Home দুইজনাতেই দুইজনাতেই পর্ব ৩৭

দুইজনাতেই পর্ব ৩৭

দুইজনাতেই পর্ব ৩৭
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

শুক্রবার। সাক্ষ্য আজ বাসাতেই। সকাল থেকে বউকে টুকটাক জ্বালিয়ে পা বাড়িয়েছে সিঁড়ির দিকে। তারপর ছাদের কার্নিশে এসেই পা ঝুলিয়ে বসল ছাদের দোলনাটায়। দোলনাটা কথার জন্য বানিয়েছিল তাদের আব্বু। ছোটবেলা থেকে মা হারা এই মেয়েটাকে সাক্ষ্যর আব্বু নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসার চেষ্টা করেছিল। ভাগ্নির অযত্ন হবে বলে একপ্রকার কথার দাদুর থেকে ঝগড়া ঝামেলা করেই নিয়ে এসেছিলেন মামা বাড়িতে। তারপর থেকে কথাকে যতটুকু সাধ্য আগলে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সাক্ষ্য ভেবেই হাসল। কথাকে সাম্য ছাড়া মোটামুটি তাদের পরিবারের সবাই -ই ভালোবাসায় মুড়িয়ে নিয়েছিল। সাক্ষ্য এসব ভেবেই দোলনাটায় দোল খেতে খেতেই বিড়বিড় করল,
“ কথাবুড়ি কবে যেন বড় হয়ে গেল। কথাবুড়ির বান্ধবীটাও বড় হয়ে গেল। এক নিমিষে আমার বউ হয়ে গেল। আর এখন? এখন.. সে আমার ঘরে,আমার চোখে সামনে থাকে সারাটা ক্ষণ। এত শান্তি কেন আম্মুর বান্ধবীর মেয়েটার কাছে? ”
এইটুকু বলেই ঠোঁট কামড়ে হাসল সাক্ষ্য। নিজের চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিয়েই চোখ বুঝে নিরবে।

শুক্রবারে থলেভর্তি বাজার করা হয় সাক্ষ্যদের। বাজার গুলো সাক্ষ্যর বাবাই করেছে। কিছুটা সময় আগেই সাম্যকে দিয়ে পাঠিয়েছে। যার মধ্যে বিভিন্নি প্রকারের মাছ, মাংস সহ সবজি রয়েছে। দ্বিতী তখন রান্না ঘরেই ছিল। টুকটাক সাহায্য করে দিচ্ছিল সাজিয়া আফরোজকে। অতঃপর বাজারগুলো আসা মাত্রই উনি থলে থেকে থেকে একে একে সব বাজার নিয়ে দেখতে দেখতেই কপাল কুঁচকাল। বাসায় সাহায্য কারী মানুষ আছে বলেই বাজার থেকে মাছ কাটানো হয় না। সাক্ষ্যর আম্মুই নিষেধ করে মনমতো কাঁটাকাটি হয় না বলে। কিন্তু আজ দুদিন যাবৎ তো কাজে যে মেয়েটা সাহায্য করে সে মেয়েটাও আসেনি। তাই বিরক্ত হয়েই বলে উঠল,
“ এত মাছ-মুরগি কাটবে টা কে? আমি একা পারব? রাহাও তো আজ আসেনি। সাক্ষ্যর আব্বুটাও না। ”
দ্বিতী শুনল। তাকিয়ে দেখল একপলক। ততক্ষনে এসে দাঁড়ালেন সাক্ষ্যর নানী। মুখ কুঁচকে উত্তর করলেন,
“ ছেলে যখন বিয়ে করিয়েছিস ছেলের বউও করবে সাথে সাথে। সমস্যা কি? নাকি মাছ টাছ কাঁটতে পারে না এমন মেয়েকে বউ করে এনেছিস? ”

দ্বিতীর মুখটা আচমকা চুপসে এল। সত্যিই তো! সে মাছ মাংস কাটাতে খুবই আনাড়ি। পারে না বললেই চলে।রান্না তাও কিছুটা পারলেও তো এসব তো পারে না।যদি এখন কাটতে বলে কি করে কাটবে সে? ছোটশ্বাস ফেলল সে। তার পরমুহূর্তেই সাক্ষ্যর নানু দ্বিতীকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,
“ কি গো নাতবউ? পারবা না শ্বাশুড়িকে সাহায্য করতে? নাকি পারো না মাছ কাটাকাটি? মায় এটা ও শিখায়নাই তোমারে? ”
শেষ বাক্যটায় দ্বিতীর চোখমুখ কুঁচকে এল। সে জানে না, এই ভদ্রমহিলার সাথে তার কি এমন শত্রুতা। নাকি কোনকালের শত্রুতা। সবসময় এভাবে কেন কথা বলে উনি? যেন দ্বিতীকে সহ্য করতে পারেন না উনি। দ্বিতী হারতে চাইল না যেন। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ একটু আধটু দেখিয়ে দিলে অবশ্যই পারব। সাজি আম্মু, একটু শিখিয়ে দিবে মাছ কাটাটা? আমি ঠিকই পারব৷ আম্মুকে বহুবার দেখেছি কাটতে। কিন্তু কখনো কাটা হয়নি বলে হয়তো একটু ভয় হচ্ছে। ”
সাক্ষ্য নানী হেসে উঠলেন। মুখ ভেঙ্গিয়ো বলে উঠল,

“ সে কি! এত বড় দিঙ্গী মেয়ে হইছো, অথচ মাছ কাটতে পারো না? ঠিক সময়ে বিয়ে করলে তো তিন চারটা বাচ্চা মা হতা নাতবউ৷ কয়দিন পর নাকি ভার্সিটি থেইকাও পইড়া বাইর হইয়া যাবা। আর মাছ কাটতে পারো না? অবশ্য তোমার মায় ও আছিল তেমন। কামকাজ কিই বা মেয়েরে শিখাইব? নিজেই তো মনে হয় পারে না। কামকাজ পারে না বইলাই তো গ্রামের সংসার রাইখা শহরে চইলা আসছিল। ”
দ্বিতীর এই পর্যায়ে চোখজোড়া লাল হয়ে উঠল রাগে। বোধহয় অতিরিক্ত কান্নায় চোখজোড়া টলমল ও করল। কেন তার মাকেও টানা হয় কথায় কথায়? শুধু দ্বিতীকে বললেও তো হতো। হতো না? সাজি আম্মুও তো শুধু শুনল। কিচ্ছু বলল না। দ্বিতী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। একপাশে বটি নিয়ে বসেই বলে উঠল,
“ আমার আম্মু সবই পারে নানু। ছোট থেকে আমার সবকিছু আমার আম্মু একা হাতে সামলেছে। কেউ সামলায়নি, কেউ সাহায্য করেনি। আমার আম্মু একাই সংসারের সব করত, জব করত, আমায় মানুষ করেছে। আমার আম্মু কি পারে না তা নিয়ে কথা বলবেন না দয়া করে। ”
সাক্ষ্যর মা এই পর্যায়ে কথা বলল,
“ দ্বিতী, তোকে কাটতে হবে না যা। তুই এমনিও পারবি না আম্মু, আরো কাজ নষ্ট করবি হয়তো। ”
দ্বিতীর এবার জেদই জন্মাল যেন। পারবে না কেন সে? শিখিয়ে দিলে অবশ্যই পারবে। ওভাবেই জানাল,
“ পারব সাজি আম্মু, তুমি শুধু দেখিয়ে দাও। দ্বিতী এতোটা অপদার্থ নয় যে দেখিয়ে দিলেও পারবে না আম্মু। ”

সাজিয়া আফরোজ এবারে বসলে দ্বিতীর পাশেই। বটিতে নিজে মাছ কাটার পাশাপাশি দ্বিতীকেও দেখিয়ে দিলেন মাছ কাঁটা। অপরিপক্ব হাতে দ্বিতী বেশ চেষ্টা করেছে সুন্দর করে কাটার জন্য। অতঃপর কাটল ও। মাছের আঁশটে গন্ধ শরীরে মেখে আছে মনে হলেও দ্বিতী সরল না। বাড়িয়ে দেখাল,
“ হয়েছে সাজি আম্মু? পেরেছি? ”
সাজি আফরোজ দেখলেন। প্রশংসা করে শুধালেন,
“ এইতো। খুব হয়েছে। আরো পারবি কাটতে কাটতে। ”
দ্বিতী হাসল। পরবর্তী মাছগুলোও কাটল মনোযোগ দিয়ে। পাশে তখন এসে বসলেন সাক্ষ্যর নানু৷ মাছ কাটা দেখে বললেন,
“ একি! দেখিয়ে দেওয়ার পরও তো সুন্দর হয়নি মাছ কাটা। সত্যিই, তোমার মা তোমারে খাইয়ে পড়িয়ে বড় করেছেই কেবল। এর চাইতে তো আমাদের কণাই ভালো পারত। ”
দ্বিতী চাইল। কারোর সাথে তার তুলনা তার সহ্য হয়না। তাও কণার সাথে? দ্বিতীর আন্দাজ মতে স্বাক্ষ্যর নানু সম্ভবত কণাকে মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসেন বলেই দ্বিতীকে সহ্য করতে পারেন না। এই যেমন দ্বিতীর সাথে কণার এই নিয়ে বহুবার কথা কাটাকাটি হয়েছে। বহুবার দুইজন দুইজনকে সহ্য করতে পারছে না এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আর ওসব থেকেই সম্ভবত দ্বিতীকে উনি সহ্যই করতে পারেন না। দ্বিতী ফোঁস করে শ্বাস ফেলে জবাব দিল,
“ তাহলে বরং কণাকে ডাকুন নানু। বসে বসে মুভিই তো দেখছে। এর চেয়ে বরং কয়েকটা মাছ কেটে দিলে ভালো নয়? ”
সাক্ষ্যর আম্মু এবারে বলে উঠল,

“ উহু, দ্বিতী। এভাবে বলতে নেই আম্মু। কণা তো আমাদের বাসায় অতিথি তাই না? ও কেন করবে? ”
দ্বিতী একপলক তাকাল কেবল। কণাকে একটু বলাতেই সাজি আম্মু কথা বলল অথচ তাকে যে এত কিছু বলল একবারও কিছু বলল না? দ্বিতীর অভিমান হলো যেন।এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো সাজিয়া আফরোজ কণাকেই খুব খুব ভালোবাসে৷ বাকিদের বাসেনই না বোধহয়। এবারে সাক্ষ্যর নানুও বলল,
“ তাই তো, আমার নাতনি কেন কেবে হ্যাঁ? বউ হয়েছো তুমি। কাজ ও তো তুমিই করবে। যদি কাজকর্ম নাই পারো তাই তিড়িং বিড়িং করে বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলে কেন?”
দ্বিতী জবাবে হেসে বলল,
“ আমার আম্মু বুঝে উঠে নি এত তাড়াতাড়ি আনুষ্ঠানিক বিয়েটা হবে। নয়তো সবই শিখিয়ে পড়িয়ে পাঠাত। ”

এর পরবর্তীতে দ্বিতী আর একটা জবাবও করল না। চুপচাপ মাছ কাটল। কিন্তু সমস্যা হলো তখন, যখন মাছ কাটা শেষে মাংস কাঁটার সময় হলো। কখনো মাংস না কাটা দ্বিতী প্রথমবারের মতো মাংস কাটতে গিয়েই হাত কেটে ফেলল। আচমকায় বটির ধারালো অংশতে হাত কাটায় বেশ জঘন্যভাবেই কাঁটল হাতটা। সঙ্গে সঙ্গেই চিনচিনে এত যন্ত্রণার সাথে হাত দিয়ে বইল লাল রক্তের ধারা।দ্বিতী মুখ চোখ কুঁচকে হাত ঝাড়া দিল। যন্ত্রনা করছে কেমন! সাক্ষ্যর আম্মু ততক্ষনে আতঙ্কিত হয়ে দ্বিতীর হাতটা তুলে ধরলেন। মুখচোখ কুঁচকে ভীত হয়ে বললেন,
“ কি করলি আম্মু? কি করলি? ইশশ! কিভাবে কাটছিলি বলতো? হাতটা কেটে যে সর্বনাশ হয়ে গেল। ”
দ্বিতীর চোখজোড়া টলমলে হয়ে এল কেমন। হাতের উপর বয়ে যাওয়া তরল রক্ত গুলোর দিকে চেয়ে কান্না আটকানোর খুব চেষ্টা করল বোধহয়। ঠিক তখনই সাম্য দেখল। এক মুহূর্তেই লাফিয়ে আসতে আসতে ভাইকে কল দিয়ে বলল,

“ নিচে আসো ভাইয়া। দ্বিতুর হাতের তো সাংঘাতিক অবস্থা। ”
এইটুকু বলেই ফের ফোনটা সে পকেটে পুরল। সাক্ষ্য তখনও ছাদেই। আচমকায় কল আসা এবং কথাগুলোর অর্থ না বুঝে ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিয়ে পা বাড়াল দ্রুতই। অতঃপর এসেই দেখল সামনে বটি, কাটা মাছ এবং মাংস। সাক্ষ্য মাছের গন্ধ সহ্য করতে পারে না। বমি আসে তার। তাই কখনো বাজারেও যাওয়া হয়নি। দূরেই থাকত মাছের গন্ধ থেকে। অথচ সে সাক্ষ্যই এই মাছের গন্ধের মধ্যেই রান্না ঘরের ফ্লোরটায় লেপ্টে বসল। দ্বিতীর হাতটা এক মুহূর্তেই দুই হাতে নিয়ে বলে উঠল,
“ কে বলেছে বটি নিয়ে বসতে হ্যাঁ? কে বলেছে? বেশি পন্ডিতি না করলে হয়না দ্বিতী? এখন যে এতোটা হাত কাটল? কেন বসেছিলেন বটি নিয়ে? ”
শেষের বাক্যটা সামান্য চাপা আর গম্ভীর শোনাল যেন। যেন চাপা ধমক দিল। দ্বিতী বোধহয় কেঁদেই ফেলবে। তবুও সামলে নিয়ে উত্তর দেওয়ার আগেই সাক্ষ্যর নানু বলে উঠল,
“ আমি বলেছি কাটতে। কেন? তোমার বউ কি মানুষ না? মেয়েমানুষ হয়ে শ্বশুড়বাড়িতে মাছ কাটবে এটাই তো স্বাভাবিক। তাও ভালো পারলে তো। কাটছে কোনরকম। ”
সাক্ষ্য চাইল একপলক নানুর দিকে। দ্বিতীর রক্তে লাল হয়ে যাওয়া হাতটার দিকে একবার চেয়েই উত্তর দিল,

“ নানু, একটু বেশিই হীন মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছো না তুমি আজকাল? একটা সামান্য কথার জন্য তুমি হুট করে এমন বদলে যাও কি করে? উনার হাত কেটেছে, দেখছো নিশ্চয়? তবুও এই সময়ে তুবি যেভাবে কথা বলছো মনে হচ্ছে উনাকে এই বাড়িতে আনাই হয়েছে মাছ কাটানোর জন্য, মাংস কাটানো জন্য। তাই না? ”
এইটুকু বলেই সাক্ষ্য একবার চোখ বুঝল। দ্বিতীর টলমল করতে থাকা চোখজোড়া তার চোখের আড়াল হয়নি। এমন না যে সে খেয়াল করেনি। বরং চোখজোড়ার দিকে চেয়েই তার বুকের ভেতরটা অস্থির হচ্ছে। কেমন দমবন্ধ লাগছে৷ সে দমবন্ধ অনুভূতি নিয়েই সাক্ষ্য মায়ের দিকে চাইল। বলল,
“ বেশিই যদি মাছ কাটানোর প্রয়োজন হতো আমাকে বলতে আম্মু। বাজার থেকে কাটিয়ে আনাতাম। নয়তো রাহাকে নাহয় এক্সট্রা টাকা দিয়ে মাছগুলো কেটে দিয়ে যেতে বলতাম। তবুও সমস্যা হলে, আমায় বলতে। আমি যা পারতাম কেটে দিতাম আম্মু। কিন্তু তবুও তোমার বান্ধবীর মেয়ের হাত কাটতে দিতাম না। ”
এইটুকু বলেই থামল সাক্ষ্য। একটা শ্বাস ফেলে পরমুহূর্তেই আচমকা মাছের আঁশটে গন্ধসমেতই দ্বিতীকে কোলে তুলল। পা বাড়িয়ে রুমে গেল কয়েক মুহূর্তেই। অতঃপে পরিষ্কার বিছানাটায় দ্বিতীকে বসাতে নিতেই দ্বিতী আপত্তি করল। বলে উঠল,

“ আমার গায়ে মাছের গন্ধ সাক্ষ্য। মাছের ময়লাও আছে হয়তোবা। বিছানা ময়লা হবে। ”
সাক্ষ্যর মুখটা টানটান। মুখ শক্ত রেখে চেয়েই উত্তর করল,
“ হোক। ”
ঠিক পরমুহূর্তেই দ্বিতীকে বিছানায় বসাল। মাছের আঁশটে গন্ধে সাক্ষ্যর অন্য সময় পেট উগড়ে আসলেও আজ আসল না। বরং সময় নিয়ে বউয়ের হাত পরিষ্কার করিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিল। অতঃপর সে মাছের আঁশটে গন্ধসমেত মেয়েটার হাতেই একটা চুমু এঁকে দৃঢ় গলায় বলল,
“ যেটা পারেন না, সেটা করতে যাবে দ্বিতী। মনে থাকবে? ছোট বাচ্চা, ছোট বাচ্চার মতোই থাকবে। আপনি আপনি বলি বলে নিজেকে খুব বেশি বড় ভাববে না ওকে? নেক্সটটাইম আগ বাড়িয়ে হাত কাটলে, হাত পুড়ালে সোজা বেলকনি থেকে নিচে ফেলে দিব আমি। ”
দ্বিতী চাইল ফ্যালফ্যাল করে। তুমি করে বলছে সাক্ষ্য? বাহ! ওভাবে শুনতেই সাক্ষ্য ফের আবার রাগ রাগ মুখ করে বলল,

“ শুনতে পেয়েছেন কি বলেছি? ”
দ্বিতী মাথা নাড়িয়ে জানাল,
“ পেয়েছি। ”
“ গুড। মাথায় থাকে যেন। ”
বলেই সাক্ষ্য পা বাড়াতে নিয়েও বাড়াল না। ফের ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,
“ যান, হাতটা না ভিজিয়েই গোসল সেরে আসুন। আমি বিছানা ছাদর বদলে নিচ্ছি। এসে ঘুম দিবেন। তারপর বিকালে আম্মুর কাছ থেকে ঘুরে আসবেন। ”
“ আম্মু? ”
“ হ্যাঁ, আমার আম্মুর বান্ধবী। ”
দ্বিতী বোধহয় খুশি হলো। সাক্ষ্য হুটহাটই তাকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যায়। ঘুরিয়ে আনে। আবার কখনো বা অবাধ্য দ্বিতী মায়ের কাছে থেকেই যায়। দ্বিতী খুশি হয়েই পা বাড়াল। যেতে যেতে বলল,
“ আজ গেলে দুই মাস পর ফিরব। একেবারে সংসারী মেয়ে হয়ে আবার ফিরব। ”
সাক্ষ্য ভ্রু বাঁকায়। জবাব দিল,
“ দরকার নেই। আমার বউ যথেষ্ট সংসারী। বেশি সংসারী হলে আবার আমাকে রেখে সংসার নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। ”

“ আপনাকে তো এমনিতেও পাত্তা দিই না। ”
সাক্ষয বাঁকা হাসল। বলল,
“ জ্বী, সেটা আমি বুঝে নিব। সমস্যা নেই। ”
দ্বিতী একটু পরই ওয়াশরুমে গেল। গোসল সারল। অতঃপর গোসল শেষেই তার মনে পড়ল যে সে জামা কাপড় নিয়ে যায় নি। দ্বিতী হতাশ হলো। পরনের ভোজা জামাটার দিকে একবার চেয়েই ডাক দিল,
“ শুনছেন? আছেন আপনি? ”
সাক্ষ্য প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দরজার এপাশ থেকে উত্তর করল,
“ জ্বী, দরজার এপাশেই দাঁড়িয়ে আছি।”
দ্বিতী দরজা মেলে মুখটা এগিয়ে দেখল সাক্ষ্যকে। বলল,
“ আমার জামা কাপড় লাগবে। আনিনি। ”
সাক্ষ্য ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ তো নেননি কেন? নিষেধ করেছি আমি? ”
“ আপনি নিষেধ করলে আমি শুনতাম নাকি? ”
“ না শুনলে নিয়ে যেতেন। আমাকে বলছেন কেন? ”
সাক্ষ্যর দায়সারা ভাব দেখে দ্বিতী রেগে তাকাল। উত্তর করল,
“ আপনাকে বলছি ঘরে আপনি আছেন তাই। আমি ভেজা জামা নিয়ে ঘরে আসব? ”
সাক্ষ্য আড়ালেই বাঁকা হাসল। জবাবে বলল,

” আসুন। না করেছি? ”
“ ফ্লোরে পানি গড়াবে। এর চেয়ে ভালো জামা কাপড় দিয়ে যান। ”
সাক্ষ্য ততক্ষনে আলমারির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আলমারি মেলে হাতে জামাকাপড় নিতে নিতে বলল,
“ জামাকাপড় দিয়ে গেলে আমার লাভ কি হবে? পারলাম না দিতে। ”
দ্বিতী রাগে লাল হয়ে বলল,
“ ওকে ফাইন। ভেজা শরীরেই অপেক্ষা করব। জ্বর নামলে আম্মুকে বলব আপনার কারণে জ্বর হয়েছে। আপনার কারণে অসুখ হয়েছে।”
দ্বিতী বাকিটা বলতে পারল না। তার আগেই সাক্ষ্য হাজির হলো তার সামনে। দরজা চিপায় বাড়িয়ে রাখা ভেজা মুখটার দিকে চেয়ে হেসে ফেলল কেমন। অতঃপর হাতের কাপড়গুলো এগিয়ে ধরে ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
“ বড্ড বেশি থ্রেট দেওয়া শিখছেন ম্যাম। আমি থ্রেট দেওয়া শুরু করলে কিন্তু বাধ্য বউ হয়ে যাবেন আপনি। তখন আর এমন ঝগড়া করতে পারবেনই না। ”
“তাই নাকি? দিয়ে দেখান দেখি থ্রেট? ”
সাক্ষ্য বাঁকা হাসে। হুট করে ধীরে এক পা বাড়িয়ে এগোতে নিয়ে বলল,
“ হাত কেটেছে না আপনার? ড্রেস চেঞ্জ করা মুশকিল হবে না? আমি বরং…”
সাক্ষয প্রায় ওয়াশরুমের ভেতরেই ডান পা টা রেখে দিয়েছিল। দ্বিতী ততক্ষনে ঠেলে পা টা বের করেই আঙ্গুল উঁচাল। বলল,

“ খবরদার বলছি। পা বাড়িয়ে মানুষের প্রাইভেসি লঙ্গন করলে মামলা দিয়ে দিব মিস্টার। ”
পরপরই দ্বিতী দরজা লাগাল দপাস করে। সাক্ষ্য ততক্ষনে মুচকি হাসল। গলা উঁচিয়ে বলল,
“ প্রাইভেসি লঙ্গন হয়নি শিওর মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম? ভেবেচিন্তে বলুন, মিস্টার আর মিসেসের মাঝে প্রাইভেসিটা কি হুহ? ”
ওপাশ থেকে দ্বিতীর উত্তর এল,
“ আপনার মাথা। ”

আজ সাক্ষ্যর জন্মদিন। বিয়ের প্রায় দুই দুটো মাস হাসি, খুনসুটি, ঝগড়ায় কাটিয়ে দেওয়ার পর দ্বিতী আজ আয়োজন করে সাক্ষ্যর জন্য কেক বানিয়েছে। যে সাক্ষ্যকে সরাসরি ভালোবাসেই না এমন ভাব দেখায় তার জন্য কেক বানিয়েছে সারাটা দিন ব্যয় করে। ঘুরে ঘুরে কিয়ান আর সাদাবের সাহায্যে শপিং করেছে একগাদা। কিয়ান আর সাদাব নিজেরাও চিন্তিত এই মেয়ে এত শপিং দিয়ে করবেটা কি হুহ? অথচ তাদের বান্ধবী যে গোপনে সংসার পেতে ফেলেছে তা তো তাদের অজানা। দ্বিতী প্রিতটা গিফ্টবক্স সুন্দর করে সাজিয়েই আলমারিতে রেখেছে।অতঃপর কেক বানানো শেষ হতেই বিকাল বেলায় গেল গোসল করতে। বেশ সময় নিয়ে গোসল সেরে যখন দ্বিতী ফের রুমের বাইরে এল ঠিক তখনই দেখা গেল তার এত কষ্টের বানানো কেকটা কণার কাছে। চুরি দিয়ে পিস করে করে খাচ্ছে আরাম করে। কণা আজই এসেছিল অবশ্য। সাক্ষ্যর নানু এসেছিল এক সপ্তাহ আগে।
দ্বিতী চেয়ে দেখল নিজের কেকের হালটা। সাজিয়ে আফরোজ নিজেও তো দেখল দ্বিতী কত কষ্ট করে বানাল কেকটা। আনাড়ি হাতে কত চেষ্টার পর সফল হয়েছিল। অথচ সে কষ্টের ফলের এরূপ দশা দেখে রাগে নাক চোখ লাল হলো তার। কণা তখন শেষ পিসটা মুখে তুলতে গিয়েই দ্বিতীর দিকে চাইল। হেসে বলল,
“ কেক খাবে দ্বিতী ভাবি? বেশ মজা। তুমি বানিয়েছো নাকি? জানো? তুমি বানিয়েছো শুনেই খেয়ে নিয়েছি পুরোটা। ”

দ্বিতীর রাগ হলো। রাগে জেদে চোখজোড়া কেমন টলমল করল মেয়েটার। কণা যে ইচ্ছে করেই এটা করেছে তানতাররমুখভঙ্গিতেি স্পষ্ট। এই যে হাসছে, এই হাসিতেও বুঝা যাচ্ছে। দ্বিতী এগিয়ে বলল,
“ কেন খেলে কণা? কেকের উপরের লেখা দেখোনি তুমি?নাকি ওটাও চোখে পড়েনি? ”
“ পড়েছে। ধরে নাও পড়েছে বলেই খেয়ে ভ্যানিশ করে দিলাম কেকটা। ”
দ্বিতী এই পর্যায়ে আর রাগটা কন্ট্রোল করতে পারল না। রাগে যখন হাত পা নিশপিশ করল তখনই আঙ্গুল উঁচিয়ে বলে উঠল,
“ কি চাও কণা? সাক্ষ্যকে চাও? সরাসরি বলো, একটা বিবাহিত পুরুষের প্রতি এতো ইন্টারেস্টেড কেন তুমি? সত্যিই পেতে চাও তাকে? ”
কণা হাসল যেন। উত্তরে দায়সারা ভাবে বলল,
“ পেতে চাই না, তবে আমাকে রিজেক্ট করেছে এই রাগে তোমাদের সুখীও দেখতে পারছি না দ্বিতী ভাবি। তুমি জানি সবাই আমাকে মাথায় তুলে রাখে। সবাই! সেখানে আমায় রিজেক্ট করা? তাও তোমার জন্য? বেশি অপমান না বলো? এইজন্যই কেকটা ফিনিশ করলাম। মজাই হয়েছে কিন্তু। বেশ ভালো বানাও তো কেকটা। ”

কণার মুখে হাসি স্পষ্ট। দ্বিতী সে হাসিটা এবার আর সহ্যই করতে পারল না। কত কষ্ট করে বানিয়েছিল সে। কত চেষ্টার পর! রাগ, জেদ সমস্ত কিছু সামাল দিতে না পেরে যখন হাত নিশপিশ করে উঠল ঠিক তখনই দ্বিতী সজোরে একটা চড় বসাল কণার গালে। দাঁতে দাঁত চেপে শুধাল,
“ খুব বেশিই বেহায়ার মতো আচরণ করো তুমি কণা। কারোর বিয়েতে একই রকম পোশাক চ্যুজ করা, একই রকম পোশাক পরা, বিবাহিত ছেলের আশপাশে ঘুরঘর করা! এসব কি জানো? স্বস্তা বেহায়াপনা কণা। তুমি খুব সুন্দর বুঝেছো? দেখতে ছোট্টমতো একটা পুতুল লাগে তোমায়। তুমি চাইলেই এমন কতশত ভালো ছেলে হাজির হবে তোমার জন্য। অথচ তুমি পড়ে আছো একটা বিবাহিত পুরুষের পেছনে। লজ্জা করে না? ”
কণার চোখজোড়া বোধহয় রাগে লাল হয়ে উঠল। ফোঁসফাস শ্বাস ফেলেই বলে উঠল,
“ না লজ্জা করে না। তোমার আগে আমি ছিলাম বুঝেছো? আমি দয়া করেছি বলেই তুমি সাক্ষ্য ভাইয়ার বউ হতে পেরেছো। আমি সরেছি বলেই পেরেছো বুঝলে? আমি না সরলে পারতে না। কিছুতেই পারতে না। এই যে বড়বড় কথা বলছো এসব বলতে পারতে না?”
দ্বিতী হাসল মৃদু। বলল,

“ তাই নাকি? তুমি সরেছো বলেই আসতে পেরেছি? হাস্যকর! মানুষের সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে ঘুরঘুর করো, লজ্জা করে নাা। আর তুমি বলছো তুমি সরে গিয়েছিলে? ”
“ তৃতীয় ব্যক্তি তুমি। তুমিই! তুমিই পরে এসেছো বুঝলে? আমি নই। আমাদের বিয়ে ঠিক ছিল আরো আগে থেকে। বহু আগে থেকে। তোমার সাথে এই কয়টা মাস আগেই বিয়ে ঠিক হলো, তারপর আকদ হলো। বুঝেছো? সো আমাকে নিয়ে কথা বলতে ভেবে বলবে। ভেবে। মাইন্ড ইট।”
কথাগুলো কণা আক্রমনাত্মক হয়েই চেঁচিয়ে বলল। তাকে কখনো কেউ মারেনি। কেউ না! সেখানে দ্বিতী তাকে চড় মেরেছে। মানতে পারবে সে? দ্বিতী ততক্ষনে হেসে বলল,
“ গলা নামিয়ে কথা বলো কণা। কত বছর আগে বিয়ে ঠিক ছিল তা আমি জানতে চাইছি না। কিন্তু এখন যেহেতু উনার স্ত্রী আছে তোমার উচিত একটা বিবাহিত পুরুষের পেছনে ঘুরঘুর না করা। যদি লজ্জাশরম থাকে এরপর তুমি সাক্ষ্য এহসানের পেছনে, সামনে, পাশে কোথাও ঘুরঘুর করবে না। যদি লজ্জা শরম থাকে তাহলে তুমি উনার ত্রিসীমানায় আসবে না আজকের পর। বুঝেছো? ”
অপমানে, রাগে জেদে কেঁদে ফেলল কণা। নিজের বাম হাতের অনামিকা আঙ্গুলে থাকা রিংটা দেখাল সরাসরিই। জোর খাটিয়ে বলল,

“ চুপ, একদম চুপপপ! রিংটা দেখছো তুমি? এই রিংটা সাক্ষ্য ভাইয়া আর আমার বিয়ের জন্য পড়ানো রিং। তুমি জানোও না, তুমি আসার বহুবছর আগে থেকে আমাদের বিয়ে ঠিক ছিল। ছোটবেলা থেকে!আমি যদি না সরতাম তাহলে তুমি কিভাবে আসতে হুহ? কিভাবে? ”
দ্বিতী বোধহয় কিঞ্চিৎ বিস্ময় নিয়ে চাইল। কথার কাছে শুনেছিল কণা সাক্ষ্যকে পছন্দ করে। দুয়েকদিন নয়, কিশোরী বয়সের শুরু থেকেই। সে যেমন কথাকে দিয়ে সাক্ষ্যর খোঁজখবর নিত, ঠিক তেমনই কণাও সাম্যর মাধ্যমে সাক্ষ্যর খোঁজখবর নিত। ভালোবাসত। দ্বিতী ফোঁস করে শ্বাস ফেলেই রিংটার দিকে চেয়ে হুট করে বলল,

“ এংগেইজম্যান্ট হয়েছিল তোমাদের?”
“ একপ্রকার হয়েছিলই। ”
এ পর্যায়ে দ্বিতীর বিস্ময় বিস্তৃত হলো। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতেই ওখানে হাজির হলো সাজিয়া আফরোজ। কণাকে ওভাবে কাঁদতে দেখেই দ্রুত এগিয়ে এলেন উনি। দ্রুত জানতে চাইলেন, কি হয়েছে। কণাও এবারে ফুফিকে পেয়ে দ্রুতই গিয়ে জড়িয়ে ধরল। কাঁদতে কাঁদতে আবেগি কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ ফুফি, তোমার বাসায় আমি আর আসব না? আসব না ফুফি? সাক্ষ্য ভাইয়ার আশপাশেও আসব না? ভাবি বলেছে না আসতে। বলেছে আজকের পর ভাইয়ার ত্রিসীমানায় ও না থাকতে। ফুফি, তুমি বলো? কে তৃতীয় ব্যক্তি? কে? আমি? আমি তৃতীয় ব্যক্তি ফুফি? বলো… ”
কণা কাঁদতে কাঁদতে ইতোমধ্যেই হেঁচকি উঠে গছে মেয়েটার। কান্নায় চোখমুখ লাল হয়ে উঠেছেে।সাজিয়া আফরোজ ওর সে রূপ দেখে অস্থির হলেন। ছটফট করে অস্থির গলায় বললেন,
“ না না, আম্মু। কে বলেছে? কে বলেছে তুই তৃতীয় ব্যক্তি? কে বলেছে তুই ফুফির বাসায় আসতে পারবি না? তুই তো ফুফির একটামাত্র মেয়ে। ফুফি ভালোবাসি, ভালোবাসি তো আম্মু। কাঁদিস না..”
কণা ওভাবেই কেঁদে গেল। বোধহয় জীবনে কখনো কেউ হাত তুলেনি বলেই তার কান্নাটা সে দমাতে পারছে না। কাঁদতে কাঁদতে নেতিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। গালে হাত দিয়ে ও রাগ জেদ নিয়েই বলল,
“ আমিই তো ছিলাম প্রথমে তাই ফুফি? আমার সাথেই তো সাক্ষ্য ভাইয়ার বিয়ের কথা ছিল বলো? তোমার ইচ্ছে ছিল তো আমায় বউ করে আনার? তাই না ফুফি? বলো না.. ”
“ হ্যাঁ, হ্যাঁ আম্মু। তোমাকেই বউ করে আনার ইচ্ছে ছিল। তোমাকেই আমার ঘরের বউ করে তোলার ইচ্ছা ছিল আম্মু। কাঁদে না, কাঁদে না আম্মু। থামাও না কান্নাটা আম্মু..”
কণা কান্না থামায় না। ফের কাঁদতে কাঁদতে বলে,

।“ সাম্য ভাইও তো চেয়েছিল আমি সাক্ষ্য ভাইয়ার বউ হয়ে আসি বলো. চেয়েছিল তো? তোমরা সবাই তো চেয়েছিলে আমি সাক্ষ্য ভাইয়ার বউ হই। তাই না ফুফি? বলো, তাই না?”।
“ হ্যাঁ, হ্যাঁ, খুব করে চেয়েছিলাম আম্মু। খুব করে চেয়েছিলাম তুমি আমার ঘরে বউ হয়ে আসো৷ সবাই চেয়েছিলাম..সবাইইই! এবার কাঁদে না আম্মু..”
দ্বিতী শুধু বিস্ময় নিয়ে চেয়ে থাকল। হৃদপিন্ড থমকে যাচ্ছে তার। তাহলে কি তৃতীয় ব্যক্তিটা সেই ছিল? সেই ভুলক্রমে চলে এসেছে ওদের দুইজনের মধ্যে? এইজন্যই কি সাক্ষয প্রথমে আকদে রাজি হয়নি? আকদের পরেও এতগুলা দিন এমন দায়সারা ভাবে ছিল কি এই জন্যই? দ্বিতী বুঝে না। শুধু চোখ টলমল করে মেয়েটার। দমবন্ধ হয়ে আসে। কণা ফের বলল,
“ আমায় কেউ কখনো মারেনি ফুফি। কেউ মারেনি। কেউ না..সে আমি মার খেয়েছি। কার জন্য? সাক্ষ্য ভাইয়ার জন্য। কিসের জন্য মার খেয়েছি? সাক্ষ্য ভাইয়ার পেছনে ঘুরঘর করার জন্য,এ বাসায় আসার জন্য, কারোর সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে ডুকে পড়ার জন্য। ফুপি, ফুপি, আমায় কখনো কেউ মারেনি। কেউ না। সে আমিই কার হাতে মার খেলাম? দুইদিনের একটা মেয়ের কাছে আমি থাপ্পড় খেলাম? আমি আর আসব না ফুফি। তোমাদের বাসায় আর আসব না ফুফি। ”
কথাগুলো সাক্ষ্যর নানু নিজেও শুনল। সাজিয়া আফরোজও শুনল। বিস্ময় নিয়ে চাইতেই কণা ততক্ষনে অভিমান, অভিযোগ পুষে দৌড় দিল সদর দরজার দিকে। দ্বিতী তখনও বিস্ময় নিয়ে চেয়ে আছে। সাজিয়া আফরোজ তখন সামনে এসে দাঁড়ালেন। কণাকে অত্যাধিক ভালোবাসেন বলেই হয়তো দ্বিতীর টলমল করা চোখজোড়া উনি খেয়ালই করলেন না। শুধালেন,

“ সত্যিই কি কণাকে মেরেছিস দ্বিতী? হাত তুলেছিস আম্মু? ”
“ তুলেছি। ”
দ্বিতীর কন্ঠটা শীতল শোনাল। কিন্তু কন্ঠটা খেয়াল না করে সাজিয়া আফরোজ বোধহয় খালি উত্তরটাই শুনলেন। রাগে বলল,
“ সত্যিই তুলেছিস? কি করে পারলি দ্বিতী? কি করে পারলি ঐ বাচ্চা মেয়েটাকে মারতে? কি পিচ্চিমতো চেহারা। মারতে ইচ্ছে হলো তোর? শোন দ্বিতী, তুই যে কারণে মারলি না? তা ভিত্তিহীন। কণা তোদের সম্পর্কে তৃতীয় ব্যাক্তি নয়। কোনভাবেই না। ওর সাথেই সাক্ষ্যর বিয়ের কথা ছিল। ওর সাথেই প্রথমে বিয়ে ঠিক ছিল। ওকে বউ করে আনারই স্বপ্ন দেখেছিলাম প্রথমে। মেয়েটার অনুভূতি সরতে একটু তো সময় লাগবে বল? তুই তো বুঝিয়ে বলতে পারতি আম্মু। পারতি না? কেন মারলি বল? কেন ওকে এ বাড়ি আসতে নিষেধ করলি হুহ? ”
কথাগুলো বলেই সাজিয়া আফরোজ দ্রুত পা বাড়াল। হন্তদন্ত হয়ে ছুটলেন সদর দরজার দিকে। না জানি রাগী জেদি মেয়েটা রাগে কি করে বসে! সাজিয়া আফরোজ ছুটতে ছুটতেই নিচে গেইটের কাছাকাছি দেখলেন সাক্ষ্য সবে ফিরছর। সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষ্যকেও নিলেন সাথে। বললেন কণাকে খুঁজে দিতে।

দ্বিতী পাথরের মতো জমে রইল যেন। হ্যাঁ, সে সাক্ষ্যকে ভালোবাসত, বাসে এবং বাসবেও৷ কিন্তু তাই বলে কারোর বদলে সাক্ষ্যর জীবনে আসতে চায়নি সে। যেখানে সাক্ষ্যর পুরো পরিবার রাজি ছিল সেখানে দ্বিতীর অনাকাঙ্ক্ষিত আগমণটা মানাচ্ছে? দ্বিতী বুঝে না। তবে কান্না পাচ্ছে তার। প্রচুর কান্না পাচ্ছেে।ঠোঁট কাঁমড়ে কান্না আঁটকানোর চেষ্টা চালাতেই পাশ থেকে শুনতে পেল নানুর কন্ঠস্বর,
“ একে তো মায়ে আমার নাতিটার কপালে এই মেয়েরে গছিয়ে দিয়েছে তার উপর এই মেয়ের এত অহংকার আসে কিভাবে হুহ?! প্রথমে তো আমার নাতনিটাই বউ হওয়ার কথা ছিল। সবাই ই তো রাজি ছিল। কিন্তু পরে এর মায়ই সব পাল্টাল। আমার নাতি তো রাজিও ছিল এই মাইয়ারে বিয়ে করতে। তবুও করছেে।না পারতেই করছে অনুরোধ রাখতে। আর এখন এই মেয়ের ভাব কি? এই জন্যই বারবার বলছিলাম ভাঙা সংসারের মেয়ে না আনতে। মায়ই সংসার করতে পারেনি, মেয়ে আর কিভাবে পারবে হুহ? ”
দ্বিতীর গলা কাঁপে। নিজের কেমন যেন আহত সৈনিকের মতো বোধ হলো। যার পায়ের নিচে মাটি নেই। দ্বিতী শুকনো ঢোক গিলে কান্না আটকায়। বলে,

“ অনুরোধ রাখতে? আমার আম্মু অনুরোধ করেছিল নানু? আর.. আর ভাঙা সংসার মানে? ভাঙা সংসার বললেন কেন নানু?”
উনি মুখ ভেঙালেন। জানালেন,
“ তো ভাঙা সংসাররে ভাঙা সংসার বলব না তো কি বলব? তোমার আম্মা আব্বায় সংসার করতে পারছে হুহ?তোমারে পেটে নিয়াই তোমার মায় চইলা আসছিল বুঝছো? তোমার বাপের সংসার করে নাই এরপর আর। না তো শ্বশুড়বাড়িতে ফিইরা গেছে। তুমি আর কেমন হবা বলো? মা যেমন তেজ দেখিয়ে চলে আসছে, তুমিও তো তেমনই হবা। শোনো, তোমার আব্বা আম্মা তোমার সামনে যে সংসারটা দেখায় না? সেটা ভুয়া। তোমার জন্যই ওরা দুইজনে আলাদা থাইকাও উপরে উপরে নাটক করে। ”

দুইজনাতেই পর্ব ৩৬

“ কিসব বলছেন নানু? আমার আব্বু আম্মুরে নিয়ে যা মুখে আসছে তাই বলছেন? কেন?”
“ বিশ্বাস না হইলে তোমার আম্মুরেই জিজ্ঞেস করো গা। দেখবা গড়গড় কইো সব বলতাছে। আমরা সবাই জানি তোমার আব্বা আম্মা যে আলাদা। আমার নাতি ও জানে। তবুও তোমারে বিয়ে করছে কেন জানো? শুধু দয়া কইরা। ”
দ্বিতীর বিশ্বাসই হলো না এতগুলো কথা। কান্না আসছে তার। দমবন্ধ লাগছে। এমন অনুভব হচ্ছে যেন কেউ তাকে যত্ন নিয়ে মেরে দিচ্ছে। খু’ন না করেও খু’ন করে দিচ্ছে যেন।

দুইজনাতেই পর্ব ৩৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here