Home উপসংহারে তুমি সিজন ২ উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ১

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ১

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ১
রুহানিয়া ইমরোজ

অমাবস্যার রাত। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিয়ন বাতির নরম আলোয় আলোকিত রাস্তাঘাট। সেই উৎস ধরেই এক পা দু পা করে উদ্দেশ্যহীন গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে চিত্রা। শরীরে শক্তি নেই। পেটের যন্ত্রণায় পা ফেলতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে কিন্তু থামা যাবে না।
বহুদূর যেতে হবে তাকে। পরিচিত সকলের থেকে শতশত মাইল দূরে। অদ্ভুত জেদ চেপে বসেছে চিত্রার মাথায়। সমস্ত সহ্য ক্ষমতা ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে আজ। তাইতো সব ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। লাগবে না আশ্রয়, বোঝা হয়ে থাকবে না আর কারও জীবনে। এতিমেরা কি বাঁচে না?

আপনমনে এসব বিড়বিড়য়ে সম্মুখে হেঁটে যাচ্ছিল চিত্রা। পথটা অদ্ভুত অন্ধকারে ঢেকে আছে। রাস্তার দুই পাশে ঘন জঙ্গল এবং অর্ধ নির্মিত বাড়ি ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না। শিকদার মহল থেকে বেরিয়ে একটা লোকাল বাসে উঠেছিল চিত্রা। প্রায় ঘন্টা দেড়েক জার্নি করার পর কোথায় যেন ওকে নামিয়ে দিয়েছে বাস ওয়ালা।
এমনি এমনি নামাইনি৷ তার কাছে ভাড়া না থাকায় সজোরে একটা চড় মেরেছে বাসের হেল্পার৷ দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বিশ্রি কিছু গালিও দিয়েছে। চিত্রা প্রতিরোধ করতে পারেনি। কিই-বা করবে? দোষ তো তারই। ও বুঝে না, সৃষ্টিকর্তা ওকে নিজের কাছে ডেকে নেয় না কেনো? পৃথিবী ভর্তি মানুষ থাকা সত্ত্বেও চিত্রার কেউ নেই। সেটা কি তিনি জানেন না?

চলতে চলতে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে চিত্রা। সময় কত হয়েছে জানা নেই তবে চারপাশটা আঁধারে ডুবে আছে। দু পা বাড়াতেই হঠাৎ মুখ থুবড়ে পড়ে সে। একেবারে মরার উপর খাঁড়ার ঘা। বেকায়দায় পড়ায় মুখে, বুকে আর কুনুইতে ভালোই চোট পায়, সেই সাথে পথ চলার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে।
কোনোমতে সোজা হয়ে হুঁ হুঁ করে কেঁদে ফেলে চিত্রা। ক্ষত স্থান গুলো জ্বলে যাচ্ছে। সারা শরীর জুড়ে অসহনীয় ব্যথা। মনে হচ্ছে কেউ ওর কলিজা কেটে ফালাফালা করে দিচ্ছে। মেন্টালি ট্রমাটাইজ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও বেশি পীড়াদায়ক হয়ে উঠে চিত্রার জন্য।
জ্ঞান থাকলেও প্যারালাইসিস রোগীর মতো রাস্তার মাঝে পড়ে থাকে। নির্জন রাস্তা দেখে ভাবে, ভোরের আলো ফুটলে যাত্রা শুরু করবে। ঠিক তখুনি চিত্রার মাথায় ধরা দেয় আরেক ভাবনা, গন্তব্যই তো নেই তাহলে কিসের উদ্দেশ্য যাত্রা করবে ও? চিন্তাটা ভীষণ কষ্ট দেয় চিত্রাকে। কি আজব না? মা- বাবা, স্বামী, শ্বশুরবাড়ি থাকা সত্ত্বেও ওর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই৷

দিশেহারা চিত্রার মস্তিষ্কে হুট করে ভেসে উঠে এক পবিত্র মুখের প্রতিচ্ছবি। জন্ম না দেওয়া সত্ত্বেও যে তাকে মা বলে ডেকেছে,নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবেসেছে, নিজের বুকে ঠাঁই দিয়েছে কিন্তু বিনিময় চায়নি।গোটা পৃথিবী তাকে যা দিতে পারেনি ওইটুকু অবুঝ শিশু তার শতগুণ বেশি দিয়েছে। নাফিমের কথা মনে পড়তেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে চিত্রা। বড্ড করুণ শোনায় সেই স্বর। তার মনে পড়ে যায় নাওয়াফের শেষ বিদায়ের মুহূর্তটা।ঝাপসা চোখে আকাশের পানে চেয়ে বিড়বিড়িয়ে বলে,
–” মাম্মা আসছে বাচ্চা..”

চিত্রা জানে, বেশিদিন বাঁচবে না ও। পর্যাপ্ত খাবার, পানি আর আশ্রয় ছাড়া ক’দিন বাঁচে একটা মানুষ? ভিক্ষা করা সম্ভব নয় ওর পক্ষে। নাইবা সম্ভব ইজ্জত বেঁচে চাকরি করা। তাই তৎক্ষনাৎ সিধান্ত নেয়, কোনো এক কবরস্থানে গিয়ে নিজের কবর খুঁড়ে তাতেই থাকবে চিত্রা। সেই জায়গায় নিশ্চয়ই কেউ ওর সম্মানহানি করতে আসবে না? বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে কারো কাঁধের বোঝাও হতে হবে না। সবটা ভেবে ওর ফ্যাকাশে মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে।
এমুহূর্তে এক পা-ও চলা সম্ভব নয় চিত্রার পক্ষে। প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে তার উপরন্তু মাথা ঘুরাচ্ছে। একটুখানি রেস্ট না নিলে সকালে বেরোতে পারবে না। ভাবনা মোতাবেক ঘুামানোর চেষ্টা করে কিন্তু আকস্মিক তার ঝাপসা দৃষ্টিতে ধরা পড়ে চারজন হিংস্র মাতালের প্রতিচ্ছবি। যারা হেলেদুলে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে তারই দিকে। মস্তিষ্ক এলার্ট করলেও জখমী শরীর চুল পরিমাণও নাড়তে পারে না চিত্রা। সে আবছা চোখে চেয়ে দেখে, ওরা অলরেডি একটা মেয়ের চুল ধরে টেনে আনছে।

পথিমধ্যে রাস্তার পাশে ওকে পড়ে থাকতে দেখে উল্লাস ধ্বনিতে মেতে উঠে তারা৷ বিপদ টের পেয়ে চিত্রা ছুটতে চায়। দুর্বল শরীর সঙ্গ দেয় না। কোনো মতে মাটি খামচে ধরে টলমল পায়ে উঠে দাঁড়ায় ও। মাতাল গুলো অতি সন্নিকটে এসে দাঁড়ায় ততক্ষণে। টিটকারি মেরে বলে,“আজ তো ভুঁড়ি ভোজ হবে রেএএএ…”এরপর কিটকিটিয়ে হেসে উঠে। চিত্রার আত্না খাঁচা ছাড়া হয়ে যায়। যে ভয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে রাজি ছিলো সেটাই পথরোধ করে দাঁড়াল। এবার কি হবে?

নিয়তি বরাবরই নিষ্ঠুর তার বেলায়। এবারেও ব্যতিক্রম ঘটলো না। চিত্রা দু তিন ধাপ করে পেছনে সরতে নিলে দু’জন এসে খাবলা দিয়ে ধরে তাকে আর অন্যজন সার্চ করার ভঙ্গিতে শরীর ছোঁয়। চিত্রা প্রতিবাদ করতে নিলে ধুমধাম কয়েকটা মার পড়ে শরীরে। জানোয়ার গুলোর পশুর ন্যায় আঘাত সইতে পারে না চিত্রার দুর্বল দেহ। লড়াই করার মতো শক্তি উপস্থিত না থাকায় পরপর দুটো থাপ্পড় খেয়ে সরজমিনে লুটিয়ে পড়ে চিত্রা।
তাকে বশে আনতে পেরে ক্ষিপ্ত মাতালেরা উল্লাসে মেতে উঠে রীতিমতো। মনের খোরাক মেটাতে সরজমিনের ধুলোয় হুটোপুটি খাওয়া চিত্রাকে যে যার মতো লাথি মারতে থাকে। চিত্রা কাতরে উঠে মরণ যন্ত্রণায়। গলার স্বর ভেঙে যাওয়ার দরুন চিৎকার গুলো গোঙানির মতো শোনায়। মারের তীব্রতা সইতে না পেরে ঝিমিয়ে পড়ে বেচারি। আধবোজা চোখের কার্ণিশ ছাপিয়ে গড়িয়ে পড়ে নোনাজল।

এই এক জীবনে কষ্ট, আঘাত আর যন্ত্রণা ছাড়া কিছুই জুটলো না তার কপালে। শান্তির মউত মরতে পারল না। আঘাতে জর্জরিত, ক্ষত-বিক্ষত এবং বিকৃত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করাই বুঝি নিয়তি ছিল? নিভু নিভু চোখে চেয়ে এসবই ভাবতে লাগল চিত্রার অকৃতকার্য মস্তিষ্ক। আরও ভাবল, নিরাপদ বাহুবন্ধনে থাকলে নিশ্চয়ই আজ কলুষিত হতে হতো না তার পবিত্র সত্তাকে?

এরপর আর কিছু ভাবার অবকাশ পেলো না, জ্ঞানশূন্য চিত্রাকে রোড থেকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হলো জঙ্গলের দিকে অতঃপর শোনা গেল কিছু গোঙানির স্বর। পরপরই থমথমে পরিবেশে ছেয়ে গেল জঙ্গল। ভোর নামার পূর্ব মুহূর্তে নিঃশেষ হলো একটা তরতাজা প্রাণ।

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here