Home কিস অফ বিট্রেয়াল কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪৩

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪৩

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪৩
লামিয়া রহমান মেঘলা

বাহিরে আকাশজুড়ে মেঘের তাণ্ডব চলছে। গুরগুর শব্দ তুলে কালো মেঘে ঢেকে গেছে সম্পূর্ণ আকাশ। প্রকৃতি যেন আজ নিজের সমস্ত শান্তি হারিয়ে উন্মত্ত রূপ ধারণ করেছে। কিছুক্ষণের মাঝেই শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। অগণিত জলের ধারা আছড়ে পড়তে লাগল মাটির বুকে। চারিদিক শুধু বৃষ্টি আর বৃষ্টির জলেই অথৈ হয়ে উঠেছে। বাতাসে কাঁচা মাটির গন্ধ, জানালার কাঁচে টুপটাপ শব্দ, আর দূরের বিদ্যুতের ঝলকানি মিলিয়ে পরিবেশ হয়ে উঠেছে ভয়ংকর অথচ মোহময়।
এই ভয়াবহ বৃষ্টির মাঝেও কায়ানের গাড়ির গতি একটুও কমেনি। বরং সে যেন আরও দ্রুত সবকিছুকে পেছনে ফেলে ছুটে চলেছে। তার চোখে মুখে জমে থাকা আগুন গাড়ির গতিকেও হার মানাচ্ছে।
নীলা ক্যাফেতে পৌঁছে কায়ান লক্ষ্য করল, আশেপাশে তেমন কেউ নেই। এই ভারী বৃষ্টিতে প্রায় সবাই নিজেদের ঘরে ফিরে গেছে। যারা দু একজন রয়েছে, তারাও হয়তো কোনো কারণে বৃষ্টির ফাঁদে আটকে পড়েছে।

কায়ান ভেতরে প্রবেশ করে দেখল, ক্যাফেটা প্রায় সম্পূর্ণ ফাঁকা। মাত্র দুটো টেবিলে দুজন লোক বসে আছে, তাদের সঙ্গে একটি মেয়ে। চারদিকে চোখ বুলিয়ে কায়ান সেরিনকে খুঁজল, কিন্তু কোথাও তাকে পেল না।
কায়ান ভাবল, হয়তো সেরিন ইতোমধ্যেই চলে গেছে। তাই ফিরে আসার জন্য ঘুরতেই পরক্ষণে কিছু একটা ভেবে সে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল।
কাউন্টারে একজন লোক বসে ছিল। কায়ান তার সামনে গিয়ে কিছু টাকা বাড়িয়ে দিল।
লোকটা অবাক হয়ে বলল,
“কিসের টাকা স্যার”
কায়ান কোনো উত্তর না দিয়ে ফোন বের করে সেরিনের ছবি দেখাল লোকটাকে।
“মেয়েটা এসেছিল এখানে”
লোকটা ছবির দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই মেয়েটা, হ্যাঁ এসেছিল। বয়ফ্রেন্ডের সাথে এসেছে মনে হয়”
কথাটা শুনে কায়ানের ভেতরে জ্বলতে থাকা আগুন যেন মুহূর্তেই দাবানলে পরিণত হলো। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ভারী কণ্ঠে সে আবার জিজ্ঞেস করল,
“এই মেয়েটা এখন কোথায়”
লোকটা কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
“স্যার, মেয়েটা এখন পেছন দিকে কিছু রুম আছে, সেখানেই আছে। আপনি কে হন ভাই”
কায়ান রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে। সেই দৃষ্টি এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল যে লোকটার বুক কেঁপে উঠল।

“না”
একটি মাত্র শব্দ, অথচ তাতে জমে ছিল হিমশীতল হুমকি।
লোকটা ভয় পেয়ে গেল। কায়ান দ্রুত পায়ে রুমের দিকে হাঁটা ধরল।
পেছন থেকে লোকটা বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“বাহ রে, ঘরের মেয়ে এসব করে বেড়াবে, আর অন্য কেউ কিছু বললে দোষ। যাকগে, আমার কি। আমি তো বোনাস পেয়ে গেছি”
সেরিন সোফার উপর গুটিশুটি মেরে বসে ছিল। তার চোখে ভয়, মুখে ক্লান্তির ছাপ। এমন সময় দড়াম করে দরজা খুলে যাওয়ার শব্দে সে চমকে উঠে সেদিকে তাকাল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কায়ান।
তার চোখ দুটো রক্তিম, যেন ভেতরে জমে থাকা সমস্ত রাগ আজ দৃষ্টিতে রূপ নিয়েছে।
সেরিনের পরনে কারোর একটি কোট। কায়ান এক নজরেই বুঝে গেল, এটা নিশ্চয়ই ওই জাকিরের কোট।
এক মুহূর্তও দেরি করল না কায়ান। ঝড়ের বেগে ভেতরে ঢুকে সেরিনের গালে সজোরে একটি থাপ্পড় বসিয়ে দিল। তীব্র আঘাতে সেরিন ছিটকে পাশের দিকে পড়ে গেল।
পরক্ষণেই কায়ান সেরিনের চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে তাকে দাঁড় করাল।

“কুত্তার বাচ্চা, আজ বাড়িতে চল। তোর জ্বালা আজ মেটাব”
সেরিন কিছুই বলতে পারছিল না। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে কাঠ। শরীর জমে আসছে। আতঙ্কে তার হাত পা অবশ হয়ে গেছে।
কায়ান সেভাবেই সেরিনের চুল ধরে তাকে টানতে টানতে বাহিরে নিয়ে গেল।
কায়ান বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুম থেকে বের হলো জাকির।
বেরিয়ে এসে সেরিনকে না দেখে সে অবাক হলো। চারদিকে তাকিয়ে সেরিনকে খুঁজল। কোথাও না পেয়ে দ্রুত বাইরে চলে এলো।
সেখানেও সেরিনকে না দেখে সে কাউন্টারের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল।
লোকটা কায়ানের কথা সব খুলে বলল।
কথাগুলো শুনে জাকিরের মুখে রাগের ছাপ ফুটল না, আবার খুশিরও নয়। তার অভিব্যক্তি ছিল অদ্ভুত শান্ত।
তার চোখেমুখে থেকে গেল এক অজানা রহস্য, যেন সে এমন কিছু জানে যা অন্য কেউ জানে না।

কায়ানের গাড়িটা যেন আজ কোনো বাঁধাই মানছে না। রাস্তা, গতি, ঝড়, বৃষ্টি, কিছুই তাকে থামাতে পারছে না। স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে থাকা তার আঙুলগুলোতেই বোঝা যাচ্ছে ভেতরে কী ভয়ংকর ঝড় বইছে।
সেরিন ভয়ে মুখ খুলে বলতেও পারছে না, “আস্তে চালান।”
তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন নিজেই শুনতে পাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর সেরিন লক্ষ করে বুঝতে পারল, গাড়িটা সিকদার নিবাসের দিকে যাচ্ছে না। এই পথ অন্য কোথাও নিয়ে যাচ্ছে। অচেনা, নিঃশব্দ, ভারী এক গন্তব্যের দিকে।
অবশেষে কায়ানের গাড়ি এসে থামল সম্পূর্ণ আলাদা একটি বাড়ির সামনে। চারপাশ অস্বাভাবিক নীরব। শহর থেকে বের দুরে বাড়িটা। ছোট হলেও বেশ পরিপাটি করে সাজানো চারিদিকে। সবুজে মোড়া বাড়িটা সেরিনের চেনা নয়৷ তবে বাড়িটা যে নতুন করা হয়েছে এটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
গাড়ি থেকে নেমেই কায়ান সেরিনকে টেনে বের করল।
সেরিনের হাত শক্ত করে ধরে তাকে টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে গেল।
কায়ান সেরিনকে রুমে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে মেঝেতে ফেলে দিল।
সেরিন ভয়ে নিজেকে আরও পিছিয়ে নিল।
কায়ানের হাতে একটা বেত।
সে সোফায় বসে সেরিনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টি অস্বাভাবিক স্থির, অস্বাভাবিক ভয়ংকর।

সেরিন নিজের পরনের জামাটা শক্ত করে খামচে ধরে রেখেছে।
কায়ানের কোঁকড়া চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। কপালে রাগের গভীর ভাঁজ। নেভিব্লু শার্ট খানিকটা ভিজে শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে। তবু তার সুদর্শনতা এতটুকুও কমেনি। বরং সেই সৌন্দর্যের মাঝেই আজ এক ভয়াবহ অন্ধকার বাসা বেঁধেছে।
কিন্তু সেরিন চোখ তুলে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না।
কায়ানের ভারী কণ্ঠ ঘরজুড়ে ধ্বনিত হলো,
“ছেলেটা কে, আমাকে বলবি”
“জ জাকির।”
“জাকির কে”
“ভ ভার্সিটির সিনিয়র।”
কথাটা শুনে কায়ানের মাথা যেন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারাল।

সে ঝড়ের মতো এগিয়ে এসে সেরিনকে মেঝে থেকে তুলে আরও দুটো থাপ্পড় বসিয়ে দিল।
সেরিনের ঠোঁট কেটে রক্ত পড়তে লাগল।
“কেন গেছিলি ওই ক্যাফের ওই রুমে?
তোর কি স্বামী নাই?
তোর শরীরে এত জ্বালা, তুই আমাকে বলতে পারতি। তুই ওখানে কেন গেলেছিলি”
কথাগুলো বলেই কায়ান আবার চড় বসিয়ে দিল সেরিনের গালে।
সেরিন যন্ত্রণায় কাতরে উঠল।
কায়ানের বুকের আগুন যেন কিছুতেই নিভছে না।
সে সেরিনকে মেঝে থেকে উঠিয়ে নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিল। তার শরীর কাঁপছে, শ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে।
“বুকে আগুন জ্বালিয়ে দিছিস সেরিন।
আমার যে কত কষ্ট হচ্ছে তোকে কেমন করে বুঝাব। আমার সহ্য হচ্ছে না, কি করব? মেরে ফেলব তোকে? কিন্তু মারলেও যে আমার অন্তরের আগুন নিভবে না।
কি করতে বলতেছিস বল?

তোরে ভালোবাসি বলে নিজেকে বোকা** বানায় ফেলছি নাকি রে? তুই আমার বুক থেকে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার চিন্তা করবি, আর সেটা বসে বসে দেখব, এতটা অন্ধ ভেবে রাখছিস আমাকে”
কথাগুলো শুনে সেরিন ভয়ে আরও পিছিয়ে যেতে লাগল।
কায়ানের এই হিংস্র রূপ সে মেনে নিতে পারছে না।
সেরিন কাঁদছে। তার পুরো শরীর কাঁপছে।
সেরিনের কান্না শুনে কায়ানের রাগ যেন আরও উন্মত্ত হয়ে উঠল।
সে সেরিনকে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে হাতের বেত দিয়ে আঘাত করতে শুরু করল।
প্রতিটি আঘাতে সেরিনের শরীর যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠছে। ব্যথায় তার নিঃশ্বাস ভেঙে যাচ্ছে, কিন্তু কায়ানের ক্রোধ থামছে না।
আঘাতের পর আঘাতে একসময় কায়ানের হাতের বেতটাই ভেঙে দুটুকরো হয়ে গেল।
লোকটার শরীর ঘামে ভিজে গেছে।
সেই সঙ্গে সেরিনের জ্ঞানও হারিয়েছে।
কায়ান স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল মেঝেতে পড়ে থাকা জ্ঞানহীন সেরিনের শরীরটার দিকে।
রক্তাক্ত হয়ে গেছে মেয়েটা।
চুলগুলো মুখের ওপর এসে পড়েছে।

এই দৃশ্য কায়ান সহ্য করতে পারছে না।
তার মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়েছে।
সেই সঙ্গে বুকে অস্বাভাবিক ব্যথা।
কায়ান পকেট থেকে সিগারেট বের করল।
লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেট ধরাল।
কায়ানের পা কাঁপছে সেই অবস্থায় সিগারেট টানতে লাগল সে।
তার সামনেই পড়ে আছে সেরিনের নিস্তেজ দেহ।
নীরব, নিশ্চল, ভাঙা।
ঘরজুড়ে ধোঁয়া জমছে।
আর সেই ধোঁয়ার আড়ালে বসে থাকা কায়ানকে আজ মানুষ কম, নিজের অন্ধকারের কাছে হেরে যাওয়া এক ভয়ংকর ছায়া বেশি মনে হচ্ছে।

জারিফ এবং জিনুকে স্কুল থেকে আনার পর শিমুল দুপুরের খাবার রান্না করতে কিচেনে যাচ্ছিলো।
এমন সময় বানু মির্জা শিমুলকে আওয়াজ দেয়,
“শিমুল সেরিন ফেরেনি এখনো?”
“না মা হয়ত বৃষ্টিতে আঁটকে গিয়েছে। ভাইয়াত আজ ওকে নিয়ে কোথাও যাওয়ার কথা৷”
“ও হয়ত কায়ানের সাথেই আছে।”
“হ্যাঁ।”
শিমুল চলে যায় রান্না ঘরে। বানু মির্জা লিভিং রুমের সোফায় গিয়ে বসেন৷
তাকে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেয় উর্মি।
বানু মির্জা পানিটা নিয়ে উর্মির দিকে হেসে তাকায়। উর্মিও হাসে।
তবে উর্মি, শিমুলের কথা গুলো সব শুনেছে।
উর্মি পানি দিয়ে একটু সরে আসে সবার থেকে।
এরপর নিজের ফোনটা বের করে কাউকে কল করে,

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪২

“হ্যালো।”
ওপাশের কথা শোনা গেলোনা।
“কোথায় মেয়েটা?”
ওপাশ থেকে যা উত্তর এলো তা শুনে উর্মির রাগ যেন বেড়ে গেলো। সে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
“এভাবে চলতে থাকলে কিছু হবেনা।
দ্রুত সবটা সামনে নাও নাহলে ওনার হাতে পড়ে যাবা।”
উর্মি কথা গুলো বলে কল কেটে দেয়।
আর কাজে চলে যায় শিমুলকে রান্না সাহায্য করতে।

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here