Mad for you 2 part 35
তানিয়া খাতুন
রাত একটা বেজে গেছে।
তবে ইতালির মিলান শহর যেন এখনও ঘুমিয়ে পড়েনি।
এখানে রাত আর দিনের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই।
শহরজুড়ে এখনও আলো ঝলমল করছে, দূর থেকে ভেসে আসছে যানবাহনের শব্দ।
হোটেলের মাস্টার বেডরুমটি ছিল বিশাল আকারের।
ঘরের সাজসজ্জা থেকে শুরু করে প্রতিটি আসবাবপত্রেই বিলাসিতার ছাপ স্পষ্ট।
রুহি ক্ৰুশের সঙ্গে একই বিছানায় শুতে রাজি না হওয়ায় ক্ৰুশ সোফাতেই গিয়ে শুয়েছিল।
অন্যদিকে বিশাল বিছানা টিতে একা হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে ছিল রুহি।
ক্ৰুশ বেশ কিছুক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে কিন্তু রুহির চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই।
সে এতক্ষণ ঘুমের ভান করে চুপচাপ শুয়ে ছিল, অপেক্ষা করছিল ক্ৰুশ কখন গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।
অবশেষে আর অপেক্ষা না করে সে ধীরে ধীরে উঠে বসল।
কিছুক্ষণ স্থির হয়ে ক্ৰুশের দিকে তাকিয়ে থেকে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করল লোকটা সত্যিই ঘুমিয়েছে কি না।
তারপর অত্যন্ত সতর্ক পায়ে বিছানা থেকে নেমে এলো। নিঃশব্দে এক পা এক পা করে সোফার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
সোফাটি যথেষ্ট বড় হলেও ক্ৰুশের মতো দীর্ঘদেহী মানুষের জন্য সেটি যেন কিছুটা ছোটই মনে হচ্ছিল।
ফলে ঘুমন্ত অবস্থাতেও তার অস্বস্তি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।
রুহি কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষটিকে অদ্ভুত শান্ত লাগছে।
কেন জানি না, ক্ৰুশের মুখের দিকে তাকিয়ে রুহির বারবার মনে হতে লাগল, এই মুখটা তার ভীষণ পরিচিত।
যেন বহুদিন আগে কোথাও দেখেছে। অথচ সে নিশ্চিত, এই মানুষটিকে সে আগে কখনও চিনত না।
তাহলে এমন অনুভূতি কেন?
মনের ভেতর প্রশ্নটা বারবার উঁকি দিতে লাগল।
পরমুহূর্তেই তার মনে পড়ে গেল সমস্ত ঘটনা। সঙ্গে সঙ্গে মুখ কঠিন হয়ে উঠল তার।
না, এই মানুষটিকে সে সহজে ছেড়ে দেবে না।
যে অন্যায় করেছে, তার শাস্তি তাকে পেতেই হবে।
এমন হাজারো ভাবনা মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে খেতে রুহি ধীরে ধীরে মুখটা আরও নিচু করল।
খুব কাছ থেকে ক্ৰুশকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
সে নিশ্চিত হতে চাইল, ক্ৰুশ সত্যিই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন কিনা।
নিশ্চিত হতেই রুহি প্রথমে সোফার পাশের ছোট্ট টেবিলটার দিকে এগিয়ে গেল।
একবার নয়, দু’বার চোখ বুলিয়ে দেখল।
টেবিলের উপর ছড়িয়ে থাকা ম্যাগাজিন, রিমোট আর পানির গ্লাসের পাশেও খুঁজল। কিন্তু কোথাও ফোনের দেখা নেই।
ভ্রু কুঁচকে গেল তার।
এরপর সোফাটার দিকে মনোযোগ দিল। কুশনগুলো একে একে সরিয়ে দেখল, ফাঁকফোকরেও চোখ বুলাল।
কিন্তু ফলাফল একই—শূন্য।
রুহি বিরক্ত হয়ে ঠোঁট কামড়ে ভাবল,
— তাহলে কি পুরো রুমটাই তছনছ করে খুঁজতে হবে?
পরক্ষণেই মাথা নাড়ল সে।
— উঁহু, এই লোকটা যতটা শেয়ানা, রুমের কোথাও ফোন ফেলে রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাবে না।
অবশ্যই এমন জায়গায় লুকিয়েছে, যেখানে কেউ সহজে খুঁজে পাবে না।
কথাটা মনে হতেই তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে ক্ৰুশের দিকে গিয়ে স্থির হলো।
সোফায় আধশোয়া অবস্থায় গভীর ঘুমে ডুবে আছে সে।
মুখে অদ্ভুত এক শান্ত ভাব। যেন পৃথিবীর কোনো চিন্তাই তাকে স্পর্শ করতে পারে না।
রুহির সন্দেহ আরও বেড়ে গেল।
— তবে রাখল কোথায়?
সন্দেহমাখা চোখে কয়েক সেকেন্ড ক্ৰুশের দিকে তাকিয়ে রইল সে। তারপর সাহস সঞ্চয় করে একটু ঝুঁকে পড়ল।
প্রথমে ক্ৰশের ট্টাউজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে খুঁজল। ডান পাশ, বাম পাশ—দুটোই দেখল।
কিন্তু না।
ফোন সেখানেও নেই।
রুহি বিরক্ত হয়ে মুখ বাঁকাল।
— অসম্ভব! তাহলে গেল কোথায়?
ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল ক্ৰুশের শার্টটা অনেকখানি ওপরে উঠে গেছে।
ফলে প্যান্ট টা নেমে যাওয়ায় ভেতরের আন্ডারপ্যান্টের কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে।
দৃশ্যটা দেখে রুহির মুখ অস্বস্তিতে কুঁচকে গেল।
নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল,
— এই লোক আবার আন্ডারপ্যান্টের ভেতরে রাখেনি তো?
ভাবনাটা আসতেই নিজেই লজ্জা পেল সে। কিন্তু ফোনটা উদ্ধার করাও জরুরি।
কয়েক মুহূর্ত দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে হাত বাড়াল।
খুব সাবধানে পোশাকের প্রান্তটুকু সামান্য টেনে দেখতে চাইল।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই—
একটি শক্ত, উষ্ণ পুরুষালি হাত তার কব্জি শক্ত করে চেপে ধরল।
ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে রুহি প্রায় লাফিয়ে উঠল।
তার পুরো শরীর মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল।
ধীরে ধীরে চোখ তুলে সামনে তাকাতেই দেখল ক্ৰুশ তার দিকে চেয়ে আছে।
ঘুম ঘুম চোখ দুটো পুরোপুরি খোলা নয়, তবুও
সেই দৃষ্টির সঙ্গে চোখাচোখি হতেই রুহির বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল।
শরীরের মধ্যে অদ্ভুত এক শীতল স্রোত বয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না।
তারপর ক্ৰিশ সামান্য ঝুঁকে নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
— রাতবিরেতে কলা চুরি করতে এসছিস?
আগে বলতি… আমি নিজেই খাওয়াতাম।
রুহি হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
কথাটা শুনে প্রথম কয়েক সেকেন্ড রুহির মাথায় কিছুই ঢুকল না। সে শুধু পলকহীন চোখে ক্ৰুশের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎই কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পারল।
মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখ রাগে আর লজ্জায় লাল হয়ে উঠল।
কব্জি ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে ক্ৰুশের দিকে আগুনঝরা চোখে তাকাল।
— ছি! যেমন অসভ্য লোক! তেমন অভদ্ৰ কথাবার্তা।
সকালের আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে মিলান শহরের আকাশে।
ব্যস্ত নগরীটি ইতোমধ্যেই জেগে উঠেছে। রাস্তাজুড়ে মানুষের আনাগোনা, গাড়ির শব্দ আর বিভিন্ন দোকানের কোলাহলে চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠেছে।
প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র কেনার জন্য খুব সকাল সকালই মলে চলে এসেছিল আমান।
হোটেলে বসে থাকলে তার দম বন্ধ হয়ে আসে।
তাই সুযোগ পেলেই সে বাইরে বেরিয়ে পড়ে।
যদিও সে নিজেও জানে, তার এই বেরিয়ে পড়ার পেছনে আরেকটি কারণ রয়েছে— এক অদম্য আশা।
সে এটাও জানে, ইতালির মতো বিশাল দেশে কাউকে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
তবুও মানুষের মন তো যুক্তির কথা শোনে না।
মলের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়িয়েছে সে।
কখনো খাবারের সেকশনে, কখনো পোশাকের দোকানে, কখনো বা দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রীর দিকে।
প্রয়োজনীয় জিনিসের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় জিনিসই যেন বেশি কিনে ফেলেছে সে।
আসলে তার মন কেনাকাটায় ছিল না। মনটা কোথায় যেন হারিয়ে ছিল।
অবশেষে বেশ ভরে যাওয়া ট্রলিটি ঠেলে পেমেন্ট কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল আমান।
হঠাৎ করেই সামনে ছোট্ট একটি অবয়ব এসে দাঁড়াল।
ট্রলির চাকা থামিয়ে নিচের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল, বছর তিনেকের একটি ছোট্ট মেয়ে তার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে।
মেয়েটির গোলগাল মুখ, টুকটুকে গাল আর দুই পাশে বাঁধা ছোট্ট দুটি ঝুঁটি তাকে আরও মিষ্টি করে তুলেছে।
পরনে হালকা গোলাপি রঙের পোশাক। তাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো পুতুল হেঁটে চলে এসেছে।
আমানের অজান্তেই মুখে হাসি ফুটে উঠল।
সে ধীরে ধীরে ঝুঁকে মেয়েটিকে কোলে তুলে নিল।
আশ্চর্যের বিষয়, বাচ্চাটি একটুও ভয় পেল না। বরং কোলে উঠেই খিলখিল করে হেসে উঠল।
সেই হাসিটা যেন সরাসরি আমানের হৃদয়ে গিয়ে লাগল।
কতদিন হলো সে এমন নিষ্পাপ হাসি দেখেনি?
কতদিন হলো এমন নির্ভার আনন্দ অনুভব করেনি?
বাচ্চাটির গাল আলতো করে টিপে দিয়ে সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল।
মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সমস্ত পবিত্রতা যেন এই ছোট্ট মানুষটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
ঠিক সেই সময় পেছন থেকে একটি পরিচিত নারীকণ্ঠ ভেসে এলো—
— এক্সকিউজ মি…
মাত্র দুটি শব্দ।
কিন্তু সেই দুটি শব্দই যেন আমানের চারপাশের পৃথিবীকে থামিয়ে দিল।
তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ধক করে উঠল।
হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো।
এই কণ্ঠস্বর…
না, এটা কি সত্যিই সেই কণ্ঠস্বর?
যে কণ্ঠস্বর একসময় তার প্রতিটি সকালকে সুন্দর করে তুলত?
যে কণ্ঠস্বর শুনে সে জীবনের সব কষ্ট ভুলে যেত?
ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল আমান।
সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সিমরান।
আমানের চোখের পলকে জমে উঠল জল।
কত রাত সে এই মুখটার কথা ভেবে কাটিয়েছে!
কতবার কল্পনা করেছে আবার যদি একবার দেখা হতো!
কিন্তু বাস্তবে এমন মুহূর্ত এসে দাঁড়াবে, তা সে কখনো ভাবেনি।
অন্যদিকে সিমরানও যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে।
তার মুখের রঙ মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে গেল।
চোখেমুখে স্পষ্ট বিস্ময়।
মনে হচ্ছিল, সে নিজেও বিশ্বাস করতে পারছে না যে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি সত্যিই আমান।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলতে পারল না।
শুধু দুজন মানুষ একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
যেন হাজারো অপ্রকাশিত কথা তাদের চোখের ভাষায় বিনিময় হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু পরমুহূর্তেই সিমরানের মুখে অস্থিরতার ছাপ ফুটে উঠল।
চারপাশে একবার সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে সে দ্রুত আমানের কোল থেকে বাচ্চাটিকে নিজের কাছে নিয়ে নিল।
ঠিক তখনই ছোট্ট মেয়েটি আনন্দে হাত বাড়িয়ে বলে উঠল—
— পাপা! পাপা!
শব্দটি শুনেই আমানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে অবাক হয়ে বাচ্চাটির দিকে তাকাল।
তারপর ধীরে ধীরে চোখ চলে গেল সিমরানের মুখে।
এক মুহূর্তের জন্য যেন তার চারপাশের সমস্ত শব্দ মিলিয়ে গেল।
বছরের পর বছর ধরে বুকে লুকিয়ে রাখা স্বপ্নগুলো বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে এসে আঘাত করল।
তবুও সে হাত বাড়িয়ে কিছু বলতে চাইল।
হয়তো জানতে চেয়েছিল, কেমন আছো?
হয়তো বলতে চেয়েছিল, এতদিন পরেও আমি তোমাকে ভুলতে পারিনি।
কিন্তু তার আগেই সিমরান দ্রুত পায়ে হাঁটা শুরু করল।
একবারও পেছন ফিরে তাকাল না।
আর আমান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মলের মাঝখানে।
হাতে থেমে থাকা ট্রলি, চোখে জমে থাকা জল আর বুকভরা অপূর্ণতার যন্ত্রণা নিয়ে।
কারণ কিছু মানুষ জীবনে ফিরে আসে ঠিকই, কিন্তু তারা আর কখনো আমাদের হয়ে ফিরে আসে না।
ক্ৰুশ গোসল করার জন্য ওয়াশরুমে ঢুকতেই সুযোগটা হাতছাড়া করল না রুহি।
এতক্ষণ ধরে তার মাথার ভেতর একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল— ফোনটা তাকে খুঁজে বের করতেই হবে।
ভিডিওটার নাগাল পেতেই হবে তাকে। অন্যথায় এই লোকটার বিরুদ্ধে কিছুই প্রমাণ করা সম্ভব হবে না।
ওয়াশরুম থেকে পানির শব্দ ভেসে আসছে।
রুহি একবার সেদিকে তাকাল। তারপর নিশ্চিত হয়ে দ্রুত কাজে নেমে পড়ল।
প্রথমে টেবিলের ড্রয়ার খুলে দেখল।
কিছু ফাইল, কয়েকটি কাগজপত্র, একটি কলম— কিন্তু ফোন নেই।
এরপর আলমারির ভেতর খুঁজল।
সেখানে শুধু ঝোলানো কিছু পোশাক আর হোটেলের অতিরিক্ত কম্বল।
সোফার কুশনের নিচে, সেন্টার টেবিলের পাশে, এমনকি পর্দার আড়াল পর্যন্ত খুঁজে ফেলল সে।
কিন্তু কোথাও কিছু নেই।
সময় যত গড়াতে লাগল, রুহির অস্থিরতাও তত বাড়তে লাগল।
মনে হচ্ছিল, ফোনটা যেন ইচ্ছে করেই তার সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে।
— অসম্ভব!
বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করল সে।
— একটা মানুষ তার ফোন কোথায় রাখে?
হতাশ হয়ে চারপাশে তাকাতে তাকাতে হঠাৎই তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ঘরের এক কোণে রাখা বড় কালো লাগেজটির ওপর।
মুহূর্তেই তার চোখ সরু হয়ে এল।
এতক্ষণ সে লাগেজটার কথা ভাবেইনি।
ক্ৰুশের মতো সতর্ক একজন মানুষ যদি সত্যিই কিছু লুকিয়ে রাখতে চায়, তাহলে ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের মাঝেই রাখবে।
ভাবনাটা মাথায় আসতেই আর দেরি করল না সে।
দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ভারী লাগেজটি টেনে বিছানার ওপর তুলে রাখল।
চেইন খুলতেই ভেতর থেকে ভেসে এলো পরিচ্ছন্ন কাপড়ের সুগন্ধ।
রুহি একে একে সবকিছু বের করতে শুরু করল।
শার্ট টি-শার্ট প্যান্ট কিছু কাগজপত্র।
সবকিছু বিছানার ওপর ছড়িয়ে দিতে লাগল সে।
ঠিক তখনই একটি ভাঁজ করা শার্টের ভেতর থেকে দুটি ছবি মেঝেতে পড়ে গেল।
রুহির হাত মাঝ আকাশে স্থির হয়ে গেল।
ভ্রু কুঁচকে নিচের দিকে তাকাল সে।
তারপর ধীরে ধীরে ঝুঁকে ছবিগুলো তুলে নিল।
প্রথম ছবিটিতে তাকাতেই তার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
সেখানে সে নিজেই রয়েছে।
একটি বেঞ্চে বসে দূরে কোথাও তাকিয়ে আছে।
ছবিটি যে গোপনে তোলা, তা বোঝা যায়।
কিন্তু সেটাই তাকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করল না।
বরং দ্বিতীয় ছবিটি হাতে নিতেই তার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন জমে গেল।
ছবিটিতে সে এবং ক্ৰুশ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
শুধু পাশাপাশি নয়, দুজনের দূরত্ব এমন যে দেখে মনে হয় তারা একে অপরের অত্যন্ত কাছের মানুষ।
রুহি অবিশ্বাসে ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল।
কিন্তু ছবির দৃশ্য বদলাল না।
এটা বাস্তবই।
তার হাত কাঁপতে শুরু করল।
ফিসফিস করে বলল সে।
— এটা কীভাবে সম্ভব?
মাথার ভেতর যেন হাজারো প্রশ্ন একসঙ্গে আঘাত করতে লাগল।
আমার ছবি উনার কাছে এলো কীভাবে?
এই ছবিটা তোলা হলো কখন?
আমি কি সত্যিই কখনো এই লোকটার সঙ্গে দেখা করেছি?
যদি করে থাকি, তাহলে কেন আমার কিছুই মনে নেই?
আর যদি না করে থাকি, তাহলে এই ছবিগুলো কোথা থেকে এলো?
তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ বাড়তে লাগল।
মনে হচ্ছিল, এতদিন ধরে সে যে বাস্তবতাকে সত্যি বলে জেনে এসেছে, তার ভেতর কোথাও একটা বড় ফাঁক রয়েছে।
হঠাৎ করে মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল।
ঠিক তখনই—
ওয়াশরুমের দরজা খুলে গেল।
রুহি চমকে মাথা তুলল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ক্ৰুশ।
ভেজা চুল থেকে এখনও ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে। হাতে সাদা তোয়ালে।
বাইরে এসেই তার দৃষ্টি প্রথমে বিছানার ওপর ছড়িয়ে থাকা জামাকাপড়ের দিকে গেল।
তারপর খোলা লাগেজে।
আর সবশেষে রুহির হাতে ধরা ছবিগুলোর ওপর।
মাত্র এক সেকেন্ড।
একটি মাত্র সেকেন্ড।
কিন্তু সেই এক সেকেন্ডেই ক্ৰুশ সব বুঝে গেল।
ঘরের ভেতর নেমে এলো অস্বস্তিকর নীরবতা।
কেউ কোনো কথা বলছে না।
শুধু দুজন মানুষ একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে।
রুহির চোখে তখন বিস্ময়, সন্দেহ, ভয় আর অজস্র প্রশ্ন।
অবশেষে নীরবতা ভাঙল রুহিই।
ছবিগুলো শক্ত করে মুঠোর ভেতর চেপে ধরে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
Mad for you 2 part 34
— কে আপনি?
— কী চান আমার কাছে?
তার কণ্ঠ আরও উঁচু হয়ে উঠল।
— আর এসব কী? আমার ছবি আপনার কাছে কেন?
প্রশ্নগুলো ছুড়ে দিয়ে সে স্থির দৃষ্টিতে ক্ৰুশের দিকে তাকিয়ে রইল।
