তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১১
আশফিয়া হিয়া
পুরো ড্রয়িং রুম জুড়ে কথার শব্দ শোনা যাচ্ছে। বাড়ির পুরুষরা নিজেদের মাঝে আলাপ – আলোচনা করতে ব্যস্ত। কখনো নিজেদের ব্যবসা নিয়ে। আবার কখনো দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ – আলোচনায় মগ্ন তারা। আরুর মামী ইরিনা বেগম বাড়ির গৃন্নীদের সঙ্গে কাজে হাত লাগিয়েছেন । ডায়নিং টেবিলে খাবার সাজাতে সাহায্য করছেন। তাদের আজ এই বাড়িতে আসার একটা উদ্দেশ্যও রয়েছে। তাদের বড় মেয়ে পিহু এইবার অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে তাই এ বাড়ির সকলকে আমন্ত্রণ করতে এসেছেন। আরুর মামা রেদোয়ান চৌধুরী কথায় কথায় রুদ্ধকে এটা সেটা বলছেন। তবে রুদ্ধর সেদিকে কোনো ধ্যান নেই। সে দাঁতে দাঁত চেপে কোনোরকম রাগ নিয়ন্ত্রণ করে বসে আছে। তার নজর ঠিক সামনের সোফার দিকে নিবদ্ধ। যেখানে আরু রোহান আর আহি বসে আছে। রোহান আরুকে প্রশ্ন করছে আর আরু সৌজন্যতার খাতিরে উওর দিচ্ছে। এখান থেকে উঠতেও পারছে না। এখন উঠে গেলে খারাপ দেখাবে না ব্যাপারটা। তবে রুদ্ধকে তার ভীষন ভয় করছে একা পেলে না জানি তাকে কি শাস্তি দেয়।
– ” মাএ গোসল করে এলে? ”
– ” জ্বী.. জ্বী
– ” তোমাকে খুব সিগ্ধ লাগছে দেখতে।” রোহান আরুর দিকে তাকিয়ে বলল।
আরুর খুব অস্বস্তি হলো বেশ কথাটা শুনে আড়চোখে রুদ্ধর দিকে তাকাল একবার রুদ্ধ তাদের দিকেই তাকিয়ে রাগে ফুঁসছে।
– ” তুমি তো আমাদের বাড়িতে একদমই আসো না আরু সেই কবে এসেছিলে লাস্ট। পিহু তোমাকে খুব মিস করে।”
– ” এবার যাবো। আপুর তো সামনে বিয়ে যেতে তো হবেই।” আরু খুশি মনেই বলল কথাটা।
– ” তাহলে আমাদের সাথেই চলো?” রোহান বেশ আশা নিয়ে বলল আরুকে। আরু আতঁকে উঠল।
– ” না না এখন কি করে যাবো আমার কলেজ আছে না?”
– ” ওহ হ্যাঁ তাই তো। তোমার পড়াশুনা কেমন চলছে।”
– ” আপনিও শুরু করবেন না প্লিজ। দেখা হলেই শুধু সবাই পড়ার কথা জিজ্ঞেস করে।” আরুর মুখের ভঙ্গিমা দেখে রোহান হেসে ফেলল।
– ” আচ্ছা বেশ তোমাকে আর পড়ার কথা জিজ্ঞাসা করছি না। খুশি?”
আরু উপর – নিচ মাথা দুলালো।
– ” আপু তো আস্ত একটা ফাকিঁবাজ পড়াশুনার নামই শুনতে পারে না।”
– ” তুই চুপ থাক নিজে যেন পড়ে উল্টে ফেলেছিস।”
– ” তোর মতো পরীক্ষায় আ.. বাকিটা শেষ করার আগেই আরু রোহানের উপর দিয়েই কিছুটা ঝুঁকে আহির মুখ চেপে ধরল।
অসাবধানতাবশত আরু খেয়াল করেনি রোহানের হাতের কনুইয়ের সাথে আরুর হাত স্পর্শ করল। রুদ্ধ এবার আর সহ্য করতে পারল না তৎক্ষনাৎ আরুর নাম ধরে ধমকে উঠল। রোহান এত সময় ধরে খুব কাছ থেকে আরুর মুখটা দেখছিল রুদ্ধর ধমক শুনে সে নিজেও চমকে উঠল। আরু ভয়ে কেঁপে উঠল বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। বাড়ির সবার নজর এবার রুদ্ধর দিকে পড়ল। আসলাম শেখ এবার অসন্তুষ্ট গলায় রুদ্ধকে বলল,
– ” কি হয়েছে ওকে এভাবে ধমকে উঠলে কেনো?”
রুদ্ধ কিছু বলল না হাড়হিম করা দৃষ্টিতে আরুর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আরু একবার সেই দৃষ্টি দেখে চোখ তোলার সাহস পায়নি।তার হৃদপিন্ড লাফাচ্ছে। রুদ্ধর থেকে জবাব না পেয়ে আসলাম শেখ বিরক্ত হলেন তার ছেলের মতো ত্যাড়া ছেলে তাদের পরিবারে আর একটিও নেই।
এবার মিতা বেগম বলে উঠলেন,
– ” নিশ্চয়ই আবার কিছু করেছে ছেলেটাতো আর এমনি এমনি ধমকে উঠবে না?”
– ” না মামি আরু তো কিছু করেনি আমরা তো কথা বলছিলাম জাস্ট। ”
আরু মনে মনে বলল,
– ” চেপে যা ভাই আমার বাঘকে আর খ্যাপাস না। ”
– ” আচ্ছা ঠিক আছে অনেক হয়েছে এবার সবাই খেতে চলো। ওদের ছোটদের ব্যাপার ওদেরই বুঝতে দাও। ”
রুমা বেগমের কথা শুনে কেউ আর মাথা ঘামালেন না সবাই খাবার টেবিলের দিকে হাঁটা দিল। রুদ্ধ শেষবারের মতো আরুর দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকাল। এরপরে বরফ শীতল কন্ঠে বলল,
– ” খেতে আয়।” বলেই গটগট করে হেঁটে চলে গেল। আরু আর কোনোদিকে না তাকিয়ে রুদ্ধর পেছনে ছুটল।
রোহান ওদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টিতে সন্দেহ স্পষ্ট। কেমন জানি লাগছে তার। মা – বাবার সাথে দ্রুত কথা বলবে ভাবল।
ডায়নিং টেবিলে নানা রকমের খাবারের সমাহার। বিভিন্ন ধরনের আইটেম দিয়ে টেবিল ভরিয়ে ফেলা হয়েছে৷ আরু এইবার খুশি মনে তার বানানো পায়েস ফ্রিজ থেকে বের করে টেবিলে রাখল। রুমা বেগম বললেন,
– ” আজ কিন্তু আমাদের আরু সবার জন্য পায়েস বানিয়েছে।” রুদ্ধর রাগটা এবার কিছুটা কমে এল।
মেয়েটা পায়েস রান্না করেছে। রান্নাটা নিশ্চয়ই তার জন্যই করেছে। তবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। আরু রুদ্ধর দিকে আড়চোখে তাকাল লোকটা কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখাল না।
– ” তাই নাকি আমার আম্মা রান্না করেছে। তাহলে খুব ভালোই হবে।” বাবার কথা শুনে আরু হাসল।
পায়েস দেখতে খুব সুন্দর হয়েছে সবাই খুব প্রশংসা করল। এরমাঝে রোহান ফট করে বলে ফেলল,
– ” পায়েস তো আমার খুব পছন্দের। আরু নিজের হাতে বানিয়েছে এখন তো আরো বেশি করে খেতে হবে।”
আরু একবার রুদ্ধর দিকে তাকাল এখনই এটা বলতে হলো। যার মুখ থেকে শুনতে চাচ্ছে সেইতো কিছু বলছে না।
– ” আরু তুইও বসে পড়। ”
– ” বসছি ছোট মা।”
সবাই যে যার মতো আগেই চেয়ারে বসে পড়েছে। রোহানের পাশের টেবিলটাই একমাএ খালি ছিল। আরু বসবে কি বসবে না ভাবছিল। এরমধ্যেই ছোট মায়ের কথা শুনে আরু রোহানের পাশের চেয়ারটাতেই বসে পড়ল। রোহানের পাশে বসেও তার আরেক জ্বালা হয়েছে। এই ছেলেটাকে তার যে কি করতে মন চাচ্ছে। এত মানুষ থাকতেও আরুকে এটা – সেটা এগিয়ে দিতে বলছে। আরুই বা কি করবে যতই হোক বাড়ির আতিথি সে তো না করতে পারে না। তবে সেসব রুদ্ধ বুঝলে তো? যতবার সে রোহানকে খাবার এগিয়ে দিচ্ছে ওমনি রুদ্ধ এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন তাকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। আরু আর তাকানোর সাহস করেনি। খাওয়া – দাওয়া প্রায় শেষের পর্যায়ে চলে এলে রুমা বেগম বাটিতে পায়েস বেড়ে দিল সবাই। রুদ্ধর সামনে দিতেই রুদ্ধ বলল,
– ” খাব না।” আরুর হাসি মুখটা দপ করে নিভে গেল।
– ” ওমা খাবি না কেনো? তোর তো এটা পছন্দের।”
– ” মুড নেই। “বলেই থমথমে মুখে উঠে চলে গেল।
আসলাম শেখ অতিষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন, এই ছেলের কখন কি হয় বোঝা মুশকিল। আরুও কোনোরকম খেয়ে উঠে গেল। তার ওপর রাগ করেই নিশ্চিত রুদ্ধ এরকম করলো? রুদ্ধ তো কখনই তাকে কোনো কিছু নিয়ে ফিরিয়ে দেয়নি।
আরু এক বাটি পায়েস নিয়ে রুদ্ধর রুমে উঁকি দিল। রুদ্ধ কপালে এক হাত চেঁপে শুয়ে আছে। আরু দরজায় দুটো টোকা দিল। রুদ্ধর কোনো রেসপন্স পাওয়া গেল না। আরু এবার দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। রুদ্ধর সামনে গিয়ে মৃদ্যু শব্দ করল। তাতেও রুদ্ধর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। আরু এবার সাহস করে রুদ্ধর চুলে হাত রাখল। রুদ্ধ ছুঁড়ে ফেলার মতো করে আরুর হাত ঝাঁড়া দিল। আরু নিজেকে সামলে কোনোরকম স্থির হয়ে দাঁড়াল। চোখটা ছলছল করে উঠল। রুদ্ধ বেড থেকে উঠে এসে আরুর গাল শক্ত করে চেঁপে ধরল।
– ” চুপ করে শুয়ে ছিলাম ভালো লাগছিল না? এখানে কেনো এসেছিস? স্পিক আপ! শেষের কথাটা চ্যাঁচিয়ে বলল। আরু কেঁপে উঠল।
– ” শান্ত হোন। আপনার জন্য পায়েস নিয়ে এসেছিলাম।”
– ” যার জন্য রেধেঁছিস তাকে গিয়ে খাওয়া। আমার কাছে কি?”। এবার আরুর গাল ছেড়ে শক্ত করে আরুর হাত চেঁপে ধরল। আরু শখ করে আজ কাঁচের চুড়ি পড়েছিল।এইগুলো রুদ্ধই তাকে মেলা থেকে কিনে দিয়েছিল। কয়েকটা চুড়ি ভেঙ্গে আরুর হাত কেটে গেল। রুদ্ধর সেদিকে খেয়াল হলো না। আরুকে দরজার সামনে টেনে নিয়ে বলল,
তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১০
– ” তুই না তোর মামার বাড়ি গিয়ে থাকতে চাস? আজই চলে যা তোকে যেন আজ আমি এই বাড়িতে না দেখতে পায়। মামার বাড়ি গিয়ে ওই রোহানের সাথে যতখুশি হাসিঠাট্টা করিস।”
আরু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সে হাসি ঠাট্টা কখন করলো? তার বলা সামান্য কথাটাকে কোথায় টেনে এনেছে এই লোক।
