শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১২
আয়েশা শেখ
সকাল সকাল রান্নাঘরে তুমুল ব্যস্ততা টুম্পার। গোলগাল চেহারা আর ফর্সা গড়নের পঁয়ত্রিশ বছর বয়সি এই নারী এ বাড়িতে আছে বছর ছয়েক ধরেই। রান্নার মূল দায়িত্বটা তার কাঁধেই, তবে সাহায্যকারী হিসেবে তার সাথে আছে পঞ্চান্ন ছুঁইছুঁই পারুল খালা।
কাজের ফাঁকে ফাঁকে টুম্পার মুখে অনর্গল খই ফুটছে,
—‘ বুইড়ার লাইগগা তেল ছাড়া পরোটা, সবজি ভাজা আর দুধ চা। বুড়ির লাইগগা ওটস, ফলের প্লেট, গ্রিন টি। বুড়ির বড় পোলার লাইগগা স্টাফড অমলেট, চিকেন সসেজ আর কফি। বুড়ির নাতি খাইব ডাবল চিকেন স্যান্ডউইচ, চিজ অমলেট, হ্যাশ ব্রাউন আর এক গ্লাস জুস। বুড়ির নাতনি ফ্রেঞ্চ টোস্ট, সসেজ, দুধ। বুড়ির…’
পারুল খালা এতক্ষণ রান্নাঘর ঝাড়ু দিচ্ছিল। হাতে থাকা ঝাড়ুটা একপাশে রেখে পারুল খালা ধমকের সুরে বলে উঠলেন,
—‘ চুপ কর, চুপ কর! আইসা হুনলে ঘাড় ধইরা বাইর করব তোরে।’
বিরক্তিতে মুখঝামটা মেরে বলল টুম্পা,
—‘ তুমি চুপ করো তো খালা! প্রতিদিন একেক জনের লাইগা একেক পদের খাবার বানাইতে আর ভালো লাগে না। সকাল সকাল উইঠা একটা জিনিস রাইন্দা দিমু, সবাই হেইডা খাইব–তা না! ওগোর একেক জনের পেটে একেক জিনিস ঢুকান লাগব!’
—‘তুই তাও এইডির নাম মুখস্থ কইতে পারোস, আমি তো তাও পারি না। তুই না থাকলে যে কেমনে কী করতাম!’
হন্তদন্ত হয়ে কিচেনে পা রাখল ঝিলমিল। চোখেমুখে রাজ্যের তাড়া তার।
—‘ ও টুম্পা আন্টি, তাড়াতাড়ি আমাকে কিছু বানিয়ে দাও তো!’
পেছন ফিরে ঝিলমিলকে দেখে টুম্পা অবাক!
—‘তুমি এইখানে, এত সকালে?’
—‘হ্যাঁ, জলদি কিছু একটা বানিয়ে দাও।’
—‘কী বানামু?’
—‘ বারিশ চাচ্চুর জন্য কিছু একটা বানিয়ে দাও। সকালে উনি কী খান? দ্রুত কিছু একটা রেঁধে দাও। আর শোনো, একদম বলবে না এটা তুমি বানিয়েছো। বলবে, এই রান্নাটা আমি—মানে ঝিলমিল করেছে। ওকে? এখন চটজলদি হাত চালাও।’
টুম্পার কণ্ঠে এবার একরাশ কৌতূহল,
—‘হ, এহন তো সবার জন্যই রানমু, ছোট ভাইয়েরটাও রানমু। কিন্তু
তোমারে এত অস্থির লাগতেছে কেন?’
—‘পরে বলব। আগে রান্না করো। উনারটা আগে করো। মনে থাকে যেন, ক্রেডিট কিন্তু আমার!’
কথা শেষ করেই ঝিলমিল দ্রুত পায়ে পেছন ফিরতেই শক্ত কিছুর সাথে ধাক্কা খেলো। সঙ্গে সঙ্গেই নাকে এসে ঠেকল টম ফোর্ড পারফিউমের অতি চেনা সেই কড়া সুবাস। দু-পা পিছিয়ে মুখ তুলে সামনে দাঁড়ানো পুরুষটিকে দেখামাত্রই পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত বৈদ্যুতিক তরঙ্গ খেলে গেল ঝিলমিলের শরীরে।
বারিশ একপলক ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে তাকে একপাশে সরিয়ে দিল। এরপর টুম্পার দিকে তাকিয়ে তার গম্ভীর নির্দেশ,
—‘টুম্পা, আপনি আপাতত কিচেন থেকে বের হোন।’ পারুল খালার দিকে চোখ ফিরতেই যোগ করল,
—‘খালা, আপনিও।’
পারুল খালা কিছুটা থতমত খেয়ে বলে উঠলেন,
—‘কিন্তু কেন বাবা?’
—‘ঝিলমিল আমার জন্য খাবার তৈরি করবে।’
—‘ওমা! কেন? ঝিলমিল কেন করবে ভাইজান? আমরা তো আছিই। আমরা…’
বারিশের কণ্ঠে এবার খানিকটা কঠোরতা,
— ‘আমি আপনাদের যেতে বলেছি। বের হোন এখান থেকে।’
টুম্পা আর পারুল খালা একে অপরের দিকে তাকাল। ঝিলমিল চোখের ইশারায় যেতে নিষেধ করল। তবে বারিশের দিকে তাকিয়ে আর দাড়িয়ে থাকল না তারা। চলে গেল। রান্নাঘর থেকে তারা বেরিয়ে যেতেই তাদের পেছন পেছন বারিশও খানিকটা এগোল। ঝিলমিল এই সুযোগে দ্রুত পায়ে এসে টুম্পার হাতটা চেপে ধরল। ফিসফিসিয়ে বলল,
— দাঁড়াও! উনি সকালে কী খান?
চটজলদি উত্তর দিলো টুম্পা,
— দুটো সানি-সাইড-আপ ডিম, মাল্টিগ্রেইন ব্রেড টোস্ট আর চিনি ছাড়া ব্ল্যাক কফি।
—‘টুম্পা, আপনাকে চলে আসতে বলেছি!’ বাইরে থেকে বারিশের গমগমে কণ্ঠস্বর ভেসে আসতে সময় লাগল না। ভয়ে টুম্পা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। বারিশ পুনরায় কিচেনে প্রবেশ করে ভেতরে থাকা ছোট ডাইনিং টেবিলের চেয়ারটায় গিয়ে বসল। পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে ডুব দিল সে।
বারিশের ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
—‘আপনি কিন্তু এবার বাড়াবাড়ি করছেন!’
ফোনের পর্দা থেকে চোখ না সরিয়েই বারিশের নির্লিপ্ত জবাব,
— তাহলে চলো, তোমাকে তোমার বাড়ি রেখে আসি।
— এটা কেমন কথা? ওরা থাকতে আমি কেন এসব করতে যাব?
— তাহলে কি ওদের কাজ থেকে বরখাস্ত করব? আচ্ছা, আমি ওদের ডেকে বলে দিচ্ছি কাল থেকে যেন এ বাড়ির আর কোনো কাজে হাত না দেয়।
চেয়ার ছেড়ে বারিশ উঠে দাঁড়াতে নিতেই ঝিলমিল তড়িৎ বেগে তার শক্ত বাহু আঁকড়ে ধরল।
— থাক! ওদের রিজিকে হাত দিয়েন না। বানাচ্ছি আপনার খাবার।
বারিশ আবার বসে পড়তেই ঝিলমিল কাউন্টারটপের দিকে এগিয়ে গেল। ইন্ডিকেটর বাটন চেপে ইন্ডাকশন ওভেনটি চালু করে ওপর বসিয়ে দিল নন-স্টিক ফ্রাইপ্যান। এরপর ফ্রিজটা খুলে দুটো ডিম হাতে নিল সে। ডিম সে ভাজতে পারে। এতটুকু করতে তার কোনো সমস্যা নেই।
একটা ডিম নিজের কপালে ঠেস দিলো ভাঙার জন্য। কিন্তু ভাঙল না। দ্বিতীয়বার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে তাকাল বারিশের দিকে। বারিশের পুরো মনোযোগ তখনও ফোনের স্ক্রিনে নিবদ্ধ।
ঝিলমিল তার দিকে এগিয়ে গেল গটগট করে। আলতো করে বারিশের একমুঠো চুল করে ধরে মাথাটা উঁচিয়ে ধরল সে। নিজের নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে, চোখ দুটো ছোট ছোট করে, বাম হাতের ডিমটা সোজা ঠুকে দিল বারিশের শক্ত কপালে। প্রথম আঘাতেই মট করে ভেঙে গেল ডিমের খোলস। চরম বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে কপালে হাত ঠেকাল বারিশ। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝিলমিল দ্রুত পায়ে ফিরে এসেছে চুলার কাছে। ফুটন্ত প্যানের তেলের ওপর ছেড়ে দিল ডিমের ভেতরের অংশটুকু। মনোযোগ দিলো সে ডিম ভাজায়।
এদিকে নিজের কপাল ডলতে ডলতে উঠে দাড়াল বারিশ।
— এটা কী করলে তুমি?
ঘাড় ঘুরিয়ে বলল কিশরী,
— আমার এভাবে ডিম ফাটাতে ভালো লাগে। আর আপনার কপালটাও বেশ শক্ত! ফেটে গেল।
— তাই বলে তুমি আমার কপালে ডিম ফাটাবে?
— বসে আছেন কেন এখানে? বাহিরে গিয়ে বসুন, নাহলে যেটা আছে ওটাও ফাটাব।
বারিশ কিছুক্ষণ চোখমুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোয়ালজোড়া কঠিন, চোখের তারায় তীব্র বিরক্তি। ঝিলমিলের দিকে তপ্ত চোখে তাকিয়ে নিচু ও ভারী গলায় শুধু একটা শব্দই উচ্চারণ করল সে,
— স্টুপিড!
বলেই গটগট করে কিচেন থেকে বের হয়ে ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ার টেনে বসল।
শিউলি বেগম নিচে এসে রান্নাঘরের ভেতরে ঝিলমিলকে দেখে তার চোখ কপালে উঠল। অবাক হয়ে বললেন,
— ‘একি ঝিলমিল! তুমি কী করছো এখানে?’
ঝিলমিল অত্যন্ত অসহায় কণ্ঠে বলল,
— ‘খাবার বানাচ্ছি চাচী।’
— ‘ক্ষিদে পেয়েছে বুঝি? টুম্পাকে বললেই তো করে দিত। এই টুম্পা কোথায় তুই? এত সকাল হয়ে গেছে, এখনো রান্না-বান্নার কোনো তোড়জোড় নেই!’
শিউলির চড়া ডাক শুনে তড়িঘড়ি করে রান্নাঘরে ঢুকল টুম্পা।
— ‘তোমার দেওরই তো আইসা বাইর কইরা দিল আমাগো! বলল, আজ থেইকা ঝিলমিল যেন রান্না করে। আমাগো কী দোষ? আমরা তো আইসা সকালের নাশতার তোড়জোড়ই করতেছিলাম।’
ঝিলমিলও টুম্পার কথায় সায় দিয়ে যোগ করল,
— ‘হ্যাঁ চাচী, বারিশ চাচ্চুই ওদের চলে যেতে বলেছে। ওদের কোনো দোষ নেই।’
— ‘কিন্তু কেন?’
— ‘উনার জন্য যেন আমি খাবার বানাই।’
— ‘এটা কেমন কথা! বাড়িতে এত মানুষ থাকতে তুমি কেন রান্নাঘরে খাটবে?’
— ‘কী জানি! এটা তার কেমন অদ্ভুত যুক্তি! আরও অনেক কাজ দিয়েছে আমাকে।’
কথাটা শুনে শিউলি বেগম স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ছেলেটা নিশ্চিত দীঘিকে হারিয়ে পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে! তা না হলে এই বাচ্চা মেয়েটার ওপর এমন অ’ত্যাচার কেন করবে? তিনি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে সরাসরি বারিশের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। ক্ষিপ্ত গলায় বললেন,
— ‘মাথা খারাপ হয়েছে তোমার, তরঙ্গ? ঝিলমিলকে কেন রান্নাঘরে ঢুকিয়েছ?’
বারিশ ফোনের স্ক্রিনে ব্যস্ত। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে জবাব দিল,
— ‘রান্না করবে আমার জন্য।’
— ‘ওকে দিয়ে রান্না করাবে মানে?’
— ‘ও আমার বউ! ওকে দিয়ে কী করাব আর না করাব, সেটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছা। তুমি এ বিষয়ে কথা না বললেই খুশি হব। ওকে ওর কাজ করতে দাও।’
শিউলি বেগম এবার একটু নরম স্বরে বোঝানোর চেষ্টা করলেন,
— ‘আরে তুমি বুঝতে পারছ না কেন! ওর বয়স কতটুকু? এসব রান্নাবান্নার কাজ ও কখনো করেছে? কাল বিয়ে করে আজই ওকে রান্নাঘরে ঢুকিয়ে দিলে! ওর বাপের বাড়ির মানুষ জানতে পারলে কী ভাববে, বুঝতে পারছ?’
বারিশের কণ্ঠে কোনো দ্বিধা ছাড়াই অত্যন্ত শীতল গলায় বলল,
— ‘ওদের সমস্যা হলে এসে নিয়ে যাক ওকে। তবে এ বাড়িতে থাকতে হলে ও আমার নিয়মেই চলবে।’
— তরঙ্গ, তুমি…
— তুমি চুপ করো, বউমা। আমার ছেলে একদম ঠিক বলেছে।
পেছন থেকে ভেসে আসা তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরে শিউলি বেগম কথা থামিয়ে সেদিকে তাকালেন। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে কথাগুলো বলছিলেন ঝর্ণা শেহরিয়ার। ঠিক সেই মুহূর্তে সদর দরজা দিয়ে ভেতরে পা রাখলেন চঞ্চল সাহেবও। ফজরের নামাজ পড়ে এতক্ষণ বাইরে হাটছিলেন তিনি।
ঝর্ণা বেগম ধীর পায়ে হেঁটে এসে ছেলের পাশের চেয়ারটায় বসলেন।
— ‘এত দিনে একটা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছ তুমি। যতদিন এ বাড়িতে থাকবে, সব কাজ ওকেই করতে হবে। টুম্পা! ওকে বলে দে, সবাই সকালে যা যা খাবে, সব তৈরি করে যেন টেবিলে সাজিয়ে রাখে।’
ঝিলমিল বারিশের জন্য তৈরি করা সানি-সাইড-আপ ডিম আর মাল্টিগ্রেইন টোস্টের ট্রে-টা হাতে নিয়ে ডাইনিংয়ের দিকে আসছিল। ঝর্ণা বেগমের হুকুমটা কানে আসতেই তার পা দুটো যেন মেঝেতে আটকে গেল। তবে পরক্ষণেই টেবিল থেকে ভেসে এল বারিশের কণ্ঠ।
— ‘না আম্মা। ওকে রান্নাঘরে পাঠিয়েছি শুধু আমার আর ওর খাবার বানানোর জন্য।’
ঝর্ণা বেগম ভ্রু কুঁচকে বললেন,
— ‘আর আমরা? আমাদের খাবারও আজ থেকে ওই তৈরি করবে।’
— ‘না।’ অত্যন্ত স্বাভাবিক, নিরেট আওয়াজে জবাব দিল বারিশ। সে আবারও ফোনের স্ক্রিনে ডুবে গেছে। ছেলের এমন অবাধ্যতায় ঝর্ণা বেগমের জেদ চেপে গেল,
— ‘তুমি বলেছ তোমারটা বানাতে, আমিও বললাম ও সবার জন্যই বানাবে। কী হলো, দাঁড়িয়ে আছ কেন ঝিলমিল? যাও, আমার জন্য গ্রিন টি আর তোমার শ্বশুরের জন্য লিকার চা বানিয়ে নিয়ে এসো। একটু পর ফরহাদ আর ওর ছেলেমেয়েরা ঘুম থেকে উঠবে, ওদের পছন্দের নাশতাও তৈরি করবে।’
ঝিলমিলের নাকটা রাগে ফুলে উঠল। এত বড় সাহস! পুরো বাড়ির রাঁধুনি বানাতে চাইছে তাকে! সে ঠোঁট নেড়ে তীব্র প্রতিবাদ করতে চাইল, কিন্তু তার আগেই ডাইনিং কাঁপিয়ে গর্জে উঠল বারিশ।
— আমার বউ রান্না করবে শুধুমাত্র আমার জন্য। ওর হাতের বানানো খাবার শুধু আমিই খাব। আর আজ থেকে এ বাড়িতে আমার জন্য কেউ খাবার বানাবে না। আমি আমার ওয়াইফের হাতের খাবার ছাড়া আর কারও হাতের খাবার খাবো না।
কথাটা শেষ করেই সে চেয়ার ছেড়ে হনহন করে এগিয়ে গেল ঝিলমিলের দিকে। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির হাত থেকে আলতো করে খাবারের ট্রে-টা নিজের হাতে নিল। তারপর ঝিলমিলের বাহু ধরে ডাইনিং টেবিলের একটি চেয়ারে এনে বসিয়ে দিল। ট্রে থেকে একটা ডিম আর দুটো ব্রেড টোস্ট ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে হুকুমের সুরে বলল,
— ‘তাড়াতাড়ি আমার সঙ্গে খাবার শেষ করো। কলেজে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে হবে।’
ঝিলমিল মুখ ফিরিয়ে জেদি গলায় বলল,
— ‘আমি খাব না এখন।’
— ‘খেতে বলেছি।’ বারিশের কণ্ঠে স্পষ্ট শাসন।
— ‘বললাম তো খাব না! আপনি খান। বেশি করে খান!’
ঝিলমিলের এমন মুখে মুখে তর্কে বারিশের হাতটা মুহূর্তের মধ্যে শূন্যে উঠে গেল। কিন্তু সেই হাত ঝিলমিলের নরম গালে স্পর্শ করার আগেই চঞ্চল সাহেব দ্রুত এগিয়ে এসে শক্ত করে বারিশের কবজিটা চেপে ধরলেন। যদিও বারিশ আঘাত করত না, কেবল ভয় দেখানোর জন্যই হাত তুলেছিল।
চঞ্চল সাহেবের চোখমুখ রাগে লাল হয়ে উঠেছে। তিনি কড়া গলায় বললেন,
— ‘বেয়াদবির সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ, তরঙ্গ! আমার সামনে দাঁড়িয়ে ঝিলমিলের গায়ে হাত তোলার সাহস কী করে হয় তোমার?’
বারিশ কোনো উত্তর দিল না। তার মুখাবয়ব থমথম করছে। এদিকে ঝিলমিল আতঙ্কে এখনো চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে রেখেছে। ডাইনিংয়ের এই তুলকালাম কাণ্ড দেখে ঝর্ণা বেগম বাকরুদ্ধ হয়ে বসে রইলেন। ছেলে তার এসব কী বলছে? এ বাড়ির আর কারও হাতের রান্না খাবে না মানে কী? ও কি যৌথ পরিবারে থেকেও এক দিনের মাথায় বউ নিয়ে আলাদা সংসার পাততে চাইছে?
চঞ্চল শেহরিয়ারের ভেতরের ক্ষোভ এবার বিস্ফোরণের মতো ফেটে পড়ল। চিৎকার করে বললেন,
— ওকে দিয়ে তুমি কোন সাহসে রান্না করিয়েছ?
এবারও বারিশের তরফ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া মিলল না। চঞ্চল সাহেব আবারও বললেন,
— ঝিলমিলে আজই আমি ওর নিজের বাড়িতে রেখে আসব।
ঝিলমিল ঝটকা দিয়ে চোখ খুলল। এত কাহিনি করে বিয়ে করল, দু’দিনের মধ্যেই চলে যাওয়ার জন্য! এখনো তো জারিফের সাথে কিছুই করতে পারেনি।
চেয়ার ছেড়ে তড়িৎ বেগে উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নেড়ে ব্যাকুল হয়ে বলল কিশরী।
— না, না, না! আমি কোথাও যাব না।
চঞ্চল সাহেব দৃঢ় গলায় বললেন,
— এখানে তুমি ভালো থাকবে না। অযথাই কিছু মানুষ তোমাকে কষ্ট দেবে। ভেবেছিলাম ওপরওয়ালার ইচ্ছেতেই এই বিয়েটা হয়েছে, যা হয় মঙ্গলের জন্যই হয়। কিন্তু আজ আমার ভুল ভেঙেছে। আমি তোমার দাদীমার সাথে কথা বলে সব ব্যবস্থা করছি।
— না দাদাভাই, প্লিজ আমি যাব না। এখানেই থাকব। আমার উনার জন্য রান্না করতে একটুও আপত্তি নেই।
কথাটা বলেই সে ভেজা চোখে বারিশের পাথুরে মুখের দিকে তাকাল। মিনতিভরা কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল,
— আপনি কিছু বলুন… আমি যাব না!
বারিশের চোয়াল এতক্ষন শক্ত ছিল। এবার সামান্য আলগা হলো। চঞ্চল শেহরিয়ারের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল সে।
— শুনলেন তো? ও নিজেই যেতে চাইছে না। ও এখানেই থাকবে। আর আমার সব শর্ত মেনেই থাকবে।
চঞ্চল সাহেব ক্ষিপ্ত গলায় কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে বারিশ চেয়ার ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, টেবিল থেকে খাবারের ট্রে-টা এক হাতে তুলে নিয়ে, অন্য হাতে ঝিলমিলের কবজি শক্ত করে চেপে ধরল। কোনো বাক্যব্যয় না করে ঝিলমিলকে টেনে হিঁচড়ে ডাইনিং স্পেস থেকে বের করে নিয়ে এল সে।
জারিফ মাত্রই ঘুম থেকে উঠে চোখ ডলতে ডলতে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছিল। ঘরের ভেতরে এত বড় তুলকালাম ঘটে গেছে সে কিছুই টের পায়নি। সে এক রাশ অবুঝ বিস্ময় নিয়ে তার চাচা আর নতুন চাচির টানাহেঁচড়ার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
নিজের রুমে ঢুকেই বারিশ সশব্দে দরজাটা আটকে দিল। আর কথা না বাড়িয়ে বিছানার পাশের ছোট টেবিলটায় খাবারের ট্রে-টা রেখে ঝিলমিলের বানানো নাশতা থেকে কেবল একটা ব্রেড টোস্ট মুখে দিল সে। তারপর গ্লাস পানি খেয়ে নিজেকে শান্ত করল।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল বারিশ,
— বাকিটা শেষ করে দশ মিনিটের মধ্যে তৈরি হবে।
বলে সে নিজের কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। ঝিলমিলও বাধ্য মেয়ের মতো খেয়ে নিলো বাকি খাবার।
চৌধুরী বাড়িতে সকালের নাশতা শেষ করে নূরজাহান চৌধুরী, আলতাফ চৌধুরী আর তাহসিন—তিনজন একসঙ্গে সদর দরজা দিয়ে বাইরের দিকে বের হচ্ছিলেন। অফিস যাবে তারা। মেহরাজ তখনও নিজের ঘরে ঘুমাচ্ছে, সে আরও কিছুটা পরে অফিসে যাবে।
কিন্তু সদর দরজার কাছে আসতেই আচমকা থমকে গেল তিন জোড়া পা। চোখের পলকে সবার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে দীঘি। তার পুরো অবস্থাটা চরম এলোমেলো। চোখের নিচে কালচে কালি পড়ে গেছে, মাথার চুলগুলো অবিন্যস্ত। বিগত এই কদিন সে যে প্রচণ্ড নেশা করেছে, তা তাকে দেখলেই নিশ্চিত বোঝা যাচ্ছে। দীঘিকে এই অবস্থায় ঘরের দোরগোড়ায় দেখে তাহসিনের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
— ‘মা!’
শব্দটা সে উচ্চারণ করতে না করতেই নূরজাহান চৌধুরীর হাত এসে পড়ল দীঘির গালে। সজোরে এক থাপ্পড় খেয়েও দীঘি সম্পূর্ণ নির্বাক রইল। গালে দ্বিতীয় থাপ্পড়টা পড়ার আগেই আলতাফ চৌধুরী দ্রুত মাকে জড়িয়ে ধরে একপাশে সরিয়ে নিয়ে এসে বললেন,
— ‘মাথা ঠাণ্ডা রাখো আম্মা। ওর সাথে আমাকে কথা বলতে দাও।’
নূরজাহান চৌধুরী রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলেন,
— ‘কোনো কথা বলার প্রয়োজন নেই। বের হয়ে যেতে বলো ওকে। না হলে আজ আমি একে জানে মেরে ফেলব!’
আলতাফ চৌধুরী মাকে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে বোনের দিকে তাকিয়ে ক্ষিপ্ত গলায় বলল,
— ‘কোথায় ছিলি তুই এতদিন?’
— ‘ফ্রেন্ডের বাসায়।’
আলতাফ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— ‘বিয়ে করবি না সেটা আমাকে বলে দেখতিস! তোর জন্য আজ আমার মেয়েটার জীবনটা পুরো সর্বনাশ হয়ে গেল!’
— ‘কী হয়েছে?’ দীঘি খানিকটা কপাল কুঁচকে তাকাল।
— ‘আম্মা বারিশের সাথে ঝিলমিলের বিয়ে দিয়ে দিয়েছে।’
কথাটা শুনে খুব একটা অবাক হলো না দীঘি। সে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
— ‘এতে সর্বনাশের কী আছে?’
নূরজাহান চৌধুরী তেরে এসে দীঘির চুল ধরলেন।
— ‘আবার বলছো সর্বনাশের কী আছে? তোমার জন্য আমার ছোট্ট সোনাটাকে এই কাঁচা বয়সে বিয়ে দিতে হয়েছে!’
দীঘি মায়ের হাতের টানের তোয়াক্কা না করে উল্টো বলল,
— ‘দিলে কেন? এত সম্মানের চিন্তা করো কেন? আমাদের থেকে কি তোমার ওই সম্মান এতই বড়?’
এবার নূরজাহান চৌধুরী আরও রেগে গেলেন। তিনি চরম আক্রোশে এক ঝটকা মেরে মাটিতে ফেলে দিলেন দীঘিকে। শক্ত মেঝেতে পড়ার আগেই তাহসিন তাৎক্ষণাত এগিয়ে এসে দীঘির দু-বাহু শক্ত করে ধরে ফেলল। দীঘি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তাকাল তাহসিনের দিকে। কেমন এক অদ্ভুত, শূন্য আর নির্বাক চাউনি! তাহসিন নিজেকে সামলে নিয়ে আলতো করে ছেড়ে দিল দীঘিকে। দীঘিও আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। উপস্থিত কারও কোনো পরোয়া না করে, সে ভেতরের দিকে যেতে যেতে বলল,
— ‘আজ সারাদিন ঘুমাব। কাল থেকে আমিও অফিসে জয়েন করব। ডিরেক্টরস কেবিনটা যেন একদম রেডি থাকে।’
মেয়ের এই খামখেয়ালিপনা আর কথার কোনো পাত্তাই দিলেন না নূরজাহান চৌধুরী। আলতাফ চৌধুরীও মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কারণ তারা ভালো করেই জানেন, এই মেয়ের কথাবার্তার কোনো আগামাথা নেই, কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। তারা দুজনেই চলে যেতে লাগলেন। তবে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল তাহসিন। তার স্থির দৃষ্টিটা তখনও দীঘির চলে যাওয়ার দিকেই নিবদ্ধ।
গাড়িতে বসে স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে ঝিলমিলের জন্য অপেক্ষা করছিল বারিশ। সদর গেটের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিতেই দেখল, দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে মেয়েটা। সে গাড়ির ভেতর থেকেই হাত বাড়িয়ে পাশের দরজাটা খুলে দিল। ঝিলমিল ভেতরে আসতেই বারিশের চোখ গেল ওর মাথার দিকে। চুল বাঁধা একদমই গোছানো হয়নি। মেয়েটা সিটে এসে বসতেই বারিশ সোজা প্রশ্ন করল,
— ‘চুলের অবস্থা এমন কেন?’
ঝিলমিল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিষণ্ণ গলায় বলল,
— ‘দাদীমা তো নেই। আমার চুল সব সময় দাদীমা বেঁধে দিতেন। নিজে তো ঠিকঠাক পারি না। আচ্ছা, আমি আমাদের বাসায় গিয়ে দাদীমার কাছ থেকে চুলটা বাঁধিয়ে আসব? না থাক— মনে হয় উনি এতক্ষণে চলে গেছেন।’
বলতে বলতেই ঝিলমিল আড়চোখে খেয়াল করল, নিজের বাড়ির কথা উচ্চারণ করতেই বারিশের মুখাবয়ব মুহূর্তের মধ্যে শক্ত হয়ে উঠেছে। চোখের সেই কঠিন ভাব দেখেই সে নিজেই চট করে কথা কাটিয়ে নিল।
— ‘চলুন, দেরি হয়ে যাচ্ছে।’ পুরো প্রসঙ্গটাই বদলে ফেলল সে।
বারিশ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। পুরো রাস্তায় দুজনের মাঝে আর কোনো বাক্য বিনিময় হলো না। শেষবার সে এই কলেজ ড্রেস পরে লোকটার পাশে বসেছিল বিয়ের আগের। তখনও সে দূরতম কল্পনাতেও ভাবেনি, সৃষ্টিকর্তা তাদের দুজনকে এমন একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ও জটিল বাঁধনে ফেলে দেবেন। কী থেকে যে কী হয়ে গেল! কী এক কাণ্ডই না করে বসল সে!
পাশ ফিরে তাকাল মানুষটার দিকে ঝিলমিল। চোখেমুখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে গাড়ি চালাতে ব্যস্ত সে। লোকটা কি আসলেই বিরক্ত, নাকি এর চেহারাই এমন? হঠাৎ বারিশের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
— ‘তাকিয়ে থেকো না। গাড়ি চালাতে সমস্যা হয়।’
হকচকিয়ে গিয়ে ঝিলমিল তড়িৎ বেগে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। লজ্জায় আর অস্বস্তিতে জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বাইরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল সে। পুরোটা রাস্তা মেয়েটা আর সোজা হয়ে বসল না।
কলেজের সামনে এসে গাড়িটা থামাল বারিশ। নিজের শার্টটা প্যান্টের ভেতর ইন করতে করতে সে ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে বলল,
— ‘আমার শার্টের ওপরের খোলা বোতামগুলো একটু লাগিয়ে দাও।’
ঝিলমিল আকাশ থেকে পড়ল,
— ‘আমি?’
— ‘তুমি ছাড়া গাড়িতে আর কেউ আছে? থাকলে তাকেই বলো।’
— ‘আমারই লাগিয়ে দিতে হবে কেন? আপনি নিজে লাগান না!’
— ‘দেখছই তো, আমি অন্য কাজ করছি!’
ঝিলমিল আর কথা বাড়াল না। খানিকটা ঝুঁকে এগিয়ে গিয়ে বারিশের শার্টের ওপরের খোলা তিনটি বোতাম একে একে লাগিয়ে দিতে লাগল। ঠিক তখনই বারিশের তপ্ত ও গাঢ় নিশ্বাস এসে আছড়ে পড়ল কিশোরীর কপালে আর মুখে। এক অদ্ভুত শিহরণে চোখ তুলে স্বামীর দিকে তাকাল ঝিলমিল। কাছ থেকে বারিশের চোখ দুটো অদ্ভুত সুন্দর আর গভীর লাগছিল, যার ভেতরে এক ধরনের সম্মোহনী ক্ষমতা লুকিয়ে আছে। নজরকাড়া এই সুদর্শনের এত কাছাকাছি এসে কেমন যেন দমবন্ধ করা অস্বস্তি হতে লাগল মেয়েটার। সে মুখটা অত্যন্ত অসহায় করে ফিসফিসিয়ে বলল,
— ‘আপনি তো চাচ্চু!’
— ‘হোপ!’
ঝিলমিল তড়িঘড়ি করে নিজের সিটে সরে এল। বারিশ নিজের চুলগুলো হাত দিয়ে পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে চশমাটা চোখে পরে নিল। মুহূর্তের মধ্যে বারিশের এই রূপান্তর দেখে ঝিলমিল পুরো হাঁ হয়ে গেল। বিস্ময় চেপে রাখতে না পেরে বলল,
— ‘এজন্যই আপনাকে কলেজে এতটা অন্যরকম লাগে?’
বারিশ চশমার ওপর দিয়ে একবার তাকিয়ে শীতল গলায় বলল,
— ‘গাড়ি থেকে নামো দ্রুত।’
ঝিলমিল আর দেরি না করে গাড়ি থেকে নেমে সোজা নিজের ক্লাসের দিকে চলে গেল। আর বারিশ গাড়ি পার্ক করে চলে গেল ডিরেক্ট অফিসের দিকে। সেখানে উপস্থিত অন্য শিক্ষকদের সাথে দু-একটা কথা বলে সে নিজের ডেস্কটায় গিয়ে বসল।
— ‘আমাকে তো কিছু জিজ্ঞেস করলেন না, স্যার?’
হঠাৎ মেয়েলি কণ্ঠস্বরের আওয়াজে বারিশ পাশ ফিরে তাকাল। সম্পূর্ণ অচেনা এক যুবতী দাঁড়িয়ে আছে। পরনে হালকা রঙের জমকালো এক শাড়ি, গায়ের সাথে জড়িয়ে আছে নিখুঁতভাবে। মাথার চুলে কৃতিম রঙের ছোঁয়া, আর হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি।
বারিশ কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে অত্যন্ত মার্জিত স্বরে বলল,
— ‘আই অ্যাম সরি, আপনাকে আজ প্রথম দেখছি।’
মেয়েটা মৃদু হেসে জবাব দিল,
— ‘আসলে আমি এখানকার নতুন জয়েন করা ম্যাম। আজই আমার প্রথম দিন, তাই সবার সাথে একটু পরিচিত হচ্ছি। আমার নাম পরীনিতা জামান। সবাই অবশ্য আমাকে পরী বলেই ডাকে। আমি কলেজ সেকশনের ম্যাথমেটিকসের লেকচারার হিসেবে অ্যাপয়েন্ট পেয়েছি।’
বারিশ মাথা নেড়ে সংক্ষেপে নিজের পরিচয় দিল,
— ‘বুঝতে পেরেছি। আমি শেহরিয়ার ফাইজান বারিশ। ইউনিভার্সিটির ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক।’
নতুন ম্যামের চোখ দুটো এবার কেমন যেন কৌতূহলী হয়ে উঠল। সে বারিশের মুখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে বলল,
শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১১
— ‘আপনার ভয়েসটা কেমন যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছে। কোথায় যেন শুনেছি আগে!’
বারিশ নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
— ‘এক্সকিউজ মি, আমার ক্লাসের সময় হয়ে গেছে। আমাকে এখন উঠতে হচ্ছে।’
বলেই বারিশ ফাইলপত্র হাতে নিয়ে চলে আসতে চাইল। পরীনিতা চট করে এক পা এগিয়ে এসে বলল,
— ‘আরে ওয়েট! আমার সত্যিই মনে হচ্ছে আপনার এই কণ্ঠস্বর আমি আগেও শুনেছি। কেন জানি মনে হচ্ছে, এই ভয়েসটার সাথে আমি অনেক দিন ধরে খুব ক্লোজলি পরিচিত!’
