রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৫ (২)
সোহানা ইসলাম
ওয়াশরুমের দরজাটা ধীরে খুলে গেল। সবাই একসাথে সেদিকে তাকিয়ে রইল। ঘরের ভেতর এমন নীরবতা নেমে এলো যে, মনে হচ্ছিল নিঃশ্বাস নিলেও শব্দ হয়ে যাবে। জারা ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো। তার হাতে ধরা ছোট্ট কিটটা কাঁপছে। চোখ দুটো অদ্ভুত রকম ভেজা, ঠোঁট কাঁপছে, মুখের রঙ বদলে গেছে।
সে কিছু বলছে না।
ফিহা এক পা এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল,
— “কি দেখাচ্ছে?”
জারা উত্তর দিল না। শুধু কিটটা একটু উপরে তুলে ধরল। দুটি দাগ। ঘরের ভেতর যেন এক মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটে গেল—কিন্তু শব্দের নয়, আনন্দের।
মিম প্রথম চিৎকার করে উঠল,
— “ইয়া আল্লাহ!”
ফিহা চোখে হাত চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। জেরিন খুশিতে লাফ দিয়ে উঠল। ফারিয়া বেগমের চোখে মুহূর্তেই পানি চলে এলো। তিনি কয়েক সেকেন্ড কিছু বুঝতেই পারলেন না—তারপর বাস্তবটা ধরা দিল।
এই মুহূর্তটা সত্যি।
জারা হঠাৎ দু’হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। আর পরক্ষণেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। এমন কান্না—যেখানে কষ্ট নেই, শুধু জমে থাকা অপেক্ষার ভার ভেঙে পড়ছে।
ফিহা আর মিম দৌড়ে এসে জারাকে আঘলে ধরল। তিনজন একসাথে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। কেউ কাউকে কিছু বলছে না, তবু সব কথা বলা হয়ে যাচ্ছে। জারার বুকের ভেতর যেন ঢেউ উঠছে। এতদিনের অপেক্ষা, ভয়, সন্দেহ, নিজের শরীর নিয়ে হাজারটা দুশ্চিন্তা—সব একসাথে চোখের পানিতে গড়িয়ে পড়ছে।
— “আমি… আমি মা হতে চলেছি…”
কথাটা বলতে গিয়েই জারা আবার কেঁদে ফেলল। গলাটা আটকে আসছে। বুকের ভেতর কেমন একটা মোচড় দিচ্ছে—ভয় আর আনন্দ একসাথে।
— “আম্মু…”
জারা কাঁদতে কাঁদতে ফারিয়া বেগমের দিকে তাকায়,
— “আম্মু, আমি মা হতে চলেছি…”
এই কথাটা শোনামাত্র ফারিয়া বেগম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। এগিয়ে এসে জারাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। যেন নিজের মেয়েকেই জড়িয়ে ধরেছেন। তার চোখ বেয়ে টুপটুপ করে পানি পড়ছে।
— “আলহামদুলিল্লাহ…”
তিনি বারবার বলছেন,
— “আলহামদুলিল্লাহ…”
জারা তার শাশুড়ির বুকে মুখ গুঁজে কাঁদছে। এই কান্নায় কোনো দুর্বলতা নেই—এই কান্না পূর্ণতার, প্রাপ্তির, আশীর্বাদের।জারা কাঁদতে কাঁদতেই কথা বলে,
— “আম্মু, তুমি জানো… আমি কতদিন ধরে এটা চাইছিলাম? প্রতিদিন মনে হতো, আমি বুঝি কিছুই পারছি না… নিজেকে খুব ছোট লাগতো… আজ মনে হচ্ছে, আল্লাহ আমার কথা শুনেছেন।”
ফারিয়া বেগম জারার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।
— “মা হওয়া শুধু শরীরের ব্যাপার না মা। আল্লাহ যেদিন চান, সেদিনই দেন। আজ সেই দিন।”
মিম চোখ মুছতে মুছতে বলে,
— “জানু, আজ থেকে তুই আর একা না।”
ফিহা হেসে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
— “এই বেবিটা তো আমাদেরও।”
ঘরের ভেতর হাসি আর কান্না একসাথে মিশে যায়।
ফারিয়া বেগম হঠাৎ মনে পড়ার মতো উঠে দাঁড়ান। —“আমার ছেলেকে জানাতে হবে।”
বলেই মোবাইলের দিকে হাত বাড়ান। জারা হঠাৎ আঁতকে উঠে তার হাত ধরে ফেলে।
— “না আম্মু… প্লিজ।”
ফারিয়া বেগম এর মুখ এক সেকেন্ডের জন্য ফেক্যাসে হয়ে যায়।
__“ কেনো জানাবো না! ”
জারা’র চোখ ভেজা, গলা কাঁপছে,
— “তুমি কিছু বলবে না। ওনাকে আমি নিজে বলবো। এই কথাটা আমি ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে চাই। আর দু দিন পর তো ওনার জন্মদিন। আমার পক্ষ থেকে এটা হবে ওনার বেস্ট গিফট।”
ঘরে থাকা সবাই একে অপরের দিকে তাকায়। মিম মৃদু হাসে।
— “ঠিকই তো। এটা ভালো বলেছিস তুই! ”
ফিহা সায় দেয়,
— “এই সারপ্রাইজটা ভাইয়ার জন্য তুলা থাক দুই দুনের জন্য ।”
ফারিয়া বেগম কয়েক সেকেন্ড জারার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারপর হাসেন।
— “ঠিক আছে মা। কেউ কিছু বলবে না।”
জারা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। চোখ বন্ধ করে নিজের বুকের ওপর হাত রাখে। যেন ভেতরে কিছু একটা অনুভব করার চেষ্টা করছে।সে ফিসফিস করে বলে,
— “আম্মু… আমার ভেতরে এখন একটা প্রাণ…আমি এখনো ঠিক বুঝতে পারছি না। কিন্তু মনে হচ্ছে, আমি আর আগের মতো নেই।”
ফারিয়া বেগম নরম গলায় বলেন,
— “এই অনুভূতিটাই মা হওয়া।আর তুই যদি বোকামি না করতি তাহলে আমরা আরও দুই মাস আগেই জানতাম ।”
জারা মাথা নিচু করে নরম গলায় বলে,
__“ আমার তো এতো খারাপ বা বমি আসে নি। ওই মাঝে মাঝে একটু। আর তোমার ছেলেকে বলেছিলাম, উল্টো ওনি বলেছে বাজা পুরি কম খাবে পেটে গ্যাস হয়ে যায় তোমার। এই জন্য এমন লাগে। এটা তোমার ছেলের দোষ আমার না। হুমম।বলদ লোক বুঝে না কিছু? ”
ওর কথায় সবাই হেসে ফেলে। ফারিয়া বেগম জারা’র মাথায় হাত ভুলিয়ে দিয়ে বলে,
__“ও ছেলে মানুষ। মেয়েলি বিষয় এতো টা বুঝে না। তাই ওকে দোষ দিবি না পাঁজি মেয়ে! ”
জারা গাল ফুলিয়ে বলে,
__“ তবুও তোমার ছেলের দোষ! বউয়ের দিকে ভালো করে খেয়াল রাখতে পারে না, শয়তান লোক ? ”
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নামে—কিন্তু এবার সেই নীরবতা ভারী নয়, শান্ত। ডাক্তার উঠে দাঁড়ান।
— “সব ঠিক আছে। নিয়ম মেনে চলবেন। বিশ্রাম নেবেন।”
সবাই কৃতজ্ঞতার সাথে ডাক্তারকে বিদায় জানায়।
ডাক্তার চলে গেলে মিম মিষ্টির বাক্স এনে দেয়।জারাকে মিষ্টি মুখ করানো হয়। জারা প্রথমে একটু ইতস্তত করে, তারপর হালকা হেসে মিষ্টির ছোট্ট একটা টুকরো খায়। ফিহা বলে,
— “আজ এই মিষ্টিটা জীবনের সবচেয়ে মিষ্টি,আমার আরও একটা জানু মা হতে চলেছে! ”
জারা চোখ মুছে হালকা হাসে। মুখে ক্লান্তি আছে, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত দীপ্তি। আজ তার স্বপ্ন পূর্ণ হয়েছে।
আজ সে শুধু জারা না— আজ সে হতে চলেছে মা।
জেসমিন বেগম ফিহার কান মুলে দিয়ে বলে,
__“ আমাকে কবে দাদু বানাবেন? ”
শাশুড়ির কথায় ফিহা লজ্জা পেয়ে যায়। ওর লজ্জা দেখে সবাই হেসে উঠে। মিম রিয়াতকে বলে,
__“ আপনার আরও একজন সঙ্গী আসতে চলেছে
বাবা! ”
রিয়াত কি বুঝলো কে যানে। খুশিতে সে হাত তালি দিতে থাকে। ওর হাসির শব্দে রুমটা ঝমঝম করছে।জারা নিজের পেটে আলতো করে হাত দিয়ে ওর আর স্বামীজানের অংশকে অনুভব করাতে চায়। হঠাৎই একটা ঝাঁকি দিয়ে উঠে শরীর। নতুন অনুভূতি নতুন প্রাণ। তাদের ঘরের আলো।
রাত অনেকটা পেরিয়ে গেছে। বাড়ির ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে ধীরে ধীরে। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক শব্দ করছে, যেন সময় নিজেই হেঁটে যাচ্ছে। ড্রইংরুমের এক কোণে আলো জ্বালানো। সেই আলোর নিচে জারা বসে আছে। বসে বলা ভুল—আধা বসা, আধা ঘুম। মাথাটা বারবার দুলে উঠছে, চোখ বুজে আসছে, তবুও সে উঠে যাচ্ছে না। অপেক্ষা করছে। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। তবুও জারা একা বসে আছে। নিজের কাছেই নিজে বলে, __“আর একটু…আর একটু জারা তোর স্বামীজান চলে চসবে। ”
অপেক্ষার ক্লান্তিটুকু চোখে-মুখে জমে আছে। হঠাৎ বাইরের দরজার শব্দ। চাবির খটখটানি, তারপর দরজা খোলার আওয়াজ। আরমান ঘরে ঢোকে। হাতে একটা প্যাকেট, কাঁধ ঝুলে পড়েছে ক্লান্তিতে।সারা দিনের কাজ, তারপর রাত করে ফেরা—মুখে তার ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু চোখ উঠতেই থেমে যায় সে। জারা ঘুমে ঢুলে পড়ছে, তবুও বসে আছে। আরমান কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকে। এই দৃশ্যটা তার কাছে অদ্ভুত রকমের আপন লাগে। মনে হয়, সব ক্লান্তি বুঝি এই দেখাতেই হালকা হয়ে গেল।
সে ধীরে এগিয়ে এসে জারার সামনে দাঁড়ায়। জারাকে না ডেকে পাশে বসে জুতো খুলতে গিয়ে সামান্য শব্দ হয়। সেই শব্দেই জারার ঘুম উড়ে যায়। সে ফট করে উঠে দাঁড়ায়। চোখ আধখোলা, চুল এলোমেলো, কিন্তু মুখে জমে থাকা অভিমান স্পষ্ট।
— “এতো লেট হলো কেন?”
কণ্ঠে অভিযোগ, কিন্তু সেই অভিযোগের ভেতরে লুকানো আছে অপেক্ষার হিসাব।
— “রাশেদ ভাইয়া আর জাহেদ ভাইয়া তো অনেক আগেই চলে এসেছে।”
আরমান হালকা হেসে নিশ্বাস ছাড়ে।
— “রোহানের সাথে ওদের বাড়িতে গিয়েছিলাম নূরকে দেখতে। তাই দেরি হয়ে গেল।”
জারা উত্তর শোনে, কিন্তু তার চোখ আটকে যায় আরমানের হাতে থাকা প্যাকেটটার দিকে। সন্দেহ আর কৌতূহল একসাথে ভর করে মুখে।
— “ওটা কী?”
আরমান একটু ভ্রু তুলে তাকায়। তারপর প্যাকেটটা সামনে ধরে।
— “আমার রানী সাহেবার জন্যে ফুচকা।”
জারা চোখ বড় করে বলল,
— “ফুচকা? এত রাতে?”
আরমান হাসল,
— “আমার বউ যদি অপেক্ষা করে বসে থাকে, তাহলে রাত–দিন দেখার দরকার কী?”
জারা খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,
— “আপনি জানেন, আমি মন খারাপ করলে ফুচকা খেলেই ঠিক হয়ে যাই।”
আরমান মজা করে বলল,
— “এই জন্যই তো আনছি। ডাক্তারের দেওয়া ঔষধের থেকেও ভালো কাজ করে এটা।”
এই কথাটুকুতেই জারার মুখের অভিমান উবে যায়। চোখ দুটো চকচক করে ওঠে। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে আরমানের গলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। গালে একটা চুমু দিয়ে খুশিতে বলে—
— “আমার স্বামীজান বেস্ট! আমার মনের কথা কেমন করে বুঝে যায়!”
আরমান হেসে ওঠে। জারার এই খুশি দেখলেই তার সব ক্লান্তি উড়ে যায়। তবে সে সঙ্গে সঙ্গে জারার কোমর শক্ত করে ধরে নেয়।
— “এই আস্তে। পরে যাবে তো বউ ।”
— “আপনি থাকলে আমি কখনো পড়বই না ?”
জারা আধা রাগ, আধা দুষ্টুমি করে বলে।
— “সে তো দেখছি।”
আরমান হেসে উত্তর দেয়। জারা এখনো তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। যেন ছেড়ে দিলেই সে আবার অপেক্ষার জায়গায় ফিরে যাবে।
আরমান হাতের প্যাকেটটা একটু তুলে ধরতেই ভেতর থেকে ঝাল–মিষ্টি ফুচকার গন্ধ বেরিয়ে আসে। সেই গন্ধে জারার ঘুম পুরো উড়ে যায়। চোখ কচলাতে কচলাতে সে আরমানের দিকে তাকায়, তারপর প্যাকেটের দিকে। ক্লান্ত মুখেও আরমানের হাসি ফুটে ওঠে। জারা আর দেরি করে না। প্যাকেট খুলে প্রথম ফুচকাটা হাতে নিয়েই নাক কুঁচকে বলে,
__“ আজ ঝাল বেশি হবে না তো? ”
আরমান আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল,
— “আমার বউয়ের ঝাল–টক–মিষ্টির হিসাব আমি জানি।”
কথাটা শুনে জারা চোখ বাঁকা করে তাকায়, তারপর হেসে ফেলে। ফুচকাটা মুখে দিতেই ঝাল আর টক একসাথে জিভে লাগে। সে চোখ বন্ধ করে মুহূর্তটা উপভোগ করে, যেন অনেক দিনের ক্লান্তি ওই এক কামড়েই গলে যাচ্ছে।জারা হঠাৎ ফুচকা তুলে আরমানের দিকে বাড়িয়ে বলল,
— “এইটা আপনি খান।”
আরমান ভ্রু তুলে বলল,
— “আমাকে খাওয়াবে?”
— “হ্যাঁ। না করলে আমি রাগ করব।”
আরমান নাটক করে মুখ খুলল,
— “আচ্ছা বাবা, রাগি বউয়ের ভয় আছে।”
খাওয়ার পর জারা হেসে বলল,
— “আপনি ইচ্ছে করে দেরি করেন, তারপর এসব দিয়ে ম্যানেজ করেন।”
আরমান চোখ টিপে বলল,
— “ম্যানেজ না করলে কীভাবে চলবে বলো? বউ সামলানো সহজ নাকি?”
জারা নকল রাগে বলল,
— “আমি কি ঝামেলা?”
আরমান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “ঝামেলা না, তুমি আমার সবচেয়ে পছন্দের অভ্যাস।”
ফুচকা খাওয়া শেষ হতেই আরমান প্যাকেটটা পাশে রেখে জারার দিকে তাকাল। সারাদিনের ক্লান্তি যেন ওই হাসিমুখটার দিকে তাকিয়েই হালকা হয়ে গেল। কিছু বলার আগেই সে হঠাৎ জারাকে কোলে তুলে নিল। জারা একটু চমকে উঠে হাত দুটো আরমানের গলায় জড়িয়ে ধরল।
আরমান ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে জারার গালে একের পর এক ছোট ছোট চুমু খেলিয়ে দিতে লাগল। জারা লাজুক হেসে চোখ বন্ধ করে রাখল, যেন সেই মুহূর্তটা শেষ না হয়। তার কানের কাছে আরমানের নিঃশ্বাসের উষ্ণতা অনুভব করে জারার বুকের ভেতর কেমন একটা নরম আলো জ্বলে উঠল।
হাঁটার প্রতিটি ধাপে আরমান আরও কাছে টেনে নেয়, যেন কোলে থাকা মানুষটা পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় আছে। জারা ফিসফিস করে বলে ওঠে, __“এইভাবে তাকিয়ে থাকলে আমি লজ্জা পাই।”
আরমান হালকা হেসে গালে আরেকটা চুমু দিয়ে বুঝিয়ে দেয়, এই লজ্জাটুকুই তার সবচেয়ে প্রিয়।
নীরব সেই হাঁটার মাঝে কোনো তাড়া নেই, কোনো ব্যস্ততা নেই। শুধু দুজন মানুষের মাঝে বিশ্বাস, উষ্ণতা আর নিঃশব্দ ভালোবাসার আদান–প্রদান।
নরম আলোয় ভেজা ঘরটা তখন একেবারে নিশ্চুপ। সারাদিনের ক্লান্তি আর রাতের নীরবতা মিলেমিশে একটা আলাদা আবহ তৈরি করেছে। জারা আরমানের কোট খুলতে খুলতে হালকা হাসি নিয়ে বলল,
__“আমি আপনাকে খুব জ্বালাই তাই না, স্বামীজান?”
আরমান কৃত্রিম বিরক্তির ভান করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
__“তা আর বলতে! তোমার জ্বালানো না থাকলে আমার দিনটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়!মাঝে মাঝে মন চায় নিজেই নিজের মাথায় মেরে দেই।”
জারা দুষ্টু চোখে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
__“তাই নাকি? তাহলে মন খারাপ করবেন না। পরের বার থেকে আমরা দুজন মিলে জ্বালাবো আপনাকে।”
কথাটা বলেই জারা নিজের জিভ কামড়ে ধরল। মুখ ফসকে কী বলে ফেলেছে, সেটা বুঝে একটু থমকে গেল। আরমান সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
__“দুজন মানে?”—তার কণ্ঠে কৌতূহল।
জারা তাড়াতাড়ি কথা ঘুরিয়ে নিল।
__“আরে কিছু না। এমনি বলে ফেলেছি। মাথায় এখন কী যে ঘোরে!”
আরমান কিছুক্ষণ চুপ করে জারার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। আজ যেন তাকে একটু আলাদা লাগছে। চোখের নিচে হালকা ছায়া, মুখটা কেমন ফ্যাকাশে।আরমান নরম গলায় বলল,
__“বউ,আজ তোমাকে একটু অস্বাভাবিক লাগছে কেন? শরীর খারাপ নাকি? ডাক্তার ডাকবো?”
জারা তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়ল।
__“না না, একদম না। আমি ফিট অ্যান্ড ফাইন।”
__“তাহলে মুখটা এমন কেন?”
আরমান ছাড়ল না। জারা কপাল কুঁচকে ভাবার ভান করল।
___“হয়তো আপনার আনা ক্রিমগুলোর মধ্যে গণ্ডগোল হয়েছে। আজকাল তো কিছুই ঠিক মতো কাজ করে না।”
আরমান হেসে উঠল।
__“তা ঠিক। আচ্ছা শোনো, কাল বিকেলে রেডি থাকবে। শপিংয়ে নিয়ে যাবো। যা যা পছন্দ সব কিনে দেবো। ওই ক্রিম-ট্রিম বাদ। পরে মুখে দাগ বের হলে আমার কিন্তু মাথা খারাপ হবে। স্কিনের বারোটা বেজে যাবে।”
জারা হাসতে হাসতে বলল,
__“ঠিক আছে বাবা। আপনার কথাই শেষ কথা।”
এই হালকা খুনসুটির মধ্যেই সময় কেটে গেল। খাওয়া দাওয়া শেষ করে দুজনেই শুয়ে পড়ল। জারা আরমানের বুকে মাথা রেখে আরাম করে শুয়ে আছে। বাইরে রাত আরও গভীর হয়েছে, জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা বাতাস ঢুকছে।
আরমান জারার চুলে আঙুল বুলাতে বুলাতে বলল,
__“আজ আমার বউ এত শান্ত কেন বলো তো? না রাগ, না বকুনি—কিছুই না। মুডটা কি খুব ভালো?”
জারা চোখ বন্ধ রেখেই মাথা নাড়ল, হ্যাঁ বোঝাতে।
__“খুব।”
আরমান হালকা হেসে বলল,
__“কারণটা জানতে পারি?”
জারা একটু চুপ করে থেকে বলল,
__“না, সেটা সিক্রেট। বলা যাবে না।”
__“আহা! আমার কাছেও সিক্রেট?”
আরমানের গলায় অভিমান।এই অভিমান বুঝেও যেনো বুঝলো না জারা। জারা নরম গলায় বলল,
__“এখন শুধু আমার মাথায় সুন্দর করে হাত বুলিয়ে দিন। খুব ঘুম পাচ্ছে।”
আরমান আর কিছু বলল না। চুপচাপ হাত বুলিয়ে যেতে লাগল। জারার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে নিয়মিত হয়ে এল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ঘুমিয়ে পড়ল। আরমান তাকিয়ে রইল জারার ঘুমন্ত মুখের দিকে। কত ছোট ছোট অভ্যাসে ভরা এই মানুষটা—অভিমান, দুষ্টুমি, হঠাৎ হঠাৎ অকারণ চিন্তা। সব মিলিয়ে তার জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষ। সে মনে মনে ভাবল, জীবনের সমস্ত ক্লান্তি যেন এই মুহূর্তে এসে হালকা হয়ে গেছে।
বুকের ওপর জারার মাথা একটু ঠিক করে দিয়ে আরমান চোখ বন্ধ করল। বাইরে শহর তখনও জেগে, কিন্তু এই ছোট্ট জগতে শান্তির ঘুম নেমে এসেছে। দুজনের নিঃশ্বাস এক ছন্দে মিশে রাতের নীরবতাকে আরও গভীর করে তুলল।
সকালের আলোটা আজ অন্য রকম লাগছিল। ঘরের ভেতর ছড়িয়ে থাকা রোদে একটা নরম উষ্ণতা, যেন আজকের দিনটা একটু আলাদা করেই এসেছে। আরমান আজ অফিসে যায়নি। বাবাকে বলেছে সব সামলে নিতে। বউকে নিয়ে আজ নের হবে। বহুদিন পর এমন একটা সকাল—কোনো তাড়া নেই, কোনো মিটিং নেই, শুধু সময় আর মানুষটা আছে, যাকে নিয়ে তার সব ভাবনা ঘোরে।
জারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হিজাব পরছিল। খুব মন দিয়ে ভাঁজ ঠিক করছে, পিন লাগাচ্ছে। আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে সে নিজেই যেন একটু থেমে যাচ্ছিল। চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু ঠোঁটের কোণে একটা চাপা হাসি। ভেতরে ভেতরে সে জানে—আজকের দিনটা তার জন্য ভীষণ প্রিয়ও।
আরমান আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শার্ট বের করছিল। হঠাৎ তার চোখ গিয়ে পড়ে একপাশে রাখা স্যানিটারি প্যাডের প্যাকেটগুলোর দিকে। নতুনের মতোই আছে। খুব বেশি নতুন। যেমন এসেনে তেমনই আছে। সে একটু থামে। মনে মনে হিসেব কষে। গত দুই মাসে সে নিজেই তো এনে দিয়েছে।তাহলে ব্যবহার হয়নি কেন? জারা তো বলতো ওর পিরিয়ড এসেছে তাহলে? তার কপাল হালকা ভাঁজ পড়ে।
__“মানজারা…!”
ডাকটা খুব স্বাভাবিক, কিন্তু ভেতরে একটা কৌতূহল জমে আছে। জারা আয়নার দিকেই তাকিয়ে বলে,
__“হুমমম… বলুন।”
__“এই প্যাডগুলো… তুমি ব্যবহার করো নি?”
আরমানের গলা শান্ত, কিন্তু চোখে প্রশ্ন। জারা যেন হঠাৎ জমে যায়। হিজাবের পিনটা হাতেই থেমে থাকে। বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। এই প্রশ্নটা সে আশা করেছিল আসবে না—কিন্তু জানত, একদিন না একদিন আসবেই।আরমান আবার বলে, এবার একটু স্পষ্ট করে।
__“পিরিয়ড আসে নি তোমার ?”
জারার গলা কাঁপে,
__“ এ এসেছে তো..! ব্যব… ব্যবহার করা হয় নি… কা..কারণ আম্মু যেগুলো এনে দিয়েছিল, সেগুলো ব্যবহার করেছি।”
কথাটা বলেই সে নিজেই বুঝে যায়—কতটা দুর্বল শোনাচ্ছে। আরমান তার দিকে ঘুরে তাকায়। চোখ দুটো সরু হয়ে আসে।
__“আম্মু কবে এনে দিয়েছে? সবসময় তো আমিই আনি।”
এই প্রশ্নে জারা আরও ঘাবড়ে যায়। মাথার ভেতর যেন হাজারটা কথা একসাথে ঘুরতে থাকে। এখন কী বলবে? সত্যিটা? না, এখন না। এখন বললে সে প্রস্তুত না। আরমানের মুখের দিকে তাকানোর সাহসও পাচ্ছে না। সে তাড়াতাড়ি কথার মোড় ঘোরায়।
__“আরে এনেছিলো… আপনি জানেন না। এখন এসব রেখে রেডি হন। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
বলেই সে আরমানকে হালকা ঠেলে আলমারির দিকে ঠেলে দেয়। নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। বুকের ভেতর জমে থাকা চাপটা একটু নামল।
আরমান কিছুক্ষণ জারার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছু বলে না। শুধু মাথা নেড়ে শার্টটা হাতে নেয়। কিন্তু সন্দেহটা তার চোখে থেকে যায়—চুপচাপ, নীরব।
কিছুক্ষণ পর দুজনেই রেডি হয়ে বের হয়। গাড়িতে বসার পর থেকেই আরমানের মনটা হালকা হয়ে আসে। জারাকে পাশের সিটে বসে থাকতে দেখে তার ভেতরের সব প্রশ্ন আপাতত চাপা পড়ে যায়। আজ সে শুধু এই মুহূর্তটা উপভোগ করতে চায়। আরমান গাড়ি স্টার্ট না দিয়ে বউদের দিকে তাকিয়ে থাকে। এটা দেখে জারা বলে,
__“ চিন্তা নেই! আমি আপনাতেই সীমাবদ্ধ স্বামীজান..!”
আরমান হাসে। জারাকে সিট বেল লাগিয়ে দিতে দিতে টুপ করে চুমি খেয়ে নেয়। জারা লজ্জায় গালে হাত দিয়ে বসে থাকে। আরমান গাড়ি স্টার্ট দেয়। প্রথমে তারা যায় শপিং মলে। ভেতরে ঢুকতেই জারার চোখ চকচক করে ওঠে। রঙিন জামা,জুতো, সবকিছু তার চোখে আলাদা ভাবে ধরা দিচ্ছে।
__“এইটা দেখুন তো,”
জারা একটা জামা তুলে ধরে। আরমান হাসে।
__“নাও, নাও। যেটা পছন্দ হয়, সব। যতো খুশি খরচ করো আমার কোনো আপত্তি নেই লক্ষী বউ ।”
একটার পর একটা জিনিস কার্টে জমতে থাকে। জারা কখনো কাপড় দেখে, কখনো জুতো, কখনো হালকা গয়না। আরমান কোনো প্রশ্ন ছাড়াই সব কিনে দেয়। মাঝে মাঝে জারা তাকিয়ে দেখে—সে ক্লান্ত কিনা।কিন্তু আরমানের চোখে আজ শুধু তৃপ্তি।জারা হঠাৎ জিজ্ঞেস করে,
__“আপনি কি বিরক্ত হচ্ছেন স্বামীজান ?”
আরমান হেসে বলে,
__“ তুমি আমার সাথে আছো মানে বিরক্তি আমার ডিকশনারিতে নেই। তুমি খুশি থাকলেই আমার সব ঠিক।”
শপিং শেষে তারা বসে কিছু খায়। জারা অল্প অল্প খাচ্ছে। মাঝে মাঝে মুখটা একটু ফ্যাকাসে হয়ে যায়, আবার ঠিকও হয়ে যায়। আরমান সেটা খেয়াল করে, কিন্তু কিছু বলে না। শুধু গ্লাসটা এগিয়ে দেয়।
__“পানি খাও।”
খাওয়ার পর তারা একটু হাঁটে। জারা হঠাৎ বলে,
__“আজ অনেক ভালো লাগছে স্বামীজান ।”
আরমান পাশে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকায়।
__“আমারও। অনেক দিন পর এমন দিন পেলাম।”
জারা মনে মনে ভাবে—এই মানুষটা কতটা সহজ।
কতটা নিঃশর্ত। বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি ওঠে। সে কি ঠিক করছে? না এখনো সময় আছে। আর একটু। ঠিক সময়টা সে নিজেই বেছে নেবে।
বিকেলের দিকে তারা বাড়ির পথে রওনা দেয়। গাড়ির ভেতর নরম গান বাজছে। জারা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। আরমান এক হাতে স্টিয়ারিং, আরেক হাতে হালকা করে জারার হাত ধরে। জারা তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে।
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৫
__“আজ আমাকে এতো খুশি রাখার জন্য ধন্যবাদ।”
আরমান গম্ভীর হয়ে বলে,
__“তোমাকে খুশি রাখা আমার দায়িত্ব সোনা। ”
গাড়ি ধীরে ধীরে এগোয়। আর জারার ভেতরে ভেতরে একটা গোপন আনন্দ আর ভয় একসাথে জমে থাকে। সে জানে—এই শপিং, এই হাসি, এই সাধারণ দিনগুলো—সবকিছুর মানে খুব শিগগিরই বদলে যাবে। কিন্তু আজ নয়। আজ শুধু তারা দুজন। আর এই দিনটি।
