Home প্রিয় বেলিফুল প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৯

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৯

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৯
উম্মে হাবিবা

~~~ কিছু মানুষ জীবনে আসে, সবকিছু বদলে দিতে…
তারপর একদিন নিঃশব্দে চলে যায়, রেখে যায় শুধু অসমাপ্ত গল্প আর বুকভরা যন্ত্রণা।
হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখা কষ্টগুলো কেউ দেখে না, কেউ বোঝেও না।
রাত যত গভীর হয়, স্মৃতিগুলো তত বেশি জেগে ওঠে—
মনে করিয়ে দেয়, কিছু ক্ষত কখনো শুকায় না, শুধু মানুষটা অভিনয় করতে শিখে যায়।
ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়লেও বাইরে থেকে শক্ত থাকার নামই হয়তো জীবন।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট তখনই লাগে,

যখন নিজের প্রিয় মানুষটাই একদিন সবচেয়ে বড় অপরিচিত হয়ে যায়।
রুদ্রের বুকের ভেতরের ধকধকানি আর ভারী শ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সে একবার সোহার দিকে তাকাল। সোহার মুখটা থমথম করছে, চোখের কোণ বেয়ে অবিরল ধারায় জল গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু সেই কান্না শব্দহীন, এক চরম অবহেলার আর ঘৃণার নীরব বহিঃপ্রকাশ।
পুরোটা রাস্তা কেউ কারো সাথে একটা কথাও বলল না। রুদ্রের খুব ইচ্ছে করছিল গাড়িটা রাস্তার একপাশে থামিয়ে সোহার মুখোমুখি বসে চিৎকার করে জানতে চায়, কেন সে রাফিনের সাথে কফি শপে গেল?
কেন এমন অধিকার দেখাচ্ছিলো।
কিন্তু সোহার ওই পাথরের মতো নিস্পৃহ মুখ আর জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকা শূন্য দৃষ্টি দেখে রুদ্রের ভেতরের সব কথা গলার কাছে এসে আটকে গেল।
গাড়ির গতি বাড়িয়ে সে চিল চিৎকার করতে থাকা নিজের ভেতরের সন্দেহ আর অপরাধবোধকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল।

​গাড়িটা যখন মেহতাব ভিলার মেইন গেট গলিয়ে ভেতরে এসে থামল, ব্রেক চাপার শব্দ শেষ হওয়ার আগেই সোহা গাড়ির দরজা খুলে নামল। এক মুহূর্তের জন্যও সে রুদ্রের দিকে তাকাল না। চোখের জলটুকু হাত দিয়ে মুছে সে প্রায় দৌড়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
​রুদ্র স্টিয়ারিং হুইলে কপাল ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল। তার ভেতরে এক তীব্র অস্থিরতা কাজ করছে।
কাল থেকে বাবা তাকে অফিসের পুরো দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে দেশের বাইরে চলে যাবেন।
রুদ্র গাড়ি থেকে নামল না। এই মুহূর্তে বাড়িতে গিয়ে সোহার মুখোমুখি হওয়ার মতো মানসিক শক্তি তার নেই। তাই এখন অফিসে গিয়ে কিছু কাজ বুঝে নেয়া ভালো।
তাছাড়া, রাফিন আর সোহার মধ্যে আসলে কী চলছে, আর ছবি গুলো সব বিষয়ে তাকে জানতে হবে।
—এসবের একটা চূড়ান্ত ফয়সালা না করে সে শান্ত হতে পারছে না। সে গাড়ির ব্যাক গিয়ার পেছনের দিকে নিয়ে তীব্র গতিতে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
এদিকে রৌদ আজ কলেজ শেষ হতেই সোজা চলে এলো ফয়সালের হসপিটালে। গত কয়েকটা দিন তার বড্ড ছটফটানিতে কেটেছে।

ফয়সালের সেই গম্ভীর মুখ, তার সেই মায়াবী অথচ দূরবর্তী চাহনি রৌদকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তিতে থাকতে দেয়নি। কতদিন হলো মানুষটাকে দেখেনি!
আজ সব অভিমান একপাশে সরিয়ে রেখে সে শুধু তাকে একটু চোখের দেখা দেখতে এসেছে। মনে মনে ফয়সালের কথা ভেবেই তার ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
হসপিটালের তিনতলায় ফয়সালের কেবিনের সামনে এসে পৌঁছাল রৌদ। করিডোরে বেশ কয়েকজন রোগী আর তাদের আত্মীয়রা বসে আছেন।
ফয়সাল নিজের কেবিনে শেষ রোগীটি দেখা শেষ করে তার সহকারী ডাক্তার মায়ার সাথে পরবর্তী একটা জটিল কেস নিয়ে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে আলোচনা করছিল।
মায়াও ফাইলপত্র হাতে নিয়ে ফয়সালের কথার পিঠে কথা বলছিল।
রৌদ যেই ফয়সালের কেবিনের দরজার দিকে পা বাড়াতে যাবে, অমনি বাইরে অ্যাপয়েন্টমেন্ট মেইনটেইন করার লোকটা তাকে আটকে দিল। লোকটা কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল,
— শুনুন, আপনার কি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া আছে? সিরিয়াল ছাড়া ভেতরে যাওয়া যাবে না।
​রৌদ একটু থতমত খেয়ে বিনীত গলায় বলল,

— না, আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই। আসলে আমি ডক্টর ফয়সালের আত্মীয় হই। আপনি প্লিজ ভেতরে গিয়ে ওনাকে একটু আমার নামটা বলুন, তাহলেই হবে। আমার নাম রৌদ।
​লোকটা রৌদের দিকে একবার আপাদমস্তক তাকিয়ে অনুমতি নিয়ে কেবিনের ভেতরে গেল। ফয়সাল তখন মায়ার দিকে তাকিয়ে ফাইলের একটা অংশ বুঝিয়ে দিচ্ছিল। লোকটা ভেতরে গিয়ে বলল,
— স্যার, বাইরে একজন আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন। উনার নাম রৌদ, বলছেন আপনার আত্মীয় হন।
রৌদের নামটা শুনতেই ফয়সালের চোখের মণি দুটো এক মুহূর্তের জন্য উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মনের ভেতর এক পশলা ভালোলাগা বয়ে গেল। কিন্তু ঠিক তখনই তার মনে পড়ে গেল সেই রাতের কথা—
রৌদ অন্য কাউকে ভালোবাসে,, নিজের থেকে বয়সে এতো ছোট এই মেয়েটার মায়ায় কখনোই নিজেকে বাঁধতে চায় নি ফয়সাল।
তবে অনুভূতি কি আর বেঁধে রাখা যায়,,। সে ও পারে নি ঐ মিষ্টি পুতুলটার থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে।
কিন্তু সেই পুতুল টা এখন অন্য কাউকে ভালোবাসে। সেই আঘাতটা ফয়সালের পুরুষালি অহংকারে বড্ড শক্ত হয়ে লেগেছিল। এক নিমিষেই ফয়সালের মুখটা মেঘলা দিনের মতো গম্ভীর আর শক্ত হয়ে গেল। সে মায়ার সামনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ না করে অত্যন্ত রূঢ় গলায় লোকটাকে বলল,

— এভাবে যে কেউ এসে আত্মীয় পরিচয় দেবে, আর আপনি কাজ ফেলে আমাকে জিজ্ঞেস করতে চলে আসবেন? ওনাকে বলুন আমার এখন কোনো ফালতু সময় নেই। পেশেন্ট দেখা শেষ, এখন আমার অফিশিয়াল মিটিং আছে। ওনাকে চলে যেতে বলুন।
​লোকটা মাথা নিচু করে কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে রৌদকে বলল,
— দুঃখিত ম্যাম , স্যার এখন দেখা করতে পারবেন না। ওনার জরুরি কাজ আছে, আপনাকে চলে যেতে বলেছেন।
​কথাটা শুনে রৌদের বুকের ভেতরটা যেন এক ধাক্কায় ভেঙে গেল। ফয়সাল তাকে এভাবে ফিরিয়ে দিতে পারে? সে নিজেকে একটু সামলে নিয়ে লোকটাকে আবার অনুরোধের সুরে বলল,
— আপনি হয়তো ওনাকে বুঝিয়ে বলতে পারেননি যে আমি ওনার কতটা কাছের আত্মীয়। আপনি প্লিজ আর একবার ভেতরে গিয়ে ওনাকে বলুন যে, রুদ্র মেহতাবের বোন রৌদ এসেছে। ওনার সাথে দেখা করাটা আমার খুব জরুরি।
​লোকটা বিরক্ত হয়ে আবার কেবিনের ভেতরে ঢুকল। ফয়সাল তখন মায়ার সাথে কথা বলছিল। লোকটা আবারও রৌদের কথা তুলতেই ফয়সাল এবার চরম ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। সে মায়ার সামনেই লোকটার ওপর চিল চিৎকার করে রূঢ় গলায় বলে উঠল,

— আপনার কি কানে কোনো সমস্যা আছে? একবার বললাম না আমি দেখা করব না! যে কেউ এসে মেহতাব পরিবারের বা আত্মীয়তার ধুয়া তুলবে, আর আপনি বারবার আমার কেবিনে ঢুকে আমার মূল্যবান সময় নষ্ট করবেন?
এখানে কি আমি আজাইরা বসে আছি মানুষের ফালতু গল্প শোনার জন্য? গেট আউট ফ্রম হেয়ার! ওনাকে ঘাড় ধরে হসপিটাল থেকে বের করে দিন!
ফয়সাল যখন রাগে কাঁপতে কাঁপতে লোকটার পেছন দিকে তাকাল, তখন তার পুরো শরীর যেন এক মুহূর্তের জন্য জমে পাথর হয়ে গেল। কেবিনের অর্ধস্বচ্ছ কাঁচের দরজাটা একটু ফাঁকা করে দাঁড়িয়ে আছে রৌদ।
ফয়সালের বলা প্রতিটি বিষাক্ত, রূঢ় শব্দ তীরের মতো এসে তার বুকে বিঁধেছে। রৌদের চোখের কোণ বেয়ে টলমল করা জল গড়িয়ে পড়ছে। ফয়সাল এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তার মুখের সব রাগ যেন এক পলকে মিলিয়ে গেল।
রৌদ আর সেখানে এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। কোনো মতে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছে সে করিডোর ধরে উল্টো পথে হাঁটা দিল। ফয়সাল তখনো চেয়ারে থ হয়ে বসে রইল। সে বুঝতে পারল, নিজের ক্ষোভ আর অহংকার প্রকাশ করতে গিয়ে সে কতটা বড় অন্যায় করে ফেলেছে মেয়েটার সাথে। সে ধপ করে নিজের চেয়ারটায় বসে পড়ল এবং দুই হাতে মুখ ঢাকল।
​পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মায়াও ফয়সালের এই আকস্মিক পরিবর্তনে পুরোপুরি অবাক হয়ে গেল। সে কিছু বুঝতে না পেরে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল,

— স্যার? কী হয়েছে? আপনি ঠিক আছেন তো?
​ফয়সাল কোনো উত্তর না দিয়ে অত্যন্ত ক্লান্ত ও ভারী গলায় শুধু বলল,
— মায়া, প্লিজ তুমি এখন বাইরে যাও। আমাকে একটু একলা থাকতে দাও।
​মায়া আর কথা না বাড়িয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। ফয়সাল চেয়ার ছেড়ে উঠে তার কেবিনের বিশাল কাঁচের জানালাটার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
নিচের দিকে তাকাতেই তার চোখে পড়ল, রৌদ চোখ মুছতে মুছতে প্রায় দৌড়ে হসপিটালের মেইন বাউন্ডারি এরিয়া ছেড়ে রাস্তার দিকে চলে যাচ্ছে। তার সেই চঞ্চল, হাসিখুশি রূপটা আজ এক চরম অপমানে ধুলোয় মিশে গেছে।
ফয়সাল চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুকটা যেন তার নিজেরও এক অজানা ব্যথায় মুচড়ে উঠল।
এদিকে সোহা বাসায় এসে কোনোমতে ফ্রেশ হয়ে সোজা ডাইনিং টেবিলে গিয়ে খেতে বসল। নিজের ভেতরের সবটুকু কষ্ট আর গ্লানি লুকিয়ে সে নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করছে। সে খুব ভালো করেই জানে, আদিবা এই বাড়ির প্রতিটি ছোটখাটো ঝামেলার সুযোগ নেওয়ার জন্য ওত পেতে বসে আছে।
রুদ্র আর তার মাঝের এই অশান্তির কথা আদিবা জানতে পারলে সেটা নিয়ে যে আরও বড় নোংরামি হবে, তা সোহার অজানা নয়।

টেবিলে আদিবাও বসে ছিল। সে নাস্তার টেবিলের গম্ভীর পরিবেশের পর থেকেই বুঝতে পেরেছিল কিছু একটা বড়সড় ঘটেছে। এখন সোহার এই জোরপূর্বক স্বাভাবিকতা দেখে আদিবা একদৃষ্টিতে কুৎসিত কৌতূহল নিয়ে সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
সোহা প্রথমে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও আদিবার এই ক্রমাগত আর বিরক্তিকর তাকানোটা সে আর সহ্য করতে পারল না। সে প্লেটে ভাত মাখতে মাখতেই চরম বিরক্ত হয়ে মুখ তুলে আদিবার দিকে তাকাল। অত্যন্ত কড়া আর ঝাঁঝালো গলায় বলল,
কী ব্যাপার ? এভাবে হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছো কেন? আমার রূপ কি রাতারাতি খুব বেড়ে গেছে? কিছু নেবে নাকি? যদি রূপ নিতে চাও, তবে যাও, গিয়ে একটা বড় সাইজের বালতি নিয়ে আসো, ঢেলে দিচ্ছি!
​সোহার মুখ থেকে এমন অতর্কিত আর ধারালো কথা শুনে আদিবা পুরো আহাম্মক বনে গেল। তার ফর্সা মুখটা রাগে আর অপমানে লাল হয়ে উঠল, কিন্তু সোহার এই রুদ্রমূর্তি দেখে সে আর পালটা কিছু বলার সাহস পেল না।
সোহা কোনোমতে খাওয়ার পর্ব শেষ করে টেবিল থেকে উঠে পড়ল। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে নিজের জন্য বরাদ্দ করা নতুন ছোট রুমটায় চলে এলো।
দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিয়ে সে ধপ করে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। নিজের ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, তার ফোনটাও তো রুদ্রে ভেঙ্গে ফেলেছে। ফোনটা না থাকায় সে রাইসার সাথেও একটু কথা বলতে পারছে না, নিজের মনের বোঝাটা হালকা করতে পারছে না। অথচ বাবার সাথেও তার কিছু জরুরি কথা ছিল।

এসব এলোমেলো, যন্ত্রণাদায়ক চিন্তা করতে করতে ক্লান্তিতে আর মানসিক অবসাদে সোহার চোখের পাতা দুটো একসময় ভারী হয়ে এলো এবং সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
রৌদও দুপুরে কলেজ থেকে ফিরেই নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। সে আর লাঞ্চের জন্যও রুম থেকে বের হলো না। রুনিয়া বেগম রৌদের এই আচরণে খুব একটা অবাক হলেন না, কারণ রৌদ মাঝে মাঝেই মন খারাপ হলে বা পড়ালেখার চাপ থাকলে নিজেকে এভাবে গুটিয়ে রাখে।
তাই তিনি আর তাকে ডাকলেন না। পুরো মেহতাব ভিলা জুড়েই যেন এক অদৃশ্য নিস্তব্ধতার রাজত্ব চলছে।
রাত প্রায় আটটা। অফিসের কাজ শেষ করে রুদ্র গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে পার্কিং লট থেকে বের হলো। বাবার অফিসের নতুন প্রজেক্টের এত ফাইল আর হিসাবের জটিলতা সামলাতে সামলাতে তার মাথাটা জ্যাম হয়ে আছে। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সে যখন মেইন রোডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই তার ফোনে একটা পরিচিত নাম্বার থেকে কল এলো। কলটা এ সময় পেয়ে একটু অবাক হলো। জরুরি কিছু ভেবে রুদ্র গাড়িটা রাস্তার একপাশে সাইড করে থামাল এবং কলটা রিসিভ করল।

বলো, ইফতি!
অপাশ থেকে ইফতি যখন অত্যন্ত গম্ভীর এবং জরুরি গলায় কিছু একটা বলল, তখন রুদ্রের মুখের সব রঙ এক নিমিষে উবে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
কলটা কেটে দিয়ে রুদ্র গাড়ি থেকে নামল একটু ফ্রেশ বাতাস নেওয়ার জন্য। ঠিক তখনই তার নজর পড়ল সামনে রাস্তার ওপারে একটা ছোট টং চায়ের দোকানের দিকে। সেখানে কাঠের বেঞ্চে বসে একমনে চা খাচ্ছে রাফিন!
রাফিনের নজরও তখন রুদ্রের গাড়ির দিকেই ছিল। রুদ্রকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে রাফিনও চায়ের কাপটা রেখে সোজা রাস্তা পার হয়ে রুদ্রের সামনে এসে দাঁড়াল।
রুদ্র চরম বিরক্তি আর রাগ নিয়ে রাফিনের দিকে তাকাল। সে গাড়িতে উঠে বসতে যাবে, এমন সময় রাফিন কড়া গলায় বলে উঠল,

— মিস্টার রুদ্র মেহতাব, আপনার সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে। আজ দুপুরে কফি শপে যা হয়েছে, সেটার একটা ব্যাখ্যা আপনার জানা দরকার…
আমি চাই না আমার কারণে কেউ একজন খুব কষ্ট পাক।
​রুদ্র তার পকেটে হাত দিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর আর বিষাক্ত চোখে রাফিনের দিকে তাকাল। সে তার ফোনটা বের করে স্ক্রিনটা অন করল এবং রাফিনের চোখের সামনে ধরল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল সেই দিনের ছবিগুলো—যেখানে রাফিনের বুকে সোহা জড়িয়ে আছে। রুদ্র অত্যন্ত ঠান্ডা অথচ ধারালো গলায় বলল,
— আপনার কথার উত্তর দেওয়ার আগে, আমি আপনাকে এই ছবিগুলো দেখাতে চাই। আশা করি অন্তত নিজের বিবেকের কাছে সত্যটা বলবেন।
ছবিগুলো দেখামাত্রই রাফিন যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে স্তব্ধ হয়ে ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। ছবিগুলো এমন কোণ থেকে তোলা হয়েছে, যেন মনে হচ্ছে সোহা আর সে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অবস্থায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে!
রাফিন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে বুঝতে পারল, কোনো এক তৃতীয় পক্ষ অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তাদের এই নোংরা ফাঁদে ফেলেছে।
​রুদ্র এবার রাফিনের কলারের কাছাকাছি হাত নিয়ে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করল,

— এবার বলুন মিস্টার রাফিন, এসবের মানে কী? আপনি সোহাকে আগে থেকে কীভাবে চেনেন? আপনাদের মধ্যে আসলে কী সম্পর্ক?
​রাফিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের চশমাটা ঠিক করল। তারপর অত্যন্ত স্পষ্ট গলায় সেদিনের সব সত্যি ঘটনা খুলে বলল,
— মিস্টার রুদ্র, আপনি যা ভাবছেন বা এই ছবিগুলোতে যা দেখানো হয়েছে, তার এক শতাংশও সত্যি নয়। সেদিন কলেজ থেকে কিছুটা দূরে,, একটা বেপরোয়া গাড়ি সোহার ওপর তুলে দিচ্ছিল।
আমি ঠিক সময় না পৌঁছালে সেদিন একটা বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেত। আমি সোহাকে বাঁচানোর জন্য নিজের দিকে টেনে এনেছিলাম, আর অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সে সামাল দিতে না পেরে আমার বুকে এসে পড়েছিল। আর এই পুরো বিষয়টাকে কেউ একজন অত্যন্ত বাজে এবং নোংরাভাবে ক্যামেরাবন্দি করে আপনার কাছে পাঠিয়েছে।
আর আজ কফি শপে যা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ একটা কাকতালীয় ঘটনা। আমি ওখানে এমনিই গিয়েছিলাম, রাইসা আর সোহাকে দেখে সৌজন্যবশত বসেছিলাম।
বিশ্বাস না হলে রাইসা কে জিজ্ঞেস করতে পারেন।
সব কথা শুনে রুদ্রের মাথার ভেতরে যেন একটা বজ্রপাত হলো। তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে যেতে লাগল।

সেদিনের সেই এক্সপার্ট দিয়ে চেক করানো ছবিগুলোর পেছনের আসল সত্যটা যে এত বড় একটা ভুল বোঝাবুঝি, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি। রাগের মাথায় সে নিজের পবিত্র, নিষ্পাপ স্ত্রীর চরিত্র নিয়ে এত বড় কথা বলে দিল?
তার গায়ে হাত তুলল? রুদ্র নিজের চুল খামচে ধরে দ্রুত গাড়ির দিকে পা বাড়াল। তাকে এখনই সোহার কাছে যেতে হবে।
​সে গাড়ির দরজা খুলতে যাবে, ঠিক তখনই রাফিন পেছন থেকে আবার কড়া গলায় ডেকে উঠল,
— মিস্টার রুদ্র, একটু দাঁড়ান। আপনার ভুল তো ভাঙল, কিন্তু আমার একটা কথা এখনো বাকি আছে
​রুদ্র ঘুরে তাকাতেই রাফিন তার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ভারী অথচ স্পষ্ট গলায় বলল,
— আমি সোহাকে ভালোবেসে ফেলেছি। হ্যাঁ, আমি জানি ও আপনার স্ত্রী, জানি এটা অন্যায়। তবুও নিজের অজান্তেই, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আমি ওকে ভালোবেসে ফেলেছি। আপনি ওর স্বামী হতে পারেন, কিন্তু ওর বিশ্বাসের জায়গায় আপনি আজ ব্যর্থ।

আমি নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করে যাবো সোহাকে আপনার এই অন্যায় বন্ধন থেকে মুক্ত করে নিজের করে পাওয়ার জন্য। ও একটা মুক্ত পাখির মতো, আপনার মতো সংকীর্ণমনা মানুষের খাঁচায় ও মানায় না।
রাফিনের মুখ থেকে এই চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা শোনা মাত্রই রুদ্রের ভেতরের সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গেল। সে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে এসে রাফিনের মুখে এক শক্ত, সজোরে ঘুষি বসিয়ে দিল। রাফিন সামলাতে না পেরে দুই পা পিছিয়ে গেল, তার ঠোঁটের কোণ ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ল। রুদ্র রাফিনের শার্টের কলারটা দুই হাতে শক্ত করে টেনে ধরে চোখ দুটো রক্তবর্ণ করে বলল,
— মুখ সামলে কথা বলবেন মিস্টার রাফিন! সোহা আমার, শুধু আমার! নিজের ভালো চাইলে ওর ছায়া থেকেও দূরে থাকবেন। ও আমার বিবাহিতা স্ত্রী। ওর দিকে যদি আর একবার কুদৃষ্টি দিয়েছেন, তবে আপনাকে আমি পিষে ফেলবো জাস্ট পিষে।
​রাফিন তার ঠোঁটের রক্তটুকু হাত দিয়ে মুছে এক তীব্র, প্রাণহীন ও তিক্ত হাসি হাসল। যে হাসিতে কোনো ভয় ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত চ্যালেঞ্জ।
আরে যদি আপনি সোহা কে ভালোই বাসতেন তাহলে কখনোই সামান্য ছবি দেখে তাকে জাজ করতেন না বরং এটা খুঁজে বের করতেন, কে আর কেনো ছবি গুলো আপনাকে পাঠালো।
রুদ্র শুনলো তবে আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। সে গাড়িতে উঠে বসে রাগে আর অনুশোচনায় স্টিয়ারিং হুইলে এক শক্ত ঘুষি বসাল। গাড়ির স্পীড একশ পার করে সে মেইন রোড দিয়ে মেহতাব ভিলার দিকে ছুটল। তার ভেতরের হিংস্র পুরুষটা তখন চিৎকার করে বলছে,

— খুন করে ফেলব! জাস্ট খুন করে ফেলব যে আমার শ্যামলতা, আমার বেলিফুলের দিকে চোখ তুলে তাকাবে! ও শুধু আমার!
তার কানে রাফিনের শেষ কথা গুলো বাজছে __সোহা কে ভালোই বাসতেন তাহলে কখনোই সামান্য ছবি দেখে তাকে জাজ করতেন না বরং এটা খুঁজে বের করতেন, কে আর কেনো ছবি গুলো আপনাকে পাঠালো।
রাত তখন প্রায় দশটার কাছাকাছি। রুদ্র গাড়ি পার্ক করে ঝড়ের গতিতে বাড়ির ভেতরে ঢুকল। তার পুরো শরীর কাঁপছে সোহার কাছে যাওয়ার জন্য। সে সোজা রৌদের রুমের দিকে এগিয়ে গেল, কারণ সে ভেবেছিল সোহা এখনো রৌদের রুমেই আছে।
​রৌদের রুমের দরজায় সে জোরে জোরে নক করতেই রৌদ দরজা খুলে দিল। রৌদের মুখটা তখনো কিছুটা থমথমে। রুদ্র ভেতরে উঁকি দিয়ে সোহাকে না দেখে অত্যন্ত অধৈর্য গলায় জিজ্ঞেস করল,
— রৌদ, সোহা কোথায়? ও কি তোর রুমে ?
​রৌদ তার ভাইয়ের এই অস্থিরতা দেখে অত্যন্ত শীতল গলায় বলল,

— না ভাইয়া, ভাবি আমার রুমে নেই। মা সকালেই ভাবিকে আলাদা একটা ছোট রুম পরিষ্কার করে দিয়েছে। ভাবি এখন ওখানেই । কোন রুমে আছে, তা আমি জানি না।
রুদ্র রৌদের রুম থেকে বেরিয়ে যাবে, এমন সময় সে ভালো করে রৌদের মুখের দিকে তাকাল। করিডোরের আলোয় সে স্পষ্ট দেখতে পেল, রৌদের চোখ-মুখ অস্বাভাবিক রকমের ফোলা, যেন সে সারা বিকেল প্রচুর কেঁদেছে।
রুদ্র রৌদকে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না, কারণ তার নিজের মাথায় এখন হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।
​সে নিজের রুমে ফিরে এসে দরজাটা বন্ধ করে ।
পকেট থেকে নিজের পার্সোনাল ফোনটা বের করে সে একটা নির্দিষ্ট নাম্বারে অত্যন্ত কড়া আর হুমকিমিশ্রিত একটা মেসেজ টাইপ করল—
​”আমার বোনের চোখ থেকে ঝরানো প্রতিটা অশ্রু কণার দাম তোকে চড়া সুদে দিতে হবে। খুব শীঘ্রই তোর হিসেব আমি চুকাবো ফয়সাল। মেহতাব পরিবারের মেয়েকে কাঁদানোর শাস্তি কী, তা তুই নিজের হাড় দিয়ে টের পাবি।”
মেসেজটা সেন্ট করে রুদ্র ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলল। সে এবার সোহাকে খোঁজার জন্য ঘর থেকে বের হতে যাবে, ঠিক তখনই দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন রুনিয়া বেগম। রুদ্রকে এত অস্থির অবস্থায় দেখে তিনি অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বললেন,

— রুদ্র, এখন আর সোহার ঘরে যাওয়ার চেষ্টা করো না। ওকে একটু একা থাকতে দাও। তুমি এখন ওর সামনে গেলে পরিস্থিতি ভালো হওয়ার বদলে আরও বেশি ঘেঁটে যাবে। নিজের ভুলগুলো আগে নিজে উপলব্ধি করো।
​মায়ের এই অকাট্য কথা শুনে রুদ্র আর পা বাড়াতে পারল না। সে চুপচাপ নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে ঘরের ভেতর পায়চারি করতে লাগল। রাত বাড়ছে, চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আসছে। রুদ্র বিছানায় গিয়ে শোয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু আগের মতোই তার বুকে এক তীব্র অস্বস্তি শুরু হলো। কিছুতেই তার চোখের পাতা এক হচ্ছে না, ঘুম যেন তার থেকে মাইলের পর মাইল দূরে সরে গেছে।
​সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। তার মনে পড়ে গেল, এই গত এক মাসে সোহা যেদিন থেকে এই রুমে এসেছে, তার পাশে ঘুমিয়েছে, সেদিন থেকে রুদ্রের এই অনিদ্রার রোগটা যেন ম্যাজিকের মতো মিলিয়ে গিয়েছিল। সোহার গায়ের সেই চুলে গুঁজে রাখা বেলিফুলের স্নিগ্ধ ঘ্রাণ আর তার শান্ত উপস্থিতি রুদ্রকে এক পরম শান্তি দিত।

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৮

রুদ্র বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে করতে মনে মনে ভাবল—’মেয়েটা কি কোনো জাদু জানে? ও পাশে না থাকলে আমার কেন এমন দম বন্ধ লাগে? কেন আমি এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ করতে পারছি না?’
ভাবতে লাগলো ইফতির দেয়া তথ্য যদি সত্যি হয়। তবে কাল একজনের কপাল ভিষন ভাবে পুড়বে।
​অনুশোচনা আর সোহার সেই তাচ্ছিল্যভরা হাসির মুখটা তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠতে লাগল, যা তাকে পুরো রাত এক ফোঁটাও ঘুমাতে দিল না।

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here