প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৪ (২)
বন্যা সিকদার
রাত তখন প্রায় দশটা। উজান ক্লান্ত শরীর নিয়ে হেলেদুলে হেঁটে যাচ্ছিল। মাত্রই সে আর তন্ময় এলাকার সেই জটিল কেসের প্রাথমিক ইনভেস্টিগেশন শেষ করে বাড়ি ফিরল। অবশ্য এই অভিযানে এখানে শুধু তারা দুজনই আসেনি‚ এসেছে তাদের পুরো টিম। তবে গ্রামে কোনো ভালো রিসোর্ট বা হোটেল না থাকায় টিমের বাকি সদস্যরা কাছাকাছি অন্য কয়েকটি বাসাবাড়িতে সাময়িকভাবে উঠেছে। উজান ধীরপায়ে নিজের রুমে এসে প্রবেশ করল। রুমে ঢুকেই সে দেখতে পেল মৌ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। তপ্ত জ্বরে পুড়তে থাকা নিজের পিচ্চি বউটাকে দেখা মাত্রই উজানে’র ইচ্ছে করছিল এক দৌড়ে গিয়ে তাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরে। কিন্তু ধুলোবালি আর নোংরা জামাকাপড় শরীরে থাকায় সে নিজের তীব্র ইচ্ছেটা মনের ভেতরেই চেপে রাখল। অতঃপর আলনা থেকে নিজের টাওয়ালটা হাতে নিয়ে সে শাওয়ার নেওয়ার জন্য রুম থেকে বেরিয়ে গেল। যেহেতু এটি একটি যৌথ পরিবারের পুরোনো ধাঁচের বড় বাড়ি‚ তাই প্রতি রুমে আলাদা কোনো এটাচড ওয়াশরুম নেই। বাড়ির শেষ মাথার কমন ওয়াশরুমে গিয়ে উজান দ্রুত শাওয়ার শেষ করে রুমে ঢুকল।
টাওয়াল দিয়ে কোনো রকমে চুলগুলো মুছতে মুছতে সে এক লাফে বিছানায় উঠে গেল। কিন্তু মৌ’কে যেই না সে পেছন থেকে নিজের কাছে টেনে নিতে চাইল‚ অমনি মৌ এক ঝটকায় বাইম মাছের মতো মুচড়ে উল্টো দিকে ঘুরে পুরো শরীরে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। এতক্ষণে উজান বুঝতে পারল তার লক্ষ্মী বউটা আসলে গভীর ঘুমে নেই বরং গভীর অভিমানে রেগে মেগে বোম হয়ে আছে। তার ওপর সে এতটাই রাগান্বিত যে উজানে’র দিকে পা ফিরিয়ে শুয়েছে। তবে উজান চৌধুরীও এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। সে বিছানায় এগিয়ে গিয়ে কাঁথার ওপর দিয়েই মৌ’য়ের পা দুটো টেনে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল।
মৌ সাথে সাথে ছটফট করে নিজের পা সরিয়ে নিল এবং বিছানায় উঠে বসে এক কর্কশ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল‚ ”ইবলিশ শয়তান একটা। কাণ্ডজ্ঞান সব লোপ পেয়েছে নাকি আপনার? মনের ভেতর যতসব শয়তানি বুদ্ধি ঘুরঘুর করে।
“আমি আবার কী করলাম?
উজান নিজের মুখটা একদম বাচ্চার মতো ইনোসেন্ট করে বলল। তার এই ভাজা মাছটি উল্টে খেতে না জানা চেহারা দেখে মৌ’য়ের ভেতরের রাগ আরও তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। সে চোখ বড় বড় করে বলল‚
“কী করলাম মানে? আপনি জানেন না কোনো বউকে তার স্বামীর বুকে পা দেওয়া চরম পাপ? ওহ‚ বুঝেছি। আমাকে আপনি ত্যাড়াবেড়া বুঝিয়ে নিজে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিতে চান‚ আর নিজে ঢ্যাং ঢ্যাং করে জান্নাতে গিয়ে সেখানে হাজার খানেক হুর নিয়ে রঙঢঙ করবেন তাই না?
“যাহ্ শালা এই বউগুলো এত ত্যাড়া কীভাবে হয় রে ভাই? গরু গাছে উঠবে না‚ তবুও তারা জোর করে তাকে গাছে উঠিয়েই ছাড়বে।
কথা শেষ হতে না হতেই মৌ সোজা হয়ে আরও কাছে এগিয়ে এলো। সে তড়িঘড়ি করে উজানে’র চুল মুঠো করে খামচে ধরল এবং দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে বলল‚ “বউগুলো মানে? তার মানে আপনি আমায় রেখে অলরেডি আরও কয়েকটা বিয়ে করে বসে আছেন? তাই তো বলি‚ আমার শরীরে ১০৩ ডিগ্রি জ্বর হওয়া সত্ত্বেও কেন এই শাশুড়ির পুত আমাকে একা ফেলে ওমন করে চলে গেল। এমনকি আমি এতবার ফোন দেওয়ার পরেও কেন একটা বারও রিসিভ করল না। আমার ফোন রিসিভ করবে কীভাবে? ওদিকে এতগুলো ফুলের মতো সুন্দরী বউ রেখে কি আর এই করলার মতো তিতকুটে বউয়ের কাছে আসতে ইচ্ছে হয় আপনার?
মৌ’য়ের এই মারাত্মক লজিক শুনে উজান রীতিমতো খকখক করে কাশতে শুরু করে দিল। এই পিচ্চি মেয়েটা ভেতরে ভেতরে এত ডেঞ্জারাস আর সন্দিগ্ধ মনের‚ তা উজান আগে জানত না। সে চুলের মুঠোর ব্যথায় তোঁতলাতে তোঁতলাতে বলল‚ “আউচ বউ‚ চুলটা ছাড়ো প্লিজ। আমার জানের‚ প্রাণের‚ কলিজার একটাই মাত্র বউ আর সেটা হলে তুমি। এছাড়া আমার লাইফে আর দ্বিতীয় কেউ নেই সত্যি বলছি। আমি তো জাস্ট কথার কথা ওমন করে বলেছি। প্লিজ লক্ষ্মী বউ আমার আর রাগ কোরো না। আচ্ছা সরি‚ আর জীবনে ভুলেও এমন ভুল কথা মুখ দিয়ে বের করব না প্রমিজ।
”এটাকে আপনার ভুল মনে হয়? —মৌ ভ্রু কুঁচকে ঝামটা দিল।
“প্লিজ শাশুড়ির মেয়ে এবার একটু শান্ত হও। আমি এই গভীর রাতের বেলায় তোমার সাথে একদম ঝগড়া করার মুডে নেই‚ সত্যি।
”ওহ! তার মানে আমি ঝগড়ুটে? আমি ঝগড়া করছি? ওকে‚ থাকেন আপনি আপনার হুরদের নিয়ে আমি চলে যাচ্ছি।
মৌ নিজের অসুস্থ শরীর নিয়েও বিছানা থেকে নামার জন্য পা বাড়াতেই উজান এক ঝটকায় তাকে শক্ত করে আগলে ধরল। টেনে নিজের একদম কাছাকাছি নিয়ে এসে তার কানের লতিতে ঠোঁট ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল‚ “মিসেস উজান চৌধুরী‚ প্লিজ একটু রিলাক্স হোন। আপনার যত ইচ্ছে ঝগড়া করবেন আমার সাথে‚ আমি একটা কথাও বলব না। তবে তার আগে প্লিজ সুস্থ হয়ে নিন। আপনি সুস্থ হওয়ার পর শুধু চুল খামচানো কেন‚ আমাকে ঝাটা দিয়ে মারতে আসলেও আমি একটুও বকব না প্রমিজ! তবে এখনকার মতো প্লিজ একটু শান্ত হয়ে বসেন।
বুকের ওম পেয়ে মৌ খানিকটা শান্ত হলো। শরীরটা বড্ড ম্যাজম্যাজ করছে বিধায় সে আর বেশি তর্ক করার শক্তি পেল না। উজান তার এই আকস্মিক শান্ত ভাবটা লক্ষ্য করল। সে মৌ’য়ের কপালে আর গলায় হাত দিয়ে দেখতে পেল শরীর এখনো তপ্ত আগুনের মতো পুড়ছে। সে ড্রয়ার থেকে থার্মোমিটার বের করে জ্বর মেপে দেখল‚ জ্বরের পারদ এখনো আগের মতোই চড়া।
“পিচ্চি এখনো তো গা অনেক গরম। ওষুধ খেয়েছিলে ঠিকমতো? —উজান চিন্তিত মুখে শুধাল।
”হুম‚ মেহু খাইয়ে দিয়েছে।
মৌ আচমকা উজানে’র শার্টের বুকটা খামচে ধরে অত্যন্ত কাতর কণ্ঠে বলল‚ “আমায় একটু আপনার বুকে আশ্রয় দেবেন প্রফেসর সাহেব? কেমন জানি ভেতরটা শূন্য শূন্য লাগছে আমার।
তার এই ছোট্ট একটি ব্যাকুল বাক্য উজানে’র বুকের ভেতর যেন এক অগ্নিকুণ্ডের মতো আছড়ে পড়ল। সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে মেয়েটাকে পরম মায়ায় নিজের বুকের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে নিল‚ যেখানে দুজনের মাঝে বিন্দুমাত্র দূরত্বের অবকাশ রইল না। উজান মৌ’য়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নরম গলায় বলল‚ “পিচ্চি অনেক কষ্ট হচ্ছে তোমার‚ তাই না? সরি….আমি তোমার অসুস্থতার কথা জেনেও ওমন করে চলে গিয়েছিলাম। একটুও তোমার পাশে থাকার কথা ভাবিনি। এমনকি তোমার ফোনটাও রিসিভ করতে পারিনি। আই সোয়্যার পিচ্চি‚ আমার ফোনে একদম চার্জ ছিল না বিশ্বাস করো আমায়।
মৌ উজানে’র বুকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থেকে অত্যন্ত আকুল ও ভাঙা গলায় বলল‚ “আপনি কোথায় ছিলেন? কেন ছিলেন? কিসের জন্য ছিলেন? তার মূল কারণটা কী? কোনো রকম এক্সকিউজ আমি আপনার থেকে জানতে চাই না প্রফেসর সাহেব‚ আমি শুধু এই মুহূর্তে আপনাকে চাই।
মৌ’য়ের কণ্ঠস্বরে এক অন্যরকম তীব্র আকুলতা শুনতে পেল উজান। সেও বউকে আরও শক্ত করে বাহুডোরে বেঁধে রাখল। কিছুক্ষণ ওভাবেই নিস্তব্ধতায় অতিবাহিত হওয়ার পর হঠাৎ করেই মৌ উজানে’র বুকের ওপর মুখটা ঘষে নিচু স্বরে আওড়াল‚ ”আমাকে একটু ভালোবাসবেন প্রফেসর সাহেব?
এই ছোট্ট একটা সহজ প্রশ্ন উজান’কে ভেতর থেকে পুরোপুরি নাড়িয়ে তুলল। মৌ কী বোঝাতে চেয়েছে‚ সেই কথার গভীরতা আর ইঙ্গিত বুঝতে উজানে’র মতো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের বাকি থাকার কথা নয়। তবে তার মনে এক তীব্র ডাউট হলো‚ মেয়েটা কি আসলেই সুস্থ মস্তিষ্কে নিজের অধিকার চাইছে নাকি তীব্র জ্বরের ঘোরে অবচেতন মনে এমন প্রলাপ বকছে? উজান’কে চুপ থাকতে দেখে মৌ আবারও একটু নড়েচড়ে উঠে।
“কী হলো প্রফেসর সাহেব? ভালোবাসবেন না আমায়?
“কেন? আমি কি এখনো তোমায় কম ভালোবাসি‚ হুম? যে আবার নতুন করে ভালোবাসতে হবে?
উজান ইচ্ছা করেই একটু না বোঝার ভান করে দুষ্টুমি মিশিয়ে বলল। মুহূর্তের মধ্যে মৌ’য়ের রাগ আবারও চড়ে গেল। সে এক ঝটকায় মাথা তুলে উজানে’র চোখের দিকে নিজের তপ্ত ও রাগী চোখ রাখল। নিজের অভিমানী কণ্ঠস্বর শক্ত করে ফিসফিসিয়ে বলল‚ “হুম‚ নতুন করেই ভালোবাসতে হবে। আপনাকে একদম নিজের করে চাই আমার‚ এখন…ঠিক এই মুহূর্তে।
“আমি তো তোমারই আছি, পিচ্চি।
উজান হাসল। উজানে’র এমন দায়সারা উত্তর শুনে মৌ বিন্দুমাত্র খুশি হতে পারল না। এই মানুষটা কি আসলেই তার মনের ভেতরের তীব্র ইচ্ছাটা বুঝতে পারছে না নাকি সব বুঝেও ইচ্ছা করে এমন অবুঝের ভান ধরে তাকে খ্যাপাচ্ছে?
”এইটুকুতে আমার চলবে না প্রফেসর সাহেব। ঠিক যতটা কাছে আসলে আমাদের মাঝে কোনো রকম দূরত্বের দেয়াল থাকবে না…ঠিক ততটা নিবিড়ভাবে চাই আপনাকে!
মৌ’য়ের মুখের এমন স্পষ্ট ও সাহসী দাবি শুনে উজানে’র ঠোঁটের কোণে এক মনোহর মুচকি হাসি খেলে গেল। সে আর দূরত্ব না রেখে মৌ’কে এক ঝটকায় নিজের বুকের ওপর টেনে শুইয়ে দিল।
“এবার হয়েছে তো‚ ম্যাডাম?
মৌ তাও ঠোঁট ফুলাল। এই মানুষটাকে আর কতভাবে বললে যে সে তার আসল মনের কথা বুঝবে। সে আর কথা না বাড়িয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে উজানে’র বুকেই লেপ্টে রইল। উজান এরপর আরও কয়েকবার আদর করে তাকে ‘পিচ্চি’ ‘পিচ্চি’ বলে ডাকল কিন্তু মৌ অভিমান করে কোনো উত্তর দিল না। বউয়ের এমন অনড় অভিমান দেখে উজান মৃদু হাসল। তারপর মৌ’য়ের কানের একদম কাছে নিজের উষ্ণ ঠোঁট ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে আওড়াল‚
“মিসেস চৌধুরী‚ আপনি মনে মনে এখন যেটা চাচ্ছেন…সেটা এই মুহূর্তে কোনোভাবেই পসিবল নয়।
”কেন?
মৌ চট করে মাথা তুলে সোজাসাপটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল। উজান মৌ’য়ের তপ্ত কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে এক পরম ভালোবাসার পরশ দিল। তারপর অত্যন্ত মৃদু স্বরে আওড়াল‚ “কারণ আমার মিসেস এখন বড্ড অসুস্থ। ১০৩ ডিগ্রি জ্বর শরীরে নিয়ে সে আমার মতো এই হৃষ্টপুষ্ট ও সুঠাম পুরুষটাকে সামলাতে পারবে না। সেই জন্য বলছি আগে আমার লক্ষ্মী বউটা সুস্থ হয়ে উঠুক‚ তারপর যা চাওয়ার সব হবে।
”ওহ! পারবো আমি আপনাকে সামলাতে‚ সত্যি বলছি পারবো। —মৌ জেদ ধরল।
“পিচ্চি বউ লক্ষ্মীটির মতো ঘুমাও এখন। মাঝরাতে এমন পাগলামি বাদ দাও তো। —উজান তাকে শান্ত করতে চাইল। কিন্তু সে শুনলো না।
”তাহলে আপনি আমার কথা শুনছেন না কেন? কেন দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন?
“আরে ইয়ার কেন বুঝতে পারছো না‚ তোমার এই দুর্বল শরীর এখন এত স্ট্রেস নিতে পারবে না।
উজান এবার কিছুটা হাপিয়ে উঠে বলল। কথাটা শোনামাত্রই মৌ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে উজানে’র বুক থেকে এক ঝটকায় সরে গিয়ে বিছানায় সটান বসল। সে এক কর্কশ কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত করে‚ “আমি বুঝি না‚ নাকি আপনি নিজেই চান না আমাকে সম্পূর্ণ নিজের করে নিতে? আমি সব বুঝি প্রফেসর সাহেব। আপনার নজর তো আগে থেকেই ওই পেত্নী গুলোর দিকে ছিল। আর সেই কারণেই আপনি সবসময় আমার থেকে এভাবে দূরে দূরে থাকার বাহানা খোঁজেন৷ কই ইফাত ভাইকে তো মেহের বারবার দূরে ঠেলে দেয়‚ তবুও সে মেহেরে’র আরও কাছে যায়। আর আপনি এমনিতেই দূরে থাকেন। যাতে আমাকে রেখে অন্য কোনো মেয়েকে বিয়ে করতে পারেন। আমি কিচ্ছু বুঝি না‚ তাই না?
মৌ’য়ের মুখে এমন অদ্ভুত আর আপত্তিকর কথা শুনে উজানে’র মুখের রঙ নিমেষেই পাল্টে গেল। তাদের একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তে এই মেয়েটা কেন হুট করে বাইরের অন্য নারীদের কথা টেনে আনল‚ এটা ভেবেই উজানে’র ভেতরের পুরুষালি রাগ আর ইগো দ্বিগুণ বেড়ে গেল। সে রাগে গজগজ করতে করতে বিছানায় উঠে বসল।
“আমি তোমাকে রেখে অন্য কোনো মেয়েকে বিয়ে করতে চাই? তোমার এই মাথায় এসব নোংরা বুদ্ধি ঢোকে কী করে‚ হুম?
”হ্যাঁ‚ চানই তো। নয়তো আমি নিজে থেকে এত বড় অফার দেওয়ার পরেও আপনি আমাকে এতক্ষণ ধরে ফালতু ভুজুংভাজুং বোঝাচ্ছেন কেন?
“পিচ্চি চুপ করো একদম। আমাকে রাগাবে না কিন্তু বলে দিচ্ছি। —উজান আঙুল তুলল।
”সত্যি কথা বললে তো সবার শরীরেই জ্বালা ধরেই প্রফেসর সাহেব। সরুন আপনি‚ আমি থাকবই না আপনার কাছে। কী কুক্ষণে যে আপনার মতো এক রাক্ষসকে বিয়ে করার জন্য ওমন লাফালাফি করতাম আল্লাহই জানে।
মৌ রাগ করে বিছানা থেকে নেমে চলে যাওয়ার জন্য যেই না অগ্রসর হলো‚ অমনি উজান হিংসা বাঘের মতো ক্ষিপ্র গতিতে খপ করে তার হাতটা ধরে ফেলল। মৌ কিছু বুঝে ওঠার আগেই উজান তার দু-হাত দিয়ে তাকে উঁচু করে ধরে এক ঝটকায় বিছানার ফেলে দিল। মৌ পুরো স্তব্ধ হয়ে গেল। উজান আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে মৌ’য়ের ওপর নিজের ভারী শরীরের সম্পূর্ণ ভর ছেড়ে দিল। তার চোখ দুটো তখন এক আদিম ও তীব্র অধিকারবোধে জ্বলজ্বল করছে। সে মৌ’য়ের চোখের দিকে চেয়ে অত্যন্ত কঠোর ও মাদকতাপূর্ণ গলায় আওড়াল‚
“শাশুড়ির মেয়ে পরে যদি আবার চিৎকার করে কান্না করিস তাহলে তোর খবর আছে।
উজানে’র মুখের এই হুমকিটা কুম্ভকর্ণের গর্জনের মতো মৌ’য়ের কানের পর্দায় গিয়ে বাজতে লাগল। এতক্ষণে সে নিজের ভুলটা বুঝতে পারল‚ যে বরের পুরুষত্বকে সে এতক্ষণ রাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছিল। রেগে গেলে সে কতটা ভয়ংকর ও নিয়ন্ত্রণহীন হতে পারে‚ তা সে ভুলে গিয়েছিল। সে নিজের ভুল বুঝতে পেরে আত্মপক্ষ সমর্থনে যেই না কিছু একটা বলতে যাবে‚ অমনি উজান আর তাকে কোনো কথা বলার বা অজুহাত দেখানোর বিন্দুমাত্র সুযোগ দিল না। উজান এক ঝটকায় নিজের তপ্ত ও তৃষ্ণার্ত ওষ্ঠজোড়া মৌ’য়ের নরম ও শুষ্ক ঠোঁটের ওপর স্থাপন করে তা নিজের সম্পূর্ণ আয়ত্তে নিয়ে নিল। সে এক পরম আবেশে আর তীব্র ভালোবাসার টানে মৌ’য়ের কোমরটা নিজের শক্ত বাহুডোরে চেপে ধরল। বেশ কিছু সময় পর মৌ যখন পুরোপুরি হাঁপিয়ে উঠল‚ তখন উজান তার ঠোঁট দুটো মুক্ত করে দিয়ে তার সারা মুখমণ্ডলে‚ কপালে আর গালে একের পর এক ভালোবাসার গভীর ও উষ্ণ পরশ এঁকে দিতে লাগল।
উজানে’র এমন আকস্মিক উন্মাদ আর রূপবান পুরুষালি রূপ দেখে মৌ ভয়ের চোটে নিজের ভেতরের সব রাগ ভুলে বিছানায় গুটিয়ে গেল। সে উজানে’র এই তীব্র বাঁধন থেকে নিজেকে সামান্য ছাড়ানোর জন্য ফিসফিস করে কিছু একটা বলতে চাইল কিন্তু উজান আজ কোনো বারণ বা যুক্তি কানেই তুলল না। তার বদলে উজানে’র মুখ থেকে এক চরম মাদকতাময় ও গভীর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো।
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৪
“হুশশশ…!! একদম ডিস্টার্ব করবে না এখন। উজান চৌধুরী এখন তার স্পেশাল ডিশ টেস্ট করার মোডে আছে।
অতঃপর উজান তার জীবনের একমাত্র অর্ধাঙ্গিনীকে নিজের দুই বাহুর বেড়াজালে বন্দী করে ভালোবাসার এক অতল ও শান্ত সাগরে ডুব দিল। নিজের অন্তরের গভীর থেকে গভীরতম ভালোবাসার রঙে সে তার আদুরে পিচ্চি বউটাকে রাঙিয়ে তুলল। দীর্ঘদিনের সমস্ত লুকানো আকাঙ্ক্ষা আর আবেগের মাঝে সে আজ খুঁজে নিল নিজের জীবনের পরম সার্থকতা। এভাবেই সব অভিমান আর দূরত্বের অবসান ঘটিয়ে এক অনন্ত ভালোবাসার চাদরে সম্পূর্ণ হলো উজান ও মৌ’য়ের চিরন্তন প্রেমের উপাখ্যান।
