আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৮
ইসরাত জাহান দ্যুতি
-‘চোরের মতো এসে পেছনে দাঁড়িয়ে কথা শোনার স্বভাব মন্ত্রির সঙ্গে যায় না।’
-‘মন্ত্রির সঙ্গে না যাক। নাওফিলের সঙ্গে গেলেই হলো।’ জবাবটা বউকে দিয়েই নাওফিল ইয়াসিফের উদ্দেশ্যে ভুরু নাচাল। ‘তুই এখানে ঘাপটি মেরে আছিস কেন? তোকে খুঁজতে খুঁজতে ওদিকে যে সুন্দরীদের জুতোর তলা খসে যাচ্ছে।’
ভাইয়ের মজাকে পাত্তা না দিয়ে ইয়াসিফ সিগারেট ধরাতে ব্যস্ত হলো। এতক্ষণ কথায় ব্যস্ত থাকায় সুযোগটা পাচ্ছিল না। দুইটা টান দিয়ে রিসোর্টের আশপাশে চোখ বুলিয়ে বলল নাওফিলকে, ‘শাহীর স্বপ্নের রিসোর্টটা হয়েছে একের। স্মরণকে ঘু্রিয়ে দেখা।’ বলার পর দীধিতিকেও বলল সে, ‘যাও, একটু ঘুরেফিরে দেখো ওর সাথে। ভালোই লাগবে।’
না বলার ফুরসতটুকু মিলল না দীধিতির। তার আগেই নাওফিল, ‘তানিয়া এলে ভালোভাবে ট্রিট করিস কিন্তু।’ অনেকটা সতর্ক গলায় ইয়াসিফকে বলেই দীধিতিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকল রিসোর্টের পেছন দিকে। কিন্তু দীধিতি আরও কিছুক্ষণ কথা বলতে চেয়েছিল ইয়াসিফের সঙ্গে। ইয়াসিফ অবশ্য হাঁপ ছেড়েই উঠল তাতে৷ কারণ, অনেকক্ষণ ধরেই একটু একা সময় কাটাতে চাইছিল সে। নিজের সঙ্গে কিছু বোঝাপড়া করে চলেছে সে মাভিশা আসার পর থেকেই। মারিহামের মুখোমুখি হওয়ার কথা মনে পড়লেই কেমন এক দ্বিধাপূর্ণ অনুভূতি হচ্ছে তার। বেইমানির চরম সাজা মেয়েটাকে পোহাতে হবে, এর কোনো ভুল নেই। কিন্তু খটকাটা লাগছে অন্য এক জায়গাতে। এতগুলো দিনেও মাভিশার থেকে সে কোনো প্রকার তথ্য বের করতে পারেনি, মারিহাম কোথায় আছে সে ব্যাপারে। অথচ এখন সেই মাভিশা নিজে থেকেই ছুটে এসে মারিহামের হদিস জানিয়ে দিলো! এর পেছনে যত যুক্তিই খাঁড়া করাক তার কাছে, একটা যুক্তিও পরিপূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য লাগেনি তার। তবে কী গোপন অভিসন্ধি নিয়ে মাভিশা সাহায্যের হাত বাড়াল?
-‘পার্টি কি ইনজয় করছেন না, ইয়াসিফ শেখ?’
অপরিচিত এক নারীকণ্ঠে একটু চমকালোই ইয়াসিফ। গভীর চিন্তা থেকে বেরিয়ে সম্মুখে আবিষ্কার করল তানিয়াকে। ভু্রু কুঁচকে মনে করল সে, নাওফিলের বলা একটু আগের ইঙ্গিতপূর্ণ কথাটা। ইঙ্গিতটা ছিল, তানিয়ার থেকে ভদ্রতার সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখা। তখন সেটা নিছক মজা মনে হলেও এখন ভাবনায় পড়ল ইয়াসিফ। এই মেয়ে নাওফিলকে রেখে তার কাছে কেন এসেছে? আর তার কারণটা নিশ্চয়ই নাওফিল জানে। কিন্তু বলে গেল না কেন তাকে?
দীঘির কাছাকাছি আসতেই চারপাশটা দেখে দীধিতির মেজাজা ঠান্ডা হয়ে এসেছে। নারকেল গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হ্যামকটা হাওয়ার তোড়ে দুলতে দেখে সেটার কাছে এসে বলল, ‘আসার পথে গুগল সার্চ করেছিলাম লোকেশন জানার জন্য। তখন এখানকার ছবিগুলো দিনের আলোয় তোলা ছিল বলে ভেবেছিলাম, এডিটিং করা তাই বেশি গর্জিয়াস লাগছে। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে ছবির থেকেও সুন্দর আর রোমান্টিক রিসোর্টটা।’
-‘হু, রিসোর্টের মালিকও প্রচণ্ড রোমান্টিক’, নাওফিল গায়ের কোর্টটা খুলে হ্যামকের মাঝে ফেলে দীধিতির কাছে এসে দাঁড়াল। ‘আমি বুকিং দেওয়ার পর কল করেছিলাম ব্যাটাকে। তার সিকিউরিটির ওপর ভরসা করা যাবে কি-না, এ নিয়ে কথা বলার জন্য। ব্যাটা দেখতে সাদাসিধা, সরল লাগলেও পাক্কা একটা মিচকে শয়তান। বলে কী জানো?’
রহস্য গলায় ওর শেষ প্রশ্নটা শুনে দীধিতি ফিরে তাকায়। ‘কী বলে?’
-‘এই যে এখানে’ হ্যামকটা দেখিয়ে মিটিমিটি হাসে নাওফিল, ‘এখানে শুয়ে বউয়ের সঙ্গে যদি অর্ধেক বাসরও করতে চাই, নিশ্চিন্তে তা করতে পারি। কাকপক্ষীও এসে বিরক্ত করার সুযোগ পাবে না না-কি।’
-‘হাও ক্যাডিশ!’ চোখ আর নাক কুঁচকে ফেলে দীধিতি নাওফিলকেও কটাক্ষ করল, ‘তুমিই কি কম? মিচকে বদমাশ একটা! নিজের মতো মানুষের সাথেই কাজকর্ম তোমার।’
-‘এটা একদম মিথ্যে বললে’ মুহূর্তেই প্রতিবাদ গলায় জানাল নাওফিল, ‘আমার কাজ কী আর কাজের সূত্রে কোথায়, কাদের সাথে ওঠা-বসা করি। তা তোমার থেকে ভালো আমার বাপও জানে না এখন। আর শাহীর স্বপ্নের কাজের গণ্ডি আলাদ। সে ব্যাটা স্বভাবচরিত্রে আর কাজকর্মে উত্তরমেরুর হলে আমি দক্ষিণমেরুর৷ তবে সেও বোধ হয় পলিটিক্সে নামবে শোনা যাচ্ছে। সেসব আগামী নির্বাচনের প্রসঙ্গ। যাকগে, এসব টপিকস বাদ দিই। চলো ওখানে গিয়ে বসে হাওয়া খাই আর সুখ-দুঃখের দুটো আলাপ করি।’ বলেই দীধিতির কব্জি ধরে টানতে টানতে দীঘির শেষ সিঁড়িতে নেমে এলো সে।
একটু আগের চিটচিটে গরম ভাবটা গায়েব হতে শুরু করেছে দীঘির পাড়ের উতলা বাতাসে। দীধিতি মাথার হিজাব আর মুখের মাস্কটা চটপট খুলে নিলো। এখন আর কিছুই বলবে না নাওফিল, তা সে জানে।
শার্টের ওপরের বোতাম তিনটা খুলতে খুলতে নাওফিল হঠাৎ বলে উঠল, ‘মন চাচ্ছে তোমাকে নিয়ে প্রেম সাঁতার কেটে আসি।’
-‘আমাকে নিয়ে কেন? আমার তো ইচ্ছে করছে না।’
-‘তাতে কী’, শ্রাগ করে বলল নাওফিল। ‘গত রাতেও তোমার ইচ্ছে করছিল না। পরে তো ঠিকই ফূর্তি কুড়িয়েছ। এখনও তাই হবে, জানি। চলো, নেমে পড়ি।’ বলেই ফিচেল হেসে দীধিতিকে চোখ মারল সে, ‘পানিতে ওই ব্যাপারটা কেমন ইনজয়েবল, সেটার এক্সপেরিয়েন্স হয়ে যাবে।’
লম্পটদের মতো নাওফিলের ফিচলেমিটা দীধিতি ভালোই উপভোগ করছে। হঠাৎ ওর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল সে, ‘তো তুমি পানিতে নেমে ওটার এক্সপেরিয়েন্স পেতে চাও?’
বাতাসে আরও এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে দীধিতির সোনালী, কালো মিশেলের চুলগুলো। নাওফিল মুচকি হেসে সেগুলো তার কানের পাশে গুঁজে দিতে দিতে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘যদি চাও তুমি।’
-‘এত গেস্ট এখানে। আর তুমি এই খোলা জায়গাতে আমার সঙ্গ চাইছ?’
-‘উঁহু, আমার বউকে আমি সামান্য চুমুও কারও সামনে দিতে রাজি নই। তবে আমার বউ আমার মনের বাসনা পূরণ করতে চাইলে দেশে অথবা দেশের বাইরে মধুচন্দ্রিমাতে তাকে নিয়ে শুধু পানিতে কেন; লিভিংরুম, বাথরুম, ব্যালকনি, পুল সাইড, সব জায়গাতেই এক্সপেরিয়েন্স নিতে চাই।’
ঠোঁট চেপে দীধিতি হাসিটা সামলে মুহূর্তেই আকস্মিক এক ধাক্কা দিয়ে বসে নাওফিলকে। ঝপাৎ করে পানিতে পড়ে কয়েক পলের জন্য নাওফিল নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে। মুখ চেপে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে দীধিতি বেজায় হাসছে। হাসতে হাসতেই বলল, ‘মনে হলো হট হয়ে যাচ্ছিলে বেশি।’
-‘তাই ঠান্ডা করতে একাই পাঠালে?’ কোমর সমান পানিতে নাওফিল। কোমরে এক হাত রেখে সটান দাঁড়িয়ে থেকে বউয়ের উল্লাস দেখল কতক্ষণ।
-‘আমি যাইনি সেটা তোমার ভাগ্য। আমি নামলে তোমার ঘাড় চেপে ধরে পঞ্চাশবার চোবাতাম।’
-‘হুঁ, তা আর বলতে। চার বছরের শোধ এক রাতেই নিয়ে নিতে। জল্লাদ বউ কোথাকার!’ বলতে বলতেই পানি থেকে উঠে এলো নাওফিল। ‘এখন আমি সবার সামনে যাব কীভাবে?’
-‘কীভাবে আবার?’ নির্বিকার ঢঙে বলল দীধিতি, ‘কটেজ কি এমনি এমনি বুক করেছ? এক রাত থাকার ব্যবস্থা যেহেতু করেছ তাহলে ড্রেসের ব্যবস্থাও করে রেখেছ। বোকা না-কি আমি? জেনেশুনেই ফেলেছি।’
-‘মহৎ কর্ম সেরেছেন। চলুন তাহলে।’ বলে পা বাড়াল নাওফিল নিজের কটেজের উদ্দেশ্যে।
কিন্তু দীধিতি মোটেও এগোল না। ‘আমি যাচ্ছি না। চেঞ্জ তুমি করবে, আমি না।’
-‘ফিরে এসে তোমাকে কাঁধে উঠিয়ে লেকের মাঝখানে ছুঁড়ে ফেলব’, যেতে যেতেই বলতে থাকল নাওফিল, ‘এমনটা যদি না চাও তো দ্রুত এসো। লাস্টটাইম ওয়ার্ন করা হয়েছে তোমাকে।’
-‘কোনো ফাজলামি করতে চাইবে না একদম।’ বলতে বলতে পিছু নিলো সে নাওফিলের। তার আগে হ্যামক থেকে স্যুটটা নিতে ভুলল না।
ঘরের ভেতর এসে নাওফিল সরাসরি বাথরুমে ঢুকে পড়লে দীধিতি দরজাটা আটকে বিছানায় এসে বসল। বেডসাইড ক্যাবিনেটের ওপর এসি রিমোটটা নিয়ে সেটা অন করে পানি খেতে উঠে এলো। বাথরুম থেকে তখন গলা ছেঁড়ে ডাকল নাওফিল তাকে, ‘গিন্নি কি আছেন ঘরে?’
-‘আজ্ঞে কর্তামশাই। বলুন কী চাই?’
-‘ক্লজেট থেকে আমার পোশাক বের করো।’
পানির গ্লাসটা ক্যাবিনেটে রেখে দীধিতি ছোটো কাঠের আলমারির সামনে এসে দাঁড়াল। ভেতরে তিন সেট ফর্মাল পোশাক গুছিয়ে রাখা এক পাশে৷ এক রাত থাকা হবে বিধায় আগেভাগেই সব কিছুর ব্যবস্থা করিয়ে রেখেছে তাওসিফ। এমনকি দীধিতির প্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যবস্থাও বাদ যায়নি।
শার্ট আর প্যান্ট বের করতেই নাওফিল বেরিয়ে এলে দীধিতি বলল, ‘আমি তো নিয়ে আসছিলামই।’
-‘আমার সমস্যা নেই তো তোমার সামনে চেঞ্জ করতে।’ দুষ্টু হাসি মুখে নিয়ে এগিয়ে আসছে নাওফিল। দীধিতি হাতে ধরে রাখা শার্ট, প্যান্ট ওর দিকে ছুঁড়ে মারল তখন। তা ওর মুখের ওপর গিয়ে পড়তেই কপট রাগ দেখিয়ে দীধিতি জানিয়ে দিলো, ‘আজ ঘর অন্ধকার না কিন্তু। তাই সেদিনের কিকটা মিস গেলেও আজকেরটা জায়গামতো না লাগার সুযোগ নেই।’
দুষ্টুমি তবুও কমল না নাওফিলের। দীধিতির কাছে আসতে আসতে শার্ট, প্যান্ট বিছানার ওপর ছুঁড়ল সে। আর বলতে থাকল, ‘তুমি এখন ন্যাকা হয়ে গেছ কেন, স্মরণ? আগেই ভালো ছিলে। কী দারুণ পাল্লা দিতে আমার সঙ্গে! উফ্ ভাবতেই আবার গরম হয়ে যাচ্ছি।’ বলেই দাঁত বের করে হেসে ফেলল সে।
দীধিতি এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করল না বটে। নাওফিল এসে তাকে নিজের চওড়া, কঠিন, শীতল খোলা বুকের মাঝে চেপে ধরতেই এক ঝাঁক বিশ্রী গালি ছুঁড়ে দিলো। তা শুনে জিভ কামড়াল নাওফিল। সেই সাথে আস্তাগফিরুল্লাহ পাঠ করে কপট শাসন সুরে বলল, ‘আমি কখনও গালি-গালাজ করিনি তোমার সামনে। আর তুমি যদি এভাবে র্যাপ সং গাওয়ার মতো গালি-গালাজ করতে থাকো, এক সময় দেখা গেল রেগেমেগে আমার বাচ্চাকাচ্চার সামনেও বলে ফেলেছ। তখন কিন্তু খুব খারাপ হবে, স্মরণ।’
-‘আমার রাগ কমানোর বদলে তুমি বাড়িয়ে দিচ্ছ এমন জোরাজোরি করে।’ বেশ সিরিয়াস গলাতেই বলল দীধিতি, ‘আমার আরও সময় চাই তোমাকে মেনে নিতে। চার বছরের দূরত্ব আমি এত সহজে ভুলতে পারছি না। যত লজিকই থাক তার পিছে।’
-‘আচ্ছা ঠিক আছে’, নরম হয়ে এলো নাওফিলের কণ্ঠ। আদর সুরে বলল দীধিতিকে, ‘জোরাজোরি করব না আর। তোমাকেও সময় দেবো নতুন করে আমাকে মেনে নিতে। কিন্তু চার বছরের দূরত্ব তো আমিও সয়েছি, ধৈর্য সহ্য আমিও করেছি। এখন তোমাকে কাছে পেয়ে এভাবে কি দূরে থাকা সম্ভব আমার পক্ষে? আমি তো ইউনাক না, যে বউকে কাছে পেয়ে কোনো ফিলিংস কাজ করবে না। এইটুকু অন্তত আমার সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করো, সোনা।’ শেষে অনুরোধ ঝরে পড়ল ওর গলায়।
আর এভাবেই সর্বদা সরলমনা নারীদের মানিয়ে নেয় চালাকচতুর পুরুষেরা। করুণ করে তোলা নাওফিলের মুখটা আর ওর আকুল আবেদনে দীধিতি অনেকটাই গলে গেল। কপট ভার কণ্ঠে শুধু বলল, ‘বেশ, করলাম কম্প্রোমাইজ। কেবল এক্ষেত্রেই।’
-‘আমি কৃতজ্ঞ, আমার বেগম।’ মৃদুস্বরে বলে নাওফিল দীধিতির গালে ঠোঁটজোড়া এমন শক্তভাবে চেপে ধরে দীর্ঘক্ষণ চুমু খেলো যে, অস্ট্রেলিয়ান বংশদ্ভূত স্যামুয়েল কন্যার গাল সে চুমুর চিহ্ন ধারণ করল ভালোভাবেই। গোলাপী হয়ে ওঠা গালটাই তখন আরও একবার চুমু দেবার লোভ সামলাল না নাওফিল। পরবর্তীতে ওর চুমুর স্থান দীধিতির গাল থেকে গ্রীবাদেশ, গ্রীবাদেশ থেকে বক্ষদেশ পৌঁছতেই দীধিতি এক ধাক্কায় ওকে সরিয়ে মনে করিয়ে দিলো, ‘বাইরে আপনার ভাইয়ের বিয়ের রিসিপশন পার্টি চলছে, স্যার। আমরা একটু আগে পার্টি জয়েন করতে এখানে এসেছি।’
-‘ওহ, তাই না-কি? আমি তো জানতামই না।’ বিরসবদনে নাওফিল কৃতজ্ঞতা জানাল দীধিতিকে, ‘আমার ওবিডিয়েন্ট গানম্যানকে অসংখ্য ধন্যবাদ গুরুত্বপূর্ণ কথাটা জানানোর জন্য।’
-‘ইউ আর ওয়েলকাম, স্যার।’ নাটকীয়ভাবেই সামান্য নড করে বলল দীধিতি। এগিয়ে এলো সে ড্রেসিংটেবিলের সামনে। হিজাবটা হাতে নিয়ে নাওফিলকে তাগিদ দিলো, ‘রেডি হও ফাস্ট। তোমার দাদার ডাক পড়ল বলে।’
কথাটা বলতে না বলতেই দরজায় এক বাটলার এসে হাজির হলো। নক করল, ‘স্যার, ভেতরে আছেন?’
-‘ইয়েস।’ ঠান্ডা গলায় প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে জানাল নাওফিল।
-‘আপনাকে ডাকতে পাঠানো হয়েছে, স্যার।’
-‘টেল দেম আই উইল বি দেয়ার ইন ফিফটিন মিনিটস।’
-‘ওকে, স্যার।’
আয়নাতে নাওফিল দেখল দীধিতি হাসছে। তার ভবিষ্যদ্বাণী মুখে থাকতেই ফলে গেল কি-না৷ সরু চোখে সে হাসি দেখতে দেখতেই নাওফিল তোয়ালে পালটে প্যান্ট পরে শার্ট গায়ে চড়িয়ে নিলো। বোতাম না লাগিয়েই হঠাৎ সে দীধিতির পেছনে এসে তার কোমরের দুপাশ ছুঁলো। খুব আলগোছে চেপে ধরে পেছন দিকে টেনে এনে নিজের বুকের সঙ্গে আবারও মেশাল। আর নরম স্বরে বলল, ‘তোমাকে সব থেকে বেশি মানায় বোরকাতে। সেটা বিশ্বাস করো?’
জবাব দিলো না দীধিতি৷ হিজাবে পিন সেট করতে ব্যস্ত রইল। তা নীরবে কয়েক মুহূর্ত দেখে নাওফিল মাথা ঝুঁকিয়ে দীধিতির মাথায় চুমু খেলো। চুমুটা যদিও হিজাবে স্পর্শ করল। তবুও ভেতরে ভেতরে দীধিতি চনমনে হয়ে উঠল। বাইরে অবশ্য তা প্রকাশ করল না। শুদ্ধ পুরুষদের ভালোবাসার প্রগাঢ়তা যতখানি, তাদের দেওয়া কষ্টের বিশালতাও বুঝি ততখানিই৷ নয়ত দুটোর গভীরতাই কেন অন্তর কাঁপিয়ে দেবে?
-‘আমার বাবা স্যামুয়েল টেলর, তুমি তা নিশ্চিত হলে কী করে?’
নাওফিল শার্টের হাতায় কাফলিংক পরছিল। দীধিতি পাশে দাঁড়িয়েই তা দেখতে দেখতে প্রশ্নটা করে বসল হঠাৎ। প্রস্তুতই ছিল জবাবটা নাওফিলের কাছে। জানত, প্রশ্নটা না করে থাকতে পারবে না দীধিতি। কিন্তু আপাতত কাগুজে প্রমাণপত্র নেই যেহেতু, তাই বলল তাকে, ‘ঘুমানোর সময় তোমাকে একটা ফটো দেখাব। তখনই বুঝবে কীভাবে নিশ্চিত হলাম।’
-‘এর মানে কোনো ডিএনএ রিপোর্ট নেই? তুমি তো আমাদের বিচ্ছেদের দিন একটা ফাইল দিয়েছিলে আমাকে। বলেছিলে আমার জন্মপরিচয় আছে ওতে। ডিএনএ রিপোর্টের কথায় তো বলতে চেয়েছিলে মনে হয়।’
-‘মনে হয় না। আদতেই ডিএনএ রিপোর্ট ছিল ফাইলে। কিন্তু সেটা তোমার মায়ের সঙ্গে করা টেস্ট রিপোর্ট। তোমার বাবার নয়।’
-‘তাহলে সামান্য একটা ছবির মাধ্যমে কীভাবে নিশ্চিত হলে তুমি? না-কি তোমার দাদার কাছে আমার ভিত শক্ত দেখানোর উদ্দেশ্যে মিথ্যে বলে এলে?’ কণ্ঠে অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে দীধিতির।
-‘মিথ্যের আশ্রয় নিলে চার বছর আগেই কি নিতাম না? আর মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে কি আমার দাদার মতো মানুষকে দমিয়ে রাখা সম্ভব? সে কি খোঁজ নেবে না মনে করছ? অনেক সময় ছবিই কথা বলে, স্মরণ। অন্তত স্যামুয়েল টেলরের ছবি দেখলে তা তুমি বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে। যেমনটা মারিহামকে দেখে প্রথমবারেই বিশ্বাস করে নিয়েছিলে, সে আয়মান মেহরিনের মেয়ে, নাওফিল শেখের বোন।’ কথাটা বলেই টাই দীধিতির হাতে ধরিয়ে দিলো নাওফিল। ইশারা করতে হলো না সেটা পরিয়ে দেওয়ার জন্য। টাই পরাতে পরাতে দীধিতি জবাব দিলো, ‘মারিহামের চেহরায় তোমার আর তোমার মায়ের ছাপ অনেক বেশি। তুমি ওর ছবি দেখলেই বুঝতে।’
-‘সেরকম তুমিও স্যামুয়েল টেলরের ছবি দেখলেই বুঝবে। আর আমি আমার বোনকে স্বচক্ষে দেখব, স্মরণ। আব্বু আম্মুর মতো ওকে অন্তত ছবিতে দেখতে চাই না৷ কিন্তু তুমি চাইলেই তো তোমার বাবা-মার ছবি দেখতে পারো।’
-‘ধরে নাও, আমিও তাদের স্বচক্ষে দেখতে চাইছি বলেই আরও কয়েকটা দিন ধৈর্য ধরছি। ছবিতে চাই না দেখতে।’
টাই পরানো শেষ। বিছানার ওপর রাখা স্যুটটা এনে নাওফিলের হাতে ধরিয়ে দিলো দীধিতি। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘স্যামুয়েল টেলর কি সত্যিই উডসাইড অ্যানার্জির ডিরেক্টর?’
-‘একশো পারসেন্ট সত্য। তুমি আমাকে লাইয়ার ভাবা কবে থেকে শুরু করলে, স্মরণ? এই তথ্যটা পেয়েছি আমি গত বছর।’
-‘তাহলে তুমি তোমার বাবার জায়গাতে কেন বসতে চাইলে না? মাহতাব শেখের মতো ইন্টেলিজেন্ট বিজনেসম্যান অত বড়ো এক বিজনেস তোমাকে ছেড়ে দিয়ে আসতে বললেন কী করে?’
হেসে উঠল নাওফিল। ‘এটা মিথ্যে, স্মরণ।’
-‘আচ্ছা, তাই? আমিও তো বলি, মাহতাব শেখ এমন বোকামি করবেন কেন?’
-‘দাদা জানলে আমাকে কী ডিসিশন দিতেন তা আমি জানি না। তবে আব্বু জানলে জীবনেও ওই বিজনেসে আমাকে জড়াতে দিতো না।’
কপালে ভাঁজ পড়ল দীধিতির। ‘কী বলছ? বুঝলাম না। তোমার দাদা, আব্বু কেউ জানত না বলছ?’
-‘না, দাদা আজই জানলেন এই বিষয়ে।
আয়নাতে আপাদমস্তক দেখতে দেখতে নাওফিল জবাব দিলো, ‘উডসাইড অ্যানার্জি থেকে কোনো ডিরেক্টর বা সিইওর সাথে আমার কোনো যোগাযোগ হয়নি। তারা আমাকে কোনো অফারই করেনি। এ কথাটা বলেছিলাম স্রেফ তোমার সত্যটা মজবুতভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য।’ ছোটো করে কাটা চুলগুলো ব্রাশ করে নিয়ে সে দীধিতির মুখোমুখি দাঁড়াল এবার, পুরো ব্যাপারটা আরেকটু খোলাসা করে বোঝানোর জন্য। ‘ওই কোম্পানির চেয়ারম্যান আমার আব্বু ছিল এটা সত্য।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৭
যতদিন আব্বুর সঙ্গে তার বন্ধুদের যোগাযোগ ছিল, ততদিন সুইস ব্যাঙ্কে তার অ্যাকাউন্টে কোম্পানির লাভের অংশ জমা হত। কিন্তু আব্বু নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে সেটা তোমার বাবা বা আব্বুর বাকি তিন বন্ধু নিজেদের অ্যাকাউন্টেই জমা করেছে। বলা ভালো করে যাচ্ছে। দুনিয়াতে এমন উদারমনা কি আছে, স্মরণ? যে যেচে পড়ে ভাগিদারকে খুঁজে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার তার হাতে তুলে দেবে!’
