ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯৪
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই
প্রীতম একটা বিশাল হাই তুলে চোখের পাতা ডলতে ডলতে আনমনে সিঁড়িতে পা ফেলছে।
চোখ-মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। মধ্যরাতে একটা আগা মাথা ছাড়া স্বপ্ন দেখে ঘুমটা গেছে চটকে গেছে অনেক আগে। বেশ কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করেও আর ঘুম আসেনি। তাই অযথা ঘুমের ভান না ধরে উঠে চলে এসেছে প্রীতম।
এবার সোফায় বসে আরাম করে কফি খেতে খেতে সপ্তাহ ভরে জমিয়ে রাখা কাজ গুলো ভোর হওয়ার আগেই শেষ করে ফেলবে প্রীতম।
যা হয় ভালোর জন্যই হয়।
কথাটা মনে মনে আওড়ে কিচেনের দিকে পা বাড়াতেই উত্তর দিকের জানালাটা ধারাম করে শব্দ করে উঠলো। বার বার জানালার পাল্লা গ্রিলের সাথে বাড়ি খেয়ে বিকট শব্দ উৎপন্ন করছে। বাতাসের প্রলয়ংকারী শুশু শব্দ বলছে, বাহিরে কোনো অভিশপ্ত ঝড়ের তান্ডব চলছে।
লম্বা নিঃশ্বাস টানলো প্রীতম। এগিয়ে গিয়ে খুলা জানালাটা বন্ধ করে দিলো। পর্দা টেনে পেছনে তাকাতেই ভ্রু কুচকে গেলো প্রীতমের।
ডাইনিং এরিয়াতে চুপচাপ বসে আছে প্রিয়তা।
প্রীতম সোজা দেওয়াল গড়িতে দৃষ্টিপাত করলো।
ইংরেজ আমলের বিশাল কাটাযুক্ত ঘড়িটা ঢং ঢং করে জানান দিচ্ছে, রাত দুটো বেজে ৪৫ মিনিট।
বাহিরে ঝড়, আর ভেতরে মৃত্যুপুরি সমতুল্য নিরবতা।
প্রীতম এগিয়ে গেলো প্রিয়তার নিকট। বোনের পাশে বসে অবাক কন্ঠে শুধালো—
— “বোন, তুই এত রাত অবধি এখনো জেগে আছিস কেন? জানিস না, এই টাইমটা কতটা সেন্সেটিভ?”
প্রিয়তা নির্বিকার। ভাইয়ের স্নেহমাখা কণ্ঠের শাসনবাণী তার কর্নে পৌঁছাল কি না, বোঝা গেল না।
— “বোন, কিছু বলছি তো আমি!”
শব্দের তীব্রতা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা অধিক হতেই কেঁপে উঠল প্রিয়তা। চমকে তাকাল প্রীতমের দিকে, যেন গভীর কোনো কল্পনার জগৎ থেকে ছিটকে পড়েছে বাস্তবিক দুনিয়ায়।
প্রিয়তার চোখ-মুখের অবস্থা দেখে ভড়কে গেলো প্রীতম। ফোলা ফোলা রক্তবর্ণ চোখ দুটো দেখে মনের কোণে বাসা বাঁধল অজানা আশঙ্কা।
ব্যাথিত হলো প্রীতম। অদ্ভিগ্ন কন্ঠে শুধালো—
— “কী হয়েছে আমার লক্ষ্মী বোনটার? দেখি দেখি, তাকা আমার দিকে। কেঁদেছিলি নাকি? কোনো সমস্যা? দেখ, তোর ভাই আছে তো! যার ভাই আছে, তার কিসের চিন্তা বল? কী হয়েছে, পাখি? বল তোর ভাইয়াকে।”
প্রীতম আরও কিছু বলতে গিয়েও একদম চুপ হয়ে গেল। বলা বাহুল্য, তার কলিজার টুকরো বোনের কান্নার শব্দ তাকে চুপ করিয়ে দিল।
ভাইয়ের বুকে মুখ গুঁজে উচ্চস্বরে কেঁদে উঠলো প্রিয়তা। হেঁচকি তুলে থেমে থেমে বলল—
— “আমার প্রণয় ভাইকে এনে দাও না ভাইয়া। উনাকে আমি পাচ্ছি না। কোথাও পাচ্ছি না। উনি সেই বিকেলে বলেছিলেন উনি আসছেন, কিন্তু মধ্যরাত হয়ে গেলো, এখনো আসেননি। একটা ফোন ও করেননি।
আমার মন বলছে, কিছু একটা ভুল হচ্ছে ভাইয়া। আমার ভয় হচ্ছে উনাকে নিয়ে। উনার শত্রুর অভাব নেই। কেউ যদি আমার প্রণয় ভাইকে বিপদে ফেলে! কোনো ক্ষতি করে ও ভাইয়া, কিছু করো!”
প্রিয়তার কথাগুলো জড়ানো, অস্পষ্ট। তবুও নিজের মতো করে বুঝে নিল প্রীতম। আর যতটুকু বুঝল, তাতেই তাজ্জব বনে গেল সে। তার ভাই নিখোঁজ, এটা হতেই পারে না। আবার তার ভাই নিজের জানকে কথা দিয়ে কথা রাখবে না, এটাতো অসম্ভব। মনে হচ্ছে, সত্যিই কোথাও কোনো বড় গণ্ডগোল হচ্ছে।
প্রীতম সব চিন্তা এক পাশে রেখে বোনের চিন্তাগ্রস্ত মুখের পানে চাইল।
সুন্দর লাবণ্যময়ী মুখটা কয়েক ঘণ্টার দুশ্চিন্তায় শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। কাঁদার ফলে হয়তো মাথাও ব্যথা করছে। এই অবস্থায় অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করে প্রেশার ফল করলে মিসক্যারেজ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে।
প্রীতম লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলে প্রথমে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। কণ্ঠের উদ্বেগ কিছুটা দমিয়ে স্বাভাবিক হয়ে বলল—
— “ওহ, এই ব্যাপার? ধুর পাগলী, এটা কোনো চিন্তা করার মতো বিষয় হলো? আসলে ভুলটা আমারই। আমি তোকে বলিনি? দাদান সন্ধ্যার দিকে আমাকে ফোন করেছিল।”
প্রীতমের কথায় লাফিয়ে সোজা হয়ে বসল প্রিয়তা। নতুন আশার আলোয় নীলাভ চোখ দুটো ঝিলিক দিয়ে উঠল। উচ্চস্বরে শুধালো—
— “সত্যি বলছ, ভাইয়া? কোথায় উনি?”
— “হ্যাঁ, একদম সত্যি বলছি। আমি কাজের চাপে তোকে বলতেই ভুলে গেছি। দাদান আমাকে সন্ধ্যায় ফোন করেছিলেন। বলেছেন, তোকে জানাতে যে তিনি কী যেন খুব দরকারি কাজে রাজশাহী যাচ্ছেন। ২-১ দিনের মধ্যেই ফিরে আসবেন। তুই যেন চিন্তা না করিস।”
— “তাহলে, তাহলে ফোন কেন যাচ্ছে না?”
বোনের কণ্ঠে উপচে পড়া অস্থিরতা। মিথ্যে বলতে বিবেকে বাঁধছে প্রীতমের, তবুও সে বাধ্য।
হাসার চেষ্টা করল প্রীতম। প্রিয়তার মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহ মাখা কন্ঠে বলল—
— “দেখ, হয়তো ব্যাটারি শেষ হয়ে গেছে। কিছু একটা হবে হয়তো। তুই একদম চিন্তা করিস না তো। যা, গিয়ে শুয়ে পড়। তোর কিন্তু পর্যাপ্ত ঘুমের প্রয়োজন। দেখ, সকাল হয়ে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই।”
যাওয়ার কথা শুনে মুখটা শুকিয়ে গেল প্রিয়তার। প্রীতমের হাত চেপে ধরে ব্যাকুল কণ্ঠে বলল—
— “না, না, আমি ঘুমাবো না। আমি অপেক্ষা করি।”
প্রীতমের চোখে অসহায়ত্ব ভরে গেলো। তার মিথ্যে আশ্বাসে প্রিয়তার অস্থিরতা যে কমেনি, তা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে প্রীতম। শুধু মাত্র ভাই বলেই হয়তো তার বানানো কথাগুলো বিশ্বাস করে নিয়েছে। কিন্তু মন কি আর মিথ্যে বলে?
নিজের যন্ত্রণা নিজের মধ্যেই দমিয়ে রাখল প্রীতম। চেহারার ভাবমূর্তিতে প্রকাশ পেতে দিলো না। ধমকে উঠল বোনকে। শাসনের সুরে বলল—
— “এই বয়সেও যদি আমার হাতে মার খেতে না চাস, তাহলে চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়। সারারাত না ঘুমিয়ে পেঁচার মতো জেগে বসে থাকলে কি দাদান চলে আসবে? ঠিক আছে, তোকে তোর ঘরে ঘুমাতে হবে না। তুই গিয়ে ইনুর পাশে শুয়ে পড়। আমি আর ঘুমাবো না।”
— “কিন্তু ভাইয়া…”
— “চুপ! আর কোনো কিন্তু নয়। এক্ষুনি যা!”
প্রিয়তা আর ভাইয়ের মুখে মুখে কোনো তর্ক করতে পারল না। উঠে গেল। কিন্তু অজানা এক কারণে মনটা কোনো মতেই শান্ত হতে চাইছে না তার। ভাইয়া তো বলল, প্রণয় ভাই বলে গেছেন। তবুও কেন এত অস্থির লাগে, আল্লাহ!
হঠাৎ করে মন খারাপ হয়ে গেল প্রিয়তার। রমণীর মনের ঈসান কোন গর্জে উঠল অভিমানের কালো মেঘ। বিড়বিড় করে বলল—
— “কেন ভাইয়াকে ফোন করে বলা গেল, আমাকে কী বলা যেত না? খারাপ লোক! আরে বাবা, ভাইয়ের থেকে তো আমার চিন্তা বেশি হয়, নাকি?”
— “এই মুটকি, সর ওদিকে! পুরো বিছানা কি একাই দখল করে শুবি নাকি? আমাকেও একটু জায়গা দে, মেরি মা!”
ঘুমের মধ্যে সামান্য নড়ে উঠল ইনায়া। একপাশে অভিরাজ, অপরপাশে যতটুকু জায়গা ছিল, সব টুকুতে হাত পা মেলে দিয়ে মরার মতো ঘুমোচ্ছে ইনায়া। ওর ঘুমানোর কায়দা দেখে নাক সিটকালো প্রিয়তা।
ইনায়া ঘুমের মধ্যে দু’হাত মেলে এদিক-ওদিক হাতড়াচ্ছে আর বিড়বিড় করে বলছে—
— “পেয়ারেলাল… মেরি পেয়ারেলাল, আলু পটল- জিঙ্গের বাপ, একটা চুমু দাও! আলু পটল তো হলো, এবার কিন্তু আমার একটা জিঙ্গা লাগবে।”
— “বেশরম আওরাত! এতো আলু পটল জিঙা দিয়ে কী সবজির দোকান দিবি? কিছু তো শরম কর। চোখ খুলে দেখ, আমি তোর জামাই নই। ঘুমের মধ্যেও আমার ভাইটাকে চুষে খাওয়ার ধান্দায় আছিস? এইজন্যই আমার ভাইয়ের রক্তস্বল্পতা দেখা দেয় কিছুদিন পরপর!”
প্রিয়তার এসব মৃদু শোরগোল ইনায়ার কানের কাছে মশার ভ্যানভ্যান ছাড়া কিছুই মনে হলো না। সে তার নিজের মতো একনাগাড়ে বিড়বিড় করতেই থাকল। ওর এসব আবোলতাবোল বকবকানি শুনে বিরক্তির মাত্রা সপ্তম আকাশে চড়ে গেল প্রিয়তার। ঠেলা ধাক্কায় কোনোভাবেই ইনায়ার কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙাতে সমর্থ হলো না। এবার রেগে গেল প্রিয়তা। দাঁত চিপলো।
— “আচ্ছা বেটা, তুমি এভাবে মানবে না? ঠিক আছে। আমার কাছেও তোমার জন্য ‘প্ল্যান বি’ রেডি আছে।”
ঘুমের মধ্যে হঠাৎ হাঁসফাঁস করতে শুরু করলো ইনায়া। অক্সিজেনের অভাব মস্তিষ্কে পৌঁছালো দ্রুতই। পাঁচ-সাত সেকেন্ড ছটফট করে ধড়ফড়িয়ে জেগে উঠলো ইনায়া। লাফিয়ে বসে চিৎকার দিয়ে উঠলো—
— “কে? কে? কে?”
— “চুপ।”
ধমক খেয়ে চুপসে গেলো ইনায়া। ওর নাকের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিলো প্রিয়তা। দাঁত খিঁচিয়ে বললো—
— “তোকে ঘুমের মধ্যে রেখে যদি আমার ভাইকে দ্বিতীয় বিয়ে করিয়ে দেই, মনে তো হয় না তুই বুঝতে পারবি।”
ইনায়া বোম হয়ে গেলো।
— “কোন কোন চুন্নিরে আমার জামাইকে বিয়ে করতে আসবে, শুধু একবার আসুক! নিচের বাঁশঝাড়ে এমন আগুন লাগাবো!”
বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গেলো ইনায়া। ভ্রু কুঁচকে তাকালো প্রিয়তার পানে।
— “এক মিনিট, তুই এতো রাতে নিজের জামাই রেখে এখানে কী করিস? আর আমার জামাই কই? আমার আলু পটল-এর বাপ কই?”
— “ধুর বাল! সর তো, মাথা ঝিমঝিম করছে। আমায় শুতে দে।”
ইনায়াকে ঠেলে সরিয়ে শুয়ে পড়লো প্রিয়তা।
— “ওই ঘরে প্রণয় ভাই ছাড়া ঘুম আসবে না। নাহলে এই পাণ্ডার পাশে কে আসে?”
প্রিয়তাকে ঠেলতে শুরু করলো ইনায়া। গাল ফুলিয়ে বললো—
— “এই! এই! তুই আমার জামাইয়ের জায়গায় শুয়ে পড়ছিস কেন? আহা, এটা আমার জামাইয়ের জায়গা। তুই কি আমার জামাই? তোর জামাই কই? তুই তোর জামাইয়ের সাথে শুবি। উঠ! উঠ! বলছি আমার জামাইয়ের জায়গা থেকে!”
ঝকাঝকিতে চরম মাত্রায় বিরক্ত হয়ে প্রিয়তা ঝাড়ি দিয়ে বললো—
— “উফ! মশার মতো কানের পাশে ঘ্যানঘ্যান করছিস না তো? ধরে নে আজ রাতের জন্য, আমি তোর জামাই। তোর কি মনে হয় আমার জামাই ঘরে থাকলে আমি তোর পাশে শুতে আসতাম? একটু বেশি স্বপ্ন দেখিস তুই।”
— “কীইই! আমার বাশুর বাড়ি নেই?”
— “না।”
মাথা চুলকে প্রিয়তার গা ঘেঁষে শুয়ে পড়লো ইনায়া। দুষ্টু হেসে ভ্রু নাচিয়ে বললো—
— “ভালোই হলো, বান্ধবী?”
— “হুম।”
— “তোর গা থেকে নাকি সেক্সি একটা গন্ধ আসে! ইচ্ছা করছে চিবিয়ে ফেলি। আচ্ছা, গায়ে কী মাখিস তুই? আগে তো এতো সুন্দর গন্ধ ছিলো না?”
— “স্বামীর ভালোবাসা।”
চোখ বন্ধ রেখেই প্রত্যুত্তর করলো প্রিয়তা।
— “স্বামীর ভালোবাসা তো আমিও মাখি, কই আমার গায়ে তো এতো সুন্দর গন্ধ নেই?”
— “হয়তো তোমার ভালোবাসায় ভেজাল আছে। ভেজাল থাকলে হবে না।”
খেঁকিয়ে উঠলো ইনায়া—
— “বাজে মহিলা!”
— “এই বান্ধবী, তোকে একটা চুমু খাই?”
— “আমার হরমোনে কোনো সমস্যা নাই। তোর পাশে শুয়েছি বলে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা ভুলেও করবি না। তোর ভাব-সাব সুবিধের লাগে না আমার।”
ঠোঁট কামড়ে হাসলো ইনায়া। প্রিয়তার মেহেদিন মসৃণ কোমরে হাত রেখে পুরুষদের মতো হর্নি আওয়াজে বললো—
— “বান্ধবীইইইই! আমাদের সম্পর্কের কয় বছর হয়েছে?”
— “১৫ বছর।”
চোখ বন্ধ রেখেই জবাব দিলো প্রিয়তা।
ইনায়া আরেকটু প্রিয়তার দিকে চেপে এলো।
— “১৫ বছর কিন্তু অনেক সময় একে অপরকে বোঝার জন্য। তো তোর মনে হয় না এখন আমাদের ফিজিক্যাল হয়ে যাওয়া উচিত?”
ইনায়ার এক বাক্যে ফট করে চোখ মেলে তাকালো প্রিয়তা। সবার আগে মুখ থেকে বের হলো—
— “আস্তাগফিরুল্লাহ!”
কাঁধে মুখ ঘষতে লাগলো ইনায়া। বান্ধবীকে চটিয়ে দেওয়ার একটা সুযোগও সে মিস করতে চায় না। ওর বদমাইশি দেখে ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেললো প্রিয়তা। মনে মনে ভাইয়ের ধৈর্যের শক্তির তারিফ করলো ভীষণ। এতো হর্নি মহিলা সামলানো নেহাত চার্টিখানি কথা নয়।
— “বেবি, মে আই?”
বাঁকা হাসলো প্রিয়তা। মেঝের দিকে ইশারা করে বললো—
— “এখন যদি তোকে বিছানা থেকে লাথি দিয়ে এখানে ফেলে দেই, তাহলে আগামী এক মাস তুই ফিজিক্যাল হতে পারবি না। বাড়ি থেকে হসপিটাল আর হসপিটাল থেকে বাড়ি, এভাবেই চক্কর কাটবি আর মাজার ব্যথায় আহ্ উহ্ করবি।”
মুখ চুপসে গেলো ইনায়ার। দুই সেকেন্ডের নীরবতার পর একসাথে হেসে উঠলো দুই বান্ধবী। ইনায়া আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো প্রিয়তাকে।
— “আরে আরে! আস্তে ধর, শ্বাস আটকে মরে যাবো তো!”
শোয়ার পরও অনেকক্ষণ ছটফট করতে করতে ধীরে ধীরে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে প্রিয়তার। হালকা হালকা তন্দ্রা ভাব চলে আসে। ঘুমের মধ্যেও প্রণয়ের জন্য ছটফট করতে থাকে মেয়েটা।
প্রায় মিনিট কুড়ি পর হঠাৎ ‘টুং টুং’ করে আসা অসংখ্য মেসেজের বেসুরো নোটিফিকেশনে হালকা ঘুমটা চট করে ভেঙে গেলো প্রিয়তার। ইনায়াকে ছাড়িয়ে উঠে বসলো সে। অলস ভঙ্গিতে সাইড টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নেয় প্রিয়তা। এই ভোর রাতে কে মেসেজ করেছে ভাবতে ভাবতে ফোন স্ক্রিনে চোখ যেতেই ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত হয়ে এলো প্রিয়তার।
স্ক্রিনে ভেসে আছে বিশটিরও বেশি হোয়াটসঅ্যাপ নোটিফিকেশন। সবগুলোই প্রহেলিকার নম্বর থেকে এসেছে। বড় আপু নামে সেভ করা নম্বরটা থেকে এতোগুলো ছবি আর ভিডিও দেখে ভ্রুর ভাঁজ আরও গভীর হলো প্রিয়তার। মনে মনে ভাবলো—
— “এতোগুলো কিসের ছবি?”
কৌতূহল দমাতে না পেরে দ্রুত ছবিগুলোতে ক্লিক করলো প্রিয়তা। সাথে সাথেই পায়ের নিচের জমিন সরে গেলো। প্রিয়তার মাথার উপর যেন বিশাল আকাশটা ধ্বসে পড়লো।
এমন কিছু ছবি ওপেন হয়ে গেলো, যেগুলোতে দৃষ্টি পড়া মাত্রই সর্বাঙ্গ অবশ হয়ে এলো প্রিয়তার। নিজের চোখকেই সবথেকে বড় বিশ্বাসঘাতক মনে হলো। এমন কিছু তো কোনোদিন দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি প্রিয়তা। পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। প্রচণ্ড রাগে, নাকি দুঃসহ কষ্টে—সঠিক বোঝা গেলো না।
প্রিয়তাকে এভাবে অন্ধকারে বসে থাকতে দেখে চোখ ডলে উঠে বসলো ইনায়া। প্রিয়তার ঘাড়ে মাথা এলিয়ে দিয়ে অলস ভঙ্গিতে বললো—
— “কী হয়েছে লো, বান্ধবী? না ঘুমিয়ে এভাবে ভূতনির মতো বসে আছিস কেন?”
কিন্তু প্রিয়তার তরফ থেকে কোনো জবাব এলো না। কোনো নড়াচড়া নেই, একেবারে ফ্রিজ হয়ে গেছে মেয়েটা।
ইনায়া আরো অনেক কিছু বলার পরও যখন প্রিয়তার জবাব এলো না, তখন ভ্রু কুঁচকে গেলো ইনায়ার। সোজা হয়ে বসে তাকালো প্রিয়তার দিকে। প্রিয়তা নির্জীব চোখে তাকিয়ে আছে স্ক্রিনের দিকে।
ইনায়ার কপালের ভাঁজ আরও দৃঢ় হলো। কৌতূহলী কণ্ঠে শুধালো—
— “এভাবে কী দেখছিস?”
এবারও প্রিয়তার তরফ থেকে কোনো জবাব না আসতে দেখে বিরক্ত হলো ইনায়া। প্রিয়তার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিলো।
— “কী দেখছিস এভাবে আমাকে…”
উক্তিটুকু সম্পন্ন করতে পারলো না ইনায়া। স্ক্রিনে চোখ পড়তেই বাকিটুকু গলায় আটকে গেলো। চোয়াল আপনাআপনি হাঁ হয়ে গেলো ইনায়ার। যেন দুনিয়ার অষ্টম আশ্চর্য দেখে ফেলেছে।
— “হোয়াট দ্য ফাক?”
আঁতকে উঠলো ইনায়া। ঢোক গিলে চমকে তাকালো প্রিয়তার দিকে। প্রিয়তা এখনো নিথর নির্জীব, যেন পাথরের মূর্তির মতো তাকিয়ে আছে ছবিগুলোর দিকে। প্রিয়তার মনের অবস্থা আন্দাজ করে ঢোক গিললো ইনায়া। এসব যাই হোক, এগুলো কিছুতেই সত্যি হতে পারে না।
হড়বড় করে দ্রুত বোঝাতে লেগে পড়লো ইনায়া—
— “প্রিয়, প্রিয়, এটা সত্যি নয় বেবি। এটা হতে পারে না। দেখ আমার দিকে! তুই কিন্তু এসব একদম বিশ্বাস করিস না। এগুলো ফেক এআই জেনারেটেড। তুই তো জানিস আমার বাশুর কী রকম! দেখ, বান্ধবী, সূর্য পশ্চিম দিকে উঠে—এটা বললে মেনে নেবো, কিন্তু এগুলো মেনে নেবো না।”
প্রিয়তাকে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বলতে লাগলো ইনায়া।
ইনায়ার কথার মধ্যেই হাত লেগে আচমকা একটা ভিডিও প্লে হয়ে গেলো। ভিডিওর আওয়াজে থেমে গেলো ইনায়া। আবারও দু’জনের দু’জোড়া চোখ স্থির হয়ে গেলো ফোনের স্ক্রিনে। যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে দু’জন মানব-মানবী একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। তাদের সঙ্গমের দৃশ্য যেন ফোনে নয়, চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছে প্রিয়তা।
ছবিগুলো যেমন তেমন, কিন্তু ভিডিওটা আর কোনো ইঙ্গিত অবশিষ্ট রাখছে না। সবকিছু দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। ফোন স্ক্রিনের ওপারের মানবীটির উচ্ছ্বাস বিশেষভাবে লক্ষণীয়, যেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ সে দু’হাতে লুটে নিচ্ছে। খুবই তৃপ্তি সহকারে ভোগ করছে মুহূর্তগুলো।
ইনায়া ছোঁ মেরে ফোনটা নিয়ে স্ক্রিন অফ করে দিলো। আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকালো প্রিয়তার থমথমে মুখের পানে। কাঁদলে বা চিৎকার করলে বোঝা যেত প্রিয়তা স্বাভাবিক, কিন্তু তার এমন অস্বাভাবিক নীরবতা ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে ইনায়ার মনে। ভিডিওটা যদি সত্যিও হয়, তাহলে প্রণয় যে খুব বড় কোনো বিপদে আছে, এ নিয়ে দ্বিধার কোনো অবকাশ নেই।
ইনায়া বেশি দূর ভাবতে পারলো না। বিছানা থেকে নেমে চিৎকার দিয়ে ডাকলো—
— “প্রীতম! প্রীতম!”
চোখের পাতায় দিবাকরের প্রথম রশ্মি পড়তেই নেত্রযুগল খিঁচে বন্ধ করে নিলো প্রণয়। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকানোর চেষ্টা করতেই জ্বলে উঠলো চোখের মণি। আবারও তড়িৎবেগে চোখ বন্ধ করে ফেললো প্রণয়।
মাথার ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা।
ব্যথার তীব্রতা এতো বেশি যে দুই চোখের কার্নিশ বেয়ে একনাগাড়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। পেইনকিলারের প্রভাব কেটে যাওয়ায় মুখ দিয়ে গোঙানির মতো শব্দ বেরোচ্ছে প্রণয়ের। নড়াচড়া করার চেষ্টা করলে টান লাগছে হাতে-পায়ে। পাঁচ মিনিট কাটানোর পর অবশেষে চোখ মেলতে সক্ষম হলো প্রণয়।
আধা নিভু-নিভু চোখ দুটো অসম্ভব লাল। যেন পলক ঝাপটালেই তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়বে। প্রণয়ের নিকট মনে হচ্ছে, তার আশপাশের দুনিয়াটা মাথার ওপর ভো-ভো করে ঘুরছে। সে ঘাড় ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলো। সে একা সম্পূর্ণ একটা নির্জন কক্ষে বিছানার ওপর বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে। অদ্ভুতভাবে হাত দুটো বিছানার দুই দিকে হ্যান্ডকাফ দিয়ে বাঁধা, পা দুটোও তাই।
হাত-পা ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে করতে নিজের দিকে চোখ পড়তেই স্তব্ধ হয়ে গেলো প্রণয়। দু’চোখে ভরে উঠলো তীব্র অবিশ্বাস। মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো—
— “ব্লাডি হেল! নো, নো, নো, নো ওয়ে! এটা হতে পারে না, এটা হতে পারে না।”
বলতে বলতে চিৎকার দিয়ে উঠলো প্রণয়। সাথে সাথেই মনে হলো, মাথার ভেতরের অসহনীয় যন্ত্রণাটা চাড়া দিয়ে উঠলো।
প্রণয়ের গায়ে শার্ট নেই। তাই ফর্সা সুগঠিত দেহের প্রতিটি ভাঁজে তাজা ক্ষতচিহ্ন জ্বলজ্বল করছে, যার সামনে পুরনো ক্ষতগুলো খুবই ফিকে লাগছে।
সচেতন মস্তিষ্কে কী হয়েছে, ব্যাপারটা বুঝে আসতেই নিশ্বাস গলায় এসে আটকে গেলো প্রণয়ের। গত রাতের সব স্মৃতিগুলো ঝাপসা হয়ে ভেসে উঠলো চোখের পাতায়। কিন্তু স্পষ্ট মনে করার চেষ্টা করতেই মাথার যন্ত্রণা বেড়ে যাচ্ছে। তবুও ব্রেইনে কিছুটা চাপ দিতেই একের পর এক কাল রাতের দৃশ্যগুলো পরিষ্কার হতে শুরু করলো।
প্রণয় জান, আমার ভালোবাসা। চোখ খোলো। আমার দিকে তাকাও। দেখো আমি কতো সুন্দর করে সেজেছি তোমার জন্য। শুধু তোমার জন্য। বলো, উত্তর দাও আমাকে—কী সুন্দর লাগছে না আমাকে? আমাকে কী ওই মেয়েটার থেকে কোনো অংশে কম দেখাচ্ছে? কোনো দিন তো আমার সৌন্দর্যের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকাও না। তোমার জন্য কতো সেজেগুজে থাকি, ভালো ভালো পোশাক পরি শুধু এই আশায় যে তুমি একবার চোখ তুলে দেখবে, কিন্তু তুমি কখনো দেখো না। আমার কোন দিকটা কম বলো না।
— “আমি পরিণত, আমি সুযোগ্য, আমি ট্যালেন্টেড। তবু তুমি আমাকে ছেড়ে ওকে বেছে নিলে। ওকে পছন্দ করলে, সব সময় ওকেই যত্ন করলে, তাজের মতো মাথায় চড়িয়ে রাখলে। আর আমাকে ছুঁড়ে মারলে দুর্গন্ধযুক্ত নর্দমার অন্ধকার গলিতে।”
তোমার জীবনের কেন্দ্রে ও আছে, আমি কোথাও নেই। আমার এতো বছরের ভালোবাসার সম্মান তোমার কাছে দুই পয়সারও নয়। এটা কী অন্যায় করলাম না আমার সাথে?
প্রণয়ের বুকে মাথা রেখে অদ্ভুত ভাবে একনাগাড়ে কথাগুলো আওড়ে যাচ্ছে প্রহেলিকা। ত্রিশোর্ধ্ব রমণীর চেহারাটা সুন্দর তবু বিকৃত দেখাচ্ছে। পাগলের মতো প্রলাপ জপতে জপতে বারবার নাক-মুখ ঘষছে প্রণয়ের বুকে। তীব্র আকাঙ্ক্ষিত নিষিদ্ধ স্বপ্নকে ছুঁয়ে অনুভব করার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে লেগেছে।
ইনজেকশনের ঝিমুনি কাটিয়ে ধীরে ধীরে সচল হয়ে ওঠার স্নায়ুগুলো যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে প্রণয়ের। শরীরের প্রতিটি শিরায় যেন হাজারটা সুঁইয়ের মরণকামড়। মস্তিষ্কে হাতুড়ি পেটানোর মতো তীক্ষ্ণ অনুভূতিতে দেহ অবশ হয়ে আসছে। কড়া সেডেটিভের প্রভাব কাটিয়ে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে প্রণয়। কপালে সাদা রঙা ব্যান্ডেজের উপর দিয়ে রক্তিম পদার্থ ভেসে উঠছে। সুদর্শন মুখটাতে কয়েক স্তর মলিনতার ছাপ। ঘরের পরিবেশ গুমোট ও শ্বাসরুদ্ধকর।
প্রণয় নিভু-নিভু চোখ দুটো মেলতেই সামনের সকল দৃশ্য অস্পষ্ট ও ঘোলা হয়ে এলো তার নিকট।
দমবন্ধ করা ভারী বাতাসে রজনীগন্ধার তীব্র ঘ্রাণ আর জ্বলন্ত মোমের গলিত তেলের গন্ধ মিলেমিশে এক বিভীষিকাময় আবেশ তৈরি করেছে। ঘরের প্রতিটি কোণে যেন এক রুদ্ধশ্বাস নীরবতা।
প্রতিবার নিঃশ্বাসের সাথে হুড়মুড় করে নাসারন্ধ্র ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। এসব কিছুর সম্মিলিত মিশ্র গন্ধে কক্ষের বাতাসকে তীব্র বিষাক্ত করে তুলেছে।
জ্ঞান ফিরতেই প্রণয় অবচেতন মনে ডেকে উঠলো—
— “জান।”
এই একটি মাত্র শব্দ উচ্চারণ প্রহেলিকাকে পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ হিংস্র করে তুললো। প্রণয়কে নিজের করে পাওয়ার জেদ এবার তার মাথায় খুন চাপিয়ে দিলো। অর্ধ-অবচেতন প্রণয়ের চুলে চেপে ধরে দাঁত পিষতে পিষতে বিষাক্ত কণ্ঠে বললো—
— “এখনো প্রিয়তা আসলে তুমি মিস্টার আবরার শিকদার প্রণয় ভালো মানুষীর যোগ্যই নও। যদি পারতাম তাহলে তোমার তৃতীয় হার্টটাও খুলে রাস্তার ড্রেনে ছুঁড়ে ফেলতাম। তোমার বুকের ভেতর প্রবেশ করা মাত্রই কেনো প্রত্যেকটা হার্ট ওই মেয়েটার নাম জপতে থাকে? মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে তোমাকে আমার হার্টটা দেই, তোমাকেও একটু বুঝাই আমার ভালোবাসা।”
— “শোনো মিস্টার, আমি যদি না বাঁচি, তুমিও বাঁচবে না। মাইন্ড ইট, আমি কবরে পচবো আর তুমি আমার শত্রুর সাথে সুখে দিন পার করবে—এটা কিন্তু আমি হতে দেবো না।”
প্রণয়ের শরীর এখনো দুলছে সেডেটিভের প্রভাবে। কানের কাছে ফিসফিস শব্দ আর শরীরে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ অনুভব হতেই প্রণয়ের সতর্ক মস্তিষ্ক দ্রুত নিজের সারভাইভাল মুডে সুইচ হয়ে গেলো। তড়াক করে জেগে উঠলো।
সরাসরি চোখাচোখি হয়ে গেলো প্রণয়ের সাথে। এক মুহূর্তে যেন চারপাশে কবরস্থানের নীরবতা নেমে এলো। ঘরের তাপমাত্রা বোধহয় কয়েক ডিগ্রি নেমে গেলো।
দু’জোড়া শিকারি চোখ একে অপরকে দেখছে।
প্রণয়কে জেগে উঠতে দেখে এক অদৃশ্য মৃদু হাসি খেলে গেলো প্রহেলিকার রঞ্জিত ওষ্ঠ কোণে। কারণ আজকের জয় নিশ্চিত আর ট্রফি কেবল প্রহেলিকা শিকদারের।
প্রহেলিকাকে নিজের এতো নিকটে দেখে ঘন ভ্রু যুগল সামান্য কুঁচকে গেলো প্রণয়ের। স্থির থেকে দু’সেকেন্ড পর্যবেক্ষণ করলো প্রহেলিকার সন্দেহজনক হাবভাব। এবার কপালের ভাঁজে সরু রেখা উদিত হলো প্রণয়ের।
খুব শান্ত অথচ স্বভাবসুলভ ধারালো কণ্ঠে সতর্কবাণী ছুঁড়ে দিলো—
— “Don’t touch my body. Keep your distance.”
খুব শান্ত অথচ তরোয়ালের চেয়েও ধারালো সাধারণ এক লাইন সরাসরি প্রহেলিকার আত্মবিশ্বাসের পিলারে সজোরে আঘাত আনলো।
ইষৎ কেঁপে উঠলো প্রহেলিকা। পুরো প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও ওই ভারী পুরুষালী কণ্ঠের ধার কয়েক মুহূর্তের জন্য কাঁপিয়ে তুললো তাকে। তবে ভয়ের টুকু মুখাবয়বে প্রকাশ করলো না প্রহেলিকা। গোপনেই হজম করে নিলো ভীতি।
বাঁকা হেসে নিজের আত্মবিশ্বাসের শিকড় আরও মজবুত করে টেনে ধরলো প্রহেলিকা। সতর্কবাণী উপেক্ষা করে আরও কাছে চলে এলো। গভীর নেশাতুর চোখে সামনে বসা ত্রিশোর্ধ্ব পুরুষটাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো।
বড়ো বড়ো পেশীবহুল হাত দুটো ঠান্ডা ধাতব স্টিলের চেয়ারের হাতলে বাঁধা। পা দুটোও তাই। এক চুল এদিক থেকে ওদিকে নড়ার সামর্থ্য নেই, কিন্তু তেজ আর পুরুষালী দম্ভ সেই আগের মতোই সাড়ে ষোলো আনা। বাদামি বর্ণের চোখ দুটো নির্ভীক।
উফসস… এই ব্যাপার, হ্যাঁ ঠিক এই ব্যাপারটাই প্রহেলিকাকে প্রেমে পড়তে বাধ্য করেছিল আর আজ পর্যন্ত পাগল উন্মাদ বানিয়ে রেখেছে।
এই ম্যানলি ডমিনেটিং ভাইবটাই তাকে এতো বেশি চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে, এতো বেশি পাগল হতে বাধ্য করে আর এই পাগল হতে হতে আজ সে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে গেছে।
ঠোঁট কামড়ে হাসলো প্রহেলিকা। সে ভালোই জানে, খাঁচায় আবদ্ধ সিংহ গর্জন করবে অবশ্যই, কিন্তু আক্রমণ করার সামর্থ্য নেই।
গর্জে উঠা কণ্ঠে নিঃস্তব্ধ কক্ষের ভারী নীরবতার চাদর ফের চূর্ণ হলো।
— “কী বললাম, শুনতে পাওনি? দূরে থাকো আমার থেকে। এতটা দূরে থাকো যতটা দূরে থাকলে তোমার হারাম দেহের ছায়াও আমার উপর না পড়ে।”
ইষৎ কেঁপে উঠলো প্রহেলিকা। ছিটকে পড়লো তার কল্পনার জগৎ থেকে। প্রণয়ের নিষ্ঠুরতম বাক্যগুলো আবার গলা চেপে হত্যা করলো তার মনের রঙিন প্রজাপতি।
চোখে জল আসতে দিলো না প্রহেলিকা। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত চাপলো। পাওয়ার জেদ যেন আরও বেশি করে মাথায় চেপে বসলো।
প্রণয়ের মুখের উপর হালকা ঝুঁকে এলো প্রহেলিকা। কপালে পড়া মেসি চুলগুলো আঙুলের সাহায্যে সরাতে সরাতে স্লো ভয়েসে হিসহিসিয়ে বললো—
— “আমাকে অস্পৃশ্য লাগে তোমার কাছে, তাই না? আমাকে দেখলে খুব ঘৃণা হয়। আমার শরীরটা অপবিত্র লাগে। অথচ আজ পর্যন্ত শুধু তোমার স্পর্শের আশায় দ্বিতীয় কোনো পুরুষকে নিজের চোখ তুলে তাকাতে দেইনি। যার জন্য এতো সংরক্ষিত করে রেখেছিলাম নিজেকে, তার কাছেই অপবিত্র।”
— “তবে আমি যদি অস্পৃশ্য হয়েও থাকি, তবু তোমাকে আজ আমাকে অমৃত না হোক বিষ হিসেবে পান করতে হবে।”
প্রণয় প্রত্যুত্তর করতে নিলেই তার মুখ চেপে ধরলো প্রহেলিকা। চোখে চোখ রেখে ঘাড় বাঁকিয়ে বললো—
— “মাথায় ঢুকিয়ে নাও মিস্টার শিকদার প্রণয়। এটা তোমার এম্পায়ার নয়। এই রাজত্ব আমার। এই রাজ্যের রানী আমি। এখানে কেবল আমার শাসন চলে। তাই এখানে আমি ছাড়া অন্য কারো কোনো মতামত গ্রহণযোগ্য নয়। নট এবাউট ইউ।”
— “আর লিমিটস এর কথা বলছো।”
হঠাৎ শরীর দুলিয়ে হেসে উঠলো প্রহেলিকা। সাথে সাথে বাইরে থেকে তীব্র মেঘের গর্জনে কানে তালা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তীব্র সাদা আলোর ঝলকে বাইরে রাতের অন্ধকার ঘুচে গেলো। সৃষ্টির সকল অন্ধকার যেন জমা হয়েছে এই কক্ষে।
প্রহেলিকার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ অস্বাভাবিক বিপজ্জনক ঠেকছে প্রণয়ের নিকট। এটা যে তার জন্য কত বড় বিষধর সাপ, এটা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সুযোগ পেলেই বিষদাঁত বসিয়ে দেবে তার ঘাড়ে।
এই সর্পিনীর সামনে বসা তো দূর, এর মুখটা দেখেই মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বুকের উপর যেন হাজার টনের পাথর চেপে বসলো প্রণয়ের।
সে ইতিমধ্যেই বুঝে গেছে এই বাঁধন থেকে মুক্ত হতে কেবল তার পেশীবল যথেষ্ট নয়। তাই ছটফট করে খামোখা নিজের শক্তির অপচয় করতে চায় না। কিন্তু এই মেয়েটা তার মাথার উপর বিপদের ঘণ্টা হয়ে ঝুলছে।
প্রণয় শান্ত কণ্ঠে শুধালো—
— “আমার গাড়ির ব্রেক ফেল তুমি করিয়েছো, তাই না?”
প্রশ্ন শুনে প্রহেলিকা মুখটা একদম ইনোসেন্ট করে ফেললো। দু’পাশে মাথা নাড়িয়ে ঢং করে বললো—
— “হুঁউউউ! আমার ঘাড়ে কটা মাথা যে আমি দ্য গ্রেট আবরার শিকদার প্রণয় উপস নো নো এ এস আর কে কিডন্যাপ করবো? হায় আল্লাহ।”
ভেতরে ভেতরে ক্রোধে ফেটে পড়লো প্রণয়। কটমট চোখে তাকালো প্রহেলিকার পানে।
— “আমি আমার সব কিছু ছেড়ে দিয়েছি, এটা তুমি জেনে গেছো, তাই না?”
— “স্মার্ট ম্যান হ্যাঁ। সমঝদার লোকদের লিয়ে ইশারাই কাফি।”
— “ইউ বিচ।”
হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেলো প্রণয়ের।
— “কন্ট্রোল কন্ট্রোল। এতো রাগ হার্টের জন্য ভালো নয়।”
— “কেন করলে এমনটা?”
আজব প্রশ্নটা শুনে হুহু করে হেসে উঠলো প্রহেলিকা। হাসতে হাসতে প্রণয়ের উরুতে বসে গলা জড়িয়ে ধরলো। ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিয়ে নেশাতুর কণ্ঠে শুধালো—
— “উফফ, কী ঘ্রাণ! কী নেশা তোমার! এই নেশা একদিন আমার জান নিয়ে নেবে, দেখো।”
প্রণয়ের শরীর জ্বলে উঠলো প্রহেলিকার স্পর্শে। ঘৃণায় গা গুলিয়ে এলো যেন।
— “অটিস্টিক নাকি? স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারো না?”
— “কতো কাঠখড় পুড়িয়ে তোমাকে একবার ছুঁতে পারি, তার জন্য অটিস্টিক হতে আমার অসুবিধা নেই।”
— “আমাকে কিডন্যাপ করলে কেনো?”
— “যেটা বহু বছর আগে আমার হওয়ার কথা ছিল, যেটা বেহাত হয়ে গেছে, সেটার উপর সিলমোহর মারতে।”
— “হোয়াট?”
— “হ্যাঁ, আমার জিনিস, আমার ভালোবাসা বহু বছর ধরে অন্য কেউ ভোগ করছে, অথচ আমি তার স্বাদই জানি না।”
এসব আজেবাজে কথা শুনে মাত্রাতিরিক্ত বিরক্ত হলো প্রণয়। এমনিতেই তার প্রাণটা আনচান করছে তার বাচ্চা বউয়ের জন্য। হয়তো এখনো অপেক্ষা করছে তার পাগলীটা। অথচ এই আপদ তাকে বেঁধে রেখেছে।
প্রহেলিকা ফের বললো—
— “আজ রাত তোমার জন্য স্মরণীয় করে দেবো, মিস্টার শিকদার প্রণয়।”
প্রহেলিকার কথার প্রেক্ষিতে খেঁকিয়ে উঠলো প্রণয়।
— “In your dreams. শর আমার উপর থেকে। আমার বউয়ের হক থেকে দশ হাত দূরে থাক।”
— “আমার বউ যদি জানতে পারে তুই আমার উপর চড়ে বসেছিলি, তাহলে তুই যা ভাড় মে আমাকে আস্ত রাখবে না। আমার জান নিয়ে নেবে তুই। আমার মা লাগিস, মা। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কথা বল। বউয়ের হাতে এই কচি বয়সে মার্ডার হতে চাই না। নাহলে বলা যায় না, আমাকে ও যদি নীল ড্রামে প্যাক করে দেয়।”
সিরিয়াস মোমেন্টে এমন কথা শুনে বেকুব বনে গেলো প্রহেলিকা। চোয়াল হাঁ হয়ে গেলো আপনাআপনি। তৎক্ষণাৎ রিঅ্যাক্ট করলো।
— “Whatttt.”
— “হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। যেখানে বসে আছিস ওটা আমার বউয়ের জায়গা। আমার বউয়ের হক। দূরে সর, শাকচুন্নি।”
প্রিয়তার নাম শুনে রেগে গেলো প্রহেলিকাও। মেজাজ তার চিরবিড়িয়ে উঠলো। চিৎকার দিয়ে বললো—
— “কী সব সময় বউ বউ করতে থাকো! জরুরি গোলাম! কখনো তো আমাকে ও দেখতে পারো না।”
— “আস্তাগফিরুল্লাহ! আমি কেনো কোনো বেগানা নারীর দিকে তাকাবো? আমার জন্য আমার বউই সব। ঘরে ফ্রেশ রসমালাই রেখে আবরার শিকদার প্রণয় বাইরের কুকুর-বিড়ালের নজর দেওয়ার মিষ্টির দোকানে মুখ মারবে? ছি! এমন রুচির দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়নি। এমনিতেও আমার বউয়ের তুলনায় কেউ আশেপাশে নাই।”
প্রণয়ের স্পষ্ট বাক্যে গায়ে জ্বালা ধরে গেলো প্রহেলিকার। হাত বাড়িয়ে খপ করে চেপে ধরলো প্রণয়ের শার্ট। রাগে সাপের মতো ফোঁসফোঁস করতে করতে বললো—
— “এতো যে ভালোবাসো, কাল সকালে বিশ্বাস করবে তোমাকে।”
প্রহেলিকার চেপে ধরা হাতটার দিকে শান্ত চোখে তাকালো প্রণয়। ঠান্ডা কণ্ঠে বললো—
— “Don’t cross your limits.”
— “আর যদি ক্রস করি, কী করবে?”
হাসলো প্রণয়। উদাস কণ্ঠে বললো—
— “সীমা ছাড়ালে আমার কিছুই করা লাগবে না। আমার ঘরওয়ালিকে তো তুমি দেখেছো, জানো। ও খুবই শান্ত, শিষ্ট, নরম সরম বাচ্চা একটা মেয়ে। কিন্তু তুমি যেটা দেখোনি, যেটা জানো না, সেটা আমি জানি। তোমার জন্য চাপের হয়ে যাবে। আমি কিন্তু পরে কিছুই করতে পারবো না। আমার জান্নাতী মেয়ে আব্বার কথা কী তোমার বেশি মনে পড়ছে?”
— “কী বলতে চাও?”
— “বলতে চাই, দয়ালের দুনিয়ায় লীলার কোনো অভাব নেই। কে জানি কখন কী হয়।”
প্রহেলিকার ভ্রুতে ভাঁজ পড়লো। সন্দিহান কণ্ঠে শুধালো—
— “ভয় দেখানোর চেষ্টা করছো আমায়?”
— “সত্যিটা বলছি। দেখো, যেটা ভালো বুঝো।”
— “দুঃখিত, ভয় পেলাম না। কারণ জীবনের লক্ষ্যই তোমাকে পাওয়া। তোমার বউ হওয়া।”
— “আহারে, বেচারা মেয়েটার জীবনের লক্ষ্যই মার খেলো।”
— “প্রণয়।”
— “এসব সস্তার আবেগ আমার সামনে না দেখিয়ে যাত্রা পালায় দেখাও, টাকা পাবে।”
আবারো অপমান আর প্রত্যাখ্যানে মুখ লাল হয়ে গেলো প্রহেলিকার। চোখের কোণে তরল চিকচিক করে উঠলো অজান্তেই। কণ্ঠের তেজ নিভে এলো। প্রহেলিকার ভাঙা স্বরে শুধালো—
— “আমার এতো ভালোবাসা, এতো ব্যাকুলতা, দিনের পর দিন ভিক্ষুকের মতো তোমার দোয়ারে পড়ে থাকা—এসব কী তোমাকে কোনোদিন এতটুকু স্পর্শ করেনি?”
— “থু।”
— “প্রণয়।”
প্রহেলিকার মায়া মাখানো কাতর কণ্ঠেও কোনো ভাবান্তর দেখা গেলো না প্রণয়ের।
প্রহেলিকা কান্নাটা চিবিয়ে গিলে নিলো। কারণ এখন ঝামেলা করার সময় নয়।
— “দেখা যাক।”
উঠে দাঁড়ালো প্রহেলিকা। বাঁকা হেসে পাশের ছোট সেন্টার টেবিল থেকে দেশলাই বক্স তুলে নিলো।
দেশলাই বাক্সের গা ঘষে ম্যাচ স্টিকটা জ্বালাতেই আশেপাশে অন্ধকারের ঘনত্ব কমে এলো।
ক্ষীণ আলোয় ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হতে শুরু করলো অন্ধকারে ঢাকা জিনিসপত্রগুলো।
আশেপাশের পরিবেশে চোখ নজর পড়তেই চোখ ছোট ছোট হয়ে গেলো প্রণয়ের। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো প্রহেলিকার পানে, যেন বোঝার চেষ্টা করছে যে মেয়েটা আসলে কী করতে চায়।
প্রহেলিকা ধীরে ধীরে করে আগে থেকে সাজিয়ে রাখা প্রদীপ আর মোমবাতির সলতেগুলোতে আগুন দিতে লাগলো। একটি কাঠি, একটি শিখা—প্রতিটি সজ্জা যেন প্রহেলিকার এক তীব্র পাগলামির স্বাক্ষর।
মোমের নরম আলোয় প্রণয় দেখতে পেলো, তাকে বেঁধে রাখা জায়গা ব্যতীত পুরো ঘর ফুল আর মোমবাতি দিয়ে সাজানো।
একে একে মোমের নরম আলোয় পুরো ঘরটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। প্রতিটি জিনিস স্পষ্ট হয়ে ধরা দিলো প্রণয়ের চোখে।
এবার এক সেকেন্ডও লাগলো না প্রহেলিকার আসল উদ্দেশ্যটা ধরে ফেলতে।
সবটা আন্দাজ করে গলা শুকিয়ে এলো প্রণয়ের। প্রহেলিকা এতটা সাহস করবে ভাবেনি। প্রহেলিকাকে থামাতে চিৎকার দিয়ে উঠলো প্রণয়—
— “Stop.”
প্রহেলিকা থামলো না। প্রত্যেকটা প্রদীপের কম্পমান অগ্নিশিখা যেন তার এতো বছরের ছাই চাপা আগুনকে টেনে বের করছে।
প্রত্যেকটা বাতি জ্বলে ওঠার সাথে সাথেই আগের থেকেও দ্বিগুণ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে প্রহেলিকার চোখ।
এসব দেখে রক্তচাপ বাড়ছে প্রণয়ের। কারণ সে এক শিকারের মতো শিকারির জালে আটকা পড়েছে। কোনো ব্যাকআপ প্ল্যান নেই, কারণ এতো চিন্তার মধ্যে এমন কিছু ঘটতে পারে তা কল্পনাতেও আসেনি।
তার সন্ধান পাবে না। কেউ তার খোঁজ করবে না। সব ক্ষমতা তো সে নিজেই ছেড়ে এসেছে।
নাহলে প্রণয় শিকদারকে কিডন্যাপ করা তো দূরের কথা, চোখ তুলে তাকানোর সাহসও এই মেয়েটার হতো না।
ক্ষমতা বিসর্জন দেওয়ার পর প্রথম আঘাতই যে এমন হবে, এটা প্রণয়ের সিলেবাসেই ছিলো না।
প্রহেলিকা ঘরের সমস্ত আলো জ্বালিয়ে ঘরটার দিকে মন ভরে তাকালো। ঠিক তেমনটা, যেমনটার স্বপ্ন প্রহেলিকা ছোট থেকে দেখতো।
একটা সুন্দর ঘর, একটা সুন্দর ফুলসজ্জিত বিছানা আর সাথে বর বেশে তার প্রিয় মানুষটা।
প্রহেলিকা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো প্রণয়ের পানে। বর সেজে তো নেই, গায়ে ফর্মাল একটা কালো শার্ট, কালো প্যান্ট আর মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ। তবু আজ প্রহেলিকা তৃপ্ত।
এই সবকিছু যেন মায়াবী স্বপ্ন মনে হচ্ছে প্রহেলিকার নিকট। চোখের পলক ঝাপটালেই ভেঙে যাবে। ভালোবাসা চেয়ে সে পায়নি, ভিক্ষুকের মতো প্রার্থনা করেও পায়নি, কৌশলেও পায়নি। তার কপালে অপমান, অবহেলা আর অবজ্ঞা ছাড়া কিছু জুটেনি। তাই এবার সে আর ভালো মানুষী দেখবে না। সুযোগের ভরপুর ফায়দা লুটবে।
মুচকি হাসলো প্রহেলিকা। এক পা, দু’পা করে একদম কাছে চলে এলো প্রণয়ের। তার চোখ দুটো ঘোলাটে, নেশাতুর। সে প্রণয়ের বৃদ্ধাঙ্গুল ছুঁয়ে ধীরে বললো—
— “এবার? এবার কী করবে শিকদার বংশের সুযোগ্য জ্যেষ্ঠ পুত্র?”
প্রণয় দাঁত কটমট করে তাকালো। চিবিয়ে চিবিয়ে বললো—
— “তোমার মনে হয় না, তুমি বেশি সাহস দেখিয়ে ফেলছো প্রহেলিকা?”
— “হ্যাঁ, দেখাচ্ছি। কারণ অল্প ভালোবাসা সাহসী হতে শেখায় আর গভীর ভালোবাসা বেপরোয়া। আর তোমাকে পেতে আমি কোনো সীমা মানি না। শুধু একবার আমার হয়ে যাও।”
প্রহেলিকার কণ্ঠে শেষ কাকুতি।
প্রণয় ঘৃণায় নাক সিটকালো।
— “ছিঃ! তুই নিজেই ভাব, কতটা নির্লজ্জ আর বেহায়া মেয়েমানুষ তুই! লজ্জা করে না পরপুরুষকে এভাবে বলতে?”
মলিন হাসলো প্রহেলিকা। প্রণয়ের গলা জড়িয়ে ধরে বললো—
— “না, করে না। কারণ আমি তোমাকে চাই। যেকোনো মূল্যে চাই। তুমি না চাইলেও আমি চাই।”
ওর ঔদ্ধত্যের সীমা ছাড়াতে দেখে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে প্রণয়ের। সারা শরীর জ্বলছে। ছাড়া থাকলে এতক্ষণে বেয়াদব মেয়েটাকে কবর দিয়ে দিতো।
— “শরীরে এত জ্বালা থাকলে বাজারে দাঁড়িয়ে পড়তে পারিস তো। তোকে দেখতে পারি না, এটা জানার পরেও কেন পিছনে পড়ে আছিস আমার? কেনো জীবনটা নরক বানিয়ে তুলছিস আমার? আমার জীবনের নয়টা বছর, আমার ভবিষ্যৎ আর স্বপ্ন সব জ্বালিয়ে দিয়ে ওহ্, কী তোর মন ভরেনি?”
ম্লান হাসলো প্রহেলিকা। প্রণয়ের মাথার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে নিচু কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বললো—
— “বলো, বলো। যা বলতে ইচ্ছা হয় বলো। যত খুশি অপমান করতে ইচ্ছা হয় করো। আজ আমি কষ্ট পেয়ে কান্না করে চলে যাব না। আমি যা কিছু করেছি সব তোমাকে পেতে করেছি। প্রথমেই যদি আমার হয়ে যেতে এতো কিছু করতে হতো না।”
— “আর শরীরের কথা যদি বলো তবে শোনো মেরি জান। দেহের খিদে মেটানোর পুরুষের অভাব নেই, কিন্তু আমার মনের খিদা তো তোমাকে ঘিরে।”
— “একটা প্রবাদ শুনেছিস? পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে। তোরও তাই হয়েছে।”
— “মেরে ফেলার ভয় দেখাচ্ছ?”
— “কিন্তু ভয় তো তোমার আমাকে পাওয়া উচিত। আচ্ছা ঠিক আছে, মেনে নিলাম তোমার কথা। তুমি বরং আমায় কাল সকালে মেরে ফেলো, কেমন? কাল সকালে তোমার আমার সাথে যা করতে মন চায় করো। আজ রাতের পর যদি কাল সকালের সূর্য নাও দেখি, আফসোস নেই।”
— “জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা মন্দ নয়।”
হাসলো প্রহেলিকা। প্রণয়ের কপালের চুল সরিয়ে গভীর চুমু খেলো পরম ভালোবাসায়। একটা চুমুতেই তার ভেতরে ঝড় শুরু হয়ে গেলো। নিজের অবস্থা দেখে নিজেই অবাক হয়ে গেলো প্রহেলিকা।
প্রহেলিকার স্পর্শে বিষ লাগছে প্রণয়ের। খুলবে না জেনেও হাত-পা ছাড়ানোর চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠলো প্রণয়। ক্ষেপা বাঘের ন্যায় গর্জে উঠলো—
— “ছাড় আমায়।”
জবাব দিলো না প্রহেলিকা। দাঁড়িয়ে পড়লো। সেন্টার টেবিলের ওপর রাখা ছোট কালো পাউচ থেকে একটা সিরিঞ্জ আর ছোট ছোট দুটো কাঁচের অ্যাম্পুল বের করলো, যার ভেতর মাত্র কয়েক মিলি হলুদ মেডিসিন।
এতক্ষণ উদ্বেগহীন থাকলেও, এবার প্রহেলিকার হাতের হলুদ মেডিসিনের অ্যাম্পুলগুলো দেখে আতঙ্কে উঠলো প্রণয়। মুখের সকল রঙ উড়ে গেলো। শরীরের সকল রক্ত যেন পানি হয়ে গেলো এক মুহূর্তে।
পুরুষালি কণ্ঠটা প্রথমবারের মতো কাঁপলো হয়তো। ছটফট করতে শুরু করলো প্রণয়। কম্পিত কণ্ঠে অনুনয় করে বললো—
— “ন-না না, প্রহেলিকা! তুমি এটা করতে পারো না। এটা অন্যায়। প্লিজ দূরে রাখো।”
প্রহেলিকা তিক্ত হাসলো।
— “তুমি বলছো ন্যায়-অন্যায়ের কথা? ইন্টারেস্টিং।”
জীবনে প্রথমবারের মতো প্রণয়ের ঘাবড়ে যাওয়া ভীত মুখটা দেখে ভীষণ মজা পেলো প্রহেলিকা। অ্যাম্পুলটা ভেঙে হলুদ মেডিসিনটা সিরিঞ্জে ভরে নিলো। অতিরিক্ত মেডিসিনটুকু দুটো টোকা দিয়ে ফেলে প্রণয়ের পানে ফিরে তাকালো।
চেয়ারের দু’পাশের হাতলে হাত রেখে ধীরে ঝুঁকে এলো প্রণয়ের সন্নিকটে। মুখের কাছে মুখ এনে চোখে চোখ রেখে বিষাক্ত কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বললো—
— “ভয় পাচ্ছো, প্রণয়?”
— “দূরে সরো আমার থেকে। I said leave.”
প্রণয়ের বুকের কাঁপনটা বোধহয় প্রহেলিকা বাইরে থেকেই শুনতে পাচ্ছে।
প্রহেলিকা কণ্ঠ নরম করে বললো—
— “সারাজীবন দূরে সরেই তো ছিলাম। আজ একটা রাত, কয়েকটা ঘণ্টা যদি কাছে চলে আসি, বেশি ক্ষতি হবে না বলো?”
দু’চোখ লাল হয়ে গেলো প্রণয়ের। ঘাড় আর কপালের রগ ফুলতে শুরু করলো। যেন ছাড়া পেলে এখুনি প্রহেলিকাকে জীবন্ত দাফন করে দেবে।
প্রণয়ের জলছাড়া মাছের মতো অবস্থা দেখে ব্যথিত হওয়ার ভান ধরলো প্রহেলিকা। প্রণয়ের হাতে হাত রেখে উত্তেজিত কণ্ঠে বললো—
— “উপস্! এতো ছটফট করো না, জান। তোমার তো কষ্ট হবে। তোমার এত সুন্দর হাত-পা ছিঁড়ে যাবে তো। মানছি তোমার অনেক শক্তি, কিন্তু এগুলো ছিঁড়তে পারবে না জান।”
প্রহেলিকার চোখের এক্সপ্রেশন ভীষণ ইরোটিক। ভীষণ ক্রিপি লাগছে তাকে।
— “নাও, এখন চোখটা বন্ধ করো তো দেখি। আমি জানি, তুমি নিডলে ভয় পাও না। তবুও হালকা একটা হুল ফোটার মতো ব্যথা হবে জান।”
— “না ওওও প্র—”
প্রণয় কথা সমাপ্ত করতে পারলো না। চোখের পলকে ইনজেকশনের সুঁচালো নিডলটা প্রণয়ের ঘাড়ের শিরায় গেঁথে দিলো প্রহেলিকা।
আবারও প্রণয়ের কপালে চুম্বন একে বললো—
— “এই তো জান হয়ে গেছে। আর কিছুক্ষণ, তারপর তুমি আমার।”
প্রণয় দেখলো তার হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে। ওষুধের নীল বিষ ধমনীতে তীব্র স্রোতে মিশে যাচ্ছে। চোখের সামনে প্রহেলিকার মুখটা ভেঙে দু-তিনটে হয়ে যাচ্ছে। সে জানে, এই অচেতনতা মানেই আজ চরম পরাজয়। কিন্তু প্রণয় শিকদার হারতে জানে না। ধীরে ধীরে শরীর গরম হয়ে উঠছে প্রণয়ের। শরীরে পুরুষালি হরমোনের মাত্রা লাফিয়ে বাড়ছে।
ঝরনার মতো দরদর করে ঘাম ছুটতে শুরু করেছে ঘাড়, গলা, বুক বেয়ে। হাঁসফাঁস করতে শুরু করেছে প্রণয়। চোখের সামনে সবকিছু ডাবল ডাবল দেখতে শুরু করেছে।
চোখ দুটো ঘোলা হয়ে আসছে প্রণয়ের। গলা দিয়ে আওয়াজ করতে পারছে না। কেবল দেখছে দুটো থেকে তিনটা, তিনটা থেকে চারটা প্রহেলিকা, যাদের ঠোঁটে লেগে বিষাক্ত সেই সর্বনাশা হাসি।
প্রহেলিকা গড়িয়ে দিকে তাকালো। আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড। হুঁশে থাকার তীব্র প্রচেষ্টায় স্টিলের হাতল শক্ত করে চেপে ধরলো প্রণয়। ধমনীতে বয়ে চলা রক্তের স্রোত যেন উত্তাল হয়ে উঠলো মুহূর্তেই। প্রিয়তমার মায়াবী মুখটা কেবল ভাসছে চোখের পাতায়। সে যদি নিজের বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলে তখন কী হবে।
প্রণয় বুঝতে পারছে, সে ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার কোনো গহ্বরে। নিজের বডির ওপর থেকে নিজেরই কন্ট্রোল উঠে যাচ্ছে। শরীরের হরমোনগুলো ক্র্যাশ করছে রীতিমতো।
প্রহেলিকা বিজয়ী হাসলো। প্রণয়ের অবস্থা তার হাতের মুঠোয় চলে আসছে দেখে দ্রুত প্রণয়ের হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিলো প্রহেলিকা।
খুশিতে ঝাঁপিয়ে ধরলো প্রণয়কে। বুকে মুখ গুঁজে দিলো। নেশা আর উত্তেজনায় হাত-পা কাঁপছে প্রণয়ের। চোখ বুজে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে প্রহেলিকাকে ধাক্কা দিলো প্রণয়।
কেমন আচমকা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না প্রহেলিকা। তাল সামলাতে পারলো না। পুরুষালি শক্তির প্রখরতায় ছিটকে পড়লো দু’হাত দূরত্বে। প্রণয় বুঝে গেছে, আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড, তারপর হয়তো সব শেষ হয়ে যাবে। প্রহেলিকার হাতের পুতুল হয়ে যাবে সে। হুঁশ, জ্ঞান, বিচারক্ষমতা—সব খুইয়ে বসবে।
হাঁপানি রোগীর মতো জোরে জোরে হাঁপাতে শুরু করলো প্রণয়। নিভু-নিভু নেশা জড়ানো চোখ দুটো আশেপাশে ঘুরিয়ে কিছু একটা খুঁজলো। সাথে সাথেই চোখ পড়ে গেলো বাঁ দিকে, যেখানে দুটো রেড ওয়াইনের বোতল রাখা।
প্রণয় প্রহেলিকার দিকে তাকালো না। বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে কম্পিত পায়ে ওয়াইনের বোতলটার দিকে এগোতে শুরু করলো। এক পা এগোলো, দু’পা পিছিয়ে যাচ্ছে প্রণয়।
কিছুটা এগোতেই আবারো জাপটে ধরলো প্রহেলিকা। মনোবল কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে প্রণয়ের বেলায়ও তাই হলো।
এবার আরও জোরে ধাক্কা দিয়ে ছুঁড়ে ফেললো প্রহেলিকাকে। আবারও মুখ থুবড়ে পড়ে ব্যথা পেলো প্রহেলিকা। সে নিজের মূর্খতার ওপর নিজেই চরম বিরক্ত হলো। সে কেনো বারবার ভুলে যায় প্রণয় সাধারণ কোনো পুরুষ নয়। তার আগেই বোঝা উচিত ছিল, প্রণয়ের মতো আলফা ম্যানদের ওপর কোনো ড্রাগ এত তাড়াতাড়ি কাজ করবে না। তার আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা উচিত ছিল।
প্রহেলিকা বুঝে ওঠার আগেই প্রণয় ছোঁ মেরে একটা ওয়াইনের বোতল তুলে মাথার ওপর থেকে সজোরে আছাড় মারলো। সাথে সাথেই কাঁচের বোতলটা টাইলস বসানো মেঝেতে পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলো। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো শত শত কাচের টুকরো।
কাঁচ ভাঙার তীব্র জোরালো শব্দে কেঁপে উঠলো প্রহেলিকা। দ্রুত পেছনে ফিরে তাকাতেই চমকে উঠলো সে। প্রণয়ের ডান হাতের মুঠোয় কাঁচের বোতলের শুরুর অংশটা, আর বাঁ হাতের শিরা বেয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। টপটপ করে তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে মার্বেল বসানো মেঝেতে।
নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো প্রণয়। দাঁতে দাঁত চেপে নিজের ক্ষতবিক্ষত শিরার দিকে তাকালো—রক্তের লালচে ধারা মেঝে ভিজিয়ে দিচ্ছে।
মাতালদের মতো পায়ের হাঁটুতে ব্যালেন্স রাখতে পারছে না প্রণয়। দু’পা পিছিয়ে গেলো। চোখ বন্ধ করে মনে মনে বিড়বিড় করে—
ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯৩
— “তোর প্রণয় ভাইয়ের দেহ ও মনে শুধু তোর অধিকার জান। জীবন থাকতে এক সেকেন্ডের জন্য তোর অধিকার অন্য কাউকে ভোগ করতে দেবো না। প্রয়োজনে জীবন দিয়ে দেবো, তবুও ভুল বুঝিস না জান আমায়।”
এতো রক্ত দেখে চিৎকার দিয়ে উঠলো প্রহেলিকা—
— “প্রণয়য়য়!”
