Home উপসংহারে তুমি সিজন ২ উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৩

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৩

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৩
রুহানিয়া ইমরোজ

চিত্রা ঢাকায় নেই, রংপুরেও যায়নি। গেল কোথায় মেয়েটা?এই চিন্তায় দিন দুনিয়া ভুলে বসল নাওয়াফ৷ তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে সিসিটিভি চেক করল। চিত্রার বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা দেখে গা হিম হয়ে গেল তার। মেয়েটা হাঁটতে পারছিল না। দাঁড়িয়েছেও কুঁজো হয়ে কিন্তু অদম্য জেদ তাকে থামাতে পারেনি।
এমনকি ঘর থেকে বেরোনোর পর একটাবারও পিছু ফিরে তাকায়নি। ঠিক কতটা কষ্ট পেলে চিত্রার মতো নরম মনের মানুষ এমন কঠিন সিধান্ত নিতে পারে তা ভেবেই বুকের চাপ বাড়ল নাওয়াফের৷ একদণ্ড শান্ত হয়ে বসে রইল না সে। ধুরন্ধর ব্রেইন খাঁটিয়ে আশেপাশের অলিতে-গলিতে খুঁজতে লাগল চিত্রাকে।
রাস্তার সিসিটিভি ফুটেজ বের করে বাস ড্রাইভার এবং হেল্পারের থেকে তথ্য নিয়ে সেই নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছালো। এতটুকু তথ্য খুঁজে পেতে টানা দুদিন লেগে গেছে এরমধ্যেও মেয়েটা ফিরে আসেনি। নাওয়াফ উদ্ভ্রান্তের ন্যায় খুঁজছে তাকে সেই সাথে শুধু একটা দোয়াই করছে যেনো এই নির্মম দুনিয়ায় ওই পবিত্র সত্তাটা কোনো নিষ্ঠুরতার স্বীকার না হয়৷

পুরো ঢাকা শহরে চিরুনি তল্লাসি চালিয়েছে নাওয়াফ কিন্তু সপ্তাহখানেক পেরিয়ে যাওয়ার পরও কোনো তথ্য হাতে আসেনি। খোঁজ পাওয়া যায়নি চিত্রার। নাওয়াফ এর বারংবার মনে হচ্ছে, তার অধিক কঠোরতাই এসব জটিলতার আসল কারণ। নাওয়াফ যতক্ষণে নিজের কঠোরতা বুঝল ততক্ষণে সবকিছু শেষ।
তার ভীত পাখিটা আর খাঁচায় নেই। নাওয়াফ হন্য হয়ে খুঁজল কিন্তু দিন পেরিয়ে রাত নামার পরেও কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না। এরমধ্যে তার কানে পৌঁছালো বীভৎস স্বীকারোক্তি। নাজনীন বেগম কেঁদেকুটে জানিয়েছেন, তিনি জোরাজোরি করেছিলেন ওসবের জন্য। চিত্রাকে একপ্রকার ভয় দেখিয়ে ব্লেকমেইল পর্যন্ত করেছেন। কথাটা শোনার সাথে সাথে রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ে নাওয়াফ৷ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে সাময়িক সময়ের জন্য।
গোটা বাড়ি ভাঙচুর করে রাগ তো মিটিয়ে ফেলে কিন্তু মারাত্মক এক অপরাধবোধে জর্জরিত হয়ে যায় তার মন। বুকের ভেতরকার অস্থিরতা বাড়ে৷ মন চায় ওই নরম শরীরটাকে বুকে আগলে একটুখানি স্বস্তির শ্বাস ফেলতে অথচ সেটা অসম্ভব।

দশদিন পর জানা যায়, চিত্রার লাস্ট লোকেশান থেকে দশমিনিট হাঁটা পথে একটা মেয়ের মৃত দেহ পাওয়া গেছে। ধর্ষণের পর ভারি পাথর দিয়ে আঘাত করে মাথা থেতলে দেওয়া হয়েছে তার। বলা বাহুল্য, ওই স্পটের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জামা কাপড়ের টুকরো চিত্রারই৷
দীর্ঘদিন খোঁজ না পেয়ে এমন একটা আশঙ্কায় উদয় হয়েছিল তার মনে। এই কংক্রিটের শহরে এসব খুব সামান্য ঘটনা ; পুলিশদের কাছে তুচ্ছ বিষয়। কেননা এই দেশের নারীরা সচেতন হওয়া সত্ত্বেও প্রতি দশ জনের মধ্যে মিনিমাম পাঁচ জন ধর্ষিত এবং নয় জন যৌন হয়রানির স্বীকার হয়।
এই নির্মম বাস্তবতা মানতে নারাজ নাওয়াফের মন। চিত্রা ধর্ষিত হলেও তাকে বুকে আগলে নিতে বিন্দু পরিমাণ সমস্যা নেই কিন্তু ওর মৃত্যু কোনোভাবেই মানতে পারবে না নাওয়াফ। এমনটা হলে ও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কি করে বসবে জানা নেই। বারংবার অফিসার তাকে মার্ডার প্লেস ভিজিট করার অনুরোধ জানাচ্ছেন। নাওয়াফ সরাসরি তাকে নিষেধ করে দিয়ে ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট সেন্ড করতে বলেছে।
এ ছাড়া আর কি’বা করার আছে? নাওয়াফ তো ওদের বুঝিয়ে বলতে পারবে না, এই এক রত্তি মেয়ের অসীম জেদ তাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তার মধ্যে পর্যাপ্ত শক্তি নেই কোনো খারাপ সংবাদ শোনার। চারপাশে যখন ব্যর্থতার ছড়াছড়ি তখন সবকিছু ভুলে সৃষ্টিকর্তার নিকট পানাহ চাইল নাওয়াফ। সিজদায় বসে স্ত্রীর জন্য অঝোরে কাঁদল। দু-হাত পেতে ধরে ক্রন্দনরত সুরে সৃষ্টিকর্তাকে বলল,

–“ আমার ভুলের শাস্তি ওইটুকু নাজুক প্রাণ কে দিয়েন না মাবুদ। যে সম্মান বাঁচাতে সমস্তটা বির্সজন দিয়েছে তাতে আঁচ পড়তে দিয়েন না। মরে যাবে মেয়েটা ; আমি সইতে পারব না তার মৃত্যু..
শেষ অংশটুকু অজান্তেই বলে বসে নাওয়াফ। এটা কি শুধুই অপরাধবোধের ফল নাকি নব্য অনুভূতির সূচনা? উত্তরটা অজানা তবে যাইহোক তা এখন মূল্যহীন।সময় গেলে সাধন হয় না।
নাওয়াফের দাপটে জোরদার ইনভেস্টিগেশন চলছিল কিন্তু কোনো ক্লু পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষমেশ খোদার সান্নিধ্যে গিয়ে একটুখানি মাথা ঠান্ডা করে নিজের সাথে বোঝাপড়া করতে শুরু করে নাওয়াফ। মনকে শুধায়, কত কঠিন কেস সলভ্ করে ফেলেছে সেখানে সামান্য একটা নিখোঁজ ভিক্টিমকে খুজতে এত সময় লাগছে কেনো? কিছুক্ষণ ভাবার পর জবাব আসে, নিশ্চয়ই কেউ ওকে আড়াল করে রেখেছে নয়তো পাচার করে দিয়েছে।

নাওয়াফ তৎক্ষনাৎ হেডকোয়ার্টারে ফোন দিয়ে লাস্ট দশ দিনে হওয়া হিউম্যান ট্রাফিকিং এর খোঁজ খবর নেয়। সেই সাথে ধর্ষিত হওয়া, রিসেন্টলি পাবনায় ভর্তি হওয়া এবং অভিভাবক বিহীন হসপিটালে আনা সকল ব্যক্তির খোঁজ নিয়ে তাকে ইনফর্ম করতে বলে। তাদের কাজগুলো হয় সুপার ফাস্ট তাই রাত একটা বাজতে বাজতে নাওয়াফের হাতে সকলের ছবি সহ ডিটেলস চলে আসে। পুরো আড়াই ঘন্টা খুঁজেও চিত্রার খোঁজ বের করতে পারে না৷
এপর্যায়ে নাওয়াফ শিওর হয়ে যায় তার প্রথম ধারণাটা সঠিক। কেউ একজন চিত্রাকে আড়াল করে রেখেছে কিংবা কিডন্যাপ করেছে। এমুহূর্তে তার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো কুখ্যাত টেরোরিস্ট রাজন তালুকদার। সে প্রায় মাস তিনেক আগে বেশ কিছু সরকারি নথি পত্র চুরি করে পালিয়ে যায়। নথিপত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল। ওগুলোর একটাও লিক হলে দেশ হুমকির মুখে পড়বে। কেসটা অতিরিক্ত কনফিডেনসিয়াল বলে এনএসআই টিমের কাছে হস্তান্তর করা হয়। নাওয়াফ একজন ডেপুটি ডিরেক্টর বলে সমস্ত পরিকল্পনার দায়ভার তাকে দেওয়া হয়।

যথারীতি সে পরিকল্পনা সাজিয়ে টিমকে ব্রিফ করে। তার কাজ পরিকল্পনা অব্দি সীমাবদ্ধ এরপর বাকিটা তার আন্ডারে থাকা সুদক্ষ টিম সামলায়। মাঝেমধ্যে নাওয়াফ ও যায় মিশনে। রাজনের সাথে পার্সোনাল শত্রুতা থাকায় মাঠ পর্যায়ে থেকে দায়িত্ব পালন করার সিধান্ত নেয় নাওয়াফ। এটাই তার কাল হয়ে দাঁড়ায়৷ শুরুতে নানান দিক থেকে হুমকি, প্রলোভন, প্ররোচনা আসতে থাকে কিন্তু কোনকিছুই তাকে দমাতে পারেনা৷
তার অকুতোভয় সংগ্রামী চেতনা দেখে সরাসরি ওর কলিজা ধরে টান মারে প্রতিপক্ষ। নাওয়াফ শতভাগ নিশ্চিত, নাফিমের মৃত্যুর পেছনে রাজনেরই হাত আছে৷ আর এখন চিত্রাকে গুম করে তাকে পুরোপুরি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে চাইছে৷ মিশনে ও চিত্রাকে গুটি হিসেবে ইউজ করার নোংরা ফন্দি আঁটছে। এমনটা চৈত্রিকার বেলাতেও হয়েছিল। রাজন তখন পাক্কা স্মাগলার ছিল৷ নাওয়াফ তার কেস হাতে নিতেই ; সে-ও পাল্ট আঘাতে হাত বাড়ায় তার পরিবারের দিকে।

এমনিতে খাড়ুশ হলেও খেঁকশিয়ালের মতো চালাক সে। ঠান্ডা মাথায় ভাবতে বসলে পুরো কেসের নাড়িনক্ষত্র টেনে বের করে ফেলে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয় না। রহস্য বুঝতে পেরে নাওয়াফের মাথার জট খুলে যায়। ফলে এভিডেন্স বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে মার্কার দিয়ে কিছু আঁকিবুঁকি করতে থাকে।
ক্লু মিলিয়ে ধারণা করে, রাজন চিত্রাকে এমন আস্তানায় রেখেছে যেখানে তাকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। কেননা, স্পটে চিত্রার ছিন্নভিন্ন জামাকাপড় সুস্পষ্ট সাক্ষ্য দিচ্ছে, সে স্টেবল কন্ডিশনে নেই এবং তাকে বেশ কিছুদিন হসপিটালে রাখতে হবে। চিত্রার খোঁজ বের করতে হলে রাজনের এমন এক ডেরা খুঁজে বের করতে হবে যেখানে কাউকে লং টাইম ট্রিটমেন্ট দেওয়া পসিবল।

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ২

বাস্তবতা পরিকল্পনারও উর্ধ্বে। নাওয়াফ ভেবেছিল, এবার হয়তো খোঁজ পেয়ে যাবে চিত্রার কিন্তু বেচারা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি তার জন্য অপেক্ষা করছে এক নির্মম সত্য যা তাকে পুরোপুরি বরবাদ করে দিবে। তার অপেক্ষার প্রহর ফুরাবে না বরং আরও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে।

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here