তোমার আমার গল্প পর্ব ১১
noorayn
সময়ের স্রোতে কেটে গেলো আরও একটি মাস।
আলিশা এখন প্রায় সাড়ে ছয় মাসের প্রেগন্যান্ট। পেটটা সময়ের সাথে সাথে বেড়েছে। তাকে এখন আগের তুলনায় বেশ গুলুমুলু লাগে ; দেখতেই যেন আদর আদর লাগে। আরহাম তো পারেনা সারাদিন আলিশার ফোলা ফোলা গাল দুটো টানতে। এতে যদিও আলিশা বেশ বিরক্ত হয় তবুও যেন আরহামের বর্তমানের প্রিয় একটি কাজ হলো আলিশার গাল টানা।
–আলিশা সেই কবে থেকে ঘুমিয়ে আছে। আজকাল তার বড্ড বেশি ঘুম পায়। বিছানা থেকে একদমই উঠতে চায়না। তবে এখন তাকে জাগাতে হবে ; কারন সে অনেকক্ষন যাবত কিছু খায়নি। এখন তাকে খাওয়াতে হবে।
আরহাম তার ফোলা ফোলা গাল টানতে টানতে বলছে –
“এই গোল আলু উঠ ঘুম থেকে”
“উমমম…আরেকটু ঘুমাতে দাও”
“সকাল ১০ টা বাজে এখন। উঠ, নাস্তা করতে হবে।”
“আমি পরে করে নেবো। তুমি যাও। তোমার না ক্লাস আছে?”
“তোকে না খাইয়ে কোথাও যাবোনা আমি। আমার জানা আছে, আমি চলে গেলে তুই আর খাবিনা।”
“খেয়ে নিবো সত্যি, এবার যাও।”
“উঠবি নাকি তোর মোবাইল নিয়ে যাবো সাথে করে?”
–এবার যেন আলিশা এক লাফে উঠে বসলো।
“আমার মোবাইল কেন নিবে?”
“এই আস্তে….কেউ পালিয়ে যাচ্ছেনা যে এভাবে উঠা লাগছে তোর।”
“সরো এখান থেকে, আমি উঠবো।”
“একা পারবি?”
“পারবো”
–পারবে বললেও ভারি পেটটা নিয়ে একা উঠা আলিশার জন্য এখন বেশ কষ্টদায়ক।
“হাত দাও।”
“এখন কেন? তুই না বলেছিস একা পারবি?”
–আলিশা ছলছল চোখে আরহামের দিকে তাকালো।
“ঠিক আছে, লাগবেনা তোমার হেল্প। আমি একাই পারবো।”
বলেই একা উঠতে গেলো তবে উঠার আগেই আরহাম একহাতে আলিশার হাত এবং অন্যাহাতে কোমড় ধরে উঠতে সাহায্য করলো।
“কিছু লাগবে?”
“হুম, টাওয়াল টা দাও।”
–আরহাম টাওয়াল দিতেই আলিশা তা নিয়ে ওয়াশরুম চলে গেলো ফ্রেশ হতে।
প্রায় সাড়ে ১০ টা বাজে…
–এখন আর টেবিলে কেউ নেই। সবাই অনেক আগেই খেয়ে নিয়েছে। বাকি রয়েছে কেবল আরহাম-আলিশা।
–এখন আলিশার রাতে তেমন একটা ঘুম হয়না। পুরা রাত জাগনা থাকে সে এবং সাথে আরহাম কেউ জাগনা রাখে। তাকে ঘুমাতে দেয়না। যার ফলে দুজনই সকালে দেরি করে উঠে।
–আরহাম-আলিশা ডাইনিং টেবিলে আসতেই শাইনা বেগম ওদের নাস্তা সার্ভ করলেন।
“বড় মা দুধ খাবোনা। সরিয়ে নাও প্লিজ।”
আরহাম এক পলক আলিশার দিকে চেয়ে নিজের মাকে বললো-
“মা তুমি যাও। ও কেমনে না খায় আমিও তা দেখবো।”
–শাইনা বেগম ছেলের কথামত চলে গেলেন সেখান থেকে।
–আরহাম দুধের গ্লাস হাতে নিয়ে আলিশার মুখের সামনে ধরে বললো,
“হা কর”
“আমি খাবোনা।”
“আচ্ছা পুরাটা খেতে হবেনা, অর্ধেক খেয়ে নে।”
“না মানে না, আমার বমি আসে।”
“নাক বন্ধ করে খেয়ে ফেল জলদি।”
“বলেছি তো খাবো না মানে না না না…”
“তুই দুধ খেলে আজ তোকে ফুচকা এনে দিবো লুকিয়ে লুকিয়ে।”
–ফুচকার কথা শুনেই আলিশার চোখজোড়া চকচক করে উঠলো। কতদিন হয় সে ফুচকা খায়না। প্রেগন্যান্সির পর থেকে বাড়ির কেউ তাকে বাইরের খাবার দিতে চায়না। তবুও মাঝে মধ্যে আরহাম এনে দেয় সবার থেকে লুকিয়ে।
“সত্যি বলছো তো? এনে দেবে ফুচকা?”
“হুম, একদম সত্যি।”
–অনেক কষ্টে আলিশা অর্ধেক গ্লাস দুধ শেষ করলো।
–নাস্তা শেষে ওরা উঠতে নিলেই আলিশা চিৎকার করে উঠল।
“কি হয়েছে?”
“বেবী কিক দিয়েছে।”
“কই দেখি দেখা। আমিও দেখবো।” বলেই আলিশার পেটে হাত রাখলো আরহাম তবে এবার আর বেবীর কোনো নড়চড় অনুভব করলোনা।
“কোথায় কিক দিয়েছে? আমিতো টের পাচ্ছিনা।”
“এখন আর দিচ্ছেনা।”
–আলিশা এক আঙুল দিয়ে নিজের পেটে গুতা মেরে শুধালো- “এই আবার ঘুমাচ্ছিস নাকি?”
“কি করছিস লিশা?”
“ওকে জগাচ্ছি। আবার ঘুমিয়েছে নাকি?”
“ঘুমালে ঘুমাক। তোর কি?”
“না, ওকে এখন ঘুমাতে দেয়া যাবেনা ; নয়তো পরে আমি ঘুমালে আমাকে ঘুমাতে দিবেনা।”
–আরহাম কিছু বলার আগেই ড্রইং রুম থেকে ভেসে আসলো দাদির ডাক।
দুজন কাছে যেতেই দাদি বলে উঠলো –
“আয় আমার পাশে এসে বস তোরা। তোদেরকে আমার আর মুজাহিদ সাহেবের (আরহাম এর প্রয়াত দাদা) গল্প শুনাই। কিভাবে উনি আমায় পটিয়েছিলেন।
আলিশা নাকমুখ কুঁচকে বললো –
“দাদি আর কত শুনবো? এখন তো অফ যাও।”
–আরহাম হো-হো করে হেসে আলিশাকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার জন্য বললো –
“হ্যাঁ হ্যাঁ দাদি, তুমি ওকে শুনাও। আমি আসছি এখন। আমার ক্লাস আছে।” বলেই সে প্রস্থান করলো সেখান থেকে।
আরহাম ক্যাম্পাসে পৌঁছাতেই আরাফ তাকে জিজ্ঞেস করলো –
“কিরে, আজ এতো দেরি হলো কেন?”
“আর বলিস না, লিশাটা আজকাল বড্ড জ্বালায়।”
আরহামের অসহায় মুখ দেখে আরাফ তার মজা নেওয়ার জন্য শুধালো –
“কি আর করবি? অল্প বয়সে বাপ হতে চলেছিস তাই এসব সহ্য করতে হবে নতুন আব্বায়ায়ায়া…”
“মজা নিচ্ছিস?”
“না, তা কেন নেব? উড বি আব্বায়ায়ায়ায়া…”
” বাকিরা সবাই কোথায়?”
“ক্লাসে আছে, চল।”
আরহাম কিছু সময় আগে বাড়িতে ফিরেছে।
এসেই আবার বেড়িয়ে গেলো আলিশাকে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে।
–আজ আলিশার আল্ট্রা করানো হবে।
–কিছুক্ষন পূর্বেই আলিশাকে আল্ট্রা রুমে নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে, আলিশা আল্ট্রা রুমের বেডে শুয়ে আছে আর ডাক্তার নিলুফার আলিশার পেটে সোনোগ্রাফি জেল লাগাচ্ছেন। এবং পাশেই আরহাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব অবকলোন আছে করছে।
–ডাক্তার নিলুফার আলিশার পেটে আলতো করে আল্ট্রাসাউন্ড প্রোবটি বুলিয়ে দিতে শুরু করলেন। মুহূর্তেই পাশের মনিটরের পর্দায় ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক ছোট্ট প্রাণের অস্তিত্ব। সাদা-কালো আবছা ছবির ভেতর আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল অনাগত শিশুটির ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। যেন নিঃশব্দে নিজের আগমনের খবর জানিয়ে দিচ্ছে সে।
তোমার আমার গল্প পর্ব ১০
–ডাক্তার আলিশাকে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন –
“তোমার বেবিকে দেখো আলিশা।”
–ছোট্ট একটা প্রান দেখা যাচ্ছে সেখানে। যে এখন গুটিশুটি মেরে তার মায়ের গর্ভে ঘুমিয়ে আছে।
চিত্রটি নিজের চোখের সামনে দেখতে পেয়ে; আলিশা নিঃশব্দে আরহামের হাত খামচে ধরলো।
