আবির ভাই পর্ব ১৬
উর্মিলা মজুমদার
অরির কথার পিঠে সারিমের সেই চিরচেনা নির্লজ্জ হাসিমুখ দেখে অরির ইচ্ছে করছিল দেওয়ালে মাথা কুটে মরতে। এই লোকের ডিকশনারিতে ‘লজ্জা’ নামক কোনো শব্দ যে নেই, তা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। অরি দ্রুত নিজের শার্টের খোলা বোতাম দুটো কোনোমতে আটকে নিজেকে আড়াল করল। ওর ফর্সা মুখাবয়ব ততক্ষণে রাগ, ক্ষোভে থমথম করছে।
সে বিছানা থেকে বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে রইল। সারিম অবশ্য বিছানায় বেশ রাজকীয় ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে এক হাত দিয়ে নিজের চুলগুলো ঠিক করতে করতে অরির এই অসহায় অবস্থা বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিল।
অরি নিজের গলার সমস্ত জোর এক করে অত্যন্ত শক্ত গলায় বলল,
_”আর কতবার বলতে হবে সেই একই কথা? আপনাকে আমি স্বামী হিসেবে মানি না, আর কোনোদিন মানবোও না!”
সারিমের মুখের চতুর হাসিটা এক নিমেষে মিলিয়ে গেল। সে সোজা হয়ে বসল। ওর চোখে এবার খেলে গেল এক অদ্ভুত কূটবুদ্ধির ছটা। চেরচেনা সেই গম্ভীর রূপটা যেন এক সেকেন্ডে ফিরে এলো ওর অবয়বে। সারিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাটের ওপর রাখা অরির পরীক্ষার টেস্টের কাগজগুলোর দিকে তাকাল।
তারপর অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল,
_”ঠিক আছে, রইলো কথা। যদি এটাই তোর সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে মনে রাখিস চন্দ্রিমা-তোর ওই টুকলি করে দেওয়া পরীক্ষাটাকেও আমি মানি না! তাহলে হিসাব একদম বরাবর।তোর ওই এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল করা হলো।”
‘পরীক্ষা বাতিল’ শব্দটা শোনামাত্রই অরির পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। মেডিকেল কলেজে পড়ার যে স্বপ্ন সে ছোটবেলা থেকে বুনে এসেছে,যে পরীক্ষার জন্য সে রাত-দিন এক করে পড়াশোনা করেছে, তা এক নিমেষে শেষ হয়ে যাবে? অরি রাগে আর আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে দু-কদম এগিয়ে এসে বলল,
_”আপনি… আপনি এত বড় অন্যায় করতে পারেন না! আপনি ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন!”
সারিম একটা বাঁকা হাসি হেসে বলল,
_”ক্ষমতা তো অপব্যবহার করার জন্যই রে বউ। আর তা ছাড়া, টুকলি করা ছাত্রীর পরীক্ষা বাতিল করা তো শিক্ষামন্ত্রীর পবিত্র দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, তাই না?”
_”তাহলে ওইদিন হলে গিয়েই কেন তখন বাতিল করে দিলেন না? তখন তো ঠিকই আমার কাছে টুকলি পাওয়া সত্ত্বেও অন্য একটা মেয়েকে এক্সপেইল কেন করেছেন?”
সারিম এবার হাহা করে হেসে উঠল। খাটের ওপর থেকে নেমে সে ধীর পায়ে অরির একদম কাছে এসে দাঁড়াল। ওর সেই তীব্র পুরুষালি পারফিউমের সুবাস আবার অরিকে গ্রাস করে নিল। সারিম অরির থুতনিটা আলতো করে নিজের আঙুল দিয়ে ওপরে তুলে ধরে ফিসফিস করে বলল,
_”তখন তো আমি প্রেমে অন্ধ ছিলাম, চন্দ্রিমা!বউকে বাঁচাতে নিজের সততা বিসর্জন দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ যখন বউ আমাকে স্বামী বলেই মানছে না, তখন আর ওই অন্ধ প্রেমের কী মূল্য, বলো? এখন তো আমি একজন কঠোর শিক্ষামন্ত্রী!”
সারিমের এই অকাট্য যুক্তির সামনে অরি একদম দমে গেল। ওর চোখের সামনে নিজের পুরো ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখতে পেল সে। যদি সারিম সত্যি সত্যি ওর পরীক্ষা বাতিল করে দেয়, তবে বাবার সামনে মুখ দেখাবে কী করে? ওর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন তো অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাবে।অরি সারিমের এই রূপ ভালো করেই জানেন, সারিম যা বলে তা করতে পারে।
ভয়ে আর আশঙ্কায় অরির চোখের কোণে জল জমে উঠল। নিজের সমস্ত জেদ একপাশে সরিয়ে রেখে সে হঠাৎ করেই নরম হয়ে গেল। এই জল্লাদটার সাথে এখন ভালো ব্যবহার করা ছাড়া ওর আর কোনো গতি নেই।
অরি জোর করে নিজের মুখে একটা মিষ্টি, কাঁপাকাঁপা হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল। অত্যন্ত বিনীত আর মোলায়েম গলায় সারিমের পাঞ্জাবির হাতাটা আলতো করে ধরে বলল,
_”না… মানে, আপনি তো এতটাও খারাপ নন। আমি তো রাগ করে ওসব বলেছি। আপনি তো অনেক ভালো… প্লিজ, পরীক্ষাটা বাতিল করবেন না। আমি সত্যি বলছি, আমি আর কখনো অমন কথা বলব না।”
সারিম অরির এই আকস্মিক রূপান্তর দেখে মনে মনে চরম হাসল। ও বুঝতে পারল, ওষুধ ঠিক জায়গায় কাজ করেছে। বউ লাইনে আসছে! সে নিজের গম্ভীর ভাবটা বজায় রাখার ভান করে বলল,
_”ওহ! তাই নাকি? এত তাড়াতাড়ি সুর বদলে গেল? কিন্তু মুখে মিষ্টি কথা বললে তো হবে না, চন্দ্রিমা। তার জন্য তো একটু প্র্যাক্টিক্যাল প্রমাণ দিতে হবে।”
অরি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল,
_”কী… কী প্রমাণ?”
সারিম বিছানার দিকে ইশারা করল। ওর ঠোঁটের কোণে সেই চতুর, দুষ্টু হাসিটা আবার ফিরে এল। সে ভারী গলায় বলল,
_”এখানে এসে বসো। একদম আমার পাশে।”
অরি এক বুক দ্বিধা আর সংকোচ নিয়ে, নিজের ভাগ্যকে দোষ দিতে দিতে বাধ্য হয়ে বিছানায় গিয়ে বসল।অরি বিছানায় বসা মাত্রই সারিম আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। সে অরিকে এক ঝটকায় আবার নিজের দিকে টেনে নিল। অরি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সারিম আগের মতো অরির নরম বুকে নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিল।
_”সারিম… উমম… ছাড়ুন…”
অরি নিচু স্বরে একটু ছটফট করার চেষ্টা করল, কিন্তু পরীক্ষা বাতিলের ভয়ে বেচারি আর জোরে ধাক্কা দিতে পারল না।অরির অবস্থা এখন এমন যে-ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’। একদিকে তার শ্বাস আটকে আসছিল সারিমের এই তীব্র গভীর ভালোবাসার অত্যাচারে, অন্যদিকে মনের ভেতর থাকা লজ্জা আর অপমানবোধ। এই লাগামহীন লোকের বেহায়াপনার কাছে সে আজ সম্পূর্ণ জিম্মি।
রাতের খাবার টেবিল। মৃদু আলোয় ঝকঝক করছে মৃধা নিবাসের ডাইনিং স্পেস। টেবিলের এক প্রান্তে আরিশান মৃধা আর অন্য প্রান্তে জেবা। মাঝে দীর্ঘ নীরবতা, কিন্তু সেই নীরবতায় আগের মতো ভারী কোনো অস্বস্তি নেই। বিকেলে বাগানে আরিশান মৃধার সঙ্গে হওয়া সেই কথোপকথন জেবার মনের ভেতর একটা অদ্ভুত শান্ত ভাব এনে দিয়েছে। ও বুঝেছে, আরিশান মৃধা যা বলছেন, তা তাঁর জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার নির্যাস। জেবা আর আগের মতো জেদ করে নিজেকে শেষ করছে না, বরং আরিশান মৃধার ব্যক্তিত্বের প্রতি একটা গভীর শ্রদ্ধা নিয়ে সে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।ধৈর্য কে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার বানিয়ে নিছে।
শাহীন মিয়া ধীর পায়ে টেবিলে খাবার পরিবেশন করছিলেন। রুপোলি ডিশে ধোঁয়া ওঠা খাবার।
আরিশান মৃধা এক টুকরো গ্রিলড চিকেন কাঁটা-চামচ দিয়ে কাটতে গিয়ে তাঁর নজর গেল টেবিলের খালি চেয়ারগুলোর দিকে। অরি আর সারিমের দেখা নেই। তিনি ভ্রু কুঁচকে শাহীন মিয়ার দিকে তাকালেন।
_”শাহীন, অরি আর সারিম কোথায়? ওরা কি ডিনারে আসছে না?”
শাহীন মিয়া মাথা চুলকে কিছুটা ইতস্তত হয়ে বললেন,
_”জি স্যার… আসলে… আমি ওনাদের ডাকতে ভুলে গিয়েছিলাম। আমি এক্ষুনি উপরে যাচ্ছি স্যার।”
শাহীন মিয়া চেয়ার ছেড়ে ওঠার জন্য উদ্যত হতেই ড্রয়িংরুমের সিঁড়ি দিয়ে অরি আর সারিমের নামার শব্দ পাওয়া গেল। দুজনে নিচে নামছে। অরি দ্রুত পায়ে হেঁটে আসছে, আর সারিম তার পেছনে হাত পকেটে গুঁজে ধীর লয়ে, ঠোঁটে এক বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে নেমে আসছে।
আরিশান মৃধা দুজনকে একসঙ্গে নামতে দেখে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর চোখজোড়া সরু হয়ে গেল। অরি ডাইনিং রুমে ঢুকেই জেবার পাশের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে পড়ল। সারিম বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে অরির ঠিক পাশেই গিয়ে বসল।
টেবিলে আবারও একরাশ অস্বস্তিকর নীরবতা। শাহীন মিয়া দ্রুত সবার প্লেটে খাবার বেড়ে দিয়ে সেখান থেকে সরে পড়লেন। অরি আর জেবা দুজনেই খুব তাড়াহুড়ো করে খাবার খাচ্ছিল। কালকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট পেপার, পড়ার পাহাড় জমে আছে। অরি কোনো রকমে কয়েকটা লোকমা মুখে দিয়ে পানি খেয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
_”বাবা, আমি যাচ্ছি। কাল খুব গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট আছে, আমার অনেক পড়া বাকি।” অরি সারিমের দিকে না তাকিয়েই দ্রুত কথাগুলো বলল।
জেবাও উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে আরিশান মৃধাকে অভিবাদন জানাল।
_”আমিও আসছি,আমারো অনেক পড়া বাকি আছে।”
অরি আর জেবা দ্রুত ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে উপরের দিকে চলে গেল। টেবিল এখন ফাঁকা, শুধু আরিশান মৃধা আর সারিম।
সারিম একটা চপ মুখে দিয়ে তৃপ্তির সাথে চিবুতে শুরু করল। তারপর চামচটা টেবিলে রেখে আরিশান মৃধার দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিল।
_”বড়ই ব্যস্ত মানুষ আমার বউ আর আর তোমার বউ, তাই না ড্যাডি?”
আরিশান মৃধা নিজের প্লেটে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করলেন।
_”ওরা পড়াশোনা করছে, এটা ভালো লক্ষণ। তোমার মতো আড্ডা দিয়ে ঘুরে বেড়ায় না অন্তত।”
সারিম অট্টহাসি হেসে উঠল।
_”তবে একটা কথা না বলে পারছি না তোমায়—বিকেলে অরিকে আমার থেকে দূরে থাকার যে উপদেশ দিয়েছিলে, সেটা আমার কানে এসে পৌঁছেছে।”
আরিশান মৃধার হাতটা একটু কেঁপে উঠল। তিনি স্থির চোখে সারিমের দিকে তাকালেন।
_”আমি যা বলেছি, ঠিকই বলেছি। তোমার মতো লম্পট ছেলের সাথে থাকা ওর জন্য বিপদজনক।”
সারিম এবার চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিল। পরনের পাঞ্জাবিটা একটু টেনে ঠিক করে নিয়ে সে আরিশান মৃধার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল,
_”পিতা, তুমি কি সত্যিই ভাবছ আমার বউ তোমার কথা শুনবে?বউটা আবার আমার বুকের ঘ্রাণ নিয়ে বড় হচ্ছে এখন বুঝলে।বউকে এবার একদম বশে রেখেছি। তুমি যত দেওয়াল তুলোনা কেন?আমার আর অরির মাঝখানে আমি তত বেশি ওটার ফাটল দিয়ে অরিকে নিজের করে নেব।”
আরিশান মৃধা দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
_”তোমার মতো বেয়াদপের কাছ থেকে এগুলো ছাড়া অন্য কিছু আশা করাও বোকামি!তুমি এগুলো বলে আমাকে জ্বালাতে আসছ!”
সারিম এবার হো হো করে হেসে উঠল। সে আরিশান মৃধার দিকে ঝুঁকে এল।
_”কেন? তুমি জ্বলছো বুঝি! আহারে দুক্কু পেলাম। বাবারা ছেলেদের প্রেম দেখে জ্বলে তাও এই প্রথম শুনলাম। বড্ড ছ্যাকা দিলে তুমি আমায় ড্যাডি।
_”তুমি কি নিজেকে মানুষ মনে করো? তোমার কোনো বিবেক নেই?”
সারিম উঠে দাঁড়াল। সে টেবিলটা পেরিয়ে আরিশান মৃধার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
_”বিবেক? বিবেক কি তোমার আছে? নিজের এতো সুন্দর একটা বউ থাকতে রাতে একা রুমে ঘুমাও। ছেহ!”
সারিম আবার ব্যঙ্গাত্মক গলায় যোগ করল,
“ধরো যদি তোমার কোনো হারবাল জনিত সমস্যা থেকে থাকে তাহলে নির্দ্বিধায় আমাকে সংকোচ না রেখে বলতে পারো।এমনিতেই তুমি আর আমি আমরা আমরাইতো।”
আরিশান মৃধা নিজের মাথাটা চেপে ধরলেন। তাঁর মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে সারিমকে কিছু বলার চেয়ে নিজের মাথাটা দেওয়ালে ঠুকে দেওয়া অনেক বেশি শান্তিদায়ক।
সারিম চলে যাওয়ার আগে আবার ফিরে তাকাল।
_”গুড নাইট, ড্যাডি! কাল সকালে আবার দেখা হবে। আশা করি ততক্ষণে তুমি একটু মানুষ হওয়ার ট্রেনিং নেবে।”
সারিম শিস দিতে দিতে ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আরিশান মৃধা একা বসে আছেন টেবিলে।ওনার মাথাটা কেমন ভো ভো করছে সারিমের মুখের বাক্যগুলো শ্রবন করার পর থেকে। মন চাচ্ছে নিজের কপাল নিজে ধরে টেবিলে আছাড় মেরে ফাটিয়ে দিতে। কতবড় পাপ করলে ওনার সন্তান হিসেবে সারিমের মতো একটা অসভ্য ছেলে জন্মেছে।ওনি ওনার জীবনের অর্ধেকটা সম পার করে এসেছেন,কিন্তু আজ এতবছর পর তাকেই তার ছেলে পুরুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কিছুই হতে পারে না একজন পিতার কাছে।
রাত তখন প্রায় তিনটে। চারপাশ নিঝুম, হসপিটালের করিডোরগুলোয় টিমটিমে আলো। চারিদিকের এই গম্ভীর নীরবতার মাঝেই দ্রুত পায়ে হেঁটে চলেছে অনুপমা। চেনা পথ ধরে এগিয়ে গিয়ে সে দাঁড়াল একদম শেষপ্রান্তের একটা গোপন দরজার সামনে। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে, পকেট থেকে চাবি বের করে আলতো চাপে দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকতেই সামনে এসে দাঁড়ালেন একজন মাঝবয়সী ডাক্তার।
অনুপমাকে দেখেই ডাক্তারের ক্লান্ত চোখে কিছুটা স্বস্তির আভাস পাওয়া গেল। তিনি গলা নামিয়ে বললেন,
_”ভালোই হলো আপনি এলেন। একটা মিরাকেল ঘটেছে। দীর্ঘ চৌদ্দ বছর পর… কাল রাতে পেশেন্ট সামান্য রেসপন্স করেছে।”
কথাটা শুনতেই অনুপমার বুকটা কেঁপে উঠল। এতগুলো বছরের অপেক্ষা! তার চোখে-মুখে এক লহমায় খেলে গেল তীব্র খুশির আভাস। তবে ভেতরের উত্তেজনা চেপে রেখে সে শুধু বলল,
_”রেসপন্স করেছে? সত্যি?”
_”হ্যাঁ,”
ডাক্তার মাথা নাড়লেন,
_”মেডিকেল সায়েন্সে এমনটা খুব কমই দেখা যায়। তবে লক্ষণ ভালো। পেশেন্ট হয়তো খুব শীঘ্রই জ্ঞান ফিরে পেতে পারে।”
অনুপমা আর দেরি না করে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
_”আর কত সময় লাগবে? ঠিক কতদিনের মধ্যে ওনি পুরোপুরি সচেতন হবে?”
ডাক্তার কিছুটা ভেবে নিয়ে বললেন,
_”নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন, তবে ওনার শরীরের বর্তমান উন্নতি দেখে মনে হচ্ছে বড়জোর আর দেড়-দু মাস। হয়তো তার চেয়েও কম সময়ে চোখ মেলবেন ওনি।”
অনুপমার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
_”চিকিৎসায় যেন কোনো খামতি না থাকে। যা যা দরকার সব করুন, যত দ্রুত সম্ভব ওনাকে সুস্থ করে তুলুন।”
_”আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন,”
বলে ডাক্তার ফাহমিদ ফাইলটা বগলে চেপে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন।
ডাক্তার চলে যেতেই ঘরটায় আবার নীরবতা নেমে এল। অনুপমা ধীরে ধীরে বেডের পাশে শুয়ে থাকা মাঝবয়সী মহিলাটির দিকে এগিয়ে গেল। চৌদ্দটা বছর ধরে এই একটা শরীর শুধু যন্ত্রের সাহায্যে বেঁচে আছে। অনুপমা পাশ থেকে একটা কাঠের টুল টেনে নিয়ে বেডের একদম ঘেঁষে বসল।অবশ, নিথর হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় তুলে নিল। অনুপমার আঙুলগুলো কাঁপছিল, কিন্তু চোখে তখন এক অদ্ভুত, জ্বলন্ত প্রতিজ্ঞা।
মহিলাটির মুখের দিকে তাকিয়ে নিচু কিন্তু ইস্পাতকঠিন গলায় অনুপমা বলল,
_”ফাইনালি… সবকিছু আবার প্রথম থেকে শুরু হবে। এবারের খেলাটায় আমরাই জিতবো।”
ভোরের স্নিগ্ধতা তখনও মৃধা নিবাসের চারপাশে চাদরের মতো জড়িয়ে ছিল। অরি আর জেবা খুব ভোরেই ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে নিয়েছে। আজ কোচিংয়ে বিশেষ ক্লাস, কোনোভাবেই মিস করা যাবে না। অরি হালকা গোলাপি রঙের একটি শার্ট পড়েছে সঙ্গে জিন্স। আর জেবা পরেছে আকাশী রঙের কামিজ। দুজনের সাজেই এক ধরণের সরলতা আর স্নিগ্ধতার ছাপ।নিচে নেমে অরি সোজা ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল। রহিম মিয়া আজ ছুটিতে থাকায় অরি নিজেই গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। জেবা পাশের সিটে বসে ম্যাপ দেখছিল।
গাড়িটা ড্রাইভওয়ে দিয়ে বেরিয়ে মেইন রোডে উঠল। অরি বেশ সাবধানেই গাড়ি চালাচ্ছিল। জেবা পাশে বসে নোটগুলো ঝালাই করে নিচ্ছিল। দুজনে মিলে পড়াশুনার বিষয়ে নানা খুটি নাটি টুকটাক আলোচনা করছিল। আবার কিছুক্ষন পরপর কিছু একটা বলে হাসছিল।পরিবেশটা খুব প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল।গাড়িটা তখন শহরের এক ব্যস্ত মোড় পার হচ্ছিল, অরি একটু দ্রুত গতিতে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করল। হঠাৎ সামনে একটি রিকশা চলে আসায় অরি ঝটকা দিয়ে ব্রেক চাপল। কিন্তু বিপত্তি বাধল তখনি। যখন ব্রেক প্যাডলটি একদম মেঝেতে ডেবে গেল, কোনো চাপ অনুভব হলো না!
_”অরি! ব্রেক কর! সামনে দেখ!”
জেবার আর্তনাদ বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই অরি স্টিয়ারিং ঘোরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু ততক্ষণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে গাড়িটি। প্রচণ্ড শব্দে গাড়িটি পাশের একটি সীমানা প্রাচীরে ধাক্কা খেল। ধাক্কার তীব্রতায় অরি আর জেবা সিটবেল্ট পরা থাকায় বড় কোনো আঘাত পেল না ঠিকই, কিন্তু গাড়ির সামনের অংশটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। আর সেই ধাক্কায় গাড়িটি পিছলে গিয়ে ট্রাফিক সিগন্যাল ভেঙে সরাসরি রাস্তার উল্টো দিক থেকে আসা একটি গাড়িকে সজোরে ধাক্কা মারল।
মুহূর্তের মধ্যে পুরো রাস্তাটা স্তব্ধ হয়ে গেল। চারপাশ থেকে মানুষের ভিড় জমতে শুরু করেছে। ট্রাফিক পুলিশ ছুটে এল ঘটনাস্থলে। অরি আর জেবা সিটে পাথরের মতো বসে রইল।
পুলিশ তাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে আনল। ট্রাফিক সার্জেন্ট রাগী চোখে অরির দিকে তাকিয়ে গলার স্বর চড়িয়ে বললেন,
_”এত বড় দুঃসাহস! আইন ভঙ্গ করে গাড়ি চালাচ্ছেন? ট্রাফিক সিগন্যাল দেখলেন না? পুরো গাড়িটা ভেঙে ফেলেছেন!”
অরি কাঁপতে কাঁপতে বলল,
_”স্যার, আমি… আমি আসলে ব্রেক কাজ করছিল না…”
ইন্সপেক্টর রহমান পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি অরির কথা থামিয়ে দিয়ে গর্জে উঠলেন,
_”চুপ! কোনো অজুহাত শুনব না। লাইসেন্স কোথায় আপনাদের? বের করুন!”
অরি আর জেবা একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। লাইসেন্স। তাদের কাছে লাইসেন্স তো দূরের কথা, বয়সই তো মাত্র আঠারো।অরি মিনমিনিয়ে ইন্সপেক্টর রহমানের উদ্দেশ্যে বলল।
_”আসলে…মানে ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই আমাদের কাছে!
_”লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো ঘোর অপরাধ আপনি জানেন না?
পাশ থেকে জেবা ইন্সপেক্টরের উদ্দেশ্যে বলল।
_”স্যার এবারের মতো ভুল হয়ে গেছে মাফ করে দিন!আর কখনো লাইসেন্স বিহীন গাড়ি চালাবো না।প্লিজ স্যার আমাদের যেতে দিন,আমাদের কোচিং যেতে হবে লেট হয়ে যাচ্ছে।
ইন্সপেক্টর রহমান তাদের কোনো কথা না শুনেই সোজা নিকটস্থ পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন।
_”এদেরকে থানায় নিয়ে চলো কন্সটাবেল!
পাশ থেকে কন্সটাবেল হামিদ মাথা নাড়িয়ে বলে উঠে।
_”ইয়েস স্যার!
থানার পরিবেশটা এমনিতেই ভারি। ইন্সপেক্টর রহমান টেবিল চাপড়ে হুঙ্কার ছাড়লেন,
_”কী ভেবেছেন আপনারা নিজেদের? মগের মুল্লুক নাকি? একে তো ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই, তার ওপর ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে হুট করে গিয়ে অন্য একটি গাড়িকে ধাক্কা মারলেন! ঘোর অপরাধ! আইনের হাত কত লম্বা ধারণা আছে আপনাদের?”
জেবা ওড়নার খুঁট আঙুলে জড়াতে জড়াতে মিনমিন করে বলল,
_”আসলে স্যার… ব্রেকটা কাজ করছিল না…”
_”চুপ!” ইন্সপেক্টর আবার ধমকে উঠলেন।
_”থানায় এসে অজুহাত দেবেন না। এখন সোজা হিসাব, আপনাদের মা-বাবার নম্বর দিন। অভিভাবক ছাড়া আপনাদের ছাড়া যাবে না।”
অরি এবার জড়সড় হয়ে মাথা তুলল। গলাটা প্রায় বুজে এসেছে তার। সে আমতা আমতা করে বলল,
_”স্যার… আমার বাবা-মা নেই।”
রহমান সাহেব ভ্রু কুঁচকে জেবার দিকে তাকালেন,
_”আপনার?”
জেবাও নিচু স্বরে বলল,
_”আমারও বাবা-মা নেই স্যার।”
এবার ইন্সপেক্টরের বিরক্তি চরমে পৌঁছাল। তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে হাতের কলমটা টেবিলে ছুড়ে মারলেন।
_”ভারী অন্যায় তো! দুজনের কেউই আকাশ থেকে পড়েননি। বাবা-মা নেই তো কী হয়েছে? কার কাছে থাকেন আপনারা? তাদের নম্বর দিন। একজন লোকাল অভিভাবক তো লাগবে আপনাদের ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য।”
অরি আর জেবা এবার একে অপরের দিকে তাকাল। তারপর একসাথেই প্রায় ফিসফিস করে বলল,
_”আমরা আমাদের স্বামীর বাড়ি থাকি স্যার।”
শুনে ইন্সপেক্টর রহমান কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইলেন। এদের দেখে বড়জোর কলেজপড়ুয়া মনে হচ্ছে, অথচ এখনই বিয়ে হয়ে গেছে! তিনি একটু সামলে নিয়ে ডায়েরিটা টেনে নিলেন।
_”আচ্ছা, তাহলে স্বামীদের নম্বরটাই দিন। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো আর এক্সিডেন্ট করার অপরাধে ওনাদের ডাকতে হবে। দেখি আপনাদের কোন মহান স্বামীরা আপনাদের হাতে এভাবে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘরে বসে আছেন!”
ইন্সপেক্টর রহমান অরির দিকে তাকিয়ে টেবিলের ওপর আঙুল দিয়ে ঠকঠক করতে লাগলেন। অরি আর জেবা দুজনেই যেন জমে গেছে। অরি কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
_”স্যার… দয়া করে ওদের ডাকবেন না। আমরা নিজেরাই কোনোভাবে বিষয়টি সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছি।”
জেবাও যোগ করল,
_”হ্যাঁ স্যার, ওনাদের জানালে খুব ঝামেলা হবে। প্লিজ…”
ইন্সপেক্টর রহমান বিরক্তির সাথে হাসলেন।
_”ঝামেলা তো আপনারা আগেই বাধিয়ে রেখেছেন! লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো আর দুর্ঘটনা ঘটানোর মতো গুরুতর অপরাধে অভিভাবক ছাড়া ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই। হয় আপনারা নম্বর দিচ্ছেন, না হয় আমরাই আপনাদের ফোন চেক করে নম্বর বের করব। কোনটা চান?”
অরি নিরুপায় হয়ে তার পকেট থেকে ফোনটা বের করল। ইন্সপেক্টর ডায়েরি ও কলম নিয়ে প্রস্তুত। বাধ্য হয়ে অরি সারিমের নম্বরটি বলল। জেবাও কোনো উপায় না দেখে আরিশান মৃধার নম্বর দিতে বাধ্য হলো।
ফোন নম্বরগুলো পাওয়ার পর ইন্সপেক্টর রহমান কনস্টেবলের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন। তিনি তার ফোন থেকে ডায়াল করলেন। কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠে আরিশান মৃধা হ্যালো বললেন।
ইন্সপেক্টর রহমান যেন প্রস্তুতই ছিলেন। তিনি বিন্দুমাত্র দেরি না করে গর্জে উঠা গলায় বললেন,
_”হ্যালো!আপনি কি জেবা নামক মেয়েটির হাসব্যান্ড বলছেন?
আরিশান মৃধা জেবার নাম শুনে বেশ অবাক হলেন। এই সাতসকালে ওনাকে কেউ ফোন করবে তা যেন ওনার ভাবনারো বাইরে ছিলো।কিন্তু অপর পাশের ব্যাক্তিটার কন্ঠটা শুনে আরিশান মৃধার প্রখর মস্তিক ধরতে বাধ্য ব্যাক্তিটির সঙ্গে জেবার কিছু না কিছু গোলমাল বেধেছে নিশ্চিত। ওনি স্বাভাবিক গলায় উওর দিলেন।
_”জি বলছি!কোন সমস্যা হয়েছে কি?
ইন্সপেক্টর রহমান এবার বেশ ঝাঝাঁলো স্বরেই বলতে লাগেন।
আবির ভাই পর্ব ১৫
_”আপনার স্ত্রী জেবার কথা বলছিলাম।আমি থানা থেকে বলছি ইন্সপেক্টর রহমান উদ্দিন। আপনারা বোধহয় খুব নিশ্চিন্তে আছেন বাড়িতে, তাই না?লাইসেন্স বিহীন এক নাবালিকা স্ত্রীর কাছে গাড়ি ছেড়ে রেখে নিশ্চিন্তে কীসের ব্যবসায় ডুবে আছেন? আপনার স্ত্রী এখানে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে একটি বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটিয়েছেন। সাথে আরেকটি মেয়েও আছে নাম বোধয় অরিয়া, আপনাদের কি কোনো দায়িত্ববোধ নেই? গাড়ি চালানোর মতো বিপজ্জনক কাজ কি এভাবে হাতের মোমবাতির মতো ছেড়ে দিতে হয়? কালক্ষেপণ না করে এখনই থানায় হাজির হোন। আপনাদের এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতার হিসাব এখনই দিতে হবে!আপনাদের মতো এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন পুরুষদের আমি রহমান জেলের ভাত খায়িয়েই ছাড়বো।”
