Home প্রফেসর জিয়ান কায়সার প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৯

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৯

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৯
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না

​ কলিংবেলের আওয়াজ পেয়ে দরজা খুললেন রিহানা কায়সার। দরজা খুলতেই ওপাশে রিত্তিকার হাতের সাদা ব্যান্ডেজটা তাঁর চোখে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
​রিত্তিকার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে রিহানা কায়সার বলে উঠলেন,
__”একি রিত্তিকা! তোর হাতে ব্যান্ডেজ কেন? কী হয়েছে রে মা?”
​রিত্তিকা শাশুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে একটু ম্লান হাসার চেষ্টা করল। তাঁর দুশ্চিন্তা কমাতে সুর নরম করে বলল,

___”আম্মা, তেমন কিছু না। একটু পড়ে গিয়ে এমন হয়েছে, আপনি শুধু শুধু চিন্তা করবেন না।”
___​”চিন্তা করব না মানে! । ঠিক করে বল তো, আসলে কী হয়েছে?” রিহানা কায়সারের কণ্ঠে এবার কিছুটা ধমকের সুর।
​রিত্তিকা আমতা আমতা করতে লাগল
___, “না… মানে… আরকি…” সে আসল সত্যিটা বলতে সংকোচ বোধ করছিল।
​এমন সময় রিত্তিকার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল জিয়া। রিহানা কায়সার জিয়ার দিকে তাকিয়ে কিছুটা গম্ভীর গলায় বললেন,
___ “জিয়া, তুই বল তো কী হয়েছে ওর? ও তো কিছু লুকাচ্ছে।”
​জিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
____”মা, আজ রিত্তিকা অনেক বড় একটা অ্যাক্সিডেন্টের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছে।একটা ভাইয়া যদি একদম শেষ মুহূর্তে এসে ওকে না বাঁচাতো, তাহলে আজ হয়তো অনেক বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেত। ”
​মেয়ের কথা শুনে রিহানা কায়সারের মুখটা শুকিয়ে গেল। তিনি রিত্তিকার মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় অথচ একটু বকা দিয়ে বললেন,
“কী বলছিস তুই জিয়া! একটু সতর্ক থাকতে পারিস না?”আর আমাদের জানানোর প্রয়োজন মনে করলি না তোরা।

___মা তখন মাথা কাজ করে নি।
​ঠিক সেই মুহূর্তে জিয়ান বাড়ি ফিরছিল। পা বাড়ালো সিঁড়ির দিকে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ড্রয়িংরুমে মা, জিয়া আর রিত্তিকার কথাবার্তা শুনে তার পায়ের গতি থমকে গেল। রিত্তিকার অ্যাক্সিডেন্টের কথা শুনতেই জিয়ানের ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে রাগে আর আশঙ্কায় রক্তিম বর্ণ ধারণ করল। তার বুকের ভেতরটা যেন তোলপাড় হয়ে গেল। কিন্তু সে নিজের ভেতরের এই ঝড় কাউকে বুঝতে দিল না। কোনো কথা না বলে, কারও দিকে না তাকিয়ে একদম গটগট করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
​রিত্তিকার চোখ এড়ালো না জিয়ানের এই আচমকা চলে যাওয়া। সে জিয়ানের ফর্সা মুখের সেই আকস্মিক পরিবর্তনটা খুব ভালোভাবেই খেয়াল করল। জিয়ানের অমন থমথমে মুখ দেখে রিত্তিকার নিজের বুকের ভেতরটাও কেমন যেন করে উঠল। সে আর এক মুহূর্তও ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে না থেকে, জিয়ানের পিছু পিছু ঘরের দিকে রওনা দিল।
​ ঘরের দরজাটা খোলাই ছিল। রিত্তিকা ভেতরে পা রাখতেই জিয়ান দরজার দিকে ঘুরে তাকাল। তার চোখে তখন যেন আগুন জ্বলছে, সেই আগুনে মিশে আছে এক তীব্র অধিকারবোধ আর চাপা ভয়।
___​”কী মনে করো তুমি নিজেকে, রিত্তিকা?” জিয়ান বেশ চড়া গলায়, অথচ ভেতরের কাঁপুনিটা লুকিয়ে প্রশ্ন করল।
​রিত্তিকা কিছুটা থতমত খেয়ে চশমাটা ঠিক করতে করতে বলল,

__”মানে? কী করেছি আমি?”
___​”খবরদার! একদম না বোঝার ভান করবা না।
জিয়ান এক পা এগিয়ে এল।
___ “তোমার সমস্যাটা কী বলো তো? একদিন হাত পোড়াবা, তো আরেক দিন অ্যাক্সিডেন্ট ঘটাবা! কী শুরু করেছো তুমি এসব? যদি আজ তোমার বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যেত? যদি তোমার কিছু হয়ে যেত, তাহলে কী হতো—একবারও কি সেই কথা ভেবে দেখেছ তুমি?”

, ____”এতে আমার কী দোষ? আমি কি নিজে গিয়ে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছিলাম?”
___​”নাহ! তোমার তো কোনো দোষই থাকে না কখনোই!” জিয়ানের কণ্ঠস্বর এবার আরও কঠোর হলো। “যখন ঠিকঠাকভাবে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে পারো না, নিজের খেয়াল রাখতে পারো না, তখন ঘরে বসে থাকলেই তো পারো! বাইরে যাওয়ার কী দরকার?
​রিত্তিকার চোখে এবার জল ছলছল করে উঠল। সে অভিমানী কণ্ঠে বলল,
___ “স্যার, আমি তো ইচ্ছা করে করিনি। একটা দুর্ঘটনা তো দুর্ঘটনাই…”
__​”জাস্ট শাট আপ!”
​জিয়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এক ঝটকায় এগিয়ে এসে রিত্তিকার দুই বাহু নিজের শক্ত দুই হাতের মুঠোয় জোরে আঁকড়ে ধরল। তার চোখ দুটো রিত্তিকার চোখের খুব গভীরে নিমজ্জিত হলো।

__​”স্যার, লাগছে তো! ছাড়ুন…” রিত্তিকা ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল।
__​”লাগুক!” জিয়ান যেন আজ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।
___​”আহ, স্যার! সত্যি অনেক লাগছে…” রিত্তিকার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
​রিত্তিকার চোখের জল দেখে জিয়ানের হাত দুটো একটু শিথিল হলো, কিন্তু তার জেদ কমল না। সে রিত্তিকার চোখের দিকে তাকিয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার মতো করে বলল,
___”কাল থেকে তুমি একা কোথাও যাবে না। আমার সাথে যাবে, আমার সাথেই আসবে। মাইন্ড ইট!”
​কথাটা বলেই জিয়ান আর এক সেকেন্ডও রুমে দাঁড়াল না। তীব্র এক অভিমানে আর রাগে রুম থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল। রিত্তিকা বিছানার কোণে বসে নিজের বাহুটার দিকে তাকিয়ে রইল, যেখানে জিয়ানের আঙুলের ছাপ বসে গেছে। ব্যথাটার চেয়েও জিয়ানের এই অদ্ভুত অধিকারবোধ তাকে বেশি নাড়া দিল।

​পরদিন সকাল। গতদিনের সব ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে প্রকৃতিতে তখন এক নতুন স্নিগ্ধতা। সকালের কাঁচা সোনা রোদ জানলার পর্দা গলে সরাসরি এসে পড়েছে রিত্তিকার ফর্সা মুখে। ঘরের ভেতরে মৃদু সুগন্ধি আর জানলা দিয়ে আসা হালকা বাতাসের দোলা একটা শান্ত পরিবেশ তৈরি করেছে।
​আলোটা সরাসরি চোখে এসে পড়ায় রিত্তিকা একটু উসখুস করল। ঘুমের ঘোরেই সে গায়ের নরম কমফোর্টারটা টেনে সম্পূর্ণ মুখটা লুকিয়ে ফেলল। আরও কিছুটা সময় এই ওমে ডুবে থাকতে চাইল সে।
​ঠিক তখনই জিয়ানের গম্ভীর অথচ শান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
__ “রিত্তিকা, ওঠো।”
​কমফোর্টার ভেতর থেকেই রিত্তিকা একটু জড়িয়ে যাওয়া গলায় বলল,
__”নাহ… আর একটু ঘুমাবো।”
​জিয়ান খাটের পাশে এসে দাঁড়িয়ে কমফোর্টারের এক কোণ একটু টেনে দিয়ে বলল,
___”ভার্সিটি যেতে হবে, জলদি ওঠো। তুমি অসুস্থ, কাল অত বড় একটা ধকল গেছে বলে খুব সকালে ডাকিনি। কিন্তু এখন আর দেরি করা যাবে না, তাড়াতাড়ি ওঠো।”
​রিত্তিকা কমফোর্টারটা মুখ থেকে সামান্য নামিয়ে চোখ দুটো পিটপিট করে তাকাল। আধো-বোজা চোখে মিনতি করে বলল,
__ “আর একটু ঘুমাই না, স্যার? প্লিজ…”
__​”আর এক মিনিটও না!” জিয়ানের কণ্ঠে কোনো আপস নেই। সে আর কথা না বাড়িয়ে রিত্তিকার সুস্থ হাতটা আলতো কিন্তু দৃঢ়ভাবে ধরে টেনে বিছানা থেকে বসিয়ে দিল। রিত্তিকা অগত্যা চোখ ডলতে ডলতে বিছানা ছাড়ল।

​ক্লাস শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে রিত্তিকা আর জিয়ান একসাথে ভার্সিটিতে এসে পৌঁছাল। আজ জিয়া আসেনি ভার্সিটিতে।
​গাড়ি লক করে জিয়ান রিত্তিকার দিকে তাকাল। তার চোখে সেই চেনা গম্ভীর ভাব। সে নিচু গলায় বলল,
__”শোনো, ক্লাস শেষ হলে অন্য কোথাও যাবে না। ঠিক এই লবির সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে। আমি এসে তোমাকে নিয়ে যাব।”
​রিত্তিকা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে বলল,
__ “আচ্ছা।”
​দুপুরের দিকে ক্লাস শেষ হতেই রিত্তিকা জিয়ানের কথা মতো করিডোরের একপাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। ভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। রিত্তিকা ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল, ঠিক তখনই খুব চেনা এবং একটু চঞ্চল একটা কণ্ঠস্বর তার কানে এল—
__​”বার্বি!”
​রিত্তিকা চমকে উঠে ডানদিকে তাকাল। তার চেনা সেই চওড়া হাসিটা দেখে রিত্তিকার মুখে এক চিলতে আনন্দ খেলে গেল।
__”আনু ভাইয়া! তুমি?”
​আহনাফ এগিয়ে এসে রিত্তিকার ঠিক সামনে দাঁড়াল। তার চোখে গভীর উদ্বেগ। রিত্তিকার ব্যান্ডেজ করা হাতটার দিকে ইঙ্গিত করে সে জিজ্ঞেস করল,

__ “হাত কেমন আছে তোর এখন? খুব বেশি ব্যথা করছে?”
​রিত্তিকা হেসে মাথা নাড়ল,
__”ভালো। এখন আর আগের মতো বেশি ব্যথা নেই।”
__​”কী করিস এখানে দাঁড়িয়ে একা একা? বাড়ি যাবি না?” আহনাফ এদিক-ওদিক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
__​”হ্যাঁ যাবো তো। স্যারের জন্য অপেক্ষা করছি। উনি আসলে ওনার সাথে তারপর যাবো।”
​আহনাফ একটু অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
__ “কোন স্যারের সাথে বাড়ি যাবি তুই?”
__​”প্রফেসর জিয়ান কায়সার।”
__​”ওহ, মিস্টার কায়সার! এসেই ওনার অনেক নাম শুনেছি, খুব কড়া আর ট্যালেন্টেড নাকি। কিন্তু তুই ওনার সাথে কেন যাবি?” আহনাফের চোখে তখন একরাশ কৌতূহল।
​রিত্তিকা একটু ইতস্তত করল, তারপর চট করে এদিক-ওদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

__”উনি তো আমার হাজবেন্ড, আনু ভাইয়া।”
__​”কীহ!” আহনাফ যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে এতটাই অবাক হলো যে তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। “তোর বিয়ে হয়ে গিয়েছে? বলিসনি তো আমায়! তুই এত বড় একটা খবর লুকিয়ে গেলি?”
​রিত্তিকা মন খারাপ করে বলল,
___ “লুকাইনি তো। তোমার সাথে যোগাযোগ করার অনেক চেষ্টা করেছি আনু ভাইয়া। কিন্তু কোনোভাবেই পারিনি।”
​আহনাফ মাথায় হাত দিয়ে বলল,
___”ওহ, আসলে আমার পুরনো সিমটা হারিয়ে গিয়েছিল রে। আর তোদের কারও নতুন নাম্বার তো আমার মুখস্থ ছিল না, তাই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।”

​দুজনে যখন এভাবে পুরনো দিনের কথা বলে হাসাহাসি করছিল, ঠিক তখনই জিয়ান সেই করিডোর দিয়ে আসছিল। দূর থেকেই সে রিত্তিকাকে একটা ছেলের সাথে এত প্রাণখুলে হাসতে দেখল। জিয়ানের পায়ের গতি ধীর হয়ে গেল। সে স্পষ্ট শুনতে পেল—এই ছেলেই গতকাল রিত্তিকাকে বাঁচিয়েছে, আর রিত্তিকা তাকে অত্যন্ত আপন করে ‘আনু ভাইয়া’ বলে ডাকছে।
​বুকের ভেতর এক তীব্র হিংসা আর ঈর্ষার আগুন জ্বলে উঠল জিয়ানের। সে আর দেরি না করে সোজা তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোয়াল শক্ত, মুখাবয়ব পাথরের মতো শক্ত।
​রিত্তিকার দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে জিয়ান বলল, __”তোমার গল্প শেষ হলে চলি আমরা? আমার অনেক কাজ আছে।”
​জিয়ানের হঠাৎ আবির্ভাবে রিত্তিকা থতমত খেয়ে গেল। সে আমতা আমতা করে বলল,
__ “আনু ভাইয়া… ইনি জিয়ান স্যার।”
​আহনাফ জিয়ানের দিকে তাকিয়ে অমায়িক একটা হাসি দিল। ভদ্রতা খাতিরে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

__ “হাই মিস্টার কায়সার। আমি আহনাফ।”
​জিয়ান আহনাফের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে একবার তাকাল, কিন্তু হ্যান্ডশেক করল না। সে অত্যন্ত শীতল গলায় শুধু বলল,
__ “হ্যালো।”
​কথাটা বলেই জিয়ান রিত্তিকার উত্তরের অপেক্ষা না করে হনহন করে পার্কিং লটের দিকে চলে গেল।
​তা দেখে রিত্তিকা খুব অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে আহনাফের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
___”কিছু মনে করো না আনু ভাইয়া। উনি… উনি আসলে এমনই একটু গম্ভীর প্রকৃতির। কারও সাথে সহজে মেশেন না।”
​আহনাফ মুচকি হেসে রিত্তিকার মাথায় আলতো টোকা দিয়ে বলল,
___”আরে না, আমি কিছু মনে করিনি। তুই যা, তোর ‘উনি’ না হলে তোকে ছাড়াই একাই চলে যাবে। রাগী প্রফেসর বলে কথা!”
​রিত্তিকা একটু হাসল,
__ “আচ্ছা আসি তাহলে। বাসায় এসো কিন্তু এক দিন!”

​বাসায় ফেরার পর থেকেই ঘরের ভেতরের পরিবেশটা থমথমে। জিয়ান ঘরে এসেই ল্যাপটপ খুলে টেবিলে বসে পড়েছে। সে টাইপ করছে, স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে—বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে সে কাজে ভীষণ মগ্ন। কিন্তু আসলে তার মন ল্যাপটপের স্ক্রিনে একদমই নেই। তার মনের পর্দায় বারবার ভেসে উঠছে ভার্সিটির সেই দৃশ্যটা। রিত্তিকা কীভাবে আহনাফের দিকে তাকিয়ে হাসছিল, কীভাবে তাকে ‘আনু ভাইয়া’ বলে ডাকছিল, আর কীভাবে আহনাফ তার দিকে তাকিয়ে কথা বলছিল। প্রতিটা স্মৃতি জিয়ানের ভেতরটাকে পুড়িয়ে দিচ্ছিল।
​অনেকক্ষণ হয়ে গেল তারা বাড়ি ফিরেছে, কিন্তু রিত্তিকা ঘরে আসছে না। জিয়ান কাজের ভান করতে করতেই বারবার আড়চোখে ঘরের দরজার দিকে তাকাচ্ছিল। তার অস্থিরতা প্রতি মুহূর্তে বাড়ছিল।
​ঠিক কিছুক্ষণ পরই রিত্তিকা গুটিগুটি পায়ে ঘরে প্রবেশ করল। জিয়ান চট করে নিজের চোখ দুটো ল্যাপটপের স্ক্রিনে ফিরিয়ে নিল। সে এমন একটা ভাব করল যেন রিত্তিকার আসাটা সে খেয়ালই করেনি, সে তার কাজে ভীষণ ব্যস্ত।
​এদিকে রিত্তিকা বিছানার এক কোণে বসল। সে নিজের বাম হাত দিয়ে ডান হাতের ব্যান্ডেজটা খোলার চেষ্টা করতে লাগল। ব্যান্ডেজের গিঁটটা বেশ শক্ত ছিল। রিত্তিকা এক হাত দিয়ে সেটা টানতেই কাটা জায়গায় টান লাগল এবং সে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল।

__”আহ!”
​সে বারবার চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হচ্ছিল। ব্যথার চোটে তার চোখ মুখ কুঁকড়ে যাচ্ছিল।
​ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ থাকলেও জিয়ানের কান দুটো রিত্তিকার দিকেই ছিল। রিত্তিকার ব্যথার শব্দ শুনতেই সে আর স্থির থাকতে পারল না। ল্যাপটপটা একপাশে সরিয়ে রেখে সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসল।
​রিত্তিকার ঠিক পাশে বিছানায় বসে, তার ব্যান্ডেজ করা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে জিয়ান কিছুটা রাগী কিন্তু ভেতরের আর্দ্রতা মাখানো গলায় বলল,
__”যা পারো না, তা করতে যাও কেন? দেখি, হাতটা দাও।”
​ সে ঝটকা দিয়ে নিজের হাতটা টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে অভিমানী গলায় বলল,
__ “থাক, লাগবে না। আপনার কাজ করুন গিয়ে, আমার আপনাকে সাহায্য করা লাগবে না। আমি একাই পারব।”

​জিয়ানের ভেতরের ঈর্ষার বারুদটা এই কথায় যেন ফেটে পড়ল। সে রিত্তিকার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে, তার চোখের দিকে তাকিয়ে তীব্র তাচ্ছিল্য ও ক্ষোভের সাথে বলল—
__​”আমার সাহায্য কেন নিবে? ওই লোকটার সাহায্য নিবে, তাই না? ও তো খুব ভালো সাহায্য করতে পারে!”
​রিত্তিকা অবাক হয়ে জিয়ানের চোখের দিকে তাকাল। জিয়ানের চোখের সেই লালচে আভা আর তীব্র অধিকারবোধ দেখে সে একটু থমকে গেল, কিন্তু নিজের জেদ বজায় রেখে বলল,
___”কোন লোকটা? কার কথা বলছেন আপনি?”
___​”ভার্সিটিতে যার সাথে এত হাসিমুখে কথা বলছিলে! ওই যে… তোমার আনু ভাইয়া!” জিয়ান নামটা উচ্চারণ করার সময় তার গলার আওয়াজটা যেন আরও ভারী হয়ে গেল।

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৮

___​”হ্যাঁ! আনু ভাইয়া সাহায্য করলে আমি নিশ্চয়ই তাঁর সাহায্য নেবো। উনি তো অনেক ভালো, সেদিন তো উনিই আমার জীবন বাঁচিয়েছেন। ওনার সাহায্য নিতে আমার কোনো আপত্তি নেই!”
​রিত্তিকার এই সোজাসাপ্টা জবাবে জিয়ানের চোখ দুটো যেন আরও চওড়া হয়ে গেল, ঘরের ভেতরের বাতাসটা জিয়ানের ভারী নিশ্বাসে এক অদ্ভুত ভালোবাসার ও অভিমানে ভরে উঠল।

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here