Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ১৪

মেজর কারদার পর্ব ১৪

মেজর কারদার পর্ব ১৪
ফিনারা ঝুমুর

দুপুর বারোটা। মাথার ওপর গনগনে সূর্য। রামু উপজেলার ‘চৌমুহনী স্টেশন’-এর কোলাহলে ব্যাগপত্র নিয়ে সিএনজির জন্য অপেক্ষা করছে চার রমনী। এখান থেকে ফতেখাঁরকূল খুব একটা দূরে নয়, যেখানে মেঘের নানুবাড়ি অবস্থিত। সিএনজিতে যেতে মিনিট পনেরো থেকে বিশেক সময় লাগে। কিন্তু দীর্ঘ বাস জার্নির ক্লান্তিতে আর রোদের তাপে ওরা চারজনই তখন কিছুটা নাজেহাল।​তানিয়া নিজের পেটে হাত দিয়ে বিরক্তি মেশানো কণ্ঠে বলল,

“কিরে, আর কতক্ষণ? খিদেতে তো পেট একেবারে চুইচুই করছে, মনে হচ্ছে এখনই অজ্ঞান হয়ে যাবো!”
​রাইসা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মেঘকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আরেহ দাঁড়া না, পেয়েই যাবো। তাছাড়া তুই তো তোর নানাকে ফোন করলেই হতো, উনি লোক পাঠিয়ে দিতো। এত রোদে কষ্ট করে আর সিএনজি খুঁজতে হতো না।”
​রাইসার এই যুক্তি শুনে মেঘ একদলা বিরক্ত হয়ে নাক কুঁচকে বলল,
“ধুর! সবসময় আরাম করে গাড়ি চড়লে কি চলে? গ্রামের রাস্তায় সিএনজিতে চড়েছিস কখনও? খোলা হাওয়ায় সিএনজির সেই দুলুনির আর লোকাল রোডের আসল ‘মজা’ না জানলে তুই কি আর বুঝবি! এই রোদেও আমার সিএনজিতে ওঠার জন্যই মনটা কেমন অজানায় ছটফট করছে, বুঝলি?”
মেঘের এমন অদ্ভুত লজিক আর সিএনজি প্রেমের উত্তর শুনে বাকি তিন বান্ধবী এক্কেবারে চুপ মেরে গেল। এই দস্যি মেয়ের সাথে তর্কে জেতা যে অসম্ভব, তা ওরা খুব ভালো করেই জানে। তাই আর কেউ কোনো উচ্চবাচ্য করল না।
​কপাল ভালো, মিনিট দুয়েক যেতেই দূর থেকে একটা খালি সিএনজিকে এই দিকেই এগিয়ে আসতে দেখল ওরা। মেঘ আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে হাত নাড়িয়ে ওটাকে থামাল। ড্রাইভার ব্রেক কষতেই মেঘ সিএনজির হুডের ভেতর মুখ গলিয়ে জিজ্ঞেস করল,

​“মামা, ডাক্তার বাড়ি যাবেন?”
​চল্লিশোর্ধ্ব সিএনজি চালক মেঘের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে কিছুটা নিশ্চিত হওয়ার ভঙ্গিতে পালটা প্রশ্ন করল,
“ঐ যে আকবর জুলান ডাক্তার বাড়ি? ফতেখাঁরকূলের বড় ডাক্তার সাবের বাড়ি তো?”
​মেঘ খুশিতে মাথা নাড়াতেই সিএনজি চালক আর কোনো দরাদরি না করে এক বাক্যে রাজি হয়ে গেল,
“হ হ যামু, উঠেন আপামনিরা।”
​সিএনজির পেছনের ছোট্ট সিটে চারজন বান্ধবী মিলে বেশ গাদাগাদি করে বসল ওরা। ব্যাগপত্রগুলো কোনোমতে পায়ের কাছে অ্যাডজাস্ট করে নিতেই ড্রাইভার সাহেব গাড়ি স্টার্ট দিলেন। রামুর পিচঢালা পথ ধরে সাঁ সাঁ করে ছুটে চলল ওদের সিএনজি। খোলা বাতাসের ঝাপটা এসে লাগছিল মেঘের ফুরফুরে শ্যামলা মুখে।
​কিন্তু সিএনজিটা কিছু দূর যাওয়ার মাঝেই চালকের কোমরে থাকা বাটন ফোনটা হঠাৎ তীব্র শব্দে বেজে উঠল। চালক এক হাতে হ্যান্ডেল ধরে অন্য হাতে পকেট থেকে ফোনটা বের করে কানে ঠেকালেন। ওপাশ থেকে এক রাশভারী ও গম্ভীর পুরুষালী গলা ভেসে এল, যা মূলত মেজরের খাস লোক মুসার কণ্ঠস্বর।
​ওপাশ থেকে অত্যন্ত সতর্ক গলায় প্রশ্ন করা হলো,

“কী রে, ওদের পেয়েছিস?”
​সিএনজি চালক পেছনের আয়নায় মেঘদের দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে বেশ বিনীত সুরে উত্তর দিল,
“হ স্যার, পাইছি। চারজনই আমার গাড়িতে উঠছে।”
​ফোনের ওপাশ থেকে তৎক্ষণাৎ কড়া নির্দেশ দেওয়া হলো,
“সাবধানে গাড়ি চালাবি। ওদেরকে একদম সহি-সালামতে, অক্ষত অবস্থায় ডাক্তার বাড়িতে পৌঁছে দে। রাস্তায় যেন কোনো রকমের ছোটখাটো বিপদ বা দুর্ঘটনাও না হয়। কোনো সমস্যা হলে সোজা আমাকে জানাবি, বুঝলি?”
​“জি স্যার, আইচ্ছা। এক্কেবারে সহি-সালামতে নামাইয়া দিমু, চিন্তা কইরেন না।”
চালকের কথা শেষ হতেই ওপাশ থেকে খট করে কলটা কেটে গেল।​পেছনের সিটে বান্ধবীদের সাথে গল্পে মত্ত থাকায় মেঘালয়া বা ওর বান্ধবীরা বিন্দুমাত্র টের পেল না যে এই সিএনজি চালক আর কেউ নয়, বরং মেজর শীর্ষ কারদারের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সুক্ষ্ম একটা অংশ! ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে থেকে শুরু করে রামুর চৌমুহনী স্টেশন—সবখানেই যে মেজরের কড়া নজরদারি পাহারা দিচ্ছিল ওদের, তা এই চার তরুণীর কল্পনারও বাইরে ছিল।
​সিএনজি চালকও মেজরের নির্দেশের পর বেশ শান্ত মনে, অত্যন্ত সাবধানে গাড়ি চালিয়ে মেঘদেরকে সেই ফতেখাঁরকূলের নামকরা ‘ডাক্তার বাড়ি’র মস্ত বড় গেটের সামনে এনে পৌঁছে দিল। সিএনজি থামতেই মেঘের চোখ জুড়িয়ে গেল নিজের নানাবাড়ির চেনা পরিবেশ দেখে।

ফটকের সামনে এসে দাঁড়াতেই মেঘ ছাড়া বাকি তিনটি মেয়ের মুখ বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল! গেটের একপাশে হলুদ আর গোলাপি রঙের মায়াবী বাগানবিলাস গাছ ডালপালা মেলে একেঁবেঁকে ঠিক উল্টো ইউ আকৃতির রাজকীয় ফটকটার সাথে মিশে একাকার হয়ে আছে। আর অন্যপাশে রয়েছে হাইব্রিড বারোমাসি শিউলি ফুলের বাহার, যেখান থেকে মিষ্টি একটা সুবাস ভেসে আসছে বাতাসে।
​“এটা বাড়ি নাকি কোনো কটেজ রে ভাই! এত্ত সুন্দর! ও মাই গড–”
​ফাতিমার এমন বিস্মিত আর চোখ কপালে তোলা কথা শুনে মেঘের মনে এক মস্ত বড় গর্বের হাসি ফুটে উঠল। তার চোখ গেল গেটের ওপর খুব সুন্দর করে সোনালি আভায় খোদাই করে লেখা «ডাক্তার বাড়ি» নেমপ্লেটটার দিকে। ওর নানা আকবর জুলান পেশায় একজন স্বনামধন্য ডাক্তার ছিলেন, তবে বয়স হওয়াতে ইদানীং প্র্যাকটিস থেকে অবসর নিয়েছেন।​বন্ধুদের ওভাবে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেঘ কোমরে হাত দিয়ে হেসে বলল,

“কী রে, তোরা কি সারাদিন এই রোদের মধ্যে বাহিরেই দাঁড়িয়ে থাকবি, নাকি ভেতরেও যাবি?”
​রাইসা আর তানিয়া একসাথে ব্যাগ সামলে নিয়ে বলে উঠল,
“হ্যাঁ, হ্যাঁ চল! আর তর সইছে না।”
​একবুক দারুণ উৎসাহ নিয়ে ওরা যেই না ফটক পেরিয়ে ভেতরে পা রাখল, অমনি ভেতরের পরিবেশ দেখে সবার বিস্ময়ের মাত্রা আরও এক ডিগ্রি বেড়ে গেল। আধুনিক ইটের দালান নয়, বরং পুরো বাড়িটাই নান্দনিক কাঠের কারুকাজে তৈরি দ্বি-তল এক রাজপ্রাসাদ! বিশাল বারান্দায় সাজানো রয়েছে নিখুঁত বেতের কাজ করা আরামকেদারা আর আরামদায়ক সোফা সেট। আর বারান্দার কাঠের ছাউনির নিচে সারিবদ্ধভাবে ঝুলছে কিছু পুরনো দিনের অ্যান্টিক হারিকেন, যা রাতের বেলা এক মায়াবী আলোর পরিবেশ তৈরি করে।
​শুধু তা-ই নয়, বাড়ির ভেতরের পিচঢালা সরু রাস্তার একপাশে জারুল, সোনালু, মেহগনি আর গোলাপি ক্যাসিয়া জাভানিকা গাছ সগৌরবে শোভা পাচ্ছে। জ্যৈষ্ঠ আর আষাঢ়ের এই সন্ধিক্ষণে প্রতিটি গাছেই ফুলেরা যেন এক একটি রূপবতী রানী সেজে ডাল আলো করে বসে আছে। আর রাস্তার ঠিক অন্যপাশে সুবিন্যস্তভাবে গড়ে তোলা হয়েছে হরেক রকমের জরুরি ঔষধি গাছ-গাছালির এক বিশাল বাগান।​পুরো চত্বরটায় এক অদ্ভুত শান্ত আর স্নিগ্ধ পরিবেশ বিরাজ করছে। মেঘ বুক ভরে নানাবাড়ির সেই চেনা হাওয়া ফুসফুসে টেনে নিয়ে মনে মনে বলল,

“যাক! অবশেষে নিজের স্বাধীন রাজ্যে পা রাখা গেল।”
মেঘ ছোটবেলা থেকেই এই পরিবেশের সাথে অভ্যস্ত, কিন্তু রাইসা, ফাতিমা আর তানিয়ার কাছে এ যেন রূপকথার মতো নতুন। মেঘ ওদের বিস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসল। বাড়ির ভেতরে যাওয়ার সময় ও গলা উঁচিয়ে হাঁক পাড়ল,
“জামাই ও জামাই! বাড়ি আছোনি?”
​মেঘের এমন হাঁকডাকে ড্রয়িংরুমের ভেতর থেকে ধীরপায়ে বেরিয়ে এলেন আকবর জুলান আর তার স্ত্রী জুলেখা ইয়াসমিন। মেঘ দৌড়ে গিয়ে দুজনকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল, আর অমনি বয়স্ক মানুষ দুটির মুখে ফুটে উঠল একরাশ প্রশান্তি।​জুলেখা ইয়াসমিন মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন,
“ও ছুঁড়ি, ভালা আসোসনি? আইতে কোনো সমিস্যা অয় নাই তো?”
​জুলেখা ইয়াসমিনের মুখের আঞ্চলিক টান আর ভালোবাসায় মেঘের আহ্লাদী হাসি আরও চওড়া হলো। সে বলল,

“কিচ্ছু অয় নাই নানি। ওই দেহো, আমার বান্ধবীরাও আইসে!”
​জুলেখা ইয়ামিন লাঠিতে ভর বাকিজনদের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন,
“ও বুড়িরা , খাড়ায় আসো ক্যান? ভিত্তে আইয়ো সবাই। আই তোদের লাইগা খাওনের জোগাড়-যন্তর রতাসি।”
​তারা ভেতরে যেতেই মেঘের সাথে দেখা হলো ওর মামি আয়েশা আঞ্জুমের সাথে। মেঘের আসার খবর উনি জানতেন না, তাই সামনে হঠাৎ দেখে তো হতভম্ব!
“মেঘ? ওরে আল্লাহ, তুই আসলি!”
“হ আইলাম।”
​উনি যেন নিজের চোখকে বিশ্বাসই করতে পারছেন না। মেঘ হুটোপুটি করে গিয়ে মামির কোল ঘেঁষে দাঁড়াল। তারপর ফিসফিস করে ওনার কানে কানে সবটা খুলে বলতেই ভদ্রমহিলার চোখ কপালে ওঠার দশা! মেঘের কানটা একটু টেনে দিয়ে ধমকের সুরে বললেন,
“বিচ্ছু কোথাকার! তোর মা আলেয়া আপা জানলে তো আমারে আস্ত রাখবে না। ওরে আল্লাহ, সাত্তার ভাই রাজী হলো কী করে?”
​মেঘ তার সেই বিখ্যাত দুষ্টুমিভরা মিচকি হাসি দিয়ে বলল,
“আব্বু তো জানেই না! হেহে!”
​মেঘের এই কাণ্ডকারখানা দেখে মামিও আর না হেসে পারলেন না। তিনি ওদের ফ্রেশ হওয়ার জন্য পাঠিয়ে দ্রুত রান্নাঘরের দিকে ছুটলেন। যদিও শাশুড়ি আগেই জানিয়েছিলেন যে কিছু মেহমান আসবে, তাই রান্নার প্রস্তুতি একরকম ছিলই। আজ দুপুরের মেনুতে রয়েছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানি মাংস।

“স্যার, ম্যামকে ঠিকঠাক পৌঁছে দিয়ে এসেছি।”
​সেই সিএনজি চালক সোজা রামু সেনানিবাসের একটি গোপন অফিসে এসে দাঁড়ায়। সামনে বসা মেজরের খাস লোক মুসাকে কথাটুকু বলতেই, মুসা মাথা নেড়ে গম্ভীর গলায় জবাব দেয়,
“গুড। এখন যাও। তোমার বকশিশ পেয়ে যাবে।”
​লোকটি রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই মুসা ইন্টারকম লাইনে শীর্ষকে খবরটা পৌঁছে দেয়। খবরটা পাওয়ামাত্রই নিজের বাংলোর নরম কেদারায় বসে এক কপাট রহস্যময় ও তৃপ্তির হাসি হাসল শীর্ষ কারদার। রানী অবশেষে নিজের ইচ্ছেতেই রাজার তৈরি করা দাবার বোর্ডে এসে পা রেখেছে!​শীর্ষ তার সামনের ল্যাপটপটা ওপেন করল। স্ক্রিনে ক্লিক করতেই ভেসে উঠল একদম লাইভ একটি ভিডিও ফিড। যেখানে দেখা যাচ্ছে মেঘালয়া তার বান্ধবীদের সাথে গোল হয়ে বসে বেশ মাস্তি করে, ঠোঁট চেটেপুটে মেজবানি মাংস দিয়ে দুপুরের খাবার খাচ্ছে। এটা মূলত ডাক্তার বাড়ির ভেতরের একদম লাইভ গোপন রেকর্ড!

​আজ ভোরে, যখন পুরো ডাক্তার বাড়ি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল, তখন শীর্ষ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের দুজন দক্ষ ও ছদ্মবেশী টেকনিশিয়ানকে পাঠিয়েছিল সেখানে। ডাক্তার আকবর জুলানের দীর্ঘদিনের পুরনো বিশ্বস্ত এক কম্পাউন্ডারকে মোটা অঙ্কের টাকার টোপ দিয়ে, বাড়ির সিকিউরিটি চেক করার নাম করে ড্রয়িংরুম আর বারান্দার কাঠের কারুকাজের আড়ালে অত্যন্ত সুক্ষ্ম কয়েকটি পিনহোল হিডেন ক্যামেরা ফিট করিয়ে এনেছে ও। আর্মির মেজরের কাছে একটা সাধারণ বাড়ির ভেতরে এক্সেস নেওয়া যে কতটা বাঁ হাতের খেল, তা এই অবুঝ মেয়েটি ধারণাও করতে পারবে না!
​ল্যাপটপের স্ক্রিনে মেঘের সেই তৃপ্ত শ্যামলা মুখের চঞ্চলতা দেখতে দেখতেই শীর্ষ খেয়াল করল, বাহিরে হুট করেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। এইতো কিছু সময় পূর্বেই আকাশটা ধবধবে সাদা তুলোর মতো ছিল, আর এখনই মেঘের বুক চিরে শুরু হয়েছে আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টির তাণ্ডব।
​ডাক্তার বাড়ির সেই নান্দনিক কাঠের বারান্দায় বেতের সোফায় এসে বসেছে চার বান্ধবী। সামনে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির শীতল পানির ছোঁয়া নিচ্ছে ওরা। সবার হাতেই মামির হাতের গরম গরম ধোঁয়া ওঠা এক একটা মাটির চায়ের কাপ। মৃদু চুমুক দিচ্ছে আর চারজনে মিলে অপলক চোখে বৃষ্টিবিলাস করছে।​তানিয়া চায়ের কাপে একটা দীর্ঘ চুমুক দিয়ে মেঘের কাঁধে ধাক্কা মেরে বলল,

“এই মেঘ, তোর সেই সুরেলা গলায় একটা গান ধর না রে! এই ঝুম বৃষ্টির সময়ে এক্কেবারে জমিয়ে মানাবে।”
​মেঘ একটু ইতস্তত করে বলল,
“কী যে বলিস! এখন অসময়ে হুট করে গান গাইতে যাব কেন?”
​তানিয়া এবার মেঘের কথায় কৃত্রিম ধমকে উঠল,
“আরে অত ন্যাকামো না করে চুপচাপ গা তো দেখি–”
​বান্ধবীদের এমন জোরাজুরিতে অগত্যা মেঘ চায়ের কাপটা পাশে রেখে বৃষ্টির দিকে চোখ ফেরাল। দীঘল রেশমী চুলগুলো একপাশে এনে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে সে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক বিখ্যাত প্রেমগান ধরল। মেঘের কণ্ঠটা ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব সুরেলা আর মায়াবী, তাই নিস্তব্ধ দুপুরের এই বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে ওর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীতের এই চরণগুলো যেন এক আলাদা পূর্ণতা আর আকুলতা পেয়ে চারপাশের বাতাসকে ভারী করে তুলল–

~কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে
~কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে
~তোমারে দেখিতে দেয় না
মোহমেঘে তোমারে দেখিতে দেয় না
মোহমেঘে তোমারে
অন্ধ করে রাখে~
~তোমারে দেখিতে দেয় না
~ মাঝে মাঝে তব দেখা পাই
~চিরদিন কেন পাইনা?
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই
চিরদিন কেন পাইনা?~

​ল্যাপটপের স্পিকারে ব্লুটুথ হেডফোন কানে গুঁজে মেঘের সেই মেলোডিয়াস আর বুক কাঁপানো কণ্ঠের গানটা শুনতে শুনতে রামু সেনানিবাসের বাংলোয় বসা মেজর শীর্ষ কারদারের হাতের কফির মগটা মাঝপথেই স্তব্ধ হয়ে রইল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তার চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল। মেঘের কণ্ঠের এই আকুলতা, এই মায়াবী গানের সুর যেন মেজরের ভেতরের সমস্ত কঠোরতাকে এক নিমেষে গলিয়ে জল করে দিল। ​সে চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে ল্যাপটপের স্ক্রিনে মেঘের সেই ভেজা ঠোঁটের ওপর নিজের বুড়ো আঙুলটা আলতো করে ছোঁয়াল। এক অদ্ভুত ঘোরের মাঝে, এক গভীর তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে শীর্ষ ফিসফিসিয়ে উত্তর দিল,

মেজর কারদার পর্ব ১৩

​“খুব শীঘ্রই চিরদিনের জন্য দেখতে পাবে, আমার রাগিনী। এই মোহমেঘ আর কোনোদিন তোমাকে আমার থেকে আড়াল করে রাখতে পারবে না। এই খাঁ খাঁ করা মরুভূমির বুকে তুমিই আমার আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টি শুধুই আমার!”

মেজর কারদার পর্ব ১৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here