রাগে অনুরাগে পর্ব ৩০
সুহাসিনি ফাতেহা
তিতলি পা টিপেটিপে দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে বড্ড সতর্কতায় রুমের ভেতরে উঁকি দিলো। বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য শাশুড়ির হাতে শাড়ি পরে সেজেগুজে এসেছে। এর মাঝে আরো কয়েকবার রুমে আসলেও তখন ফারাজ বাড়িতে ছিলো না। দুপুরে কোথায়ও বেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে সে ড্রয়িংরুমে ফারাজের কন্ঠ শুনেছে। তাহলে এখন রুমে দেখছে না কেন? ফারাজকে রুমে না দেখে তিতলি আনন্দ সমেত নাচতে নাচতে ভেতরে ঢুকলো।
ব্যাগে নিজের পার্সোনাল জিনিসপত্র গুছিয়ে ঠোঁট উল্টে আনমনে বিড়বিড় করে বলল,
“নিজের তোয়ালে খুলে পরে গেছে, মনে হচ্ছে সব আমার দোষ আমার! কেমন করে তাকায়, যেন আমি ওনার তোয়ালে টেনে খুলে দিয়েছি! হুহ!ভাল্লুক কোথাকার!”
বলে পেছনে ফিরতেই চমকে উঠল তিতলি। একদম সম্মুখে দাঁড়িয়ে ফারাজ। তিতলি যত্রতত্র নুইয়ে গেল। ভয়ে প্রাণ শুকিয়ে যাওয়ার যোগাড় বেচারির। চোরা চোখে একবার তাকাতে গিয়ে নাগাল পেলো ফারাজের শক্ত চিবুকের। তিতলি দুরুদুরু চিত্তে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইল। গুনে গুনে মাত্র একখানা কদম বাড়াল সপ্তদশী, আর ওমনি পেছন থেকে তার নরম তুলতুলে হাতের কব্জিতে টান পড়ল ভীষণ। তিতলি থমকায়। ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলল অলক্ষ্যে। মনে মনে আল্লাহ, আল্লাহ করে নিজের হাত টানাটানি করা শুরু করল।
ফারাজ হাতের বাঁধন আরো দৃঢ় করল। রাগ তরতর করে বাড়ল। এক ঝটকায় বউকে নিজের সামনে এনে দাঁড় করালো তক্ষুনি। তিতলি চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিয়েছে ততক্ষণে। ফারাজ বা হাতে তিতলির কোমর পেঁচিয়ে এনে নিজের সাথে চেপে ধরে। ডান হাতে তিতলির নরম চোয়ালখানা উঁচু করে কিছুক্ষণ অমত্ত চেয়ে রইল সে। পরপরই শক্ত কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো,
“সমস্যা কী তোমার? বারবার আমার কথার অবাধ্য হচ্ছো কোন সাহসে? ভয় লাগে না আমায়?”
তিতলির বুক কেঁপে উঠল থরথর করে। ওই সময় তো খোঁচা মারা কথা শুনিয়ে পালিয়েছে। সে কি ইচ্ছে করে শুনিয়েছে? যা হওয়ার হোক! এমনিতে তো এখন ভাল্লুকের সাথেই তাকে বাপের বাড়ি যেতে হবে। কামড় দিয়ে দৌড় দিলে যদি পরে যেতে না দেয়। তাই কাঁপা কাঁপা গলায় শুধায়,
“আমার লজ্জা, লজ্জা লাগছে, আপনার সামনে দাঁড়াতে তাই! আপনার বুঝি লজ্জা করে না?”
ফারাজের কপাল কুঁচকে গেল এমন কথা শুনে। জিভের ডগায় গাল ঠেলে, দৃষ্টি করল তীক্ষ্ণ। পরক্ষণেই তিতলির কোমর ছেড়ে দিয়ে এবার চেপে ধরলো কোমল দুবাহু। অসামন্য পায়ের গতিতে তক্ষুনি পাশের দেওয়ালের সাথে চেপে ধরল।
বড্ড শক্ত করে ধরেছে। তিতলি ব্যাথা পেল। তাও চুপ করে রইল। ফারাজ সামান্য ঝুঁকে এসে বাঁকা কন্ঠে বলল,
“আমার জানামতে লজ্জা বলতে এমন কোনো ওয়ার্ড এখনো আমার ডিকশনারিতে আসে নি। কজ তুমি আমার বিয়ে করা বউ! আমার সামনে তুমি ছিলে, অন্য কেউতো ছিলো বলে আমার মনে হচ্ছে না?”
তিতলির বুক ধুকপুক করছে। এবারও আগের মতো নিষ্পাপ জবাব দিলো,
“আপনার কোনো লজ্জা নাই থাকতে পারে। আমার…আমার অনেক লজ্জা লাগে।”
তিতলির কথা শেষ হওয়ার পরপরই ফারাজ কপট রাগ দেখিয়ে হিসহিসিয়ে শুধালো,
“এত লজ্জা কই থেকে আসে তোমার? যে আমার সামনেই দাঁড়ানো যাবে না? ফারদার রুমে আসার আগে তোমার সব লজ্জা বাইরে রেখে আসবে। নয়তো তোমার কোনো লজ্জার ধার ধারবো না আমি।”
তিতলি নিশ্চুপ। ফারাজ বলল,
“কলেজে যখন আমার পেছনে পেছনে ঘুরছিলে তখন লজ্জা করে নি?”
তিতলি দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট ঈষৎ কামড়ে ধরল এবার। জেদ ধরে রেখে নিচু কণ্ঠে স্বীকারোক্তি দিলো,
“না করেনি। আপনাকে আমি ভালোবাসি তাই ঘুরেছি। সবসময় আমি আপনার পেছনে ঘুরবো।
তাতে আপনার কী? হুহ!”
বলে তিতলি ফারাজের হাত দুটো সরাতে চাইল নিজের বাহু থেকে। ফারাজের সুদর্শন মুখের ধারালো নেত্রদ্বয় কেমন গভীরভাবে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এভাবে তাকাচ্ছে কেন? সে শুকনো ঢোক গিলল। ভয় পেয়ে চোখ মুখ খিঁচে বলল,
“আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে তো!”
ফারাজ সে-কথা আদৌ শুনলো কিনা কে জানে। তিতলির মুখে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাথাটা সামান্য নিচু করে নিজের মুখ এগিয়ে আনলো মুখের একদম কাছে। ফারাজের নেওয়া প্রতিটা উষ্ণ নিশ্বাস যতবার তিতলির মুখে পড়ছে ততবার সে চোখজোড়া খিঁচে বন্ধ করে নিচ্ছে। সে হাঁসফাঁস করে দুহাতে ফারাজের বুক চেপে সরাতে চাইল। কিন্তু বালাইষাট। পাহারসম বলিষ্ঠ পুরুষ তো সরলোই না উল্টো তিতলির নরম গালে নিজের খোঁচা খোঁচা দাড়িতে আবৃত চোয়ালখানা আলতো করে ছুঁয়াল। তিতলি হালকা ব্যাথা পায় দাঁড়ির খোঁচাতে। কেঁপে উঠে সমস্ত কাঁপা দেহ। ফারাজ নিজের নাক,গাল ঘষছে তিতলির পুরো মুখে। তা ধীরে ধীরে নেমে এলো গলায়। পরপর গলায় নরম কিছুর স্পর্শে তিতলি থরথর করে কেঁপে উঠে। ফারাজের পুরুষালী নরম ঠোঁটের বিচরণে তিতলি নিশ্বাস আটকে নিলো।
হাঁসফাঁস করে কোনোরকমে বলল,
“ছাড়ুন প্লিজ!”
ফারাজ তখন নিজের কাজে ব্যস্ত। ডিস্টার্ব পেয়ে গলায় মুখ গুঁজে রেখে বলল,
“উমমমম! সবসময় ছাড়ুন ছাড়ুন বললে ধরবো কখন বেয়াদব? নির্লজ্জ বলতে পেরেছো, এখন সহ্য করো আমায়। লেট মি ডু মা’ই ওয়ার্ক!”
বলে ফারাজ আচমকা তিতলির ঘাড়ের বড্ড কাছে মুখ নিয়ে কামড় বসিয়ে দিলো। কামড়টা জোরে ছিল না তবে তিতলি ব্যাথা পেলো। নাকমুখ কুঁচকে মুখ ফস্কে বেরিয়ে এলো,
“আহহ!”
বেয়াদব বউকে এমন আওয়াজ করতে দেখে ফারাজ ঘাড় থেকে মুখ তুলে দুষ্ট কন্ঠে ফিসফিস বলল,
“নেগেটিভ আওয়াজ করছো কেন? আমিতো এখনো কিছুই করিনি।”
তিতলি সরু নাকের পাটাটা সামান্য ফুলিয়ে বলল,
“আপনি..আপনি আমাকে কামড় দিয়েছেন কেন?”
“এটা তোমার শাস্তি। আমার কথা না শোনার, বারবার অবাধ্য হওয়ার।”
তিতলি চুপ করে রইল। ফারাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ব্যাথা পেয়েছো?”
তিতলি ত্যাড়া জবাব দিলো,
“না আরাম পেয়েছি!”
ফারাজ তিতলির ত্যাড়া কথায় বিরক্ত হয়ে তৎক্ষণাৎ হাতের জোর বাড়াল। এবার ঠোঁটের কাছে মুখ এগিয়ে আনতেই হঠাৎ দরজার কাছ থেকে পায়ের আওয়াজ আসে। ফারাজ সাথে সাথেই তিতলিকে ছেড়ে দেয়। ছকিনা খাতুন বুড়ো মানুষ চোখে কম দেখলেও কিছু আন্দাজ করেছেন। তিতলি ছাড়া পেয়ে লজ্জায় মাথা নিচু করে তক্ষুনি দৌড় দিলো। ছকিনা খাতুন পান চিবুতে চিবুতে নাতবউয়ের যাওয়া দেখে নাতিকে রসিকতা করে বললেন,
“নাতবউ’ডা কি সরম পাইলো। আমার এহন আইয়া পরা ঠিক অয় নাই। দরজা কান লাগাইয়া রাইখবি না। তুই এহনো দাঁড়াইয়া আছিস ক্যান? শ্বশুর বাড়িত কি রাইতে যাইবি নে?”
ফারাজ কপাল কুঁচকে তাকায় নানির দিকে। অসময়ে রসিকতা মোটেও পছন্দ হলো না। তার সবেমাত্র জাগ্রত হওয়া ফিলিংটা দিয়ে বউকে কাবু করতে চেয়েছিল। অনেকটা সফলও হয়েছিল কিন্তু হঠাৎ করে নানির এন্ট্রিটা তার উঠতি রাগের কারণ হলো। দরজাটা লাগিয়ে রাখলে আজ আরেকটু সময় নিয়ে এই বউকে নির্লজ্জতা কাকে বলে বুঝাতো না সে। এখন তো সবে শুরু এ বউকে সে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিবে না? প্রতিদিন একটা একটা করে বুঝাবে না তার নির্লজ্জাতা। নানির কথা শুনে তৎক্ষণাৎ রুম থেকে ধুপধাপ পা ফেলে বেরিয়ে আসলো।
ঘড়িতে সন্ধ্যা ছয়টা।
শেখ বাড়ির একমাত্র আদরের মেয়ে সহ বাড়ির জামাই আসবে সে আনন্দে বাড়িতে অনেক তোড়জোড় চলছে। আলেয়া শেখ মেয়ের পছন্দের সব খাবার রান্না করেছেন। সাথে জামাই আদরের সব আইটেম তো আছেই। ড্রয়িংরুমে রমরমা আড্ডার শেষ নেই। তিতলি আসবে শুনে তিতলির খালা ইশা বেগম এসেছে আজ। বিয়ের সময় আসতে পারেনি। কারণ তিনি বিদেশ ছিলেন স্বামীর সাথে।
ড্রয়িংরুমে বসে আছেন ফরিদা বানু। আলেয়া শেখ আর তিতলির খালা ইশা বেগম কিচেনে নাস্তা পানি তৈরি করছেন। ফরিদা বানু ছেলেকে যেতে দেখে বললেন,
“নাতিন এহনো আইতাছে না ক্যান? ফোন কইরা দেখ তো! আইজকা যদি নাতজামাই নাতিনেরে নিয়া নো আইয়ে সোজা আমি গিয়া নাতিনেরে লইয়া আমু।”
তৌসিফ শেখ বাইরে যাচ্ছিলেন। মায়ের কথা শুনে বললেন,
“আসতেছে আম্মা। আমি ফোন করে কথা বলেছি জামাইর সাথে। মনে হয় চলেও এসেছে আমি বাইরে গিয়ে দেখতেছি।”
বলে তৌসিফ শেখ সদর দরজা পেরিয়ে বাইরে গেলেন।
শেখ বাড়ির মেইন গেইটে গাড়ি থামতেই তিতলি সাথেসাথেই নেমে গেল। খুশিতে তার তর সইছে না। বাবাকে গাড়ির ভেতর থেকে দেখেই চোখ-মুখ উজ্জল হয়ে গেলো তার। ফারাজকে রেখেই দৌড়ে বাবার কাছে গিয়ে আগে আগে খুশিতে বলল,
“কেমন আছো আব্বু?”
তৌসিফ শেখ পরম আদরে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। মেয়েকে কতটা ভালোবাসেন তিনি। মেয়ের কথা শুনে বুকটা ভরে গেল। মনে হলো অনেকদিন পর মেয়ের মাথায় এভাবে হাত রেখেছেন। আজকাল বাড়িতে আর ওনার ভালো লাগে না। মেয়েকে চোখের সামনে দেখেন মনে হয় এইতো এখন খেতে আসবে। আব্বু আব্বু বলে এটা সেটা আবদার করবে। কিন্তু না কেউ কিছু বলে না। মন খারাপ করে তখন রুমে চলে গিয়ে মেয়েকে ফোন করেন। ফোনে কথা বললেও মন ভরে না। স্নেহমাখা হাতদুটো মেয়ের মাথায় বুলিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো! আছি তুমি কেমন আছো আম্মু?”
বাবার স্পর্শ পেয়ে তিতলির চোখ ভিজে উঠেছে। মুখ ফুলিয়ে বলল,
“ভালো আব্বু!” তোমাকে অনেক মনে পড়েছে আব্কু! আমি অনেকদিন থাকবো। যাবো না।
আমারও তোমাকে অনেক মনে পড়েছে আম্মু। তোমার যতদিন মন চাই ততদিন থাকবা ঠিক আছে।
তিতলি দুপাশে মাথা দুলিয়ে আড়চোখে ফারাজের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকাল। নিজের বাড়ি এসে এখন আর ফারাজকে পাত্তা দিচ্ছে না। দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।
ফারাজ খান এগিয়ে শ্বশুরের সাথে কৌশল বিনিময় করল। শ্বশুর বাড়িতে আসতে যতকিছু লাগে সব নিয়ে এসেছে ফলমূল মিষ্টি যা যা লাগে সব।
তিতলি ড্রয়িংরুমে গিয়ে সবার সাথে কথা বলল। আলেয়া শেখ মেয়েকে জড়িয়ে কেঁদে দিলেন প্রায়।
ফরিদা বানু নাতিনকে বললেন,
“কীরে নাতজামাই কই? তুই একলা কা?”
তিতলি দাদুর কথা শুনে বলল,
“বাইরে দাদু।”
“এক লগে আইবি না? নাতজামাই লজ্জা পাইতো নো এহন?”
তিতলির মনে পরল ফারাজ তাকে বলেছে আমার কোনো লজ্জা নেই। তাই দাদুকে বলল,
রাগে অনুরাগে পর্ব ২৯
“ওনি বলেছেন ওনার কোনো লজ্জা নেই দাদু।”
বলে উপরে চলে গেল। বিয়ে হয়ে গেছে এমনো কোনো ভাব ওর মধ্যে নেই।
আলেয়া শেখ মেয়ের যাওয়া দেখে বললেন,
“মেয়েটা এখনো বড় হইলো না। চালচলন সব আগের মতোই। কে জানি শ্বশুর বাড়িতে কি কি অঘটন করেছে।”
