কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৭ (৩)
নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
সৈয়দ বাড়ি এখন আর থমথমে নেই। দুটো বাচ্চার কুটুকুটু দুষ্টুমিতে সারাক্ষণ মেতে থাকে।
রায়ানের বয়স ১২ বছর। ক্লাস সেভেনে উঠল। সৈয়দ সার্থ আবরারের আদর্শ ছেলে হতে না পারলেও, মিন্তুর ভাগ্নে ঠিক মিন্তুর মতোই হয়েছে। দেখতে-শুনতে,ভাবসাবে রায়ান এগিয়ে! চোখে লাগে, অথচ
পড়াশোনায় আস্ত লবডঙ্কা। টেনেটুনে পাশ করতেও ওর ভীষণ কষ্ট হয়। এই সেভেনেই উঠল প্রত্যেকটাতে ৩৩/৩৪ নম্বর পেয়ে। সার্থ এসব নিয়ে ছেলেকে কিছু বলে না। তবে তুশির দুঃখের শেষ নেই। যার বাবা অত মেধাবী,তার ছেলে কিনা শেষে! তুশির এই হতাশায় মাথা ঠুকে মরতে মন চায়। ছেলেটাও কি শেষমেশ ওর মতো হচ্ছে? গবেট!
সার্থর ফের প্রমোশন হয়েছে। এসপি থেকে এড্ডিশনাল ডি-আইজি এখন। সেখানে ফের একটা পিপিএম যুক্ত হয়েছে কিছুদিন হলো। আর এখানেই তুশির কষ্ট। ও নিজেই সেই বস্তির চোর থেকে ডিগ্রী পড়ছে আজ। সেখানে ছেলেটা! দুদিন আগে এক আত্মীয় এসেছিলেন বেড়াতে। রায়ানকে পেয়ে জ্যাকফ্রুট বানান ধরলেন। রায়ান পারেনি। তার পড়ায় মন নেই,লেখাপড়া পারে না। শুধু কাঁধে একটা ব্যাট নিয়ে টইটই করে। সোজা,সিল্কি চুলগুলো কান অবধি নেমেছে। সারাক্ষণ নাড়ে আর বুক ফুলিয়ে হাঁটে। যেন এলেন সালমান খানের বাচ্চা!
অন্যদিকে অয়ন-ইউশার সংসারে সুখের কমতি নেই। স্ত্রী-কন্যাকে চোখে হারায় অয়ন। ইতুর বয়স ছয়। নার্সারিতে পড়ে। মেয়েটার মাথা ভরতি কোকড়া চুল। খুব ফরসা,ছোটো ছোটো চোখ,নাক সরু,লাল ঠোঁট,সব মিলিয়ে আদুরে ভীষণ! তবে খুব ঠান্ডা ও। সহজে কাঁদে না। বাড়িতে বাচ্চা আছে মনেও হয় না যদি না রায়ান থাকে। রায়ান থাকলে দশ বাড়ির মানুষেরা টের পায় । এই ক বছরে আরো অনেক কিছু পাল্টেছে অবশ্য। আবহাওয়া, মৌসুম আর মানুষের জীবন। গল্পের আরো ছয় বছর পার হয়েছে। জয়নব ইন্তিকাল করেছেন। দুনিয়ার কোথাও আর তার দেহ নেই! আল্লাহর দয়ায় হাসনা জীবিত এখনো। বুড়িয়ে গেছেন তবে। নানুর মৃত্যুতে আইরিন বাবা মায়ের সাথে দেশে এসেছিল। শোনা গেছে, তার বিয়ের কথাবার্তা চলছে। জামিল সেই যে দেশ ছাড়ল ওর আর খবর নেই। ওখানকার সিমটাও বন্ধ। ছোটো মামার বিয়েতেও আসেনি। দেশের প্রতি ওর এত বিমুখতা কেন? ইউশার জন্যে! কে জানে… ওইটুকু ভালো লাগা জামিলকে কতটা আহত করে দিলো,তাতো সে খোলাশা করে গেল না!
আজ ঈদ!
সকাল ৯ টা বাজে।
রায়ান দাদা আর নানার সাথে নামাজে গেছিল। এই এলাকাতেই মসজিদ। সেখানে একটা কাণ্ড ঘটিয়েছে,যা নিয়ে ওর বেশ মেজাজ খারাপ। পাশে যে ছেলেটা নামাজে বসেছিল,হঠাৎ ওর গালে একটা মশা এসে বসল। আর রায়ান মোনাজাত ভুলে টাস করে একটা চড় মারল সেখানে। মশা তো মরলই না,উলটে ছেলেটার হাউকাউতে ও ধমক খেলো দাদার। তারপর রেগেমেগে চলে এলো বাড়ি।
পাপা আর চাচ্চু বাজারে গিয়েছেন। দাদা,নানার বয়স হয়েছে তো! ওনাদের এখন বিশ্রামের সময়। ব্যবসা মিন্তু সামলাতে শুরু করেছে। পুরোদস্তুর ব্যস্ত মানব সে। এইত ব্যবসারই একটা কাজে চিটাগং গিয়েছে। আজ ফেরার কথা!
রায়ানের পরনে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি। মাথায় টুপি। টুপিটা মুঠোয় নিয়ে সিল্কি চুলে হাত বোলাতে বোলাতে ও গোমড়ামুখে বাড়ি ঢুকল। তক্ষুণি ইঁদুরের মতো লাফাতে লাফাতে এসে সামনে দাঁড়াল ইতু। বছর খানেক আগে ওকে ন্যাড়াবেল করা হয়েছিল। আবার চুল গজিয়েছে। তালুর দুইপাশে দুটো ঝুটি সজারুর কাঁটার মত দাঁড়িয়ে থাকে এখন। পরনে লাল ফ্রক। গাল দুটো ফোলা ফোলা! সামনে এসে দাঁত বার করতেই রায়ান গজগজ করে উঠল,
“ সকাল সকাল তোর পোঁকা দাঁত গুলো দেখাতে হলো? এমনিই আমার দিন ভালো যাচ্ছে না।”
ইতু কষ্ট পেলো একটু। রায়ান খুব খচ্চুরে! ওর দাঁতে পোকা ধরেছে; তাই বলে এভাবে বলতে হবে? ঠোঁট উলটে বলল,
“ তুশি বলেছে আমার এই দাঁত পড়ে যাবে। আবার নতুন দাঁত গজাবে লায়ান ভাই!”
তুরন্ত একটা টাস করে ওর মাথার ওপর চড় মারল রায়ান। ব্যথা পেলো ইতু। ভ্যাঁ করে কেঁদে দিতে গেল- যে কান্নায় মুখ হাঁ হয় আগে, শব্দ হয় পরে। তবে এর আগেই ওর মুখটা চেপে ধরল রায়ান। আশপাশ দেখে ফিসফিস করল,
“ কাঁদিস না ফোকলাদাঁতি, মাম্মাম শুনলে আমাকে মারবে! নে,চকলেট নে!”
পাঞ্জাবির পকেট থেকে কিটক্যাটটা দিতেই,ইতু কান্না ভুলে গেল। হেচকি তুলতে তুলতে বলল,
“ মাললে কেন আমাকে?”
“ একে আমার মায়ের নাম ধরে ডাকিস। বেত্তমিজ! আর দুইতো লেদাপোকার মতো আমাকে লায়ান লায়ান বলিস। এটা শুনলেই রক্ত গরম হয়ে যায়। সর সর।”
ইতু সামনে থেকে সরে দাঁড়াল। চকলেট ছিঁড়তে গিয়েও পারল না। রায়ানকে ছিঁড়ে দিতে বলবে,পিছু ফিরতেই দেখল ওর কোমরের সাথে ঝুলানো কার্টুন পার্স ব্যাগটায় চেয়ে আছে সে। এই পার্স ইতুর ফ্রকের সাথে কেনা।
রায়ান জিজ্ঞেস করল,
“ তোর ব্যাগ এত ফোলা কেন?”
ইতু উচ্ছ্বল হয়ে বলল,
“অনেক তাকা!’’
“ সালামি পেয়েছিস? কত পেয়েছিস দেখি?”
ইতু অবোধ মনে সব টাকা বের করে এগিয়ে দেয়। রায়ানের চক্ষু চড়কগাছ! সব এক হাজার টাকার নোট।
“ এত কে দিলো তোকে?”
“ দিদান,নান,তুশি তাচ্চু বাপি সবাই দিয়েছে।”
রায়ান মুখ ফুলিয়ে ভাবল,
“ মাম্মাম তো আমাকে দিলো না। সব আদর খালি বোনের মেয়ের জন্যে?”
তারপর এদিক ওদিক চাইল সে।
ইতুর ছোট্ট হাতটা ধরে বলল – চল আমার সাথে।
রায়ানের আলাদা ঘর। বড়ো হয়েছে না? মিন্তুর সাথে ঘুমায়। ইতু সাথে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“ তুমি কি আমায় মালবে?”
“ কীহ,কেন? এমন ভাবে বলিস যেন সব সময় মারতেই থাকি।”
“ মালোই তো লায়ান ভাই!”
“ তোর আল্লাহর দোহাই লায়ান বলিস না।”
“ দোহাই মানে কী?”
“ তোর মাথা!”
ইতু দশটা সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে গেল। ক্লান্ত গলায় বলল,
“ এত গুলো সিলি বাবো কীভাবে? কোলে নাও না ইত্তু প্লিজ!”
রায়ান মেজাজ খারাপ করতে গিয়েও,হার মানল। সামনে হাঁটুমুড়ে বসে বলল,
“ পিঠে ওঠ।”
পেছন থেকে দুই হাত বাড়িয়ে ঘাড় প্যাঁচিয়ে ধরল ইতু। বাদরের মতো ওকে পিঠ তুলে হাঁটা ধরল রায়ান। এলো ঘরে।
ওকে ফ্লোরে দুপা গুছিয়ে বসতে দেখে ইতুও বসল। ফ্রক পা থেকে হাঁটুর ওপরে উঠে গেল তাতে। রায়ান দেখতেই টেনেটুনে ঢেকে দিলো আবার। ড্রয়ার থেকে কিছু টাকা বের করল এরপর। সেখানে সব ৫০০ টাকার নোট।
ইতু বলল,
“ ওয়াও সব গ্লীন গ্লীন তাকা!”
রায়ানের কাছে মোট দশ হাজার ছিল। সেখানে ইতুর ১ হাজার টাকার ১৭টা নোট। রায়ান ওরগুলো মেলল সামনে। বলল ,
“ ওয়ান টু পারিস?”
“ হ্যাঁ।”
“ এখানে কয়টা নোট,গুনে দেখা তো।”
ইতু মনোযোগী ছাত্রীর মত গুনল। রায়ান মাঝপথেই বলল
“ ব্যস ব্যস।
এই টাকা ( ১হাজার নোট) তোর, আর এই টাকা আমার।(৫০০ নোটের)। তোর কটা আর আমার কটা?”
“ তোমাল তুয়েন্তি আমার সেভেন্তি।”
“ তাহলে কার বেশি?”
“ তোমাল!”
“ হাহাহা,দেখলি? সবাই আমাকে বেশি টাকা দিয়েছে। তোর কষ্ট লাগছে না?”
ইতু দুইপাশে মাথা নাড়ল। বোঝাল, পাচ্ছে না। রায়ান মজা পেলো না। ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ কেন পাচ্ছিস না? পেতেই হবে।
শোন,ধর তুই কষ্ট পেয়েছিস। এখন আমার তোর কষ্ট কমানো উচিত। এই নে,আমি আমার বিশটা নোট দিয়ে তোর এই সতেরোটা নোট কিনে নিলাম। এখন থেকে এই টাকা তোর।”
ইতু খুশি হয়ে বলল,
“ সত্যি?”
“ হ্যাঁ।”
সব টাকা বুকের সাথে মিলিয়ে উঠে দাঁড়াল ইতু। মাথা ঝাঁকিয়ে “ লায়ান ভাই খুব ভালো!”
বলেই টুকুস করে বসে থাকা রায়ানকে একটা চুমু খেয়ে ফেলল।
ও মূহুর্তে নাক সিটকে বলল,
“ সর ফোকলাদাঁতি! চুমু দিবি না।”
ইতু শোনেনি। ছুটে বেরিয়ে গেছে। রায়ান পাঞ্জাবির হাতায় গাল মুছতে মুছতে আবার নাক সিটকায়।
এসব চুমু-চামাটি ওর একদম পছন্দ না।
তারপর উঠে জামাকাপড় ছেড়ে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর কালো টিশার্ট পরল রায়ান। এটাও ইদের জামা। চাচ্চু দিয়েছে। কাঁধে ক্রিকেট ব্যাটটা চড়িয়ে বাইরেই যাচ্ছিল,হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল তুশি। মা হওয়ার প্রায় বারো বছর চলছে তার। বয়স বেড়েছে! তবে চামড়ায় ভাঁজ আসেনি। থ্রি পিস পরে সব সময়। চুল খোপা করে রাখে। রায়ানের ক্লাসের বন্ধুরা মাকে নিয়ে খুব কথা বলে। বলে,রায়ানের মা সব চেয়ে সুন্দর! তুশির আঙুল ধরে ইতুও এসেছে। আধোবুলিতে বলল,
“ লায়ান ভাইয়া,তুশি তোমাকে বকবে।”
“ কেন,আমি কী করেছি?”
তুশি মূহুর্তে ওর কান টেনে ধরল। রেগেমেগে বলল,
“ ধরিবাজ ছেলে,তুই ওর থেকে টাকা হাতিয়েছিস কেন?”
“ কই হাতালাম? আমি তো কিনে নিয়েছি মাম্মাম?”
“ ১০ হাজার টাকা দিয়ে ১৭ হাজার টাকা কিনে নিয়েছিস? ধান্দাবাজি করিস? তোর গুষ্টিতে কেউ ধান্দাবাজ আছে?
দে,, ওর টাকা ওকে দে।”
“ না,মাম্মাম। স্যার পড়িয়েছেন বিক্রিত মাল ফেরতযোগ্য নয়!”
তুশি হুঙ্কার ছুড়ল,
“ রায়ান…”
“ মাম্মাম, ব্যথা লাগে। আমি পাপাকে বলে দেব।”
“ তোর চৌদ্দ গুষ্ঠিকে গিয়ে বল। ওর টাকা দে তুই। “
রায়ান মায়ের চোখ দেখে ভয় পেলো। বাধ্য হয়ে ড্রয়ার থেকে টাকা এনে বাড়িয়ে দিলো ইতুর দিকে। তবে কটমট করে বলল,
“ ফোকলাদাঁতি, নালিশ করেছিস আমার নামে?”
ইতু বুঝতে না পেরে বলল,
“ তুশি,নালিশ কী?”
রায়ান কিড়মিড়িয়ে উঠল,
“ ওলে ওলে উনি নালিশ মানেও জানেন না।”
“ রায়ান? এমন করছিস কেন ওর সাথে? তুই এমন হলি কী করে বলতো,এভাবে কেউ মানুষ ঠকায়? তাও এতটুকু বাচ্চাকে! ও তোর ছোট না?
চোর ছ্যাচরের পেটে জন্ম তোর? তুই চোরের বাচ্চ…
তুশি থেমে গেল। থতমত খেয়ে কথা পালটে বলল,
“ কোথায় যাচ্ছিস এখন?”
“ খেলতে। ”
“ এখন কীসের খেলা? হাতমুখ ধুয়ে টেবিলে আয়। মিমি সেমাই রান্না করেছে, খাবি?”
“ মিমি রেধেছে?
রায়ান ব্যাট রেখে সত্যিই ছুটে যায়। পেছনে শুনতে পায় ইতু বলছে,
“ কোলে নাও তুশি।”
ও তড়িবড়িয়ে ফিরে এল আবার। ধমকে বলল,
“ এই আমার মাম্মাম কোলে নেবে কেন? মাম্মামের পিঠে ব্যথা না? তুই আমার কোলে আয়।”
রায়ান আবার নিজের পিঠটা বাড়িয়ে দিলো। সেই আবার পেছন হতে দুহাত প্যাঁচিয়ে ঘাড়ে ঝুলল ইতু।
ইদের দিনে বাড়ির রমণীরা ব্যস্ত থাকেন রান্নাবান্না নিয়ে। তবে আজ তনিমাকে সেখানে জায়গা দেয়া হয়নি। কদিন আগে ওনার আরেক রোগ ধরে পড়েছে । বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না।
রান্নাঘরের দায়িত্ব ইউশা আর রেহণুমা নিলেন। তুশিও এগিয়ে দিলো কিছু কিছু। টেবিল ভরে খাবার দাবারের আয়োজন করা হলো। একটা চেয়ার টেনে ইতুকে বসিয়ে, ওর পাশেরটা টেনে বসল রায়ান।
জোরে জোরে ডাকল,
“ মিমি, সেমাই কোথায়?”
ইউশা,শাড়ি পরা মেয়ে, না সে তো এখন রমণী… ছুটে এলো সেমাই নিয়ে। বড়ো ব্যোলটা ওদের সামনে নামিয়ে রাখল। রায়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“ ,নামাজ পড়ে ফিরলে কখন?”
“ অনেকক্ষণ!”
“ তোমার সালামি তুলে রেখেছি।”
“ আহ মিমি ইউ আর সো সুইট!’’
ইতু সেমাই দেখে জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটল। হাত দিয়ে টানতে গেলে চেপে ধরল ইউশা।
“ না, এটা গরম!”
“ তাহলে তুমি খাইয়ে দাও।”
ইউশা দুজনের মাঝের চেয়ারে বসল। ইতু বলল
“ মাম্মি কোলে নাও না।”
রায়ান চোখ রাঙিয়ে বলল,
“ এই চুপ,খালি কোলে কোলে। তোর বয়সে আমি কখনো এমন করেছি?”
ইতু আর কথা বলল না।
ইউশা এক এক চামচ সেমাই তুলল,ফুঁ দিয়ে দিয়ে একবার রায়ান আরেকবার ইতুকে খাওয়াল।
তক্ষুনি দুহাত ভরা বাজার নিয়ে বাড়ি ঢুকল অয়ন। মাথার টুপি খসে পরবে পরবে ভাব। ও হড়বড় করে চ্যাঁচাল,
“ ইউশা, ইউশা আমার টুপি!”
ইউশা আঁতকে চাইল। অয়নের অবস্থা দেখে ফোস করে শ্বাস ফেলল পরপর। মাথা আর কাঁধ দিয়ে টুপি চেপে ধরেছে। ও এসে টুপি আবার অয়নের মাথায় পরিয়ে দিয়ে বলল,
“ একটা টুপিও সামলাতে আমাকে লাগে অয়ন?”
অয়ন হাসল। বাজরের ব্যাগ রাখল মেঝেতে। গলা তুলে বলল,
“ ছোটো মা,দেখো সব ঠিক আছে কিনা!”
ইতু মূহুর্তে চেয়ার থেকে নেমে যায়। ছুটে কাছে আসে।
“ বাপি বাপি!”
অয়ন কোলে তুলল মেয়েকে। ফোলা গালে চুমু দিলো। পরনে ফ্রক দেখে বলল,
“ তুমি না শাড়ি পরবে বললে? পরোনি কেন?”
“ মাম্মি দিলো না।”
ইউশা বলল,
“ সারাক্ষণ ছোটে। হোচট খেয়ে পড়বে না?”
“ তাই বলে পরাবে না? শাড়ি পরলে আমার মাকে তো পরী লাগবে।”
“ আচ্ছা, বিকেলে পরিয়ে দেবো।
রায়ানের মুখ কালো। চুপচাপ সেমাই খাচ্ছে দেখে অয়ন বলল,
“ রায়ানের আবার কী হলো?”
ও মন খারাপ করে বলল ,
“ পাপা দেখলে সকাল থেকে নেই।”
অয়ন হেসে বলল,
“ আরে পাপাভক্ত ছেলে!
তোমার পাপা আসছেন। বাইরে চেনা একজনের সাথে দেখা হলো, কথা বলছে। “
পাপা বাইরে শুনেই, রায়ান সেমাই রেখে ছুট লাগায়।
একটু বাদেই সার্থ, সাইফুল, শওকত একসাথে ঢুকলেন বাড়িতে। শওকতের এখন লাঠি নিয়ে হাঁটতে হয়। বার্ধক্য বাড়লেও ছেলের সাথে তার সম্পর্কের সুতোর দৃঢ়তা আর বাড়েনি। এখনো গা ছাড়া! সার্থ কথাই বলে না ঠিক করে।
এই তো আজ ইদ গেল,শওকত এগোলেন কোলাকুলি করতে। সার্থ খেয়াল করেনি হয়ত। হঠাৎ ফোন এলো,চলে গেল অন্যদিকে। ভদ্রলোক আর ডাকলেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্যথাটুকু বুকে চেপে রাখলেন।
ইউশা বলল,
“ সবাই এসে গেছ? নাস্তা দিই বসো।”
সার্থ এদিক-ওদিক চাইল।
“ তুশি কোথায়?”
“ মাম্মাম,ওপরে।”
“ তুমি খাওয়া শেষ করো,পাপা আসছি।”
রায়ান ঘাড় নাড়ে। বাকিরা বসলেও ঘরের ওপরের দিকে হাঁটল সার্থ।
বয়স বেড়েছে কিছুটা। কানের দুপাশে ছাটা চুল দু একটা সাদা হয়েছে । কিন্তু, পেটানো দেহের বদল নেই আজও। একইরকম শক্ত-পোক্ত, মেদহীন!
সার্থ ঘরে এসে দেখল তুশি ওয়াশরুমে।
দরজায় টোকা দিয়ে বলল,
“ অ্যাই চোর!”
শাওয়ার ট্যাপটা বন্ধ করল তুশি। উত্তর দিলো চ্যাঁচিয়ে,
“ হ্যাঁ? গোসল করছি।”
“ খোলো।”
“ কেন? আপনি তো শাওয়ার নিলেন একবার।”
“ আবার নিই, দুজন মিলে!”
শোনা গেল তুশির অতীষ্ঠ স্বর,
“ দুদিন পর ছেলে বিয়ে দিয়ে বউ আনব। এখনো আপনার বিটকেলপনা যাচ্ছে না কেন?”
“ আমার নাতি-নাতনি হয়ে কবরে এক পা ফেললেও তোমার সাথে রোমান্সের ইচ্ছে এরকইরকম থাকবে।”
তুশির উত্তরের আগেই কিশোর দুটো হাত ছুটে এসে সার্থর কোমর জড়িয়ে ধরল।
“ পাপা!”
সার্থ ফিরে চায়। মুচকি হেসে ঘুরে বুকে জড়ায় ছেলেকে।
“ আজকে ম্যাচ খেলতে যাওনি কেন?”
“ মাম্মাম দিলো না।”
“ যেতে চাও?”
“ হ্যাঁ!”
তুশি ভেতর থেকে চ্যাঁচাল,
“ এই না। ইদের দিন কীসের খেলা?”
“ যাক, বাচ্চা মানুষ!”
রায়ান উচ্ছ্বল হয়ে বলল,” পাপা, ইউ আর দ্য বেস্ট! আমাকে একটা আই প্যাড কিনে দেবে?”
তুশি বেরিয়ে এলো তাড়াহুড়ো করে। পরনে কালো জামদানি,চুল ভেজা। আঁচলটা কাঁধে তুলে বলল,
“ কেন রে তুই আইপ্যাড দিয়ে কী করবি?”
তোর বয়স হয়েছে এসবের?”
সার্থ বলল,
“ আহা,তুমি এর মধ্য এসো না। আচ্ছা কিনে দেবো। এখন যাও,পাপা বিশ্রাম নিই?”
রায়ান খুশিমনে ছুটে গেল। তুশির এত্ত আহ্লাদীপনা বিরক্ত লাগে। বাচ্চাকাচ্চা শাসন না করলে বখে যায় না? দাদি তো ওকে উঠতে-বসতে ঝাড়ুর বাড়ি মারতেন। দাদির কথা মনে পড়তেই তুশির মাথায় এলো, ওনার রুমে সেমাই দিয়ে আসা হয়নি। দাদি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-নামতে পারেন না। ও তড়িঘড়ি করে বারান্দার দিকে এগোলো, তড়িৎ হাতের কব্জি টেনে ধরল সার্থ। হ্যাচকা টানে বুকে এনে ফেলতেই বাহুতে লাগল তুশির।
হাত ডলতে ডলতে বলল,
“ উফ বাবা, শরীর না আর কিছু?”
“ শরীরই। তুমি বেশি নরম! তা কোথায় যাওয়া হচ্ছে?”
“ তোয়ালে মেলে দেব না? ভেজা!”
সার্থ শাড়ি পরা তুশিকে দেখল। চুল দিয়ে পানি পড়ছে। তোয়ালে নিয়ে নিজেই চুলটা মুছে দিতে দিতে বলল,
“ তারপর কই যাবে?”
“ দাদিকে নাস্তা দেব।”
“ ছোটো মা নিয়ে গেছেন। তোমার যেতে হবে না।”
“ ওহ,তাহলে ইউশার কাছে যাই।”
“ বেশি বোঝো কেন? রায়ানকে নিচে কেন পাঠালাম?”
“ বিশ্রাম নেবেন বললেন তো!”
সার্থ ঠোঁটের কোণ তুলে ক্রুর হাসল। এই হাসি তুশি চেনে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ ভালো হবেন না,বুঝে গেছি আমি!”
ইউশা যেদিক যাচ্ছে,অয়ন পিছু পিছু যায়। রান্নাঘর বেসিন সব দিকে। শেষে অতীষ্ঠ হয়ে ফিরল মেয়েটা,
“ কী হলো?”
“ নতুন শাড়ি কেন পরলে না? বললাম না বের হব?”
“ এইত, রান্না সব শেষ।”
“ ঘেমে গেছ কেন এত!”
অয়ন টিস্যু বক্স থেকে টিস্যু তুলে নিজেই ইউশার মুখ-চোখ ড্যাবড্যাব করে মুছে দিলো। মুখে পড়া চুল গুছিয়ে দিলো কপালের দপাশে। মেয়েটা মুচকি হাসল তাতে। অয়ন কপাল কুঁচকে বলল, – হাসছো কেন?”
ইউশার সরল স্বীকারোক্তি,
“ তুমি আমায় এত ভালোবাসবে আমি কখনো ভাবিইনি।”
অয়ন দুইহাত ওর কোমরের বাঁকে রাখল। বুকের দিকে টানতেই,হাত তুলে গলা জড়িয়ে ধরল ইউশা। অয়ন বলল,
“ তুমি এমন মানুষ যাকে ভালো না বাসলে ভালোবাসার অপমান হতো ইউশা!”
ওদের দুজনের মাঝে জায়গা কম। অথচ কুজো হয়ে হেঁটে, বসে বসে ঐ ফাঁকে ঢুকে পড়ল রায়ান। ওইভাবেই বলল,
“ ভাও…”
চমকে চাইল ওরা। ইউশা সরে গেল তাড়াহুড়ো করে। অয়নের ভ্রু গুছিয়ে এলো। পুরু স্বরে বলল,
“ রায়ান এখানে কেন?”
“ তোমরা কী কথা বলছো?”
“ তোমাকে বলব কেন? এখন বড়ো হয়েছ রায়ান। এত দিকে কেন মন দাও?”
“ বকছো কেন? ও তো ছোটো। বোঝে এত?”
অয়ন কড়া কণ্ঠে বলল,
“ রায়ান পড়তে বসেছিলে?”
রায়ানের হাওয়া বেরিয়ে গেল সব। চুপসে বলল,
“ চাচ্চুু, আজ ইদ।”
অয়ন আর কিছু বলে না। হনহনিয়ে ওপরে চলে যায়। যেতে যেতে খাবার টেবিলের ওখানটা থেকে মেয়েকে তুলে নেয় কোলে।
রায়ান খেলতে গেলেও বাকিরা খেলতে আসেনি। তাদের তো আর ইদ নিয়ে অনীহা নেই! কিংবা ওদের পাপাও রায়ানের মতো প্রশ্রয়দাতা নয়। তাও কিছু সময় অপেক্ষা করে হতাশ চিত্তে বাড়ি ফিরল ছেলেটা। এখানেও এসে দেখল বুড়োরা ছাড়া বাকিরা নেই।
অয়ন,ইউশা আর ইতুকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছে। সার্থ বেরিয়েছে তুশিকে নিয়ে। ছেলেকে ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়ে কোথাও না পেয়ে নিজেরাই চলে গিয়েছে। রায়ান কিছুক্ষণ দাদির কাছে বসল। আযান দিতেই,মাগরিবের নামাযে দাঁড়ালেন তনিমা। রায়ান নিজের ঘরে ফিরে আসে।
কতক্ষণ গেমস খেলল,টিভি দেখল, পাপাকে কল দিলো। মামুকেও দিলো। মামু এখনো আসেনি। শুনল কখন আসবে! হঠাৎ নজর পড়ল এক প্যাকেট রঙীন মোমবাতির ওপর। লাল-নীল সহ বিভিন্ন রঙের চিকন চিকন মোমবাতি এটাতে। সায়েন্স ক্লাসে এসব নিয়ে কত এক্সপিরিমেন্ট হয়। রায়ান সাথে সাথে মোম নিয়ে মেঝেতে বসে গেল। দেশলাই দিয়ে জ্বালাল সব। এখন ও একটা এক্সপিরিমেন্ট করবে। পাপা সুদ্ধ বাড়ির সবাই চায় রায়ানও বাবার মতো অফিসার হোক,নাহলে চাচার মতো ডাক্তার হোক। কিন্তু রায়ান তা চায় না। ও ম্যাকগাইভার হবে। একটা মার্কিন টিভি সিরিজে ম্যাকগাইভারকে দেখেই রায়ানের মনে ধরে গেছে। কী বুদ্ধি! কখনো
ছাতা দিয়ে দড়ি বানায়। কখনো আইস্ক্রিমের পাইপ দিয়ে টায়ার।
রায়ান সাত রঙের সাতটা মোমবাতি জ্বালাল। এখন দেখবে কোন রঙের মোম আগে গলে যায়! এটাও এক্সপিরিমেন্ট হবে না? পাপাকে জানালে ভীষণ খুশিও হবে।
অয়নরা ফিরেছে মাত্র। কিন্তু ইতু বাবা মায়ের সাথে নিজের ঘরে যায়নি। রায়ানের রুমে আলো জ্বলতে দেখেই ওভাবেই ভেতরে ছুটে এলো। পরনে বেবি শাড়ি,লাল রঙের!
ইতু খুব শাড়ি পরতে চায়। মাম্মামের ওরনা দিয়ে পরে। তাই ইদে অয়ন কিনে দিয়েছে।
মাথার তালুতে দুটো ঝুটি। হাত ভরা চুড়ি। পায়ে আর হাতের তারায় আলতা পরানো। তুশি সাজিয়ে দিয়েছে।
ও এসেই বলল,
“ লায়ান ভাই, ঘুত্তে গেছিলাম জানো।”
রায়ান চোখ তুলে চাইল না। মোমের দিকে ওর কঠিন মনোযোগ। ইতুই বসল পাশে। বকবক শুরু করল। একটা সময় লাল রঙের মোমটা গলে পড়ে গেল। হাত তালি দিয়ে উঠল রায়ান।
“ দেখেছিস? এটা আগে গলেছে।”
ইতু কিছু বোঝেনি। কিন্তু হাত তালি দিলো তালে তালে। রায়ানের হঠাৎ চোখ পড়ল দুজনের মাঝে পড়ে থাকা ইতুর লাল শাড়ির আঁচলে। মাথায় দুষ্টুমি এলো অমনি। লাল মোম আগে গললে,লাল শাড়িতে আগুন কেমন জ্বলবে? রায়ান মোম একটা তুলেই ওর আঁচলের ওপর ধরল। কড়কড়ে কাপড় লুফে নিলো সেটা। দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠতেই ইতুর চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। তড়াক করে দাঁড়িয়ে পড়ে বাচ্চাটা। আর্তনাদ করে ছোট স্বরে “ লায়ান ভাই আগুন, নেভাও। লায়ান ভাই!”
ইতুর লাফানো দেখে রায়ান খুব মজা পেয়ে গেল। খ্যাকখ্যাক করে হাসল ও। আগুন ইতুর পিঠে উঠে এলো তক্ষুনি। বাচ্চাটা আর্তচিৎকার ছুড়ল চামড়া পোড়া ব্যথায়। ওই চিৎকারে রায়ানের সৎবিৎ ফিরল। হাসিটা মুছে গেল সহসা। বুঝল ও কী করে বসেছে! ছুটে এসে ইতুর ছোটো শরীর টেনে বুকে জড়িয়ে পিঠের আগুন হাত দিয়ে নেভাতে চেষ্টা করল রায়ান। উন্মত্ত আগুন নেভে না, উলটে ওর হাতের কব্জি পুড়ে যায়। তক্ষুনি, ইতুর চ্যাঁচামেচিতে ছুটে এলো সবাই। ছোট্ট বাচ্চার গায়ে আগুন দেখে মাথায় বাঁজ পড়ল তাদের। অয়ন দৌড়ে এসেই মেয়েকে ধরল। সার্থ বালতি ভরে পানি এনে,ঢেলে দিলো গায়ে। হূলস্থুল পড়ে গেল। চিৎকার-চেঁচামেচিতে ফেটে চৌচির চারিয়াশ। শাড়িটা টেনে খুলে দূরে ছুড়ে মারল ইউশা। কিন্তু ভয়ে আতঙ্কে ইতুর অবস্থা শোচনীয়। অয়নের হাতেই অচেতন হয়ে পড়ে গেল সে। ইউশার মায়ের মন ঘাবড়ে যায়। আহাজারি করে বলে,
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৭ (২)
“ হাসপাতালে নিতে হবে,অয়ন ওকে হাসপাতালে নিতে হবে। আমার মেয়ে,আমার বাচ্চা!”
তুশি সহ প্রত্যেকে যখন ইতুকে নিয়ে ব্যস্ত, উদ্বীগ্ন,সার্থ নজর পড়ল রায়ানের দিকে। মেঝেতে মোম সাজানো। মুখ কাচুমাচু তার। এসব দৃষ্টি সার্থর চেনা।
মূহুর্তে বুঝে গেল, কার কাজ এটা! প্রথম বার ছেলের হঠকারিতায় সার্থ প্রশ্রয় দিতে পারল না। তেড়ে এসেই হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ছোট্ট গালটায় ঠাস করে থাপ্পড় মারল সে। বাবার ঐ এক থাপ্পড়ে ছিটকে গিয়ে মেঝের বুকে লুটিয়ে পড়ল রায়ান। কপাল ঠুকে গেল। দুনিয়া ঝাপসা দেখতে দেখতে ওখানেই জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়ল সেও।
