Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৬২ (২)

শেহেজাদার আদর পর্ব ৬২ (২)

শেহেজাদার আদর পর্ব ৬২ (২)
সুমাইয়া ইসলাম নূর

অবশেষে চলে এলো সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত।
মঞ্চের মাঝখানে টাঙানো হয়েছে সাদা ফুলের অপূর্ব এক পর্দা। পর্দার এক পাশে পাশাপাশি বসানো হয়েছে ইনায়া আর পিয়াসাকে, আর অন্য পাশে বসানো হয়েছে ইউভি আর রেদোয়ান কে
চারপাশে এক অন্যরকম আবেগঘন পরিবেশ। সবার চোখে-মুখে আনন্দ, উত্তেজনা আর অপেক্ষার ছাপ।কাজী সাহেব মৃদু হেসে রেদোয়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন,”বাবা, বিয়ের কাজ শুরু করা যাক। বলো, কাবিন কত লিখব?

রেদোয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল,আমার সমস্ত সম্পত্তির অর্ধেক অংশ আমি আমার স্ত্রীর নামে লিখে দিতে চাই।
কথাটা শুনে চারপাশে মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এলো। উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে রেদোয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল।কাজী সাহেব মুগ্ধ হয়ে বললেন,”মাশাআল্লাহ! আল্লাহ তোমাদের দাম্পত্য জীবন বরকতময় করুন।”এদিকে ইউভি অবাক হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। গত দুদিনে দুই ভাইয়ের মধ্যে ঠিকমতো কোনো কথাই হয়নি। রেদোয়ান কী বলবে ঠিক কী কথা দিয়ে শুরু করবে বুঝতে পারছে না আর ইউভি ইচ্ছা করেই কথা বলছে না
কিছুক্ষণ পর কাজী সাহেব ইউভির দিকে তাকিয়ে বললেন আর তুমি, বাবা? তোমার কাবিন কত লিখব?ইউভি মৃদু হেসে শান্ত কণ্ঠে বলল,আমাদের বিয়ের দেনমোহর আমার স্ত্রী নিজেই ঠিক করবে।”
কথাটা শুনে উপস্থিত সবাই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
কাজী সাহেব এবার ফুলের পর্দার ওপাশে বসা ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,বলো মা, তোমাদের বিয়ের দেনমোহর কত লিখব?ইনায়ার বুকটা ধক করে উঠল। সে কাঁপা কণ্ঠে ধীরে ধীরে বলল,”নয়শত নিরানব্বই টাকা। ইউভির ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
কাজী সাহেব অবাক হয়ে বললেন,”ব্যস? আর কিছু না?”ইনায়া লাজুক হেসে মাথা নিচু করে বলল,

—”যদি এক টাকা বাড়িয়ে এক হাজার করে দেয় আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে শর্ত আছে নতুন টাকার নোট দিতে হবে কথাটা শুনে পুরো বাড়ির সবাই হাসিতে ফেটে পড়ল।
ইউভিও হেসে মাথা নিচু করে ফেলল।
আর মনে মনে বলল,এই বেয়াদব টার সবসময় বিয়াদোবি না করলে হয় না।
এর পর কাজী সাহেব বললো
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
সকল প্রশংসা মহান আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি বিবাহকে মানুষের জন্য ভালোবাসা, শান্তি ও রহমতের মাধ্যম হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।
আজ, ঢাকার গুলশানে, জনাব রাতিব চৌধুরী সাহেবের কন্যা ইনায়া নূর চৌধুরী এবং জনাব লিখন চৌধুরী সাহেবের কন্যা পিয়াসা জান্নাত চৌধুরী-এর শুভ বিবাহ অনুষ্ঠান উপলক্ষে আমরা এখানে সমবেত হয়েছি।
বিবাহ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। এটি শুধু দুইজন মানুষের নয়, বরং দুইটি পরিবারের মধ্যে ভালোবাসা, দায়িত্ব, বিশ্বাস ও পারস্পরিক সম্মানের এক পবিত্র বন্ধন।আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন
“আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই জোড়া সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।”
(সূরা আর-রূম : ২১)

আজ আমরা মহান আল্লাহর নামে এই দুই জোড়া মানুষের নতুন জীবনের সূচনা করতে যাচ্ছি। উপস্থিত সকলের কাছে দোয়ার আবেদন রইল, যেন এই দাম্পত্য জীবন ভালোবাসা, তাকওয়া, রহমত ও বরকতে পরিপূর্ণ হয়।এরপর কাজী সাহেব প্রথমে রেদোয়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
জনাব রেদোয়ান চৌধুরী, আপনি কি জনাব লিখন চৌধুরী সাহেবের কন্যা পিয়াসা জান্নাত চৌধুরীকে উপস্থিত সবাই কে সাক্ষী রেখে নির্ধারিত দেনমোহরে নিজের সহধর্মিণী হিসেবে কবুল করছেন?
রেদোয়ান কণ্ঠে দৃঢ়তা আর প্রশান্তি এনে বললো
— “কবুল করছি।”
কাজী সাহেব দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন,
— “আপনি কি কবুল করছেন?”
আলহাদুলিল্লহ কবুল করছি।তৃতীয়বার প্রশ্ন করতেই রেদোয়ান মুচকি হেসে বলল,
— “আলহামদুলিল্লাহ, আমি কবুল করছি।
এরপর পর্দার ওপাশে বসা পিয়াসার দিকে প্রশ্ন করা হলো,পিয়াসা জান্নাত চৌধুরী, আপনি কি জনাব রাতিব চৌধুরীর পুএ জনাব রেদোয়ান চৌধুরীকে উপস্থিত সবাই কে সাক্ষী রেখে আপনার স্বামী হিসেবে কবুল করছেন?”
লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া পিয়াসা নিচু স্বরে বলল,

— “কবুল করছি।”তিনবার কবুলের মাধ্যমে তাদের নিকাহ সম্পন্ন হলো।
এরপর কাজী সাহেব ইউভির দিকে তাকালেন।
— “জনাব ইউভি চৌধুরী, আপনি কি জনাব রাতিব চৌধুরী সাহেবের কন্যা ইনায়া নূর চৌধুরীকে উপস্থিত সবাই কে সাক্ষী রেখে নির্ধারিত দেনমোহরে নিজের সহধর্মিণী হিসেবে কবুল করছেন?”
ইউভির চোখ তখন ফুলের পর্দার ওপাশে তার বিয়াদোব বউ টার দিকে ইনায়া হাসি মাখা মুখের দিকে তাকিয়ে সে বিনা দ্বিধায় বলল,
— “কবুল করছি।”
দ্বিতীয়বার কবুল করছি।”
তৃতীয়বার সে একটু জোরে বলল, আলহামদুলিল্লাহ… আমি কবুল করছি।”
তার কণ্ঠে ছিল ভালোবাসা, শান্তি আর বহু প্রতীক্ষিত পাওয়ার আনন্দ।এবার প্রশ্ন করা হলো ইনায়াকে।ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
ইনায়া নূর চৌধুরী, আপনি কি জনাব রাতিব চৌধুরীর পুএ জনাব ইউভি চৌধুরীকে উপস্থিত সবাইকে সাক্ষী রেখে আপনার স্বামী হিসেবে কবুল করছেন?”ইনায়া চোখ বন্ধ করে মৃদু স্বরে বলল, কবুল করছি।”দ্বিতীয়বার কবুল করছি।”

তৃতীয়বার তার চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল আনন্দের জল।আলহামদুলিল্লাহ… আমি কবুল করছি।”
সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে ভেসে উঠল—
“আলহামদুলিল্লাহ!”
“মাশাআল্লাহ!”কাজী সাহেব মুচকি হেসে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ, শরিয়ত মোতাবেক আজ থেকে আপনারা চারজন পরস্পরের জন্য হালাল জীবনসঙ্গী। আল্লাহ আপনাদের দাম্পত্য জীবনকে ভালোবাসা, রহমত ও বরকতে পরিপূর্ণ করে দিন।”
এরপর তিনি দোয়া পড়লেন—
“বারাকাল্লাহু লাকুমা ওয়া বারাকা আলাইকুমা ওয়া জামা‘আ বাইনাকুমা ফি খাইর।”
অর্থাৎ—

“আল্লাহ তোমাদের জন্য বরকত দান করুন, তোমাদের ওপর বরকত নাযিল করুন এবং কল্যাণের মধ্যে তোমাদের উভয়কে একত্রিত রাখুন।”
আর ঠিক সেই মুহূর্তে চারটি হৃদয় নতুন এক বন্ধনে, নতুন এক জীবনের সূচনায় আবদ্ধ হয়ে গেল।
আজ থেকে তারা শুধু প্রেমিক-প্রেমিকা নয়—পরস্পরের হালাল, আজীবনের জীবনসঙ্গী তারা
বিয়ে শেষ হতেই সবার মাঝে খেজুর বিলিয়ে দিলেন রাতিব চৌধুরী।এদিকে সব ঝামেলা মিটে যেতেই ইউভি, রেদোয়ান, রাজ্য, রেসব, আদিল, অর্ক—বাড়ির সব ছেলেরা যার যার গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেল আদরের আশ্রমগুলোর উদ্দেশ্যে।
যেতে যেতে অর্ক আর আদিল ইউভিকে বলল,
ব্রো, ভাবিকে রেখে যেতে ভালো লাগছে? আজ বিয়ের দিন। ভাবিকে সময় দিবি, তা নয়, এখনই ছুটছিস! আমরা আছি তো, আমরাই সামলে নিতাম।
ইউভি মুচকি হেসে বলল,
— বাসায় থাকলে বরং ভালো লাগত না। কী ভাবছিস সালা তোরা মধ্যরাত না হলে বউকে রুমে দেবে? শুধু শুধু এই সময়টুকু বোরিং কাটত। আর তার থেকেও বড় কথা, আজকের এই বিশেষ দিনে আমি আর রেদোয়ান বাচ্চাদের নিজের হাতে গিফট দিতে চাই। এরি মাঝে বন্ধুমহলের আড্ডা শেষ না হতেই তারা এসে পৌঁছে গেল আদরের আশ্রমে।

সবগুলো শাখাতে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই বাকি আশ্রমগুলোতে ইউভি আগেই গার্ডদের পাঠিয়ে দিয়েছে।এদিকে ইনায়া আর পিয়াসাকে বাগানে বসানো হয়েছে। সেখানেও তাদের জন্য সুন্দর করে সাজানো হয়েছে সবকিছু। সবাই এসে তাদের দেখছে, উপহার দিচ্ছে।
হঠাৎ ইনায়া আর পিয়াসার দুজনের চোখে চোখ পড়ল। তবে কেউ কারও সঙ্গে কথা বলল না। কেমন যেন এক অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়েছে দুজনের মাঝে। হয়তো অভিমান থেকেই।এদিকে তুবা মুখ গোমড়া করে বলল, আর কতক্ষণ সং সেজে বসে থাকবি তোরা? ভাইয়ারা কখন আসবে? আমরা তো আর অপেক্ষা করতে পারছি না! দুই দুইটা জিজু, আমাদের কী বলিস সাম্মি? আজ মোটা অংকের টাকা খসাবো
ঠিক তখনই আয়াত আর আতিকা দৌড়ে এসে ইনায়া আর পিয়াসাকে বলল,তোমরা কি ইউভি ভাইয়া আর রেদোয়ান ভাইয়ার বউ হয়ে গেলে?
ইনায়া মিষ্টি করে ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

— হ্যাঁ, বনু।আয়াত মুখ ছোট করে বলল,
ইউভি ভাইয়াকে আমার ভালো লাগত। তুমি বিয়ে করে নিলে কেন? আমিও বড় হয়ে ইউভি ভাইয়াকে বিয়ে করব।আয়াতের কথা শুনে সবাই হেসে উঠলো
এদিকে রিদ এসে বলল,
দেখ আপু, আজ থেকে তুই এই বাড়ির বউ। এখন থেকে একটু নিজেকে সামলাতে হবে। দাখ।আমি তোদের ছোট্ট দুষ্টু ভাই, তাই তোদের কাছে আমার একটা আবদার আছে। তোদের দুজনের ঘরের ওই ছোট ফ্রিজ দুটো আমাকে দিয়ে দে।পিয়াসা তার গাল টেনে দিয়ে বলল,আমার ছোট্ট দেবর যে! ঠিক আছে, নিয়ে নিস।পিয়াসার কথা শুনে রিদের খুশির আর সীমা রইল না। সে খুশিতে চিৎকার করতে লাগল। লাভ ইউ ভাবি
ইনায়া বেশ কিছুক্ষণ একইভাবে বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গেল। সে সবার থেকে একটু দূরে সরে দাঁড়াল।ঠিক তখনই তিয়া এসে বলল,
ইনায়া, তোর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।
ইনায়া রাগী কণ্ঠে বললো আমার তোর সঙ্গে কোনো কথা নেই।তিয়া সঙ্গে সঙ্গে ইনায়ার হাত ধরে বলল,

— প্লিজ, আমাকে ক্ষমা করে দে। সত্যি কথা বলতে, ইউভি ভাইয়া তোকে এতটা ভালোবাসে, এটা আমি সহ্য করতে পারিনি। তাই তোর ওপর আমার রাগ ছিল। তোর ক্ষতি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি, জোর করে কোখনো ভালোবাসা পাওয়া যায় না।দূর থেকে পিয়াসা সব দেখছিল। তিয়া আর ইনায়া কী কথা বলছে, তা নিয়ে তার কৌতূহল হচ্ছিল কারন তিয়া যে ওদের ভালো চাই না বিষয় টা সে অনেক আগেই বুঝতে পারছে। ঠিক তখনই একজন এসে তার সঙ্গে ছবি তুলতে চাইলে সে সেদিকে মনোযোগ দিল।
এই সুযোগে তিয়া আবার ইনায়ার হাত ধরে বলল, প্লিজ, বোন, বল না, আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছিস।
কথা বলতে বলতে সে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে ইনায়াকে একটু দূরে নিয়ে গেল।

ইনায়া রাগে চিৎকার করে উঠল, তুই মানুষের ক্ষতি করার মতো এত নোংরা কাজ করেছিস! তোকে আমি কখনো ক্ষমা করতে পারব না। আমি আরো অনেক কিছু জেনে গেছি, তিয়া!তিয়া আবারও তার হাত শক্ত করে ধরে অনুনয় করতে লাগল,প্লিজ… আমি তোর পায়ে পড়ছি। ঠিক তখন ই তিয়া ব্যাগ থেকে একটি সাদা কাপড় বের করল। ইনায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার নাকে তীব্র এক রাসায়নিক গন্ধ ভেসে এলো। সে কপাল কুঁচকে এক পা পেছাতে চাইল, কিন্তু মাথাটা অদ্ভুতভাবে ঝিমঝিম করে উঠল। চারপাশের সবকিছু ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে এলো, চোখের পাতা ভারী হয়ে গেল, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
ঠিক সেই সময় কয়েকজন মেয়ে দ্রুত এগিয়ে এসে তিয়াকে সাহায্য করল যেহেতু সাধারণ মানুষের জন্য আলাদা খাবারের আয়োজন করা হয়েছে চৌধুরী ভিলাই এই জন্য তারা খুব সহজেই অতিথিদের ভিড়ের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।তারা অত্যন্ত কৌশলে চারপাশের সবার দৃষ্টি এড়িয়ে ইনায়াকে ধরে পেছনের গেটের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। চারদিকে এত মানুষের আনাগোনা, হাসি, ছবি তোলা আর কোলাহলের মাঝে কেউ বিষয়টি খেয়ালই করল না।ইনায়া যে ক্যারাতে জানে, নিজের আত্মরক্ষা নিজেই করতে পারে, তা তিয়া জানত। তাই তাকে সাধারণভাবে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তার শরীরের শক্তি নিস্তেজ হয়ে যাওয়ায় সে আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। এই জন্য তিয়া এমন নোংরা প্লান করেছে।

কিছুক্ষণ পর সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে গেল তিয়া?সে যেন কিছুই ঘটেনি এমন ভান করে আবার চৌধুরী বাড়ির সবার সঙ্গে গিয়ে মিশে গেল।বেশ কিছু সময় পর…
ইনায়াকে একটি অন্ধকার ঘরে এনে রাখা হয়েছে। তার হাত-পা শক্ত করে বাঁধা, মুখও কাপড় দিয়ে আটকানো। ঘরটিতে আলো বলতে শুধু একটি মিটমিটে বাল্ব, যার ক্ষীণ আলোয় চারপাশ আরও ভয়ংকর লাগছে।ঘরের বাইরে কয়েকজন গুণ্ডা দাঁড়িয়ে আছে। তারা অপেক্ষা করছে কখন ইনায়ার জ্ঞান ফিরবে। তবে তিয়ার কঠিন নির্দেশ ছিল—
ভাইয়া আর আমি না আসা পর্যন্ত ওর গায়ে কেউ একটা স্পর্শও করবে না।তাই কেউ সাহস করে ঘরের ভেতরে ঢুকল না।এদিকে তিয়া কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে দ্রুত ভিলা থেকে বেরিয়ে গেল।

অন্যদিকে, চৌধুরী ভিলায় তখন শুরু হয়েছে এক অদ্ভুত অস্থিরতা।ইনায়াকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।পিয়াসা প্রথমে ভেবেছিল, হয়তো ইনায়া একা কোথাও বসে আছে বেবির সাথে কথা বলতে হবে না হলে ভালো লাগছে না সে খুঁজতে খুঁজতে সেই জায়গায় গেল, যেখানে কিছুক্ষণ আগে ইনায়া আর তিয়া দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। কিন্তু সেখানে গিয়েও সে কাউকে পেল না।তার বুকটা কেমন ধক করে উঠল।
এদিকে বাড়ির ছোট ছোট বাচ্চারাও ইনায়াকে খুঁজছে। তুবা, সাম্মি, রানি—সবাই পুরো বাগান, বাড়ির ভেতর আর আশপাশ খুঁজেও কোথাও ইনায়ার কোনো খোঁজ পেল না।একসময় সবার মুখেই চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল।
বেশ কিছুক্ষণ পর লিখন চৌধুরী ফোন করলেন রিতাকে। তোমরা কোথায়? নূর কে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।ওপাশে রিতা রেগে উঠে বলল কী বলছেন, স্যার? ইউভি স্যার জানতে পারলে আমাদের মেরেই ফেলবে! শুধু আপনার কথায় আমরা অফিসে এসেছি।লিখন চৌধুরী উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন,কী করব বলো? আমি চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রি এন্ড কোম্পানিকে নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলাম। ভেবেছিলাম, যেহেতু আজ আমরা কেউ অফিসে যাইনি, সেই সুযোগে ওরা কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করতে পারে।কিছুক্ষণ থেমে তিনি আবার বললেন,
তোমরা যত দ্রুত পারো, চৌধুরী ভিলায় চলে আসো। এখানে পরিস্থিতি ভালো লাগছে না।ফোন কেটে যেতেই রিতা আর বাকিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল।
চৌধুরী ভিলায় এক অদ্ভুত উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সবাই এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে, কেউ বাগানে, কেউ বাড়ির ভেতরে, কেউ আবার গেটের বাইরে খোঁজ করছে।কিন্তু ইনায়ার কোনো খোঁজ নেই।

কেটে গেছে বেশ কিছু সময়।
গোধূলি বিকেল শেষ হয়ে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। চারপাশে মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। অথচ চৌধুরী ভিলার ভেতরে যেন এক অদৃশ্য অন্ধকার নেমে এসেছে।আর না পেরে রিটা কাঁপা হাতে ইউভিকে কল দিল।ফোন রিসিভ হতেই ইউভির গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
বলো, রিটা। সবকিছু ঠিক আছে তো?রিতা কাঁপা কণ্ঠে বলল, স্যার… ম্যামকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।এক মুহূর্তের জন্য যেন ইউভির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।তার হাতে ধরা ফোনটা শক্ত হয়ে উঠল। ঠিক তখনই রাস্তার মাঝখানে তার গাড়ি প্রচণ্ড শব্দে ব্রেক কষে থেমে গেল।ইউভির গর্জন শোনা গেল,

— কী বললে? আমার আদর কে পাওয়া যাচ্ছে না?, তোমরা কোথায় ছিলে ইডিয়ট ? রিটা কিছু বলতে যাবে এমন সময় ইউভি চিৎকার করে বললো না, থাক! আমি কিছু শুনতে চাই না।
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে আবার বলল, আমার আদরের গায়ে যদি একটা ফুলের টোকাও লাগে, আমি কাউকে ছেড়ে কথা বলব না।এদিকে ইউভির গাড়ি থেমে যেতে দেখে রেদোয়ান দ্রুত নেমে এলো।
অর্ককে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? ভাইয়া এত রেগে আছে কেন?অর্ক ধীরে ধীরে সব খুলে বলল।
আশ্চর্যজনকভাবে রেদোয়ানের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। সে শুধু একবার উভির দিকে তাকাল।ইউভিকে তার স্বাভাবিক লাগছে না।
ইউভি যখন রেদোয়ানের দিকে তাকাল, তখন রেদোয়ানের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শীতল স্রোত বয়ে গেল।উভির চোখ দুটো লাল হয়ে আছে।

আর সেই চোখের কোণে চিকচিক করছে পানি।এই মানুষটার চোখে সে কোনোদিন অশ্রু দেখেনি।
রেদোয়ান কাঁপা কণ্ঠে বলল, ভাইয়া… আমার বোনু…ইউভি আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।খুব নিচু কিন্তু ভয়ংকর স্বরে বলল, যে-ই ওকে নিয়ে যাক না কেন, আমার আদরের একটা ফোটার চোখের অশ্রুরও হিসাব দিতে হবে।দুই ভাই একবার চোখে চোখ রাখল।
সেই নীরব দৃষ্টিতেই যেন হাজার কথা হয়ে গেল।
পরের মুহূর্তেই গাড়ির ইঞ্জিন আবার গর্জে উঠল।
এদিকে চৌধুরী ভিলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
পিয়াসা কাঁদতে কাঁদতে রিমঝিমকে সব খুলে বলল।
শেষবার আমি ইনায়াকে তিয়ার সাথেই দেখেছি।

বাকিটা আর বলতে পারল না সে।কিন্তু এতটুকুতেই রিমঝিমের সব বুঝতে বাকি রইল না।তার মুখের রং বদলে গেল।পাশে দাঁড়ানো রাশেদ মির্জাও গম্ভীর হয়ে উঠলেন।এক মুহূর্ত দেরি না করে দুজনেই বেরিয়ে গেলেন।গাড়িতে উঠতে উঠতে রিমঝিম ইউভিকে কল দিল
এদিকে ইউভি, রিমঝিমের মুখ থেকে তিয়ার নাম শুনেই আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। নিজের লোকদের দিয়ে তিয়ার নম্বর ট্র্যাক করাতেই জানতে পারল, সে শহরের এক নির্জন, জনমানবহীন জায়গার দিকে যাচ্ছে। খবরটা শুনে উভির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেল।

— “তিয়া সেখানে কেন যাচ্ছে?” সে বিড়বিড় করে বলল আমার আদর কে ওরা ওই খানে নিয়ে যাচ্ছে না তো ইউভি ঠিক মতো ড্রাইভ করতে পারছে না চিৎকার করে বললো আদিল ড্রাইভ কর
অন্যদিকে, রিমঝিমও কিছু একটা অস্বাভাবিক টের পেয়েছিল। তাই কারও নজরে না পড়ে সেও একই নির্জন স্থানের দিকে রওনা দিল।
এদিকে ইনায়া যখন জ্ঞান ফিরে পেল, তখন নিজেকে একটা অচেনা ঘরে আবিষ্কার করল। চারদিকে তাকিয়ে দেখল, ঘরে আর কেউ নেই। মুহূর্তের জন্য তার মাথা ঘুরে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই সবকিছু মনে পড়ে গেল। তাকে অপহরণ করা হয়েছে!
ঠিক তখনই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তি বুঝতে পারল যে ইনায়ার জ্ঞান ফিরেছে। সে তড়িঘড়ি করে তাদের নেতাকে খবর দিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লোকটা ঘরে ঢুকে পড়ল।কিন্তু ইনায়ার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক রহস্যময় হাসি।
মনে মনে সে বলল,

— “তাহলে খেলা শুরু করা যাক।”
পরের মুহূর্তেই সে শরীর কাঁপতে শুরু করল। শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে গেল, চোখ দুটো আধবোজা। এমনভাবে অভিনয় করতে লাগল যেন ভয়ে কিংবা অসুস্থতায় যেকোনো মুহূর্তে অজ্ঞান হয়ে যাবে।
ওদের মধ্যে একজন আতঙ্কিত হয়ে বলে উঠল,
এই মেয়েটা আবার মরে-টরে যাবে না তো? এভাবে কাঁপছে কেন?আরেকজন তাড়াতাড়ি বলল,
বস, হাত-মুখ খুলে দিন। পালাতে পারবে না, আমরা সবাই তো আছি!ব্যাস এই কথাটা শোনার জন্য ইনায়া অপেক্ষা করে ছিল।
ইশারা পেতেই ওরা তার হাত, পা আর মুখের বাঁধন খুলে দিল।ইনায়া কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
— “পানি… একটু পানি…”

একজন লোক দ্রুত এক গ্লাস পানি এনে তার হাতে দিল। কারণ তাদের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল—মেয়েটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। না হলে বাকি টাকা মিলবে না।
পানি খেতে খেতে ইনায়া নিঃশব্দে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করল। লোকগুলোর হাতে কোনো অস্ত্র আছে কিনা দেখে নিলো না নেই।
পরের মুহূর্তেই সবকিছু বদলে গেল।ইনায়া আচমকা গ্লাসভর্তি পানি সামনের লোকটার মুখে ছুড়ে মারল। সবাই হতভম্ব হয়ে যাওয়ার আগেই সে মেঝেতে থাকা ধুলো-বালি চারদিকে ছড়িয়ে দিল। ধুলো চোখে পড়তেই কয়েকজন দিশেহারা হয়ে গেল।
এই ক্ষণিকের বিশৃঙ্খলাকেই সুযোগ বানাল ইনায়া।
তার চোখে ফুটে উঠল তীক্ষ্ণ দৃঢ়তা। সে নিজের আত্মরক্ষার জন্য দ্রুত ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে একের পর এক পদক্ষেপ নিতে লাগল। কেউ তাকে ধরে ফেলতে এলে সে নিজেকে কৌশলে ছাড়িয়ে নিল, কেউ পথ আটকালেই কৌশলে তাকে সরিয়ে দিল।
ঘরের মধ্যে এক অদ্ভুত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলো। একজনের হাত মোচড় দিয়ে ধরে গলাই আঘাত করলো লোকটি বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল,

আরেকজন ভয়ে পিছিয়ে যেতে যেতে বলল,
ওকে ধরে রাখো! না হলে সবাই বিপদে পড়ব!”
ইনায়া মুচকি হেসে বললো সামনে এসে কথা বল।চানদু। সে নিজের সাহস, বুদ্ধি আর উপস্থিত বুদ্ধির জোরে তাদের মোকাবিলা করে বেরিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করতে শুরু করেছে। তার চোখে তখন একটাই সংকল্প যেভাবেই হোক, তাকে বাঁচতে হবে… আর সত্যিটাও সবার সামনে আনতে হবে।যে দড়ি দিয়ে এতক্ষণ ইনায়ার হাত বেঁধে রাখা হয়েছিল, মুহূর্তের মধ্যেই সেই দড়িটাই তার হেচকা টানে হাতে মধ্যে নিয়ে এল। চোখেমুখে তখন আর কোনো ভয় নেই, আছে শুধু অদম্য দৃঢ়তা। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো তার এই রূপ দেখে হতবাক হয়ে গেল। একে একে সবাই কে দড়ি দিয়ে মারতে লাগলো
ইনায়া বজ্রকণ্ঠে চিৎকার করে উঠল—

“আমি ইনায়া নূর চৌধুরী! আমি কারও সামনে মাথা নত করি না। আমার ভেতরের কোমল মানুষটাকে দেখার অধিকার একমাত্র আমার ব্যক্তিগত পুরুষেরই আছে। তার সামনে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্বল মেয়ে… একদম বাচ্চাদের মতো জেদ করি, অভিমান করি, কান্নাও করি। কিন্তু তোদের সামনে আমি শুধু তোদের ধ্বংস! আজকের পর ইনায়া নূর চৌধুরীর দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহসও আর হবে না তোদের। কারণ আমার ব্যক্তিগত পুরুষের বিচারের হাত থেকে তোদের বাঁচানোর ক্ষমতা আমারও নেই!”
তার কণ্ঠের তেজে যেন পুরো ঘর কেঁপে উঠল।
লোকগুলোর অবস্থা তখন শোচনীয়। কেউ মেঝেতে বসে হাঁপাচ্ছে, কেউ আবার বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। এমন সময় তাদের মধ্যে একজন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এগিয়ে এল। তার হাতে ছিল অজ্ঞান করার ওষুধ।এক ফাঁকে সে ইনায়ার নাকে স্প্রে দিয়ে দিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ইনায়ার চোখ ভারী হয়ে এলো। শরীর দুলে উঠল। সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে একজন চিৎকার করে উঠল—

“মোটা অঙ্কের টাকা পাব বলেই তোর সব বাড়াবাড়ি সহ্য করছি! না হলে তোর এত তেজ অনেক আগেই মাটিতে মিশিয়ে দিতাম শালি
ঠিক সেই সময় অন্যদিকে, তিয়া আর রবার্ট সেই নির্জন আস্তানার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।হঠাৎ তিয়ার ফোন বেজে উঠল স্ক্রিনে ভেসে উঠল নাম—রাইহান চৌধুরীর নাম ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে কঠিন কণ্ঠ ভেসে এলো তিয়া, তুমি ইনায়াকে কোথায় নিয়ে গেছ? আজ যদি ইনায়ার কিছু হয়ে যায়, তাহলে ভুলে যাব তুমি আমার মেয়ে!”কথাটা শুনে তিয়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মুহূর্তেই সে বুঝে গেল—চৌধুরী ভিলার সবাই তাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছে।রবার্টও বিষয়টা বুঝতে পেরে নিচু স্বরে বলল,এখান থেকে এখনই চলে যেতে হবে, তিয়া। ওরা যদি নম্বর ট্র্যাক করে ফেলে, তাহলে সব শেষ।দুজন দ্রুত সেখান থেকে ফিরে যাওয়ার সাথে সাথে ঘুরতেই দূরে আরেকটি গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
গাড়ি থামতেই নেমে এল রিমঝিম এবং রাশেদ মির্জা।দুজনের চোখেমুখে তীব্র সতর্কতা।চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন মুহূর্তে আরও ভারী হয়ে উঠল।

রাশেদ মির্জা ধীরে ধীরে কোটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে নিজের রিভলভার বের করলেন। রিমঝিমও চারদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।একজন অভিজ্ঞ তদন্তকারীর মতো তারা কোনো তাড়াহুড়ো করল না। নিঃশব্দে, অত্যন্ত কৌশলে, চারপাশের প্রতিটি শব্দ আর প্রতিটি নড়াচড়া লক্ষ্য করতে করতে তারা আস্তানার দিকে এগিয়ে গেল।হাওয়ায় তখন অদ্ভুত এক উত্তেজনা।
কয়েক মিনিটের মধ্যে ইউভি, রেদোয়ান, রাজ্য,আলভি,অর্ক,রেশব,আদিল সবাই পৌঁছে গেল রেদোয়ান দৌড়ে রিমঝিম দের কাছে গেলো কিন্তু ইউভির যেন পা চলছে না একটু ও আদিল ইউভি কে সান্তনা দিয়ে বললো সব ঠিক থাকবে ব্রো চিন্তা করিস না
ইউভিরা দ্রুত সেই আস্তানায় পৌঁছে গেল। সেখানে গিয়ে যে দৃশ্যটা দেখল, তাতে সবার বুক কেঁপে উঠল।মেঝেতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে ইনায়া।
রাশেদ মির্জা কয়েকজন গুন্ডার দিকে বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চোখেমুখে স্পষ্ট রাগ অন্যদিকে রিমঝিম বারবার ইনায়াকে ঝাঁকিয়ে কাঁপা গলায় ডাকছেন,নূর… মা, একবার চোখ খোলো। কথা বল মা…”
রেদোয়ান যেন রোবট হয়ে গেছে। সে স্থির চোখে বোনের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎই বুকফাটা চিৎকার করে উঠল,বোনু! কথা বল! বোনু, আমার কলিজা রে… একবার চোখ খোল! আমার সঙ্গে কথা বল!তার কণ্ঠ কেঁপে উঠছে, চোখ বেয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ছে।
আর ইউভি সে যেন নিজের অস্তিত্বই ভুলে গেছে।
ধীরে ধীরে হেঁটে গেল ইনায়ার কাছে। তারপর কাঁপা হাতে মেঝে থেকে তাকে তুলে নিজের বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।ইনায়ার মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠল,

— “আমার আদর…! আমার বউ…! চোখ খোলো, প্লিজ! আমার দিকে একবার তাকাও!”
তার চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। বুকের ভেতরটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে।এদিকে রাজ্য প্রচণ্ড রাগে এক লোকের কলার চেপে ধরল।”বল! কী করেছিস ওর সঙ্গে?”লোকটা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল,বিশ্বাস করেন, কিছু করিনি। শুধু ওকে অজ্ঞান করে রেখেছিলাম… এর বেশি কিছু করিনি।।কথাটা শুনে চারপাশের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
আর ইউভি… সে শুধু তার আদরকে বুকে জড়িয়ে ধরে বারবার ফিসফিস করে বলছে কিছু হবে না তোমার… আমি এসে গেছি, বউ। আমি এসে গেছি…। চোখ খোলো, জান… এভাবে ভয় দেখিও না আমাকে। আমি সবকিছুর সামনে দাঁড়াতে পারি, কিন্তু তোমার এই নিস্তব্ধতা সহ্য করার শক্তি আমার নেই যে তোমাকে এই অবস্থা করেছে তার বিচার পরে হবে। আগে তুমি চোখ খোলো… কারণ তোমাকে ছাড়া আমার পৃথিবীটা শুধু একটা শূন্য অন্ধকার। তোমার এই নীরবতা আমাকে ধীরে ধীরে মেরে ফেলছে এর পর হুসে ফিরলে চিৎকার করে বললো ফুপিমণি… ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাও আমি… আমি ওকে এই অবস্থায় দেখতে পারছি না।
রিমঝিমের চোখও ভিজে উঠেছে। তিনি মাথা নাড়লেন।রাশেদ মির্জা দ্রুত এগিয়ে এলেন। রেদোয়ান এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের বোনকে কোলে তুলে নিল।
কোলে তোলার সময় তার হাত কেঁপে উঠল।

কিছু হবে না, বোনু… কিছু হবে না।কথাটা বললেও তার নিজের কণ্ঠেই কোনো জোর ছিল না।
রাশেদ মির্জা গাড়িতে উঠতে উঠতেই নিজের লোকদের ফোন দিলেন। ইউভি আবার চিৎকার করে বলল রাজ্য তুই যাস না কেন যা না প্লিজ দ্রুত রাজ্য যেতে যেতে অর্ক কে বললো ইউভি কে দেখে রাখিস। কাওকে ফোন দিয়ে যেন বলল হাসপাতাল প্রস্তুত রাখো। আমরা আসছি।গাড়ি ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেল।
এদিকে ঘরের ভেতরে অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো।
আলভি, অর্ক, রিসব, আদিল আর সবগুলো ছেলে গুলো কে আটকে রেখেছে।ইউভি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।তার চোখে কোনো চিৎকার নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই।এই নীরবতাই যেন আরও ভয়ংকর লাগছে ।সে শান্ত কণ্ঠে বললো দরজাটা বন্ধ করে দাও।কথাটা শুনে সবার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।
ইউভি কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল।তারপর একটা ছেলের শার্ট এর কলার ধরে মুখে কয়েকটা আঘাত করতে করতে বজ্রকণ্ঠে বলে উঠল, বল… কে আমার স্ত্রীর গায়ে হাত দিয়েছে?
একটা ছেলে কাঁপতে কাঁপতে বলল, ভাই… আমরা কিছু করতে চাইনি। একজন মেয়ে আমাদের টাকা দিয়েছে…ইউভি গর্জে উঠল ওই “একজন” কে, আমি খুব ভালো করেই জানি। আমি শুধু একটা কথা জানতে চাই—আমার বউকে কে ছুঁয়েছে ছেলেটা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, আমরা তাকে ছুঁইনি, ভাই। বরং… ওই মেয়েটাই আমাদের মেরেছে!ইউভির চোখ দুটো বড় হয়ে গেল।পরের মুহূর্তেই সে গর্জে উঠল, মেয়ে মানে? এই বান্দির বাচ্চা, “ওকে মেয়ে বলবি না মিসেস চৌধুরী ও আমার স্ত্রী। আমার কলিজা। আমার আদর।তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“বান্দির বাচ্চা! আমি ওকে একটু শক্ত করে ধরতেও ভয় পাই, যদি কষ্ট পায়… আর তোরা কোন সাহসে ওর গায়ে হাত তুলেছিস?ওকে আমি ফুলের মতো আগলে রাখি, নিজের শ্বাসের চেয়েও বেশি যত্নে রাখি। আর তোরা ভাবলি ওকে ছুঁয়ে পার পেয়ে যাবি?আমার মানুষটার দিকে তাকানোর সাহস কোথায় পেলি? নাম শুনিসনি নাকি, নাকি মরার শখ হয়েছে?আজ তোদের বুঝিয়ে দেব—যে মানুষটাকে আমি প্রাণ দিয়ে আগলে রাখি, তার এক ফোঁটা কষ্টের দাম কতটা ভয়ংকর হতে পারে!”
ইউভি ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। এর পর ছেলেটার মুখ বরাবর আঘা*ত করতেই ছেলেটা আহত হয়ে অচেতনঅবস্থায় মেঝেতে পড়ে গলো।
তার সেই দৃষ্টি দেখে বাকি ছেলেগুলোর শরীর কেঁপে উঠল।রিসব, অর্ক, আদিল, আলভি—সবাই নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে।এ কি তাদের পরিচিত ইউভি?নাকি নিজের প্রিয় মানুষটাকে হারানোর ভয়ে বদলে যাওয়া অন্য কেউ?ঠিক তখনই ইউভির চোখ মেঝেতে পড়ল।একটা ছেলে আগেই মাটিতে পড়ে আছে।
ইউভি ভ্রু কুঁচকে বলল,ওই মা*ল টার কী হয়েছে?
একজন কাঁপা গলায় উত্তর দিল,

শেহেজাদার আদর পর্ব ৬২

— ভাই… ওকে… ওই মেয়েটা…লোকটা দ্রুত নিজেকে শুধরে নিল। না… মিসেস চৌধুরী… উনিই এই অবস্থা করেছেন ওর মেইন পয়েন্ট এ লাথি মেরেছে কথাটা শুনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
উভির চোখে হঠাৎ অন্যরকম এক ঝিলিক ফুটে উঠল।রাগের মাঝেও তার ঠোঁটের কোণে একফোঁটা গর্বের হাসি ফুটে উঠল।
সে খুব আস্তে বলল,
— আমার আদর

শেহেজাদার আদর পর্ব ৬৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here