রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫৮
মহাসিন
মৃধা শাপলাকে বাড়ির ভিতর ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে। নতুন বাড়ি, নতুন পরিবেশ সবকিছুই শাপলার কাছে অপরিচিত। মৃধা হঠাৎ থেমে হেসে বলল, _“ভালোই হলো তোমাকে পেলাম। তোমার সাথে মন খুলে কথা বলা যাবে। আচ্ছা, তুমি কি পড়াশোনা করো?”
শাপলা মাথা নেড়ে সংক্ষেপে জবাব দিল,
_“না।”
মৃধা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
_“কেন? তোমার কি পড়াশোনা ভালো লাগে না?”
শাপলা একটু চুপ করে থেকে বলল,
_ “তেমন না। কিছু সমস্যার কারণে এখন পড়াশোনা অফ রেখেছি। তুমি নিশ্চয়ই পড়ো?”
মৃধা উজ্জ্বল মুখে বলল,
_ “হ্যাঁ, আমি পড়ি। পড়াশোনা করতে আমার খুব ভালো লাগে। আচ্ছা, তুমি ভবিষ্যতে কী হতে চাও?”
শাপলা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
_ “জানি না। আসলে কিছু হওয়ার ইচ্ছাই নেই। তুমি কী হতে চাও?”
_“পাইলট! আমার খুব ইচ্ছে, ওই দূর আকাশে উড়ে বেড়াই। মেঘের ওপর দিয়ে, নীল আকাশে…”
দুজনের কথা বলতে বলতে তারা বাড়ির বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে দেখছে।
অন্য দিকে বির শিখা বাগান থেকে ঘুরে ঘরে ফিরে এলো। রিক্তাও ড্রয়িং রুমে চলে এলো। বির চারপাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
_“মা কোথায়?”
_“মা তো তার বোনের বাড়িতে বেড়াতে গেছে,” রিক্তা জবাব দিল।
রিক্তা হেসে বলল,
_“চলো, আমরা সবাই মিলে রান্না করি।”
শিখা বিরের দিকে তাকাতেই বির হেসে মাথা নেড়ে বলল,
_“না না, আমার বউ এত তাড়াতাড়ি রান্না করবে না।
_”এখনই বউ পাগল হয়ে গেছো?” (রিক্তা)
শিখা বলল,
_“ঠিক আছে, চলেন।”
এরপর রিক্তা ও শিখা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
এখানে শাপলা হঠাৎ তার অতীতের গল্প বলা বন্ধ করে দিল। চোখ দুটো ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
পুলিশ অফিসার রকি রায় সামনে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলেন,
_“কী হলো? আপনি চুপ করে গেলেন কেন? বলুন, তারপর কী হয়েছিল?”
শাপলা কোনো কথা বলল না। একদম চুপ।
সিয়াম উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
_“শাপলা, কী হয়েছে তোর? বল না, তারপর কী হলো?”
শাপলা ধীরে ধীরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার মুখ শুকনো, চোখে অস্বস্তি।
_“আমার ভালো লাগছে না। আমি এখন আর কিছু বলতে পারব না।”
কথা শেষ করেই সে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল। তার পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
রকি রায় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সিয়ামের দিকে তাকালেন।
_ “ঠিক আছে। আপনি পরে তার কথাগুলো রেকর্ড করে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দেবেন। আমরা তদন্ত চালিয়ে যাব।”
এই বলে পুলিশ অফিসার উঠে চলে গেলেন।
ঘরের ভিতর একটা ভারী নীরবতা নেমে এলো।
সিয়াম দ্রুত পায়ে রুমের ভিতরে ঢুকে পড়ল। শাপলা বিছানার একপাশে চুপচাপ বসে আছে। তার চোখে মুখে এক অস্থির ছায়া। সিয়াম নরম পায়ে এগিয়ে এসে তার পাশে বসল। আলতো করে জিজ্ঞাসা করল,
_“কী হয়েছে তোর? এভাবে হঠাৎ চলে এলি কেন?”
শাপলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
_“খুব ভয় লাগছিল।”
এই বলে সে সিয়ামের বুকের মধ্যে ঝাঁ পি য়ে পড়ল। দুই হাত দিয়ে তাকে জ ড়ি য়ে ধরল শক্ত করে। সিয়াম তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। তার স্পর্শে শাপলার শরীরটা একটু একটু করে শান্ত হতে শুরু করল।
_“আপনি আমাকে কখনো ছেড়ে যাবেন না তো?” শাপলা ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল। তার গলায় অসহায়তা আর আকুতি মিশে আছে।
সিয়াম বলল,
_“কখনো না। শুধু তোর কাছেই থাকব। সারা জীবন তোর সঙ্গে থাকবো।”
কথাগুলো শুনে শাপলার চোখে সাময়িক একটা আরামের আলো ফুটে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই সে সিয়ামের কাছ থেকে সরে গিয়ে জানালার কাছে চলে এলো। বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল।
সিয়াম পেছন থেকে বলল,
_“সিরাজকে পুলিশ খুব তাড়াতাড়ি খুঁজে বের করবে। তুই আর চিন্তা করিস না।”
সিরাজের নাম শুনে শাপলার ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু সে এমনভাবে মুখ ঘুরিয়ে রাখল যেন সিয়াম দেখতে না পায়। এই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই। শুধু এক গভীর, অজানা ছায়া।
সিয়াম উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
_“তোর জন্য রাতে একটা গিফট আছে। তুই একটু বিশ্রাম নে।”
এই বলে সিয়াম হালকা হেসে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর শাপলা ধীরে ধীরে ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়াল। কলি এখানে বসে আছে। শাপলা নরম গলায় বলল,
_ “আমি একটু বাইরে যাব। খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসব।”
কলি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
_“আমিও তোর সাথে যাব।”
শাপলা মাথা নেড়ে বলল,
_“না, তোকে যেতে হবে না। আমি একাই যাব।”
কলি চিন্তিত মুখে বলল,
_“একা কীভাবে যাবি? যদি কোনো সমস্যা হয়? তোকে একা যেতে দেব না। আমি তোর সাথে যাব।”
শাপলা এবার একটু জোর দিয়ে বলল,
_ “না কলি। আমার কিছু কিনতে হবে। শুধু শুধু তোকে কষ্ট করতে হবে না।”
ঠিক তখন নীলাঞ্জনা এখানে এসে পড়ল।
_“কী নিয়ে কথা হচ্ছে তোমাদের?” জিজ্ঞাসা করল সে।
কলি তাকে সব বলতেই নীলাঞ্জনা হেসে বলল, “চল, আমরা তিনজন মিলেই যাই।”
শাপলা এবার স্পষ্টভাবে বলল,
_“না। আমি একা যাব।”
নীলাঞ্জনা আবার বলল,
_“না, সবাই মিলে যাব।”
হঠাৎ শাপলার গলা চড়ে গেল,
_ “বলছি তো আমি একা যাব!”
এমন আচরণ আগে কেউ দেখেনি তার কাছ থেকে। কলি আর নীলাঞ্জনা দুজনেই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। শাপলা আর কোনো কথা না বলে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
গেটের সামনে এসে সে একটা অটো দেখে উঠে পড়ল। অটো চলতে শুরু করতেই শাপলা তার ফোন বের করে কাউকে কল করল।
ওপাশ থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল,
_ “কিরে, তুই কখন আসবি?”
শাপলা নিচু গলায় বলল,
_ “এই তো রওনা দিয়ে দিয়েছি।”
ওপাশ থেকে মেয়েলি কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “তাড়াতাড়ি আয়। সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি। আর ভালো লাগছে না।”
শাপলা আশ্বাস দিয়ে বলল,
_ “আর একটু অপেক্ষা কর। আমি আসছি।”
কল কেটে দিয়ে সে ড্রাইভারকে বলল,
_“মামা, একটু তাড়াতাড়ি চলেন। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
ড্রাইভার শান্ত গলায় বললেন,
_ “আপনি শান্ত হয়ে বসুন। তাড়াতাড়ি নিয়েই যাচ্ছি।”
অটোটা রাস্তার বাঁকে মিলিয়ে যেতে যেতে শাপলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। তার চোখে এক জটিল মিশ্রণ ভয়, উৎকণ্ঠা আর এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। কেউ জানে না, সে কোথায় যাচ্ছে আর কেন এত জোর করে একা বেরিয়ে এসেছে।
নীলাঞ্জনা আর কলি ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছে। দু’জনের মনেই এখনো বিস্ময়ের ঘোর লেগে আছে। শাপলা হঠাৎ করে তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
নীলাঞ্জনা কলির দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল, _“কলি, শাপলা তো তোমার বন্ধু। তাহলে তোমাকেও এভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে কেন?”
কলি একটু চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল।
_“আমিও তো কিছু বুঝতে পারছি না। শাপলা আগে কখনো এমন করেনি। হঠাৎ কী হয়ে গেল ওর?”
হঠাৎ কবিতা কাঁদতে কাঁদতে চলে এলো। তার চোখ দুটো ফোলা, গাল বেয়ে অবিরাম পানি গড়িয়ে পড়ছে।
কবিতা কান্নাজড়ানো গলায় বলল,
_“আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে…”
নীলাঞ্জনা তাড়াতাড়ি উঠে তার কাছে গিয়ে বসল। _“কী হয়েছে ?”
_“আদি আমাকে ডি ভো র্স দি য়ে ছে।”
_“কবে?” কলি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
_“অনেক আগেই। কিন্তু এতদিন কিছু বলেনি। আজ হঠাৎ বলল, আজকেই নাকি ডি ভো র্সে র কাগজ চলে আসবে।”
নীলাঞ্জনা কবিতার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে আলতো করে চাপ দিল।
_“একদম কাঁদবে না। ওই ছেলের চেয়ে অনেক ভালো কেউ তোর জীবনে আসবে। আমি তোদের কখনো সংসার করতে দেখিনি। শুধু বিয়েটাই হয়েছিল, আর কিছু নয়।”
একটু থেমে আবার বলতে লাগলো,
_“মা বাবাকে বলছো?”
_“হ্যাঁ, জানে।”
নীলাঞ্জনা নরম গলায় জিজ্ঞাসা করল,
_ “একটা কথা বলো তো… বিয়ের পর কি তোদের মধ্যে কখনো কিছু হয়েছিল?”
কবিতা মাথা নিচু করে বলল,
_“না, কিছুই হয়নি। আদি অন্য একজনকে ভালোবাসত। এখন তার সঙ্গেই আছে। শুধু বাবা মায়ের জন্য আমাকে বিয়ে করেছিল।”
রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫৭
হঠাৎ দরজার কলিং বেল বেজে উঠল।
নীলাঞ্জনা উঠে গিয়ে দরজা খুলল। একজন লোক একটা খাম হাতে দিয়ে চলে গেল। সে খামটা নিয়ে ফিরে এসে কবিতার হাতে দিল।
“এই নাও, সই করে দাও। সব ঝামেলা শেষ হয়ে যাক।”
কবিতা চুপচাপ খাম থেকে কাগজ বের করে দেখল। কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থেকে কাঁপা হাতে সই করে দিল। তারপর আর কিছু না বলে দ্রুত নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
ড্রয়িং রুমে নীলাঞ্জনা আর কলি পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল। বাতাসে এক অদ্ভুত নীরবতা ছড়িয়ে পড়ল।
