গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে সে। চারপাশ অন্ধকার হয়ে এসেছে , তবুও পা যেন নড়ছে না। হাতের কাটা জায়গা থেকে হালকা জ্বালা ও করছে বটে। হাতে শক্ত করে ব্যান্ডেজ বাঁধা এরপর ও ব্যথা কমছে না। কিন্তু এই কাটা হাত নিয়ে আর কতক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা যায়?
আজকের দিনটাই যেন অন্যরকম ছিল।
কলেজে গিয়ে আনন্দী জানতে পারে কোনো ক্লাস হবে না। অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মতো বাকিরাও এইচএসসি পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে। পুরো কলেজজুড়ে স্লোগান, হৈচৈ, উত্তেজনা।
সেই ভিড়ের মাঝেই হঠাৎ আনন্দীর মাথায় অন্য এক চিন্তা আসে।সে আজ থানায় যাবে।নিজের সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে।
যেই দেশে দু’দুবার নারী প্রধানমন্ত্রী ছিল, সেই দেশে এত ধর্ষণ কীভাবে হয়? অপরাধীরা এত সাহসই বা কোথা থেকে পায়?
অভীর পাঠানো ভয়েস, টেক্সট, ভিডিও, সবকিছু এখনও ফোনে আছে আনন্দীর। প্রতিটা মেসেজ যেন তাকে মনে করিয়ে দেয়, সে চুপ ছিল বলেই অপরাধীরা আরও সাহস পেয়েছে।আজ আর চুপ থাকবে না সে।আজ সে নিজের জন্য লড়বে।
নিজের সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের জবাব চাইবে।
এরপর আর কী? ব্যাগটা শক্ত করে কাঁধে তুলে সোজা থানার উদ্দেশে রওনা দেয় আনন্দী।
বেশ অনেকটা সাহস জুগিয়ে আনন্দী থানায় যায়। বুকের ভিতর কাঁপুনি চললেও মুখে সেটা প্রকাশ হতে দেয় না।
ভিতরে ঢুকতেই ডিউটিতে থাকা এক লেডি অফিসার এগিয়ে আসে।
“জি মামুনি! কী দরকার?”
আনন্দী ঠোঁট ভিজিয়ে শান্ত গলায় বলে,
“আমি এসপির সাথে কথা বলতে চাই।”
অফিসার কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জানায়, এসপি এখন থানায় নেই। তবে তার জুনিয়র অফিসার আছেন, চাইলে তার সঙ্গে কথা বলা যাবে।
আনন্দী রাজি হয়।
কিছুক্ষণ পর তাকে একটি রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। মাঝবয়সী এক ইন্সপেক্টর ফাইল দেখতে দেখতে মাথা তোলে। আনন্দীকে কয়েক সেকেন্ড দেখেই ভ্রু কুঁচকে বলে,
“আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি…”
আনন্দী ব্যাগটা শক্ত করে ধরে শান্ত স্বরে বলে,
“নেটে দেখেছেন। ২০২২ সালে।”
“ওহহ! হ্যাঁ!” ইন্সপেক্টর আঙুল তুলে বলে ওঠে,
“প্র্যাকটিসরত এক হবু ডাক্তারকে না আপনি পুলিশের হাতে দিয়েছিলেন?”
আনন্দী ধীরে মাথা নাড়ে।
“জ্বী।”
ইন্সপেক্টর এবার পুরোপুরি মনে করতে পারে। চেয়ার হেলিয়ে বলে,
“হুম… মনে পড়েছে। শুনেছিলাম, ছেলেটা আপনার বান্ধবীকে প্রেম প্রস্তাব দিয়েছিলো। রাজি না হওয়াতে তার গায়ে হাত তোলে। রে’প করার চেষ্টা করে।। এরপর আপনি বিষয়টা নেটে ছেড়ে দেন।”
আনন্দী আবারও মাথা নাড়ে।হুট করে যেন তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে পূরানো সেই বিষে ভরা স্মৃতি গুলো।
২০২২ সালের কথা।এসএসসি পরীক্ষার ঠিক কিছুদিন আগে।আনন্দীর সবচেয়ে কাছের বান্ধবী স্নেহা একদিন কাঁদতে কাঁদতে এসে জানায়, সে প্রেগন্যান্ট। আর এর জন্য দায়ী অভী নামের এক ছেলে। কিন্তু এখন সে সব অস্বীকার করছে।স্নেহা সেদিন হাউমাউ করে কেঁদেছিল।
তখন আনন্দীদের বয়স কম। মাথায় রাগ বেশি, বিচারবুদ্ধি কম।আনন্দী ঠিক করেছিল, সরাসরি গিয়ে ওই ডাক্তার ছেলেটার সঙ্গে কথা বলবে। দরকার হলে জুতো দিয়েও মারবে।
পরিকল্পনা মতো স্নেহাকে নিয়ে মেডিকেলে যায় সে।আনন্দীর মায়ের ফোনটা নিয়ে স্নেহা একাই ভিতরে ঢোকে। বেশ কিছুক্ষণ পর যখন বেরিয়ে আসে, তার গালে স্পষ্ট কয়েকটা থাপ্পড়ের দাগ। চোখ লাল, মুখ কাঁপছে।
সেই মুহূর্তে আনন্দীর মাথা পুরো গরম হয়ে যায়।
সে ঠিক করে সবাইকে জানাবে সবকিছু। কিন্তু স্নেহা হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“আমি প্রেগন্যান্ট… এটা কেউ জানুক, তা আমি চাই না।”
তখন জানা যায়, ভিতরে যাওয়ার সময় স্নেহা ফোনে ভিডিও করে রেখেছিল।পরে সেই ভিডিও আনন্দীর মায়ের আইডি থেকে পোস্ট করা হয়। পুলিশেও খবর দেওয়া হয়।
এরপর পুরো ঘটনা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশ আসে, সাংবাদিক আসে, চারদিকে হইচই পড়ে যায়।
অভী তখন মেডিকেলের ক্যান্টিনে ছিল। সেখান থেকে তাকে টেনে বাইরে আনা হয়। কেউ জুতোর মালা পরিয়ে দেয়, কেউ মুখে কালি মাখায়। উত্তেজিত জনতা মারধরও শুরু করে দেয়।
পুলিশ পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খেয়ে যায়।
এরপর অনেক কষ্টে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ। চারদিক তখন মানুষের ভিড়ে ঠাসা। কেউ ভিডিও করছে, কেউ লাইভ করছে, কেউ আবার চিৎকার করে গালাগাল দিচ্ছে।
অভীকে কয়েকজন পুলিশ ধরে গাড়ির দিকে নিয়ে যেতে থাকে। সাদা অ্যাপ্রোনটা ততক্ষণে মাটির ধুলো আর কালিতে নোংরা হয়ে গেছে। মুখের একপাশ লাল হয়ে ফুলে আছে। তবুও ছেলেটা অদ্ভুত রকম চুপ।একটাও কথা বলছে না।
এদিকে সাংবাদিকরা আনন্দীর চারপাশে ভিড় করে।মাইক্রোফোন, ক্যামেরা, মানুষের ভিড়ে এক মুহূর্তে দম বন্ধ লাগছিল আনন্দীর।
তবুও সে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছিল।
ঠিক তখনই অভীকে পুলিশের গাড়িতে তোলা হয়।গাড়িতে ওঠার আগে একবার থেমে যায় সে।
চারপাশে এত মানুষ, এত চিৎকার তবুও অভীর চোখ যেন শুধু একজনকেই খুঁজছিল।
আনন্দী।
দূর থেকে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে সে।
না সেখানে রাগ ছিল, না ভয়।অদ্ভুত এক দৃষ্টি।
যেন হাজার মানুষের শব্দের মাঝেও সে শুধু আনন্দীকেই দেখছে।
সেই চোখ দুটো কয়েক সেকেন্ডের জন্য আনন্দীর বুকের ভিতর কেমন অস্বস্তি তৈরি করে।
কারণ সবাই চিৎকার করছিল, সবাই অপমান করছিলকিন্তু অভী শুধু তাকিয়েছিল।একদৃষ্টিতে।
“ম্যাডাম?”
ইন্সপেক্টরের ডাকে অতীত থেকে বাস্তবে ফিরেআসে আনন্দী।কিছুক্ষণ চুপ থেকে শুকনো গলায় বলে,
“আমার সাথে… খুব জঘন্য একটা ঘটনা ঘটনা।”
ইন্সপেক্টর কড়া নজরে তাকায় আনন্দীর দিকে। সে শুকনো ঢোক গিলে আরো বলে,_আমার কাছে প্রমাণও আছে।”
ইন্সপেক্টর এবার একটু সোজা হয়ে বসে, গা ছাড়া ভাব নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“কী ধরনের প্রমাণ?”
কাঁপা হাতে ফোন বের করে আনন্দী।ভয়েস রেকর্ড, মেসেজ, কিছু ভিডিও,সব দেখাতে থাকে। তার আঙুল কাঁপছিল, কিন্তু চোখে তখনও একরাশ ভরসা। হয়তো এবার বিচার হবে। হয়তো এবার কেউ অন্তত তার কথা শুনবে।ইন্সপেক্টর ফোনটা হাতে নেয়।
কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
“হুম… আচ্ছা।”
মজার ব্যাপার হলো,সে ঠিকমতো কিছু পড়লও না।দুই-একবার স্ক্রল করেই হঠাৎ সব ডিলিট করে দেয় একসাথে।ভিডিও,ভয়েস,চ্যাট,সব।
আনন্দী কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারেনি কী হয়েছে।
লোকটা এবার বিরক্ত মুখে চেয়ারে হেলান দেয়।
“ ফোন তো ফাঁকা ম্যাডাম! প্রমাণ কোথায়?’
আনন্দীর বুক ধকধক করতে থাকে।সে বুঝতেই পারেনি, থানায় ঢোকার পর থেকেই সব খবর অন্য কোথাও পৌঁছে গেছে।কারণ আনন্দীকে দেখেই ইন্সপেক্টর ফোন করেছিল অভীকে।
আর যতক্ষণ সে মিথ্যে সহানুভূতি দেখিয়ে কথা চালিয়ে যাচ্ছিল।
ততক্ষণে অভী রওনা হয়ে গিয়েছিল।
কিছুক্ষণ পর থানার বাইরে একটা খোলা জীপ এসে থামে।ভারী জুতোর শব্দ তুলে ভিতরে ঢোকে অভী। এরপর?
এরপর আর কী? আনন্দী বিচার পেলে না।
একটা গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বাড়ির মেইন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে স্মৃতি চারণ করতে থাকে আনন্দী।
হাতটা এখনও জ্বলছে। মাথার ভিতর হাজারটা শব্দ ঘুরছে। থানার সেই রুম, ডিলিট হয়ে যাওয়া প্রমাণ, পুলিশের ঠান্ডা চোখ।সব মিলিয়ে বুকটা ভার হয়ে আছে তার।
কাঁপা হাতে দরজার লক ছুঁতেই হঠাৎ পিছন থেকে ভেসে আসে রাশভারী একটা কণ্ঠ,
উন্মাদনা পর্ব ১৯
“পুলিশে গেছিলা, সোনামণি? আমার নামে কেস করতে?”
মুহূর্তে আনন্দীর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়।সে ধীরে ধীরে পিছনে ফিরতে গিয়েও পারে না। শরীর জমে যায় পুরো।ঠিক তখনই পিছন থেকে অভী এগিয়ে এসে তার কাঁধে মুখ গুঁজে দেয়।তার গরম নিঃশ্বাস ঘাড়ে লাগতেই আনন্দীর বুক কেঁপে ওঠে।
অভী নিচু স্বরে, অদ্ভুত ঠান্ডা হাসি মিশিয়ে বলে,
— “তাতে আমার বা:ল ছিঁড়ে গেলো।”
