তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১৩
আশফিয়া হিয়া
আরু নিচে এসে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মামীরা এবার বিদায় নেবে তারই প্রস্তুতি চলছে।রুদ্ধ এসে আরুর পাশে দাঁড়াল। আরুর এক হাত নিজের মুঠোয় নিল। আরু হকচকিয়ে গেল। বড়দের সামনে রুদ্ধ এভাবে হাত ধরছে। আগে তো কখনো এমন করেনি৷ কেউ দেখলে খারাপ ভাবতেই পারে। আরু সঙ্গে সঙ্গেই সামনের দিকে তাকিয়ে সবাইকে দেখে নিল। না কেউ এদিকে তাকিয়ে নেই যে যার কাজে ব্যস্ত। আরু ফিসফিস করে বলল,
– “কি করছেন?”
– ” কি করেছি?” রুদ্ধও তার মতো ফিসফিসে স্বরে বলল।
– ” হাত ছাড়ুন। সবাই আছে।”
– ” তো?
– ” এভাবে হাত ধরে রাখলে খারাপ ভাববে।”
রুদ্ধ একরোখা স্বরে জবাব দিল,
– ” ভাবতে দে।”
আরু আর কি করবে এখন বললেও কিছু শুনবে না। আরু ওড়নাটা পেছন থেকে টেনে তাদের হাতের ওপর দিয়ে দিল। এতে করে রুদ্ধ তার হাত ধরে আছে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। রুদ্ধ তার কান্ড থেকে হালকা হাসল তবে সেটা আরুর চোখে ধরা পড়ল না। তাদের এই কাহিনী কারোর চোখে না পড়লেও রোহানের চোখে ঠিকই ধরা পড়ল। তার ভেতরটা কেমন করে করে উঠল। তার আর বুঝতে বাকি নেই এদের মাঝে কিছু চলছে। তবুও হাসার চেষ্টা করে শেষবার বিদায় নিতে এল তাদের কাছে। রোহান ও রুদ্ধ দুজনের চোখেই এক প্রকার নিস্তব্ধতা খেলা করছে। দুজন চোখের দিকে তাকিয়েই হাত মেলাল। এবার আরুর দিকে তাকাল। আরু এবার জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াল। রুদ্ধ এখনো রোহানের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। রোহান একবার তাদের ধরে রাখা হাতের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল এরপর আরুকে বলল,
– ” আসছি আরু ভালো থেকো। এবার কিন্তু আমাদের বাড়িতে অবশ্যই যাবে।”
আরু হালকা হাসার চেষ্টা করল। না হেসে থমথমে মুখে কাউকে বিদায় দেওয়াটা কি ভদ্রতার ভেতর পড়ে? একটু তো হাসা যেতেই পারে। ভেবেই দাঁত বের করে একটু হাসল।
– ” আচ্ছা ভাইয়া।” ওমনি রুদ্ধর হাতে থাকা আরুর হাতে চাপ সৃষ্টি হলো। আরু রুদ্ধর দিকে তাকাল। ফিসফিসে স্বরে সুধাল,
– “কি হয়েছে?”
রুদ্ধ থমথমে মুখে বলল,
– ” এত ভদ্রতা দেখানোর প্রয়োজন নেই।
আরু হতাশার শ্বাস ফেলল। সামান্য বিষয় নিয়ে এমন করছে কেনো এই লোক। তার জন্য এত পসেসিভ? কই আগে তো এতটা প্রকাশ করেনি। হঠাৎ করে কি হলো? আরুর মনের ভেতরটা শীতল হয়ে গেল। রুদ্ধ তাকে ভালোবাসে। ভালোবাসে বলেই তো এরকমভাবে রিয়্যাক্ট করছে। মানুষটা স্বীকার না করুক তবুও তো কাজকর্ম দেখে সে ঠিকই বুঝতে পারে।
সন্ধ্যায় রুমা বেগম ছেলের জন্য কফি বানিয়ে রুমে নিয়ে এলেন। রুদ্ধ ঘুমিয়ে ছিল। রুমা বেগম ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে ডেকে তুললেন। রুদ্ধ মাকে দেখে হালকা হাসল। এরপর মাথা তুলে আলতো করে মায়ের কোলে মাথা রাখল।
– ” মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দাও। ” রুমা বেগম ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। রুদ্ধ আরামে আবার চোখ বুঝে ফেলল।
– ” আব্বা তোমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে এইবার কিন্তু বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে ভাবা উচিত।”
– ” সঠিক সময় এলে আমি নিজেই কথা বলবো মা।”
– ” সময়টা কবে হবে জানতে পারি?”
– ” আরোও কিছুদিন পর।” রুমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই ছেলের কোনো হেলদোল নেই। অন্যদিকে তার ভাইয়ের বাড়ি থেকে রুদ্ধর জন্য প্রস্তাব পাঠাতে চাইছে। সে কি করবে রুদ্ধকে বলেও লাভ নেই। তাই ভাবল কিছুদিনের মধ্যেই সব ঠিকঠাক করে ফেলবে।
আরু আহি রুহানি একসাথে বসে টিভি দেখছে। ইউটুব থেকে তারা টার্কিস ড্রামা দেখছে। তিন জনের মুখই হা হয়ে আছে। মিতা বেগম তাদের জন্য নাস্তা নিয়ে এল। টেবিলে রাখতে গিয়ে দুই মেয়ের হাতে ব্যান্ডেজ দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন।
– ” কি হয়েছে মা তোদের হাতে ব্যান্ডেজ কেনো?”
আরু আহি একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলল। দুজনের চোখাচোখি দেখে মিতা বেগম ক্ষেপে গেল,
– ” মা*রামা*রি করেছিস দুটে তাই না?”
– ” না না মারামারি করবো কেন? চুড়ি পড়েছিলাম না সেখান থেকেই হয়েছে।”
– ” ওমা সাবধানে থাকবি না। কতখানি কেটেছে। তোরও চুড়িতে হাত কেটেছে?
আহি একাধারে মাথা নাড়তে লাগল।
– ” আমি একটু হলুদ দিয়ে দুধ নিয়ে আসছি খেলে ভালো লাগবে।” আরু আর আহি মানা করল মিতা বেগম তাদের কথা শুনলে তো তিনি রান্নাঘরের দিকে ছুটেছেন।
মিতা বেগম যেতেই রুহানি দুজনের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকল,
– ” কেসটা কি বলতো ডালমে কুচ কালা হে?”
– ” নো কালা কালা সাব সাদা হেয়।” আরুর হিন্দি শুনে আহি হেসে দিল।
– ” ইশ্ হিন্দির কি ছিঁড়ি। ”
– ” এইসব বাদ দে আসল কথায় আয় কি লুকাচ্ছিস বলতো? ” বলেই সে ভ্রু নাচালো।
আরু ও আহি একে পরের সাথে চোখাচোখি করল এরপর দুজনে একসাথে বলে উঠল,
– ” আপুই তোমার গলার লাল দাগ টা কিসের গো?”
রুহানি সাথে সাথে ওড়না দিয়ে গলা ডেকে ফেলল।
– ” কি.. কিসের দাগ?”
– ” কালকে ভাইয়াকে দেখলাম ছাদে আসতে । ”
– ” ভুল দেখেছিস। তোদের কোনো কাজ নেই সারাদিন হা করে টিভি গিলিস যা পড়তে বস।
তাদের ধমকে ধমকে সে ওপরে চলে এল৷ বিচ্ছু দুইটা বেশি পেঁকে গেছে। আরেকজনেট জ্বালায় তো সে অতিষ্ট হয়ে পড়ছে। রুহানি যেতেই আরু আহি দুজনের জোরে হেসে দিল। তাদের হাসির শব্দ শুনে রুদ্ধ এসে তাদের ধমকে বলল বই নিয়ে তার রুমে যেতে সে আজ পড়াবে তাদের। আরু আহি মুখটা কাচুমাচু করে রুমে চলে গেল বই আনতে।
|
আরু ইয়াজ আহি তিনজন বিছানায় বই খুলে বসল। রুদ্ধ হাত মুখ ধুঁয়ে এক কাপ কফি নিয়ে এল। আরু আর ইয়াজকে হিসাববিজ্ঞান থেকে আর্থিক বিবরণী করতে দিল। আহিকে ম্যাথ করতে দিল। আরু অংকে মনোযোগ দিবে কি আড়চোখে বার বার রুদ্ধকে দেখছে। এইবার তাকাতেই দেখল রুদ্ধও তার দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে আছে। আরু ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। চুপচাপ অংকে মনোযোগ দিল। ইয়াজ মাথা চুলকাচ্ছে একটু পর পর এই আর্থিক বিবরণী কিছুতেই তার মাথায় ঢুকতে চায় না৷ সে আরুর খাতায় উঁকিঝুকি দিতে লাগল। আরু অবশ্য তার দিকে খাতা মেলে দিয়েছে সে আবার এই দিক থেক্র খুব দয়ালু। রুদ্ধ দুজনের কান্ড দেখে দুজনকেই ধমকাল। আরু মুখ বাঁকাল। ঢং! রুদ্ধ ইয়াজকে সুন্দর করে বুঝিয়ে আবার করতে দিল। রুদ্ধ এবার আরুর খাতা দেখছে ফাঁকে ফাঁকে কফিতে চুমুক দিচ্ছে আর আরু রুদ্ধকে দেখতে ব্যস্ত। আহি ইয়াজকে খোঁচা দিয়ে আরুর দিকে তাকাতে ইশারা করল। আরুকে রুদ্ধর দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে শয়তানি হাসল এরপর ওয়াশরুমে যাবার বাহানা দিয়ে পেছন থেকে টুপ করে দুজনের ছবি তুলে নিল। রুদ্ধ হিসাব মিলাতে ব্যস্ত তার অত খেয়াল নেই আর আরু সেও রুদ্ধর ধ্যানে।
আহির ম্যাথ করা শেষ হতেই সেও পানি খাওয়ার বাহানা দিয়ে উঠে গেল। ঘরে শুধু রয়ে গেল আরু ও রুদ্ধ। আহি যেতেই রুদ্ধ চোখ তুলে আরুর দিকে তাকাল। যেন সে তাদের ইচ্ছে করেই ছাড় দিল।
– ” কি সমস্যা?”
আরু দু দিকে মাথা নেড়ে কিছু না বোঝাল।
– ” কিছু না তো এইভাবে তাকিয়ে রয়েছিস কেনো? পড়ায় মনোযোগ দে।” রুদ্ধ ধমকে বলল।
তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১২
আরু তড়িঘড়ি করে বইয়ের দিকে চোখ ফেরাল। মনোযোগ দিয়ে ম্যাথের সমস্যা বের করতে লাগল। এবার রুদ্ধ তার দিকে অনিমেষ ক্লান্তিহীন চোখে তাকিয়ে রইল। আরুর হঠাৎ মনে হলো রুদ্ধ তাকে দেখছে। মেয়েদের এইক্ষেত্রে স্বরণ শক্তি খুবই প্রখর হয়। বিষয়টা বুঝতে পেতেই আরুর ঠোঁটে আপনাআপনি মুচকি হাসি ফুটে উঠল। রুদ্ধ তার হাসি দেখে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল।
