রাগে অনুরাগে পর্ব ২৬
সুহাসিনি ফাতেহা
অয়নের কণ্ঠ শুনে তুষার পেছন ফিরে তাকায়। ঠোঁটের কোণে দুষ্ট হাসি খেলা করছে। তুষার একবার ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল। অয়নকে সোজা বলল, ” হুমম চলছে তো! তোর ফুপাতো বোনকে বউ বানাবো ঠিক করেছি। প্রেমে টাইম নষ্ট করবো না।”
ঝিলিক লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছে। কানের পিঠে চুল গুঁজল লাজুক ভঙ্গিতে। মনে মনে ভাবল, কি বেহায়া লোক! সে তো তুষার ভাইকে খুব ভদ্র ভেবেছিল। উঁহু, মোটেও তা নয়। ভীষণ অভদ্র উনি!
তুষার অয়নকে কথাটা বলে আচমকা ঝিলিকের দিকে সামান্য ঝুঁকে গিয়ে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে একবাক্যে বলল,
“কি মিস বউ হবেন আমার? এই নিরামিষ পুরুষটার আমিষ বউ?”
সহসা ঝিলিকের বুকের ভেতরে ধুকপুক করে উঠল। এমন কথা সে মোটেও আশা করেনি। বিড়বিড় করে, অসভ্য লোক! বলে সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে গেলো।
অয়ন তুষারের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওর তো বিয়ে দিয়ে দিবে। সময় থাকতে তুই পাত্র হয়ে চলে আয়, নাহলে পরে হারাবি।” অয়নের বুকের ভেতরে ধক করে উঠল। সে একজনকে হারিয়েছে। তাই বোঝে হারানোর যন্ত্রনা।
তুষার অয়নের কাঁধে ভর দিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল,
“তোর ফুপিকে বলিস অয়ন। পরেরবার মেয়ের জন্য ছেলে দেখলে যেন আমার কাছেই আসে। তার মেয়েকে আমার পছন্দ হয়েছে। ঠকবে না!”
বিকেল চারটা ত্রিশ মিনিট । এখনো বৌভাতের জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে খান বাড়িতে। শেখ বাড়ির মানুষজন এসেছে প্রায় তিন ঘন্টা। ইতিমধ্যেই সকল মানুষদের সব রকম মেহমানদারি করা শেষ। তিতলি মা বাবা সবাইকে দেখে অনেক খুশি। বাবার পাশ থেকে উঠছেই না।
ফারাজ শ্বশুর বাড়ির লোকজনের সাথে দেখা করে উপরে গিয়েছে। শ্বশুর থাকায় তিতলিকে ডাকতে পারছে না তাই অয়নকে পাঠিয়েছে তিতলিকে গিয়ে বলতে, তোর ভাবিকে গিয়ে বল এক্ষুনি যেন রুমে আসে।
কিন্তু তিতলি জেদ ধরে গেলো না। মা বাবা সবাইকে পেয়ে ফারাজ কে পাত্তা দিচ্ছে না।
বেয়াদব বউ কথা শুনছে না দেখে ফারাজের মেজাজ খিটখিটে হয়ে আছে। সকাল থেকে একবারও হাতের কাছে পাচ্ছে না। শুধু পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কত পালাবে সেও দেখবে। রাতে যখন রুমে আসবে তখন সব সুদে আসলে উসুল করবে। ভেবে শক্ত মেজাজে ফারাজ আবার রুম থেকে বেরিয়ে এলো। বেয়াদব বউকে কয়টা কড়া কথা না শুনালেই নয়।
খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে দুই পরিবার ড্রয়িংরুমে খোশগল্পে মেতে উঠেছেন।
তিতলি বাবার পাশে বসে আছে। তৌসিফ শেখ মেয়ের মাথায় পরম স্নেহে হাত রেখে কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“শ্বশুর বাড়ি কেমন আম্মু?”
তিতলি মুচকি হেসে উত্তর দেয়, “অনেক ভালো আব্বু!”
তৌসিফ শেখ খুশি হলেন মেয়েকে খুশি দেখে। মেয়ের খুশিতেই তিনি খুশি।
আফজাল খান পাশ থেকে বললেন,
“ভালো না হয়ে উপায় আছে বেয়াই? আপনার মেয়ে তো এখন আমারও মেয়ে। আর মেয়ে কি বাবার কাছে ভালো না থেকে পারে।”
তৌসিফ শেখ ভাবলেন, মেয়েকে ভালো ঘরেই বিয়ে দিতে পেরেছেন। একমাত্র মেয়ে সবসময় চাইতেন এমন এক পরিবারে বিয়ে দিবেন মেয়ের কোনো কষ্টে থাকবে না। নিজের কাছে যেমন ছিলো ঠিক তেমনই থাকবে। কিন্তু তিনি চান মেয়েকে আজকে সাথে করে নিয়ে যেতে। তাই তৌসিফ বললেন,
“বেয়াই মেয়েকে এক রাতের জন্য নিয়ে যাবো ভাবছি। আপনাদের কোনো আপত্তি নেই তো?”
সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতেই কথাটা কানে এলো ফারাজের। চিবুক শক্ত তখনি। কিন্তু মুখ দেখে সে রেগে আছে নাকি তা বুঝা দায়। তিতলির দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দুজনের। তিতলি চোখ নামিয়ে নিলো। ভাবখানা এমন সে ফারাজকে দেখেনি। এমনিতে রেগে আছে এবার ফারাজের রাগ আকাশসম হলো। সোজা এসে শ্বশুরের পাশে বসল। তিতলি কেঁপে উঠল ফারাজের উপস্থিতিতে।
আফজাল খান ছেলেকে বসতে দেখে কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। ছেলের শক্ত মুখ দেখে বুঝে গেলেন কিছু। কিন্তু তাও বেয়াইকে বললেন,
“কোনো আপত্তি নেই বেয়াই। আপনার মেয়ে আপনি যখন ইচ্ছে নিয়ে যেতে পারবেন।”
তৌসিফ শেখ খুশি হয়ে বললেন,
“তাহলে তো কোনো কথায় নেই।” পাশ ফিরে ফারাজের উদ্দেশ্যে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন,
” জামাই তোমার কোনো আপত্তি নেই তো? তিতলিকে নিয়ে যাওয়াতে?”
ফারাজ খানের খুব আপত্তি! বিয়ে করার আগে তো ভেবেছে শাস্তি হিসাবে কখনো বাবার বাড়ি যেতেই দিবে না। কিন্তু শ্বশুরকে ভদ্রতা দেখিয়ে খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
“আমার কোনো আপত্তি নেই! নিয়ে যেতে পারেন।”
তিতলি এটা শুনে মনে মনে বলে, আপত্তি থাকবে না তো আমি চলে গেলে তো আরো খুশি হুহ!
ফারাজ শ্বশুরের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে চলে গেল। কোনদিকে গেল তিতলি দেখলোই না। সবাই রাজি তিতলিকে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তিতলি রাজি নেই। তার ফারাজকে ছেড়ে একমুহূর্ত ও থাকতে ইচ্ছে করবে না। তার সারাক্ষণ ভাল্লুকের কাছে থেকে জ্বালাতে ভালো লাগে। দূরে যেতে একদমই ইচ্ছে করে না। তিতলি সহসা বাবার হাত চেপে ধরে বলে উঠল,
“আমি যাবো না আব্বু!”
তৌসিফ শেখ থতমত খেয়ে গেলেন।
আফজাল খান শুনে ফেললেন সে কথা। বেয়াইও পুত্রবধুর উদ্দেশ্য একসাথে বললেন,
“দেখলেন বেয়াই মেয়ে আমাদের কতটা ভালোবেসে ফেলছে। আমাদের ছেড়ে যেতেই চাচ্ছে না কি বলো আম্মু কথাট সত্যি বললাম না?”
তিতলি লজ্জায় হাঁসফাঁস করছে। জিভ কাটছে বারবার। এ কথা বলায় নিশ্চয় তার মনের কথা আন্দাজ করছেন সবাই। ছিঃ এটা কি বললি? বলে তিতলি নিজেই সেখান থেকে উঠে চলে এলো।
বৌভাত শেষ হতেই প্রায় অনেকে বাড়ি চলে গেছেন। তিতলির বাড়ির সবাই চলে গেছে এক ঘন্টা হলো। এখন সন্ধ্যা সাতটা। তিতলি দীর্ঘক্ষণ পর রুমে এসে দরজা লাগিয়ে এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দিলো। এত্ত গরম আর শাড়িটা? এটা পরে থাকা যায় না। শাড়ির থেকে পিন খুলে বুক থেকে শাড়ি পেলে দিলো। সহসা কুচির থেকে পিন খুলে ড্রেসিন টেবিলের উপর রাখতেই আয়নায় ফারাজ কে দেখে চিল্লিয়ে উঠে,
“ভূততততততততত!”
ফারাজের রুমের বেলকনিতে একটা টেবিল আছে। সেখানে সে প্রায় বসে বসে ম্যাকবুক চালায়। রুমে আওয়াজ পেয়ে ম্যাকবুক বন্ধ করে ভেতরে আসতেই বেয়াদব বউকে এভাবে চিল্লাতে দেখে আচমকা দু কদম এগিয়ে এসে তিতলির মুখ চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,
“চুপ! একদম চুপ।”
মুখ চেপে ধরায় তিতলি ঠিকমতে কথা বলতে পারছে না।
“ভূভূ!”
“এভাবে ষাঁড়ের মতো চিল্লাচ্ছো কেন বেয়াদব!”
বলে ফারাজ তিতলির মুখ থেকে হাত সরাল।
ছাড়া পেয়ে তিতলি বড় বড় নিশ্বাস ছাড়ল। লজ্জায় খাটের নিচে দ্বিতীয় বারের মতো ঢুকে যেতে ইচ্ছে করছে।
“আ…আপনি…আপনি রুমে ছিলেন?”
“নাহ! মহাকাশে ছিলাম আমি।”
“ক…কই ছিলেন!”
ফারাজ কপাল কুঁচকাল! এমনিতে অনেক রেগে আছে বেয়াদব বউয়ের উপর । তিনবার ডেকেছে রুমে এসো, একবারও শুনে নি। এখন কি সে ছেড়ে দিবে? শক্ত মেজাজে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“একটু ছাড় দিয়েছি বলে অনেক সাহস বেড়ে গিয়েছে না ! আমি এতবার রুমে ডেকেছি আসলে না কেন?”
রাগে অনুরাগে পর্ব ২৫
পরমুহূর্তেই আয়নায় চোখ পড়তেই তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গিয়ে আটকালো অর্ধ উম্মুক্ত নারী কায়া’র পানে। সঙ্গে সঙ্গে কপাল গোছালো ফারাজ খান! তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একরাশ পরিবর্তন ঢেলে, সেথায় এবার ভর করল এক আকাশসম বিরক্তির ঝাঁঝ! সে কেমন বিরক্ততায় চোখদুটো খিঁচে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল অন্যত্র। মেয়েটার এহেন বোকামিতে অসন্তুষ্ট হয়ে মুহুর্তেই দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“শাড়ি খুলে আমাকে দেখানোর ইচ্ছে হলে আগেই বলতে পারতে, এভাবে খুলে দেখানোর প্রয়োজন ছিলো না বেয়াদব!”
