তোমার আমার গল্প পর্ব ১৬
noorayn
আরহাম বরফ লাগালেও কাজের কাজ কিছু হলোনা ; বরং জ্বলুনি সময়ের সাথে বাড়তে লাগলো।
এদিকে, আলিশা সহ্য করতে না পেরে কান্না করছে।
আরহাম আলিশার গালে ঠেকিয়ে জিজ্ঞেস করছে –
“জান, কি হয়েছে তোর? এমন করছিস কেন?”
“আমি জানিনা, আমার গায়ে অনেক চুলকাচ্ছে।”
–আলিশা চুলকাতে চুলকাতে কিছু জায়গায় একদম জখম করে ফেলেছে।
“মাম্মাকে ডাকো।”
“একটু অপেক্ষা কর, এখনই ডেকে আনছি ছোট মাকে।” বলেই আলিশার কপালে চুমু দিয়ে চলে গেলো।
–শাইনা আর আয়শা দুজনকেই ডেকে এনেছে আরহাম।
–আয়শা এসে মেয়ের অবস্থা দেখে অবাক না হয়ে পারলেন না।
“এসব কি?”
“পুতুল! কিভাবে হয়েছে এসব?” শাইনা।
আলিশা ফোপাঁতে ফোপাঁতে জবাব দিলো –
“আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা। আমি তো ঘুমাচ্ছিলাম হঠাৎ করেই গায়ে অনেক বেশি চুলকাতে শুরু করেছে।”
“দেখে তো মনে হচ্ছে, কোনো এলার্জির রিঅ্যাকশেন।” আয়শা।
আরহাম বললো – “আমি কি তবে এলার্জির মেডিসিন দেবো?”
শাইনা মানা করে দিলো এখন কোনো মেডিসিন দিতে।
” না, ডাক্তারের অনুমতি ছাড়া এখন কোনো মেডিসিন দেওয়া ঠিক হবে না।”
“তাহলে, এতো রাতে কি করবো? ওর অনেক কষ্ট হচ্ছে মা।” (আরহাম)
শাইনা ছেলেকে আসস্ত করতে বললেন –
“একটু পরেই সকাল হয়ে যাবে। তখন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।”
আলিশা কাঁদতে কাঁদতে শুধালো –
“আমি এতো সময় কিভাবে সহ্য করবো?”
শাইনা হঠাৎ কিচেনের দিকে যেতে যেতে বলে উঠলেন –
“অপেক্ষা কর পুতুল। আমি হার্বাল পেস্ট বানিয়ে আনছি। দেখি কোনো কাজ হয় কিনা।”
আরহাম তার মাকে তাড়া দিয়ে বললো –
“মা, যা করার জলদি করো। লিশা কষ্ট পাচ্ছে।”
–১৫ মিনিটের ব্যাবধানে শাইনা হাতে করে হার্বাল পেস্ট বানিয়ে আনলেন।
“আয়শা, এটা পুতুলের র্যাশের উপর লাগিয়ে দে। আমি ততক্ষনে গরম পানি করে আনি।”
“ঠিক আছে, আপা।” আয়শা।
–আয়শা মেয়ের গায়ে আলতো হাতে হার্বাল পেস্টের প্রলেপ লাগিয়ে দিলেন।
–পেস্টটা লাগানোর ১০ মিনিটের মধ্যেই আলিশার জ্বলুনি আগের তুলনায় কমে আসলো।
শাইনা জিজ্ঞেস করলেন – “এখন কেমন লাগছে পুতুল?”
“আগের তুলনায় অনেকটা কমেছে, বড় মা। থ্যাংক ইউ ; তুমি সময়মতো এই নুসকা বানিয়ে না আনলে হয়তো আমি জ্ঞান হারাতাম।”
–আলিশার কথায় সবাই যেন একটু শান্তি পেলো।
আয়শা মেয়েকে আদর করে বললেন – “এখন ঘুমিয়ে পড়ো মা। সকালে হসপিটাল যেতে হবে তোমার।”
–মায়ের কথা শুনে আলিশা বিনা বাক্য শুয়ে পড়লো। এত ধকল তার শরীর আর নিতে পারছেনা। কিছু সময়ের মধ্যেই ঘুমের দেশে পাড়ি দিলো সে।
–শাইনা আলিশার গায়ে কম্ফোর্টার জড়িয়ে দিয়ে আরহামকে বললেন ; যাতে সকালে আলিশাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়।
তারপর, আয়শা আর শাইনা দুজনেই ঘুমাতে চলে গেলেন নিজেদের কামরায়।
সকাল প্রায় ১১.৩০…
ডাক্তারের ক্যাবিনে বসে আছে আরহাম-আলিশা।
–কিছুক্ষন আগেই অনেকগুলা টেস্ট শেষে তারা এখন রিপোর্টের অপেক্ষায় বসে আছে।
রিপোর্ট দিতে আরও ১ ঘন্টা সময় বাকি। তাই তারা ক্যাবিনে বসে অপেক্ষা করছে। ডাঃ নিলুফার কেবিনে নেই ; তিনি যাওয়ার আগে আরহামকে বলে গিয়েছেন যাতে সে আলিশাকে নিয়ে উনার ক্যাবিনে অপেক্ষা করে।
–ক্যাবিনের কর্নারে এক সেট সোফা রাখা আছে ; যেখানে এখন বসে আছে আরহাম-আলিশা।
আরহামের কাধে মাথা রেখে বসে আছে আলিশা।
আরহাম আলিশার চুলে বিলি কাটতে কাটতে জিজ্ঞেস করলো –
“খারাপ লাগছে?”
” হুম”
“ঠিক হয়ে যাবে।”
“আমার জন্য তোমার অনেক কষ্ট হচ্ছে, তাই না?”
“তা কেন মনে হলো তোর?”
“এই যে, কালরাত থেকে আমাকে সময় দিতে হচ্ছে। আজ তো তোমার রেকর্ডিং ও ছিলো।”
“এসব পরে। আগে তুই আর আমাদের বেবী।”
–দুজনের কথোপকথনের মাঝেই উপস্থিত হলেন নিলুফার।
ডাক্তারের আগমনে আরহাম সোজা হয়ে বসে জিজ্ঞেস করলো-
“আন্টি রিপোর্ট এসেছে?”
“এসেছে। এদিকে এসে বসো তোমরা।”
–আরহাম আর আলিশা সামনের চেয়ারে এসে বসতেই নিলুফার আক্তার বলেন –
“তোমার রিপোর্ট দেখে যা বুঝতে পারলাম তা হলো ; এসব কিছুই তোমার এলার্জির রিঅ্যাকশেন।”
আলিশা অবাক হয়ে বললো –
“কিন্তু আমার তো তেমন কিছুতেই এলার্জি নেই আন্টি।”
“তুমি কি এমন কিছু খেয়েছো বা ছুঁয়েছো যেটাতে তোমার এমন রিঅ্যাকশেন শুরু হয়েছে?”
” না, আমি তো তেমন কিছুই খাইনি।”
“তবে, কালরাতে ওর ক্ষিদে পাওয়াতে, আমি মাশরুম স্যুপ বানিয়ে দিয়েছিলাম।” আরহাম।
নিলুফার আক্তার কিছুক্ষণ চুপ থেকে গম্ভীরমুখে মুখে বললেন-
“তবে, সেটা খাওয়ার পরপরই কি তোমার এমন হয়েছে?”
“ঘন্টা দুয়েক এর মাঝে।”
“কিন্তু ওর তো মাশরুমে এলার্জি নেই। আমি অন্য এমন কিছুই এক্সট্রা দেইনি যার জন্য এমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।” (আরহাম)
–সব শুনে নিলুফার কিছু সময় চুপ থেকে আরহামকে জিজ্ঞেস করলেন –
“আরহাম তোমার কি মাশরুমে এলার্জি আছে?”
“হ্যাঁ, আমার আছে তবে তার সাথে আলিশার এলার্জি রিঅ্যাকশেনের সম্পর্ক কোথায়?”
ডাক্তার হেসে বললেন –
“এখন বুঝেছি। এলার্জি রিঅ্যাকশেন আলিশার নয় বরং বেবীর হয়েছে।”
–দুজনে একইসাথে বলে উঠলো – “বেবীর!”
“হ্যাঁ বেবীর। কারন সে তার বাবার থেকে জেনেটিক্যালি এটা রপ্ত করেছে।”
আরহাম আর আলিশা দুজনেই হতবাক।
ডাক্তার আরও বললেন,
“যতটুক বুঝেছি তাতে, বেবীর সেসব খাবারে এলার্জি আছে যেসবে আরহামের আছে। তাই আলিশা ডেলিভারির আগে তুমি এমন সবকিছু এভোইড করবে, যেগুলাতে আরহামের এলার্জি রিঅ্যাকশেন হয়।”
আলিশা গাল ফুলিয়ে নিজের বাড়ন্ত পেটে আঙুলের টোকা মেরে নিজে নিজে বলছে – “বাবু আমার পেটে থেকে কেন বাবার জেনেটিকস বেশি পাবে?”
আরহাম আলিশাকে আরও জ্বালানোর বাঁকা হেসে বলে –
“কারন, সে তার বাবাকে বেশি ভালোবাসে।”
এটা শুনে আলিশা এবার রাগান্বিত হয়ে আবারও পেটে টোকা দিয়ে বাবুর উদ্দেশ্য বলে – “এই বেবী শুন, তোর সাথে আমি আর কোনো কথায় বলবোনা।”
— দুজনের এমন বাচ্চামিতে ডাক্তার নিলুফার হেসে উঠলেন।
“নিজেরাই এখনও বাচ্চা। আর এরা নাকি আবার হবে বাচ্চার
মা-বাবা!”
তিনি আরও বললেন – “আলিশা, প্রেগন্যান্সির কারনে এখন তোমাকে কোনো মেডিসিন দিতে পারছিনা। তবে কিছু অয়েন্টমেন্ট দিয়েছি। সেগুলা নিয়মিত দিলে তোমার র্যাশ কমে যাবে।”
“আচ্ছা”
–ডাক্তার থেকে সব বুঝে নিয়ে তারা দুজনেই বেড়িয়ে গেলো হসপিটাল থেকে।
পার্কিং লটে গাড়ির কাছে যেতে যেতে আলিশা বারবার আরহামের গায়ে টোকা দিচ্ছে। এতে আরহাম বিরক্ত হয়ে শুধালো –
“কি সমস্যা, লিশা? এমন করছিস কেন?”
–আলিশা কিউট ফেস করে আরহামের একহাত জড়িয়ে ধরে আহ্লাদী স্বরে জিজ্ঞেস করলো –
“আমার বাচ্চার কিউট পটল বাপপপ…এখন আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
“এখনই একটা চটকনা লাগাবো, বেয়াদব মহিলা।”
আলিশা তা পাত্তা না দিয়ে আবারও জিজ্ঞেস করলো –
“বলো না, আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
“কোথায় আবার, বাসায় যাচ্ছি।”
“একদম না। আমরা এখন শপিংয়ে যাচ্ছিইইই।”
“চুপ থেকে, বাসায় চল।”
“তুমি বলেছিলে আমায় শপিং করাবে।”
“কখন বলেছি? আমার তো মনে পড়ছেনা।”
“যা তুই যাহহহ। তোর সাথে আর কোথাও যাবোনা আমি।”
“আচ্ছা।” বলেই আরহাম আলিশাকে ফেলে সামনের দিকে পা
বাড়ালো।
“এই গন্ডার দাড়া…. আমাকে ফেলে কোথায় যাচ্ছিস?”
“তুই’ই তো বললি, আমার সাথে আর কোথাও যাবিনা। তাই তো তোকে ফেলে যাচ্ছি।”
“রাগ করেছি আমি। রাগ ভাঙাও।”
“তোর ঝাটার রাগ তুই নিজে ভাঙা।”
“আমি কিন্তু সত্যি রাগ করবো।”
“এখন কি তবে মিথ্যা মিথ্যা রাগ করেছিস?”
আলিশা উত্তর করলোনা তবে তার চোখ ছলছল করছে।
“হয়েছে আর ন্যাকা কান্না করতে হবেনা। চল শপিংয়ে, তবে বেশি কিছু নিবিনা।”
“বেশি বেশিই নিবো।”
আরহামের গাড়ি এসে থামলো দেশের সবচেয়ে বড় শপিং মলের সামনে।
গাড়িটি থামার সঙ্গে সঙ্গেই পেছনে থাকা নিরাপত্তা রক্ষীদের গাড়িগুলোও একে একে এসে দাঁড়ালো। মুহূর্তের মধ্যেই কয়েকজন গার্ড নেমে চারপাশে সতর্ক অবস্থান নিলো। আরহাম ও আলিশা গাড়ি থেকে নামার আগেই পুরো এলাকাটা নিরাপত্তার বলয়ে ঢেকে গেলো।
আরহামের মুখ ঢাকা কালো মাস্কে, মাথায় নিচু করে পরা ক্যাপ, চোখে গাঢ় রঙের সানগ্লাস, তার উপর ফুল-স্লিভ জ্যাকেট ; নিজের পরিচয়ের সামান্যতম আভাসও রাখেনি সে।
আলিশাকেও মাথায় ওড়না টেনে মুখে মাস্ক পরে নিতে বলেছে আরহাম।
একবার যদি মিডিয়ার কানে খবর পৌঁছে যায় তবে মুহূর্তেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। তাই কোনো ধরনের ঝুঁকি না নিয়েই সম্পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করে এসেছে তারা।
শপিং মলের স্বয়ংক্রিয় কাঁচের দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই আশপাশের কয়েকজন কৌতূহলী দৃষ্টিতে একবার তাদের দেখলো। তবে পরমুহূর্তেই আবার যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। এই অভিজাত শপিং মলে এমন কড়া নিরাপত্তায় ধনী ও প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যদের আসা-যাওয়া নতুন কিছু নয়; তাই অল্প সময়ের কৌতূহল দ্রুতই মিলিয়ে গেলো ব্যস্ততার ভিড়ে।
–আলিশা প্রথমেই একটা টেডি বিয়ার শপে গেলো।
তার পিছু-পিছু আরহামও গেলো।
“এখানে কেনো এসেছিস?”
“দেখছোনা কেন এসেছি? আমাকে ওই টেডিটা কিনে দাও।”
“এসব কেনার বয়স আছে তোর?”
তোমার আমার গল্প পর্ব ১৫
“আমার জন্য না তো।”
“তাহলে কার জন্য?”
“বেবী চাচ্ছে তাই ওর জন্য নিবো।”
“বেবী কথা বলতে পারে?”
“পারেনা, তবে আমি বুঝতে পারি ও কি চায়।”
