Mad for you 2 part 33
তানিয়া খাতুন
চোখ বড় বড় করে ক্রুশের দিকে তাকিয়ে আছে রুহি।
রাগে, অপমানে আর অসহায়ত্বে তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল হয়ে উঠেছে।
সেই দৃষ্টিতে যেন হাজারটা প্রশ্ন, হাজারটা প্রতিবাদ জমে আছে।
কিন্তু মুখে বাঁধা রুমালের কারণে সেগুলোর একটাও প্রকাশ করতে পারছে না সে।
রকিং চেয়ারে হাত বাঁধা অবস্থায় বসে আছে রুহি।
ক্রুশ নিজের বেল্ট খুলে তার দুই হাত শক্ত করে বেঁধে দিয়েছে।
বারবার নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে রুহি।
কখনো কবজি মোচড়াচ্ছে, কখনো পুরো শরীরের জোর লাগাচ্ছে।
কিন্তু কোনোভাবেই মুক্ত হতে পারছে না।
বরং প্রতিবার ব্যর্থ হয়ে তার ভেতরের ক্ষোভ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে ক্রুশ।
তার চোখে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। যেন বহুদিনের জমে থাকা অনুভূতি, অভিমান আর আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
সে ধীরে ধীরে নিজের শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করে।
তার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু শুধুই রুহি।
রুহির এই রাগে লাল হয়ে যাওয়া মুখ, তার চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, প্রতিটা নড়াচড়া—সবকিছুই যেন ক্রুশকে আরও বেশি টানছে।
বহুদিন ধরে সে এই মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করেছে।
বহু রাত একা কাটিয়েছে, অসংখ্য স্মৃতি নিয়ে ঘুমহীন রাত পার করেছে।
তার বিশ্বাস, এই মেয়েটিই তার সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষ, যে আজ তাকে চিনতে না পারার অভিনয় করছে।
নিজের ভাবনার মধ্যেই ক্রুশ শার্টটা খুলে পাশের টেবিলে ছুড়ে ফেলে।
তার বুকের ভেতর তখন ঝড় বইছে।
সে মনে মনে ভাবছে, হয়তো কাছে গেলে সব ভুল বোঝাবুঝি মিটে যাবে।
হয়তো রুহি আবার আগের মতো হয়ে যাবে।
হয়তো তাদের মাঝখানের দূরত্বটা এক মুহূর্তেই মুছে যাবে।
এই ভাবনাগুলোই তাকে আরও বেপরোয়া করে তোলে।
সে ধীরে ধীরে রুহির দিকে এগিয়ে যায়।
রুহি সঙ্গে সঙ্গে চেয়ারে ছটফট করতে শুরু করে।
তার চোখের ভাষা স্পষ্ট—সে এই পরিস্থিতি চায় না।
কিন্তু সেই ভাষা পড়ার মতো অবস্থায় নেই ক্রুশ।
নিজের অনুভূতির গভীরতায় ডুবে গিয়ে সে বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে।
ক্রুশ ঝুঁকে রুহির মুখ থেকে রুমালটা সরিয়ে ফেলেই ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়।
রুহি কিছু বলার সুযোগ পায় না, তার আগেই নিজের ঠোঁটে ক্রুশের স্পর্শ অনুভব করে।
সে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু সম্ভব হয় না।
ক্রুশ ইতিমধ্যে তার চুলের মুঠি শক্ত করে চেপে ধরেছে, আর অবিরাম তার ঠোঁটের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে, শুষে নিচ্ছে সব মধু।
যেনো বহু দিনের ক্ষুধা নিবারণ করছে।
প্রায় অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল।
রুহির শ্বাস নেওয়া ক্রমশ কষ্টকর হয়ে উঠছিল।
এখনও সে মুক্তি পাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ফলাফল ছিল বরাবরের মতোই শূন্য।
ক্রুশের এক হাত রুহির চুলের ভাঁজে নিবিষ্ট ছিল, আর অন্য হাতটি শার্টের আড়াল ভেদ করে তার কোমল উদরে বিচরণ করছিল।
সেই স্পর্শে রুহির নারীমন ও শরীর আরও অস্থির হয়ে উঠছিল।
কিন্তু সেদিকে ক্রুশের যেন কোনো ভ্রুক্ষেপই ছিল না।
সে তখন সম্পূর্ণ ব্যস্ত রুহির কোমল অধরের মায়ায়।
বহুদিন পর যেন নিজের পুরোনো নেশাকে ফিরে পেয়েছে সে।
রুহির অধরদ্বয়ে এমন এক অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল, যা ক্রুশ কে বারবার নিজের দিকে টেনে নিচ্ছিল।
তার কাছে সেই অনুভূতিটা যেন আফিমের নেশার মতো— একবার ছুঁয়ে দেখলে বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রুশ যেন চারপাশের সবকিছু ভুলে যেতে লাগল।
তার সমস্ত মনোযোগ, সমস্ত অনুভূতি এসে স্থির হলো রুহিকে ঘিরেই।
আর রুহি, নিজের অসহায়তা ও অস্থিরতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে ক্রমেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল।
অবশেষে অধর সরিয়ে মেয়েটির লাল হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকাল বাসনাময় পুরুষটি।
মেয়েটি ঘন ঘন শ্বাস নিতে নিতে ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু বলতে চাইল।
কিন্তু দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসের কারণে তার মুখ দিয়ে কোনো স্পষ্ট শব্দ বেরিয়ে এলো না।
সেই সুযোগটিই যেন কাজে লাগাল ক্রুশ।
এক টানে রুহির শার্টের সামনের অংশ খুলে দিল সে, ফলে একে একে বোতামগুলো খুলে নিচে পড়ে গেল।
রুহি কিছু বলার সুযোগই পেল না।
তার আগেই ক্রুশ আবারও নিজের অধর মিলিয়ে দিল তার অধরের সঙ্গে।
মুহূর্তের মধ্যেই সে রুহিকে তুলে নিল নিজের কোলে।
রুহির দুই পা তার কোমরের দুই পাশে আবদ্ধ হয়ে রইল।
রুহিকে বুকে আগলে নিয়ে ক্রুশ ধীরে ধীরে চেয়ারে গিয়ে বসল।
চারপাশের নীরবতার মাঝখানে কেবল তাদের ভারী শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দই যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
আর রুহি, সমস্ত ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে, নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে।
তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে।
দুজনের মাঝের দূরত্ব তখন আর প্রায় নেই বললেই চলে।
ক্রুশের বেল্টে আবদ্ধ রুহির দুটি হাত সে নিজের গলার চারপাশে জড়িয়ে নিল।
পরমুহূর্তেই তার উষ্ণ নিশ্বাস এসে স্পর্শ করল রুহির বক্ষদেশ।
সেই স্পর্শে রুহির সমগ্র দেহ যেন অজানা এক অস্বস্তিতে শিউরে উঠল।
কিছুক্ষণ ধরে ক্রুশের দৃঢ় দুই হাতের বিচরণ চলতে থাকল।
তার চাপ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতেই রুহির কণ্ঠ থেকে চাপা গোঙানির শব্দ বেরিয়ে এল।
কিন্তু সেই শব্দ স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারল না, কারণ ক্রুশ পুনরায় তার মুখে রুমাল বেঁধে দিয়েছিল।
ফলে তার সমস্ত প্রতিবাদ ও অসহায়তা রুদ্ধ হয়ে রইল।
কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ক্রুশ কোমল স্থানে নিজের অধরের স্পর্শ রাখল।
স্পর্শের সেই ক্ষণস্থায়ী অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হলো মৃদু কামড়ের চাপ, যা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল।
রুহির দেহে অদ্ভুত এক কম্পন বয়ে গেল, অথচ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার কোনো উপায় তার ছিল না।
এত কিছুর পরও ক্রুশের মনে শান্তির কোনো ছাপ দেখা গেল না।
বরং তার অন্তরের অস্থিরতা যেন আরও প্রকট হয়ে উঠল।
তার দৃষ্টিতে ফুটে উঠল এক অদম্য অশান্তি, যেন সমস্ত কিছু অর্জন করেও সে কাঙ্ক্ষিত প্রশান্তির নাগাল পাচ্ছে না।
যত সময় গড়াতে লাগল, ততই তার সেই অস্থিরতা গভীরতর হয়ে উঠতে লাগল।
কাঙ্ক্ষিত স্থানে হাত পড়তেই রুহি যেন আরও একবার ভয়ে ছটফট করে উঠল।
কিন্তু নড়াচড়া করার মতো শক্তি তার আর অবশিষ্ট ছিল না।
ক্রুশ তাকে এমনভাবে নিজের বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছিল যে মুক্ত হওয়ার সামান্য সুযোগও তার ছিল না।
ক্রুশ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে রুহির কানের কাছে মুখ নিয়ে এল।
তারপর নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
— তোর এই বুক, কোমর, পিঠ— তোর শরীরের প্রতিটি অংশ আমার চেনা, বাটারফ্লাই।
আমার পূর্ণ বিশ্বাস, তুই-ই আমার বাটারফ্লাই।
তুই যতই অস্বীকার করিস না কেন, আমি জানি তুই আমার লেদু সোনা।
কথাগুলো শেষ করেই ক্রুশ রুহির কোমর শক্ত করে চেপে ধরে তাকে নিজের সামনে বসিয়ে নিল।
রুহি দ্রুত মাথা নেড়ে নিজের অসম্মতির কথা বোঝানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু ততক্ষণে ক্রুশ যেন নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।
হঠাৎ করেই যেন ঝড়ের সূচনা হলো।
রুহি ব্যথায় গুঙিয়ে উঠল।
ক্রুশ নিজের নেশাভরা দৃষ্টি তুলে প্রেয়সীর মুখপানে তাকাল।
মেয়েটি চোখ বন্ধ করে কুঁকড়ে ছিল, মুখে স্পষ্ট ক্লান্তি আর যন্ত্রণার ছাপ।
সেই দৃশ্য দেখেই ক্রুশের মনে ভেসে উঠল অতীতের অসংখ্য মুহূর্ত।
এই মেয়েটিই তো তাকে বহুবার এমনভাবে পাগল করে তুলেছে, নিজের সমস্ত স্থিরতা হারাতে বাধ্য করেছে।
আজও যেন তার ব্যতিক্রম ঘটল না।
রুহির কপালে আলতো করে একটি চুম্বন এঁকে দিল ক্রুশ।
তারপর গভীর এক নিশ্বাস ফেলে তাকে আরও শক্ত করে নিজের বুকে আগলে নিল।
যেন নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে এই মুহূর্তটাকে ধরে রাখতে চাইছে।
রুহি ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।
না চাইলেও একসময় মাথাটা এসে ঠেকল ক্রুশের বুকে।
তার চোখ দুটি এখনও বন্ধ, আর দ্রুত ওঠানামা করা শ্বাস-প্রশ্বাস যেন তার অবসন্নতারই সাক্ষ্য দিচ্ছিল।
মুখ খোলা থাকলে হয়তো সে অনেক কিছুই বলত— কিন্তু সেই সুযোগ তার ছিল না।
ক্রুশ যেন এক অদ্ভুত উন্মত্ততায় হারিয়ে গিয়েছিল।
চারপাশের সবকিছু ভুলে তার সমগ্র সত্তা আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল এই একটি মুহূর্তে।
ভবিষ্যতে কী হবে, তার পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে— সে সম্পর্কে তার কোনো ভাবনা ছিল না।
সে শুধু জানত, এই মুহূর্তটি তার কাছে ভীষণ মূল্যবান, ভীষণ প্রয়োজনীয়।
তাই সে সমস্ত দ্বিধা ও সংশয় দূরে সরিয়ে রেখে সেই ক্ষণটুকুকে নিজের অস্তিত্বের গভীরে ধারণ করে রাখতে চাইল।
রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে আমান। তার হাতে জুসের একটি ক্যান, যেখান থেকে মাঝে মাঝেই ছোট ছোট চুমুক নিচ্ছে সে।
দুটি চোখ অদ্ভুতভাবে শূন্য দৃষ্টিতে ব্যস্ত রাস্তার দিকে স্থির হয়ে আছে।
যেন কাউকে খুঁজছে। যেন প্রাণপণে অপেক্ষা করছে কোনো অলৌকিক ঘটনার জন্য।
তার মনে হচ্ছে, যদি হঠাৎ করেই কোনো জাদু ঘটে যায়!
যদি বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া মানুষটিকে একবারের জন্য হলেও দেখতে পায়!
অগাধ আশা নিয়েই সে ক্রুশের সঙ্গে ইতালিতে এসেছে।
হঠাৎই স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠল সেই কালো অতীত, যে অতীত প্রতিদিন একটু একটু করে তাকে শেষ করে দিচ্ছে।
সেদিন ছিল শুক্রবার।
আমান তার বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে সিমরানদের বাড়িতে গিয়েছিল বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।
নিজের সামর্থ্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই সিমরানের বাবা-মায়ের সামনে তুলে ধরেছিল সে।
কিন্তু সব কথা শোনার পরও তারা এই সম্পর্কের ব্যাপারে সম্মতি জানায়নি।
বরং সেদিন তারা এমন একটি সত্য প্রকাশ করেছিল, যা এতদিন আড়াল করেই রেখেছিল।
এমন একটি বিষয়, যার সম্পর্কে সিমরান নিজেও অবগত ছিল না।
সিমরানের বিয়ে তারা আগে থেকেই ঠিক করে রেখছিলো।
নিরাশ ও ভাঙা মন নিয়ে সেদিন বাড়ি ফিরে এসেছিল আমান ও তার পরিবার।
তবে আমান এত সহজে হাল ছাড়ার মানুষ ছিল না।
সে বহুবার সিমরানের সঙ্গে কথা বলেছিল।
তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। বিয়ে করে একসঙ্গে জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিল।
কিন্তু সিমরান কখনোই নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে যেতে রাজি হয়নি।
সময় থেমে থাকে না। এক বছরের মধ্যেই সিমরানের বিয়ে হয়ে যায়।
বিয়ের আগের রাতে সিমরান আমানকে ফোন করেছিল।
মেয়েটির কণ্ঠ ভীষণ ভারী ছিল। মনে হচ্ছিল সে অনেক কেঁদেছে।
খুব ছোট্ট করেই সে বলেছিল,
— ভালো থেকো, আমান।
কথাটা ছিল মাত্র দুটি শব্দের, কিন্তু সেই দুটি শব্দই যেন আমানের সমগ্র জীবনকে বদলে দিয়েছিল।
কারণ সেই দিনের পর থেকে সত্যিকার অর্থে আর ভালো থাকা হয়নি তার।
পরে খোঁজ নিয়ে সে জানতে পেরেছিল, বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই সিমরান তার স্বামীর সঙ্গে ইতালিতে চলে গেছে।
আর ঠিক সেই কারণেই যখন আমান জানতে পারে ব্যবসায়িক কাজে ক্রুশ ইতালিতে আসছে, তখন সে নিজের মনকে আর সামলাতে পারেনি।
সে কোনো অন্যায় করতে আসেনি। কারও সংসার ভাঙতে চায়নি।
তার একমাত্র ইচ্ছে ছিল দূর থেকে একবার সিমরানকে দেখা।
Mad for you 2 part 32
শুধু একবার।
এত বছরের ভালোবাসার মানুষটিকে এক ঝলক দেখেই হয়তো সে নিজের অস্থির হৃদয়টাকে বোঝাতে পারবে—
কিছু গল্প কখনো পূর্ণতা পায় না, তবুও মানুষ সেগুলো বুকে আগলে সারাজীবন বেঁচে থাকে।
