Home প্রিয় প্রণয়িনী ২ প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬২

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬২

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬২
জান্নাত নুসরাত

বিবাহ সম্পূর্ণ হলো। ইসলামী শরিয়ত মতে আজ থেকে আপনারা স্বামী স্ত্রী। স্বামীকে সবসময় সম্মান করো কিন্তু, মা। তাকে নারাজ হতে দিও না কখনো!
নববধূ মাথা দোলাল উপর নিচ। নবদম্পতির সুখ শান্তি কামনা করে দীর্ঘ এক দোয়া পাঠ করলেন ইমাম। দোয়া শেষে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। তার সাথে লাল লেহেঙ্গা পরিহিতা নিজেও উঠে দাঁড়াল। আরশ চাইল একবার পিছু ফিরে মেয়েটা তার দিকে তাকাক, কিন্তু তার মনোবাসনা পূরন হলো না, মেয়েটা ফিরে তাকাল না তার দিকে। চলে গেল সিঁড়ির দিকে। হাঁটার তালে তার মাথা হতে ঝড়ে পড়ল জরজেটের দোপাট্টাখানা, লুটিয়ে পড়ল সিঁড়ির কাছে৷ খুলে রাখা চুলগুলো পিঠের উপর মুক্তো দানার মতো আলো ছড়াল। আরশের চোখগুলো তার পিঠ হতে ধীরে ধীরে পায়ের দিকে নেমে গেল। বাঁ-পায়ের মধ্যমা আঙুলের মধ্যে রুপালি রঙের রিং। আরশের চোখ সেখানেই স্থির হলো। সে চোখের পাতা ফেলতে ভুলে গেল। সে শ্বাস নিতে পারল না।। তার কাছে সব সপ্ন মনে হলো। তার বিশ্বাস হলো না সামনে দাড়ানোর ব্যক্তিটি তার স্ত্রী! সে বিশ্বাস করতে পারল না, ওই মেয়েটা তার সামনে দাঁড়িয়ে!

যে একটু পূর্বে তার নামে কবুল পাঠ করেছে, যে হেঁটে যাচ্ছে এখন উপরের দিকে। নিজের চোখের ভুল ভেবে সে কয়েকবার চোখের পলক ও ফেলল। না মেয়েটা এখনো সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠছে। দু-হাতে আঁকড়ে ধরেছে লেহেঙ্গার নিম্নাংশ। কচু পাতা রঙের মারবেল টাইলসে তার মোমঢালা নরম পা দুটো স্পর্শ করে যাচ্ছে নৃত্যের মতো। আরশ এক-পা দু-পা করে মেয়েটার পিছু পিছু সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে লাগল। বাহিরে মেঘে গর্জন শোনা যাচ্ছে, বৃষ্টি শুরু হবে আবারো। বাহিরের বৃষ্টির সাথে পাল্লা দিয়ে উড়ছে বাড়ির পর্দাগুলো, সাথে উড়ছে সামনের মেয়েটার চুল। নাকে এসে লাগছে কুস্তুরীর মিষ্টি সুবাস। আজ যেন সেই ঘ্রাণে পুরো বাড়ি মো মো করে উঠছে। মানবীর সিঁড়ি ভেঙে ওঠা পা থামল, সেই ক্ষণে মানবের পা থামল। মানবী ঘুরে তাকাল মানবের দিকে। তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি নিক্ষেপ করল, কপালে ভাঁজ ফেলে শুধাল গম্ভীর স্বরে,”আমার পিছু নেওয়া হচ্ছে কেন?

আরশ কথার উত্তর দিতে পারল না, হা করে তাকিয়ে থাকল জ্যৌলুস পূর্ণ নারী চেহারার দিকে। ঢোক গিলল। সে ওই তীক্ষ্ণ চোখের বিঃধ্বংসী নারীর দিকে বেশিক্ষণ তাকাতে পারল না। চোখ ধরে আসলো, সেকেন্ডের ভেতর সরিয়ে নিল দূরে। মানবী প্রশ্নের উত্তরের জন্য এখনো চেয়ে আছে তার দিকে। আরশের বুকের হৃদযন্ত্রটা ঢিপঢিপ করে বেপরোয়া কম্পন তুলছে। অসাড় হওয়া মস্তিষ্ক নিয়ে আবারো সে তাকাল ওই মুখের দিকে। মনে হলো এই বুঝি হৃৎপিন্ডটা বেরিয়ে আসবে! তার চোখকে সে ভরসা করতে পারছে না এই মুহুর্তে, এক পলক করে তাকিয়েই সে চোখ সরিয়ে নিল। নিজের প্রতি অবিশ্বাস নিয়ে আরেক পা আগাল সামনে। জিভের কাছে নোনতা স্বাদ অনুভূতি হলো তার। একটু পূর্বে ঘুষি পড়ে কেটে গিয়েছে হয়তো। এসবের তোয়াক্কা করল না সে। মেয়েটার থেকে দু-সিঁড়ি দূরত্বে দাঁড়িয়ে গেল। বাদামি বর্ণের চেহারাটা একদম তার সম্মুখে। ঠোঁট বাঁকিয়ে তার দিকে ঝুঁকে আসছে। চোখাচোখি হলো, তা ভেঙে দিয়ে মানব হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। হাঁটুর চামড়াতে ব্যথা পেলেও, চোখ বুজে তা সয়ে নিল। মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল চারহাত লম্বা দোপাট্টা
সে হাত বাড়িয়ে লাল রঙের দোপাট্টা স্পর্শ করল। আবারো অনিশ্চয়তায় চোখ বন্ধ করে অপেক্ষা করল ছাই হয়ে সব উড়ে যাওয়ার, কিন্তু আজ আর ছাই হয়ে কিছু উড়ে গেল না। সে চোখ খুলে দেখল হাতের দোপাট্টা হাতেই আছে, সামনের ব্যক্তি এখনো সামনে দাঁড়িয়ে, তাকিয়ে আছে তার দিকে নিষ্পলক। ভীষণ যত্নের সহিত মেঝেতে গড়াগড়ি খাওয়া দোপাট্টা দু-হাতের অঞ্জলিতে প্যাঁচিয়ে নিল সে। নিম্নাংশে চুমু খেল সময় নিয়ে। সামনে দাঁড়ানো নববধূ অবাক হলো এতে ভীষণ! অপ্রত্যাশিত ঘটনায় মুখটা হতবিহ্বল রুপ ধারণ করেছে। তা তার চোখের দৃষ্টিপাত দেখেই বোঝা যায়। সে তাকিয়ে রয় নির্মিশেষ মানবের মুখের দিকে। লোকটা দোপাট্টা নিজের অধর থেকে নামিয়ে বুকের কাছে চেপে ধরেছে।। দৈর্ঘ্যে লম্বা দোপাট্টায় ঢেকে গেল পাহাড় সমান উচ্চতার লোকটার চেহারা।

আরশ বসে রইল অনেকক্ষণ। নীরব, নিশ্চুপ, চুপচাপ! সেই নীরবতা কেউ ভাঙল না। সবাই শ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে রইল। ঘড়ির কাটার টিক টিক শব্দ ছাড়া আর একটাও টু শব্দ শোনা গেল না। আরশ নুসরাতের সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে রেখে একটু পরই দ্বিতীয় বারের ন্যায় হুহু করে কেঁদে উঠল। একহাতে দোপাট্টা শক্ত করে নিজের সাথে চেপে ধরে পকেট হাতড়াল।
সামনে দাঁড়ানো মেয়েটা চুপচাপ দেখল লোকটার কান্ড। ধৈর্য নিয়ে পরিলক্ষণ করল সবকিছু। কী করছে লোকটা, কী করবে, সেসব বিষয়ে উদ্বেগ জন্মাল৷ উদ্বেগ জন্মালেও তা চাপা দিল মনের ভেতর। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে মনোনিবেশ করল তার সামনে। তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসা লোকটা নিজের পকেট হাতড়ে মানিব্যাগ বের করছে। কাঁপা হাতে টাকার নোট বের করতে গিয়ে তা ঝড়ে পড়ে গেল হাত থেকে। থরথর করে কাঁপতে থাকা মৃর্গী রোগীর ন্যায় সাদা হাতগুলোর দিকে মেয়েটা তাকিয়ে রইল এক দৃষ্টিতে। লোকটা পড়ে যাওয়া টাকাগুলো আবারো সিঁড়ি থেকে কুড়িয়ে নিল। সে জানে এবার কী হবে! টাকা গুলো তার পাশে ফেলা হবে! তার নজর কাটবে এই লোক! তাই হলো, টাকাগুলো আরশ মেয়েটার পুরো মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঘুরিয়ে নজর কাটল। হাতের মুঠোয় তখনো দোপাট্টা ধরে রাখা তার, যেন ছেড়ে দিলেই উড়ে যাবে মেয়েটা। মানব এবার সোনালি কাজের লেহেঙ্গা জড়ানো মেয়েটার মুখোমুখি হলো। মেয়েটা ভ্রু কুটি করে চেয়ে আছে তার দিকে। পরবর্তী কাজটা কী হবে বুঝতে পারছে না ঠিক! মানব নিজের মুখ মেয়েটার মুখের একদম সংস্পর্শে নিয়ে গেল। পুরো পরিবারের সামনে দাঁড়িয়ে নির্লজ্জের মতো আরশ হেলাল তার নববধূকে চুমু খেল। আর তা নিচে দাঁড়িয়ে হা করে দেখল পুরো পরিবার।। তখনো সবাই শ্বাস আটকে, পিনপতন সেই নীরবতায় শ্বাস ফেলার শব্দই যেন বিকট রুপ ধারণ করবে।

আরশ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মেয়েলি চেহারাটা দেখল। কপাল, ঘাড়ের একপাশ পুড়ে গিয়ে দাগ পড়েছে। হাত বাড়িয়ে আলগোছে ছুঁয়ে দিল পুড়া অংশ। মেয়েটা কপাল ভাঁজ করল। আরশ পরোয়া করল না তার মুখের ভাবগতি, একহাতে মাথার পেছন আকড়ে ধরে টেনে নিল নিজের কাছে। নিজেদের মধ্যে ইঞ্চি পরিমাণ জায়গা ফাঁকা রাখল না সে৷ শক্ত করে চেপে ধরে রাখল নিজের সাথে। যেন ছেড়ে দিলেই সে হারিয়ে যাবে। কাঁধে মুখ গুজে স্বস্থির শ্বাস ফেলল মানব। নাক টেনে কুস্তুরীর সুগন্ধি টেনে নিল নিজের হৃদয়ের ভেতর। গা হতে বের হওয়া তাপ শীতিল হয়ে আসলো কয়েক মিনিটের মধ্যেই। বুক ভার হয়ে আসা অনুভূতি নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। মানবী উপলব্ধি করল ভর ছেড়ে দিচ্ছে লোকটা তার উপর। সে ভার সামলাতে না পেরে দু-পা পিছিয়ে যেতে নিলে আরশ কোমর টেনে জড়িয়ে ধরল নিজের সাথে তাকে, একদম আষ্টেপৃষ্টে, শক্ত করে। চোখ চেপে ধরল ঘাড়ের খালি অংশে। মানবীর মনে হলো তার কাঁধ ভিজে যাচ্ছে একটু একটু করে। আরশ তাকে এক মুহুর্তের জন্য ছাড়ল না। এক মুহুর্তের জন্য নিজের আশপাশ হতে সরতে দিল না। কারণ লাল লেহেঙ্গা পরিহিত সিঁড়িতে দাঁড়ানো নববধূ আর কেউ ছিল না, সে ছিল সৈয়দ বাড়ির বউ, সৈয়দ নাছির উদ্দিনের উড়নচণ্ডী কন্যা, আরশ হেলালের নববিবাহিত স্ত্রী, সৈয়দা নুসরাত নাছির..! যাকে সেদিন আরশের কাছে মনে হয়েছিল, হৃদয় থমকে দেওয়ার মতো সুন্দরী। তার থেকে বেশি সুন্দরী নারী এই পৃথিবীর বুকে আরশ হেলাল আর দ্বিতীয় কাউকে দেখেনি।

সোফার উপর পাশাপাশি বসা আরশ নুসরাত। একহাত দিয়ে শক্ত করে তার হাত চেপে ধরে রেখেছে নিজের সাথে। নুসরাত দু-একবার ছাড়ানোর চেষ্টা করেছিল, তার ফলস্বরূপ আরো শক্ত হয়েছে। ইরহাম আর সৌরভি টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে একে অন্যের সাথে নাক ফোলাফুলি করছে। সৌরভির রাগী স্বর ভেসে এলো,”আমাদের এভাবে অনুষ্ঠান করে বিয়ে হবে না, ইরহাম?
ভ্রু উচিয়ে ছেলেটা ঠোঁট নাড়িয়ে শুধাল,“কেন?
“তোমার কী ইচ্ছে নেই আমাকে বঁধু সাজে দেখার?
ইরহাম উত্তর দিল না।সৌরভি দু-হাতে তার বাহু চেপে ধরে ঝুলে পড়ল। বলল,”রাখবে না আমার কথা? বলো রাখবে না, ইরহাম? আমার তো শখ, আহ্লাদ আছে, তাই না?

ইরহাম শান্ত চোখ ঘুরিয়ে তাকাল ঝুলন্ত মেয়েটার দিকে। নুসরাতের দীর্ঘ দোপাট্টা রাখা ছিল সোফার উপর। সৌরভিকে নিজের বাহুতে ঝুলিয়ে রেখেই সেদিকে গেল। সোফার উপর থেকে লম্বা দৈর্ঘ্যের দোপাট্টা তুলে সৌরভিকে পরিয়ে দিল। বলল,”নাও, তুমি বঁধু হয়ে গেছো। আজ ভাবো আমাদের বিয়ে হয়েছে।
সৌরভি ভ্রু কুঁচকাল। ঘোমটার নিচ থেকে মুখ বের করতে করতে বলল,”এটা কোনো কথা হলো? এভাবে না!
ইরহাম আবারো তার মুখ ঢেকে দিল। চোখ পাঁকিয়ে বলল,”গরীবদের বিয়ে এইভাবে হয়, সৌরভি। আমি বড়লোক না সবার মতো, তাই আমাদের বিয়ে এইভাবে হবে।
সৌরভি ঘোমটার নিচে দাঁত কেলিয়ে মুখ লুকাল। বলল,”আচ্চা, ঠিক আছে! আমি যশেতু ভদ্র বউ তাই, এভাবে মেনে নিচ্ছি৷ ঘোমটা তুলবে কিন্তু তুমি! হ্যাঁ? আমি যখন জিজ্ঞেস করব কার বউ লাগছে তখন বলবে, আমার বউ, হু?
ইরহাম মাথা দোলাল। সে বুঝতে পেরেছে সৌরভির কথা। মেয়েটা ঘোমটা টেনে দিতেই ইরহাম সময় নিয়ে তুলল। তোলার পর দেখল সৌরভি মিটমিট করে হাসছে তার দিকে তাকিয়ে। গালটা হাসির তোড়ে ফুলেফেপে উঠেছে। ইরহাম বুকের একপাশ চেপে ধরতেই সৌরভি জিজ্ঞেস করল,”কার বউ লাগছে?
ইরহাম বুকের একপাশ চেপে ধরে রেখেই সৌরভির কথার উত্তর দিল,”আমার বউ, সৈয়দ বাড়ির সেজ ছেলের বউ।

নুসরাত তাদের দু-জনের ডং পেছনে বসে দেখল। ঘন্টাখানেক কাটার পর একসময় উঠে দাঁড়ানোর তাগিদ বুঝতে পারল। বসতে বসতে কোমর ব্যথা করছে তার। তখনো আরশ তার হাত চেপে ধরে রেখেছে নিজের সাথে। নুসরাত নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল। বলল,”হাত ছাড়ুন!
আরশ হাত ছাড়ল না ধরে রাখল আগের মতোই। নুসরাত আরো দুয়েকবার চেষ্টা করল হাত ছাড়ানোর, সম্ভব হয়ে উঠল না। ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাতেই দেখল সোফায় গা এলিয়ে বসে আছে আরশ৷ চোখ দুটো বন্ধ। নুসরাত জড়তা নিয়ে হাত বাড়াল ধাক্কা দেওয়ার জন্য, আবারো তা গুটিয়ে নিল। নিশ্চিন্ত মুখটার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। নাকের ডগায় ছোটোখাটো একটা তিল তার নজর কাড়ল। পুরো মুখের উপর অন্বেষণ করল তার চোখ। আস্তে ধীরে তার নয়নযুগল নেমে এলো গলার কাছে। খুব ধীরে ধীরে অ্যাডামস অ্যাপলটা নড়াচড়া করছে, পুরুষালি কন্ঠদেশের পাশেই কালো গাঢ় একটা তিল। নুসরাত সেদিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। চোখ দুটো ঘুরতে ঘুরতে নিজের হাতের কাছে স্থির হলো। এখনো শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে নিজের সাথে। নুসরাত তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় কিছু কথা নাড়া দিল তার ভেতর। আরশ তাকে দেখার পর আর একটা শব্দ উচ্চারণ করেনি! নুসরাত যা যা জিজ্ঞেস করেছে তার উত্তর দিয়েছিল, তা ও খুব ঠান্ডা স্বরে। সে শুধিয়েছিল,”জানতে চাইবে না, এতদিন কোথায় ছিলাম? কী করেছি? কেন কাউকে কিছু জানাইনি?

আরশ এই প্রশ্ন করার পর দীর্ঘ সময় তার দিকে তাকিয়ে ছিল। শীতিল চোখ দুটো বরফের মতো ঠান্ডা। গলার আওয়াজ একদম নিচু, যেন সামান্য উঁচু করে কথা বললে নুসরাতের শুনতে কষ্ট হবে,”না!
না শোনে ভ্রু কুঁচকাল নুসরাতের। জিজ্ঞেস করল,”কেন?
আরশ সে কথার উত্তরে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। কন্ঠদেশের উঠানামা বাড়ল সময়ের সাথে। নুসরাত দেখল সেসব, তবুও অপেক্ষা করল উত্তরের জন্য,“প্রয়োজন বোধ মনে করছি না!

আরো কিছু বলতে নিবে মেয়েটা আরশ তার কথা কেটে দিয়ে সোফায় গা এলিয়ে শুয়ে পড়ল। শ্বাস ফেলল। যাকে স্বস্থির নিঃশ্বাস বলে! বলল,”তুমি যেমন আমার কাছে জানতে চাওনি অনিকাকে আমি কেন বিয়ে করছিলাম তার কারণ, তেমন করে আমিও জানতে চাইব না। তুমি কোথায় ছিলে, কী করছিলে, কেন কিছু বলোনি এসবের কারণ আমি জানতে চাই না৷ এই মুহুর্তে তুমি আমার সামনে বসে আছো, আমার স্ত্রী হিসেবে, এটাই আমার জন্য অনেক। আমি যখন কবুল বলে তোমাকে নিজের করেছি, তখন আমি তোমার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত, তোমার স্বভাব, তোমার নিজস্বতা, তোমার আচরণ, রাগ, ক্রোধ, সব কবুল করেছি। তুমি আগে কী করেছ, কী করোনি তা আমি জানতে চাই না! আমি শুধু জানব আমার স্ত্রী হিসেবে তুমি কী করছ, কী করোনি! আমি এসবের কৈফিয়ত চাইব। আমার এর থেকে বেশি কোনোকিছু জানা বা বোঝার ইচ্ছে নেই।
নুসরাত তখন হা করে চেয়েছিল। সবাই যেখানে হাজারটা প্রশ্ন করেছে, সেখানে এই লোক বলে কিনা সে কিছু জানতে চায় না! এত পরিবর্তন, এত পরিবর্তন, কীভাবে হলো! সে মানতে পারল না, হা করে চেয়েই রইল। তার তাকিয়ে থাকা বিশেষ পাত্তা না দিয়ে একহাত বুকের কাছে চেপে ধরে লোকটা চোখ বুজল। নুসরাত ভেবেছিল একটু শুয়েছে, কিন্তু এমন গভীর ঘুম দিচ্ছে তখন বুঝল যখন সে ডাকল, আর তার ডাকে লোকটা বিন্দুমাত্র নড়ল না। নুসরাত নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য শক্তি প্রয়োগ করল, অতিরিক্ত নড়াচড়ায় আরশ একবার চোখ খুলে তাকিয়ে বন্ধ করে নিল। অতঃপর নিভু নিভু কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,”কী হয়েছে?
নুসরাত হাত ছাড়ানোর চেষ্টায় রপ্ত থেকে বলল,“হাত ছাড়ুন!

“কেন?
“ আমি বলছি বলে, হাত ছাড়ুন!
আরশ ছাড়ল না, আরো শক্ত করে নিজের আঙুলের ভাঁজে ঢুকিয়ে নিল। বলল,”এই হাত ছাড়ার জন্য ধরিনি। আর এখন তো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছাড়ছি না, কবর পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাব এই হাত আর হাতের মালিককে।
নুসরাত ঠোঁট টিপে তপ্ত শ্বাস ফেলল। তার বলতে ইচ্ছে হলো, এটা কে ভাই! কোথা থেকে উঠে এসেছে? কে এই মেন্টাল! বলতে ইচ্ছে হলো না, তাই চেপে গেল ভেতরে। নিজেও গা এলিয়ে দিল সোফার উপর। কোমর ব্যথা করছে টনটন করে। সাথে তো আছেই কাঁধের ব্যথা। গুলিটা এভাবে ঢুকে না বের হলে জীবনে বুঝতে পারত না কতটা ব্যথা লাগে। নুসরাত সোফায় মাথা রেখে একবার তাকাল আরশের দিকে। বুকের কাছের তিনটা বোতাম খোলা থাকায় বুকের বাঁ-পাশ দেখা যাচ্ছে। এখানেই নুসরাত একদিন গুলি করেছিল, তখন আরশ কী করেছিল? হেসেছিল? হ্যাঁ হেসেছিল! ব্যথা লাগেনি? প্রশ্ন মনে জাগলেও চাপা দিল, ডান হাতখানা দিয়ে ছুঁয়ে দিল ওই জায়গাটা। সময়ের সাথে ভরাট হয়ে গেছে কিন্তু এখনো গুলির দাগ থেকে গেছে। তাহলে কী তার কাঁধের দাগটা ও আর মিটবে না?

রুহিনী বেগম, ইরহাম, সৌরভি, আহান, আমিরা বাসর ঘর সাজাচ্ছে। আহান কাজ কম করছে, চ্যাঁচাচ্ছে বেশি। আমিরা সৌরভি আর ইরহামকে বিয়ের কথা বলতে দেখে একবার গদগদ হয়ে বলেছিল,”চলুন, আমরা আবারো বিয়ে করি!
আহান তখন তার দিকে তাকাল এমনভাবে যেন চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। খ্যাক করে ওঠে শুধাল,”কেন?
আমিরা ইশারায় দেখাল ইরহাম আর সৌরভিকে। ইরহাম ঘোমটা তুলে বুকে হাত চেপে ধরছে, তা দেখে হাসছে সৌরভি। আহান চোখ সরিয়ে তাকাল আমিরার গোলগাল মুখটার মতো। থুতনির দিকে চোখ আটকাল। তখন সে বুঝতে পারল আমিরাকে কখনো ঠিকভাবে তাকিয়েই দেখেনি। থুতনিটা দেখতে আপেলের মতো! আপেলের মতো থুতনির নিচের দিকে একটা তিল,যেখানে এসে মিহি আলো খেলা করছে। চোখ সরিয়ে সে তাকাল মুখের দিকে, ভীষণ আশা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে চোখগুলো৷ আহান তাতে পানি ঢালতে চাইল না, তবুও মুখ ফেড়ে তেতিয়ে ওঠা স্বর বেরিয়ে এলো,”কীসের বিয়ে? যত্তসব ন্যাকাগিরি! আহান নাওফিল ন্যাকামি ট্যাকামি করে না।

আমিরার মুখটা কালো ছায়ায় ঢেকে গেল। চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। শান্ত মেয়েটা মেজাজ দেখাল,” আপনার কাছে সবকিছু ন্যাকামি মনে হয় তাই না? আপনি আসলেই খারাপ। ভীষণ খারাপ! আপনার মতো খারাপ মানুষ এই বাড়িতে দুটো নেই। আমি কী এমন চেয়েছি? কিছুই না! সামান্য কথা যেসব ব্যাটা মানুষ রাখতে পারেনা, ওগুলা হলো খবিস। আমি আর আপনার সাথে কথা বলব না। যান, আর কিছু বলব না আপনাকে! কখনো কোনো আবদার নিয়ে আসব না। কথাই বলব না।

আহান আমিরার কালো হয়ে আসা চেহারা, আর ছলছল চোখের দিকে তাকিয়ে রইল যতক্ষণ চোখটা তার দিকে তাকিয়ে ছিল, অতঃপর লম্বা চুল ঝাড়া মেরে চলে গেল। আহান চোখ বড় বড় করল, কত্ত বড় সাহস এই পিচ্চি মেয়ের তাকে চুল ঝাড়া মারে! একহাতে ধরে ঢিল মারলে আর খুঁযে পাওয়া যাবে কীনা সন্দেহ, আর তাকে তেজ দেখায়! যেখানে রাগ করার কথা আহানের সেখানে এই মেয়ে রাগ করে বসে আছে। আহান রাগ ভাঙাতে যাবে না, যা ইচ্ছে করুক। যা ইচ্ছে করুক বললেও আহানের চোখের সামনে কান্না মাখা চোখ দুটো ভেসে রইল। কোনো কাজ করতে গেলেই চোখ দুটো এসে উদয় হলো মস্তিষ্কে। এজন্য সে চ্যাঁচাল অনেক সময়। মাথায় বরফ দিল, পানি দিল, কোনো কিছুতেই কিছু হলো না। আমিরার সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বলার জন্য গেলেও রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে রইল, তবুও মুখ দিয়ে টু শব্দ করতে পারল না। আমিরা তার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল না, আলগোছে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। আহান আয়নার সামনে দাঁড়াল চুল আঁচড়ানোর জন্য, আয়নার মধ্যে দেখে ন্যাকা মেয়েটাকে। মাথা ঝাড়া দিয়ে আবারো তাকাল, এখন দেখল বেডের মধ্যে বসে তার দিকে তাকিয়ে আছে। দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে উঠল। বিটলা মেয়েটাকে মাথায় তুলে আছাড় মারবে সে। যত্তসব..

যত্তসব বললেও আমিরা তার মস্তিষ্ক থেকে বের হলো না, ভাইরাসের মতো মস্তিষ্ক মন সব জায়গায় চেপে বসে রইল।
সন্ধ্যার শেষ মুহুর্ত। বৃষ্টি হচ্ছিল এতক্ষণ, এখন শুধু বাতাস বইছে। বাসর ঘর সাজানো শুরু করেছেন নিজ উদ্বোগে রুহিনী বেগম। তার হাতে হাতে কাজ এগিয়ে দিচ্ছে অনিকা। আমিরা শ্বাশুড়ীর শাড়ির আঁচল ধরে ঘুরছে। আহান কয়েকবার ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল, মেয়েটা তার মাকে কী যেন পট্টি পড়াচ্ছে! চোখে চোখ পড়তেই আহান চোখের ইশারায় তার মায়ের থেকে দূরে যেতে বোঝাল। আমিরা যেন পাত্তাই দিল না, আরো শ্বাশুড়ির গা ঘেঁষে গেল। রুহিনী বেগম গা ঘেঁষা খুব একটা পছন্দ করেন না, আহান ঘেঁষলেই ঠাস ঠাস করে কিল বসান, মনে মনে সে খুশিই হলো এই ধমক খাবে ভেবে, কিন্তু তাকে অষ্টম আশ্চর্য করে দিয়ে তার মা, বিটলা মেয়েটার গাল চেপে ধরে চুমু খেলেন। আহানের চোখ দুটো বোঝা গেল অক্ষিকোটর ফেড়ে বেরিয়ে যাবে। গোল গোল চোখে মায়ের কান্ড দেখল। কই তাকে তো এমন আদর করে কখনো চুমু খায়নি, এই মেয়েকে খাচ্ছে কেন? হিংসে জ্বলে পুড়ে ছাই হলো ছেলেটা! আমিরা তার তীক্ষ্ণ, হিংসে জ্বলে যাওয়া চেহারা দেখে শ্বাশুড়ীর গালে টপাটপ দুটো চুমু খেল। রুহিনী বেগমের রুপের প্রশংসায় পঞ্চ মুখ হলো। ভদ্রমহিলা খুশিতে গদগদ হলেন, ছেলের বউটাকে কাছে টেনে আরো আদর করে দিলেন, আর তা দূরে দাঁড়ানো আহান দেখল হিংসাত্মক মনোভাবে।

অনিকা কাজ এগিয়ে দিয়ে বসল কাউচে। হাঁপিয়ে উঠেছে৷ চোখের দৃষ্টি শূন্য। রুহিনী বেগম কাজ ইরহাম সৌরভির কাছে গছিয়ে দিয়ে বসলেন নিজেও আরেকটা কাউচ টেনে। অনিকার চেহারাটা বিমর্ষ ঠেকল তার নিকট। নাজুক মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন সময় নিয়ে। হাত বাড়িয়ে অনিকার হাত নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরলেন। অনিকা তাকাল তার দিকে একটু অবাকতা নিয়েই৷ তার ধার ধারলেন না ভদ্রমহিলা, মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে বললেন,”মন খারাপ?
অনিকা দু-পাশে মাথা দোলাল। রুহিনী বেগম বুঝলেন মিথ্যে বলছে মেয়ে। তাই আরো শক্ত করে নিজের মুঠিতে চেপে ধরলেন হাতটা৷ ভরসা যেন দিলেন তাকে। শ্বাস ফেললেন, সময় নিয়ে বলতে শুরু করলেন,”নিয়তি বিশ্বাস করো তো অনিকা?
অনিকা বিশ্বাস করে, তাই মাথা দোলাল। অপাশ থেকে কথা ভেসে এলো,”তোমার নিয়তিতে যে নেই হাজার চেষ্টা করলে সে তোমার হবে না, যেভাবেই হোক, বিয়ের এক সেকেন্ড আগেই কোনো না কোনো ভাবে সে তোমার হাত ছাড়া হবে। তাই মন খারাপ করতে নেই, এসব বিষয়।
অনিকার মিহি স্বর,”আমার মন খারাপ নয়, আমি খুশি এই বিয়েতে।

রুহিনী বেগম মেয়েটার উপরে উপরে হাসার চেষ্টাটা ধরে ফেললেন। হাসলেন খিলখিল করে। তিনি মিথ্যা ধরে ফেলতে পারলেই এভাবে হাসেন,”তুমি কী জানো অনিকা, তুমি হলে পৃথিবীর সবথেকে ভালো মানুষ। সবচেয়ে রঙিন মনের মানুষ। যার মন ভালো তার থেকে ভালো মানুষ এই পৃথিবীতে নেই। অন্যের সুখের জন্য তুমি সরে গিয়েছ! অন্যের ভালোটা চেয়েছ! তুমি এই যে, এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে আরশকে বিয়ে করবে না, এই সিদ্ধান্ত পুরো পরিবারের মুখে হাসি ফুটিয়েছিল, তুমি কী জানো? বড় ভাই ভাব ধরেছেন তার কিছু যায় আসে না, কে মরল, কে বাঁচল, কে বিয়ে করল, কিন্তু উনিও খুশি। মুখের ভাবগতি ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখবে উনার ঠোঁটে হাসি লেগে আছে। ভাবতে পারো, তুমি একজন অসাধারণ মেয়ে যে, পুরো একটা পরিবারের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। আমি তো কখনো এই কাজ করতে পারিনি। ইউ আর আ ট্রুলি মাইন্ডব্লয়িং এন্ড ওয়ান্ডার ফুল গার্ল।

এতক্ষণ চুপচাপ কথা শুনল অনিকা, এবার জিজ্ঞেস করল,”আমাদের মধ্যে পার্থক্য কী আন্টি? আরশ আমাকে পছন্দ না করে নুসরাতকে কেন করল?
রুহিনী বেগম হাসলেন। বললেন,”তোমাদের মধ্যে পার্থক্য কী আমি জানি না, আমি তোমাকে খুব ভালো করে জানিনা, আমি শুধু খুব ভালো করে জানি আমার ভাসুরের ছোট মেয়েটাকে। যে মুখে মিষ্টি কথা রেখে ভেতরে তোমার জন্য তিক্ততা গড়তে পারবে না। যার মুখ দিয়ে এক বের হবে, আর মনে আরেক চেপে রাখবে। সে মুখে যা বলে, মনেও তাই। যাকে সে পছন্দ করে না সরাসরি বলে দেবে আমি তোমাকে পছন্দ করি না, গদগদ করবে না। সে তার মতো, তুমি তাকে লাইক করো, ওকে, তুমি যদি তাকে পছন্দ না করো, অলরাইট, সে কেয়ার করবে না, তুমি আমাকে নিয়ে কী ভাবো, কী মনোভাব রাখো আমার কিছুই যায় আসে না। তোমার প্রশ্ন ছিল আরশ কেন তাকে পছন্দ করে, আমি এর একটাই কারণ জানি, আর এর কারণ হলো….

তিনি থামলেন। সময় নিয়ে বললেন,” সে নুসরাত নাছির, আর তাকে পছন্দ করতে এই কারণটাই হলো সবথেকে বড়। তুমি মানো বা না মানো নুসরাতের মধ্যে একটা আকর্ষণ কাজ করে। সে উল্টাপাল্টা কথা বললেও, কেউ না শোনার ভান করে থাকলেও, তা শুনতে বাধ্য। তার একটা অভ্যাস বলি, উল্টাপাল্টা কথা বলবে হাসতে হাসতে। আর সেই হাসির মধ্যে দুনিয়ার সবথেকে বড় বড় সত্য বলে ফেলবে অনায়াসে। তোমার ভালো লাগুক আর না লাগুক তার কিছু যায় আসে না। পেটে খুব কম কথা সে চেপে রাখে অন্যের ব্যাপারে, কিন্তু নিজের ব্যাপারে টু শব্দটি করবে না। তার অপছন্দীয় কোনো কাজ তুমি করলে চোখ উল্টিয়ে দেখবে অনেকক্ষণ, তারপর না দেখার মতো করে চলে যাবে। ওর কথা বলতে গেল সারা বছর চলে যাবে, এসব রাখি এখন একপাশে, তোমাকে বলি কিছু!

অনিকা মাথা দোলাল। মনোযোগ দিয়ে শুনছিল সে রুহিনী বেগমের কথা। তিনি আবারো বললেন,” তুমি তো আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখো, আরশ কে? সাধারণ এক ব্যাটা মানুষ! পৃথিবীর সবথেকে ভদ্র ছেলেটা, বুদ্ধিমান ছেলেটা অনিকা নামক সুন্দর হৃদয়ের মেয়েটার জন্য আসবে, তোমাকে ভালোবাসবে। তুমি যে এত মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছ তার প্রতিদান পাবে নিশ্চয়ই। আল্লাহ যেহেতু এই বিয়ের উসিলা তোমাকে বানিয়েছে, এর প্রতিদান তুমি নিশ্চয়ই পাবে। মন খারাপ করতে নেই, মেয়ে। এবার একটু দিল খুলে হাসো! কত ঘন্টা হয়ে গিয়েছে হাসতে দেখি না তোমাকে। মাহাদিকে দেখেছ, তোমার চিন্তায় চেহারাটা কেমন করে রেখেছ! এত কষ্ট পেতে হয় না, বুঝতে পারছে?

রুহিনী বেগম আরো কিছু বলতেন, কিন্তু তার ডাক পড়ে যাওয়ায় তিনি ছুটলেন নিচে। নাজমিন বেগম ডাকছেন, কী একটা দেখাবেন বলে! তিনি যাওয়ার পর দেখা গেল অনিকা আলগোছে উঠে দাঁড়িয়েছে। বের হচ্ছে রুম থেকে৷ ইরহাম, সৌরভি, আহান ফিসফিস করছে কিছু একটা নিয়ে। কোনো কান্ড ঘটাবে মনে হয়! সে আর ধ্যান দিল না, নেমে গেল সিঁড়ি বেয়ে। নাছির সাহেবকে দেখল বড় মেয়ের সাথে কথা বলছেন। দু-জনে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে টেবিলের উপর৷ সদর দরজা দিয়ে যেতে যেতে তার পা থামল। কাকে যেন দেখেছে ওখানে? সময় নিয়ে, আস্তে ধীরে সোফার পানে তাকাল। সোফার দিকে তাকাতেই অক্ষিগত হলো স্বামী স্ত্রী দুজনকেই। নুসরাতের মাথা রাখা পুরুষালি বুকের মধ্যে। একহাতে আরশ ধরে রেখেছে শীর্ণ, লম্বা লম্বা হাতটা। অন্যহাত দিয়ে তার বাহু আঁকড়ে ধরে রেখেছে নিজের সাথে। মেয়েলি শীর্ণ হাতের নখগুলো দেবে আছে পুরুষালি হাতের চামড়ায়। আরশের মাথাটা সোফায় রাখা। অনিকা একবার ঘড়ির দিকে তাকাল। দুটোর দিকে দেখেছিল দম্পতিকে এসে বসতে, আর এখনো বসে আছে। কী নিশ্চিন্ত ঘুমাচ্ছে তারা! যেন দুনিয়ার কোনো চিন্তা নেই তাদের মধ্যে! সবচেয়ে সুখী যুগল তারা। মেয়েটার কাছে একটা বিষয় দারুণ মনে হলো, স্বামী স্ত্রী দুজনের মুখ কিছুটা একরকম। দু-জনের ঠোঁট, নাক, মুখ একদম কপি-পেস্ট। গালে দু-জনেরই তিল। সএ হেসে ফেলল। এতটা মিল, এতটা মিল কী কাজিন বলেই? হয়তো! তার ঠোঁট ছেয়ে গেল মিষ্টির হাসিতে। নজর লেগে যাবে ভেবে চোখ সরিয়ে নিল। চোখ নামিয়ে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। যেতে যেতে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দু-এক ফোটা জল। সারাদিনের আটকে রাখা কান্না এখন বের হচ্ছে। ঠোঁটে মৃদু হাসি, চোখে পানি নিয়ে সে এগোল রাস্তা দিয়ে। ওই বাড়ি হতে আসা আলোয় কংক্রিটের রাস্তা মৃদুমন্দ দেখাচ্ছে। ল্যাম্পপোস্ট গুলো বন্ধ৷ অনিকার হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো কেউ একজন তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। চোখ তুলে তাকাতেই চেহারাটা চেনা পরিচিত ঠেকল। সরু চোখে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। গাল বেয়ে অঝোর ধারায় কান্না পড়ছে৷ সংকোচ বা লজ্জায় চোখ সরাল না সে। ঝাপসা ঝাপসা কিছু স্মৃতি মনে টনক নড়ল। মনে পড়ল পাঁচ বছর পূর্বের একরাতে একই চেহারার এক লোকের সাথে তার দেখা হয়েছিল৷ যে তাকে নিয়ে মজা উড়িয়েছিল। এবারো উড়াবে ভেবে চোখ নামিয়ে নিল। কিন্তু বিপরীত পাশ থেকে ভেসে এলো, গাম্ভীর্যের মোড়া শান্ত এক স্বর,”কাঁদছো কেন?

সে উত্তর দিতে পারল না৷ চোখ নোয়ানো থাকল। সেই প্রশ্নের উত্তর দিল না। আকস্মিক কী ভেবে চোখ তুলে তাকাল। সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ল,”আমাকে বিয়ে করবে?
আরমান অবাক হওয়ার সময় টুকু পেল না, মেয়েটা আবারো জিজ্ঞেস করল,”আমাকে বিয়ে করবে, উত্তর দাও!
পুরুষালি ভারী কন্ঠস্বর ভেসে এলো। প্রতিধ্বনি হল, ”এভাবে কে জিজ্ঞেস করে?
অনিকা সোজা একটাই প্রশ্ন করল,”হ্যাঁ অর না?
আরমান থতমত খেল। বলল,“সময় তো দরকার আমার ভাবার জন্য।
মেয়েলি কন্ঠস্বরটা ভীষণ জেদি। আবারো একই সুরে শুধাল,“ হ্যাঁ অর না?
প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দু-পা আগাল। অনিকা দু-পা পিছিয়ে গেল৷ বলল,“তোমার অবস্থা ভালো মনে হচ্ছে না, চলো বাড়ি দিয়ে আসি!

“ হ্যা অর না?
“আরে বাবা আমার কথাটা শুনবে তো?
‘’হ্যাঁ অর না?
“এত জেদ ধরতে নেই, আগে একটু ভাবো?
“ হ্যাঁ অর না?
আরমান হতবাক। অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,“আরে, আরে, তোমার মাথায় সমস্যা নাকি?
“ হ্যাঁ অর না?
“আমাদের দু-জনের জীবন নষ্ট হবে এভাবে, আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নিয়ো না!
ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে চ্যাঁচিয়ে উঠল মেয়েটা,”তুমি হ্যাঁ নাতে উত্তর দাও, এত ভাবতে হবে না। কোনো ভাবাভাবির প্রয়োজন নেই। এই দেখো, আমি দেখতে সুন্দরী, আমার চোখ সুন্দর, আচার ব্যবহার চলনসই, হাই প্রোফাইলে বাস করি, রেড পাসপোর্ট আছে, টাকা পয়সা আছে, সবকিছু আছে, আর কি চাও তুমি?

“ আমি কিছুই চাই না। একটা তো ভাবার ব্যাপার আছে, বড়দের সম্মতির প্রয়োজন আছে, তাদের সাথে আলোচনা না করে আমি একা তো আর সিদ্ধান্ত নিতে পারিনা। তুমি বুঝতে পারছ আমার কথা,মিস?
অনিকা কপাল কুঁচকাল। সে এত কথা শুনতে চাচ্ছে না, এই মুহুর্তে বিয়ে না করলে তার মাথা থেকে আরশ নামক যন্ত্রণাটা নামবে না সে জানে। তাই কঠিন স্বরে জিজ্ঞেস করল,”শেষবারের মতো আমি জিজ্ঞেস করছি, হ্যাঁ, নাতে উত্তর দিবে। এটাই শেষবার, এরপর শুধু অ্যাকশন নিব। বিয়ে করবে আমাকে? হ্যাঁ নাতে উত্তর চাই! কোনো প্যাঁচাল শুনতে চাই না।
আরমান মাথায় সমস্যা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকল নির্বাক চোখ মুখে। এক দেখায় কে বিয়ের কথা জিজ্ঞেস করে, কে এমন জেদ ধরে, আল্লাহ ভালো জানে। মানসিক সানতুলোন এই মেয়ের ঠিক নেই, নিশ্চিত আরমান জানে । যদি ডিপ্রেশন বা মানসিক রোগী হয়, আর উল্টাপাল্টা কাজ করে বসে, কে দায়ভার নিবে এর? তাই হতবিহ্বল মুখ নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল সে। সময় নিয়ে উত্তর আসলো, অনিকার অতি আকাঙ্ক্ষিত হ্যাঁ না প্রশ্নের,”হ্যাঁ! আমি তোমাকে বিয়ে করব, কিন্তু একটা শর্তে!

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬১

“কী শর্ত?
তড়াক করে জিজ্ঞেস করল অনিকা। আরমান ঢোক গিলল। বলল,” তোমার পরিবার ও আমার পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হবে। কারোর যদি এই বিয়েতে অমত থাকে, তাহলে আমরা আলগোছে সরে যাবে এই সিদ্ধান্ত থেকে। রাজী?
ভ্রু উচিয়ে তাকাল প্রশ্ন শেষে আরমান। অনিকা এক কথায় রাজী হলো,”রাজী..!
জেদী কন্ঠে বিড়বিড় করতে শোনা গেল,” বিয়ে তো করেই আমি এই দেশ ছাড়ব, তার আগে না।

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here