Home তোমার নামের রোদ্দুরে তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১৫

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১৫

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১৫
আশফিয়া হিয়া

সময় কখনো থেমে থাকে না। দেখতে দেখতেই রহমতের মাসের সমাপ্তি ঘটল। আজ চাঁদ রাত। আগামীকাল সারা দেশে ঈদ উদযাপন করা হবে। শেখ বাড়িতে বেশ শৌখিনতার সাথেই ঈদের আয়োজন চলছে। বাড়ির ছোটরা মিলে বাগানটা খুব সুন্দর করে লাইটিং করছে। প্রতিবছর ঈদেই তারা বাড়ির বাগান সাজিয়ে থাকে। আরু ও রুহি মিলে এক পাশ সাজাচ্ছে। অন্যদিকে ইয়াজ ও আহি মিলে অন্যদিকটা সাজাচ্ছে। রুদ্ধ তাদের ঠিক পেছনেই চেয়ারে বসে কফি খাচ্ছে। সেও এতোক্ষণ কাজ করেছে। আপাতত বসে কফি খাচ্ছে। কফির মগে চুমুক দিচ্ছে আর আরুর কাজ করা দেখছে।

রুহির ফোণে কল আসাতে সে অন্যপাশে চলে গেল। আরু বড় আম গাছটায় লাইটা বাঁধতে চেষ্টা করছে কিন্ত ডালটা উঁচু হওয়ায় সে কিছুতেই নাগাল পাচ্ছে না। পা উঁচু করে লাফিয়ে কিছুক্ষণ চেষ্টা করেও যখন সফল হলো না তখনই নিজেকে কারোও শক্ত বাঁধনে আবদ্ধ পেল। রুদ্ধ শক্ত করে তার কোমর জড়িয়ে ধরে উপরে তুলেছে। আরু এতটায় অবাক হয়েছে মুখ থেকে শব্দই বের হচ্ছে না। লজ্জায় গাল দুটো লাল হয়ে গেল। রুদ্ধ তাকে এভাবে কোলে তুলেছে। অস্বস্তিও হচ্ছে ভীষণ। সে তড়িৎ আশে পাশে তাকাল কেউ দেখছে না তো আবার। আহি ইয়াজ কাজ করছে কম নিজেদের পেছনে লাগছে বেশি তাদের এদিকে খেয়াল নেই কোনো। অন্যদিকে রুহানি ফারিশের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত তারও এদিকে কোনো খেয়াল নেই।

– ” কি করছেন? ছাড়ুন আমাকে কেউ দেখলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।”
রুদ্ধ তার ভীত স্বর শুনে চোখে চোখ রেখে বলল,
– ” কাউকে দেখাতে না চাইলে নিজের কাজ শেষ কর।”
– ” আপনি করে দিন না।”
– ” আমি পারবো না।” রুদ্ধ অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। আরু বাধ্য হয়ে সেভাবেই কোনোরকম লাইটটা গাছের মধ্য দিয়ে ঝুলিয়ে দিল। কাজ শেষ হতেই রুদ্ধ আরুকে নামিয়ে দিল। আরু হাফ ছেড়ে বাঁচল। মাঝেমাঝে কি হয় এই লোকটার সে নিজেই বুঝতে পারে না।

ঘড়ির কাটায় রাত নয়টা বাজছে। আরু রুহি আহি মিলে নাচের রিলস বানাবে তাই তারা রিলস দেখছে। গান সিলেক্ট করা হয়ে গেলে তারা তিনজন মিলে বাড়ির পেছনের বারান্দায় চলে এল। বারান্দাটা বিশাল বড় এবং খোলামেলা। রিলস অন করে যেই না তিনজন নাচা শুরু করল তখনি ইয়াজ মোবাইলের সামনে দিয়ে চলে গেল। সবাই বিরক্ত হয়ে ইয়াজের পিঠে ধুমধাম লাগল। আবার ক্যামেরস অন করতেই ইয়াজ দূর থেকে নাচের উল্টো – পাল্টা স্টেপ করে দেখাল। ওরা সেটা দেখে ফ্লোরে গড়াগড়ি দিয়ে হাসল। পরেরবার ক্যামেরা অন করার আগে আরু দুজকে ইশারা দিয়ে কিছু বোঝাল। এরপর ক্যামেরা অন হতেই তিনজন এক স্টেপ নেচেই ইয়াজকে টেনে নিয়ে এল। এরপর সবাই মিলে উড়াধুড়া নাচল। এভাবেই আনন্দের মাঝে তাদের সময়টুকু কেটে গেল।

রাতে খাওয়া – দাওয়ার পরে মেয়েরা মেহেদী নিয়ে বারান্দায় বসেছে। আরু নিজের এক হাতে নিজেই দিচ্ছে। পরে রুহানির থেকে অন্য হাতে দিয়ে নেবে। রুহানি আহিকে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে সু্যোগ পেলে ফারিশের সাথে কথাও বলছে। মেহেদী দিতে দিতেই আরুর হঠাৎ করে কিছু খেয়াল হতেই মেহেদী নিয়ে দৌড়ে চলে গেল। রুহানি আহি একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে ঠোঁট উল্টাল। আরু দৌড়ে গিয়ে রুদ্ধর রুমের সামনে দাঁড়াল। ঘরে উঁকি দিয়ে দেখল পুরো রুম ফাঁকা অথাৎ রুদ্ধ রুমে নেই। তার মুখে আধাঁর হয়ে এল। ধুর সে ভাবল কি আর হলোটা কি? তখনো তার মাথায় বেশ জোরে একটা টোকা পড়ল। অরু ঠোঁট উল্টে পেছনে তাকাতেই রুদ্ধকে দেখে সোজা হয়ে দাঁড়ল।

– ” চোরের মতো উঁকিঝুকি না মেরে নিজে ঢুক নাহলে আমাকে ভেতরে যেতে দে। ”
আরু সরে দাঁড়াল। রুদ্ধ তাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে চলে গেল। আরু ধীরে ধীরে রুমে প্রবেশ করল। রুদ্ধ আরুরদিকে সূক্ষ্ণ নজরে তাকাতেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
– ” মেহেদী অসম্পূর্ণ কেনো?”
– ” হাতে খুব ব্যাথা করছে তাই লাগাতে পারছি না।”
– ” তুই কোনো কাজ করেছিস বলে তো মনে পড়ছে না যে হাতে ব্যাথা হবে।”
আরুর মুখটা চুপসে গেল।এরপর মিনমিনে স্বরে বলল,
– ” রুহানি আপু আহিকে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে। আমার হাতেও প্রচন্ড ব্যাথা করছে।”
– ” এখন আমি কি করতে পারি?”
আরু তার অন্য হাতে থাকা মেহেদীর কোণ এগিয়ে দিল। রুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
– ” আপনি দিয়ে দিবেন?”
– ” আমি?” রুদ্ধর ভ্রু জোড়া শিথীল হয়ে এল।
– ” হুম।”
– ” আমি মেহেদী পড়াতে জানি না। তোর হাত নষ্ট হয়ে যাবে।”
– ” হবে না। আপনি ইউটিউব দেখে দিয়ে দিন না?”
– ” আয়।” আরুর মুখে হাসি ফুটে উঠল।

আরু বেড এ গিয়ে বসল। রুদ্ধ ইউটিউব থেকে খুব সিম্পেল একটা ডিজাইন বের করল। এরপর ধীরে ধীরে আরুর হাতে মেহেদী দেয়া শুরু করল। প্রথমবার হওয়ায় মেহেদী ধরায় তার হাত কাঁপছিল। আস্তে আস্তে সেটাও ঠিক হয়ে এল। আরু রুদ্ধর দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে রইল। রুদ্ধ খুব মনোযোগ দিয়ে আরুর হাতে মেহেদী পড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। তেমন ভালো না হলেও মোটামোটি হচ্ছে আরু তাতেই সন্তুষ্ট।

আজ পবিএ ঈদুল ফিতর। শেখ বাড়ির ছেলেরা সবাই সাদা রঙের পাঞ্জাবি – পায়জামা পড়ে নামাজে যাওয়ার জন্য তৈরী হয়ে নিচে নেমে এল। বাড়ির গৃহীনীরা সবার জন্য সেমাই নিয়ে আসল। সেমাই খেয়েই সবাই মসজিদের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। রুদ্ধরা বেরিয়ে যেতেই আরু বেলকনি থেকে এসে আবার বিছানায় গিয়ে ঢলে পড়ল। তারা তিনজন ঘুমিয়েছেই ভোর চারটায়। শুধুমাত্র রুদ্ধকে ঈদের এই সিগ্ধ রুপে দেখবে বলেই সে উঠেছিল।
আধঘন্টা পরেই রুমা বেগম সবকটা ধমকে ঘুম থেকে উঠাল ঈদের দিনে এভাবে ঘুমালে চলে একটু পরেই মানুষজন চলে আসবে।
তিনবোন সেজেগুজে বাবা- চাচাদের থেকে সালামি নিল। এরপর সোজা চলে গেল রুদ্ধর রুমে। রুদ্ধ শুয়ে ফোণ দেখছিল। ওদের দেখে উঠে বসল। সবাই সালামি চাইতেই বিনাবাক্যে সামালি বের করে রুহানি ও আহিকে দিল। বাকি রইল আরুরটা। রুদ্ধ ইশারা দিতেই আহি রুহানি রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আরু কোমরে হাত গুজে প্রশ্ন করল,

– ” আমার সালামি কোথায়?”
– ” সালাম করেছিস যে সালামি দিব?”
– ” ওরাও তো সালাম করে নি ওদের তো ঠিকিই দিয়েছেন।”
– ” আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই দিয়েছে। তুই সালাম করলেই সালামি পাবি।”
রাগে আরুর নাকের ফাঁটা ফুলে উঠছে। তার বেলায় সবসময় এমন করে এই লোকটা। তার মাথাতেও এইবার দুষ্টিমি চেপে বসল। সে হাত উঁচিয়ে জোরে সালাম দিল।
– ” আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া। আমার সালামিটা যদি বুঝিয়ে দিতেন।”
রুদ্ধ বিরক্ত স্বরে বলল,
– ” আরু।”
আরু হেসে ফেলল। এরপর বলল,
– ” সালামি দিলে দিন হয়তো আমি চললাম। “বলেই মুখ ঘুরিয়ে যেতে নিলে রুদ্ধ পেছন থেকে তার হাত টেনে ধরল। এরপর একহাতে কোমর জড়িয়ে ধরে। অন্য হাত পকেটে ধুকিয়ে এক হাজার টাকার ছয়টা নোট বের করে আরুর হাতে গুজে দিল। দুজন দুজনের দিকে বেশকিছু সময় তাকিয়ে রইল। আরুর মুখে কিছু চুল এসে পড়ছিল। রুদ্ধ সযত্নে তা হাত দিয়ে সরিয়ে দিল। কারোর পায়ের শব্দ কানে পৌছাতেই দুজন ছিটকে সরে এল। আরু দ্রুত গতিতে রুম থেকে বের হয়ে গেল। রুদ্ধ গিয়ে আবার বেড এ শুয়ে পড়ল।

ইয়াজ নামাজ পড়ে এসে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আহি সেই সুযোগেই ইয়াজের রুমে এসে মানিব্যাগ হাতাতে লাগল। সেখান থেকে যেই না হাজার টাকার নোট তুলবে ওমনি তার হাত কেউ চেপে ধরল। আহি ভীত হয়ে তাকাতেই ইয়াজকে দেখে ভয়ে মুখটা চুপসে গেল।
– ” তুমি ঘুমাও নি?”
– ” আমি তো জানি তুই আসবি চুন্নিগিরি করতে তাই তো ঘুমের ভান ধরে ছিলাম।”
ইয়াজ আহির হাত পেছন থেকে মুচড়ে ধরল।
– ” আহ্ ব্যাথা পাচ্ছি ছাড়ো।”
– ” আর আমার রুমে আসবি চুরি করতে? বল।”
শেষের কথা বলে হাত আরোও চেপে জোড়ে ধরল।
– ” না না। ছাড়ো প্লিজ।”

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১৪

ইয়াজ হাত ছেড়ে দিল। হাত ছেড়ে দিতেই আহি দৌড়ে দরজা পর্যন্ত দিয়ে আবার ফিরে তাকাল।
– ” আসবো। একশোবার আসবো। কি করবে করো।
ইয়াজ তার পিছু আসতেই সে দৌড়ে পালাল।

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here