Home উন্মাদনা উন্মাদনা পর্ব ৪৮

উন্মাদনা পর্ব ৪৮

উন্মাদনা পর্ব ৪৮
কায়নাত খান কবিতা

“ পরের বার দরজা লাগাইস বাটুলি! এতো সুন্দর সুন্দর দৃশ্য চোখ বেশি সহ্য করতে পারে না!’
দরজার পাশে হেলান দিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থেকে এতো ক্ষণ ধরে আনন্দীকে দেখছিল অভী। ঠোঁটের কোণে মৃদু এক দুষ্টু হাসি। আনন্দীর পিছনে ফিরে না তাকিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলল, “ আর নতুন করে কী দেখার রয়েছে। সবই তো আগে থেকেই দেখেছেন!”
অভী তড়িৎগতিতে এগিয়ে এসে আনন্দীর সামনে দাঁড়ায়। কপালে হালকা ভাঁজ ফেলে প্রতিবাদের সুরে বলল,
“এই বাটুলি! আজেবাজে অপবাদ দিবি না। আমি নেহাতই একজন ভদ্রলোক!”
আনন্দী ঠোঁট বাঁকিয়ে মৃদু বিদ্রূপের হাসি হাসে। মাথায় জড়ানো পেঁচানো তোয়ালেটা খুলে খাটের স্ট্যান্ডে মেলে দিতে দিতে নির্বিকার কণ্ঠে বলে,

“আপনি কতটা ভদ্রলোক, সেটা আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে, লম্বু?”
অভী অসহায় ভঙ্গিতে দু’হাত ছড়িয়ে দিল।
“সবকিছু তো পানির মতো পরিষ্কার, সোনামণি। ভিডিও পর্যন্ত দেখালাম। তারপরও এত অভিযোগ কেন? Why সোনামনি why?”
কথাটা শুনে আনন্দী কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল। তারপর গম্ভীর মুখে ধীরে ধীরে বলল,
“আমার এখনও পি’রি’য়’ড হয়নি, অভী। আর দু’বার না হয় আমি অজ্ঞান ছিলাম… কিন্তু চিলেকোঠার ঘটনাটা?”
অভীর মুখের হাসিটা মিলিয়ে যায়। সে এক পা এগিয়ে এসে আনন্দীর কব্জি আলতো করে ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে নেয়!
“চিলেকোঠায় কী হয়েছে, সোনামণি?”
আনন্দী তার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“আপনি খুব ভালো করেই জানেন।”
“জানি। কিন্তু আমি তো কিছুই করিনি।”
“করেননি? কিন্তু আপনার চোখ তো বন্ধ ছিল না।”
অভী হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“বন্ধ ছিল না ঠিকই। কিন্তু খেয়াল করে দেখ।আমার চোখ তোর ওপর ছিল না। এদিক-ওদিকই ঘুরতাছিল।”
আনন্দী গভীর নিঃশ্বাস ফেলে। বুকের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তিটা যেন তার চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। কড়া দৃষ্টিতে অভীর দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলে,
“আচ্ছা, সবই মেনে নিলাম। ধরে নিলাম আপনি নির্দোষ। আপনি কিছুই করেননি, আপনি একেবারে সাধুপুরুষ। কিন্তু আমার শরীরের সেই ব্যথা? সেটাও কি আপনাআপনি চলে এসেছিল? পনেরো দিন হয়ে গেল, পি’রিয়’ড মিস। এখন বলুন, আমি কাকে বিশ্বাস করব? আপনাকে… না-কি আমার শরীরের এই লক্ষণগুলোকে?”
কথাগুলো শুনে অভী কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বিরক্তি মিশ্র সুরে বলে উঠল,
“তোর এই মোটা মাথাটাকেই! আমি নাম মাত্র ডাক্তার নই, বাটুলি। কোন ওষুধ কীভাবে কাজ করে, সেটা আমার ভালো করেই জানা আছে। আর একবার ভিডিওটা ভালো করে দেখ।”
এই বলে নিজের ফোনটা আনন্দীর হাতে গুঁজে দিয়ে অভী আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

আনন্দীও নাছোড়বান্দা। যেহেতু সুযোগটা হাতে এসেছে, এবার ভিডিওর প্রতিটি মুহূর্ত সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখবেই। সত্যি-মিথ্যার ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত তার মন কোনোভাবেই শান্ত হবে না।
প্রায় ছয়বার একই ভিডিও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখল আনন্দী। প্রতিটি ফ্রেম থামিয়ে, প্রতিটি মুহূর্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করল। কিন্তু কোথাও এমন কোনো দৃশ্য তার চোখে পড়ল না, যা প্রমাণ করে অভী সীমা লঙ্ঘন করেছে। তবু প্রশ্নটা থেকেই গেল। তাহলে শরীরের এই অদ্ভুত ব্যথা এলো কোথা থেকে?
কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে বসে রইল সে। তারপর ধীরে ধীরে একটি খাতা আর কলম টেনে নিল সামনে। ভিডিওতে অভী ঠিক কী কী করেছে, কোন সময়ে কী ঘটেছে, সবকিছু পয়েন্ট ধরে লিখতে শুরু করল।একসময় হঠাৎ তার হাত থেমে গেল।চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল।প্রতিবারই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, সে যখন অবচেতন ছিল, তখন অভী তাকে কিছু একটা খাইয়ে দিচ্ছে।

আনন্দী ধীরে ধীরে মাথা তুলে ছাদের দিকে তাকায়। বুকের ভেতর যেন অদ্ভুত এক ভার জমে উঠেছে। দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে সে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।সোজা ডাইনিং টেবিলে এসে দাঁড়ায়।ওদিকে বিশাল স্ক্রিনে ফুটবল ম্যাচ চলছে। অভী খেলায় এমনভাবে ডুবে আছে, যেন পৃথিবীতে আর কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নেই। তার চারপাশে বসে আছে তার চিরচেনা সাঙ্গোপাঙ্গরা।
আনন্দীকে দেখতে পেয়ে তারা দ্রুত নিজেদের বসার জায়গা গুছিয়ে নেয়। অভীও আর দেরি না করে উঠে এসে আনন্দীর পাশের চেয়ারটাতেই বসে পড়ে।
এতগুলো অচেনা মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাওয়ার অভ্যাস নেই আনন্দীর। অস্বস্তিতে তার কাঁধ শক্ত হয়ে গেল। চোখ নিচু করে নীরবে খেতে শুরু করল সে।হঠাৎ কবি মুখভরা হাসি নিয়ে বলে উঠল,
“ভাবি মা, এত লজ্জা পাবেন না। আমরা তো আপনার ছেলের মতোই!”
কথাটা শুনে আনন্দীর খাবার প্রায় গলায় আটকে যাওয়ার উপক্রম হয়ে উঠে। কাশতে কাশতে একবার সবার দিকে তাকায় সে।

ছেলে?সামনে বসে থাকা একেকজন যেন আস্ত দামড়া মানুষ! মনে মনে হিসাব কষে তার নিজেরই হাসি পেল। সময়মতো বিয়ে হলে হয়তো এদের কারও কারও ঘরেই তার সমবয়সী মেয়ে থাকত।ঠোঁটের কোণে চাপা একটুখানি হাসি ফুটে উঠল।মাথা নেড়ে আবার খাওয়ায় মন দিল সে।
“শুনলাম, নোবেল নাকি আবার গেছে!”
ডিজে শহিদুলের কথায় স্মার্ট নোবেল খাওয়া থামিয়ে ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকায়। মুখভর্তি ভাত থাকায় সঙ্গে সঙ্গে কিছু বলতে পারল না সে। তাড়াহুড়ো করে ভাত গিলে নিয়ে চোখ রাঙিয়ে বলে উঠল,
“আমি আবার কবে জেলে গেলাম, মাঙ্গের নাতি?”
শহিদুল নির্বিকার ভঙ্গিতে গ্লাসের পানি থেকে এক চুমুক নিয়ে বলল,
“আরে তুই না, বলদ! তোর জমজ ভাই। তবে তুই গেলে অবশ্য আমি বেশি খুশি হতাম!”
“হালা!”

মুহূর্তেই ডাইনিং টেবিলজুড়ে হাসির রোল পড়ে যায়। সবাই খাওয়া থামিয়ে দুজনের বাকযুদ্ধ উপভোগ করতে লাগে। আনন্দীর ঠোঁটের কোণেও নিঃশব্দে একফোঁটা হাসি ফুটে উঠল। তবে সেই হাসি ছিল ক্ষণস্থায়ী, চোখের আড়ালেই মিলিয়ে গেল।
খাওয়া শেষ করে কিছুক্ষণ একা থাকার জন্য বারান্দায় এসে দাঁড়াল আনন্দী।রাত তখন অনেকটাই গভীর। আকাশের বুকজুড়ে ঝুলে থাকা গোল চাঁদটাকে আজ অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। এমন রাতের নরম আলোয় পৃথিবী এত শান্ত দেখায়, সেটা যেন আগে কখনও খেয়ালই করেনি সে।
নিঃশব্দে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ নাকে সিগা’রের তীব্র গন্ধ এসে লাগে তার। বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে পাশ ফিরে তাকায় সে।
“সব সময় ধূ’মপান করাটা কি খুব জরুরি?”
অভী ঠোঁটের কোণে অলস হাসি টেনে বলল,
“এটা সিগা’রেট না, বোকাচন্দ্র। সি’গার।”
“তফাতটা কী?”

“সিগা’রেট খায় সাধারণ মানুষ। আর সিগার… সেটা আমার মতো খানদানি রিচ পার্সনদের জন্য।”
আনন্দী ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“গ্যারেজের মালিক আবার রিচ পার্সন?”
অভী ভ্রু নাচিয়ে উত্তর দেয়,
“সাধে কী তোরে বোকাচন্দ্র বলি। তুই আস্ত একটা বোকা চন্দ্র।’
“কচু!” অভীকে পাশ কাটিয়ে ঘরের দিকে এগোতেই হঠাৎ তার কব্জিটা শক্ত করে ধরে ফেলে অভী।এক টানে তাকে থামিয়ে সিগা’রটা মাটিতে ফে’লে পায়ের নিচে পি:ষে দেয় সে। তারপর শান্ত স্বরে বলল,
“নতুন বউকে কিছু না কিছু উপহার তো দিতেই হয়।”
আনন্দী তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
“সারাজীবনের কষ্টই তো দিয়ে দিয়েছেন। এর চেয়ে বড় উপহার আর কী হতে পারে?”
কথাটা শুনে অভীর মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“কষ্ট শুধু আমি দিইনি, আনন্দী। তুইও কম দিসনি। আমি জানি, তুই স্নেহার কথায় পড়েছিলি। এটাও জানি, তুই নিজের থেকে কিছু করিসনি। কিন্তু… সাক্ষী? ওটা তো মিথ্যা ছিল।”
কথাগুলো বাতাসে ঝুলে রইল।আনন্দী কোনো উত্তর দিল না। নীরবে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে বলল,

“একদিন আপনি নিজেই বলেছিলেন, আপনার জীবনে যা ঘটেছিল, তার সবটাই আপনার নিজের ইচ্ছেতে হয়েছিল। সেই হিসাব করলে আমার অপরাধও আপনার চেয়ে বেশি নয়… হয়তো কমই।”
অভী মৃদু মাথা নাড়ল।
“কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু পরিকল্পনা তো ভিন্ন ছিলো।”
আনন্দী আর কিছু বলল না।সে জানে, তার ভুল ছিল। নিজের অপরাধ অস্বীকার করার উপায় নেই।তবু অভীও কি পুরোপুরি নির্দোষ?শুধু তাকে বিয়ে করার জন্য যেভাবে একের পর এক ঘটনা ঘটিয়েছে, সেটাও কি সঠিক ছিল?
নীরবতার মাঝেই অভী ছোটো একটি বাক্স সামনে ধরে। বাক্স খুলে খুব সাধারণ নকশার একটি সোনার ব্রেসলেট আলতো করে আনন্দীর হাতে পরিয়ে দেয়। আনন্দী চোখ তুলে তাকায় অভীর পানে।
অভী কোনো ব্যাখ্যা করলো না, আর না কোনো বাড়তি কথা বললো।শুধু একবার আনন্দীর চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

“তোর সেই বান্ধবী না প্রেগন্যান্ট ছিল? তাহলে এত বছরেও বাচ্চা হলো না কেন? বারো মাইসা পেট না-কি ?”
অভী ঘরের ভেতরে পা রাখতেই আনন্দীও আর এক মুহূর্ত দেরি করে না। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে তার পথ আটকে দাঁড়ায়। স্থির দৃষ্টিতে অভীর চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আপনিই তো বাচ্চাটাকে পৃথিবীতে আসতে দেননি, অভী। তাই আজ সে নেই।”

উন্মাদনা পর্ব ৪৭

কথাটা শুনে কয়েক মুহূর্ত অভী নির্বাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সে। সেই হাসিতে ছিল বিস্ময়, তাচ্ছিল্য আর অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাসের মিশেল।হাসি থামিয়ে সে ধীরে ধীরে আনন্দীর কাছে এগিয়ে এল। আলতো করে তার গাল টিপে দিয়ে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে বলল,
“অন্যের খাওয়া মাল আমি খাই না, বোকাচন্দ্র।”

উন্মাদনা পর্ব ৪৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here