Home Born to be villains Born to be villains part 28

Born to be villains part 28

Born to be villains part 28
মিথুবুড়ি

“আপনি আমার থেকে কিছু লোকাচ্ছেন মি. কায়নাত?”
“আপনার ঠোঁটে কিন্তু এখনও আমার ছোঁয়া লেগে আছে, ওয়াইফি।”
“মানে?” এলিজাবেথের সরু চোখ সংকুচিত হলো।
রিচার্ড ফোন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পূর্ণ দৃষ্টিতে এলিজাবেথের দিকে তাকাল। এগিয়ে গেল। বুড়ো আঙুলের ডগা রাখল রক্তার্ভ ঠোঁটে। পুরুষালী কণ্ঠটা বেশ গভীর শোনালো,
“যার ঠোঁটে এখনও আমার ছোঁয়া লেগে আছে, তার থেকে আদৌও কিছু লুকানো যায় বুঝি? হাহ?”
এলিজাবেথ আজ লোকটার মিষ্টি কথায় গললো না।রুক্ষভাবে হাত সরিয়ে দিল সে। অসহিষ্ণু হয়ে গলা খানিক উঁচু করল,”তাহলে এসব কি? কি হচ্ছে এসব? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”

এলিজাবেথ ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে দেওয়ার মুহূর্তেই রিচার্ডের সমুদ্রনীল চোখে যেন সুপ্ত আগ্নেয়গিরির লাভা জ্বলে উঠেছিল। রুক্ষ চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছিল। কপালের নীলচে রগগুলোও ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল। তবে সে নিজের ভেতরে উথলে ওঠা হিংস্র ক্রোধটাকে জোর করেই গিলে ফেলল। কুল হাসবেন্ড হওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ক্রোধ সবসময় নিয়ন্ত্রণ মানে না। রিচার্ড আবারও এলিজাবেথের এক হাত নিজের মুঠোয় পুড়ে নিল। লোকটার আঙুলের ক্রমশ শক্ত হয়ে ওঠা চাপে এলিজাবেথ স্পষ্ট টের পায় ভেতরে জমে থাকা রাগ আর বেশিক্ষণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।রিচার্ড গভীর শ্বাস নিল। কণ্ঠস্বরকে যথাসম্ভব স্থির রাখার চেষ্টা করেও তাতে চাপা রাগের কর্কশতা লুকিয়ে রইল না,
“কী বুঝতে পারছেন না?”
এলিজাবেথ আবারও একই কাজ করল। ঝাটকা মেরে হাতটা ছাড়িয়ে নিল। তার কণ্ঠে গনগনে অগ্নি মিশে ছিল,

“আপনি বুঝতে পারছেন না, আমি কি বোঝাতে চাচ্ছি? আমরা এটা কি করছি? এটা কি আদৌও কোনো হানিমুন ট্রিপ না হিডেন অ্যান্ড সিক গেইম? একদিন এই দেশে, তো পরদিন অন্যদেশে। আমার তো মনে হচ্ছে না, আমরা কোনো ট্রিপে আছি। বিষয়টা এমন দাঁড়াচ্ছে, আমরা এক দেশ থেকে আরেক দেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। অদৃশ্য কেউ আমাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। তাছাড়া, আমার ফোন কোথায়? আপনি আমাকে কারোর সাথে যোগাযোগ করতে দিচ্ছেন না কেন? আমার পরিবার! আমার ফেন্ড! কারও সাথে আমাকে কন্টাক্ট করতে দিচ্ছেন না। আমার ভাই? কেমন আছে আমার ভাই? বিদায়ের সময়ও আমি, আমার ভাইয়ের সাথে দেখাটাও করতে পারিনি। কোথায় আমার ভাই? ও কেমন আছে? আমার পরিবার কেমন আছে, সেটা জানার অধিকার আমার আছে মি.কায়নাত। আপনি আমাকে সবার থেকে এভাবে আলাদা করতে পারেননা।” শেষের কথাগুলো প্রতিবাদের সুরে বলল।
আশ্চর্যজনকভাবে এতক্ষণ রিচার্ডের চোখে যে চাপা ক্রোধ আর তা দমিয়ে রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা স্পষ্ট ছিল, সবকিছুই এক লহমায় কর্পূরের মতো উবে গেল। তার দৃষ্টি আবার দুর্ভেদ্য হয়ে উঠল। রহস্যময় ভঙ্গিতে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে সংক্ষিপ্ত স্বরে কেবল বলল,”তাঁরা ভালো আছে।”

যে দৃষ্টি রিচার্ড ফিরিয়ে নিয়েছিল, এলিজাবেথ আবারও এগিয়ে গিয়ে সেই দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়াল। রিচার্ডের চোখে চোখ রেখে সরাসরি জানতে চাইল,
“আর আমি? আমি কেমন আছি, তারা কি তা জানে?”
রিচার্ড এলিজাবেথের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দৃষ্টিপাত করল। চোখে চোখে প্রশ্ন রাখল,
“আপনি ভালো নেই?”
এবার এলিজাবেথ নিজেকে খুব অসহায় অনুভব করল। সে কিছুতেই তার ভেতরের জ্বালা বোঝাতে পারছে না। না পেরে দিশেহারা হয়ে নিজের চুল খামচে ধরল। তারা এই মুহুর্তে আইফেল টাওয়ারের একটি ব্রিজে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু পর্যটক অদ্ভুত দৃষ্টিতে এলিজাবেথের দিকে তাকিয়ে আছে। রিচার্ড ভিজ দিয়ে শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে এলিজাবেথকে আগলে ধরল,”কি হয়েছে, রেড? ফিজিক্যাল পেইন হচ্ছে?”
“মি.কায়নাত, আপনি আমাকে বুঝতে পারছেন কেন?”

রিচার্ড তাকে শান্ত করার জন্য অত্যন্ত ধৈর্য নিয়ে এলিজাবেথের মাথাটা তার বুকের সাথে চেপে ধরল,”আমি পারছি, আপনাকে আমি বুঝতে পারছি। তবে আমি চাই না আমাদের মধ্যে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি থাকুক।”
এলিজাবেথ অবিশ্বাস্যে রিচার্ডের দিকে তাকাল,”ওরা তৃতীয় পক্ষ নয়। ওরা আমার পরিবার।”
রিচার্ডের নিরেট ঠান্ডা জবাব,”আপনার একমাত্র পরিবার আমি। শুধুই আমি। আর কেউ নয়।”
এলিজাবেথ শুকনো ঢোক গিলল। এই মুহুর্তে রিচার্ডের দৃষ্টি, কণ্ঠ, আচরণ সবকিছুই অচেনা লাগছে।
“আপনি টক্সিক আচরণ করছেন।” এলিজাবেথের ঠোঁট কাঁপে।
রিচার্ডের একহাত এবার শক্ত করে চেপে বসল এলিজাবেথের কোমরের নরম মাংসে। চাপটা এতোটাই প্রবল ছিল যে এলিজাবেথের চোখের কোণে অশ্রুর কুয়াশা ভেসে ওঠে। যন্ত্রণায় চোখমুখ বিকৃত হয়ে উঠল। একফোঁটা অশ্রু কারুকার্যের মতো গড়িয়ে পড়ল মোমের মতো মসৃণ গাল বেয়ে। তবে অশ্রুবিন্দুটি মাটি ছোঁয়ার আগেই রিচার্ড তীব্র এক লেহনে তা জিভের ডগায় তুলে নিল। শুষে নিল। তারপর গিলে ফেলল। তারপর ঠোঁট চেপে ধরল এলিজাবেথের ভেজা চোখের ওপর, যেন আর একটি যন্ত্রণামাখা অশ্রুও বেরিয়ে আসার সুযোগ না পায়। কাঁদতে না পেরে এলিজাবেথ অসহায়ের মতো ফুঁপিয়ে উঠল।

শুরু থেকে রিচার্ড এলিজাবেথের প্রতি যে কোমল আচরণ ও প্রীতি দেখিয়েছে, এবং প্রতিটি স্পর্শে, চাহনিতে, আর কণ্ঠে যে আদ্রতা ছিল, এই মুহূর্তে তার লেশমাত্রও অবশিষ্ট রইল না। মুহূর্তেই রিচার্ডের দৃষ্টি ধারালো হয়ে উঠল। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল পৈশাচিক, শিরশিরে হাসি। ঝিরিঝিরি করে তুষার ঝরতে শুরু করল। রিচার্ড অত্যন্ত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সুতীব্র অধিকারে এলিজাবেথের গলার মাফলার টেনে তার চুল আর মুখ ভালোভাবে ঢেকে দিল। তারপর পেছন থেকে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে নিজের ওভারকোটের ভেতর টেনে নিল। অতঃপর থুতনি রাখল এলিজাবেথের কাঁধে। কানের একেবারে কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে, ভয়ংকর রকমের নির্লিপ্ত স্বরে বলল,

“কজ আই’ম টক্সিক।”
রিচার্ডের বরফ শীতল কণ্ঠস্বর শুনে এলিজাবেথের পুরো শরীর কেঁপে উঠল। এই মানুষটাকে সে নিজের স্বামী বলে জানে, অথচ মাঝেমধ্যেই লোকটাকে তার ভীষণ অচেনা মনে হয়। রিচার্ডের পুরোটা অস্তিত্ব যেন ঘন রহস্যে মোড়ানো। আপাতদৃষ্টিতে সে সবকিছু যতটা সহজ আর স্বাভাবিক দেখায়, ভেতরে ভেতরে পরিস্থিতি আসলে ততটা সহজ মনে হয় না। মনে হয় এই বাহ্যিক স্বাভাবিকতার আড়ালে লুকিয়ে আছে জটিল মনস্তত্ত্ব আর গভীর রহস্যের ঘনঘটা। তবে এলিজাবেথকে সবচেয়ে বেশি যা অবাক এবং দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে, তা হলো রিচার্ডের অদ্ভুত আচরণ। তারা এখন তাদের জীবনের সবচেয়ে মধুর সময়, অর্থাৎ হানিমুন ট্রিপে আছে। একের পর এক দেশ সফর করছে তারা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো এলিজাবেথের কাছে এটাকে কোনো রোমান্টিক সফর মনে হচ্ছে না৷ বরং মনে হচ্ছে তারা কোনো কিছু থেকে অবিরাম পালিয়ে বেড়াচ্ছে। একটা দেশের কোথাও রিচার্ড স্থির হতে পারছে না। অদৃশ্য ভয় বা তাড়া যেন সবসময় রিচার্ডকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

তার চেয়েও বেশি অদ্ভুত রিচার্ডের অতি-সাবধানতা। হানিমুন ট্রিপে এসে যেখানে মানুষের বুঁদ হয়ে থাকার কথা ভালোবাসায়, সেখানে রিচার্ড সারাক্ষণ চারদিকে তীক্ষ্ণ, সন্দিগ্ধ দৃষ্টি বুলাচ্ছে। যেন কোনো বাজপাখি আকাশ থেকে তার শিকার খুঁজছে বা কোনো শত্রুর আগমনের অপেক্ষা করছে। রিচার্ডের এই সাবধানতা কেবল দৃষ্টিতেই সীমাবদ্ধ নয়, তার কাজেও প্রকাশ পায়। তারা যেখানেই যাচ্ছে, যে হোটেল বা রিসোর্টেই উঠছে না কেন, রিচার্ড পুরো জায়গাটা একাই বুক করে নিচ্ছে। এলিজাবেথ যদি সমুদ্র সৈকত দেখতে চায়, রিচার্ড আস্ত একটা বিচ ভাড়া করে নেয়। সিনেমা দেখতে চাইলে পুরো থিয়েটারটাই বুক করে ফেলে, যাতে সেখানে অন্য কোনো তৃতীয় ব্যক্তি না থাকতে পারে।
এলিজাবেথের পছন্দের কোনো জায়গা ছাড়া রিচার্ড সাধারণত রুম থেকে বের হতে চায় না। আর যখুনি বাধ্য হয়ে বের হয়, তখুনি সে মুখে মাস্ক পরে নেয়। প্রথম প্রথম এলিজাবেথ ভেবেছিল হয়তো রিচার্ডের ডাস্টএলার্জি। এ কারণে সে এমনটা করছে। কিন্তু এখন আর এই বিষয়টাকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। রিচার্ড যে কেবল নিজেকেই লোকচক্ষু থেকে আড়াল করছে তা নয়। এলিজাবেথকেও পৃথিবীর সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখছে। এই অবরুদ্ধ অবস্থা এলিজাবেথের জন্য বিভ্রান্তিকর। ধীরে ধীরে সবকিছু দমবন্ধকর হয়ে উঠছে।

সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো, রিচার্ড এলিজাবেথকে তার নিজের ফোনটি পর্যন্ত ব্যবহার করতে দিচ্ছে না। টেলিভিশনের সামনেও যেতে দিচ্ছে না। বাইরের পৃথিবীর বা পরিবারের কারও সাথে তাকে যোগাযোগ করার কোনো সুযোগই দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি রিচার্ড নিজেও ফোন খুব একটা হাতে নেয় না। আর যখনই নেয়, খুব অল্প সময়ের জন্য এলিজাবেথের আড়ালে, অত্যন্ত গোপনে ব্যবহার করে। রিচার্ডের প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি পদক্ষেপ এলিজাবেথের মনে সন্দেহের বীজ বুনে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না সে কি ভালোবাসার মানুষের সাথে হানিমুনে এসেছে, নাকি কোনো পলাতক অপরাধীর সাথে রহস্যময় বন্দিদশায় আটকে পড়েছে!
এলিজাবেথ রিচার্ডকে ভয় পাচ্ছে বুঝতে পেরে রিচার্ড নরম হয়, কোমল হয়। ঠোঁট ছোঁয়ায় কেশরাশিতে।

“স্যরি ওয়াইফি, ইফ আই হার্ট ইয়্যু…
“আপনি তো বলেছিলেন আমাকে নিয়ে ইতালি যাবেন। আপনার পরিবারের সাথে দেখা করাবেন। কোথায় তারা? আমি তাদের সাথে দেখা করতে চাই৷”
রিচার্ড থমকে গেল। খাকিন অপ্রস্তুত ভাব ফুটে উঠল তার পাথুরে কঠিন মুখাবয়বে। কিন্তু পরক্ষনেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। কণ্ঠ শাকের করাতের মতো ধারালো হয়ে উঠল,”আমার কেউ নেই, আপনি ছাড়া।”
একটু থেমে এলিজাবেথকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল সে। তারপর ভীষণ কোমল এবং তীব্র অধিকারসুলভ কণ্ঠে বলল,
“আজ থেকে আপনারও কেউ থাকবে না, আমি ছাড়া।”
এলিজাবেথ কিছু বলতে যাবে, এমন সময় দূর থেকে ভেসে এলো চেনা চঞ্চল কণ্ঠ,
“ইমামা।”
বিদেশের মাটিতে চেনা কণ্ঠে এলিজাবেথ ভেতর থেকে শিউরে উঠল। সামনে তাকিয়ে দেখল ইবরাত। তার পিছনে অপ্রসন্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছে ন্যাসো। ন্যাসোর পেছনে লুকাস। সে বসের রোমান্টিক মুহুর্তে বাগড়া দিতে পেরে ডায়মন্ডের মতো চকচকে দাঁত কেলিয়ে হাসছে। ওদের এই মুহুর্তে এখানে দেখামাত্র রিচার্ডের চিবুক শক্ত হয়ে উঠল। সে ক্ষিপ্র গতিতে তেড়ে গিয়ে ন্যাসোর কলার চেপে ধরল। দাঁতে দাঁত পিষে চাপা গলায় বলল,
“তোমরা এখানে কেন? জানলে কি করে? ওহ, গড! এক্ষুণি লোকেশন চেঞ্জ করতে হবে।”

দৃশ্যপট ক্যাপিলানো সাসপেনশন ব্রিজ, নর্থ ভ্যানকুভার। নর্থ ভ্যানকুভারের ক্যাপিলানো সাসপেনশন ব্রিজের চারপাশটা বর্তমানে থমথমে নীরবতায় ঢেকে গেছে। আদালতের কাঠগড়ায় কোনো অপরাধী যেভাবে নত মস্তকে দাঁড়িয়ে থাকে, ঠিক সেভাবে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছে ইবরাত আর ন্যাসো। তবে ইবরাতের মুখটা অনুশোচনা আর ভয়ে একদম চুপসে গেলেও ন্যাসোর শান্ত বাদামী চোখে স্পষ্ট ফুটে উঠছে চাপা ক্ষোভ, যা সে শত চেষ্টা করেও লুকাতে পারছে না।
তাদের সামনে বুকে হাত বেঁধে, পাথরের মতো গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে রিচার্ড আর এলিজাবেথ। রিচার্ডের তীক্ষ্ণ, বিজ্ঞ চোখজোড়া ন্যাসোকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে চলেছিল। ন্যাসোর ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে লুকাস। এই গুমোট পরিস্থিতির মধ্যেও তার চোখে-মুখে কোনো ভয়-ভীতি নেই। উল্টে সে বেশ উপভোগ করছে এই পরিস্থিতি৷
নীরবতা ভেঙে এলিজাবেথ কঠোর গলায় প্রশ্ন করল,

“কী হলো ইবরাত? সবটা এবার খুলে বল। তুই এখানে কীভাবে এলি, আর এদের সাথেই বা তোর কী?”
প্রতিবারের মতো ইবরাত এবারও পাথরের মূর্তি বনে রইল। এলিজাবেথ সেই কখন থেকে তাকে একনাগাড়ে প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। অথচ ইবরাত যেন মুখে কুলুপ এঁটেছে। একটা শব্দও তার ঠোঁট গলে বেরোচ্ছে না। এতো বড়ো কাণ্ড ঘটিয়ে এখন আবার মেয়েটার এমন ন্যাকা নীরবতা আর জড়তা দেখে ন্যাসোর ভেতরের সুপ্ত ক্রোধ এবার আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে মুখ খুলল ন্যাসো,
“আমি বলছি।”
সকলের দৃষ্টি একযোগে ঘুরে গেল ন্যাসোর দিকে। ন্যাসো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল…

সেদিন ন্যাসো ও লুকাসের ইতালি ফিরে যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা যায়নি। বাংলাদেশে এটি তাদের দ্বিতীয়বার আসা। প্রথমবার তারা এসেছিল রিচার্ডের সাথে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাতনির জন্মদিনের অনুষ্ঠানে। আর এবার এসেছে বসের বিয়েতে। আবারও ইতালির সেই একঘেয়ে, যান্ত্রিক জীবনে এত দ্রুত ফিরে যেতে মন চাইছিল না তাদের। সজলা-সফলা, সবুজে ঘেরা বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে প্রকৃতির সতেজ বাতাস নিতে চেয়েছিল তারা। চেয়েছিল যান্ত্রিকতার পাথরে খোদাই করা নিজেদের হৃদয়ে একটু সজীবতা ফিরিয়ে আনতে। যেমন ভাবা, তেমন কাজ। তবে ভ্রমণের সুবিধার্থে তারা দুজনে যে যার মতো আলাদা হয়ে গেল।
ভোজনরসিক লুকাস বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘেঁটে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের কথা জানতে পেরে সেদিকেই রওনা হলো। তার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশে যতদিন আছে, এখানকার সব ধরনের বিখ্যাত খাবারের স্বাদ নেওয়া। অন্যদিকে, ন্যাসোও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্য নিয়েছিল। কিন্তু সেটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। যার সূত্র ধরে তাকে এক ভয়ানক ফাঁদে পড়তে হয়েছিল।
বাংলাদেশে এসে ন্যাসো যে হোটেলে উঠেছিল, সেখানে তাকে ব্রেকফাস্টে ফলের আম দেওয়া হয়েছিল। সেই আমের স্বাদ ও সুবাসে ন্যাসো এতটাই মুগ্ধ হয়েছিল যে, সে খাঁটি আমের খোঁজে সরাসরি আমের রাজধানী রাজশাহীতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু অচেনা শহরে কাউকে না চেনায় তার একজন গাইডের প্রয়োজন ছিল, যে তাকে রাজশাহীর বড় বড় বাগান ঘুরিয়ে দেখাবে এবং সেরা আমের স্বাদ দেবে। উপায় না পেয়ে সে সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন গাইডের খোঁজ চেয়ে একটি পোস্ট দেয়।

পোস্ট করার সাথে সাথেই একজন ব্যক্তি তার সাথে যোগাযোগ করে এবং জানায় যে সে ন্যাসোকে পুরো রাজশাহী শহর ঘুরে দেখাবে। সরল বিশ্বাসে ন্যাসো পরদিনই গাড়ি নিয়ে একা একা রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল। লুকাসকে সে এই বিষয়ে জানায়নি পর্যন্ত। অথচ সে বিন্দুমাত্র টের পায়নি যে, যে লোক তাকে গাইড করার আশ্বাস দিয়েছে, সে আসলে ঢাকা থেকেই তাকে অনুসরণ করে আসছিল। তাদের মূল পরিকল্পনা হয়তো অন্য কিছু ছিল। কিন্তু মাঝখানে আমের স্বাদ এসে তাদের সেই পরিকল্পনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
রাজশাহী পৌঁছানো মাত্র সেই লোক ন্যাসোকে রিসিভ করে শহরের সবচেয়ে বড় এক আমবাগানে নিয়ে গেল। প্রথম কয়েক ঘণ্টা সবকিছু বেশ স্বাভাবিক ও ঠিকঠাকই ছিল। নিরেট ঠান্ডা স্বভাবের ন্যাসো ঘুরে ঘুরে বাগান দেখছিল। তবে হঠাৎ করেই পরিস্থিতির মোড় বদলে গেল। গাইডরূপী সেই লোক ন্যাসোকে একটি পুরোনো গোডাউনের ভেতর নিয়ে গেল এবং বাইরে থেকে দরজাটা আটকে দিল গোডাউনটি ছিল মূলত আম সংরক্ষণের জায়গা। ভেতরে শুধু ক্যারেট ভর্তি আম রাখা। আলোর কোনো ছিটেফোঁটাও ছিল না। ধুলোবালিতে ভরা সেই আটপৌরে অন্ধকার গোডাউনে আটকে পড়ে ধূর্ত ন্যাসোর মস্তিষ্ক তৎক্ষণাৎ সঙ্কেত দিয়ে উঠল—এখানে ভয়ানক কিছু ঘটতে যাচ্ছে। সে ফাঁদে পড়েছে।

সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে যে কেউ ভয় পেত, কিন্তু রিচার্ড কায়নাতের বাঁ-হাত হিসেবে পরিচিত এই গানম্যানের চোখে-মুখে ভয়ের বিন্দুমাত্র রেখাও দেখা গেল না। উল্টো তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছিল বাঁকা হাসি। অনেকদিন ধরে শরীরে কোনো ঝরঝরে খাটুনি হয়নি। ন্যাসো ভাবছিল, এই উছিলায় আজ অন্তত একটু ভালো শারীরিক ব্যায়াম হয়ে যাবে।কিন্তু তাকে চমকে দিয়ে সেই অন্ধকার ও বন্ধ গোডাউনের ভেতর হঠাৎ ঘুঙুরের শব্দ ভেসে এলো। ন্যাসো কপাল কুঁচকে সামনে তাকাল। সে দেখল অন্ধকার ভেদ করে একটি নারী ছায়ামূর্তি ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। তার পরনে গলা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত কাফনের কাপড়ের মতো সাদা পোশাক। মুখমণ্ডল দীর্ঘ কালো চুলে সম্পূর্ণ ঢাকা। ঘন কালো চুলগুলো সিঁথি বরাবর ভাগ করে বুকের দু’পাশে ফেলে রাখা হয়েছে। তার হাতে ছিল একটি জ্বলন্ত মোমবাতি। দেখে মনে হচ্ছিল কোনো এক প্রেতাত্মা যেন হেঁটে আসছে। সেদিন জীবনের প্রথমবার ন্যাসো সত্যিই ভীষণ ভয় পেয়েছিল। অশরীরীর মতো সেই ছায়াকে এগিয়ে আসতে দেখে তার চোখের তারায় ভয়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সে ভয়ে এক পা পিছিয়েও গিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে অদ্ভুত সুরেলা কণ্ঠ ভেসে উঠল,

❝বন্ধুর আমের বাগান চার
আমার পছন্দের খাবার
লইয়া আইসো বানাইয়া তুমি
আমেরই আচার…❞
সুরটি আসছিল সেই ছায়ামূর্তির কণ্ঠ থেকেই। গান শেষ হতেই ছায়ামূর্তিটি মুখের সামনে থেকে চুলগুলো গেল। ভেসে উঠল ইবরাতের ভয় দেখানো বিদঘুটে অট্টহাসি। ইবরাতের পুরো মুখে সাদা রঙ মাখানো ছিল, যা অন্ধকারে বীভৎস রূপ ধারণ করেছিল। তখন দ্বিতীয়বারের মতো চমকে উঠেছিল ন্যাসো। তবে এবার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো বিষয়টা তার কাছে পানির মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারল এই মেয়ের আসল উদ্দেশ্য কী!সব বোঝার পর ন্যাসো আর এক মুহূর্তও স্থির থাকেনি। তার দানবীয় শক্তির দুটো লাথিই যথেষ্ট ছিল গোডাউনের শক্ত কাঠের দরজাটি ভেঙে ফেলার জন্য। দরজা ভেঙে ন্যাসো যখন পালানোর চেষ্টা করল, ইবরাতও তার পিছু নিল। কিন্তু ন্যাসো বেশিদূর যেতে পারল না। হঠাৎ উপর থেকে তার ওপর জাল ফেলে তাকে সম্পূর্ণ আটকে ফেলা হলো।

ইবরাত হলো প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার মেয়ে।ইবরাতের পক্ষে কখনোই সম্ভব ছিল না ন্যাসোর মতো চতুর ও শক্তিশালী একজনকে ফাঁদে ফেলা কিংবা আটকে রেখে বিয়ে করা, যদি না তার রাজনীতিবিদ বাবা তাকে সাহায্য করতেন। মায়ের সঙ্গ ত্যাগ করেও যখন ইবরাত বাবার কাছ থেকে কোনো স্নেহ-ভালোবাসা পায়নি, তখন সে নিজেকে বাবা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন পর সে যখন ভালোবাসার দাবি নিয়ে বাবার কাছে আবদার করল, তখন বাবা আর মেয়ের সেই আবদার ফেলতে পারেননি। পরবর্তীতে ন্যাসোকে ঢাকা থেকে রাজশাহী নিয়ে যাওয়া, আমবাগানের গোডাউনে ফাঁদ পাতা এবং শেষ পর্যন্ত বিয়ে সম্পন্ন করা সবটাই ছিল ইবরাতের বাবার ক্ষমতার খেলা। মেয়ের এই অদ্ভুত আবদার পূরণ করার জন্যই রাজনীতিবিদ বাবা ন্যাসোকে আঠারো দিন আটকে রেখে শারিরীক এবং মানষিক কষ্ট দিয়ে বিয়ের জন্য চাপ দিয়েছিল। সবশেষে আঠারো দিন বন্দি থাকার পর, কোনো উপায় না পেয়ে ন্যাসো ইবরাতকে বিয়ে করতে রাজি হয় এবং মুক্তি পায়।

আর এভাবেই এক অভিনব ও নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হলো।
রাগে ন্যাসোর চোয়াল কাঁপছে। সবটা শোনার পর এলিজাবেথ আশ্চর্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। বিস্ময়ের অভিঘাতে কিছুক্ষণ কথা বলার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলে সে। শুধু নির্বাক চোখে তাকিয়ে রইল ইবরাতের দিকে। বিপরীতে, রিচার্ডের অভিব্যক্তি দেখে তার অনুভূতির লেশমাত্রও আঁচ করা গেল না। সে পূর্বের ন্যায় পাথরের মতো স্থির এবং অটল। লুকাস ন্যাসোর আড়ালে মুখ লুকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। সবটা শোনার পর থেকে সে হেসেই চলেছে। তার হাসি যেন থামছেই না।
ন্যাসো হঠাৎ ক্ষিপ্ত বাঘের মতো এগিয়ে গিয়ে ইবরাতের হাত খামচে ধরে, ওকে এলিজাবেথের কাছে টেনে নিয়ে গেল। তারপর ওর হাতের ট্যাটু উপরে তুলে ধরে চিড়বিড়িয়ে উঠল,
“জাস্ট লুক, এই মেয়ে নাকি আমাকে ভালোবাসে! আমার নামে হাতে ট্যাটু করেছে! অথচ দেখুন, আমার নামের কি হাল করেছে!”

এলিজাবেথ তাকিয়ে দেখল সত্যিই ইবরাত ন্যাসোর নামের ওপর লাঙ্গল চালিয়ে দিয়েছে। দোষ ইবরাতের নয়। বানানে গন্ডগোল লাগিয়ে দিয়েছে ট্যাটু আর্টিস্ট।
“চুষো! লাইক সিরিয়াসলি?” ন্যাসোর ইবরাতের দিকে তাকিয়ে বজ্রকণ্ঠে ধমকে উঠল,”এই মেয়ে, আমার নাম চুষো?”
ইবরাত নিজের দিকটা ব্যাখা করতে চাইল,”আমার কি দোষ? আমি তো ট্যাটু আর্টিস্টকে….
“শাট আপ!”
ইবরাত কেঁপে উঠল। ছুটে গিয়ে আশ্রয় নিল এলিজাবেথের বুকে। তবে সে যে ভুল করেছে, তার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থানেও ঠাঁই পেল না। এলিজাবেথ ইবরাতকে বুক থেকে সরিয়ে ওর কাঁধে হাত রাখল।
“ইবরাত, তুই এটা কি করলি?”

ইবরাত বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে উঠল,”আমি উনাকে সত্যিই ভালোবাসি রে ইমু৷”
কিছু মানুষ আছে, যাদের চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রু গড়ালেই নাকমুখ আগুনের মতো লাল হয়ে যায়। ইবরাতেরও তেমনি। একটু কাঁদতে না কাঁদতে চোখমুখ পাকা মরিচের মতো লাল হয়ে গেছে। যার কারণে এলিজাবেথ চাইলেও ওর ওপর চড়া হতে পারল না ৷ তাই সে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“মানছি তোর ভালোবাসা সত্য। কিন্তু ভালোবাসাকে হাসিল করার জন্য তুই যে পথ অবলম্বন করেছিস, তা সম্পূর্ণ ভুল। আর আমরা কেউই এটাকে সমর্থন করব না।”
ইবরাত ফোপাঁতে ফোঁপাতে বলল,”ভুলের শাস্তি হিসেবে আমাকে যে শাস্তি দেওয়া হয়, আমি তা-ই মাথা পেতে নিব।”
ন্যাসো পাশ থেকে তৎক্ষণাৎ ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল,
“তাহলে আমাকে ডিভোর্স দিয়ে উদ্ধার করো। আমি আজকেই ডিভোর্সের ফাইল রেডি করছি।”
এতক্ষণ চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়ালেও, ন্যাসোর কথা শুনে হঠাৎ করেই জ্বলে উঠল ইবরাত। কান্না থামিয়ে ন্যাসোর মুখের ওপর স্পষ্ট ভাষায় চ্যাটাং করে বলে দিল,
“অসম্ভব!”

ন্যাসো এমনভাবে তাকাল যেন চোখ দিয়েই গিলে খাবে ওকে। শুধু রিচার্ড সামনে দাঁড়িয়ে আছে বলেই সে কোনোমতে নিজেকে সামলে রাখল, নয়তো পরিস্থিতি অন্যরকম হতো। এলিজাবেথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ন্যাসোর দিকে তাকাল। শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আমি আপনার অবস্থাটা বুঝতে পারছি। হ্যাঁ, আমিও মানছি ও যা করেছে তা অন্যায়। ও যে পথটা বেছে নিয়েছিল, সেটা সম্পূর্ণ ভুল ছিল। কিন্তু বিয়ে তো কোনো ছেলেখেলা নয়! চাইলেই একটা সম্পর্ক এভাবে হুট করে শেষ করে দেওয়া যায় না।”
এলিজাবেথ এবার তাকাল রিচার্ডের দিকে। রিচার্ড একহাত পকেটে গুঁজে আগে থেকেই একদৃষ্টিতে ন্যাসোর দিকে তাকিয়ে ছিল। বাজপাখির মতো শাণিত চোখে সে ন্যাসোকে পরখ করছিল৷ বোঝার চেষ্টা করছিল তার ভেতরের আসল মনোভাবটা। বিয়ের মতো একটা জটিল বিষয় কারও ওপর এভাবে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। সেটা অন্যায়।
রিচার্ড কিছু একটা বলতে গেলে লুকাস তাকে চোখের ইশারায় একটু পাশে ডেকে নিয়ে গেল। নিচু গলায় বলল,
“বস, ন্যাসোর কাছে কিন্তু গান ছিল। ও চাইলেই নিজেকে ওখান থেকে মুক্ত করে চলে আসতে পারত। বুদ্ধি আর শক্তি দিয়ে ওকে হারানোর ক্ষমতা কারও নেই। ও জীবনে মাত্র একবারই হেরেছে। হয়তো আবারও হারতে চাইছে বলেই মেয়েটাকে এত দূর নিজের সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে।”
লুকাসের কথা শুনে রিচার্ড কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে রইল। তার চোখের চাউনি আরও গভীর হলো। কিছুক্ষণ পর
সবার সামনে এসে একদম আদেশের সুরে ঘোষণা করল,
“কিছুক্ষণ পর আবারও আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাসো এবং ইবরাতের বিয়ে দেওয়া হবে। এটাই ফাইনাল। নো মোর ওয়ার্ডস।”
ব্যস তার কথায় শেষ ঘোষণা হিসেবে কাজ করল। এরপর আর কেউ টুঁশব্দ অব্দি করার সাহস পেল না।

কথামতো তার কিছুক্ষণ পরই পুনরায় ন্যাসো আর ইবরাতের বিয়ে সম্পন্ন হয়। শুরুতে ন্যাসো দ্বিমত পোষণ করলেও, রিচার্ড তার সাথে আলাদাভাবে খোলাখুলি কথা বলে। তখন ন্যাসো নিজেকে শক্ত রাখতে পারেনি। ভেঙে পড়েছিল সে। আচমকাই অতীত গ্রাস করেছিল তাকে। আর সেই ভেঙে পড়া মুহুর্তে কাঁধে নির্ভরতার ছোঁয়া হিসেবে পেয়েছিল রিচার্ডের হাত। তারপর তা মনে মনে সায় দিয়ে হোক কিংবা পরিস্থিতির চাপে পড়ে অসম্মতিতে হোক, অবশেষে সুচারুভাবেই তাদের বিয়েটা সম্পন্ন হলো।

নর্থ ভ্যাঙ্কুভারের নির্জনতায় ঘেরা একটি কাঠের তৈরি কটেজ। বাইরে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। পূর্বদিকের জানালাটা খোলা ছিল। সেখান থেকে বয়ে আসা শীতল হাওয়া ঘরে ঢুকে আলতো করে উড়িয়ে দিচ্ছিল একটি ডায়েরির পাতা। জানালার পাশে রাখা একটি টেবিল। টেবিলের ওপর যত্নে রাখা দুটি ডায়েরি। প্রথম ডায়েরিটি এলিজাবেথের৷ শেষবার যখন সে ডাক্তার দেখিয়েছিল, তখন ডাক্তারের পরামর্শেই এটি লিখতে শুরু করে সে। এলিজাবেথ ইতিমধ্যে তার অতীতের অনেক স্মৃতিই হারিয়ে ফেলেছে। যা সে ভুলে গেছে, তা পুনরায় মনে করার মতো সামর্থ্য বা শক্তি আর তার মস্তিষ্কের নেই। তাই ডাক্তারের কথামতো সে ডায়েরির পাতায় জমা করতে শুরু করেছিল তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা চিন্তাভাবনা, স্বপ্ন আর কল্পনার গল্প। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তার গায়ে হলুদের রাত থেকেই ডায়েরিটি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ ছিল। আর সেই হারিয়ে যাওয়া ডায়েরিটি বর্তমানে রয়েছে রিচার্ডের হাতে। মূলত এই ডায়েরির পাতাগুলো পড়েই রিচার্ড তাদের হানিমুন ট্রিপের প্রতিটি গন্তব্য নির্বাচন করছিল। এই মুহূর্তে সে নিবিষ্ট মনে বসে ডায়েরি থেকে তাদের পরবর্তী সফরের জন্য চারটি দেশ চূড়ান্ত করল—সুইজারল্যান্ড, রাশিয়া, করাচি এবং নেপাল।
অ্যাডভেঞ্চার এবং রোমাঞ্চপ্রিয় এলিজাবেথ তার ডায়েরিতে ভবিষ্যতের কিছু রোমাঞ্চকর আর ভয়ানক অ্যাডভেঞ্চারের তালিকা করে রেখেছিল। যার মধ্যে ছিল— ডাই কুইকলি, স্কাই ডাইভিং, বিচ ডেট, বন ফায়ার এবং আরও কিছু বুক কাঁপানো অ্যাডভেঞ্চার। এগুলো ছিল এলিজাবেথের ইচ্ছে। পূর্বের বাকি ইচ্ছেগুলোর মতোই, তার এই সুপ্ত ইচ্ছেগুলোও খুব শীঘ্রই সত্যি হতে চলেছে। রিচার্ড যেমন তার ডায়েরির পাতার পূর্ববর্তী প্রতিটি স্বপ্ন পূরণ করেছে, ঠিক তেমনি এগুলোও পূরণ করবে, যেকোনো মূল্যে। কোনো পাতায় স্বপ্নই অপূর্ণ থাকবে না।

রিচার্ড এবার টেবিল থেকে দ্বিতীয় ডায়েরিটি হাতে তুলে নিল। এই ডায়েরিতে সে তাদের একসাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি স্মৃতি পরম যত্নে লিখে রাখছে ও সংরক্ষণ করছে। প্রতিদিন এলিজাবেথ ঘুমিয়ে পড়ার পর এটিই হয়ে ওঠে রিচার্ডের রাতের প্রধান কাজ। শুধু লেখালেখিই নয়, ডায়েরির পাতায় পাতায় সে প্রতিটি সুন্দর মুহূর্তের ছোট ছোট ছবিও প্রিন্ট করে জুড়ে দেয়। আর এই বিশেষ ডায়েরিটির ওপর একটি নাম খোদাই করা আছ—এলিচার্ড।যার অর্থ রিচার্ড এবং এলিজাবেথের এক হয়ে যাওয়া দুটি প্রাণ।
হঠাৎ পাশ থেকে কেউ অপর ডায়েরিটি তুলে নিল। রিচার্ড পেন রেখে গ্রীবা ঘুরিয়ে পিছন ফিরে তাকাল। এলিজাবেথ প্রথমে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তার ডায়েরিটা দেখল। তারপর সরাসরি দৃষ্টিপাত করল রিচার্ডের অপ্রস্তুত সমুদ্র নীল চোখ দু’টোয়।

“আমার হারিয়ে যাওয়া ডায়েরিটি তাহলে এতোদিনে আপনার হেফাজতে ছিল?”
বলতে বলতে এলিজাবেথের নজর গিয়ে পড়ল অপর ডায়েরিটার ওপর। তাকানো মাত্রই তার চোখ দুটো অশ্রুতে ভরে উঠল। সে রিচার্ডের নিস্প্রভ মুখের দিকে তাকিয়ে প্রায় ফিসফিসিয়ে উঠল,
“আপনিও কি আমার মতোই ভয় পাচ্ছেন?”
রিচার্ড নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। তারপর এলিজাবেথকে টেনে নিয়ে ওর মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরল নিজের সুঠাম বুকে। লোকটার কণ্ঠস্বরে ভর করে ছিল ভারী আবেগ,
“আপনাকে হারানোর ভয় আমাকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়াবে, জান। এই ভয় থেকে ইহজন্মে আমার কোনো নিস্তার নেই।”
এলিজাবেথ রিচার্ডের বুকের শার্টের কাপড়টা খামচে ধরে আকুলভাবে বলল, “এজন্যই? এজন্যই আপনি আমাকে আমার পরিবার কিংবা বন্ধুবান্ধবদের সাথে যোগাযোগ করতে দিচ্ছেন না? আপনি চাচ্ছেন আমি আমার অতীত ভুলে গিয়ে ভবিষ্যতে শুধু আপনাকে নিয়েই বাঁচি, কেবল আপনাকেই মনে রাখি? সেজন্যই কি এই স্মৃতিগুলো এভাবে আগলে রাখছেন? আমাকে এতোটা মায়ায় ফেলছেন?”
রিচার্ড এবার আর এড়িয়ে গেল না। সবটুকু সত্য অকপটে স্বীকার করল, “আমি চাই আপনার পুরো মস্তিষ্ক জুড়ে শুধু আমিই থাকি। আর কেউ না, কেউই না। নট আ সিঙ্গেল পার্সন।”
রিচার্ডের কণ্ঠস্বর এতটাই শীতল শোনাল যে, সেই কথার তীব্রতায় এলিজাবেথের ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল, “মি. কায়নাত!”

রিচার্ডের বৃদ্ধাঙ্গুলটা ছুটে গিয়ে থামল এলিজাবেথের ঠোঁটের ডগায়, “হুঁশশ… কোনো শব্দ নয়। এটাই শেষ কথা। আপনার জীবনে শুধু আমিই থাকব। মন, মস্তিষ্ক—সব জায়গায় আমি, শুধুই আমি। হাজারে একজনকে ভোলা খুব সহজ, প্রিন্সেস। কিন্তু যেখানে কেউ থাকবেই না, তখন? গোটা এক পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আপনি এমন এক জায়গায় গিয়ে থাকবেন, যেখানে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। কেউ না। আপনার বিপদ আর
আশ্রয়—দুটোই আমি।”
এলিজাবেথ অবিশ্বাস্য চোখে রিচার্ডের দিকে তাকিয়ে রইল। এই লোকটাকে মাঝে মাঝে যেমন বড্ড অচেনা লাগে, তেমনই মনে হয় ভীষণ রহস্যময়। অবাধ্য মনটা প্রশ্ন না করে পারল না,

“এর কারণ কি শুধুই আমার রোগ? নাকি এর নেপথ্যেও কোনো গভীর রহস্য লুকিয়ে আছে, মি. কায়নাত?”
উত্তরের আশায় এলিজাবেথ কিছুক্ষণ চাতকের মতো চেয়ে রইল। কিন্তু কোনো প্রতিউত্তর এলো না। পরক্ষণেই সে ভাবল, লোকটা নিশ্চয়ই তার এই রোগের কারণেই এতটা ডেস্পারেট হয়ে আছে। সে হয়তো অযথাই মানুষটাকে সন্দেহ করছে। তা ছাড়া, এখন তো আর সেই ম্যাডবিস্ট নামক দুষ্ট রাজা নেই, যার হাত থেকে রিচার্ড তাকে লুকিয়ে রাখবে। রিচার্ডের ভেতরের এই অস্থিরতা বুঝতে পেরে এলিজাবেথের মনটা এক লহমায় মায়ায় ভরে গেল। সে নিজেও তো লোকটাকে ভুলে যাওয়ার ভয়ে ভেতরে ভেতরে প্রতিমুহূর্তে মরে যায়। তাহলে এই মানুষটাও নিশ্চয়ই তার মতোই ছটফট করে!
এলিজাবেথ আর দূরত্ব বজায় রাখতে পারল না। সে রিচার্ডের পায়ের পাতার ওপর পা রেখে ভর দিয়ে কিছুটা উঁচু হলো। রিচার্ডও মুহূর্তের মধ্যে দু-হাতে ওর কোমর জড়িয়ে ধরে ভারসাম্য বজায় রাখল। এলিজাবেথ দু-হাতে রিচার্ডের চিবুক ছুঁয়ে আদুরে কণ্ঠে বলল,

“প্রেমের শুরু হয় চোখ দিয়ে। বিশ্বাস করুন মি. কায়নাত, আমি আপনার ওই চোখের প্রেমেই পড়েছি। আমি দুনিয়ার সব কিছু ভুলে গেলেও, এই চোখ দুটো কখনোই ভুলতে পারব না।”
এতক্ষণে রিচার্ডের পাথুরে মুখে এক টুকরো নির্মল ভাব ফিরে এলো। একরাশ দুশ্চিন্তা আর চিরন্তন ভয় যেন কর্পূরের মতো উড়ে গিয়ে তার সমুদ্র-নীল চোখ দুটোতে গভীর তৃপ্তি এনে দিল। কালচে অধরের কোণে একচিলতে হাসি ফুটল৷ যা হয়তো তার চেনা রূপের সাথে পুরোপুরি মানানসই নয়, তাও তা ছিল ভীষণ সুন্দর।
রিচার্ড কিছুটা ঝুঁকে এসে এলিজাবেথের কপালে কপাল রাখল, তারপর নাকে নাক ঘষল। লোকটার পরবর্তী মতলব বুঝতে পেরে এলিজাবেথ চট করে দূরে সরে গেল। ঠোঁট কামড়ে বাচ্চাদের মতো মিষ্টি হেসে সে ছুটে গিয়ে একটা নেলপলিশ নিয়ে আসল। রিচার্ডও অবাধ্য আলতো হাসল। তাকে এখন বড্ড ভারহীন, শান্ত দেখাচ্ছে। সে আর কোনো জোরাজুরিতে গেল না। বাধ্য ছেলের মতো চেয়ারে বসে পড়ল। এলিজাবেথও চটজলদি ছুটে গিয়ে বিছানায় বসল এবং পা দুটো তুলে দিল রিচার্ডের উরুর ওপর। তারপর নেলপলিশ বাড়িয়ে দিল রিচার্ডের দিকে।

Born to be villains part 27 (2)

রিচার্ড একটা দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে হাসল। তারপর আলতো করে এলিজাবেথের মোমরাঙা পায়ে নেলপলিশ পরিয়ে দিতে লাগল। এলিজাবেথ মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে দেখছিল, এই গম্ভীর লোকটা কতটা ধৈর্য আর ভালোবাসা নিয়ে তার পায়ের নখগুলো রাঙিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ সব সৌন্দর্য চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে দূর থেকে কারোর বুকফাটা কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। সেই শব্দে শিউরে উঠল এলিজাবেথ।

Born to be villains part 29

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here