কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪৯
লামিয়া রহমান মেঘলা
ভোরের কোমল আলো জানালার কাঁচ ভেদ করে ধীরে ধীরে এসে পড়ল সেরিনের মুখশ্রীতে। সোনালি আলোর নরম ছোঁয়ায় তার নিদ্রাভাঙা দেহে মৃদু সাড়া জাগল। সে অল্প নড়ে উঠল।
নিজের শরীরের চারপাশে এক উষ্ণ, দৃঢ় উপস্থিতি অনুভব করতেই ধীরে ধীরে চোখ মেলল সেরিন। চোখ খুলেই দেখতে পেল কায়ান ঘুমিয়ে আছে, খাটের সঙ্গে মাথা ঠেকানো, মুখে গভীর ক্লান্তির ছাপ, অথচ অদ্ভুত প্রশান্তিও মিশে আছে সেখানে।
সেরিন ধীর ভঙ্গিতে উঠে বসল বিছানায়। চেষ্টা করল যেন কায়ানের ঘুম না ভাঙে। নরম পায়ে বিছানা ছেড়ে সে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
এই হোটেলের ওয়াশরুমটি যেন বিলাসিতার এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। চকচকে মার্বেলের দেয়াল, স্নিগ্ধ আলোকসজ্জা, আর গতানুগতিক নকশার বাইরে বেশ বড় একটি বাথটাব পুরো জায়গাটিকে আরও অভিজাত করে তুলেছে।
সেরিন বাথটাবে পানি ভরল। বডি ওয়াশ মেশাতেই ফেনার শুভ্র স্তর ধীরে ধীরে পানির উপর ভেসে উঠল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো বাথটাব ভরে গেল নরম ফেনায়। পানির রঙেও মিশে গেল হালকা বেগুনি আভা, যেন ভোরের আকাশের এক টুকরো রং নেমে এসেছে জলে।
সে চোখ বন্ধ করে শান্ত হয়ে শুয়ে রইল। উষ্ণ পানি ধীরে ধীরে তার শরীরের ক্লান্তি গলিয়ে দিচ্ছিল। যেন রাতভর জমে থাকা সব অবসাদ, সব ভার, এই পানির স্রোতে মিলিয়ে যাচ্ছে।
চোখ বন্ধ করেই ছিল সেরিন। হঠাৎ কোমর জুড়ে এবং উরুর কিছুটা উপরে অচেনা অথচ পরিচিত এক স্পর্শ অনুভব করতেই তার শরীর কেঁপে উঠল। বিস্ময়ে চোখ মেলে পাশ ফিরে তাকাতেই কায়ানকে দেখতে পেল।
চমকে উঠে বসে পড়ল সেরিন।
কায়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল, চোখে বিস্ময়ের বদলে এক অদ্ভুত স্থিরতা।
“হোয়াট?”
সেরিন থতমত খেয়ে গেল। সে তো দরজা লক করেই এসেছিল। কণ্ঠে বিস্ময় মিশিয়ে বলল,
“আ… আপনি কিভাবে এলেন? দরজা তো বন্ধ ছিল।”
প্রশ্ন শুনে কায়ানের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিতে ছিল আত্মবিশ্বাস, ছিল রহস্য, ছিল এক অদ্ভুত আধিপত্য।
কায়ান সেরিনের হাত আলতো করে ধরল। তার স্পর্শে সেরিনের বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দন অকারণে দ্রুত হয়ে উঠল।
গভীর স্বরে কায়ান বলল,
“পৃথিবীর কোনো তালা আমাকে তোমার কাছে আসা থেকে ঠেকাতে পারবে না, সেরিন।”
কথাগুলো যেন বাতাসে ভেসে রইল কিছুক্ষণ। শব্দগুলোতে ছিল না উচ্চস্বরে বলা কোনো দাবি, তবু তাদের ওজন ছিল অসীম।
সেরিনের নিশ্বাস আটকে এলো।
কায়ান সামনের আয়নার দিকে তাকাল। চকচকে কাঁচে পাশাপাশি ভেসে উঠেছে তাদের প্রতিচ্ছবি। এক ফ্রেমে ধরা পড়েছে দুটি ভিন্ন সত্তা, অথচ তাদের মাঝের অদৃশ্য দূরত্ব যেন ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে।
ভোরের আলো তখনও জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। সেই আলো, বেগুনি আভামাখা পানি, আর নীরবতার গভীরে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মানুষ যেন এক অদ্ভুত অনুচ্চারিত গল্পের অংশ ।
কায়ানের হাতের স্পর্শ ধিরে ধিরে তার সীমা অতিক্রম করলো।
সেরিনের কাঁপতে থাকা শরীরটা তাকে আরও আকর্ষণ করছে।
সেরিন হুট করেই কায়ানের হাত ধরে বসে,
“ক কি করছেন?”
“লাভিং মাই ওয়াইফ।”
“ন না প্লিজ।”
কায়ান, সেরিনের দিকে তাকায়,
“কেন?”
সেরিন পিট পিট করে চায় কায়ানের দিকে। কায়ান মৃদু হাসে।
“রিলাক্স তুমি সাওয়ার নাও।”
এরপর আর কায়ান সেরিনকে বিরক্ত করল না।
নীরবতা যেন ধীরে ধীরে তাদের মাঝখানে নরম এক প্রশান্তি ছড়িয়ে দিল।
দু’জন শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এলো।
সেরিনকে রেডি হতে বলে কায়ান জরুরি একটি কল রিসিভ করার জন্য বেলকনিতে এসে দাঁড়াল।
সেরিন নিঃশব্দে মাথা নাড়িয়ে রেডি হতে চলে গেল।
ফোন কানে তুলতেই কায়ানের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
“হ্যাঁ হিমেল, বল।”
ওপাশ থেকে ভেসে এলো হিমেলের কণ্ঠ,
“ভাই, এই নাম্বার মেহেরীণের।
মেহেরীণ শালি তোর বাড়িতেই।”
সবটা শোনার পর কায়ানের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটি বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। চোখেমুখে খেলে গেল অদ্ভুত এক রহস্যময়তা।
“ওকে, আমি ফিরছি চট্টগ্রাম।”
কথাটা বলেই কায়ান কল কেটে ভেতরে ফিরে এলো।
এরই মধ্যে সেরিন রেডি হয়ে কায়ানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
সেরিনকে দেখামাত্র কায়ানের চোখে কোমলতা নেমে এলো। ঠোঁটে ফুটল মৃদু হাসি।
সে আলতো করে ঝুঁকে সেরিনের কপালে চুমু খেল।
“চলো, বাড়িতে ফিরতে হবে। আবার আসব এখানে।”
কথাটা শুনে সেরিনের মনটা হালকা বিষণ্নতায় ছেয়ে গেল। এত তাড়াতাড়ি এই জায়গা ছেড়ে যেতে তার মন চাইছিল না।
কায়ান তার মনের ভাষা বুঝে ফেলল যেন। মৃদু হেসে আবারও সেরিনের কপালে স্নেহভরা চুমু এঁকে দিল।
“আবার নিয়ে আসব। তখন অনেক ঘুরব।”
কায়ানের আশ্বাসে সেরিনের মুখে ধীরে ধীরে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
অতঃপর কায়ান সেরিনকে সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা করল। সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা কেউই তখনও জানত না।
সিকদার নিবাস।
দুপুরের সময়টাতে পুরো বাড়িজুড়ে এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছিল। ডাইনিং স্পেসে বসে শিমুল, জারিফ এবং জিনুকে দুপুরের খাবার খাইয়ে দেওয়া হচ্ছিল। শিশুদের ছোট ছোট কথাবার্তা আর থালা চামচের ক্ষীণ শব্দ মিলিয়ে পরিবেশটা হয়ে উঠেছিল বেশ স্বাভাবিক, বেশ গৃহস্থালির।
ঠিক তখনই সেখানে এসে উপস্থিত হলো হিমেল।
হিমেলকে দেখামাত্র জেবরান মুখে দুষ্টুমিভরা হাসি টেনে দ্রুত এগিয়ে এলো। চোখেমুখে টিজ করার স্পষ্ট আভা।
“আরে বস, আপনি এত দিন পর।”
জেবরানের টিজিং টোন শুনে হিমেল ওর কাঁধে মৃদু একটা আঘাত করল। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠলেও চোখেমুখে ছিল চেনা ব্যস্ততার ছাপ।
“অসভ্য, আমার তো কাজ সব সময় থাকে।”
জেবরান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, বুঝেছি।”
হিমেল আর কথাটা বাড়াল না। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে বসল বানু মির্জার পাশে। তার মুখে ভদ্র, শান্ত একটা অভিব্যক্তি।
“কেমন আছেন আন্টি?”
বানু মির্জার মুখে স্নেহমাখা হাসি ফুটে উঠল।
“আলহামদুলিল্লাহ বাবা, তোমার কী খবর?”
হিমেল মাথা নেড়ে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ। আজকে একটা সুন্দর নাটক হবে। সেটাই সবাই মিলে একসাথে দেখব।”
কথাটা বলার সময় হিমেলের চোখে এক রহস্যময় ঝিলিক খেলে গেল। যেন সে এমন কিছু জানে, যা এই ঘরে উপস্থিত আর কেউ জানে না।
হিমেলের কথার অর্থ বুঝতে পারলেন না বানু মির্জা। ভ্রু কুঁচকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলেও পরে হালকা হেসে কথাটা উড়িয়ে দিলেন।
কিছুক্ষণ পর একে একে সেখানে উপস্থিত হলেন শিমুলের মা বাবা।
নূরবানু সিকদার এবং আবু সুফিয়ানকে দেখে বানু মির্জা যেন খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। দ্রুত উঠে বসার ব্যবস্থা করতে বললেন।
নূরবানু সিকদার সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠলেন।
“আরে বেয়াইন, কী করছেন এসব? থামেন।”
বানু মির্জা বিস্মিত গলায় বললেন, “বেয়াইন, আগে বলবেন না?”
নূরবানু সিকদার এবার সোফায় বসতে বসতে বললেন, “বেয়াইন, আমাদের কায়ান ফোন করে আসতে বলেছে। খুব জরুরি কিছু বলবে। শিমুলের বাবাকে এমনভাবে বলল, আমরা ফেলতে পারিনি।”
ঘরের বাতাসে যেন ধীরে ধীরে অদৃশ্য এক চাপা উত্তেজনা জমতে শুরু করল।
হিমেল তখন চুপচাপ ফোন টিপছিল। তার ঠোঁটে নির্লিপ্ত ভাব থাকলেও ভেতরে ভেতরে সে সবই জানে। এই পুরো নাটকের অদৃশ্য দর্শক যেন সে নিজেই।
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪৮
কিন্তু জেবরান কিছুই বুঝতে পারছে না। তার চোখেমুখে স্পষ্ট বিভ্রান্তি।
শিমুলও কনফিউজড। কায়ান হঠাৎ সবাইকে একত্রে ডেকেছে কেন, সেটা তার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না।
অন্যদিকে উর্মির রাগ ক্রমশ বাড়ছে। বাড়িতে একের পর এক মেহমান আসায় তার কাজ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বিরক্তিতে তার ভ্রু কুঁচকে আছে। ঠোঁট চেপে সে কাজ করেই যাচ্ছে, কিন্তু মুখের অভিব্যক্তি স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে, এই অতিরিক্ত ঝামেলা একদমই তার পছন্দ হচ্ছে না।
